📄 ওলিমাহ (বৌভাত) বা বিবাহ উপলক্ষে খাবারের ব্যবস্থা করা ওয়াজিব
অবশ্যই সহবাসের পর ওলিমাহ (বৌভাত) করতে হবে। আব্দুর রহমান বিন আওফকে ওলিমার ক্ষেত্রে রাসূলে করীম ﷺ-এর আদেশের কারণে, যা সামনে আসছে এবং বুরাইদাহ বিন হুসাইব-এর হাদীসের বাস্তব দলীল।
বুরাইদাহ ইবনে হুসাইব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী (রা) যখন ফাতিমা (রা)-কে বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "অবশ্যই নববধূর জন্য ওলিমা বা বৌভাতের আয়োজন করতে হবে।" বর্ণনাকারী বলেন, সা'দ বললেন, আমার একটি মেষ বা ভেড়া আছে, অমুক ব্যক্তি বলল : আমার ভুট্টার অমুক অমুক বস্তু আছে। অন্য বর্ণনায় আছে। আনসারদের ভূট্টার পিশা ছাতু তার ওলীমার বৌভাতের জন্য জমা করলেন। (মুসনাদে আহমদ, ৫/৩৫৯; ত্ববরানী, ১/১১২/১)
📄 ওলীমার সুন্নাত বিষয়াদি
বৌভাতের আয়োজনের ক্ষেত্রে কতিপয় বিষয়াদির প্রতি খেয়াল রাখা আবশ্যক।
প্রথম বিষয় : সহবাসের পর তিন দিন পর্যন্ত ওলীমাহ বা বৌভাতের স্থায়ীত্ব থাকবে। কেননা, এটা নবী করীম থেকে বর্ণিত। আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন : রাসূলে করীম এক স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করলেন। অতঃপর আমাকে সাহাবাদের নিকট পাঠালেন। আমি কতিপয় সাহাবীকে ওলীমাহ বা বৌভাত খাওয়ার জন্য দাওয়াত দিলাম। (বুখারী, ৯/১৮৯-১৯৪; বাইহাকী, ৭/২৬০)
আনাস বিন মালেক (রা) থেকে আরও বর্ণিত হাদীস আছে, তিনি বলেন, নবী করীম সাফিয়্যাকে বিবাহ করলেন এবং তার মুক্তিপণ হিসেবে তার মোহর নির্ধারণ করলেন এবং তিনদিন পর্যন্ত ওলীমাহ (বৌভাত) খাওয়ালেন। (বুখারী, ৭/৩৮৭; ফতহুলকাবীর, ৯/১৯৯)
দ্বিতীয় বিষয় : ওলীমার জন্য সৎব্যক্তিদের যেন দাওয়াত দেয়া হয়। চাই তারা গরীব হোক বা ধনী হোক। নবী করীম ﷺ এর বাণীর ভিত্তিতে বলা যায়- "তুমি কেবলমাত্র ঈমানদার ব্যক্তির সাথী হবে, আর তোমার খাবার খাবে কেবলমাত্র পরহেযগারী ব্যক্তি।" (আবু দাউদ, তিরমিযী, আহমদ, ৩/৩৮)
তৃতীয় বিষয়: একটি ছাগল বা তার বেশি ছাগল দ্বারা ওলীমাহ (বৌভাত) খাওয়াবে যদি সক্ষম হয়। এর প্রমাণ নিচের হাদীস। আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আব্দুর রহমান বিন আওফ মদিনায় আসলেন। অতঃপর রাসূলে করীম ﷺ তাঁর মধ্যে এবং সা'দ বিন রাবী আনসারীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করলেন। সা'দ তাঁকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং খাবার খাওয়ার জন্য আহ্বান করলেন এবং তাঁরা উভয়ে আহার করলেন। সা'দ তাকে বললেন, হে আমার ভাই! আমি মদীনার এক বড় ধনী। অন্য বর্ণনায় আছে, আনসারদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। কাজেই আমার অর্ধেক মাল দেখ এবং তা নিয়ে নাও। অন্য বর্ণনায় আছে, আমার বাগানে এসো আমি তোমাকে তার অর্ধেক প্রদান করব। আমার দু'জন স্ত্রী আছে, আর তুমি আল্লাহর ইচ্ছায় আমার ধর্মীয় ভাই, তোমার কোন স্ত্রী নেই কাজেই তুমি লক্ষ্য কর কোন স্ত্রী তোমার নিকট প্রিয়, তার নাম আমার নিকট বল, আমি তাকে তালাক দিয়ে দিব। অতঃপর তার যখন ইদ্দত শেষ হবে তখন তুমি তাকে বিবাহ করবে। অতঃপর আব্দুর রহমান (রা) বললেন, কখনো না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তোমার পরিবারে এবং সম্পদে বরকত দিন, তুমি আমাকে বাজার দেখিয়ে দাও। অতঃপর সে তাকে বাজার দেখিয়ে দিল। সে বাজারে গেল এবং ক্রয়-বিক্রয় করল এবং অনেক লাভবান হল। অতঃপর পরের দিন বাজারে গেল এবং কিছু পনির ও ঘি নিয়ে আগমন করল যা বিক্রয়ের পর বাকী রয়েছে এবং বাড়ির মালিকের নিকট তা নিয়ে আসল। এভাবে সে কিছুদিন সেখানে অবস্থান করল। অতঃপর সে একদিন রাসূলে করীম-এর নিকট তাঁর কাপড়ে জাফরানের দাগ সহকারে আগমন করল। অন্য বর্ণনায় আছে, এক ধরনের সুগন্ধী খালুকের দাগ নিয়ে আসল। রাসূলে করীম ﷺ তাঁকে বললেন, কি ব্যাপার তোমার নিকট এটা কি দেখছি? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আনসারী এক নারীকে বিবাহ করেছি। নবী করীম বললেন, তুমি কি মোহর দিয়েছ? তিনি বললেন, আঁটি পরিমাণ সোনা মোহর হিসেবে দিয়েছি। নবী করীম বললেন, আল্লাহ তোমার প্রতি বরকত দান করুন। ওলীমার আয়োজন কর যদিও একটি ছাগল হয়। তিনি তা অনুমতি দিলে আব্দুর রহমান (রা) বলেন, অবশ্য আমাকে লক্ষ্য করেছি আমি যদি পাথরও উঠাতাম তাহলেই সোনা ও রূপা পাওয়ার আশা করতাম। আনাস বিন মালেক (রা) বললেন, আমি তাঁর মৃত্যুর পর দেখেছি তাঁর প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য এক লক্ষ দিনার করে বণ্টন করা হয়েছিল। (বুখারী, ৪/২৩২ ও ৯/৯৫ ও ১৯০/১৯২; নাসাঈ, ২/৯৩)
আনাস বিন মালেক (রা) থেকে আরও বর্ণিত, রাসূলে করীম যায়নাবের জন্য যা ওলীমাহ বা বৌভাতের আয়োজন করেছেন আমি তাঁর স্ত্রীদের কোন স্ত্রীর ওলীমাহ থেকে তা করতে দেখিনি। তিনি একটি বকরী যবেহ করলেন এবং তাঁদেরকে রুটি গোশত খাওয়ালেন এমনকি তাঁরা তাঁকে ছেড়ে গেলেন। (বুখারী, ৭/১৯২; মুসলিম, ৪/১৪৯)
📄 গোশত ব্যতীত ওলীমাহ করা জায়েয
যে কোন সাধারণ খাবার দ্বারা ওলীমাহ অনুষ্ঠান পালন করা জায়েয আছে। যদিও তাতে গোশতের কোন ব্যবস্থা না থাকে।
আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন: "মদীনা ও খায়বারের মাঝখানে নবী করীম তিনদিন অবস্থান করলেন, তখন তাঁর জন্য বিবি সফীয়াকে দিয়ে বাসর ঘর নির্মাণ হয়েছিল। আমি মুসলমানদেরকে তার ওলীমাতে (বৌভাতের) দাওয়াত দিলাম। সে ওলীমাতে রুটি এবং গোশত ছিল না। চামড়ার দস্তরখানে যা একত্র করতে বলেছিলেন তা ছাড়া। তা আমি বিছিয়ে ছিলাম। (অপর বর্ণনায় আছে, আমি একটু সমতল স্থান খুঁজলাম, একটি চামড়ার দস্তখান আনা হল আর তা আমি সে সমতল ভূমিতে রাখলাম, জনগণ তাতে খেজুর, ঘি ফেলল (অতঃপর মানুষ তৃপ্তি করে আহার করল)। (বুখারী, ৭/৩৮৭; মুসলিম, ৪/১৪৭)
📄 ধনীদের নিজস্ব মাল দ্বারা ওলীমাতে অংশগ্রহণ করা
ওলীমা অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন করার জন্য জনগণ তাদের মাল দ্বারা অংশগ্রহণ করা মুস্তাহাব। সফীয়ার সাথে রাসূলে করীম ﷺ এর বিবাহের ঘটনা সংক্রান্ত আনাস বিন মালেকের হাদীস দ্বারা এটা সাব্যস্ত হয়।
আনাস বিন মালেক (রা) থেকে নবী করীম-এর স্ত্রী সফীয়াহ এর ঘটনা প্রসঙ্গে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, যখন তিনি রাস্তায় ছিলেন সফীয়াহকে তার জন্য উন্মু সুলাইম প্রস্তুত করলেন অর্থাৎ সাজালেন এবং তাঁকে রাতে তাঁর নিকট প্রেরণ করলেন। নবী করীম বাসর ঘরেই সকাল অতিবাহিত করলেন। এরপর তিনি বললেন, যার নিকট কিছু খাবার আছে সে যেন তা নিয়ে আসে। অপর এক বর্ণনায় আছে- যার নিকট অতিরিক্ত খাবার মজুদ আছে সে যেন তা আমাদের নিকট নিয়ে আসে। আনাস (রা) বিন মালেক বলেন, তিনি একটি দস্তরখানা বিছালেন। তখন কেউ কেউ পনির নিয়ে আসল, কেউ কেউ খেজুর নিয়ে আসল, আবার কেউ ঘি নিয়ে আসল। সব দিয়ে তারা হাইস (খেজুর, পনির ও ঘি মিশ্রিত খাবার) বানালো। (তারা সে হাইস আহার করতে লাগল এবং তাদের পাশের বৃষ্টির পানি হাউজ থেকে পান করতে লাগলেন) আর এটাই ছিল রাসূলে করীম-এর ওলীমাহ। (বুখারী, মুসলিম ও আহমদ, ৩/১০৩, ১৯৫)