📄 যে ব্যক্তি দাওয়াতে হাজির হবে তার জন্য যা করা মুস্তাহাব
যে ব্যক্তি দাওয়াতে হাজির হবে তার জন্য দু'টি কাজ করা মুস্তাহাব। প্রথম কাজ: দাওয়াতকারীর জন্য খাওয়া শেষে দোয়া করা যা নবী করীম থেকে প্রচলন হয়ে এসেছে। তা আবার কয়েক ধরনের।
আব্দুল্লাহ ইবনে বিসর থেকে বর্ণিত যে, তার পিতা নবী করীম ﷺ এর জন্য খাবার প্রস্তুত করলেন এবং তাকে দাওয়াত দিলেন। তিনি দাওয়াত গ্রহণ করলেন। অতঃপর খাওয়া শেষ করে বললেন- আল্লাহুম্মাগফির লাহুম, ওয়ারহামহুম, অবারিক লাহুম ফীমা রজাক্বতাহুম। অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তাদেরকে মাফ কর, তাদেরকে রহম কর। তাদের যে রিযিক দিয়েছ তাতে বরকত দান কর। (মুসলিম, ৬/১২২; আবু দাউদ, ২/১৩৫; নাসাঈ, ৬৬/৩; তিরমিযী, ৪/২৮১; বাইহাকী, ৭/২৭৪)
আনাস বিন মালেক অথবা অন্য কারো থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আনসারদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। যখন তিনি আনসারদের বাড়ির নিকটে আসলেন তখন আনসারদের বালকেরা এসে তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল। তিনি তাদের জন্য দোয়া করলেন। আর তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তি কামনা করলেন। তিনি সা'দ বিন ওবাদার ঘরের নিকট আসলেন (তিনি সা'দের নিকট ঘরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করলেন।) আর বললেন, আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। সা'দ বললেন, ওয়া' আলাইকুমুস্সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ তিনবার সালাম না দেয়া পর্যন্ত সা'দ সালামের জবাব নবীকে শুনালেন না। সা'দ তিনবার জবাব দিলেন কিন্তু তাকে শুনালেন না। আর নবী তিন সালামের অধিক সালাম দিতেন না। যদি তাকে অনুমতি দেয়া হতো প্রবেশ করতেন, তা না হলে ফিরে যেতেন। অতএব নবী প্রত্যাবর্তন করছিলেন, সা'দ তাঁর পিছু নিলেন। অতঃপর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য আমার মা, বাবা কুরবান হোক। আপনি যে কয়বার সালাম দিয়েছেন তা আমার নিকট পৌঁছেছে আর আমিও তার জবাব দিয়েছি কিন্তু আপনাকে শুনাইনি। আমি চেয়েছিলাম আপনার সালাম ও বরকতের আধিক্য। (হে আল্লাহর রাসূল! আপনি প্রবেশ করুন)। এরপর তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলেন এবং তাঁর কাছে কিসমিস নিয়ে এলেন, আল্লাহর নবী খেলেন। যখন খাওয়া সমাপ্ত করলেন তখন বললেন, তোমাদের সৎ ব্যক্তিবর্গ খাবার খেয়েছে, তোমাদের জন্য ফেরেশতা দোয়া করেছে, আর তোমাদের নিকট রোযাদাররা ইফতার করেছে। (আহমদ, ৩/১৩৮; বাইহাকী, ৭/২৮৭; আবু দাউদ, ২/১৫০)
দ্বিতীয় কাজ: মেযবান ও তার স্ত্রীর জন্য মঙ্গল ও বরকতের দোয়া করা। এ বিষয়ে অনেক হাদীস বর্ণিত আছে:
প্রথম হাদীস : জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমার পিতা সাতজন বা নয়জন কন্যা রেখে মৃত্যুবরণ করলেন। আমি একজন বিধবা নারী বিবাহ করলাম। আমাকে রাসূলে করীম বললেন, হে জাবের! তুমি বিয়ে করেছ? আমি বললাম হ্যাঁ। তিনি বললেন, কুমারী না বিধবা? আমি বললাম বিধবা। তিনি বললেন, যদি তুমি কুমারী বিবাহ করতে তুমি তার সাথে আনন্দ-ফুর্তি করতে সেও তোমার সাথে তদ্রূপ করত। তুমি তাকে হাসাতে সেও তোমাকে হাসাতো তাহলে কি উত্তম হত না? আমি তাঁকে বললাম, নিশ্চয় আব্দুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেছেন এবং (নয় বা সাতজন কন্যা রেখে গেছেন) আমি অপছন্দ করলাম তাদের মতো কাউকে ঘরে আনতে। সেজন্য এমন একজন নারীকে বিবাহ করেছি যে তাদের দেখাশুনা করার সক্ষম রাখে। তখন নবী করীম বললেন, বারা-কাল্লাহু লাকা। অর্থাৎ- আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন। অথবা আমাকে তিনি বললেন, তোমার মঙ্গল হোক। (বুখারী, ৯/৪২৩, মুসলিম, ৪/১৭৬)
দ্বিতীয় হাদীস : বুরাইদাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আনসারদের একটি দল আলী (রা)-কে বলল : ফাতিমাকে তোমার নিকট বিবাহ দিবেন। তখন আলী (রা) রাসূলে করীম-এর নিকট এসে সালাম প্রদান করলেন। রাসূলুল্লাহ বললেন: আবূ তালিবের ছেলের আবার কি প্রয়োজন দেখা দিল? তিনি বললেন, ফাতিমাহ বিনতে রাসূলুল্লাহ-এর কথা স্মরণ করেছি। রাসূলুল্লাহ বললেন, ধন্যবাদ স্বাগতম! এর চেয়ে বেশি কিছু বললেন না। এরপর আলী (রা) অপেক্ষমান সেই আনসার দলের নিকট গমন করলেন, তাঁরা বললেন, তোমার খবর কি? তিনি বললেন, আমি এ কথা ছাড়া আর কিছু জানি না। তিনি বলেছেন, 'মারহাবা আহ্লান' ধন্যবাদ স্বাগতম। তারা বলল, দু'টির একটিই রাসূলের পক্ষ থেকে তোমার জন্য সম্মতি প্রকাশের জন্য যথেষ্ট। আর তোমাকে ধন্যবাদ ও স্বাগতম উভয় দিয়েছেন। এরপরের ঘটনা, যখন নবী করীম তাঁর বিবাহ দিলেন, তিনি বললেন, হে আলী! বাসর করতে হলে তো ওলীমার আয়োজন করা প্রয়োজন। তখন সা'দ বললেন, আমার নিকট মেষ আছে। তার জন্য আনসারী একদল লোক কয়েক সা ভুট্টা জোগাড় করে আনলেন। যেদিন বাসর রাত্রি ছিল। রাসূলুল্লাহ আমার সাথে সাক্ষাৎ না করে কিছু করো না। রাসূলুল্লাহ পানি আনতে বললে, তা দ্বারা অযু করলেন। এরপর অবশিষ্ট পানি আলীর উপর ছিটিয়ে দিলেন এবং বললেন : আল্লাহুম্মা বারিক ফীহিমা, অবারিক লাহুম ফী বিনায়িহিমা। অর্থাৎ- হে আল্লাহ! তাদের উভয়েরই মাঝে বরকত দাও এবং তাদের জন্য বাসর রাতকে বরকতময় করে দাও। (ইবনু সা'দ, ৮/২০-২১; ত্ববরানী কাবীর, ১/১২১/১)
তৃতীয় হাদীস : আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমাকে নবী করীম বিবাহ করলেন, আমার নিকট আমার মা আগমন করলেন এবং আমাকে ঘরে প্রবেশ করালেন, তখন ঘরের মধ্যে আনসারী কিছু সংখ্যক নারী ছিল। তারা বলল, 'আলাল খাইরি অলবারাকাহ, অআলা খাইরি তায়ির। অর্থাৎ- তোমার বিবাহ কল্যাণ ও বরকতময় হোক এবং ভাগ্য হোক মঙ্গলময়। (বুখারী, ৯/১৮২; মুসলিম, ৪/১৪১; বাইহাকী, ৭/১৪৯)
第四 হাদীস : আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত যে, যখন কোন ব্যক্তি বিবাহ করত তখন নবী করীম তার জন্য দোয়া করে বলতেন- বারাকাল্লাহু লাকা, অবারাকা আলাইকা, অজামাআ বাইনাকুমা ফী খাইর। অর্থাৎ- আল্লাহ তোমাকে ও তোমার উপর বরকত দিন আর তোমাদের মাঝে আরও উত্তম সম্পর্ক গড়ে উঠুক। (আবু দাউদ, ১/৩৩২; তিরমিযী, ২/১৭১; ইবনু মাজাহ, ১/২৮৯)
📄 রিফ্ ও বানীন এটা জাহিলী যুগের অভিনন্দন
স্বাগত জানানোর জন্য রিফা ও বানীন বলবে না, যেমন যারা না জানে তারা করে থাকে। কেননা এটা জাহিলী যুগের কাজ, এ বিষয়ে অনেক হাদীসে নিষেধ করা হয়েছে।
হাসান থেকে বর্ণিত আছে, আকীল ইবনে আবু তালিব জাশামের এক নারীকে বিবাহ করলেন। তার লোকজন ঘরে প্রবেশ করলেন। তারা বলল: রিফা ওয়াল বানীন। তিনি তখন বললেন, এ কাজ করো না। কেননা, নবী করীম এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন। তারা বলল: তাহলে আমার কি বলব, হে আবু যায়েদ? তিনি বললেন, তোমার বলবে- বারাকাল্লাহু লাকুম, অবারাকা আলাইকুম। অর্থাৎ- আল্লাহ তোমাদেরকে এবং তোমাদের উপর বরকত দিন। আমাদেরকে এরূপই আদেশ করা হতো। (ইবনে মাজাহ, ১/৫৮৯; নাসাঈ, ২/৯১; বাইহাকী, ৭/১৪৮)
📄 নববধু অন্যান্য পুরুষদের সেবা করতে পারবে
নববধূ নিজেই দাওয়াতকৃত অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের খিদমত করতে পারবে, এতে কোন অসুবিধা নেই। যখন সে পর্দানশীলা ও ফেতনা থেকে মুক্ত থাকবে। যা সাহাল বিন সা'দ এর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
সাহল ইবনে সা'দ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন আবু উসাইদ আস সায়াদী বিবাহ করলেন, তখন তিনি নবী করীম এবং তাঁর সাহাবীদেরকে দাওয়াত দিলেন। তিনি তাদের জন্য কোন খাবার প্রস্তুত করলেন না এবং তাদের নিকট তিনি কিছু এগিয়ে দিলেন না। কিন্তু তাঁর স্ত্রী উম্মু উসাইদ যা কিছু করলেন। তিনি রাতে পাথরের এক পাত্রে খেজুর ভিজিয়ে ছিলেন। যখন নবী করীম খাওয়া সমাপ্ত করলেন তখন অনুষ্ঠানে নিজ হাতে তিনি তাঁকে আপ্যায়ন করেন এবং তিনি তাঁকে পান করান। (তার স্ত্রী উন্মু উসাইদ সেদিন তাদের সেবিকা ছিলেন এবং তিনিই ছিলেন নববধূ)। (বুখারী, ৯/২০০, ২০৫, ২০৬; মুসলিম, ৬/১০৩; ইবনু মাজাহ, ৫৯০-৫৯১)
📄 বিবাহ অনুষ্ঠানে গান করা ও দফ বাজানো
কেবলমাত্র দফ বা তবলা বাজিয়ে বিবাহের ঘোষণা করার জন্য নারীদেরকে অনুমতি দেয়া জায়েয এবং ঐ সব গান করা জায়েয যাতে সৌন্দর্যের বর্ণনা ও নির্লজ্জকর কোন কথা নেই। এ বিষয়ে অনেক হাদীস আছে।
প্রথম হাদীস: রুবাই বিনতে মু'আওবিষ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমার জন্য যখন বাসর সাজানো হল নবী করীম প্রবেশ করলেন। তিনি আমার বিছানায় উপবিষ্ট হলেন। তুমি যেভাবে আমার নিকট বসেছ (উদ্দেশ্য তার নিকট থেকে বর্ণনাকারীর) আমাদের বাচ্চারা দফ বা তবলা বাজাতে লাগল। আমাদের যে বাপ-দাদারা উহুদে মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের শোকগাথা গুণকীর্তন করতে লাগল। এর মধ্যে তাদের একজন বলল: আমাদের মাঝে এমন নবী বিদ্যমান রয়েছেন, যিনি আগামীকাল কি হবে তা জানেন। তখন নবী করীম বললেন, এ কথা বাদ দাও এবং যা প্রথমে বলতে ছিলে তা বল। (বুখারী, ২/৩৫২, ১/১৬৬-১৬৭; বাইহাকী, ৭/২৮৮)
দ্বিতীয় হাদীস: আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি এক নারীকে আনসারী এক ব্যক্তির বাসর ঘরে প্রেরণ করলেন। নবী করীম বললেন, হে আয়েশা! তোমাদের কি বিনোদন করার মতো কিছু নেই, কেননা আমোদ-প্রমোদ বিনোদন আনসারীদেরকে আনন্দিত করে। (বুখারী, ৯/১৮৪-১৮৬; বাইহাকী, ৭/২৮৮)
অন্য এক বর্ণনায় আছে এ শব্দে: "তখন তিনি বললেন, তুমি কি তার সাথে বালিকা প্রেরণ করেছ যারা দফ বাজাবে ও গান করবে? আমি বললাম, সে কি বলবে? তিনি বললেন, সে বলবে: আমরা তোমাদের নিকট এসেছি, আমরা তোমাদের নিকট এসেছি, অতএব আমরা স্বাগতম জানাচ্ছি, আমরা তোমাদেরকে স্বাগতম জানাচ্ছি। যদি লাল স্বর্ণ না হতো তাহলে তোমাদের নিকট বেদুঈন নারীগণ আসত না। আর যদি পিঙ্গল বর্ণ গম না হতো তোমাদের নিকট কুমারী নারীগণ মোটা হতো না। (ত্ববরানী যাওয়ায়িদাহ ১/১৬৭/১)
অন্য এক বর্ণনায় আছে- আয়েশা সিদ্দীকা (রা) থেকে আরো বর্ণিত যে, নবী করীম লোকজনকে বিবাহ অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করতে শুনলেন তারা বলছিল : তাকে বহু সংখ্যক ভেড়া উপহার দেয়া হয়েছে যে সব ভেড়া প্রশস্ত বাগানে বাস করে। তোমার প্রেমিক মজলিসে যিনি আগামীকালের সংবাদ রাখেন। অপর বর্ণনায় রয়েছে : তোমার স্বামী মজলিসে যিনি আগামীকালের সংবাদ রাখেন। আয়েশা (রা) বলেন, রাসূলে করীম বললেন, আগামীকাল কি হবে তা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউই জানে না। (হাকিম, ২/১৮৪-৪৮৫; বাইহাকী, ৭/২৮৯)
চতুর্থ হাদীস: আমের ইবনে সা'দ বাজালী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি কুরযাহ ইবনে কা'ব ও আবূ মাসউদের কাছে গেলাম এবং তিনি তৃতীয় ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। আলী (রা) চলে গেল এবং বালিকারা গেল দফ বাজানো এবং গান করার উদ্দেশ্যে। আমি বললাম, আপনারা মুহাম্মাদ ﷺ-এর সাহাবী হওয়া সত্ত্বেও এগুলোকে সমর্থন করেন? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, নিশ্চয় তিনি বিবাহ অনুষ্ঠানে এবং বিপদের সময় কান্নাকাটি করার অনুমতি দিয়েছেন। অপর বর্ণনায় আছে: "মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ না করে 'কান্নাকাটি করা অনুমতি দিয়েছেন'।” (নাসাঈ, ২/৯৩; আবু দাউদ, ১২২১ নং)
পঞ্চম হাদীস: আবূ বালজ ইয়াহইয়া ইবনে সুলাইম বলেছেন: আমি মুহাম্মদ বিন হাতিবকে বললাম, আমি দু'জন নারীকে বিবাহ করেছি তাদের কোন একটিতে কোন শব্দ ছিল না। অতঃপর মুহাম্মদ বিন হাতিব (রা) বললেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন: দফ বা তবলা বাজানোর শব্দ হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য করে। (নাসাঈ, ২/৯১; তিরমিযী, ২/১৭০)
ষষ্ঠ হাদীস: তোমরা বিবাহ অনুষ্ঠান প্রচার করো। (তাবরানী, ৬৯/১/১)