📘 কুরআন ও সুন্নাহ’য় বর্ণিত শাফা‘আত 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


নিশ্চয় সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য; আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর নিকট সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর নিকট তাওবা করি, আর আমাদের নফসের জন্য ক্ষতিকর এমন সকল খারাপি এবং আমাদের সকল প্রকার মন্দ আমল থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। সুতরাং আল্লাহ যাকে পথ প্রদর্শন করেন, তাকে পথভ্রষ্ট করার কেউ নেই, আর যাকে তিনি পথহারা করেন, তাকে পথ প্রদর্শনকারীও কেউ নেই। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তাঁর প্রতি ও তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।

অতঃপর..

মুসলিম ব্যক্তির ওপর আবশ্যক হলো একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং কথায় ও কাজে তাঁর প্রতি একনিষ্ঠ হওয়া, আর স্বচ্ছল ও সংকটময় পরিস্থিতিতে তাঁর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করা। আর আল-কুরআন ও সুন্নাহ'র নিয়ম-পদ্ধতি অনুসরণে পথ চলা।

'শাফা'আত' এর বিষয়টি এমন একটি বিষয়, যার পাঠ ও আলোচনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মুমিন বান্দার ভালোবাসায় বৃদ্ধি করে। আর তিনি হলেন এমন মহান নবী, যিনি তার রব আল্লাহ তা'আলার নিকট ওসীলা ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। আমরা আশা করি একক অদ্বিতীয় মুখাপেক্ষীহীন আল্লাহ কিয়ামতের দিনে আমাদেরকে তার শাফা'আত থেকে বঞ্চিত করবেন না।

শাফা'আতের গুরুত্ব বিবেচনায় এনে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আলেমগণ একে আকিদার কিতাবসমূহের মধ্যে সন্নিবেশিত করেছেন; তাই আপনি আকীদা বিষয়ক লেখকদের খুব কম সংখ্যক লেখককেই পাবেন, যারা তার আকিদা সংক্রান্ত কিতাবের মধ্যে শাফা'আত সম্পর্কে একটি অধ্যায় বা একটি পরিচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করেন নি। যাতে হক তথা আসল বিষয়টি স্পষ্ট হয় এবং বাতিল বিষয়টির মূলোৎপাটন হয়ে যায়।

আর এই কিতাবটি যা আপনার সামনে পেশ করা হল, আল্লাহ চায় তো (ইনশাআল্লাহ) তা ঐ কিতাবসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম একটি কিতাব।... আমি তা রচনার ক্ষেত্রে আল-কুরআনুল কারীম ও সহীহ সুন্নাহ'র ওপর নির্ভর করেছি... আর আমি দুর্বল হাদীস পরিহার করেছি এবং এ বিষয়ে যাঁরা পূর্বে লিখেছেন, তাদের থেকে সহযোগিতা গ্রহণ করেছি।

আর আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যাতে তা কবুল করেন এবং তার দ্বারা পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা তাঁর বান্দাদেরকে উপকৃত করেন। আর তিনি হলেন এর তত্ত্বাবধায়ক এবং তাতে তিনি সক্ষম।

লিখেছেন: ইবরাহীম ইবন আবদিল্লাহ আল-হাযেমী (আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিন এবং তার ভুলত্রুটিকে শুধরিয়ে দিন)

রিয়াদ: ২৭/০১/১৪১৩ হি.

📘 কুরআন ও সুন্নাহ’য় বর্ণিত শাফা‘আত 📄 শাফা‘আত শব্দের শাব্দিক অর্থ

📄 শাফা‘আত শব্দের শাব্দিক অর্থ


ইবনুল আছীর 'আন-নিহায়া' (النهاية) গ্রন্থে বলেন: হাদীসের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে (الشّفاعة) শাফা'আত শব্দটি বারবার আলোচিত হয়েছে, আর তার অর্থ হলো তাদের মধ্যকার সংঘটিত অন্যায় ও অপরাধ থেকে পরিত্রাণের ব্যাপারে আবেদন-নিবেদন করা। বলা হয়: شفع يشفع شفاعة فهو شافع وشفيع. সুপারিশকারীকে আরবিতে شافع ও شفيع বলা হয়। আর যিনি শাফা'আত তথা সুপারিশ গ্রহণ করেন, তাকে আরবিতে المُشفّع বলা হয়; পক্ষান্তরে যার সুপারিশ গ্রহণ করা হয়, তাকে আরবিতে المُشفّع বলা হয়।

'আল-কামূস' (القاموس) ও 'তাজুল 'আরূস' (تاج العروس)-এর মধ্যে আছে: الشّفيع মানে: শাফা'আতের অধিকারী তথা সুপারিশকারী, তার বহুবচন হলো شفعاء আর সুপারিশকারী হলো অন্যের জন্য প্রার্থনাকারী, যাকে সেই ব্যক্তি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করার জন্য সুপারিশকারীরূপে গ্রহণ করল।

উপরোক্ত অভিধানদ্বয়ের মধ্যে আরও আছে: বলা হয়ে থাকে, وشفعته فيه تشفيعا حين شفع (আর আমি তার ব্যাপারে তার সুপারিশ গ্রহণ করেছি, যখন সে সুপারিশ করেছে) অর্থাৎ আমি তার সুপারিশ গ্রহণ করেছি, যেমনটি 'আল-'উবাব' (العباب) নামক গ্রন্থে আছে, হাতেম (ত্বাই) নু'মানকে সম্বোধন করে বলেন:

فَكَكْتَ عَدِيًّا كُلَّهَا مِنْ إِسَارِهَا فَأَفْضِلْ وَ شَفِّعْنِي بِقَيْسِ بْنِ جَحْدَرٍ

তুমি 'আদী গোত্রের সকলকে তাদের বাধন থেকে মুক্ত করে দিয়েছ। সুতরাং আরও একটু বাড়িয়ে দয়া কর এবং কায়েস ইবন জাহদারের ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ কর।

আর 'হদ' তথা শরী'আত নির্ধারিত শাস্তি সম্পর্কিত হাদীসে এসেছে, «إِذَا بَلَغَ الحَدُّ السُّلطَانَ فَلَعَنَ اللَّهُ الشَّافِعَ وَالْمُشَفِّعَ»

“যখন সুলতান তথা রাষ্ট্র প্রধানের নিকট 'হদ' তথা শরী'আত নির্ধারিত শাস্তির বিষয়টি পৌঁছে যাবে, তখন আল্লাহ সুপারিশকারী ও সুপারিশ গ্রহণকারী উভয়ের ওপর লা'নত করেন।

আর আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত আছে: «القرآن شافع مشفع, ومَاحِلٌ مُصَدَّق ».

“আল-কুরআন হচ্ছে সুপারিশকারী, যার সুপারিশ গৃহীত হবে এবং এমন পক্ষ বা বিপক্ষ অবলম্বনকারী, যার পক্ষ ও বিপক্ষ সাক্ষীকে সত্যায়ণ করা হয়।” অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার অনুসরণ করবে এবং তাতে যা রয়েছে তার ওপর আমল করবে, তাহলে কুরআন তার জন্য এমন সুপারিশকারী হবে, যার সুপারিশ গৃহীত হবে; তার গুনাহ ও পদস্খলন থেকে মুক্ত করার জন্য। আর যে তার ওপর আমল ছেড়ে দিবে, সে অপরাধের কারণে গুনাহগার হবে, তার বিরুদ্ধে যে গুণাহের কথা উত্থিত হবে কুরআন সেটার সত্যায়ণ করবে।

সুতরাং الشفّع মানে: যিনি শাফা'আত তথা সুপারিশ গ্রহণ করেন, আর المشفّع মানে: যার সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। আর এই অর্থেই হাদীসে ব্যবহৃত হয়েছে: «اشْفَعْ تُشَقَّعْ» (আপনি সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে)।

استشفعه إلى فلان অর্থাৎ সে তার কাছে প্রার্থনা করেছে যে, সে যেন তার জন্য অমুকের নিকট সুপারিশ করে। যেমন, সাগানী আ'শার কবিতা আবৃত্তি করেছেন:
تقول بنتي وقد قربت مرتحلا يا رب جنب أبي الأوصاب ও الوجع
واستشفعت من سراة الحي ذا شرف فقد عصاها أبوها و الذي شفع

আমার মেয়ে বলে, যখন আমি যাওয়ার সময়ের নিকটবর্তী হয়ে গেছি, হে আমার রব! তুমি আমার পিতার অসুস্থতা ও কষ্টসমূহ দূর করে দাও। তুমি সম্ভ্রান্ত ভদ্র মানুষদেরকে সুপারিশকারী বানিয়েছ, অথচ তার পিতা গোত্রের নেতৃবৃন্দ ও যে সুপারিশ করবে তার অবাধ্য হয়েছে।

টিকাঃ
১. যুবায়ের ইবনুল 'আওয়াম রা. থেকে বর্ণিত হাদীস, হাদীসটি বিশুদ্ধ মাওকুফ। (দেখুন: তাবরানী ও মুওয়াত্তা মালেক। -সম্পাদক।)
২. হাদীসটি আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে মাওকুফ সনদে বর্ণিত। আর জাবির রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে 'মারফু' সনদে হাদীসটি বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত। দেখুন, ইবন হিব্বান, ১০/১৯৮, হাদীস নং ১০৪৫০; আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ, হাদীস নং ২০১৯; সহীহুল জামি'উ, হাদীস নং ৪৪৪৩। [সম্পাদক]
৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৩৪০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৩।
৪. এখানে 'আসাসুল বালাগাহ' ও 'লিসানুল আরব' গ্রন্থে ذا شرف বদলে ذا ثقة শব্দটি এসেছে।

📘 কুরআন ও সুন্নাহ’য় বর্ণিত শাফা‘আত 📄 যে সকল আয়াতে শাফা‘আত ও শাফা‘আতকারী নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে

📄 যে সকল আয়াতে শাফা‘আত ও শাফা‘আতকারী নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে


আল্লাহ তা'আলা বলেন,

وَاتَّقُوا يَوْمًا لَّا تَجْزِي نَفْسٌ عَن نَّفْسٍ شَيْئًا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا شَفَاعَةٌ وَلَا يُؤْخَذُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ ﴾ [البقرة: ٤٨]

"আর তোমরা সেদিনের তাকওয়া অবলম্বন কর, যেদিন কেউ কারো কোনো কাজে আসবে না। আর কারো সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না এবং কারো কাছ থেকে বিনিময় গৃহীত হবে না। আর তারা সাহায্যও প্রাপ্ত হবে না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ৪৮]

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُواْ أَنفِقُواْ مِمَّا رَزَقْنَكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَ يَوْমٌ لَّا بَيْعٌ فِيهِ وَلَا خُلَّةٌ وَلَا شَفَعَةٌ ﴾ [البقرة: ٢٥٤]

"হে মুমিনগণ! আমরা যা তোমাদেরকে যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে তোমরা ব্যয় কর সেদিন আসার পূর্বে, যেদিন বেচা-কেনা, বন্ধুত্ব ও সুপারিশ থাকবে না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৪]

আল্লাহ তা'আলা কোনো এক সৎ ব্যক্তির বক্তব্যের উল্লেখ করে বলেন:

وَأَتَّخِذُ مِن دُونِهِ عَالِهَةً إِن يُرِدْنِ الرَّحْمَنُ بِضُرٍ لَّا تُغْنِ عَنِّي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا وَلَا يُنقِذُونِ ﴾ [يس: ٢٣]

“আমি কি তাঁর পরিবর্তে অন্য ইলাহ্ গ্রহণ করব? রহমান আমার কোনো ক্ষতি করতে চাইলে তাদের সুপারিশ আমার কোনো কাজে আসবে না এবং তারা আমাকে উদ্ধার করতেও পারবে না।” [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ২৩] সুতরাং এই আয়াতসমূহে শাফা'আতের নেতিবাচক দিকের বর্ণনা রয়েছে।

আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন:

وَأَنذِرْ بِهِ الَّذِينَ يَخَافُونَ أَن يُحْشَرُوا إِلَى رَبِّهِمْ لَيْسَ لَهُم مِّن دُونِهِ، وَلِيٌّ وَلَا شَفِيعٌ [الانعام: ٥١]

"আর আপনি এর দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করুন, যারা ভয় করে যে, তাদেরকে তাদের রব-এর কাছে সমবেত করা হবে এমন অবস্থায় যে, তিনি ছাড়া তাদের জন্য থাকবে না কোনো অভিভাবক বা সুপারিশকারী। যাতে তারা তাকওয়ার অধিকারী হয়।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৫১]

আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামবাসীদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন:

فَمَا لَنَا مِن شَفِعِينَ وَلَا صَدِيقٍ حَمِيمٍ فَلَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ [الشعراء: ১০০০, ১০২]

“অতএব, আমাদের কোনো সুপারিশকারী নেই এবং কোনো সহৃদয় বন্ধুও নেই। হায়! যদি আমাদের একবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ ঘটত, তাহলে আমরা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম!” [সূরা আশ-শু'আরা, আয়াত: ১০০-১০২]

আয়াতে উল্লিখিত حميم শব্দের অর্থ: নিকটতম, আর كرة শব্দের অর্থ: দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তন করা।

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ مَا لَكُم مِّن دُونِهِ مِن وَلِي وَلَا شَفِيعٌ أَفَلَا تَتَذَكَّਰُونَ ﴾ [السجدة: ٤]

“আল্লাহ, যিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু'য়ের অন্তর্বর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে। তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই এবং সুপারিশকারীও নেই; তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?” [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ৪]

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

أَمِ اتَّخَذُوا مِن دُونِ اللَّهِ شُفَعَاءٌ قُلْ أَوَلَوْ كَانُوا لَا يَمْلِكُونَ شَيْئًا وَلَا يَعْقِلُونَ * قُل لِلَّهِ الشَّفَعَةُ جَمِيعًا لَهُ مُلْكُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ﴾ [الزمر: ٤٣، ٤৪]

“তবে কি তারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে সুপারিশকারী ধরেছে? বলুন, 'তারা কোনো কিছুর মালিক না হলেও এবং তারা না বুঝলেও?' বলুন, 'সকল সুপারিশ আল্লাহরই মালিকানাধীন, আসমানসমূহ ও যমীনের মালিকানা তাঁরই, তারপর তাঁরই কাছে তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৪৩-৪৪]

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

وَأَنذِرْهُمْ يَوْমَ الْآزِفَةِ إِذِ الْقُلُوبُ لَدَى الْحَنَاجِرِ كَاظِمِينَ مَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ حَمِيمٍ وَلَا شَفِيعٍ يُطَاعُ ) [غافر: ১৮]

আর আপনি তাদেরকে সতর্ক করে দিন আসন্ন দিন সম্পর্কে -যখন দুঃখ-কষ্ট সম্বরণরত অবস্থায় তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে। যালিমদের জন্য কোনো অন্তরংগ বন্ধু নেই এবং এমন কোনো সুপারিশকারীও নেই যার সুপারিশ গ্রাহ্য হবে।” [সূরা গাফির, আয়াত: ১৮]

এখানে আয়াতে الآزِفَةُ শব্দটি এসেছে, যা কিয়ামতের একটি নাম, এ নামকরণের কারণ হচ্ছে, কিয়ামত অতি নিকটে। যেমন, অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
أَزِفَتِ الْآزِفَةُ * لَيْسَ لَهَا مِن دُونِ اللَّهِ كَاشِفَةٌ ﴾ [النجم: ৫৭, ৫৮]

📘 কুরআন ও সুন্নাহ’য় বর্ণিত শাফা‘আত 📄 যে সকল আয়াতে শাফা‘আত ও শাফা‘আতকারী সাব্যস্ত করা হয়েছে

📄 যে সকল আয়াতে শাফা‘আত ও শাফা‘আতকারী সাব্যস্ত করা হয়েছে


আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ﴾ [البقرة: ২৫৫] “কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে?” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: ﴿مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ﴾ [يونس: ৩] “তাঁর অনুমতি লাভ না করে সুপারিশ করার কেউ নেই।” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন: ﴿وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا سُبْحَانَهُ بَلْ عِبَادُ مُكْرَمُونَ لَا يَسْبِقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُم بِأَمْرِهِ يَعْمَلُونَ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى وَهُم مِّنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ﴾ [الانبياء: ২৬, ২৮]

"আর তারা বলে, 'দয়াময় (আল্লাহ) সন্তান গ্রহণ করেছেন।' তিনি পবিত্র মহান! তারা তো তাঁর সম্মানিত বান্দা। তারা তাঁর আগে বেড়ে কথা বলে না; তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে থাকে। তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে, তা সবই তিনি জানেন। আর তারা সুপারিশ করে শুধু তাদের জন্যই, যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৬-২৮]

এসব আয়াতে শর্তসাপেক্ষে শাফা'আতের অস্তিত্ব সাব্যস্ত করা হয়েছে; অচিরেই সে শর্তগুলোর বিবরণ আসবে ইনশাআল্লাহ।

তাছাড়া আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন:
يَوْمَئِذٍ لَّا تَنفَعُ ٱلشَّفَـٰعَةُ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَّهُ ٱلرَّحْمَـٰنُ وَرَضِىَ لَهُۥ قَوْلًۭا ﴿১০৯﴾ [طه: ১০৫, ১০৯]

“দয়াময় যাকে অনুমতি দিবেন ও যার কথায় তিনি সন্তুষ্ট হবেন, সে ছাড়া কারো সুপারিশ সেদিন কোনো কাজে আসবে না।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১০৫-১০৯] আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

وَلَا يَمْلِكُ ٱلَّذِينَ يَدْعُونَ مِن دُونِهِ ٱلشَّفَـٰعَةَ إِلَّا مَنْ شَهِدَ بِٱلْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ ﴿৮৬﴾ [الزخرف: ৮৬]

"আর তিনি ছাড়া তারা যাদেরকে ডাকে, তারা সুপারিশের মালিক হবে না, তবে তারা ছাড়া, যারা জেনে-শুনে সত্য সাক্ষ্য দেয়।” [সূরা যুখরুফ, আয়াত: ৮৬]

হাফেয ইবন কাসীর রহ. বলেন: তারপর আল্লাহ্ বলেন: 'আর তিনি ব্যতীত তারা দেব-দেবী ও মূর্তিসমূহের মধ্য থেকে যাদেরকে ডাকে, তারা সুপারিশের মালিক হবে না; অর্থাৎ তারা তাদের জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখে না। আর আয়াতে আল্লাহর বাণী,

﴿إِلَّا مَن شَهِডَ بِالْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ﴾

"তবে তারা ছাড়া, যারা জেনে-শুনে সত্য সাক্ষ্য দেয়”-এটা استثناء منقطع তথা ভিন্ন শ্রেণি থেকে ব্যতিক্রম বর্ণনা অর্থাৎ কিন্তু যে বুদ্ধিমত্তার সাথে জেনে-শুনে সত্য সাক্ষ্য দেয়, তাঁর নিকট তাঁর অনুমতি সাপেক্ষ তার সুপারিশ তাকে উপকৃত করবে।

আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন:

﴿وَكَم مِّن مَّلَكِ فِي السَّمَوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِنْ بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَى ﴾ [النجم: ২৬]

আর আসমানসমূহে বহু ফিরিশতা রয়েছে, তাদের সুপারিশ কিছুমাত্র ফলপ্রসূ হবে না, তবে আল্লাহর অনুমতির পর; যার জন্য তিনি ইচ্ছে করেন ও যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ২৬]

এই আয়াতসমূহ শর্তসাপেক্ষে শাফা'আত সাব্যস্ত করার ওপর প্রমাণবহ। অচিরেই সে শর্তসমূহের বর্ণনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
৬. আরবী استثناء এর অর্থ, কোনো কিছুকে ব্যতিক্রম বলা। এই ব্যতিক্রম দুই প্রকার; কখনো কখনো পূর্বোল্লোখিত কথা বা বিধান থেকে ব্যতিক্রম বলা উদ্দেশ্য হয়। তখন এটাকে বলা হয়, استثناء متصل, যা এখানে উদ্দেশ্য নয়। আবার কখনও কখনও নতুন একটি ভিন্নধর্মী ব্যতিক্রম উল্লেখ করা উদ্দেশ্য হয়, যার সাথে পূর্বোক্ত বিধান বা কথার সম্পৃক্ততা থাকে না। এটাকেই বলা হয়, استثناء منقطع হাফেয ইবনে কাসীরের মতে এটাই এখানে উদ্দেশ্য। কারণ, যদি পূর্বোক্ত কথা বা বিধান থেকে এখানে ব্যতিক্রম বলা উদ্দেশ্য ধরা হয়, তবে সেখানে আল্লাহ ছাড়া আরও অন্যান্যদের জন্য শাফা'আতের মালিকানা সাব্যস্ত করতে হয়, যা অন্যান্য আয়াতের পরিপন্থি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px