📄 স্বামী-স্ত্রী উভয় একসাথে সালাত আদায় করা
আর মুস্তাহাব কাজ হলো যে, তারা উভয়ে এক সাথে দুই রাক'আত সালাত আদায় করবে। কেননা এটা সালাফ থেকে বর্ণিত আছে। আর এ বিষয়ে দু'টি হাদীস বর্ণিত আছে।
প্রথম হাদীস: আবূ উসাইদের মাওলা আবূ সাঈদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি দাস অবস্থায় বিবাহ করলাম। অতঃপর নবী করীম ﷺ-এর সাহাবীদের (রা) একটি ছোট দলকে আমন্ত্রণ করলাম। তাদের মধ্যে ইবনে মাসউদ, আবূ যার এবং হুযাইফা (রা) হাজির ছিলেন। তিনি বলেন, সালাতের ইক্কামাত দেয়া হল। তিনি বলেন, অতঃপর আবূ যার সামনে যেতে আরম্ভ করলেন, অতঃপর তাঁরা বললেন, সাবধান! যাবেন না। তিনি বললেন, অনুরূপ কি? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, আমি তাদের সামনে গমন করলাম। অথচ আমি ছিলাম একজন দাস। অতঃপর তাঁরা আমাকে উপদেশ দিয়ে বললেন, যখন তোমার স্ত্রী তোমার নিকট আসবে তখন দুরাক'আত সালাত আদায় করবে। তারপর তোমার নিকট যে প্রবেশ করেছে আল্লাহর নিকট তার কল্যাণ কামনা করবে এবং তার যাবতীয় অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে। তারপর তোমার ও তোমার স্ত্রীর বিষয়।
দ্বিতীয় হাদীস: শাকীক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি আসল, তাকে আবূ হুরাইয বলে সম্বোর্ডন করা হতো। তারপর তিনি বলেন, আমি একজন যুবতী কুমারী নারীকে বিবাহ করেছি। আর আমি আশংকা করছি যে, সে আমাকে সন্তুষ্টি করতে পারবে না। তারপর আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বললেন, নিশ্চয় বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর ক্রোধ অসন্তুষ্টি শয়তানের পক্ষ থেকে। শয়তান ইচ্ছা করছে যে, আল্লাহ তোমাদের জন্য যা জায়েয করেছেন তা সে তোমাদের নিকট ঘৃণা সৃষ্টি করবে। কাজেই সে যখন তোমার নিকট আগমন করবে তখন তাকে জামা'আত সহকারে তোমার পেছনে দু' রাক'আত সালাত আদায় করতে আদেশ করবে। ইবনে মাসউদ (রা)-এর অন্য এক বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, তিনি বলেছেন, তুমি বল- আল্লাহুম্মা বারিক লী ফী আহলী, অবারিক লাহুম ফীয়্যা। আল্লাহুম্মাজ মা' বাইনানা মা জামা'তা বিখাইরিন, অফাররিক বাইনানা ইজা ফাররাক্বতা ইলা খাইরিন। অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমার জন্য আমার পরিবারে বরকত দান করুন এবং তাদের স্বার্থে আমার মাঝে বরকতময় করে দিন। হে আল্লাহ! আপনি যা ভালো একত্রিত করেছেন তা আমাদের মাঝে একত্রিত করুন। আর যখন মঙ্গলের দিকে বিচ্ছেদ করবেন তখন আমাদের মাঝে বিচ্ছেদ করুন। (তাবরানী, ৩/১২/২)
📄 সহবাসের সময় পঠিত দোয়া
স্বামী-স্ত্রী যখন সহবাস করবে তখন তার জন্য এ দোয়া বলা আবশ্যক।
বিসমিল্লাহি, আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইতানা, অজান্নিবিশ শাইতানা মা রাজাক্বতানা।
রাসূলে করীম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা'আলা যদি তাদের মাঝে সন্তান সৃষ্টি করার ফয়সালা করেন, তাহলে শয়তান তাকে কখনো কোনরূপ ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। (সহীহ বুখারী, ৯/১৮৭)
📄 সহবাস করার নিয়মাবলী
স্বামীর জন্য জায়েয হলো, সে তার স্ত্রীর সম্মুখভাগে যে দিক দিয়ে চায় সামনে বা পেছনের দিক দিয়ে সহবাস করবে। আল্লাহ তা'আলার বাণীর আলোকে- "তোমাদের স্ত্রীরা হল তোমাদের জন্য শষ্যক্ষেত্র। তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার করো।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২২৩)
আর এ বিষয়ে অনেক হাদীস রয়েছে। নিম্নে দু'টি উপস্থাপন করা হলো- প্রথম হাদীস: জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইয়াহুদীরা বলতো, যদি স্বামী স্ত্রীর পেছন দিক দিয়ে তার সম্মুখভাগে সহবাস করে তাহলে সন্তান ট্যারা হবে। অতঃপর আলোচ্য আয়াতটি নাযিল হয়। নবী করীম ﷺ তারপর বললেন, সম্মুখ ও পেছন উভয় দিক দিয়ে করা যাবে যদি তা লজ্জাস্থান হয়। (বুখারী, ৮/১৫; মুসলিম, ৪/১৫৬; নাসাঈ, ৭৬/১-২)
দ্বিতীয় হাদীস: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আনসারী মূর্তি পূজকদের এ সম্প্রদায়টি ইয়াহুদী আহলে কিতাবদের এ সম্প্রদায়ের সাথে একত্রে বসবাস করত। আর আনসারগণ জ্ঞানের দিক দিয়ে ইয়াহুদীদেরকে অনেক ক্ষেত্রেই অনুসরণ করত। আর আহলে কিতাবদের একটি অভ্যাস ছিল যে, তারা শুধুমাত্র তাদের স্ত্রীদের এক দিক দিয়েই সহবাস করত। আর স্ত্রী তার দ্বারা সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হতো। কাজেই আনসারদের এ সম্প্রদায়টি ইয়াহুদীদের ঐ কাজটি গ্রহণ করেছিল। আর কুরাইশদের এ সম্প্রদায় তাদের নারীদেরকে নিকৃষ্টভাবে খোলামেলা (সহবাস) করত এবং তাদেরকে সম্মুখ দিয়ে, পেছন দিয়ে, চীৎ করে উপভোগ করত। অতঃপর মুহাজিরগণ যখন মদীনায় আসলেন, তখন একজন কুরাইশ ব্যক্তি আনসারী এক নারীকে বিবাহ করলেন। সে তার স্ত্রীর নিকট তাদের নিয়মে কাজ করলেন। কিন্তু নারী তা নিকৃষ্ট মনে করলেন এবং বললেন, আমাদেরকে শুধুমাত্র একদিক দিয়েই সহবাস করা হয়। কাজেই তুমি তা-ই কর নতুবা আমার থেকে দূরে থাক। তার এ বিষয়টি এমন আকার ধারণ করল যে, শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট পৌঁছাল। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতটি নাযিল করলেন "তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য ক্ষেতস্বরূপ, তোমরা যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পার"। (সূরা আল-বাকারা ১২৩) অর্থাৎ, সম্মুখ করে, পেছনে করে ও চীৎ করে। মূল উদ্দেশ্য তার দ্বারা সন্তান হওয়ার স্থান যেন হয়। (আবু দাউদ, ১/১৩৭; বায়হাকী, ৭/১৯৫)
📄 স্ত্রীলোকের পেছন দিক দিয়ে সহবাস করা হারাম
এ হাদীসগুলো আর পূর্ব আয়াতের অর্থানুযায়ী স্ত্রীর নিতম্বে সহবাস করা হারাম। "তোমাদের জন্য ক্ষেতস্বরূপ, তোমরা যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারো"। আর এ বিষয়ে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত আছে।
প্রথম হাদীস: উম্মু সালামাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেন, মুহাজিরগণ যখন মদীনায় আনসারদের নিকট আসলেন তখন তাদের নারীদেরকে বিবাহ করলেন। আর মুহাজির নারীরা চীৎ হতো। কিন্তু আনসারী নারীগণ চীৎ হতো না। একদা এক মুহাজির ব্যক্তি তার আনসারী স্ত্রীকে এরূপ ইচ্ছা করল, কিন্তু সে আল্লাহর রাসূলকে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত তা করতে অস্বীকৃতি জানাল। উম্মু সালামাহ বলেন, সেই নারী রাসূলে করীম ﷺ-এর নিকট আসল, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করল। তাই উম্মে সালামাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর আয়াতটি নাযিল হয়। তিনি বললেন না, কেবলমাত্র একই রাস্তায় সহবাস করা যাবে। (মুসনাদে আহমদ, ৬/৩০৫/৩১০-৩১৮; মিরমিযী, ৩/৭৫)
দ্বিতীয় হাদীস: আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) রাসূলে করীম-এর নিকট হাজির হলেন। অতঃপর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধ্বংস হয়ে গেছি! নবী করীম জানতে চাইলেন, তোমাকে কিসে ধ্বংস করল? তিনি বললেন, আমি রাতে আমার সওয়ারী পরিবর্তন করেছি। রাসূলে করীম কোন জবাব দিলেন না। অতঃপর রাসূলে করীম-এর নিকট আলোচ্য আয়াত নাযিল হল। তিনি বললেন, সামনে কর, পেছনে কর, কিন্তু নিতম্ব ও ঋতুস্রাব থেকে বেঁচে থাক। (নাসাঈ আল ইশরাহ, ৭৬/২, তিরমিযী, ২১৬২)
তৃতীয় হাদীস: খুযাইমাহ বিন সাবিত (রা) থেকে বর্ণিত, নিশ্চয় এক ব্যক্তি নবী করীম ﷺ-কে নারীদের নিতম্বে সহবাস করা প্রসঙ্গে বা পুরুষ নারীর নিতম্বে সহবাস করা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করল। নবী করীম জবাব দিলেন যে, জায়েয। অতঃপর যখন সে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করল, নবী করীম তাকে ডাকলেন। বা তাকে ডাকার আদেশ করলেন, সুতরাং তাকে ডাকা হল। নবী করীম বললেন, তুমি কেমন বললে, কোন দুই ছিদ্রতে- পেছন থেকে সম্মুখে হ্যাঁ এটা জায়েয, না পেছনে থেকে পেছনে, না বৈধ না। নিশ্চয় আল্লাহ সত্য-এর ব্যাপার লজ্জাবোধ করেন না। তোমারা নারীদের নিতম্বে সহবাস থেকে বিরত থাক। (ইমাম শাফেয়ী, ২/২৬০; বাইহাকী, ৭/১৯৬; দারেমী, ১/১৪৫ এবং ত্বহাবী, ২/২৫; ইমাম খাত্তাবী গরীবুল হাদীস, ৭৩/২ পৃষ্ঠা)
চতুর্থ হাদীস: যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর নিতম্বে সহবাস করবে আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না। (নাসাঈ আল ইশরাহ, ২/৭৭-৭৮/১; মিরমিযী, ১/২১৮)
পঞ্চম হাদীস: যে ব্যক্তি স্ত্রীদের নিতম্বে সহবাস করবে সে লা'নত প্রাপ্ত। (আবু দাউদ ২১৬২ নং এবং আহমদ, ২/৪৪৪ ও ৪৭৯)
ষষ্ঠ হাদীস: যে ব্যক্তি হায়েযাবস্থায় বা স্ত্রীর নিতম্বে সহবাস করে অথবা কোন জ্যোতিষের নিকট আসে, অতঃপর তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, তাহলে মুহাম্মদ ﷺ এর ওপর যা নাযিল হয়েছে তা সে অস্বীকার করল।