📄 নির্দিষ্ট অনুলিপিতে হিফজ করা
কুরআন শরিফ বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে ভিন্ন ভিন্ন আকার ও লিপিতে (ফন্ট) প্রকাশিত হয়ে থাকে। যার ফলে কোনো অনুলিপির পৃষ্ঠা হয় বারো লাইনে, কোনোটির চৌদ্দ লাইনে, আবার কোনোটি হয় পনেরো লাইনে...। এমনইভাবে কোনোটিতে হয়তো লাইন শুরু হয় এক আয়াত দ্বারা, কিন্তু অপর অনুলিপির একই লাইন শুরু হয় ভিন্ন আয়াত দ্বারা—এমনকি কোনো সময় সুরাও ভিন্ন হয়ে যায়।
মানুষ তার নির্দিষ্ট কিছু ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে তথ্যসমূহ মস্তিষ্কে প্রেরণের মাধ্যমে তা মুখস্থ করে থাকে। অতএব, ব্যবহৃত ইন্দ্রিয়ের পরিমাণ যত বাড়ানো যাবে, মুখস্থ করা বিষয়গুলোও তত শক্তিশালী হবে।
এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, কোনো কিছু মুখস্থ করার ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তিও একটি ইন্দ্রিয়, ফলে আপনি কুরআনের যে অনুলিপি থেকে হিফজ বা তিলাওয়াত করবেন, সেটি সর্বদা একই রূপ রাখা কর্তব্য, যেন দর্শনেন্দ্রিয় তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং, একই ধরনের বিভিন্ন সাইজের কুরআন শরিফ কিনে কোনোটা ঘরে, কোনোটা অফিসে, কোনোটা গাড়িতে, কোনোটা মসজিদে আর কোনোটা আপনার পকেটে রাখুন। তখন আপনি যেখানেই যাবেন, তিলাওয়াতে একই ধরনের কুরআন থাকায় পৃষ্ঠাটি আপনার মস্তিষ্কে গেঁথে যাবে। পাশাপাশি হিফজের ক্ষেত্রে আপনি আল্লাহর নেয়ামত দৃষ্টিশক্তি কাজে লাগানোরও সুযোগ পেয়ে গেলেন...!
আমার পরামর্শ থাকবে, যিনি এখনো কুরআনের কোনো অনুলিপি নির্দিষ্ট করে হিফজ শুরু করেননি, তিনি যেন মদিনা মুনাওয়ারার অনুলিপিটি ব্যবহার করেন। এই কপির বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
১. বর্তমানে সবচেয়ে প্রচলিত অনুলিপি এটি। ফলে যেকোনো জায়গায় এবং যেকোনো সাইজের অনুলিপি হাতের কাছে পেয়ে যাওয়ায় তিলাওয়াত করতে আপনার সুবিধা হবে।
২. এর অনুলিপিটি একদম স্পষ্ট এবং লেখার অক্ষরবিন্যাসও সহজপাঠ্য।
৩. এর বিন্যাস সুন্দর। এতে একই আয়াত দুই পৃষ্ঠায় ভাগ হয়ে যায়নি, বরং অধিকাংশ পৃষ্ঠায়ই আয়াত শেষ হয়ে গেছে। এটা নিঃসন্দেহে হিফজের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
মুখস্থের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়শক্তির আলোচনা প্রাসঙ্গিক হওয়ায় সেগুলো নিয়েও আমরা কথা বলতে পারি:
১. দৃষ্টিশক্তি: হিফজ করার সময় কুরআনের পৃষ্ঠায় দৃষ্টি বুলানো হয় আর কুরআন শরিফে দৃষ্টি দেওয়াও একটি ইবাদত।
২. শ্রবণেন্দ্রিয়: অপেক্ষাকৃত উচ্চ আওয়াজে পড়লে—মসজিদে তা উচিত নয়—শ্রবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সেটা মস্তিষ্কে প্রবেশ করে।
৩. লেখ্যশক্তি: যে-সব আয়াত হিফজ করা আপনার জন্য বেশি কঠিন মনে হয়, সেগুলো বারবার লিখে চর্চা করতে পারেন।
📄 হিফজ শক্তিশালী হওয়ার আগে সামনে না- এগোনো
কখনো হিফজ শেষ করতে আপনি অধীর আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন। তাই দেখা যাবে, হিফজকৃত অংশকে পোক্ত না-করেই আপনি রুবু থেকে রুবু, সুরা থেকে সুরা দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলছে, যা মুখস্থের ক্ষেত্রে তেমন পরিশ্রম সাধিত হয় না, তা মস্তিষ্কে বেশিদিন স্থায়ী হয় না।
অতএব, এক আয়াত থেকে অন্য আয়াত বা এক রুবু থেকে অন্য রুবুতে ততক্ষণ যাওয়া উচিত নয়, যতক্ষণ প্রথম আয়াত বা রুবু মুখস্থের ব্যাপারে আশ্বস্থ না-হন। অন্যথায় হিফজের পেছনে ব্যয় করা সময়টুকু বাস্তবে তেমন উপকারী কোনো কাজে লেগেছে বলে বিবেচিত হবে না।
📄 সুরাগুলো আলাদা আলাদাভাবে আয়ত্ব করা
হিফজের সুবিধার্থে বড় সুরাগুলো আমরা ভাগ ভাগ করে মুখস্থ করব। যেমন: আজ দু-আয়াত, কাল দু-আয়াত—এভাবে সপ্তাহে এক রুবু হিফজ পূর্ণ করে ফেলা যাবে। আর এই রীতিতে এক মাসে, দু-মাসে অথবা এরচেয়ে কম বা বেশি সময়ে আপনার একটা পূর্ণ সুরা মুখস্থ হয়ে যাবে।
এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় হচ্ছে, যেকোনো একটি সুরার হিফজ পূর্ণ হওয়ার পর শুরুর আয়াত থেকে শেষ আয়াত পর্যন্ত মস্তিষ্কে গেঁথে নেওয়া চাই, তাহলে কুরআনের সমস্ত সুরা আলাদা আলাদাভাবে আমাদের স্মৃতিতে বসে যাবে। এর জন্য আমাদের প্রত্যেকটি সুরা শেষ হওয়ার পর পুরো সুরাটি বারবার তিলাওয়াত করা জরুরি।
অনেক হাফেজের ক্ষেত্রে এমন হয়, তারা এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি অনুসরণ না-করার ফলে যে অংশ নিয়ে বর্তমান চর্চা অব্যাহত রাখে, তা ভালোভাবে শোনাতে পারলেও যখন একই সুরার পরের অংশে এগিয়ে যায়, তখন পূর্ববর্তী সেই অংশ শোনাতে গেলে আটকে যায়—আর স্মরণ করতে পারে না। তবে কেউ যদি তখন সেই অংশের শুরুটা বলে দেয়, তখন আবার সে নির্বিঘ্নে পুরো আয়াত বলে ফেলতে পারে, কিন্তু পরবর্তী অংশের শুরুতে গিয়ে আবারও বাঁধে একই বিপত্তি...! অতএব, শক্তিশালী হিফজ ও সাবলীল তিলাওয়াতের জন্য আমরা কোনোমতেই এই বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারি না—বিশেষত যে-সকল হাফেজ নামাজের ইমামতি করেন; তদুপরি যারা লম্বা কিরাআতের নামাজ, যেমন: ফজর, তারাবিহ এবং তাহাজ্জুদের ইমামতি করেন।
📄 হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা
হিফজকে সুদৃঢ় করার অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম হলো হিফজুল কুরআনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা। কারণ, মানুষের সামনে কোনো পরীক্ষামূলক বিষয় থাকলে স্বভাবতই সে সেখানে চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রচেষ্টা ব্যয়ে উদ্যোগী হয়ে থাকে। ঠিক তদ্রূপ হিফজের ক্ষেত্রেও পরীক্ষার ভাবনা থাকলে, ব্যক্তি দ্রুততম সময়ে এবং সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে তা আয়ত্ত করতে উৎসাহী হবে। দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলছেন,
﴿وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ ﴾
“এ বিষয়ে (আল্লাহর আনুগত্য) প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত।” [সুরা মুতাফফিফিন: ২৬]
তবে আপনি আপনার নিয়তের প্রতি খেয়াল রাখুন! সর্বদা তাকে ইখলাসমুখী রাখার প্রতি সচেষ্ট থাকুন! পুরস্কার অর্জন বা বিজয়ী হওয়ার কাছে তা বিকিয়ে দেবেন না! বরং নিয়তকে রাখুন পরিষ্কার ও একনিষ্ঠ...।
এভাবে ভাবুন, এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমি কেবল আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যেই হিফজকে শক্তিশালী করছি।
তবে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় পর্যায়ের প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা যদি না-ও থাকে, তবু সমস্যা নেই। সে ক্ষেত্রে আপনি মসজিদ, কর্মক্ষেত্র, কলেজ- ভার্সিটি, সংস্থা-সংগঠন, এমনকি এলাকাভিত্তিকভাবেও এর আয়োজন করতে পারেন। বিশেষত সে-সব বাচ্চাদের জন্য, যারা পুরস্কার পেলে উৎসাহ বোধ করে...।
সংঘবদ্ধভাবে কয়েকজন মিলে হিফজ করলে পর্যায়ক্রমিকভাবে একে অপরের হিফজ শোনার জন্য সময় নির্ধারণ করে নিতে পারেন। আর যার তত্ত্বাবধানে হিফজের আসর অনুষ্ঠিত হয়, হিফজকারীদের উৎসাহ প্রদান আর হতোদ্যমদের আগ্রহ ফিরিয়ে আনার জন্য তার উচিত তাদের জন্য হালকা ধরনের কিছু আয়োজন-উপহারের ব্যবস্থা করা।