📘 কুরআন ও হাদীসের মানদণ্ডে সূফীবাদ 📄 হুলুল এবং ওয়াহদাতুল উজুদ

📄 হুলুল এবং ওয়াহদাতুল উজুদ


সুফীদের যে সমস্ত ইসলাম বিরোধী আকীদাহ রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টি আকীদাহ (বিশ্বাস) হচ্ছে عقيدة الحلول والاتحاد আকীদাতুল হুলুল ওয়াল ইত্তেহাদ।

সুফীদের কতিপয় লোক হুলুল তথা সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর অবতরণে বিশ্বাস করে। হুলুল-এর সংজ্ঞায় আলেমগণ বলেনঃ হুলুল এর তাৎপর্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর কতিপয় সৃষ্টির মধ্যে অবতরণ করেন এবং তার সাথে মিশে একাকার হয়ে যান। যেমন খৃষ্টানদের ধারণা যে, ঈসা ইবনে মারইয়ামের মাধ্যমে স্বয়ং আল্লাহ অবতরণ করেছিলেন। সুফীদের কতিপয় লোকের বিশ্বাস হচ্ছে প্রখ্যাত সুফী সাধক মানসুর হাল্লাজ এবং অন্যান্য কতিপয় সুফী সাধকের মধ্যে আল্লাহ অবতরণ করেছেন। নাউযুবিল্লাহ। এটি যে একটি কুফরী বিশ্বাস তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ "তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বুঝে নি। কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোতে এবং আসমানসমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। তিনি পবিত্র। আর এরা যাকে শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক উর্ধ্বে।" (সূরা যুমারঃ ৬৭)

মানসুর হাল্লাজকে তার যুগের খলীফা চারটি কারণে হত্যা করেনঃ
১) আনাল হক্ক বলার কারণে তথা রুবুবীয়াত ও উলুহীয়াতের দাবী করার কারণে।
২) ইসলামী শরীয়তে নিষিদ্ধ যাদু চর্চা করার কারণে।
৩) শরীয়তের ফরজ বিষয়সমূহ অস্বীকার করার কারণে। মানসুর হাল্লাজ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি হজ্জ করতে চাইলে সে যদি তার বাড়িতে একটি ঘর নির্মাণ করে হজ্জের মৌসুমে তার তাওয়াফ করে তাতেই যথেষ্ট হবে।
৪) কারামেতা তথা বাতেনী সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানানোর কারণে। কারামেতা সম্প্রদায় প্রকাশ্যে ইসলামের কথা বললেও তারা ছিল মূলতঃ গোপনে অগ্নিপূজক। এই সম্প্রদায় ৩১৯ হিজরী সালে কাবা ঘরে হামলা চালিয়ে হাজীদেরকে অকাতরে হত্যা করেছিল, যমযম কূপ ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং হাজরে আসওয়াদ চুরি করে নিয়েছিল। ২০ বছর পর্যন্ত মুসলিমগণ হাজরে আসওয়াদ বিহীন কাবা ঘরের তাওয়াফ করেছে।

অপর পক্ষে সুফীদের আরেক দল ওয়াহদাতুল উজুদে বিশ্বাসী। ওয়াহদাতুল উজুদের এর তাৎপর্য হচ্ছে সৃষ্টি এবং স্রষ্টা একই জিনিষ। অর্থাৎ সৃষ্টিজীব এবং আল্লাহ তা'আলার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, উভয়ই এক ও অভিন্ন। ইবনে আরাবী এ মতেরই সমর্থক ছিল। তার মতে পৃথিবীতে যা আছে সবই মাবুদ। অর্থাৎ সবই সৃষ্টি এবং সবই মাবুদ। এ অর্থে কুকুর, শুকর, বানর এবং অন্যান্য নাপাক সৃষ্টিও মাবুদ হতে কোন বাধা নেই। সুতরাং তার মতে যারা মৃতি পূজা করে তারা আল্লাহরই এবাদত করে। (নাউযুবিল্লাহ)

ইবনে আরাবীর মতেঃ পরিপূর্ণ মারেফত হাসিলকারীর দৃষ্টিতে আল্লাহর এবাদত ও মূর্তিপূজা একই জিনিস। ইবনে আরাবী তার কবিতায় বলেনঃ বান্দাই প্রভু আর প্রভুই বান্দা। আফসোস যদি আমি জানতাম, শরীয়তের বিধান কার উপর প্রয়োগ হবে। যদি বলি আমি তাঁর বান্দা তাহলে তো ঠিকই। আর যদি বলি আমিই রব তাহলে শরীয়ত মানার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? উপরোক্ত কারণ এবং আরও অসংখ্য কারণে আলেমগণ ইবনে আরাবীকে গোমরাহ বলেছেন। সৃষ্টি এবং স্রষ্টা কখনই এক হতে পারে না। আল্লাহ ব্যতীত বাকী সকল বস্তু হচ্ছে সৃষ্টি।

আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ "তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের আদি স্রষ্টা। কিরূপে আল্লাহ্র পুত্র হতে পারে, অথচ তার কোন সঙ্গিনী নেই? তিনি যাবতীয় কিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি সব বস্তু সম্পর্কে সুবিজ্ঞ। (সূরা আনআমঃ ১০১) কুরআন ও সহীহ হাদীসে দিবালোকের মত পরিস্কার করে বলা আছে যে, মহান আল্লাহ আরশের উপরে সমুন্নত, তার গুণাগুণ সৃষ্টি জীবের গুণাবলী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের বিরাট সংখ্যক মুসলিম ওয়াহদাতুল উজূদে বিশ্বাসী। তাবলীগী নিসাব ফাযায়েলে আমাল বইয়ে গাঙ্গুহী তাঁর মোরশেদ হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজেরে মক্কীর খেদমতে লিখিত এক চিঠিতে বলেনঃ ------ অধিক লেখা বে-আদবী মনে করিতেছি। হে আল্লাহ! ক্ষমা কর, হজরতের আদেশেই এই সব লিখিলাম, মিথ্যাবাদী, কিছুই নই, শুধু তোমারই ছায়া, আমি কিছুই নই, আমি যাহা কিছু সব তুমিই তুমি। (দেখুনঃ ফাযায়েলে আমাল, দ্বিতীয় খণ্ড, ১৮৫ পৃষ্ঠা) এ কথাটি যে একটি কুফরী কথা তাতে কোন সন্দেহ নেই। আসুন আমরা এ বাক্যটির ব্যাপারে আরব বিশ্বের আলেমদের মূল্যায়ন জানতে চেষ্টা করি। তাদের কাছে উপরের বাক্যটি এভাবে অনুবাদ করে পেশ করা হয়েছিল।
অনুবাদটি শুনে তারা বলেছেনঃ এটি শির্ক ছাড়া অন্য কিছু নয়।

📘 কুরআন ও হাদীসের মানদণ্ডে সূফীবাদ 📄 উপরোক্ত ভ্রান্ত বিশ্বাসের খণ্ডন

📄 উপরোক্ত ভ্রান্ত বিশ্বাসের খণ্ডন


ইসলামের প্রধান দু'টি মূলনীতি এবং ইসলামী শরীয়তের দু'টি মূল উৎস কুরআন ও সহীহ হাদীসে সুস্পষ্ট ভাষায় আল্লাহর পরিচয়, গুণাগুণ এবং তাঁর অবস্থান উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে মহান রাব্বুল আলামীন নিজেই নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন এবং তাঁর রাসূলও অনেক সহীহ হাদীসে তাঁর পরিচয় বর্ণনা করেছেন। এ থেকে জানা যায় যে আল্লাহ তা'আলা আকাশে এবং আরশে আযীমের উপর সমুন্নত। বেশ কিছু আয়াত ও হাদীসে সরাসরি আরশের উপর সমুন্নত হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। আবার অনেক আয়াত ও হাদীসের মাধ্যমে আকাশের উপরে হওয়ার কথা জানা যায়। মূলতঃ উভয়ের মাঝে কোন দ্বন্দ্ব নেই। কেননা আল্লাহর আরশ হচ্ছে সাত আকাশের উপর।

📘 কুরআন ও হাদীসের মানদণ্ডে সূফীবাদ 📄 আল্লাহ তা'আলা আকাশের উপরে সমুন্নত হওয়ার দলীলসমূহ

📄 আল্লাহ তা'আলা আকাশের উপরে সমুন্নত হওয়ার দলীলসমূহ


আল্লাহ তা'আলা যে আকাশের উপরে আছেন, কুরআনে এর অনেক দলীল রয়েছে।

১) আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ "তোমরা কি নিরাপত্তা পেয়ে গেছো যে, আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদেরকেসহ ভূমিকে ধ্বসিয়ে দিবেন না? (সূরা মুল্কঃ ১৬)

২) আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেনঃ "তারা তাদের প্রতিপ্রতিপালককে ভয় করে, যিনি তাদের উপরে আছেন"। (সূরা নাহ্লঃ ৫০)

৩) আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেনঃ "তাঁরই দিকে পবিত্র বাক্যসমূহ আরোহণ করে এবং সৎকর্ম তাকে উন্নীত করে”। (সূরা ফাতিরঃ ১০)

৪) আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেনঃ "ফেরেশতা এবং রূহ (জিবরীল) তাঁর দিকে উর্ধ্বগামী হয়"। (সূরা মাআরেজঃ ৪)

৫) আল্লাহ তা'আলা আরও বলেনঃ "আল্লাহ্ তা'আলা আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সকল বিষয় পরিচালনা করেন”। (সূরা সিজদাহঃ ৫)

৬) আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেনঃ "যখন আল্লাহ বললেনঃ হে ঈসা!, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মৃত্যু দান করব। অতঃপর তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নিবো"। (সূরা আল-ইমরানঃ ৫৫) আল্লাহ্ তা'আলা উপরে আছেন- এ মর্মে আরো অনেক দলীল রয়েছে।

📘 কুরআন ও হাদীসের মানদণ্ডে সূফীবাদ 📄 আল্লাহ আসমানে সমুন্নত হওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত সহীহ হাদীসসমূহ

📄 আল্লাহ আসমানে সমুন্নত হওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত সহীহ হাদীসসমূহ


আল্লাহ্ তা'আলা উপরে আছেন- হাদীস শরীফে এ ব্যাপারে অগণিত দলীল রয়েছে।

১) আওআলের হাদীসে নবী বলেনঃ "তার উপর আল্লাহর আরশ। আর আল্লাহ্ আরশের উপরে। তিনি তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছেন"।

আওআলের হাদীসের বিস্তারিত বিবরণ এই যে, আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব বলেনঃ আমরা একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে খোলা ময়দানে বসা ছিলাম। তখন আমাদের মাথার উপর দিয়ে একটি মেঘখণ্ড অতিক্রম করার সময় তিনি বললেনঃ তোমরা কি জান এটি কী? আমরা বললামঃ এটি একটি মেঘের খণ্ড। অতঃপর তিনি বললেনঃ তোমরা কি জান আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানের দূরত্ব কতটুকু? আমরা বললামঃ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেনঃ উভয়ের মধ্যে রয়েছে পাঁচশত বছরের দূরত্ব। এমনি প্রত্যেক আকাশ ও তার পরবর্তী আকাশের মধ্যবর্তী দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশত বছরের পথ। এভাবে সপ্তম আকাশের উপর রয়েছে একটি সাগর। সাগরের গভীরতা হচ্ছে আকাশ ও যমীনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। সাগরের উপরে রয়েছে আটটি জংলী পাঁঠা। তাদের হাঁটু থেকে পায়ের খুর পর্যন্ত দূরত্ব আকাশ ও যমীনের মধ্যবতী দূরত্বের সমান। তারা আল্লাহর আরশ পিঠে বহন করে আছে। আরশ এত বিশাল যে, তার উপরের অংশ থেকে নীচের অংশের দূরত্ব হচ্ছে আকাশ ও যমীনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। আর আল্লাহ্ তা'আলা হচ্ছেন আরশের উপরে।

২) সা'দ বিন মুআয যখন বনী কুরায়যার ব্যাপারে ফয়সালা দান করলেন, তখন নবী তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ তুমি তাদের ব্যাপারে সেই ফয়সালা করেছো, যা সাত আসমানের উপর থেকে আল্লাহ্ তা'আলা করেছেন"।

৩) নবী একদা জনৈক দাসীকে বললেনঃ আল্লাহ্ কোথায়? দাসী বললঃ আকাশে। নবী তখন দাসীর মালিককে বললেনঃ তুমি তাকে মুক্ত করে দাও। কারণ সে মু'মিন"।

৪) আল্লাহ্ তা'আলা আকাশের উপরে। মি'রাজের ঘটনায় বর্ণিত হাদীসগুলো তার সুস্পষ্ট দলীল।

৫) পালাক্রমে ফেরেশতাদের দুনিয়াতে আগমণের হাদীসেও আল্লাহ্ তা'আলা আকাশের উপরে সমুন্নত হওয়ার দলীল রয়েছে। হাদীসের বিস্তারিত বিবরণ এই যে, নবী বলেনঃ "তোমাদের নিকট রাতে একদল ফেরেশতা এবং দিনে একদল ফেরেশতা পালাক্রমে আগমণ করে থাকে। তারা ফজর ও আসরের নামাযের সময় একসাথে একত্রিত হয়। অতঃপর তোমাদের কাছে যে দলটি ছিল, তারা উপরে উঠে যায়। মহান আল্লাহ জানা সত্ত্বেও তাদেরকে জিজ্ঞেস করেনঃ আমার বান্দাদেরকে কি অবস্থায় ছেড়ে এসেছ? তাঁরা বলেনঃ আমরা তাদেরকে নামায অবস্থায় ছেড়ে এসেছি এবং যখন তাদের কাছে গিয়েছিলাম, তখন তারা নামাযেই ছিল।

৬) নবী আরও বলেনঃ “যে ব্যক্তি বৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ হতে একটি খেজুর পরিমাণ সম্পদ দান করে, আর আল্লাহর নিকট তো পবিত্র ব্যতীত কোন কিছুই উর্ধ্বমুখী হয় না, আল্লাহ্ ঐ দান স্বীয় ডান হাতে গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি তা দানকারীর জন্য প্রতিপালন করতে থাকেন। যেভাবে তোমাদের কেউ নিজের ঘোড়ার বাচ্চাকে প্রতিপালন করে থাকে। শেষ পর্যন্ত ঐ দান পাহাড় সমতুল্য হয়ে যায়”।

৭) নবী আরও বলেনঃ "আল্লাহ তা'আলা যখন আকাশে কোন বিষয়ে ফয়সালা করেন, তখন ফেরেশতাগণ আল্লাহর উক্ত ফয়সালার প্রতি অনুগত হয়ে তাদের পাখাসমূহ এমনভাবে নাড়াতে থাকেন যার ফলে শক্ত পাথরে শিকল দিয়ে প্রহার করলে যে ধরণের আওয়াজ হয় সে রকম আওয়াজ হতে থাকে”। আল্লাহ তাআ'লা আকাশের উপরে আছেন বাতিল ফির্কা ব্যতীত কেউ তা অস্বীকার করেনি।

টিকাঃ
১- তিরমিজী, অধ্যায়ঃ কিতাবুত্ তাফসীর, মুসনাদে আহমাদ, (১/২০৬)। আলেমগণ হাদীছটি সহীহ ও যঈফ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। ইমাম ইবনে তাইমীয়া এবং তাঁর ছাত্র ইবনুল কাইয়্যেম হাদীছটি সহীহ বলেছেন। ইমাম তিরমিজী বলেনঃ হাদীছটি হাসান গরীব। ইমাম আলবানী হাদীছটিকে যঈফ বলেছেন। দেখুনঃ সিলসিলায়ে যঈফা, হাদীছ নং- ১২৪৭।
১ - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল মাগাযী।
২ - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল মাসাজিদ।
৩- বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুত তাওহীদ।
১ - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুত তাওহীদ, মুসলিম, অধ্যায়ঃ যাকাত।
২ - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুত তাফসীর।

ফন্ট সাইজ
15px
17px