📄 শিক্ষা দানের বাস্তব পদ্ধতি
শিক্ষাদানের বাস্তব পদ্ধতিকে চারিত্রিক পদ্ধতিও বলা যেতে পারে। নবী তাঁর সাথিদেরকে সারা জীবনে এমন একটি কথাও শিক্ষা দেননি, যেটি তিনি নিজের জীবন ও চরিত্রে বাস্তবায়ন করেননি। বরঞ্চ তিনি তাদের যা কিছু মৌখিক শিক্ষা দিতেন, সেটা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেই দেখিয়ে দিতেন। আর এটাই ছিলো তাদের জন্যে সবচাইতে বড় শিক্ষা। মূলত জ্ঞান হলো বিশ্বাস বা ঈমান। আর জ্ঞানের বাস্তবরূপ 'আমলে সালেহ'। রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিকে ছিলেন জ্ঞান ও ঈমানের শিক্ষক আর অপর দিকে ছিলেন আমলে সালেহর মূর্তপ্রতীক। তাঁর সাথিরা তাঁর কাছে শুনে শুনে মৌখিক [Theoritical] জ্ঞানার্জন করতো আর তাঁর জীবন ও চরিত্র দেখে দেখে বাস্তব [Practical] শিক্ষা গ্রহণ করতো। তিনি নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন বটে, কিন্তু বলেছেন:
صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي
"তোমরা সেভাবে নামায পড়ো, যেভাবে আমাকে পড়তে দেখো।"
এক কিশোরের মা তাঁর কাছে এসেছিল তার সন্তানকে মিষ্টি বেশি না খাবার উপদেশ দিতে। কিন্তু তিনি এ উপদেশ দেবার জন্যে সময় চেয়ে নেন। অতপর তিনি নিজের মিষ্টি খাবার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করেন এবং কিছুদিন পর কিশোরটিকে মিষ্টি কম খাবার উপদেশ দেন।
তাঁর মৃত্যুর পর কিছু লোক তাঁর সম্পর্কে জানতে এলে তাঁর স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা তাদের বলে দেন, তাঁর জীবন ছিলো কুরআনেরই বাস্তবরূপ। এজন্যেই তিনি বলেছিলেন:
بُعِثْتُ لِأَتَمَّ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ (مؤطا امام مالك)
"উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্যে আমি প্রেরিত হয়েছি।” [মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিক]
আর তিনি যে উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা সাধন করেছিলেন, সে স্বীকৃতি স্বয়ং তাঁর প্রভুই তাকে দিয়েছেন:
وَ إِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ (القلم : ٤)
"তুমি অবশ্যি নৈতিক চরিত্রের উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত।" [সূরা কুলম: ৪]
সাথিদের সামনে উচ্চ নৈতিক চরিত্র পেশ করার মাধ্যমেই তিনি তাদেরকে সঠিক শিক্ষা দান করেছিলেন, তাদের মন জয় করেছিলেন এবং তাদেরকেও আদর্শ মানবদল হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। কেবল মৌখিক শিক্ষার মাধ্যমে এটা কিছুতেই সম্ভব ছিলনা।
📄 মৌখিক শিক্ষাদান পদ্ধতি
রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৌখিক শিক্ষাদান পদ্ধতিও ছিলো অত্যন্ত আকর্ষণীয়। আধুনিক কালের শিক্ষাবিদরা শিক্ষাদানের যতো প্রকার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথিদেরকে এসব পদ্ধতিতেই শিক্ষা প্রদান করতেন। বরং তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিলো আরো প্রশস্ত ও কার্যকরী। আমরা এখানে কুরআন ও হাদীসের আলোকে তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতির কয়েকটি মৌলিক দিক তুলে ধরবো।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতেন প্রতিটি কথা স্পষ্ট করে বলতেন। প্রতিটি শব্দের বিশুদ্ধ ও পরিষ্কার উচ্চারণ করতেন। কথা অনর্গল বলে যেতেননা, প্রতিটি শব্দ ও বাক্য পৃথক পৃথক উচ্চারণ করতেন। তিনি যখন কুরআন পাঠ করতেন তখনও এভাবেই পাঠ করতেন। এ ব্যাপারে একাধিক সূত্রে হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
তিনি বিরতি দিয়ে দিয়ে শিক্ষা দিতেন। অনবরত উপদেশ ও শিক্ষা প্রদান করে যেতেননা। তাঁর বক্তব্য শোনা ও শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে কেউ যাতে বিরক্ত না হয় সেদিকে তিনি পূর্ণ লক্ষ্য রাখতেন। আর এটা ছিলো তাঁর প্রতি কুরআনেরই নির্দেশ:
وَقُرْآنَا فَرَقْنَاهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثٍ وَنَزَّلْنَاهُ تَنْزِيلاً - (بني اسرائيل : ١٠٦)
"এ কুরআনকে আমরা অল্প অল্প করে নাযিল করেছি, যাতে তুমি বিরতি দিয়ে দিয়ে তা লোকদের শুনাও এবং এ গ্রন্থকে আমরা ক্রমশ নাযিল করেছি।" [সূরা বনি ইসরাঈল: ১০৬]
এ প্রসংগে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি। জনৈক তাবিয়ী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথি আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ সম্পর্কে বলেন: আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ প্রতি বিষ্যুদবারে লোকদের শিক্ষা প্রদান করতেন। জনৈক ব্যক্তি তাঁকে প্রতিদিন শিক্ষা প্রদানের অনুরোধ করেন। এর জবাবে তিনি বলেন: তোমাদের বিরক্তির আশংকায় এ কাজ থেকে আমি বিরত রয়েছি ঠিক সেভাবে, যেভাবে রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বিরক্তি উদ্রেক হয় কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখতেন।
অপর এক হাদীসে ইবনে আব্বাস [রা] বলেন, সাপ্তাহে একবার উপদেশ দান করো, অথবা দুইবার কিংবা খুব বেশি করলে তিনবার। [বুখারি]
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বক্তব্য বিষয় অত্যন্ত সহজভাবে উপস্থাপন করতেন। শ্রোতাদের ধারন ক্ষমতা অনুযায়ী কথা বলতেন। কারো সাধ্যের বাইরে তাকে কোনো কাজ বা দায়িত্ব দিতেননা। তিনি তাঁর সাথিদের বলতেন:
عَلِمُوا وَيَسِّرُوا ثَلَاثًا وَإِذَا غَضِبْتَ فَاسْكُتْ
"মানুষকে শিক্ষাদান করো এবং লোকদের সামনে সহজ করে পেশ করো (কথাটি তিনি তিন বার বলেছেন)। আর যখন তোমার মধ্যে ক্রোধের সঞ্চার হবে তখন চুপ থাকবে।" [আদাবুল মুফরাদ: ইবনে আব্বাস]
তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতির দুইটি বিশেষ বৈশিষ্ট হলো সুসংবাদ দান ও সতর্ককরণ। তিনি কখনো তাঁর সাথিদেরকে নিরাশ করতেননা। তাদের অকল্যাণ হবে এমনসব ব্যাপারে তাদেরকে সবসময় সতর্ক করতেন। তিনি তাঁর সাথিদেরকেও বলতেন, মানুষকে সুসংবাদ দাও, দূরে ঠেলে দিওনা। একটু আগে সূরা আহযাবের পঁয়তাল্লিশ আয়াতেও আমরা দেখেছি, আল্লাহ্ তাঁকে সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী রূপেই প্রেরণ করেছেন।
বক্তব্য পেশ করার আগে তিনি শ্রোতাদের মনোযোগ পূরোপুরি আকৃষ্ট করে নিতেন। এ জন্যে আবার বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। কখনো ব্যক্তির নাম
ধরে ধরে সম্বোধন করতেন। কখনো কোনো সতর্ককারী বক্তব্য উচ্চারণ করতেন। কখনো একটি কথা একাধিক বার [Repeat] করতেন।
কখনো পারস্পরিক কথপোকথনের মাধ্যমে শিক্ষাদান করতেন। কখনো প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন। কখনো শিক্ষা দিতেন ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার মাধ্যমে। অবার কখনো শিক্ষা দিতেন বক্তৃতার মাধ্যমে। কখনো একটি সম্বোধন বা শব্দ উচ্চারণ করে কিছুক্ষণ চুপ থাকতেন। শ্রোতারা পরবর্তী কথাটি শুনার জন্যে গভীর আকর্ষণের সাথে মনোযোগ নিবদ্ধ করতো। অতপর তিনি মূল বক্তব্য পেশ করতেন। এভাবে তিনি অত্যন্ত কৌশল, বিজ্ঞতা ও মর্মস্পর্শী পন্থায় মানুষের কাছে দীনের শিক্ষা পেশ করতেন। আর এভাবে পেশ করার নির্দেশই তাঁর প্রভু তাঁকে দিয়েছিলেন:
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
"তোমার প্রভুর পথে মানুষকে ডাকো বিজ্ঞতার সাথে এবং মর্মস্পর্শী ভাষায়।" [সূরা আন নহল: ১২৫]