📘 কুরআন ও হাদীসের আলোকে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা > 📄 শিক্ষার কুউদ্দেশ্য/ সংকীর্ণ উদ্দেশ্য

📄 শিক্ষার কুউদ্দেশ্য/ সংকীর্ণ উদ্দেশ্য


শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য তো হলো, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ তা'আলার সঠিক পরিচয় অবগত হওয়া, তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উপায় জানা, পরকালীন মুক্তির পথ খুঁজে নেয়া এবং মানবতার উন্নতি ও কল্যাণ সাধন। এটা শিক্ষার উদার উদ্দেশ্য। কিন্তু শিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে সংকীর্ণ উদ্দেশ্যও থাকে। এটাকে কুউদ্দেশ্যও বলা যেতে পারে। এ কুউদ্দেশ্য বা সংকীর্ণ উদ্দেশ্যের পরিচয় দিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَالِمٌ لَا يَنْتَفِعُ بِعِلْمِهِ - (دارمی)
“কিয়ামতের দিন আল্লাহ্র নিকট নিকৃষ্টতম মর্যাদার অধিকারী হবে সেই জ্ঞানী, যে তার জ্ঞান দ্বারা উপকৃত হতে পারেনি।" [দারমি]
مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُجَارِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسَ إِلَيْهِ أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ - (ترمذی، ابن ماجه)
"যে ব্যক্তি জ্ঞানীদের সাথে কুতর্কে লিপ্ত হবার জন্যে, কিংবা মূর্খদের বিভ্রান্ত করার জন্যে, অথবা জনগণকে নিজের ব্যক্তি সত্তার প্রতি আকৃষ্ট করবার জন্যে জ্ঞান শিক্ষা করে, আল্লাহ্ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।" [তিরমিযি, ইবনে মাজাহ]
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا لِيُصِبَ بِهِ غَرْضًا مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ - (مسند احمد، ابو داؤد)
"যে ব্যক্তি পার্থিব স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে জ্ঞান শিক্ষা করবে, কিয়ামতের দিন সে জান্নাতের গন্ধও লাভ করতে পারবেনা।" [মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ]
مَنْ سُئِلَ عَنْ عِلْمٍ عَلِمَهُ ثُمَّ كَتَمَهُ الْجِمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
بِلِجَامِ مِنَ النَّارِ - (احمد- ترمذی- ابو داؤদ - ابن ماجه)
"যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে জ্ঞান রাখলো, কিন্তু জিজ্ঞাসিত হবার পর তা গোপন করলো, কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের লাগাম পরিয়ে দেয়া হবে।” [আহমদ, তিরমিযি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ]
وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ وَعَلَّمَهُ وَقَرَأَ الْقُرْآنَ فَأُتِيَ بِهِ فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا قَالَ فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا ؟ قَالَ تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ وَعَلَّمْتُهُ وَقَرَأْتُ فِيكَ الْقُرْآنَ، قَالَ كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ لِيُقَالَ إِنَّكَ عَالِمٌ وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ إِنَّكَ قَارِئُ فَقَدْ قِيلَ ثُمَّ أُمِرَ بِهِ فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ - (مسلم)
"কিয়ামতের দিন অতপর বিচারের জন্যে এমন ব্যক্তিকে আল্লাহর দরবারে হাযির করা হবে, যে জ্ঞান শিক্ষা করেছে এবং মানুষকে শিক্ষা দান করেছে তাছাড়া কুরআনও পড়েছে। আল্লাহ্ পৃথিবীতে যেসব অনুগ্রহ তার প্রতি করেছিলেন সেগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে সেগুলো স্মরণ করবে। আল্লাহ্ বলবেন: এসব নি'আমত পেয়ে তুমি কি কাজ করেছিলে? সে বলবেঃ আমি জ্ঞানার্জন করেছি, মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমাকে খুশি করবার জন্যে কুরআন পড়েছি। আল্লাহ্ বলবেন: তুমি মিথ্যে বলছো। তুমিতো জ্ঞান চর্চা করেছো এ জন্যে, যেনো মানুষ তোমাকে জ্ঞানী বলে। আর কুরআন পড়েছো এজন্যে, যেনো লোকেরা তোমাকে কুরআনের পন্ডিত বলে। এসব কথা মানুষ তোমাকে বলেছে [এবং তোমার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে]। অতপর তাকে নিয়ে যাবার জন্যে আদেশ করা হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” [মুসলিম]
এই হাদীসগুলো থেকে আমরা জানতে পারলাম শিক্ষার সংকীর্ণ ও কুউদ্দেশ্য কি কি? হাদীসের আলোকে শিক্ষার সংকীর্ণ উদ্দেশ্য হলো :
১. উদ্দেশ্যহীন নিষ্ফল শিক্ষা অর্জন করা।
২. মানুষকে বিভ্রান্ত করা।
৩. শিক্ষার সঠিক ধারাকে ব্যাহত করা।
৪. নিজের ব্যক্তিত্ব প্রচার করা।
৫. পার্থিব স্বার্থ অর্জন করা।
৬. খ্যাতি লাভের প্রবণতা।
৭. শিক্ষা বিস্তারে কার্পণ্য করা।

📘 কুরআন ও হাদীসের আলোকে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা > 📄 ভালো ছাত্রের বৈশিষ্ট

📄 ভালো ছাত্রের বৈশিষ্ট


لَن يَشْبَعَ الْمُؤْمِنُ مِنْ خَيْرٍ يَسْمَعُهُ حَتَّى يَكُونَ مُنْتَهَاهُ الْجَنَّةَ - (ترمذي : ابو سعيد الخدري)
"মুমিন জ্ঞান ও কল্যাণের কথা যতোই শুনে তৃপ্ত হয়না। এই অতৃপ্ত অবস্থাতেই সে জান্নাতবাসী হয়।" [তিরমিযি: আবু সায়ীদ খুদরি]
مَنْهُومَانِ لَا يَشْبَعَانِ : مَنْهُومُ فِي الْعِلْمِ لَا يَشْبَعُ مِنْهُ وَمَنْهُومُ فِي الدُّنْيَا لَا يَشْبَعُ مِنْهَا - (بيهقي : انس)
"দুই পিপাসু কখনো তৃপ্তি লাভ করেনা। একজন হলো জ্ঞান পিপাসু, সে যতোই জ্ঞান লাভ করুক, তৃপ্ত হয়না। আরেকজন হলো সম্পদ পিপাসু, সেও যতোই লাভ করে তৃপ্ত হয়না।" [বায়হাকি: আনাস]
قَالَ أَيُّ عِبَادِكَ أَعْلَمُ قَالَ الَّذِي لَا يَشْبَعُ مِنَ الْعِلْمِ يَجْتَمِعُ عِلْمَ النَّاسِ إِلَى عِلْمِهِ
"দাউদ জানতে চাইলেন, হে আল্লাহ্! তোমার কোন্ বান্দাহ সর্বাধিক জ্ঞানী। তিনি বললেন: সর্বাধিক জ্ঞানী হলো সে, যার জ্ঞান পিপাসা মেটেনা, যে সব মানুষের জ্ঞান সংগ্রহ করে এনে নিজ জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করে।" (যাদে রাহ)
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ حَبْلُ اللَّهِ وَالنُّورُ الْمُبِينُ وَالشَّفَاءُ النَّافِعُ عِصْمَةً لِمَنْ تَمَسَّكَ بِهِ وَنَجَاةٌ لِمَنْ تَبِعَهُ (حاکم)
"কুরআন হলো আল্লাহ্র রজ্জু, অনাবিল আলো, নিরাময় দানকারী এবং উপকারী বন্ধু। যে তাকে শক্ত করে ধরবে তাকে সে রক্ষা করবে। যে তাকে মেনে চলবে, তাকে সে মুক্তি দেবে।" [হাকিম: ইবনে মাসউদ]
এ হাদীসগুলো থেকে জানা গেলো যে, তারাই হলো উত্তম ছাত্র যারা:
১. জ্ঞানের কথা যতোই শুনে অতৃপ্ত থেকে যায়। যতোই শিক্ষা লাভ করে, ততোই তাদের আরো শিখবার উদগ্র কামনা জাগ্রত হয়।
২. মধু মাছি যেমন ফুলে ফুলে বসে মধু আহরণ করে, তারাও তেমনি জ্ঞানীদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে শিক্ষা লাভ করে।
৩. প্রকৃত জ্ঞানের উৎস কুরআনকে অনুধাবন করে, আঁকড়ে ধরে এবং অনুসরণ করে।

📘 কুরআন ও হাদীসের আলোকে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা > 📄 শিক্ষাদান পদ্ধতি

📄 শিক্ষাদান পদ্ধতি


كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةٍ أَعَادَهَا ثَلَاثًا حَتَّى تُفْهَمَ عَنْهُ - (بخاري : انس)
"নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো বিষয়ে বক্তব্য রাখতেন, তখন তিনি [কোনো কোনো কথা] তিনবার পর্যন্ত উচ্চারণ করতেন, যাতে করে শ্রোতারা তা ভালভাবে বুঝে নিতে পারে।" [বুখারিঃ আনাস]
مَنْ أَفْتَى بِغَيْرِ عِلْمٍ كَانَ إِثْمُهُ عَلَى مَنْ أَفْتَاهُ وَمَنْ أَشَارَ عَلَى أَخِيهِ بِأَمْرٍ يَعْلَمُ أَنَّ الرُّشْدَ فِي غَيْرِهِ فَقَدْ خَانَهُ
"জানা না থাকা সত্ত্বেও কোনো বিষয়ে কাউকেও মত দেয়া হয়ে থাকলে, সে কাজের পাপ মত প্রদানকারীর উপর বর্তাবে। আর যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইকে এমন কোনো পরামর্শ দিলো, যে সম্পর্কে সে জানে যে, সঠিক ব্যাপার অন্যটি, তবে সে তার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করলো।” [আবু দাউদঃ আবু হুরাইরা]
إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنِ الْأَغْلُولَاتِ (ابو داود : معاویه (رض
"নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী শিক্ষাদান করতে এবং কথাবার্তা বলতে নিষেধ করেছেন।" [আবু দাউদ: মুয়াবিয়া]
آفَةُ الْعِلْمِ النِّسْيَانُ وَإِضَاعَتُهُ أَنْ تُحَدِّثَ بِهِ غَيْرَ اهله (دادمی)
"জ্ঞানের আপদ হলো ভুলে যাওয়া। আর যারা যে জ্ঞানের যোগ্য নয়, তাদের কাছে সে বিষয়ে কথা বলা মানে জ্ঞান নষ্ট করা।" [দারমি]
قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ : يَاَيُّهَا النَّاسُ مَنْ عَلِمَ شَنْيًا فَلْيَقُلْ بِهِ وَمَنْ لَمْ يَعْلَمُ فَلْيَقُلْ اللَّهُ أَعْلَمُ فَإِنَّ مِنَ الْعِلْمِ أَنْ تَقُولُ لِمَا لَا تَعْلَمُ اللَّهُ أَعْلَمُ - (بخاری-মুসলিম)
"আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেছেন: হে লোকেরা! তোমরা কেবল জানা বিষয়েই বলবে। আর যে বিষয়ে জানবেনা সে বিষয়ে বলবে: আল্লাহ্ই অধিক জানেন। কেননা 'আল্লাহ্ই অধিক জানেন' একথা বলাটাই তোমার জ্ঞান।" [বুখারি, মুসলিম]
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَخَوَّلُنَا بِالْمَوْعِظَةِ مَخَافَةَ السَّامَةِ عَلَيْنَا - (بخاری، مسلم )
"আমরা বিরক্ত হতে পারি এ আশংকায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উপদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে বিরতি দিতেন।" [বুখারি, মুসলিম: আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ]
مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً حَسَنَةٌ فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنقُصُ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْ وَمَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصُ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شي (মুসলিম : জারির বিন আব্দুল্লাহ)
"যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো উত্তম আদর্শ স্থাপন করবে, তার জন্যে সে কাজের প্রতিদান রয়েছে। তার পরে যারা সে কাজ করবে, সে জন্যেও সে প্রতিদান লাভ করবে, এতে তাদের প্রতিদান কমানো হবেনা। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, সে কাজের পাপ তার ঘাড়েই
পড়বে। পরবর্তীতে যারা সে দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে তাদের সে কর্মের পাপও তার ঘাড়ে পড়বে, এতে তাদের পাপও কমানো হবেনা। [মুসলিম]
এই হাদীসগুলো থেকে জানা গেলো যে:
১. রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাই শিক্ষা দিতেন, পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতেন। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তিনবার বলতেন।
২. অজ্ঞতা নিয়ে মতামত প্রকাশ করা যাবেনা। অসত্য তথ্য দিয়ে প্রতারণা করা যাবেনা।
৩. বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী শিক্ষাদান করা যাবেনা।
৪. অযোগ্যদের কাছে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত জ্ঞান সরবরাহ করা ঠিক নয়।
৫. শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে বিরতি জরুরি। বিরক্তি উদ্রেক করা যাবেনা।
৬. শিক্ষককে শিক্ষার অনুসরণ করে নিজেই বাস্তব শিক্ষায় পরিণত হতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00