📘 কুরআন ও সুন্নাহ’য় বর্ণিত শাফা‘আত 📄 শাফা‘আত সংক্রান্ত ইতিবাচক ও নেতিবাচক আয়াতসমূহে সামঞ্জস্য বিধান

📄 শাফা‘আত সংক্রান্ত ইতিবাচক ও নেতিবাচক আয়াতসমূহে সামঞ্জস্য বিধান


উপরোক্ত ইতিবাচক ও নেতিবাচক শাফা'আতে সামঞ্জস্য বিধান এভাবে সম্ভব যে, যেসব আয়াতে শাফা'আত নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা দ্বারা ঐ শাফা'আতটিকে অগ্রহণযোগ্য বা নেতিবাচক সাব্যস্ত করা হয়েছে, যা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট চাওয়া হয়। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,

قُل لِّلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا ﴾ [الزمر: ৪৪]

"বলুন, 'সকল সুপারিশ আল্লাহরই মালিকানাধীন'।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৪৪]

আর ইতিবাচক শাফা'আত কতগুলো শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করা হবে:

১. শাফা'আত করার ব্যাপারে শাফা'আতকারী ক্ষমতাবান হওয়া, যেমন আল্লাহ তা'আলা ঐ সুপারিশকারীর ব্যাপারে বলেন, যার কাছে সুপারিশ কামনা করা হয়, অথচ সে সুপারিশ করতে অক্ষম:

وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَؤُنَا عِندَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴾ [يونس: ১৮]

“আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর 'ইবাদাত করছে, যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, 'এগুলো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী।' বলুন, 'তোমরা কি আল্লাহকে আসমানসমূহ ও যমীনের এমন কিছুর সংবাদ দিবে, যা তিনি জানেন না? তিনি মহান, পবিত্র' এবং তারা যাকে শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮]

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

﴿وَلَا يَمْلِكُ الَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِهِ الشَّفَعَةَ إِلَّا مَن شَهِدَ بِالْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ ﴾ [الزخرف: ৮৬]

আর তিনি ছাড়া তারা যাদেরকে ডাকে, তারা সুপারিশের মালিক হবে না, তবে তারা ছাড়া, যারা জেনে-শুনে সত্য সাক্ষ্য দেয়।” [সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৮৬] সুতরাং এ থেকে জানা গেল যে, মৃতদের কাছে শাফা'আত বা সুপারিশ কামনা করার অর্থই হচ্ছে, এমন ব্যক্তির নিকট সুপারিশ চাওয়া, যে তার মালিক নয়।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ ﴾ [فاطر: ১৩, ১৪]

"আর তোমরা তাঁর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো খেজুর আঁটির আবরণেরও অধিকারী নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দিবে না। আর তোমরা তাদেরকে যে শরীক করেছ, তা তারা কিয়ামতের দিন অস্বীকার করবে। সর্বজ্ঞ আল্লাহর মত কেউই আপনাকে অবহিত করতে পারে না।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১৩, ১৪]

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

﴿قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكِ وَمَا لَهُ مِنْهُم মِّن ظَهِيرٍ وَلَا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ عِندَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ ﴾ [سبا: ২২, ২৩]

"বলুন, 'তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ্ মনে করতে তাদেরকে ডাক। তারা আসমানসমূহে অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়, যমীনেও নয়। আর এ দু'টিতে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সহায়কও নয়।' আর আল্লাহ্ যাকে অনুমতি দিবেন, সে ছাড়া তাঁর কাছে কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না।” [সূরা সাবা, আয়াত: ২২, ২৩]

২. যার জন্য সুপারিশ করা হবে, সে ব্যক্তি মুসলিম হওয়া; আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿ مَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ حَمِيمٍ وَلَا شَفِيعٍ يُطَاعُ ﴾ [غافر: ১৮]

“যালিমদের জন্য কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু নেই এবং এমন কোনো সুপারিশকারীও নেই, যার সুপারিশ গ্রাহ্য হবে।” [সূরা গাফের, আয়াত: ১৮] এখানে 'যালিমগণ' দ্বারা কাফিরদেরকে বুঝানো হয়েছে; তার দলীল হল, শাফা'আতের ক্ষেত্রে মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদীসসমূহ, যা 'আহলুল কাবায়ের' তথা কবীরা গুনাহের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য সাব্যস্ত। অচিরেই যথাস্থানে তার বিবরণ আসবে ইনশাআল্লাহ। আর হাফেয বায়হাকী রহ. তার 'আশ-শো'য়াব' (الشعب) গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ২০৫ পৃষ্ঠায় বলেন: এখানে 'যালিমগণ' হলো 'কাফিরগণ', আর এর প্রমাণ হলো আয়াতের সূচনা হয়েছে কাফিরদের আলোচনা প্রসঙ্গে।

আর হাফেয ইবন কাসীর রহ. আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: অর্থাৎ যারা নিজেদের ওপর যুলুম করেছে শির্ক করার মাধ্যমে, তাদের জন্য তাদের মধ্য থেকে কোনো নিকটতম ব্যক্তি থাকবে না, যে তাদের উপকার করবে এবং এমন কোনো সুপারিশকারীও থাকবে না, যে তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করবে; বরং তাদের সাথে সকল প্রকার কল্যাণের মাধ্যম বা উপায়সমূহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

আর মুশরিকদের মধ্য থেকে আবূ তালিবকে আলাদা (ব্যতিক্রম) বিষয় হিসেবে ধর্তব্য করা হয়। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য সুপারিশ করবেন, শেষ পর্যন্ত সে জাহান্নামের উপরিভাগে তথা পায়ের গ্রন্থি পর্যন্ত জাহান্নামের আগুনে থাকবে; অচিরেই যথাস্থানে হাদীসসমূহে তার বিবরণ আসবে ইনশাআল্লাহ।

৩. সুপারিশকারীর জন্য অনুমতি প্রদান; যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ﴾ [البقرة: ২৫৫] “কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে?” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫]

৪. যার জন্য সুপারিশ করা হবে, তার প্রতি সন্তুষ্টি বা সম্মতি থাকা; যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَكَم مِّن مَّلَكِ فِي السَّমَوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ শَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَى ﴾ [النجم: ২৬] “আর আসমানসমূহে বহু ফিরিশতা রয়েছে; তাদের সুপারিশ কিছুমাত্র ফলপ্রসূ হবে না, তবে আল্লাহর অনুমতির পর; যার জন্য তিনি ইচ্ছে করেন ও যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ২৬]

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: ﴿وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى ﴾ [الانبياء: ২৮] "আর তারা সুপারিশ করে শুধু তাদের জন্যই, যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৮]

📘 কুরআন ও সুন্নাহ’য় বর্ণিত শাফা‘আত 📄 শাফা‘আত সম্পর্কিত অধ্যায়

📄 শাফা‘আত সম্পর্কিত অধ্যায়


প্রাচীনকালে ও আধুনিক কালে মুশরিকগণ শির্কে লিপ্ত হয়ে থাকে কেবলমাত্র শাফা'আতের আঁচলে লটকে থাকার কারণে; যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

﴿وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنফَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَتَؤُنَا عِندَ اللَّهِ﴾ [يونس: ১৮]

“আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর 'ইবাদাত করছে, যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, 'এগুলো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

﴿وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى﴾ [الزمر: ৩]

"আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ্ সান্নিধ্যে এনে দিবে।” [সূরা যুমার, আয়াত: ৩]

সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলা (এ মুশরিকরা যাদের কাছে শাফা'আত কামনা-বাসনা করে শির্ক করছে) তাদের সেসব বাসনাকে কর্তন করে দিয়েছেন এবং তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, তা হলো শির্ক, তিনি নিজে তা থেকে পবিত্র এবং তিনি ব্যতীত সৃষ্টির জন্য কোনো বন্ধু অথবা সুপারিশকারী হয় না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

﴿اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ مَا لَكُم مِّن دُونِهِ مِن وَلِي وَلَا شَفِيعٍ أَفَلَا تَتَذَكَّਰُونَ ﴾ [السجدة: ৪]

“আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু'য়ের অন্তর্বর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই এবং সুপারিশকারীও নেই; তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ৪]

এই অধ্যায়ে লেখক (শাইখ ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আবদুল ওহহাব) এটার সপক্ষে দলীল দিতে চেয়েছেন যে, এটা (শাফা'আত কামনা-বাসনা-ই) হলো প্রকৃত শির্ক, আর শাফা'আতের ব্যাপারে ঐ ব্যক্তির ধারণা দুনিয়া ও আখিরাতে একেবারেই অস্তিত্বহীন-অসম্ভব ও অবাস্তব, যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে ডাকে এ অজুহাতে যে, সে তার জন্য সুপারিশ করবে, যেমনিভাবে মন্ত্রী রাষ্ট্রপতির নিকট সুপারিশ করে। অথচ আল্লাহই প্রথমে সুপারিশকারীকে সুপারিশের অনুমতি দিবেন; সুপারিশকারী প্রথমে সুপারিশ করবে না, যেমনটি ধারণা করে আল্লাহর শত্রুগণ।

অতঃপর যদি তুমি বল: যখন কোনো লোক আল্লাহর নিকট কাউকে সুপারিশকারী হিসেবে গ্রহণ করবে, তখন তো এভাবে সুপারিশকারীদের মাধ্যমে মহান রবকে সম্মান করাই তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তখন এই সম্মান করাটা শির্ক কীভাবে হবে?

জবাবে বলা হবে: তার সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্য প্রমাণ করে না যে, এটা আল্লাহ তা'আলার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। কারণ, এমন অনেক ব্যক্তি আছে, যারা কোনো কোনো ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করার উদ্দেশ্য করে থাকে, অথচ তারা তাকে সম্মান করার দ্বারা মূলত তাকে অসম্মানই করে থাকে, আর এ জন্যই প্রসিদ্ধ প্রবাদের মধ্যে বলা হয়েছে: 'মূর্খ বন্ধু ক্ষতি করবে কিন্তু জ্ঞানী শত্রু অনিষ্ট করবে না।' কেননা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য সুপারিশকারী ও শরীকদের গ্রহণ করার মাধ্যমে প্রভুত্বের হক নষ্ট করা হয়, ইলাহ'র বড়ত্বকে খাট করে দেখা হয় এবং জগতসমূহের প্রতিপালকের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা হয়। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَتِ الظَّانِينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَابِرَةُ السَّوْءِ ﴾ [الفتح: ৬]

"আর যাতে তিনি মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারী যারা আল্লাহ্ সম্বন্ধে মন্দ ধারণা পোষণ করে তাদেরকে শাস্তি দেন। অমঙ্গল চক্র তাদের ওপরই আপতিত হয়।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ৬] কারণ, তারা তাঁর প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা তাঁর সাথে শির্ক করেছে; তারা যদি তাঁর প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করত, তাহলে তারা তাঁকে সত্যিকার অর্থে একক সত্তা হিসেবে মেনে নিত। আর এজন্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুশরিকদের ব্যাপারে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা তাঁকে যথাযথ মর্যাদা দান করে না। আর কীভাবেই বা ঐ ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলাকে যথাযথ মর্যাদা দান করবে, যে ব্যক্তি অন্যকে তাঁর সমকক্ষ বা সুপারিশকারী মানে?

ঐ ব্যক্তিকে আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাকে সে আল্লাহর পাশাপাশি গ্রহণ করে, তাকে ভালোবাসে, ভয় করে, তার নিকট পাওয়ার প্রত্যাশা করে, তার প্রতি বিনয় ও নম্রতা প্রদর্শন করে, তার ক্রোধ থেকে পলায়ন করে, তার সন্তুষ্টিতে প্রভাবিত হয়, তাকে ডাকে এবং তার উদ্দেশ্যে জবাই ও মানত করে। আর এসবই হলো সমতা বিধান করা, যা মুশরিকগণ আল্লাহ তা'আলা ও তাদের উপাস্যগণের মধ্যে সাব্যস্ত করে থাকে। আর তারা জাহান্নামে অবস্থানকালে জানতে পারবে যে, এসব ছিল বাতিল ও ভ্রষ্টতা; তাই তখন তারা জাহান্নাম থেকে বলবে:

﴿تَاللَّهِ إِن كُنَّا لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ إِذْ نُسَوِّيكُم بِرَبِّ الْعَالَمِينَ ﴾ [الشعراء: ৯৭, ৯৮]

"আল্লাহর শপথ! আমরা তো স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিলাম, যখন আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টিকুলের রব-এর সমকক্ষ গণ্য করতাম।” [সূরা আশ-শু'আরা, আয়াত: ৯৭-৯৮] আর এটা জানা কথা যে, তারা সত্ত্বাগত, গুণগত ও কর্মের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে তাদেরকে সমকক্ষ মনে করে না, আর তারা এটাও বলে না যে, তাদের উপাস্যগণ (ইলাহগণ) আকাশমণ্ডলী ও যমীন সৃষ্টি করেছে কিংবা তারা জীবন ও মৃত্যু দান করেছে; বরং (তারা যে বিষয়ে তাদের উপাস্যদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিয়েছে, তা হচ্ছে) তারা ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে তাদের উপাস্যদেরকে সমকক্ষ মনে করেছে; যেমন তুমি যার ওপর মুসলিম নামধারী শিরকপন্থীদেরকে দেখতে পাও।

আর (আমরা যে বলেছি যে) এটা (আল্লাহ কাছে অন্যকে সুপারিশকারী হিসেবে নির্ধারণ করা) দ্বারা প্রভৃত্বের হক নষ্ট করা হয়, ইলাহের শ্রেষ্ঠত্বকে খাট করা দেখা হয় এবং জগতসমূহের প্রতিপালকের প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করা হয়; এর কারণ হচ্ছে, সুপারিশকারী নির্ধারণ ও সমকক্ষ গ্রহণকারী ব্যক্তি- হয় ধারণা করে থাকে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বিশ্বের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তাঁর সাথে ওযীর (মন্ত্রী) অথবা সাহায্য ও সহায়তাকারীর প্রয়োজন মনে করেন, আর এটা (এ ধরনের ধারণা) হলো ঐ সত্ত্বার জন্য বড় ধরনের খুঁত, যিনি সত্ত্বাগতভাবে তিনি ভিন্ন সকল কিছু থেকে মুখাপেক্ষীহীন এবং তিনি ভিন্ন সকল কিছুই প্রকৃতিগতভাবে তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী।

অথবা সে ধারণা করে থাকে যে, তিনি (আল্লাহ) জানেন না, যতক্ষণ না সুপারিশকারী তাঁকে জানিয়ে দেয় অথবা তিনি (কারও ওপর) দয়া করবেন না, যতক্ষণ না তার প্রতি সুপারিশকারী ব্যক্তি দয়া করা শুরু করবে অথবা তিনি একা একা কোনো কাজের জন্য যথেষ্ট নন অথবা তিনি বান্দার প্রার্থিত বিষয় বান্দাকে প্রদান করেন না, যতক্ষণ না সে (সুপারিশকারী বা সমকক্ষ) তাঁর নিকট সুপারিশ করবে, যেমনিভাবে বান্দাদের মধ্যে এ ধরণের সুপারিশের প্রচলন রয়েছে অথবা তিনি তাঁর বান্দাদের দো'আ কবুল করেন না, যতক্ষণ না তারা সুপারিশকারীর নিকট আবেদন করে যে, সে যেন তাদের প্রয়োজনের কথা তাঁর নিকট উপস্থাপন করে, যেমনটি দুনিয়ার রাজা-বাদশাদের দরবারে হয়ে থাকে। আর বস্তুত এটাই হলো সৃষ্টির (মানুষের) শির্ক সংঘটিত হওয়ার প্রকৃত কারণ।

অথবা তার ধারণা, তিনি (আল্লাহ) শুনেন না, যতক্ষণ না সুপারিশকারী এই বিষয়টি তাঁর নিকট পেশ করে; অথবা তার ধারণা, তাঁর ওপর সুপারিশকারীর অধিকার রয়েছে, ফলে সে অধিকারের জোরে তার ওপর কসম করে সে দাবী আদায় করে নিবে ও সে এই সুপারিশকারীর মাধ্যমে তাঁর নিকট মিনতি করে, যেমনিভাবে মানুষ মহাজন ও রাজা-বাদশাদের নিকট তাদের প্রিয় ব্যক্তির মাধ্যমে আবেদন-নিবেদন পেশ করে। বস্তুতঃ এ ধরনের সব কিছুই প্রভূত্বকে অসম্মান করে ও তার অধিকারকে ক্ষুন্ন করে। ইবনুল কাইয়্যেম অনুরূপ আলোচনা করেছেন। সুতরাং এসব বিষয় ও অন্যান্য বিষয়ের কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, এ ধরনের সব কিছুই শির্ক এবং তা থেকে তিনি নিজেকে পবিত্র বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন,

﴿وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَؤُنَا عِندَ اللَّهِ قُلْ أَتُنَبِّئُونَ اللَّهَ بِمَا لَا يَعْلَمُ فِي السَّمَوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴾ [يونس: ১৮]

“আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর 'ইবাদাত করছে, যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, 'এগুলো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী।' বলুন, 'তোমরা কি আল্লাহকে আসমানসমূহ ও যমীনের এমন কিছুর সংবাদ দিবে, যা তিনি জানেন না? তিনি মহান, পবিত্র' এবং তারা যাকে শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮]

অতঃপর যদি তুমি বল: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তো ঐ ব্যক্তির কর্মকাণ্ডকে শির্ক সাব্যস্ত করেছেন, যে সুপারিশকারীদের উপাসনা করে; পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তাদেরকে শুধু সুপারিশ করার জন্য ডাকে, সে তো তাদের উপাসনা করে না। সুতরাং এটা শির্ক হবে না।

জবাবে বলা হবে: শুধুমাত্র কাউকে সুপারিশকারী হিসেবে গ্রহণ করাই শির্ক আবশ্যক করে, আর শির্কও সুপারিশের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত; যেমনিভাবে শির্কের সাথে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাকে হীনতা ও অপমান অবশ্যম্ভাবী উপাদান, আর হীনতা বা অসম্মানও শির্কের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। শির্ককারী মুশরিক সেটা স্বীকার করুক বা অস্বীকার করুক। এর ওপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, প্রকৃত অর্থে উপরোক্ত প্রশ্নটি সম্পূর্ণভাবে অসার, এ প্রশ্নের কোনো অস্তিত্ব বাইরে নেই, এটা শুধু এমন জিনিস যা মুশরিকরা তাদের স্মৃতিপটে স্থির করেছে। কারণ, দো'আ বা আহ্বান করাই তো 'ইবাদত, বরং তা ইবাদতের মগজ তথা মূল। সুতরাং সে যখন তাদেরকে সুপারিশ করার জন্য ডাকে, তখন সে তাদের উপাসনা করে এবং সে আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে শির্ক করে, সে সেটা স্বীকার করুক বা না করুক।

তিনি (অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবন আবদিল ওহহাব) বলেন: আর আল্লাহ তা'আলার বাণী:

وَأَنذِرْ بِهِ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَن يُحْشَرُوا إِلَى رَبِّهِمْ لَيْسَ لَهُم مِّن دُونِهِ، وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعُ ) [الانعام: ৫১]

"আর আপনি এর দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করুন, যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের রব-এর কাছে সমবেত করা হবে এমন অবস্থায় যে, তিনি ছাড়া তাদের জন্য থাকবে না কোনো অভিভাবক বা সুপারিশকারী।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৫১]

ব্যাখ্যা: الإنذار (ভয় প্রদর্শন) অর্থ: ভয়ানক জায়গা সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া, আর তাঁর বাণী: به -এর ব্যাখায় আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, بالقرآن (আল-কুরআনের মাধ্যমে) আর তাঁর বাণী: ﴿الَّذِينَ يَخَافُونَ أَن يُحْشَرُواْ إِلَى رَبِّهِمْ ﴾ [الانعام: ৫১] “যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের রব-এর কাছে সমবেত করা হবে..." [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৫১] অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! আপনি আল-কুরআনের মাধ্যমে ঐসব লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন করুন, যারা তাদের প্রতিপালকের ভয়ে শঙ্কিত। যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, ভয় করে মন্দ হিসাবকে এবং তারা মুমিন যেমনটি বর্ণিত হয়েছে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা ও সুদ্দী রহ. থেকে। আর ফুদাইল ইবন 'ইয়াদ রহ. থেকে বর্ণিত: তিনি তাঁর প্রত্যেক সৃষ্টিকে সাবধান করেন না, বরং তিনি সাবধান করেন শুধু তাদেরকে, যারা বুদ্ধিমান; তাই তো তিনি বলেন: ﴾وَأَنذِرْ بِهِ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَن يُحْشَرُوْا إِلَى رَبِّهِمْ “আর আপনি এর দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করুন, যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের রব-এর কাছে সমবেত করা হবে” অর্থাৎ তারা হলেন মুমিন, সতর্ক হৃদয়ের অধিকারী। সুতরাং তারা কাঙ্খিত ব্যক্তিবর্গ, যাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়। তারা ঐশ্বর্যশালী দাম্ভিক ও কর্তৃত্বের অধিকারী অহংকারী নয়। কারণ, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের চেহারা-ছবি ও ধন- সম্পদের প্রতি দৃষ্টি দেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কৃতকর্মের প্রতি লক্ষ্য করেন।

আর তাঁর বাণী: ﴿لَيْسَ لَهُم مِّن دُونِهِ، وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعُ ﴾ [الانعام: ৫১] “তিনি ছাড়া তাদের জন্য থাকবে না কোনো অভিভাবক বা সুপারিশকারী।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৫১] এ আয়াত সম্পর্কে যাজ্জাজ বলেন: ليس এর জায়গাটি হাল হওয়ার ভিত্তিতে নসবের অবস্থানে, মনে হয় যেন তিনি বলেন: (হাশরের মাঠে আসবে) এমতাবস্থায় যে, তারা বন্ধু ও সুপারিশকারী থেকে মুক্ত, আর তাতে 'আমিল হলো: يخافون (তারা ভয় করে) আর ইবন কাসীর বলেন: সেদিন তিনি ব্যতীত তাদের জন্য, তিনি যদি তাদেরকে শাস্তি দিতে চান, তাহলে তাঁর শাস্তি থেকে রক্ষাকারী কোনো বন্ধু ও সুপারিশকারী নেই। (তারপর আল্লাহ বলেন) ﴾لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ তাহলে আশা করা যায় তারা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করবে, (ভয় করবে), ফলে তারা এ দুনিয়ার জগতে এমন আমল করবে, যার বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাঁর শাস্তি থেকে তাদেরকে মুক্তি দিবেন।

আমি (শাইখ সুলাইমান ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবদিল ওহহাব) বলি: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুমিনদের জন্য তিনি ব্যতীত অন্য কোনো বন্ধু ও সুপারিশকারী হওয়ার ব্যাপারটি সে অর্থে অস্বীকার করেছেন, যেমনটি মুশরিকদের বিশ্বাস। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত কোনো সুপারিশকারী গ্রহণ করে, সে ব্যক্তি মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তার শাফা'আত নসীব হবে না। তবে আয়াতের মধ্যে আল্লাহর অনুমতিক্রমে কবীরা গুনাহকারী ব্যক্তিদের জন্য শাফা'আতের ব্যাপারে কোনো প্রমাণ নেই, বরং তাঁর অনুমতিক্রমে শাফা'আত সাব্যস্ত হয়েছে অনেক জায়গায়। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿مَا مِن شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ [يونس: ৩]

"তাঁর অনুমতি লাভ না করে সুপারিশ করার কেউ নেই। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব; কাজেই তোমরা তাঁরই 'ইবাদাত কর। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩]

তিনি (অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবন আবদিল ওহহাব) বলেন: আর তাঁর (আল্লাহর) বাণী:

﴿قُل لِلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا ﴾ [الزمر: ৪৪]

"বলুন, 'সকল সুপারিশ আল্লাহরই মালিকানাধীন'।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৪৪]

ব্যাখ্যা: লেখক এভাবেই তা পেশ করেছেন, আর আমরা তার ওপর এবং তার পূর্ববর্তী আয়াতের ওপর আলোচনা করব, যাতে অর্থটি সুস্পষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿أَمِ اتَّخَذُوا مِن دُونِ اللَّهِ شُفَعَاءٌ قُلْ أَوَلَوْ كَانُوا لَا يَمْلِكُونَ شَيْئًا وَلَا يَعْقِلُونَ * قُل لِلَّهِ الشَّفَعَةُ جَمِيعًا لَهُ مُلْكُ السَّمَواتِ وَالْأَرْضِ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ﴾ [الزمر: ৪৩, ৪৪]

“তবে কি তারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে সুপারিশকারী ধরেছে? বলুন, 'তারা কোনো কিছুর মালিক না হলেও এবং তারা না বুঝলেও?' বলুন, 'সকল সুপারিশ আল্লাহরই মালিকানাধীন, আসমানসমূহ ও যমীনের মালিকানা তাঁরই, তারপর তাঁরই কাছে তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে।” [সূরা যুমার, আয়াত: ৪৩-৪৪]

এখানে আল্লাহর বাণী: ﴿أَمِ اتَّخَذُوا﴾ এর হামযা (أ) টি অস্বীকার করার অর্থে; অর্থাৎ বরং মুশরিকগণ আল্লাহ ব্যতীত কিছু সুপারিশকারী নির্ধারণ করে নিয়েছে। অর্থাৎ তারা (সুপারিশকারীগণ) কি তাদের জন্য তাদের ধারণা অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলার নিকট সুপারিশ করবে? যেমনটি তিনি বলেছেন:

﴿وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنফَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلَاءِ شُفَعَؤُنَا عِندَ الله ﴾ [يونس: ১৮]

"আর তারা আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর 'ইবাদাত করছে, যা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। আর তারা বলে, 'এগুলো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী'।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮] তিনি আর বলেন:

وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَذِبٌ كَفَّارٌ ﴾ [الزمر: ৩]

"আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ্ সান্নিধ্যে এনে দিবে।' তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দিবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না।” [সূরা যুমার, আয়াত: ৩] সুতরাং এই (আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সুপারিশকারী সাব্যস্ত করার) কারণে তিনি তাদেরকে মিথ্যাবাদী ও প্রচণ্ড কাফির বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

فَلَوْলَا نَصَرَهُمُ الَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِ اللَّهِ قُرْبَانًا وَالِهَةٌ بَلْ ضَلُّوا عَنْهُمْ وَذَلِكَ إِفْكُهُمْ وَمَا كَانُوا يَفْتَرُونَ ﴾ [الاحقاف: ২৮]

"অতঃপর তারা আল্লাহ সান্নিধ্য লাভের জন্য আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছিল তারা তাদেরকে সাহায্য করল না কেন? বরং তাদের ইলাহগুলো তাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেল। আর এটা ছিল তাদের মিথ্যাচার; এবং যা তারা অলীক উদ্ভাবন করছিল।” [সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ২৮]

সুতরাং এটাই হলো মুশরিকগণ যাদের ইবাদত বা উপাসনা করে, তাদের নিকট থেকে তাদের একমাত্র চাওয়া-পাওয়া, আর তা হল, আল্লাহ তা'আলার নিকট তাদের জন্য সুপারিশ করা।

আর তাঁর বাণী: ﴿مِن دُونِ اللَّهِ (আল্লাহ ছাড়া) অর্থাৎ আল্লাহর অনুমতি ও নির্দেশ ছাড়া; বাস্তব অবস্থা হল, তাঁর নিকট তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না, আর যার জন্য সুপারিশ করা হবে, তাঁকেও তাঁর পছন্দসই ব্যক্তি হওয়া লাগবে, আর এখানে দু'টি শর্তই নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ছাড়া অন্যদেরকে সুপারিশকারী গ্রহণ করা এবং তাদের ডাকাডাকি করাকে তাঁর অনুমতি ও সন্তুষ্টির উপলক্ষ্য বানান নি, বরং এটা হলো তাঁর অনুমতি না পাওয়া ও অসন্তুষ্টির কারণ।

তাঁর বাণী: ﴾قُلْ أَوَلَوْ كَانُوا لَا يَمْلِكُونَ شَيْئًا وَلَا يَعْقِلُونَ﴿ “বলুন, 'তারা কোনো কিছুর মালিক না হলেও এবং তারা না বুঝলেও?” [সূরা যুমার, আয়াত: ৪৩] অর্থাৎ এই ধরনের (হীন) গুণাগুণবিশিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কি তারা সুপারিশ করতে পারবে? যেমন তোমরা তাদেরকে দেখতে পাচ্ছ নিষ্প্রাণ, শক্তি-সামর্থ্যহীন ও অবুঝ অথবা মৃত, এমনকি তারা সুপারিশের মালিকও নয়, যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

﴾قُل لِلَّهِ الشَّفَعَةُ جَمِيعًا﴿ [الزمر: ৪৪] “বলুন, 'সকল সুপারিশ আল্লাহরই মালিকানাধীন'।” [সূরা যুমার, আয়াত: ৪৪] অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে তিনিই সে সুপারিশের মালিক। সুতরাং তোমরা যাদেরকে ডাক, তা থেকে তারা কোনো কিছুরই মালিক নয়। বায়যাবী রহ. বলেন, এটা সম্ভবত: তাদের একটি অভিযোগের উত্তর, তারা অভিযোগ করে বলতে পারে যে, সুপারিশকারীরা (যাদেরকে তার সুপারিশ করার মালিক মনে করছে) তারা তো আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা, আর এগুলো সেসব (নৈকট্যপ্রাপ্ত) বান্দাদেরই প্রতিকৃতি সুতরাং তারা সুপারিশের মালিক হতে পারে, তখন তার উত্তরেই আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, বলুন, সকল সুপারিশ আল্লাহরই মালিকানাধীন। তার মানে- তিনি শাফা'আতের একচ্ছত্র মালিক, তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউই সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখে না এবং তিনি ব্যতীত কেউই এর ব্যাপারে স্বনির্ভর হতে পারে না।

আর তাঁর বাণী: ﴿لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ﴾ [الحديد: ২] “আসমানসমূহ ও যমীনের সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁরই।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২]

এখানেও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সুপারিশকারী গ্রহণের অসারতার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। কারণ, তিনি হলেন গোটা সাম্রাজ্য ও কর্তৃত্বের মালিক; তাঁর কোনো বিষয়ে কোনো ব্যক্তি তাঁর অনুমতি ও সম্মতি ব্যতীত কথা বলার অধিকার রাখে না। সুতরাং শাফা'আতের মালিকানার বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। অতএব, তিনিই যখন শাফা'আতের মালিক, তখন তিনি ব্যতীত অন্য কাউকে, সে যে-ই হোক না কেন, শাফা'আতের অধিকারী (মালিক) হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি এমনিতেই বাতিল হয়ে যায়।

আর তাঁর বাণী: ﴿ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ﴾ “তারপর তাঁরই কাছে তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে”। অর্থাৎ তোমরা জেনে রাখ যে, তারা সুপারিশ করবে না, আর তাদের পূজা করার ক্ষেত্রে তোমাদের সকল চেষ্টা প্রচেষ্টা বিফল হবে, বরং তারা তোমাদের জন্য হিতে বিপরীত হবে এবং তোমাদের পূজা-অর্চনা থেকে তারা দায়মুক্ত হয়ে পড়বে, যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

﴿وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشْرَكُوا مَكَانَكُمْ أَنتُمْ وَشُرَكَاؤُكُمْ فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْ وَقَالَ شُرَكَاؤُهُم مَّا كُنتُمْ إِيَّانَا تَعْبُدُونَ * فَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ إِن كُنَّا عَنْ عِبَادَتِكُمْ لَغَافِلِينَ﴾ [يونس: ২৮, ২৯]

"আর যেদিন আমরা তাদের সবাইকে একত্র করে যারা মুশরিক তাদেরকে বলব, 'তোমরা এবং তোমরা যাদেরকে শরীক করেছিলে তারা নিজ নিজ স্থানে অবস্থান কর।' অতঃপর আমরা তাদেরকে পরস্পর থেকে পৃথক করে দেব এবং তারা যাদেরকে শরীক করেছিল তারা বলবে, 'তোমরা তো আমাদের 'ইবাদাত করতে না।' সুতরাং আল্লাহই আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট যে, তোমরা আমাদের 'ইবাদাত করতে এ বিষয়ে তো আমরা গাফিল ছিলাম।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৮-২৯]

তিনি (মুহাম্মাদ ইবন আবদিল ওহহাব) বলেন, আর তাঁর বাণী: ﴿مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ ﴾ [البقرة: ২৫৫] “কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে?” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫]

ব্যাখ্যা: এই আয়াতের মধ্যে ঐসব মুশরিকদের দাবির জবাব রয়েছে, যারা আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে ফিরিশতা ও নবীগণের মধ্য থেকে এবং নেক বান্দা ও অন্যান্যদের আকৃতিতে রূপ দেওয়া মূর্তিসমূহ থেকে সুপারিশকারী গ্রহণ করে এবং ধারণা করে যে, তারা তাঁর নিকট তাঁর অনুমতি ছাড়াই সুপারিশ করবে। ফলে এই আয়াতটি তাদের এমন বিশ্বাসের প্রতিবাদ করেছে এবং তাঁর ক্ষমতার মহত্ব ও বড়ত্ব বর্ণনা করেছে, আরও বর্ণনা করছে যে, কিয়ামতের দিন কোনো ব্যক্তির কথা বলার ক্ষমতা হবে না যতক্ষণ না তিনি কথা বলার অনুমতি দিবেন, যেমন তাঁর বাণী: ﴿لَّا يَتَكَلَّمُونَ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَقَالَ صَوَابًا ﴾ [النبا: ৩৮] “সেদিন কেউ কথা বলবে না, তবে 'রহমান' যাকে অনুমতি দিবেন সে ছাড়া এবং সে সঠিক কথা বলবে।” [সূরা আল-নাবা, আয়াত: ৩৮] তিনি আরও বলেন:

﴿يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ ﴾ [হুদ: ১০৫]

“যখন সেদিন আসবে, তখন আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ কথা বলতে পারবে না।” [সূরা হুদ, আয়াত: ১০৫] ইবন জারির রহ. এই আয়াতের ব্যাপারে বলেন: এ আয়াতটি তখনি নাযিল হয়েছে যখন কাফিরগণ বলল: আমরা এসব দেব-মূর্তিদের পূজা-অর্চনা করি শুধু এই জন্য যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিবে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿لَّهُ مَا فِي السَّমَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا ﴾ [আন-নিসা: ১৭১]

“আসমানসমূহে যা কিছু আছে ও যমীনে যা কিছু আছে সব আল্লাহরই, আর কর্মবিধায়করূপে আল্লাহই যথেষ্ট।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৭১] আর এই আয়াতের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা যাকে ইচ্ছা শাফা'আত (সুপারিশ) করার ব্যাপারে অনুমতি দিবেন, আর তাঁরা হলেন নবী, আলেম প্রমূখ। আর অনুমতিটি কখনও কখনও নির্দেশে রূপান্তরিত হবে, যেমনটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেলায় বর্ণিত হয়েছে, যখন তাঁকে বলা হবে: আপনি সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। একাধিক মুফাসসির অনুরূপ বক্তব্য পেশ করেছেন।

তিনি (মুহাম্মাদ ইবন আবদিল ওহহাব) বলেন: আর তাঁর (আল্লাহর) বাণী:

﴿وَكَم مِّن مَّلَكِ فِي السَّمَوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَى ﴾ [আন-নাজম: ২৬]

“আর আসমানসমূহে বহু ফিরিশতা রয়েছে, তাদের সুপারিশ কিছুমাত্র ফলপ্রসূ হবে না, তবে আল্লাহর অনুমতির পর। যার জন্য তিনি ইচ্ছে করেন ও যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ২৬]

ব্যাখ্যা: আবূ হাইয়্যান রহ. বলেন: আয়াতে উল্লিখিত كم টি খবরিয়া এবং তার অর্থ অধিক, আর তা মুবতাদা হওয়ার কারণে রফা' এর অবস্থানে এবং তার খবর হলো: لَا تُغْنِي। আর الغناء শব্দের অর্থ, কল্যাণ বয়ে আনা বা অকল্যাণ দূর করা, যেখানে যেটা প্রয়োজন। আর ملك শব্দগতভাবে একবচন এবং অর্থগতভাবে বহুবচন। আর নৈকট্যবান ফিরিশতাগণের সুপারিশ যখন কোনো উপকার করবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তা'আলা সন্তুষ্টি চিত্তে কারও জন্য সুপারিশ করার অনুমতি ও সম্মতি দিবেন, আর আল্লাহর সন্তুষ্টি তখনই হবে যখন তাকে সুপারিশকারী হিসেবে যোগ্য মনে করবেন। সুতরাং দেব-মূর্তিসমূহ কীভাবে তাদের পূজারী'র জন্য সুপারিশ করবে? আমি বলি: এই আয়াতের মধ্যে শাফা'আত লাভ অথবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি ফিরিশতা ও সৎলোকদের উপাসনা করে, তার দাবিটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে রদ করা হয়েছে। কারণ, তারা যখন শুরুতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুমতি ব্যতীত সুপারিশ করতে পারবে না। সুতরাং কোনো অর্থে তাদেরকে ডাকা হবে এবং তাদের উপাসনা করা হবে? তাছাড়া আল্লাহ তা'আলাও এমন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে (শাফা'আতের জন্য) অনুমতি দিবেন না, যার কথা ও কাজ তিনি পছন্দ করবেন। আর তিনি হবেন ঐ ব্যক্তি যিনি তাওহীদ তথা একত্ববাদী, মুশরিক নন; যেমনটি তিনি বলেছেন:

يَوْمَئِذٍ لَّا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَرَضِيَ لَهُ قَوْلًا ﴾ [طه: ১০৯]

দয়াময় যাকে অনুমতি দিবেন ও যার কথায় তিনি সন্তুষ্ট হবেন, সে ছাড়া কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১০৯] আর আল্লাহ তা'আলা তাওহীদ ব্যতীত অন্য কোনো মতে সন্তুষ্ট হবেন না। যেমন, তিনি বলেন,

وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ ﴿ آل عمران: ৮৫

"আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫] আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ.

"কিয়ামতের দিন আমার শাফা'আতের মাধ্যমে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষ হবে ঐ ব্যক্তি, যে একান্ত আন্তরিকতার সাথে বলে: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ (আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ক ইলাহ নেই)"। লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি যে, আমার শাফা'আতের মাধ্যমে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষ হবে ঐ ব্যক্তি, যে আমাকে ডাকে।

আর মুশরিক ব্যক্তি যদি বলে, আমি জানি যে, তারা তাঁর অনুমতি ব্যতীত সুপারিশ করবে না, কিন্তু আমি তাদেরকে ডাকি এই জন্য যে, যাতে আল্লাহ আমার জন্য সুপারিশ করার ক্ষেত্রে তাদেরকে অনুমতি প্রদান করেন; তাহলে বলা হবে: আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে শির্ক করা ও তিনি ভিন্ন অন্য কাউকে আহ্বান করাকে তাঁর অনুমতি ও সম্মতির কারণ বা উপলক্ষ নির্ণয় করেন নি, বরং এটা তাঁর ক্রোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, আর এ জন্যই তিনি অপর এক আয়াতে তিনি ভিন্ন অপর কাউকে ডাকাডাকি করতে নিষেধ করেছেন। যেমন, তিনি বলেন,

وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ ﴿يونس: ১০৬﴾

"আর আপনি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকবেন না, যা আপনার উপকারও করে না, অপকারও করে না। কারণ, এটা করলে তখন আপনি অবশ্যই যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৬]

সুতরাং পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ফিরিশতা, নবী ও তাঁরা ভিন্ন অন্যদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদেরকে ডাকাডাকি (পূজা) করা শির্ক, যেমনিভাবে প্রথম কালের মুশরিকগণ তাদেরকে আহ্বান করত, যাতে তারা তাদের জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করতে পারে, আর আল্লাহ তা'আলা এই পদ্ধতির প্রতিবাদ করেছেন এবং তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তা পছন্দ করেন না এবং তিনি তা নির্দেশও করেন না, যেমনটি আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:

وَلَا يَأْمُرَكُمْ أَن تَتَّخِذُوا الْمَلَائِكَةَ وَالنَّبِيِّينَ أَرْبَابًا أَيَأْمُرُকُم بِالْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنتُم مُّسْلِمُونَ ﴿آل عمران: ৮০﴾

“অনুরূপভাবে ফিরিশতাগণ ও নবীগণকে রবরূপে গ্রহণ করতে তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দেন না। তোমাদের মুসলিম হওয়ার পর তিনি কি তোমাদেরকে কুফুরীর নির্দেশ দিবেন?” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮০] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন,

إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتَّبِعُواْ مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا وَرَأَوُا الْعَذَابَ ﴿يونس, البقرة: ১৬৬﴾

"যখন যাদের অনুসরণ করা হয়েছে তারা, যারা অনুসরণ করেছে তাদের থেকে নিজেদের মুক্ত করে নেবে এবং তারা শাস্তি দেখতে পাবে।” [সূরা ইউনুস/আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৬৬] ইবন কাসীর রহ. বলেন, ফিরিশতাগণ তাদের থেকে নিজেদেরকে বিমুক্ত ঘোষণা করে নেবে, যারা ধারণা করত যে, তারা দুনিয়াতে তাদের উপাসনা করেছে। অতঃপর ফিরিশতাগণ বলবে: আমরা তাদের থেকে বিমুক্ত হয়ে আপনার নিকট আশ্রয় চাই, তারা আমাদের ইবাদত করতো না। আর আল্লাহ তা'আলা বলেন,

وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ وَأَنتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُتِيَ إِلَهَيْنِ مِن دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقِّ ﴾ [المائدة: ১১৬]

"আরও স্মরণ করুন, আল্লাহ যখন বলবেন, 'হে মারইয়াম তনয় 'ঈসা! আপনি কি লোকদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ কর?' তিনি বলবেন, 'আপনিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই, তা বলা আমার পক্ষে শোভন নয়।” [সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ১১৬] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন,

قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِهِ، فَلَا يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِ عَنكُمْ وَلَا تَحْوِيلًا [الاسراء : ৫৬]

“বলুন, 'তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে ইলাহ মনে কর, তাদেরকে আহ্বান কর; তাহলে দেখতে পাবে যে, তোমাদের দুঃখ-দৈন্য দূর করার অথবা পরিবর্তন করার শক্তি তাদের নেই।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৫৬] আর সা'ঈদ ইবন মানসুর, ইমাম বুখারী, নাসায়ী ও ইবন জারীর রহ. আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহ থেকে আয়াত প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন: মানুষের মধ্য থেকে এক দল জিন্নের মধ্য থেকে এক দলের 'ইবাদত করত, অতঃপর জিন্নের মধ্য থেকে এক দল ইসলাম গ্রহণ করল, অথচ মানুষেরা সেসব জিন্নের উপাসনায় মগ্ন থাকল তখন আল্লাহ নাযিল করলেন:

أُوْلَبِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ ﴾ [الإসراء: ৫৭]

"ওরা যাদেরকে আহ্বান করে, তারাই তো তাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৫৭] এখানে يَدْعُونَ এবং يَبْتَغُونَ দু'টি শব্দই ي দ্বারা পঠিত হয়েছে। আর ইবন জারীর ও ইবন আবি হাতেম আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে আয়াত প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন: শির্কপন্থীগণ ফিরিশতা, মাসীহ ও ওযায়ের আলাইহিস সালামের উপাসনা করত। উপরোক্ত গ্রন্থদ্বয়ে আল্লাহর এই বাণীর

فَلَا يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِ عَنكُمْ ﴾ [الإসراء: ৫৬]

"তাহলে দেখতে পাবে যে, তোমাদের দুঃখ-দৈন্য দূর করার অথবা পরিবর্তন করার শক্তি তাদের নেই।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৫৬] এই বাণীর ব্যাপারে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে অপর এক বর্ণনায় এসেছে যে, এখানে যাদের ক্ষমতা নেই বলা হয়েছে, তারা হচ্ছেন, 'ঈসা, তাঁর মাতা ও 'ওযায়ের।

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: ﴿إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنتُمْ لَهَا وَارِدُونَ لَوْ كَانَ هَؤُلَاءِ عَالِهَةً مَّا وَرَدُوهَا وَكُلٌّ فِيهَا خَالِدُونَ * لَهُمْ فِيهَا زَفِيرٌ وَهُمْ فِيهَا لَا يَسْمَعُونَ إِنَّ الَّذِينَ سَبَقَتْ لَهُم مِّنَّا الْحُسْنَى أُوْلَبِكَ عَنْهَا مُبْعَدُونَ﴾ [الانبياء: ৯৮, ১০১]

"নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের 'ইবাদাত কর সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন; তোমরা সবাই তাতে প্রবেশ করবে। যদি তারা ইলাহ হত, তবে তারা জাহান্নামে প্রবেশ করত না, আর তাদের সবাই তাতে স্থায়ী হবে, সেখানে থাকবে তাদের নাভিশ্বাসের শব্দ এবং সেখানে তারা কিছুই শুনতে পাবে না। নিশ্চয় যাদের জন্য আমাদের কাছ থেকে পূর্ব থেকেই কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে, তাদেরকে তা থেকে দূরে রাখা হবে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৯৮-১০১]

ইবন ইসহাক রহ. এই আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় ইবনুয যাব'য়ারী ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যকার বিতর্কের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, আর তখন-ই আল্লাহ নাযিল করেন,

إِنَّ الَّذِينَ سَبَقَتْ لَهُم مِّنَّا الْحُسْنَى أُوْلَبِكَ عَنْهَا مُبْعَدُونَ ﴾ [الانبياء: ১০১]

“নিশ্চয় যাদের জন্য আমাদের কাছ থেকে পূর্ব থেকেই কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে, তাদেরকে তা থেকে দূরে রাখা হবে।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০১] অর্থাৎ 'ঈসা ও 'ওযায়ের আলাইহিস সালাম এবং ঐসব পণ্ডিত ও দুনিয়া বিমুখদের মধ্য থেকে যাদের উপাসনা করা হয়েছে, যারা আল্লাহর বিধানের ওপর জীবন অতিবাহিত করেছেন; অথচ পথভ্রষ্টরা আল্লাহকে ছাড়া তাদেরকেই রব হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে।

আর আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ وَلَا نَبِي إِلَّا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أُمْنِيَّتِهِ، فَيَنسَخُ اللَّهُ مَا يُلْقِي الشَّيْطَانُ ثُمَّ يُحْكِمُ اللَّهُ عَايَتِهِ، وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ﴾ [الحج: ৫২]

“আর আমরা আপনার পূর্বে যে রাসূল কিংবা নবী প্রেরণ করেছি, তাদের কেউ যখনই (ওহীর কিছু) তিলাওয়াত করেছে, তখনই শয়তান তাদের তিলাওয়াতে (কিছু) নিক্ষেপ করেছে, কিন্তু শয়তান যা নিক্ষেপ করে, আল্লাহ তা বিদূরিত করেন। তারপর আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৫২] ইবন আবি হাতেম ইমাম যুহুরী রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: সূরা আন-নাজম নাযিল (শুরু) হয়েছে, আর মুশরিকগণ বলাবলি করত যে, এই লোকটি যদি আমাদের ইলাহসমূহের ব্যাপারে ভালো আলোচনা করত, তাহলে আমরা তাকে ও তার সাথীদেরকে স্বীকৃতি দিতাম; কিন্তু ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি তার দীনের বিরোধিতা করে সে তার সমালোচনা করে না, যেভাবে সে গাল-মন্দের মাধ্যমে আমাদের উপাস্যদের সমালোচনা করে, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ তাদের পক্ষ থেকে যে কষ্ট ও মিথ্যারোপের শিকার হচ্ছিলেন, তাঁর ওপর তা খুব কষ্টকর মনে হচ্ছিল এবং তাদের পথভ্রষ্টতা তাঁকে চিন্তিত করে তুলছিল; তখন তিনি তাদের হিদায়াতের প্রত্যাশা করতেন; অতঃপর যখন আল্লাহ তা'আলা সূরা আন-নাজম নাযিল করলেন, তখন তিনি বললেন:

﴿أَفَرَءَيْتُمُ اللَّتَ وَالْعُزَّى وَمَنَوْةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى ﴾ [النجم: ১৯, ২০]

“অতএব, তোমরা আমাকে জানাও 'লাত' ও 'উয্যা' সম্পর্কে এবং তৃতীয় আরেকটি 'মানাত' সম্পর্কে?” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ১৯-২০] এই তাগুতদের আলোচনার সময় শয়তান এগুলো উচ্চারণের পর তার নিকট থেকে কতিপয় কথা ছেড়ে দিল, সে বলল:
تلك الغرانيق العلى وأن شفاعتهن لترتجى
(যার অর্থ, 'এগুলো হচ্ছে উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি এবং তাদের সুপারিশ অবশ্যই আশা করা যাবে') বস্তুত এটা ছিল শয়তানের অন্তমিলযুক্ত কথা ও তার ফিতনা; অতঃপর এই বাণী দু'টি মক্কার মুশরিকদের মনে প্রভাব বিস্তার করল এবং তার কারণে তাদের ভাষাসমূহ সংযত হতে লাগল, আর তারা এর দ্বারা পরস্পরকে সুসংবাদ দিল এবং তারা বলল: নিশ্চয় মুহাম্মাদ তার প্রথম তথা পূর্বের ধর্মে এবং তার সম্প্রদায়ের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করেছে।

অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তিলাওয়াত করতে করতে) সূরা আন-নাজমের শেষ প্রান্তে পৌঁছলেন, তখন তিনি সাজদাহ করলেন এবং উপস্থিত সকল মুসলিম ও মুশরিকরাও সাজদাহ করল। তারপর এ কথা জনগণের মাঝে ছড়িয়ে গেল এবং শয়তান তা প্রকাশ করে দিল, এমনকি এই সংবাদ হাবশা পর্যন্ত পৌঁছে গেল, তখন আল্লাহ তা'আলা নাযিল করলেন: ﴿وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ وَلَا نَبِي إِلَّا إِذَا تَمَنَّى أَلْقَى الشَّيْطَانُ فِي أُمْنِيَّتِهِ ﴾ [الحج: ৫২]

“আর আমরা আপনার পূর্বে যে রাসূল কিংবা নবী প্রেরণ করেছি, তাদের কেউ যখনই (ওহীর কিছু) তিলাওয়াত করেছে, তখনই শয়তান তাদের তিলাওয়াতে (কিছু) নিক্ষেপ করেছে।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৫২]

অতঃপর যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁর সিদ্ধান্ত ও শয়তানের অপপ্রচার থেকে তাঁর মুক্ত থাকার বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করলেন, তখন মুশরিকগণ মুসলিমদের জন্য তাদের শত্রুতা ও ভ্রষ্টতাকে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে আসল এবং সে ব্যাপারে তারা কঠোর হয়ে উঠল। আর এটা একটা প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ ঘটনা, যা আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে কয়েকটি সনদে বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্য থেকে কিছু কিছু সনদ বিশুদ্ধ। আর তাবে'য়ীগণের একদল থেকেও বিশুদ্ধ সনদে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে।

মূল উদ্দেশ্য হল, এ ঘটনাতে উল্লিখিত, 'এগুলো হচ্ছে উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি এবং তাদের সুপারিশ অবশ্যই আশা করা যাবে' এ কথাটুকু। কারণ, এক মতানুসারে الغرانيق তথা উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি হলো ফিরিশতাগণ। আর অপর মতে, الغرانيق তথা উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি হলো 'দেব-মূর্তি সকল'। তবে উভয় মতের মধ্যে তেমন কোনো বিরোধ নেই। কারণ, তাদের উপাসনার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো দেবদেবতা, ফিরিশতা ও সৎ ব্যক্তিগণ। সুতরাং যখন মুশরিকগণ এমন কথা শ্রবণ করল, যা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করার আশায় ফিরিশতাদের ইবাদত করাটাকে বৈধ বলে দাবি করে, তখন তারা ধারণা করেছে যে, এটা তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামই বলেছেন। ফলে তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেল, তাঁর সাথে তারাও সাজদাহ করল এবং তারা অভিমত প্রকাশ করল যে, সুপারিশের জন্য ফিরিশতা ও দেব-দেবীর প্রার্থনা করার ব্যাপারে তিনি তাদের ধর্মের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেছেন।

সুতরাং বুঝা গেল যে, তাদের এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে বিরোধের অন্যতম বিষয় ছিল 'শাফা'আত'। কারণ, তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী তারা বলে, আমরা ফিরিশতা ও তাদের আকৃতিতে তৈরি করা কল্পিত দেব-দেবীগণের নিকট চাই যে, তারা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করবে; অপরদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট আগমন করেছেন এ ধরনের চিন্তাধারাকে বাতিল করার জন্য; তা থেকে বিরত রাখতে; যে ব্যক্তি এ মতে বিশ্বাসী হবে, তাকে কাফির ও পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করতে। শাফা'আত প্রশ্নে তিনি তাদের জন্য কোনো ফিরিশতা, নবী ও দেব-দেবীর অধিকার আছে বলার সুযোগ দেন নি; বরং তিনি তাদের কাছে আল্লাহ তা'আলার এই বাণী নিয়ে এসেছেন, যাতে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿قُل لِّلَّهِ الشَّفَعَةُ جَمِيعًا ﴾ [الزمر: ৪৪]
বলুন, 'সকল সুপারিশ আল্লাহরই মালিকানাধীন'।” [সূরা যুমার, আয়াত: ৪৪] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

﴿وَأَتَّخِذُ مِن دُونِهِ عَالِهَةً إِن يُرِدْنِ الرَّحْمَنُ بِضُرٍ لَّا تُغْنِ عَنِّي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا وَلَا يُنقِذُونِ إِنِّي إِذًا لَّفِي ضَلَالٍ মُّبِينٍ ﴾ [يس: ২৩, ২৪]

"আমি কি তাঁর পরিবর্তে অন্য ইলাহ্ গ্রহণ করব? রহমান আমার কোনো ক্ষতি করতে চাইলে তাদের সুপারিশ আমার কোনো কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে উদ্ধার করতেও পারবে না। এরূপ করলে আমি অবশ্যই স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে পড়ব।” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ২৩-২৪]

উদ্দেশ্য হচ্ছে, (একথা সাব্যস্ত করা যে) প্রথম পর্যায়ের মুশরিকগণ ফিরিশতা ও সৎ ব্যক্তিদেরকে আহ্বান করত, যাতে তারা তাদের জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করতে পারে, তার প্রমাণ আল-কুরআনের বক্তব্যসমূহ এবং তাফসীর ও সীরাত গ্রন্থসমূহ, আর আসার তথা হাদীসের কিতাবসমূহে ভরপুর, আর ন্যায়নীতিবান বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তা'আলার এ বাণীই যথেষ্ট, যাতে তিনি বলেন:

﴿ وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ يَقُولُ لِلْمَلَائِكَةِ أَهَؤُلَاءِ إِيَّاكُمْ كَانُوا يَعْبُدُونَ قَالُوا سُبْحَانَكَ أَنتَ وَلِيُّنَا مِن دُونِهِمْ بَلْ كَانُوا يَعْبُدُونَ الْجِنَّ أَكْثَرُهُم بِهِم مُّؤْمِنُونَ ﴾ [سبا: ৪০, ৪১]

"আর স্মরণ করুন, যেদিন তিনি তাদের সকলকে একত্র করবেন, তারপর ফিরিশতাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন, 'এরা কি তোমাদেরই ইবাদাত করত? ফিরিশতারা বলবে, 'আপনি পবিত্র, মহান! আপনিই আমাদের অভিভাবক, তারা নয়; বরং তারা তো ইবাদাত করত জিন্নদের। তাদের অধিকাংশই জিন্নদের প্রতি ঈমান রাখত।” [সূরা সাবা, আয়াত: ৪০-৪১]

তিনি (মুহাম্মাদ ইবন আবদিল ওহ্হাব রহ.) বলেন: আর মহান আল্লহার বাণী:

﴿ قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَواتِ وَلَا فِي الأَرْضِ ) [سبا: ২২]

বলুন, 'তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ্ মনে করতে তাদেরকে ডাক। তারা আসমানসমূহে অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়, যমীনেও নয়।” [সূরা সাবা, আয়াত: ২২]

ব্যাখ্যা: এ আয়াতটির ব্যাপারে আলেমদের কেউ কেউ বলেন: যে ব্যক্তি এই আয়াতটি অনুধাবন করেছে, তা সেই ব্যক্তির অন্তর থেকে শির্ক নামক বৃক্ষের শিকড়সমূহ কেটে যাবে। ইবনুল কাইয়্যেম রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: আল্লাহ তা'আলা শির্কের সকল উপায় বা উপলক্ষ্যসমূহ মুশরিকরা যে গুলোর সাথে তারা সম্পৃক্ত থাকে; সে সবই মূলোৎপাটন করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে, সে জানতে ও বুঝতে পারবে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে অভিভাবক বা বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে ব্যক্তির দৃষ্টান্ত হলো মাকড়সার মত, যে ঘর বানায়, আর ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো দুর্বলতম। কারণ, মুশরিক ব্যক্তি তো তাকেই উপাস্যরূপে গ্রহণ করে, যার দ্বারা সে কোনো প্রকার উপকার হাসিল করতে পারে, আর কারও কাছ থেকে তখনই উপকার হাসিল করতে পারে, যখন সে ব্যক্তির মধ্যে এ চারটি বৈশিষ্ট্যের মধ্য থেকে কোনো একটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকবে: হয় সে তার উপাসক তার নিকট যা চায়, তার মালিক হবে, আর যদি সে সেটার মালিক না হয়, তাহলে সে মূল মালিকের সাথে শরীক বা অংশিদার হবে, আর যদি সে তাতে শরীকও না হয়, তাহলে সে তার সহায়ক ও সাহায্যকারী হবে, আর সে যদি তার সহায়ক ও সাহায্যকারীও না হয়, তাহলে সে তার নিকট সুপারিশকারী হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এই চারটি বৈশিষ্ট্যকেই উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে সবগুলোকে অন্য কারও কাছে থাকার কথা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন।

তিনি (ইবনুল কাইয়্যেম রহ.) বলেন: সুতরাং তিনিই (আল্লাহ তা'আলাই) সুপারিশকারীকে অনুমতি দিবেন, আর তিনি যদি তাকে অনুমতি না দেন, তাহলে সে তাঁর সম্মুখে শাফা'আতের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না; যেমনটি ঘটে থাকে সৃষ্টির বেলায়। কারণ, সৃষ্টির ক্ষেত্রে সুপারিশকারীর নিকট সুপারিশকৃত ব্যক্তির প্রয়োজন থাকে। সুতরাং যার নিকট সুপারিশ করা হচ্ছে সে ব্যক্তি, সুপারিশকারীর মুখাপেক্ষী, সে তার সহযোগিতার প্রয়োজন অনুভব করে। ফলে সে তার সুপারিশ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়; যদিও সে ব্যক্তি সুপারিশের অনুমতি তাকে না দেয়।

আল্লাহর ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, তিনি ব্যতীত সকলেই মৌলিকভাবে তাঁর মুখাপেক্ষী, আর তিনি মৌলিকভাবে সকল কিছু থেকে মুখাপেক্ষীহীন ও স্বনির্ভর। সুতরাং কীভাবে তাঁর অনুমতি ব্যতীত কোনো ব্যক্তি তাঁর নিকট সুপারিশ করবে? সুতরাং এই আয়াতটি আলো, দলীল, নাজাত, নির্ভেজাল তাওহীদ হিসেবে এবং শির্ক ও তার শিকড়সমূহের মূলোৎপাটনের মাধ্যম হিসেবে ঐ ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট, যে তা অনুধাবন করে।

যথা উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু 'আনহু বলেছেন: 'ইসলামের রশি সমূহ একটা একটা করে নষ্ট হয়ে যাবে, যখন কোনো ব্যক্তি জাহেলিয়াত সম্পর্কে না জেনেই ইসলামের মধ্যে বেড়ে উঠে।' আর এটা এ জন্য যে, যখন সে জানবে না জাহেলিয়াত ও শির্ক সম্পর্কে এবং জানবে না কুরআন কোনো বিষয়কে সমর্থন করে ও কোনোটাকে নিন্দা করে, তখন সে তাতে জড়িয়ে যাবে, তাকে স্বীকৃতি দিবে, তার দিকে অন্যকে আহ্বান করবে, তাকে সঠিক এবং উত্তম বলে মনে করবে। আর যে ব্যক্তির দূরদৃষ্টি ও প্রাণবন্ত হৃদয় আছে, সে এটাকে স্বচক্ষে দেখতে পাবে।

আর ঐসব পূর্ববর্তী মুশরিকদের বক্তব্য নকল করে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَذِبٌ كَفَّارٌ ) [الزمر: ৩]

“আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ্ সান্নিধ্যে এনে দিবে।' তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দিবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না।” [সূরা যুমার, আয়াত: ৩]

আর যে শাফা'আতকে আল্লাহ তা'আলা অনুমোদন দেন নি, তা হলো শির্ক মিশ্রিত শাফা'আত, যা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সুপারিশকারীদেরকে গ্রহণকারী মুশরিকদের অন্তরে বদ্ধমূল, ফলে তাদেরকে তাদের সুপারিশ সংক্রান্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের বিপরীত প্রতিফল দেওয়া হবে এবং তাওহীদ তথা একত্ববাদীগণ তার দ্বারা সফল হয়ে যাবে।

যেমনিভাবে তাঁর বাণী: ﴿وَمَا لَهُم مِّن ظَهِيرٍ﴾ [سبا: ২২] “আর তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সহায়কও নয়।” [সূরা সাবা, আয়াত: ২২] –এর ব্যাপারে ইবন আবি হাতিম সুদ্দী রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ফিরিশতাদের পক্ষ থেকে সহায়তা। আর যেমনিভাবে তার ওপর প্রমাণ পেশ করে, আল্লাহ তা'আলার বাণী: حَتَّى إِذَا فُزِعَ عَن قُلُوبِهِمْ...) [سبা: ২৩]। সুতরাং যখন আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত ফিরিশতাদেরকে সুপারিশকারীরূপে গ্রহণ করাটা শির্ক হয়, তখন কীভাবে মৃতদেরকে গ্রহণ করা যাবে, যেমনটি কবর পূজারীগণ করে? অথবা কীভাবে অপরাধী ও পাপী শয়তানের ভাইদেরকে সুপারিশকারীরূপে গ্রহণ করা যাবে, যাদেরকে ইবলিস তার পাশে অবস্থান ও তার আনুসরণ করতে আকৃষ্ট করেছে?

আবু আব্বাস বলেন, 'আল্লাহ তিনি ব্যতীত এমন প্রত্যেক কিছুকে (সুপারিশ করার) অযোগ্য বলে ঘোষণা দিয়েছেন, যার সাথে মুশরিকগণের সম্পৃক্ততা রয়েছে। সুতরাং তিনি ব্যতীত অন্যের জন্য মালিকানা অথবা মালিকানার অংশীদার হওয়াকে তিনি না করেছেন অথবা না করেছেন আল্লাহর জন্য সাহায্যকারী সাব্যস্ত হওয়াকে, আর বাকি থাকল শুধু শাফা'আতের বিষয়টি; তারপর তিনি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন যে, প্রতিপালক আল্লাহ যার জন্য অনুমতি দিবেন, শাফা'আত বা সুপারিশ সে ভিন্ন অন্য কারও উপকার করতে পারবে না; যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: “আর তারা সুপারিশ করে শুধু তাদের জন্যই যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।”

আর এই শাফা'আত আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাওহীদের অনুসারী একনিষ্ঠ ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য হবে এবং ঐ ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য হবে না, যে আল্লাহর সাথে শরীক করে। আর বাস্তব ব্যাপার হল, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা নির্ভেজাল একত্ববাদের অনুসারীদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। ফলে তিনি তাদেরকে ঐ ব্যক্তির দো'আর মাধ্যমে ক্ষমা করবেন, যাকে তিনি সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন, যাতে তিনি তাকে সম্মানিত করতে পারেন এবং তিনি প্রশংসিত স্থান লাভ করতে পারেন।

টিকাঃ
৭. শাইখ আবদুল্লাহ ইবন সুলাইমান ইবন মুহাম্মদ ইবন আবদিল ওহহাব তার গ্রন্থ 'তাইসীরুল 'আযীযিল হামীদ ফী শরহে কিতাবিত তাওহীদ' পৃ. ২৩৫ থেকে উদ্ধৃত।
৮. কারণ, মুশরিকরা মনে করে থাকে যে, আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত বা কোনো রূপ শর্ত ছাড়াই কোনো কোনো লোক তাদের জন্য সুপারিশ করবে, আর তারা তাই তাদের কাছে সুপারিশ চেয়ে বেড়ায়। এটাই আয়াতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৯. এভাবে সুপারিশকারী নির্ধারণ করার কাজটি তারা মোটেই ঠিক করে নি। আর এটাই استفهام إنكاري বা অস্বীকারমূলক প্রশ্ন করার অর্থ।
১০. অর্থাৎ কখনও তারা তা করবে না। কারণ তারা সে শাফা'আতের মালিক নয়।
১১. অর্থাৎ পূর্ববর্তী আয়াতের শাফা'আতের বিষয়টি এ আয়াতের আলোকে বুঝতে হবে।
১২. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৯।
১৩. অর্থাৎ যাদেরকে তারা ডাকছে, আহ্বান করছে, তারা কিন্তু নিজেরা নিজেদেরকে ইলাহ হওয়ার দাবী করছে না; উপরন্তু তারাই তাদের রবের নৈকট্য তালাশে ব্যস্ত।
১৪. তখন অর্থ হবে, শির্কপন্থীরা ফিরিশতা, মাসীহ কিংবা উযায়েরকে আহ্বান করছে, অথচ তারা কেউই এ আহ্বানে রাজী নয়।
১৫. ইবনুয যাব'য়ারী বলতে আরম্ভ করল যে, আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকেই ইবাদাত করা হয়, তারা সবাই যদি জাহান্নামের ইন্ধন হয়, তবে সেখানে ঈসা, উযায়ের ও অন্যান্য সৎলোকদেরও ইবাদাত করা হয়েছে। তখন আল্লাহ তা'আলা পরবর্তী আয়াত নাযিল করে তাদেরকে পূর্বোক্ত বিধানের আলাদা ঘোষণা করলেন।
১৬. অর্থাৎ তাদের কোনো অপরাধ নেই। কারণ, তারা এসব বিভ্রান্ত ও ভ্রষ্ট লোকদের ইবাদাতে রাজী ছিল না।
১৭. শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী রহ. এ ঘটনাটিকে পুরোপুরিই অস্বীকার করেছেন, তবে বিভিন্ন বর্ণনায় আসার কারণে অনেক আলেম ঘটনাটির মূল সাব্যস্ত রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন।
১৮. অর্থাৎ দুনিয়ায় মানুষ একে অপরের কাছে যখন সুপারিশ করে, তখন সুপারিশ যার কাছে করা হচ্ছে, তার অনুমতি ব্যতীতই কখনও কখনও সুপারিশ অনুষ্ঠিত হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা।
১৯. যে প্রয়োজন সে একা পূরণ করতে অসমর্থ, তাই তাকে সুপারিশকারীর সুপারিশ শুনতে বাধ্য করে।
২০. তাঁর সার্বভৌমত্বে কোন অংশীদার নেই এবং দুর্দশাগ্রস্ততা থেকে বাঁচতে তাঁর অভিভাবকের প্রয়োজন নেই।
২১. অর্থাৎ তারা মনে করে যে, কুরআনের আয়াতসমূহ এক বিগত জাতির জন্য প্রদত্ত হয়েছে; তাদের মত আর কারও জন্য সেটা প্রযোজ্য হতে পারে না। এটা ভুল।
২২. আকীদা-বিশ্বাস, হুকুম-আহকাম, বিধি-বিধান ইত্যাদি।
২৩. ইবনুল কাইয়্যেম রহ. এ বাণীটি উমর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন।
২৪. অর্থাৎ তাদের সুপারিশ নসীব হবে না।
২৫. উদ্দেশ্য, কুরআনুল কারীমের যেখানে যেখানে কাফের-মুশরিকদেরকে তাদের মা'বুদদের ডাকার নির্দেশ দিয়েছে, সে সকল আয়াত।
২৬. অর্থাৎ শাফা'আত সংক্রান্ত এসব আকীদা-বিশ্বাস একান্তভাবেই তাদের ধারণা- প্রসূত।
২৭. অর্থাৎ ফিরিশতারা যদি আহ্বানে সাড়া দিতে না পারে, তবে অন্যরা তো মোটেই পারবে না।
২৮. অর্থাৎ আয়াতে বর্ণিত, [তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সহায়কও নয়] দ্বারা ফিরিশতাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর কোনো সাহায্যকারী নেই সেটা বলা উদ্দেশ্য।
২৯. এ আয়াতের তাফসীরে বর্ণিত হয়েছে যে, 'আল্লাহ তা'আলা পক্ষ থেকে যখন কোনো নির্দেশ আসে তখন তা যেন পাথরের উপর জিঞ্জির পড়ার মত শব্দ হয়, আর ফিরিশতারা তা শুনেই বেহুস হয়ে পড়েন।'
৩০. আল্লাহর ওলী হওয়ার জন্য অলৌকিক কিছু ঘটানো শর্ত নয়। যারাই শরী'আত পুরোপুরি মানবে তারাই আল্লাহর ওলী।
৩১. সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৬

📘 কুরআন ও সুন্নাহ’য় বর্ণিত শাফা‘আত 📄 মহান শাফা‘আত

📄 মহান শাফা‘আত


১. আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে গোশত এনে তাঁকে সামনের রান পরিবেশন করা হলো, যা তিনি পছন্দ করতেন। অতঃপর তিনি তার থেকে কামড় দিয়ে খেলেন এবং এরপর বললেন:

«أنا سيد الناس يوم القيامة وهل تدرون مم ذلك ؟ يجمع الله الناس الأولين والآخرين في صعيد واحد يسمعهم الداعي وينفذهم البصر, وتدنو الشمس فيبلغ الناس من الغم والكرب ما لا يطيقون ولا يحتملون, فيقول الناس: ألا ترون ما قد بلغكم ؟ ألا تنظرون من يشفع لكم إلى ربكم ؟ فيقول بعض الناس لبعض: عليكم بآدم, فيأتون آدم عليه السلام فيقولون له أنت أبو البشر خلقك الله بيده, ونفخ فيك من روحه, وأمر الملائكة فسجدوا لك, اشفع لنا إلى ربك, ألا ترى إلى ما نحن فيه ؟ ألا ترى إلى ما قد بلغنا ؟ فيقول آدم: إن ربي قد غضب اليوم غضبا لم يغضب قبله مثله ولن يغضب بعده مثله, وإنه نهاني عن الشجرة فعصيته, نفسي, نفسي, نفسي, اذهبوا إلى غيري, اذهبوا إلى نوح, فيأتون نوحا فيقولون: يا نوح إنك أنت أول الرسل إلى أهل الأرض, وقد سماك الله عبدا شكورا , اشفع لنا إلى ربك, ألا ترى إلى ما نحن فيه ؟ فيقول: إن ربي عز و جل قد غضب اليوم غضبا لم يغضب قبله مثله ولن يغضب بعده مثله, وإنه قد كانت لي دعوة , دعوتها على قومي, نفسي, نفسي, نفسي, اذهبوا إلى غيري, اذهبوا إلى إبراهيم , فيأتون إبراهيم, فيقولون : يا إبراهيم أنت نبي الله وخليله من أهل الأرض . اشفع لنا إلى ربك, ألا ترى إلى ما نحن فيه ؟ فيقول لهم: إن ربي قد غضب اليوم غضبا لم يغضب قبله مثله ولن يغضب بعده مثله, وإني قد كنت كذبت ثلاث كذبات فذكرهن أبو حيان في الحديث - نفسي, نفسي, نفسي, اذهبوا إلى غيري اذهبوا إلى موسى, فيأتون موسى فيقولون: يا موسى أنت رسول الله, فضلك الله برسالته وبكلامه على الناس اشفع لنا إلى ربك, ألا ترى إلى ما نحن فيه ؟ فيقول: إن ربي قد غضب اليوم غضبا لم يغضب قبله مثله ولن يغضب بعده مثله, وإني قد قتلت نفسا لم أومر بقتلها نفسي, نفسي, نفسي, اذهبوا إلى غيري, اذهبوا إلى عيسى, فيأتون عيسى فيقولون: يا عيسى أنت رسول الله وكلمته ألقاها إلى مريم وروح منه, وكلمت الناس في المهد صبيا, اشفع لنا, ألا ترى إلى ما نحن فيه ؟ فيقول عيسى: إن ربي قد غضب اليوم غضبا لم يغضب قبله مثله قط ولن يغضب بعده مثله ولم يذكر ذنবা - نفسي نفسي نفسي, اذهبوا إلى غيري , اذهبوا إلى محمد صلى الله عليه وسلم فيأتون محمدا صلى الله عليه وسلم, فيقولون: يا محمد أنت رسول الله وخاتম الأنبياء, وقد غفر الله لك ما تقدم من ذنبك وما تأخر, اشفع لنا إلى ربক, ألا ترى إلى ما نحن فيه ؟ فأنطلق فآتي تحت العرش فأقع ساجدا لربي عز وجل, ثم يفتح الله علي من محامده, وحسن الثناء عليه شيئا لم يفتحه على أحد قبلي, ثم يقال: يا محمد ارفع رأسك سل تعطه, واشفع تشفع, فأرفع رأسي فأقول: أمتي يا رب أمتي يا رب, فيقال: يا محمد أدخل من أمتك من لا حساب عليهم من الباب الأيمن من أبواب الجنة وهم شركاء الناس فيما سوى ذلك من الأبواب, ثم قال: والذي نفسي بيده إن ما بين المصراعين من مصاريع الجنة كما بين مكة وحمير أو كما بين مكة وبصرى ».

“আমি হব কিয়ামতের দিন মানবকুলের সরদার। তোমাদের কি জানা আছে তা কেন? কিয়ামতের দিন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষ এমন এক ময়দানে সমবেত হবে, যেখানে একজন আহ্বানকারী'র আহ্বান সকলে শুনতে পাবে এবং সকলেই এক সঙ্গে দৃষ্টিগোচর হবে। সূর্য নিকটে এসে যাবে। মানুষ এমনি কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হবে, যা অসহনীয় ও অসহ্যকর হয়ে পড়বে। তখন লোকেরা বলবে, তোমরা কী বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, তা কি দেখতে পাচ্ছ না? তোমরা কি এমন কাউকে খুঁজে বের করবে না, যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশ করবেন? কেউ কেউ অন্যদের বলবে যে, আদম আলাইহিস সালামের কাছে চল। তখন সকলে তার কাছে এসে তাকে বলবে, আপনি আবুল বাশার। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে স্বীয় হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, তাঁর রূহ আপনার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছেন এবং তিনি ফিরিশতাদের নির্দেশ দিলে তারা আপনাকে সাজদাহ করেন। সুতরাং আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কী অবস্থায় পৌঁছেছি? তখন আদম আলাইহিস সালাম বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন যে, যার আগেও কোনো দিন এত রাগান্বিত হন নি এবং পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি আমাকে একটি বৃক্ষের কাছে যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি অমান্য করেছি, নাফসী! নাফসী! নাফসী! তোমরা অন্যের কাছে যাও, তোমরা নূহ আলাইহিস সালামের কাছে যাও। তখন সকলে নূহ আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে নূহ আলাইহিস সালাম! নিশ্চয় আপনি পৃথিবীর মানুষের প্রতি প্রেরিত প্রথম রাসূল। আর আল্লাহ তা'আলা আপনাকে পরম কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে অভিহিত করেছেন। সুতরাং আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আজ আমার রব এত বেশি রাগান্বিত হয়েছেন যে... আমার একটি গ্রহণীয় দো'আ ছিল, যা আমি আমার কাওমের ব্যাপারে করে ফেলেছি, (এখন) নাফসী! নাফসী! নাফসী!। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও তোমরা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাছে যাও। তখন তারা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে ইবরাহীম! আপনি আল্লাহর নবী এবং বিশেষভাবে অন্তরঙ্গ আল্লাহর বন্ধু। সুতরাং আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। তিনি তাদের বলবেন, আজ আমার রব এত বেশি রাগান্বিত হয়েছেন যে... আর আমি তো তিনটি মিথ্যা বলে ফেলেছিলাম। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও মূসা আলাইহিস সালামের কাছে যাও। তারা মূসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে মূসা আলাইহিস সালাম! আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ আপনাকে রিসালাতের সম্মান দান করেছেন এবং আপনার সাথে কথা বলে সমগ্র মানব জাতির ওপর মর্যাদা দান করেছেন। তিনি তাদের বলবেন, আজ আমার রব এত বেশি রাগান্বিত হয়েছেন যে... আর আমি তো এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেছিলাম, যাকে হত্যা করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয় নি। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও 'ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে যাও। তখন তারা 'ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে বলবে, হে 'ঈসা আলাইহিস সালাম! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং কালেমা, যা তিনি মরিয়ম আলাইহিস সালামের উপর ঢেলে দিয়েছিলেন। আপনি 'রূহ'। আপনি দোলনায় থেকে মানুষের সাথে কথা বলেছেন। তখন 'ঈসা আলাইহিস সালাম বলবেন, আজ আমার রব এত বেশি রাগান্বিত হয়েছেন যে... নাফসী! নাফসী! নাফসী!। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলবে, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী। আল্লাহ তা'আলা আপনার আগের ও পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। তখন আমি 'আরশের নিচে এসে আমার রবের সামনে সাজদায় অবনত হয়ে যাব। তারপর আল্লাহ তা'আলা তাঁর প্রশংসা ও গুণগানের এমন সুন্দর পদ্ধতি আমার সামনে খুলে দিবেন, যা এর পূর্বে কাউকে খুলে দেন নি। এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার মাথা উঠান। আপনি যা চান, তা আপনাকে দেওয়া হবে। আপনি সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। এরপর আমি আমার মাথা উঠিয়ে বলব, হে আমার রব! আমার উম্মত। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার উম্মতের মধ্যে যাদের কোনো হিসাব-নিকাশ হবে না, তাদেরকে জান্নাতের দরজাসমূহের ডান পার্শ্বের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। বেহেশতের এক দরজার দুই পার্শ্বের মধ্যবর্তী প্রশস্ততা হলো যেমন মক্কা ও হিমইয়ারের মধ্যবর্তী দূরত্ব অথবা মক্কা ও বসরার মাঝখানের দূরত্ব।”

টিকাঃ
৩৯. 'আবুল বাশার' অর্থ: মানব জাতির পিতা।
৪০. কারণ, তিনি শরী'য়তের হুকুম-আহকামের প্রথম রাসূল।
৪১. 'কালেমা' দ্বারা " كُن " শব্দকে বুঝানো হয়েছে।
৪২. 'রূহ' দ্বারা ফিরিশতাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাবান ফিরিশতা জিবরীল আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে।
৪৩. সহীহ বুখারী, তাফসীর অধ্যায় (২/৩৮৫), হাদীস নং ৪৩৫৭; সহীহ মুসলিম (১/১৮৪); তিরমিযী; আহমদ (২/৪৩৫)।
৪৪. রূহ অর্থ: আত্মা, আদেশ; আর কালিমা অর্থ: কথা।
৪৫. সহীহ বুখারী, তাওহীদ অধ্যায়, হাদীস নং ৬৯৭৫; সহীহ মুসলিম (১/১৮০); আহমদ (৩/১১৬)
৪৬. সহীহ বুখারী, তাওহীদ অধ্যায়, হাদীস নং ৬৮৮৭; সহীহ মুসলিম: (১/১৮২)
৪৭. অর্থাৎ সরাসরি আল্লাহর সাথে আমার কথা হয় নি, যেমন মূসার হয়েছিল।
৪৮. ইবন খুযাইমা তার 'আস-সহীহ' গ্রন্থে হাদীসখানা বর্ণনা করেছেন, পৃ. ২৪৫; আবু 'আওয়ানা (১/১৭৪); সহীহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায় (১/১৮৬)।
৪৯. আহমদ (১/৪); ইবন খুযাইমা হাদীসটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন, পৃ. ৩১০; আবু 'আওয়ানা (১/১৭৫); ইবন হিব্বান, পৃ. ৬৪২ (মাওয়ারেদ)।
৫০. ইমাম বুখারী রহ. হাদীসখানা তাঁর গ্রন্থের 'তাফসীর' অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন, সূরা আল-ইসরা।
৫১. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ফযীলত, হাদীস নং: ৫০৯১।
৫২. তিরমিযী (৪/৩৬৫); আহমদ (২/৪৪১)।
৫৩. ইবন মাজাহ, জুহুদ অধ্যায়, হাদীস নং ৪৩০৮।
৫৪. আবূ না'ঈম, দালায়েল (১/১৩); আহমদ (৩/১৪৪)।
৫৫. দারেমী (১/২৬); দায়লামী (১/২/৩০৮)।
৫৬. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: মুসাফিরের সালাত, হাদীস নং ১৯৪১।
৫৭. আবদুল্লাহ ইবন ইমাম আহমদ, 'যাওয়ায়েদুল মুসনাদ' (৫/১৩৮); তিরমিযী (৫/২৪৭); হাকেম (১/৭১)।
৫৮. আহমদ, মুসনাদ, হাদীস নং ২১৭৩৭।
৫৯. আহমদ, মুসনাদ, হাদীস নং ২১৭৩৯।
৬০. দারেমী (১/২৬); তিরমিযী (৫/২৪৫)।
৬১. দারেমী (১/২৭); ইবন 'আসেম, আস-সুন্নাহ (২/৩৭০)।
৬২. সহীহ বুখারী, তায়াম্মুম অধ্যায়, হাদীস নং ৩২৮
৬৩. ইবন জারীর (১৫/১৪৬); হাকেম (২/৩৬৩)।

📘 কুরআন ও সুন্নাহ’য় বর্ণিত শাফা‘আত 📄 নবী (সাঃ) কর্তৃক তাঁর উম্মতের জন্য জান্নাতে প্রবেশের ব্যাপারে সুপারিশ করা এবং তাঁর প্রথম সুপারিশকারী হওয়া

📄 নবী (সাঃ) কর্তৃক তাঁর উম্মতের জন্য জান্নাতে প্রবেশের ব্যাপারে সুপারিশ করা এবং তাঁর প্রথম সুপারিশকারী হওয়া


প্রথম হাদীসের মধ্যে পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, তাঁকে বলা হবে: « يا محمد أدخل من أمتك من لا حساب عليهم من البাব الأيمن من أبواب الجنة وهم شركاء الناس فيما سوى ذلك من الأبواب »।

“হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার উম্মতের মধ্যে যাদের কোনো হিসাব-নিকাশ হবে না, তাদেরকে জান্নাতের দরজাসমূহের ডান পার্শ্বের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। এ দরজা ছাড়া অন্যদের সাথে অন্য দরজা দিয়েও তাদের প্রবেশের অধিকার থাকবে।"

আর দ্বিতীয় হাদীসের মধ্যে আলোচনা হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুপারিশ করবেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সুপারিশ গ্রহণ করবেন এবং তাঁর জন্য সীমানা নির্ধারণ করে দিবেন, অতঃপর তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

১৯. আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: « أَنَا أَوَّلُ النَّاسِ يَشْفَعُ فِي الْجَنَّةِ, وَأَنَا أَكْثَرُ الْأَنْبِيَاءِ تَبَعًا »।

"আমি প্রথম ব্যক্তি, যে জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে শাফা'আত করব, আর নবীগণের মধ্যে আমার অনুসারীর সংখ্যাই হবে সবচেয়ে বেশি।"

২০. আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «أَنَا أَكْثَرُ الأَنْبِيَاءِ تَبَعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ, وَأَنَا أَوَّلُ مَنْ يَقْرَعُ بَابَ الْجَنَّةِ »।

"কিয়ামতের দিনে নবীগণের মধ্যে আমার অনুসারীর সংখ্যাই হবে সবচেয়ে বেশি এবং আমিই সবার আগে জান্নাতের কড়া নাড়ব।"

২১. আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «آتِي بَابَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَسْتَفْتِحُ فَيَقُولُ الْخَازِنُ: مَنْ أَنْتَ؟ فَأَقُولُ: مُحَمَّدُ, فَيَقُولُ: بِكَ أُمِرْتُ لَا أَفْتَحُ لَأَحَدٍ قَبْلَكَ»।

"কিয়ামত দিবসে আমি জান্নাতের গেইটে এসে দরজা খোলার অনুমতি চাইব। তখন খাজাঞ্চি বলবেন, আপনি কে? আমি উত্তরে বলব, মুহাম্মাদ। খাজাঞ্চি বলবেন: 'আপনার জন্যই দরজা খুলতে আমি আদিষ্ট হয়েছি। আপনার পূর্বে অন্য কারোর জন্য দরজা খুলব না'।"

২২. আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: يُطَوَّلُ يَوْمُ الْقِيَامَةِ عَلَى النَّاسِ فَيَقُولُ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ : انْطَلِقُوا بِنَا إِلَى آدَمَ أَبِي الْبَشَرِ فَيَشْفَعُ لَنَا إِلَى رَبِّنَا عَزَّ وَجَلَّ فَلْيَقْضِ بَيْنَنَا, فَيَأْتُونَ آدَمَ ও آتي الجبار ও أسجد له فَيَقُولُ: ارْفَعْ رَأْسَكَ يا محمد, ও تكلم يُسْمَعْ مِنْكَ, وَ قل يقبل قولك, وَ اشْفَعْ تُشَفَّعْ، فَأَقُولُ: أُمَّتِي أُمَّتِي فَيَقُولُ: اذهب إلى أمتك فمَنْ وجدت فِي قَلْبِهِ مِثْقَالَ نصف حبة من شعير من الإيمان فأدخله الجنة, فأذهب, فَمَنْ وجدت فِي قَلْبِهِ مثقال ذلك فأدخله الجنة, قَالَ: فَآتي الجبار وأأسجد له فَيَقُولُ: ارْفَعْ رَأْسَكَ يا محمد, ও تكلم يُسْمَعْ مِنْكَ, وَاشْفَعْ تُشَفَعْ। فأرفع رأسي, فَأَقُولُ: أُمَّتِي أُمَّتِي। أي رب। فَيَقُولُ: اذهب, فمَنْ وجدت في قَلْبِهِ مِثْقَال حبة من خردل مِنْ إِيمَان।

"মানুষের ওপর কিয়ামতের দিবসকে দীর্ঘায়িত করা হবে, তখন তাদের একদল অপরদলকে বলবে: তোমরা আমাদেরকে মানব জাতির পিতা আদম আলাইহিস সালামের নিকট নিয়ে যাও, ফলে তিনি আমাদের জন্য আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা'আলার নিকট সুপারিশ করেন, যাতে তিনি আমাদের মাঝে বিচার ফয়সালার কাজটি সমাপ্ত করেন; অতঃপর তারা আদম আলাইহিস সালামের নিকট আসবে;... আর আমি আসব পরাক্রমশালী আল্লাহর দরবারে এবং তাঁর উদ্দেশ্যে সাজদাহ করব, অতঃপর তিনি বলবেন: হে মুহাম্মাদ! আপনি তোমার মাথা উঠান এবং কথা বলুন, আপনার কথা শোনা হবে; আপনি কথা বলুন, আপনার কথা গ্রহণ করা হবে; সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে; তখন আমি বলব: আমার উম্মত! আমার উম্মত!! তখন তিনি বলবেন: তুমি তোমার উম্মতের নিকট যাও, তারপর যার অন্তরের মধ্যে যবের অর্ধেক দানা পরিমাণ ঈমান পাবে, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দাও; অতঃপর আমি যাব এবং যার অন্তরের মধ্যে এই পরিমাণ (ঈমান) পাব, তাকে আমি জান্নাতে প্রবেশ করাব; তিনি বলেন: তারপর আমি আসব পরাক্রমশালী আল্লাহর দরবারে এবং তাঁর উদ্দেশ্যে সাজদাহ করব, অতঃপর তিনি বলবেন: হে মুহাম্মাদ! আপনি তোমার মাথা উঠান এবং কথা বলুন, আপনার কথা শোনা হবে; আপনি কথা বলুন, আপনার কথা গ্রহণ করা হবে; সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে; তখন আমি বলব: আমার উম্মত! আমার উম্মত!! হে আমার রব! তখন তিনি বলবেন: যাও, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান পাবে, (তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দাও)

টিকাঃ
৬৪. সহীহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “আমি প্রথম ব্যক্তি, যে জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে শাফা'আত করব, আর নবীগণের মধ্যে আমার অনুসারীর সংখ্যাই হবে সবচেয়ে বেশি” হাদীস নং ৪০৮১।
৬৫. সহীহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “আমি প্রথম ব্যক্তি, যে জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে শাফা'আত করব, আর নবীগণের মধ্যে আমার অনুসারীর সংখ্যাই হবে সবচেয়ে বেশি” হাদীস নং ৪০৬১।
৬৬. সহীহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: "আমি প্রথম ব্যক্তি, যে জান্নাতের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে শাফা'আত করব, আর নবীগণের মধ্যে আমার অনুসারীর সংখ্যাই হবে সবচেয়ে বেশি"
৪১. 'কালেমা' দ্বারা " كُن " শব্দকে বুঝানো হয়েছে। যেহেতু এই শব্দটি বলার সাথে সাথে 'ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কুদরতে মাতৃগর্ভে আসেন, সেহেতু তাকে 'তাঁর কালেমা' বলা হয়।
৪২. 'রূহ' দ্বারা ফিরিশতাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাবান ফিরিশতা জিবরীল আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে অথবা রূহ দ্বারা আল্লাহর আদেশকে বুঝানো হয়েছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px