📘 কুরআন ও হাদীসের আলোকে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা > 📄 রসূলের শিক্ষা দানের ধারা পদ্ধতি

📄 রসূলের শিক্ষা দানের ধারা পদ্ধতি


রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনেই একটা পরিষ্কার ধারণা দেয়া হয়েছে। হাদীস থেকে তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে যা কিছু জানা যায়, তা কুরআন থেকে লাভ করা ধারণাকে ব্যাপক প্রশস্ত করে। আমরা খুঁটিনাটি আলোচনা পরিহার করে তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতির উপর কুরআন হাদীস ভিত্তিক একটি মৌলিক তথ্য এখানে পেশ করছি। প্রথমেই তাঁর শিক্ষা দান সংক্রান্ত বিখ্যাত আয়াতটি পেশ করছি। আয়াতটি কুরআনের একাধিক স্থানে পূণরুল্লেখ হয়েছে :
كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولًا مِنْكُمْ يَتْلُو عَلَيْكُمْ ابْتِنَا وَيُزَكِّيكُمُ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُمْ مَا لَمْ تَكُونُوا رورود تعلمون - (البقره : (١٥١)
“যেমন আমরা তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের মাঝে একজন রসূল পাঠিয়েছি। সে তোমাদেরকে আমার আয়াত পড়ে শুনায়, তোমাদের জীবনকে বিশুদ্ধ ও বিকশিত করে। তোমাদের আল কিতাব শিক্ষা দেয়, কর্মকৌশল শিক্ষা দেয়, আর তোমরা যা কিছু জানতেনা তা তোমাদের জানিয়ে দেয়।” [সূরা আল বাকারা : ১৫১]
এ আয়াত থেকে আমরা রসূলের শিক্ষাদান পদ্ধতির যে মৌলিক দিকগুলো লাভ করি, সেগুলো হলো :
ক. তিনি কুরআন পাঠ করে শুনাতেন : যেহেতু কুরআন লিখিত আকারে নাযিল হয়নি, তাঁকে অবশ্যি পাঠ করে শুনাতে হতো। এটা শুনানের জন্যই শুনানো ছিলনা। মূলত এটা ছিলো তাঁর পাঠদান।
খ. তাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ ও বিকশিত করতেন : অর্থাৎ তাদের আকীদা বিশ্বাস, ধ্যান ধারণা ও চিন্তা চেতনার মধ্যে তাওহীদি ঈমানের দৃষ্টিকোণ থেকে যেসব ভ্রান্তি ছিলো, সেগুলো সংশোধন করে দিতেন। শুধু তাই নয়, সেই সাথে তাদের নৈতিক চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করতেন। আর কেবল পরিশুদ্ধির কাজই তিনি করেননি, সেই সাথে তাদের আত্মিক, মানসিক, নৈতিক ও শারীরিক প্রতিভাসমূহকেও তিনি পূর্ণ বিকশিত করে দিয়েছেন।
গ. আল কিতাব শিক্ষা দিয়েছেন : আল কিতাব মানে আল কুরআন। অর্থাৎ তিনি তাদের পরিশুদ্ধি ও প্রতিভা বিকাশের জন্যে যে কাজ করেছেন, তা করেছেন তাদেরকে আল কুরআন শিক্ষা দানের মাধ্যমে। এ মহা গ্রন্থই সংস্কার সংশোধন ও মানব প্রতিভা বিকাশের সর্বশ্রেষ্ঠ উপকরণ।
ঘ. তাদেরকে কর্মকৌশল শিক্ষা দিয়েছেন : কুরআনে হিকমাহ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। হিকমাহ মানে কর্মকৌশল, প্রজ্ঞা এবং শিক্ষা, সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ বাস্তবায়নের দক্ষতা ও কৌশল। অর্থাৎ নবী কুরআন তথা অহীর মাধ্যমে তাঁর সাথিদেরকে যেসব শিক্ষা, সিদ্ধান্ত ও নির্দেশাবলী প্রদান করতেন, সেগুলো তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে কার্যকর করার যোগ্যতা, দক্ষতা এবং কর্মকৌশলও তাদের শিক্ষা দিতেন। সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈষয়িক জীবনের সকল দিক
ও বিভাগ পরিচালনার দক্ষতা সৃষ্টি কর্মকৌশল বা হিকমাহ শিক্ষা দানের অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
৬. যা তারা জানতোনা তাও তাদের শিক্ষা দিতেন: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের মধ্যে আগমন করেছিলেন, তারা ছিলো অসভ্য, কুসংস্কারে বিশ্বাসী। চালচলন ছিলো নোংরা অপরিচ্ছন্ন। সদাচার তারা জানতোনা। পবিত্রতার ধার ধারতোনা। উত্তম সভ্যতা সংস্কৃতির ধারক বাহক তারা ছিলোনা। রসূল তাদের সভ্যতা সংস্কৃতি শিক্ষা দেন। সুন্দর অমায়িক আচার আচরণ শিক্ষা দেন। পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতা শিক্ষা দেন। এভাবে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে সর্বোত্তম মানবীয় গুণাবলী তাদের মধ্যে সৃষ্টি করেন।
এ হলো রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষাদান পদ্ধতির একটি দিক। এ দিকটি অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। যারা বিশ্বমানবতাকে শিক্ষা দীক্ষার দিক থেকে চিরন্তন কল্যাণের পথে এগিয়ে নিতে চাইবেন, রসূলে করীমের এই শিক্ষাদান পদ্ধতির মধ্যে তাদের জন্যে বিরাট দিক নির্দেশনা রয়েছে।

📘 কুরআন ও হাদীসের আলোকে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা > 📄 শিক্ষকের দায়িত্ব

📄 শিক্ষকের দায়িত্ব


এ আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, রসূলের শিক্ষকতা পৃথিবীর প্রচলিত শিক্ষকতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। পৃথিবীর সাধারণ শিক্ষকরা শুধু জ্ঞান পৌঁছে দেয়ার [Transfer] দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু আমরা দেখলাম, রসূলের অবস্থা তা নয়। তিনি জ্ঞান দান করতেন এবং সাথে সাথে জ্ঞানের ভিত্তিতে আত্মা, মন ও নৈতিক চরিত্রের দিক থেকে তাঁর ছাত্রদেরকে পরিপূর্ণভাবে পরিশুদ্ধ ও পরিগঠিত করে তোলেন। তিনি শুধু জ্ঞানের সংজ্ঞা আর ব্যাখ্যাই প্রদান করতেননা। বরং সংজ্ঞা এবং ব্যাখ্যার আলোকে বিনির্মাণের কাজও করতেন। এর কারণ, তাকে যে শিক্ষা নিয়ে পাঠানো হয়েছে তা শিক্ষাদান ও বাস্তবায়ন উভয় দায়িত্বই তাঁর উপর অর্পণ করা হয়েছিল:
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ - (توبه : (۳۳)
"তিনিই আল্লাহ্, যিনি তাঁর রসূলকে সঠিক পথের শিক্ষা ও সত্য জীবন যাপনের বিধানসহ পাঠিয়েছেন, যেন তা সে অন্য সকল বিধানের উপর বিজয়ী করে দেয়।" [সূরা আত তাওবা: ৩৩]
যেহেতু আদর্শের শিক্ষাদান ও তা বাস্তবায়ন এই উভয় দায়িত্বই নবীর উপর অর্পিত হয়েছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে লোক তৈরি করতে হয়েছিল। এ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল জ্ঞান Transfar করাই নয়, বরং জ্ঞানের আলোকে লোক তৈরি করাও তার সমান দায়িত্ব।

📘 কুরআন ও হাদীসের আলোকে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা > 📄 শিক্ষকের প্রস্তুতি

📄 শিক্ষকের প্রস্তুতি


শিক্ষা দানের জন্যে শিক্ষকের প্রথম কাজ হলো নিজের প্রস্তুতি। আর রসূল যেহেতু জ্ঞান এবং জ্ঞানের বাস্তবরূপ অর্থাৎ চরিত্রেরও শিক্ষক ছিলেন, সে জন্যে উভয় প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণও ছিলো তাঁর জন্যে অপরিহার্য। শুধু প্রস্তুতিই নয়, বরং শিক্ষককে তো হতে হবে মডেল। জ্ঞানের দিক থেকে পরিপূর্ণ বুঝ এবং চরিত্রের নিখুঁত পূর্ণতা শিক্ষকের জন্যে অপরিহার্য। আর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো ছিলেন কিয়ামত পর্যন্তকার গোটা বিশ্বমানবতার মূল শিক্ষক, সে জন্যে তাঁর প্রস্তুতিরও প্রয়োজন ছিলো সর্বাধিক। আর বাস্তবেও তাঁর উভয় প্রকার প্রস্তুতিতে কোনো প্রকার ঘাটতি ছিলোনা। জ্ঞান বৃদ্ধির জন্যে আল্লাহ্র নির্দেশে তিনি দোয়া করতেন:
رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا - (طُهُ : ١١٤)
"প্রভু! আমাকে আরো অধিক জ্ঞান দান করো।" [সূরা তোয়াহা: ১১৪]
জ্ঞানের প্রতি তাঁর এতোই আকর্ষণ ছিলো যে, যখনই অহী নাযিল হতো, তিনি তা দ্রুত মুখস্ত করে নেয়ার জন্যে ঘন ঘন ঠোঁট নাড়তে থাকতেন। এমন কি তাঁর এ অবস্থাকে অহীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছিল:
لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ - (القيامه : (١٦)
"অহী দ্রুত মুখস্ত করার জন্যে তোমার যবানকে আন্দোলিত করোনা।" [সূরা কিয়ামাহ: ১৬]
তবে অধ্যয়নের ব্যাপারে আসমানি তাকীদ অব্যাহত ছিলো:
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا - (المزمل : ٤)
"কুরআন পাঠ করতে থাকো ধীরে সুস্থে।" [সূরা মুজ্জাম্মিল: ৪]
اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ (العنكبوت : (٤٥)
"তোমার কাছে প্রেরিত কিতাব পাঠ করতে থাকো।" [আনকাবূত : ৪৫]
গুরুদায়িত্ব পালনের জন্যে তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন পূর্ণমাত্রায়। স্বয়ং তাঁর প্রভু তাঁর প্রস্তুতির স্বীকৃতি দিয়েছেন:
إِنَّ رَبَّكَ يَعْلَمُ أَنَّكَ تَقُومُ أَدْنَى مِنْ ثُلُثَيِ اللَّيْلِ وَنِصْفَهُ وَثُلُثَة (المزمل : ২০)
"তোমার প্রভু জানেন, তুমি কখনো রাতের দুই তৃতীয়াংশ, কখনো অর্ধরাত, আবার কখনো রাতের এক তৃতীয়াংশ সালাতে দাঁড়িয়ে থাকো।" [সূরা মুয্যাম্মিল: ২০]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00