📘 কুরআন হিফজ করবেন যেভাবে > 📄 ‘আয়াতে মুতাশাবিহাত’ (সাদৃশ্যপূর্ণ আয়াতসমূহ)-এর প্রতি বিশেষ মনোযোগ রাখা

📄 ‘আয়াতে মুতাশাবিহাত’ (সাদৃশ্যপূর্ণ আয়াতসমূহ)-এর প্রতি বিশেষ মনোযোগ রাখা


কুরআনুল কারিমের বহু আয়াতে পারস্পরিক সাদৃশ্য রয়েছে। কখনো কখনো এক সুরার কোনো আয়াতের সাথে অন্য সুরার আয়াতের শুধু একটি শব্দ, আবার কখনো শুধু একটি অক্ষরের পার্থক্য থাকে—আবার কখনো আয়াতগুলো হুবহুও মিলে যায়! শুরুতে ব্যাপারটি সহজই থাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে হিফজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার পর সেগুলোর পার্থক্যের দিকে খেয়াল না-রাখলে হাফেজদের জন্য তা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়...।
তাই আমি সতর্ক করে দেওয়া প্রয়োজন মনে করছি, কোনো আয়াত হিফজ করতে গিয়ে যদি মনে হয় যে একইরকম আয়াত গত মাসে বা গত বছরে আপনি হিফজ করেছেন, তাহলে সাথে সাথে সেই আয়াতটি বের করুন এবং দুই আয়াতকে সূক্ষ্মভাবে তুলনা করে পার্থক্যের জায়গাটি স্পষ্ট করুন। আর যদি তাফসিরের গ্রন্থ ঘাঁটাঘাঁটি করে এই সামান্য অমিলের মূল কারণ বের করতে পারেন, তাহলে তো আরও ভালো। সে-সকল গ্রন্থে অনেক সময় এই মিল-অমিলের কারণ স্পষ্ট আকারে পেয়ে যাবেন, আবার অনেক সময় চেষ্টা করেও আয়াতদ্বয়ের মাঝে পার্থক্যের হিকমত (সূক্ষ্ম কারণ) বের করতে পারবেন না। তবুও, এই দু-আয়াতের তুলনা ও তাফসির গ্রন্থের শরণাপন্ন হওয়া সর্বাবস্থায়ই আপনার জন্য উপকারী বলে বিবেচিত হবে।
আয়াতসমূহের সাদৃশ্যের কিছু উদাহরণ:
১. সুরা আনআমের একটি আয়াত (১৫১) হলো, ﴿وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِنْ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ﴾
এদিকে সুরা বনি ইসরাইলের একটি আয়াত (৩১) হলো, ﴿وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ﴾
আয়াত দুটিতে অনেকটা মিল থাকলেও উভয়ের মাঝে তিনটি পার্থক্য বিদ্যমান-
• প্রথম আয়াতের ﴿مِنْ﴾ এর পরিবর্তে দ্বিতীয় আয়াতে আছে ﴿خَشْيَةٌ﴾ শব্দটি।
• প্রথম আয়াতের ﴿نَرْزُقُكُمْ﴾ এর বদলে দ্বিতীয় আয়াতে আছে ﴿نَرْزُقُهُمْ﴾ শব্দটি।
• প্রথম আয়াতের ﴿إِيَّاهُمْ﴾ এর স্থলে দ্বিতীয় আয়াতে আছে ﴿إِيَّاكُمْ﴾ শব্দটি।
তাফসিরের গ্রন্থ খুললে এই অমিলের সূক্ষ্ম কারণ বুঝতে পারবেন। যথা,
প্রথম আয়াতে সুরা আনআমে আল্লাহ তাআলা বলছেন 'দারিদ্র্যের কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না'- অর্থাৎ তোমরা বর্তমানে দারিদ্র্য ভোগ করছ জানি, কিন্তু এরপরও তোমরা সন্তানদের হত্যা করো না। কেননা, আল্লাহ বর্তমান দুরবস্থায়ও তোমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করবেন, সাথে তোমাদের সন্তানদেরও রিজিক দেবেন। আল্লাহ বললেন, نَرْزُقُكُمْ﴾ অর্থাৎ আমি বর্তমান দুর্দশায় তোমাদের রিজিক দিচ্ছি; এরপর তিনি আরও বললেন, ﴾وَإِيَّاهُمْ অর্থাৎ তাদেরও রিজিক দিচ্ছি।
কিন্তু দ্বিতীয় আয়াতে সুরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ তাআলা বলছেন: 'দারিদ্র্যের আশঙ্কায় তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না'-অর্থাৎ তোমরা বর্তমানে যদিও দরিদ্র নও; বরং সচ্ছল, কিন্তু সন্তান লালনপালন করতে থাকলে ভবিষ্যতে দারিদ্র্য পেয়ে বসবে, এমন আশঙ্কায় তোমরা তোমাদের সন্তানদের মেরে ফেলো না। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আপনাকে নিশ্চিন্ত করছেন, তিনি আপনার আগত সন্তানদের রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন; আর সেই সাথে আপনাদের রিজিকের ব্যবস্থাও তিনি করবেন। তাই তিনি এই আয়াতে বলছেন, ﴾نَرْزُقُهُمْ -অর্থাৎ আমি ভবিষ্যতে তাদের রিজিক দেবো; এরপর তিনি আবার বললেন, ﴾وَإِيَّاكُمْ অর্থাৎ সাথে তোমাদেরও।
আয়াতদ্বয়ের তাফসির না জানলে কোন আয়াতের শেষ অংশ কোনটি, তা মনে রাখা কষ্টকর হবে।
২. সুরা বাকারার একটি আয়াত (৫৮) এমন,
وَإِذْ قُلْنَا ادْخُلُوا هَذِهِ الْقَرْيَةَ فَكُلُوا مِنْهَا حَيْثُ شِئْتُمْ رَغَدًا وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا وَقُولُوا حِطَّةٌ تَغْفِرْ لَكُمْ خَطِيكُمْ وَسَنَزِيدُ الْمُحْسِنِينَ)
আবার সুরা আরাফের একটি আয়াত (১৬১) হলো,
(وَإِذْ قِيلَ لَهُمُ اسْكُنُوا هَذِهِ الْقَرْيَةَ وَكُلُوا مِنْهَا حَيْثُ شِئْتُمْ وَقُولُوا حِطَّةٌ وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا تَغْفِرْ لَكُمْ خَطِيئَتِكُمْ سَنَزِيدُ الْمُحْسِنِينَ)
এখানে প্রথম আয়াতের সাথে দ্বিতীয় আয়াতের পার্থক্যগুলো হলো-
• ﴾قُلْنَا﴿ এর বদলে ﴾قِيلَ﴿ এসেছে।
• ﴾لَهُمُ﴿ অতিরিক্ত এসেছে।
• ﴾أَدْخُلُوا﴿ এর বদলে ﴾اُسْكُنُوا﴿ এসেছে।
• ﴾فَكُلُوا﴿ এর বদলে ﴾وَكُلُوا﴿ এসেছে।
• এখানে رَغَدًا শব্দটি নেই।
• ﴾وَقُوْلُوْا حِطَّةٌ﴿ শব্দ ﴾ وَادْخُلُوا الْبَابَ سُجَّدًا﴿ এর আগে এসেছে।
• ﴾خَطَيْكُمْ﴿ এর বদলে ﴾خَطِيئَتِكُمْ﴿ এসেছে।
• ﴾وَسَنَزِيدٌ﴿ এর পরিবর্তে ﴾سَنَزِيدُ﴿ এসেছে।
৩. সুরা আলে ইমরানের একটি আয়াত (১২৬) হলো,
(وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُمْ بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ)
এদিকে সুরা আনফালের একটি আয়াত (১০) হলো,
(وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى وَلِتَطْمَئِنَّ بِهِ قُلُوبُكُمْ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ )
এখানে দ্বিতীয় আয়াতের পার্থক্যগুলো হলো-
• এখানে র্য) নেই।
• ﴾قُلُوبِكُمْ بِهِ﴿ এর বদলে ﴾بِهِ قُلُوبِكُمْ﴿ এসেছে।
مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ 48 ﴾مِنْ عِنْدِ اللَّهِ ، إِنَّ اللَّهَ ﴾عَزِيزٌ حَكِيمٌ﴿ আছে।
৪. সুরা নাহলের একটি আয়াত (১৪) হলো, ﴾وَتَرَى الْفُلْكَ مَوَاخِرَ فِيْهِ وَلِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ﴿
আবার সুরা ফাতিরের একটি আয়াত (১২) হলো, وَتَرَى الْفُلْكَ فِيهِ مَوَاخِرَ لِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ ) প্রথম আয়াতের সাথে এখানে দ্বিতীয় আয়াতের পার্থক্যগুলো হলো-
• ﴾مَوَاخِرَفِيهِ﴿ এর পরিবর্তে ﴾فِيْهِ مَوَاخِرَ﴿ রয়েছে।
• ﴾وَلِتَبْتَغُوا﴿ এর বদলে ﴾لِتَبْتَغُوا﴿ রয়েছে।
৫. সুরা আরাফের একটি আয়াত (১১১) হলো, قَالُوا أَرْجِهُ وَأَخَاهُ وَ أَرْسِلْ فِي الْمَدَائِنِ حَشِرِينَ )
এদিকে সুরা শুআরার একটি আয়াত (৩৬) হলো, قَالُوا أَرْجِهُ وَأَخَاهُ وَابْعَثْ فِي الْمَدَائِنِ حَشِرِيْنَ ) এখানে দ্বিতীয় আয়াতের পার্থক্য হলো-
• ﴾وَأَرْسِلْ﴿ এর পরিবর্তে ﴾وَابْعَثْ﴿ শব্দটি এসেছে।
৬. সুরা কাহফের একটি আয়াত (৭৮) হলো, سَأُنَبِّئُكَ بِتَأْوِيلِ مَا لَمْ تَسْتَطِعْ عَلَيْهِ صَبْرًا )
সুরা কাহফেরই অন্যত্র (আয়াত: ৮২) এসেছে, ﴿ ذَلِكَ تَأْوِيلُ مَا لَمْ تَسْطِعْ عَلَيْهِ صَبْرًا )
এখানে দ্বিতীয় আয়াতের পার্থক্যগুলো হলো—
• ﴿ سَأُنَبِّئُكَ ﴾ এর স্থলে ﴿ ذَلِكَ ﴾ এসেছে।
• ﴿ بِتَأْوِيلِ ﴾ এর বদলে ﴿ تَأْوِيلُ ﴾ এসেছে।
• ﴿ تَسْتَطِعْ ﴾ এর পরিবর্তে ﴿ تَسْطِعْ ﴾ এসেছে।
৭. পুরোপুরি মিলে যায় এমন একটি উদাহরণ: সুরা নামলের একটি আয়াত (৩) হলো, ﴿ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَوةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكُوةَ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ ﴾
এদিকে সুরা লুকমানের একইরকম একটি আয়াত (৪) হলো, ﴿ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَوةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكُوةَ وَهُمْ بِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ ﴾
কুরআনে এমন সাদৃশ্যপূর্ণ আয়াতের সংখ্যা অনেক। দু-হাজারেরও অধিক আয়াত আছে, যেগুলোতে কিছু-না-কিছু সাদৃশ্য বিদ্যমান! এমনকি এরূপ আয়াতগুলোর অনুসন্ধান, পার্থক্য এবং অল্প অমিলের পেছনের কারণ নিয়ে আলাদা অনেক গ্রন্থও রচিত হয়েছে।
এই আলোচনায় আমি দুটি ব্যাপারে সতর্ক করতে চাচ্ছি, ১. হিফজ পূর্ণ করার পূর্বে আয়াতে মুতাশাবিহাতের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত নয়। কারণ, এতে হিফজকৃত অংশগুলোতে বিভ্রাট ও গোলযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
২. অনেক সময় এ প্রকারের আয়াতগুলো সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে নিচের কোনো একটি পদ্ধতির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে—
১. (المعجم المفهرس للقرآن الكريم) আল-মুজামুল মুফাহরাস লিল-কুরআনিল কারিম) গ্রন্থটির শরণাপন্ন হওয়া।
২. কম্পিউটার সফটওয়্যার বা স্মার্ট ফোনের কোনো অ্যাপ ব্যবহার করা।
৩. দক্ষ হাফেজের দ্বারস্থ হওয়া।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00