📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 মাতৃগর্ভের সন্তান সম্পর্কে ডাক্তারদের অবগত হওয়া

📄 মাতৃগর্ভের সন্তান সম্পর্কে ডাক্তারদের অবগত হওয়া


আল্লাহ তা'আলা বলেন, [৩৪ :لقমান] ﴿ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ﴾ “এবং জরায়ুতে যা আছে, তা তিনি জানেন" আর মাতৃগর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে সে সম্পর্কে ডাক্তারদের বলে দেয়া!!
প্রশ্ন: বর্তমানে মাতৃগর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে, সে সম্পর্কে ডাক্তারদের অবগত হওয়া আর আল্লাহর বাণী: [ لقمان: ﴿ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ﴾ [৩৪ "এবং জরায়ুতে যা আছে, তা কেবল তিনিই জানেন।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ৩৪] উভয়ের মাঝে যে বৈপরীত্য ও বিরোধ লক্ষ্য করা যায় তা কীভাবে নিরসন করা যাবে? তা জানতে চাই। এ ছাড়াও ইবনে জারির রহ. স্বীয় তাফসীরে মুজাহিদ থেকে এবং একই বর্ণনা ক্বাতাদাহ থেকে নকল করেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার গর্ভবতী স্ত্রীর গর্ভের সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে বলল, সে কন্যা সন্তান জন্ম দেবে নাকি ছেলে? এ জিজ্ঞাসার প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তা'আলা এ ﴿ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ﴾ [لقمان: ৩৪] “এবং জরায়ুতে যা আছে, তা কেবল তিনিই জানেন” [সূরা লুকমান, আয়াত: ৩৪] আয়াত নাযিল করেন।
উত্তর: মাস'আলাটি উত্তর দেওয়ার পূর্বে এ কথা জানিয়ে দেওয়া জরুরি মনে করছি যে, কুরআনের সু-স্পষ্ট আয়াত কখনোই বাস্তবতার পরিপন্থী বা বাস্তবতার সাথে বিরোধপূর্ণ হতে পারে না। যদিও বাহ্যিক অর্থে বিরোধ দেখা যায়, তবে তা নিছক জ্ঞানের অভাব বা অহেতুক দাবী ছাড়া আর কিছুই নয়। অথবা কুরআনের আয়াতের বর্ণনাটি তার কাছে অস্পষ্ট এবং সে বুঝতে অক্ষম।
কারণ, কুরআনের স্পষ্ট বাণী ও বাস্তবতা উভয়টি অকাট্য সত্য। আর দু'টি অকাট্য সত্য বিপরীতমুখী বা পরস্পর বিরোধী হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব।
বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর বলা যায় যে, বর্তমানে ডাক্তারগণ অত্যাধুনিক ও সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির মাধ্যমে মাতৃগর্ভের সন্তান সম্পর্কে অবগত হওয়ার দক্ষতা অর্জন করেছেন। মাতৃগর্ভের সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে? সে সম্পর্কে তাদের অবগত হওয়ার দাবি যদি অসত্য হয়, তবে তাতে কোন প্রশ্ন থাকে না। (যেমনটি অনেক সময় হয়ে থাকে) আর যদি সত্য হয়, তবে তাও কুরআনের আয়াতের সাথে বিরোধপূর্ণ নয়। কারণ, এ আয়াত পাঁচটি বিষয় গাইবী হওয়াকে প্রমাণ করে যার ইলম কেবল আল্লাহর ইলমের সাথে সম্পর্ক।
এগুলো একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। আর মাতৃগর্ভের সন্তান বিষয়ে গাইবী বিষয়গুলো হলো, মায়ের পেটে তার অবস্থানের সময়ের পরিমাণ, হায়াত, কর্ম, রিযিক, সৎ হওয়া, অসৎ হওয়া এবং সৃষ্টির পূর্বে ছেলে বা মেয়ে হওয়া। (এ বিষয়গুলো কেবল আল্লাহ জানেন আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না)
ফলে সৃষ্টির পর ছেলে বা মেয়ে হওয়া সম্পর্কে জানা কোন গাইবী বিষয় নয় যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানতে পারবে না। কারণ, সৃষ্টির পর তা আর অদৃশ্য থাকে না বরং তা দৃশ্য, যা প্রত্যক্ষ জ্ঞানে পরিণত হয়। তবে সন্তানটি এমন তিনটি অন্ধকারের মধ্যে লুকায়িত ও গোপন যা দূর করা হলে তার বিষয়টি স্পষ্ট হয় যাবে। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে এমন কোন শক্তিশালী আলো বা যন্ত্র পাওয়া যাওয়া অসম্ভব নয়, যা এ তিন অন্ধকারকে ভেদ করে বাচ্চাটির ছেলে না মেয়ে তা প্রকাশ করে দিতে পারে। আর আয়াতে বা রাসূল থেকে বর্ণিত হাদীসে স্পষ্ট করে এ কথা বলা হয়নি যে, ছেলে হওয়া বা মেয়ে হওয়ার বিষয়টি গাইবী বিষয় যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানতে পারবে না।
প্রশ্নকারী ইবনে জারীর থেকে এবং তিনি মুজাহিদ থেকে যে হাদীস বর্ণনা করেছেন—এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, তার স্ত্রী কেমন সন্তান প্রসব করবেন? তখন আল্লাহ তা'আলা উল্লিখিত আয়াত নাযিল করেন—সে হাদীসটি মুনকাতে'। কারণ, মুজাহিদ রহ. তাবে'ঈনদের একজন ছিলেন সাহাবী ছিলেন না।
আর কাতাদাহ রহ, 'কেবল আল্লাহ জানেন' বলে হাদীসটির যে ব্যাখ্যা করেছেন, সে ব্যাখ্যার অর্থ, এ হতে পারে যে, বাচ্চাটি সৃষ্টির পূর্বের বিষয়গুলো কেবল আল্লাহ জানেন। আর সৃষ্টির পর তার সম্পর্কে অন্যরাও জানতে পারে তাতে কোন অসুবিধা নেই।
আল্লামা ইবন কাসীর রহ. সূরা লুকমানের আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, 'আর অনুরূপভাবে মাতৃগর্ভে যা রয়েছে সেটিকে তিনি কি সৃষ্টি করার ইচ্ছা করবেন, তা তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না। কিন্তু যখন তিনি ছেলে বা মেয়ে এবং নেককার বা বদকার হওয়ার নির্দেশ দেন তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ফিরিশতাগণ এবং অন্যান্য মাখলুক যাদেরকে তিনি জানান, তারা জানতে পারেন'।
আল্লাহর ব্যাপক বাণী—﴾وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ﴿ [لقمان: ٣٤] - “এবং জরায়ুতে যা আছে, তা কেবল তিনি জানেন” [সূরা লুকমান, আয়াত: ৩৪] -তে খাস করা সম্পর্কে তোমাদের করা প্রশ্নের উত্তর হলো, সৃষ্টি করার পর যদি আয়াতটি ছেলে হওয়া বা কন্যা হওয়া বিষয়ে যদি জানা যায়, তখন খাসকারী হলো বাস্তবতা ও অনুধাবন। উসূলের ইমামগণ বলেছেন, কিতাব ও সূন্নাহের মুখাস্পিস হয়তো নস হবে অথবা ইজমা অথবা কিয়াস অথবা বাস্তবতা। এ বিষয়ে তাদের কথা অত্যন্ত সু-প্রসিদ্ধ।
আর যদি আয়াত সৃষ্টির পরকে অর্ন্তভুক্ত না করে এবং তার দ্বারা উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সৃষ্টির পূর্বের বিষয়গুলো হয়ে থাকে তাহলে গর্বের সন্তান ছেলে না মেয়ে সে সম্পর্কে কারো জানা না থাকা এবং তা কেবল আল্লাহর জানা থাকার সাথে তোমরা যা বলেছ তার সাথে আয়াতটি মোটেও বিরোধপূর্ণ নয়।
আলহামদু লিল্লাহ! বাস্তবে এমন কোন বিষয় কখনো পাওয়া যায়নি এবং ভবিষ্যতেও পাওয়া যাবে না, যা কুরআনের স্পষ্ট বাণীর সাথে পরস্পর বিরোধী হবে।
কিছু বিষয় যেগুলো বাহ্যিক ভাবে কুরআনের স্পষ্ট বাণীর সাথে বিরোধ মনে হয় সেগুলোকে নিয়ে ইসলাম ও মুসলিমের দুশমনরা যে সব কল্পকাহিনী, প্রশ্ন ও আপত্তি আরোপ করে, তা তাদের জ্ঞানের দুর্বলতা এবং আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার কারণে হয় অথবা তাদের খারাপ কোন উদ্দেশ্যের কারণে হয়ে থাকে।
কিন্তু যারা দীনদার ও আহলে ইলম তারা গবেষণা ও চিন্তা করে আসল রহস্য উদঘাটন করতে পারেন, যা তাদের সন্দেহ-সংশয়কে দূর করে দেন। যাবতীয় প্রশংসা ও দয়া কেবলই আল্লাহর।
মনে রাখবে, এ মাস'আলাটির ক্ষেত্রে মানুষ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত:
প্রথম-এক শ্রেণী যারা কুরআনের বাহ্যিক অর্থ যা স্পষ্ট নয় তা গ্রহণ করেছে এবং কুরআনের বাহ্যিক অর্থের বিপরীত যে বাস্তবতা ও অনিবার্য সত্য রয়েছে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে আপত্তিটি হয় তার নিজের দুর্বলতা ও অক্ষমতাকে টেনে নিয়ে আসে অথবা কুরআনের প্রতি আপত্তিটি আরোপিত হয়। কারণ, তার দৃষ্টিতে কুরআনে এমন একটি বিষয় বলা হয়েছে যা অকাট্য একটি সত্যকে অস্বীকার করে এবং তা তার বিপরীত।
দ্বিতীয়- যারা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত বিষয়কে পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং বস্তুবাদের দ্বারা সাব্যস্ত বাস্তব বিষয়টিকে গ্রহণ করে থাকে। এর ফলে তারা নাস্তিকদের দলভুক্ত হয়ে পড়ে।
তৃতীয়- যারা মধ্যপন্থী। তারা কুরআনের দ্বারা প্রমাণিত বিষয়টিও জানেন এবং বাস্তবতাকে স্বীকার করেন। তারা এ কথা মেনে নেন যে, কুরআন ও বাস্তবতা উভয়টিই সত্য। কুরআনের কোন একটি স্পষ্ট বিষয় বাস্তব ও চাক্ষুষ কোন বিষয়ে সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। তারা আকল (জ্ঞান বা যুক্তি) ও নকল (কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা) উভয়ের মাঝে সামঞ্জস্য সাধন করেন। যার ফলে তাদের দীনদারি ও বাস্তবতা উভয়টি যথাস্থানে বহাল থাকে।
আল্লাহ তা'আলা যারা ঈমান এনেছেন তাদেরকে বিরোধপূর্ণ বিষয়ে সঠিক পথ দেখান। আর আল্লাহ যাকে চান তাকে সঠিক পথের প্রতি হিদায়েত দিয়ে থাকেন। আল্লাহর নিকট আমাদের কামনা এই যে, তিনি যেন আমাদের ও তোমাদের সবাইকে ভালো কর্মের তাওফীক দেন। হে আল্লাহ তুমিই একমাত্র তাওফীক দাতা, তোমার ওপরই ভরসা। আর তোমার দিকেই আমাদের ফিরে যাওয়া।

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 নবীগণ শির্ক থেকে পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের শির্ক না করার নির্দেশ

📄 নবীগণ শির্ক থেকে পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের শির্ক না করার নির্দেশ


নবীগণের শির্ক থেকে পবিত্র হওয়া ও আল্লাহ তা'আলার বাণী- ﴿وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ﴾ [يونس : ১০৬] “আর আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুকে ডেকো না, যা তোমার উপকার করতে পারে না এবং তোমার ক্ষতিও করতে পারে না।" [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৬]
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে এ কথা- ﴿وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ﴾ [يونس : ১০৬] “আর আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুকে ডেকো না, যা তোমার উপকার করতে পারে না এবং তোমার ক্ষতিও করতে পারে না” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৬] কেন বলেছেন? অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শির্ক থেকে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ এবং তার থেকে শির্ক পাওয়া যাওয়া অসম্ভব?
উত্তর: আয়াতের বাহ্যিক বর্ণনা ভঙ্গি দ্বারা বুঝা যায় যে, এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেই সম্বোধন করা হয়েছে। কোন কোন আলেম বলেন, রাসূলকে সম্বোধন করা হয়েছে, এ কথা বলা সঠিক নয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শির্ক প্রকাশ পাওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। আয়াতের শুরুতে قُلْ শব্দটি উহ্য আছে। (তখন অর্থ হবে হে রাসূল! আপনি বলুন)। এ ব্যাখ্যাটি দুর্বল কারণ, এ দ্বারা আয়াতকে তার বর্ণনা ভঙ্গি থেকে দূরে সরানো হয়।
সঠিক উত্তর: সম্বোধনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য খাস। কিন্তু বিধানটি তার জন্য ও অন্যদের জন্য ব্যাপক। অথবা সম্বোধনটি যাদের সম্বোধন করা যায় তাদের সবার জন্য ব্যাপক। তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের সম্বোধন রাসূলুল্লাহের প্রতি নির্দেশিত হওয়া এ কথাকে বাধ্য করে না যে, তার থেকে শির্ক পাওয়া যাওয়া সম্ভব। আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ ا أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ ﴾ [الزمر: ٦٤] “আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই।” [সূরা আয-যুমার আয়াত: ৬৪]
ফলে সম্বোধনটি তার জন্য এবং সব নবী ও রাসূলদের জন্য যাদের থেকে শির্ক পাওয়া যাওয়া অসম্ভব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তার অবস্থান বিবেচনায় শির্ক পাওয়া যাওয়া কখনোই সম্ভব নয়। তারপরও তাকে নিষেধ করার হিকমত হলো, যাতে অন্যরা এ কথা দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করে এবং সতর্ক হয়, যাদের থেকে শির্ক পাওয়া যাওয়া তার অবস্থান বিবেচনায় অসম্ভব তার জন্য যদি এত বড় কড়াকড়ি ও নিষেধাজ্ঞা হয়, তাহলে যারা তাদের মানের লোক নয়-নবী বা রাসূল নয়- তাদের জন্য কি ধরনের কড়াকড়ি হতে পারে?। ফলে তাদের সাবধান ও সতর্ক হওয়া তাদের তুলনায় আরো অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রেয়। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দেওয়ার মালিক এবং তিনিই অভিবাবক।
শাইখ মুহাম্মদ ইবন উসাইমীন রহ.

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 নবীদের মর্যাদার স্তর

📄 নবীদের মর্যাদার স্তর


আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴾لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ [البقرة: ٢٨٥ “আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না" [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫] এবং আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴿تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ [البقرة: ٢৫৩] “ঐ রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৫৩]
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলার এ বাণী- : ﴿تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ ﴾ [البقرة: ২০৩ “ঐ রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৫৩] এবং অপর বাণী- ﴿لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ [البقرة: ٢৮৫] "আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫] উভয় আয়াতের মাঝে পরিলক্ষিত বিরোধ কিভাবে দূর করব?
উত্তর: আল্লাহ তা'আলার বাণী - : ﴿تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ [البقرة: ২০৩ "ঐ রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৫৩] টি আল্লাহ তা'আলার অপর বাণী: ﴿وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّنَ عَلَى بَعْضٍ﴾ [الاسراء: ٥٥] “উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি” [সূরা আল-ইসরাহ, আয়াত: ৫৫]-এর মতো। নবী ও রাসূলগণ অবশ্যই একজন অপর জন অপেক্ষায় শ্রেষ্ঠ। রাসূলগণ নবীদের অপেক্ষায় শ্রেষ্ঠ। উলুল-আযম রাসূলগণ অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। উলুল-আযম রাসূলগণ হলেন পাঁচ জন যাদের আলোচনা আল্লাহ তা'আলা কুরআনের দু'টি আয়াতে করেছেন।
প্রথম আয়াত সূরা আল-আহযাবে, যাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ ﴿ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ وَأَخَذْنَا مِنْهُم مِّيثَاقًا ﴾غَلِيظًا ﴾ [الاحزاب : ٧] “আর স্মরণ কর, যখন আমি অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম নবীদের থেকে এবং তোমার থেকে, নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারইয়াম পুত্র ঈসা থেকে। আর আমি তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৭] মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূহ আলাইহিস সালাম ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মূসা আলাইহিস সালাম এবং ঈসা ইবন মারইয়াম আলাইহাস সালাম প্রমুখদের কথা এ আয়াতে বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় আয়াত সূরা আশ-শূরা, যাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ﴾ [الشورى : ١٣] “তিনি তোমাদের জন্য দীন বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন; যে বিষয়ে তিনি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আর আমি তোমার কাছে যে ওহী পাঠিয়েছি এবং ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তা হল, তোমরা দীন কায়েম করবে এবং এতে বিচ্ছিন্ন হবে না।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১৩] সুতরাং, উভয় আয়াতে পাঁচ জনের আলোচনা রয়েছে। আর এরা পাঁচজন অন্যদের তুলনায় উত্তম।
মু'মিনদের সম্পর্কে আল্লাহর বাণী: ﴿كُلُّ ءَامَنَ بِاللَّهِ وَمَلَيْكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ﴾ [البقرة: ٢٨٥] প্রত্যেক ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাকুল, কিতাবসমূহ ও তাঁর রাসূলগণের উপর, আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫] এর অর্থ, ঈমান আনার বিষয়ে আমরা তাদের মধ্যে কোন প্রকার পার্থক্য বা ব্যবধান করব না। বরং আমরা ঈমান আনব যে, তারা সবাই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য রাসূল, তারা কখনোই মিথ্যা বলেননি, তারা সত্যবাদী ও বিশ্বাস্য। আর এটি হলো আল্লাহ তা'আলার বাণী- لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ﴾ [البقرة: ٢٨٥] “আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫]-এর মর্ম অর্থ। অর্থাৎ, ঈমানের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোন ব্যবধান করব না। বরং তারা সবাই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য রাসূল এ কথার প্রতি ঈমান আনব এবং বিশ্বাস স্থাপন করব। কিন্তু ঈমানের দাবী অনুসরণ করা। যারা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর পরে দুনিয়াতে এসেছে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর অনুকরণই খাস বা নির্ধারিত। কারণ, তিনিই অনুকরণ যোগ্য। তার আনিত শরী'আত পূর্বের সব শরী'আতকে রহিত করে দিয়েছেন। এ দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম যে, ঈমান হবে সব নবী ও রাসূলগণের প্রতি, আমরা তাদের সবাইকে বিশ্বাস করি, তারা সবাই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য রাসূল এবং তারা যে শরী'আত নিয়ে আগমন করেছেন তা সত্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়াতে প্রেরণের পর পূর্বের সব দীন ও শরী'আত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আতের দ্বারা রহিত। বর্তমানে সমগ্র মানুষের ওপর ওয়াজিব হলো, কেবল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরী'আতের অনুকরণ করা এবং তার সাহায্য করা। আল্লাহর তার প্রজ্ঞা ও হিকমত দ্বারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীন ছাড়া পূর্বে নবী ও রাসূলদের সব দীন ও শরী'আতকে রহিত করে দিয়েছেন। এ কারণেই আল্লাহ তা'আলা বলেন, قُلْ يَأْيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ يُحْيِ وَيُمِيتُ فَتَامِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ النَّبِيِّ الْأُتِيَ الَّذِي يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمَاتِهِ، وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
[الأعراف: ١٥৭] “বল, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল, যার রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আন ও তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর প্রতি, যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের প্রতি ঈমান রাখে। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, আশা করা যায়, তোমরা হিদায়াত লাভ করবে।” [সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৫২] সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীন ছাড়া বাকী সব দীন রহিত। কিন্তু রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস করা ও ঈমান আনা এবং তাদের সত্য বলে জ্ঞান করা খুবই জরুরি। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দেয়ার মালিক ও অভিবাবক।
শাইখ মুহাম্মদ ইবন উসাইমীন রহ.

📘 কুরআন ও সুন্নাহের ওপর আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের জাওয়াব > 📄 শির্কের গুনাহ ক্ষমা সম্পর্কে দু‘টি আয়াতের বিরোধ নিরসন

📄 শির্কের গুনাহ ক্ষমা সম্পর্কে দু‘টি আয়াতের বিরোধ নিরসন


আল্লাহ তা'আলার বাণী: ]۸۲ ) [طه﴿ :وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَن تَابَ "আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে" [সূরা তা-হা, আয়াত: ২৮৫] আল্লাহ তা'আলার অপর বাণী: ]إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ ﴾ [النساء : ٤٨ "নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না।” [সূরা নিসা, আয়াত: ৪৮]
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলার বাণী: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن﴿ ]يَشَاءُ ﴾ [النساء : ٤٨ “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান।” [সূরা আন- নিসা, আয়াত: ৪৮] এবং আল্লাহ তা'আলার অপর বাণী: وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى ﴾ [طه: ٨٢] ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।” [সূরা তা-হা, আয়াত: ৮২] এ দু'টি আয়াতের মাঝে (একটিতে ক্ষমা করার ঘোষণা এবং অপটিতে শির্কের গুণাহ ক্ষমা না করার কথা বলা হয়েছে) কীভাবে একত্র করব এবং বিরোধ নিরসন করব। বাস্তবে উভয় আয়াতের মধ্যে কোন বৈপরীত্য বা বিরোধ আছে কি?
উত্তর: উভয় আয়াতের মধ্যে কোন বিরোধ বা বৈপরীত্য নেই। প্রথম আয়াত ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে যে শির্কের ওপর তাওবা ছাড়া মারা গেছে। আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করবেন না তার ঠিকানা জাহান্নাম। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَلَهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ ﴾ ﴿أَنصَارِ ﴾ [المائدة: ٧২] “নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা মায়েদাহ, আয়াত: ৭২] আল্লাহ আরও বলেন, ﴿وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُواْ يَعْمَلُونَ﴾ [الانعام : ৮৮] “আর যদি তারা শির্ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত।” [সূরা আল-আনআম, আয়াত: ৮৮]
আর দ্বিতীয় আয়াত: আল্লাহ তা'আলার বাণী: وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ ﴿صَلِحًا ثُمَّ اهْتَدَى ﴾ [طه: ٨২] “আর অবশ্যই আমি তার প্রতি ক্ষমাশীল, যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎ পথে চলতে থাকে।” [সূরা তা-হা, আয়াত: ৮২] (এ সম্পর্কীয় আয়াত কুরআনে কারীমে আরও অনেক রয়েছে।) দ্বিতীয় আয়াত যাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, তা হলো তাদের সম্পর্কে যারা তাওবা করেছেন। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার বাণী: قُلْ يَعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُসِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ ﴿هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ ﴾ [الزمر: ৫২] “বল, 'হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু'।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫২] সমস্ত উম্মত এ বিষয়ে একমত যে, এ আয়াতটি তাওবাকারীদের বিষয়ে অবতীর্ণ। আল্লাহ তা'আলাই তাওফীক দাতা。
শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00