📄 সুস্পষ্ট পরিকল্পনা
প্রতিটি কর্মের সফলতার জন্যই একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকতে হয়, আবার প্রতিটি পরিকল্পনার সামনেই একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হয়। উল্লেখ্য, এখানে সেই লক্ষ্যটি হলো পূর্ণাঙ্গভাবে কুরআনুল কারিমের হিফজ করা। আপনি যদি এ বিষয়টি মাথায় না রেখে হিফজ করা শুরু করেন, তবে আপনি সফল হবেন নাকি ব্যর্থ হবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা আপনি দিতে পারবেন না...। তবে পরিকল্পনাকালে আপন পরিস্থিতির বিষয়টি সামনে থাকাও জরুরি। কারণ, এটি ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন হতে পারে, অতএব সেটি মাথায় রেখেই কার্যসম্পাদন করতে হবে। দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির ধী-শক্তি প্রবল, সে দ্রুত হিফজ করতে পারে, আবার অন্য এক ব্যক্তি তার একদমই বিপরীত; তুলনামূলকভাবে কেউ অনেক সময় পায়, কিন্তু অন্য একজনের ততটা সময় হয় না; কোনো ব্যক্তি দ্বীনের দাওয়াতের কাজ করে, বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা করে—অতএব, তার হিফজুল কুরআনের প্রয়োজনীয়তা যতটা, যার এসবের দায়িত্ব নেই, তার প্রয়োজন অবশ্যই প্রথমজনের মতো ততটা নয়...।
সুতরাং, নানাজনের নানান অবস্থার প্রেক্ষিতে তাদের পরিকল্পনাও ভিন্ন ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক। আর প্রতিটা মানুষই যেহেতু তার আপন অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত, সুতরাং সে-মতেই তার আপন পরিকল্পনা সাজানো উচিত...।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সময় নির্ধারণ করে নেওয়া। আপনি যদি পূর্ণ কুরআন হিফজ করতে চান, তাহলে একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। তিন বছর, পাঁচ বছর, দশ বছর, তারচেয়েও বেশি বা কম যা-ই হোক, তা নির্দিষ্ট করে নিন। পাশাপাশি, এর জন্য আপনার আরও প্রয়োজন একটি সুবিন্যস্ত সিলেবাস ও রুটিন প্রণয়ন করা—যেমন প্রথম বছরে আপনি কতটুকু হিফজ করবেন, দ্বিতীয় বছরে কতটুকু হিফজ করবেন...।
📄 সংকল্পবদ্ধ হয়ে শুরু করা
অনেক ক্ষেত্রে এমন হয়, কারও কোনো আমলের প্রতি প্রবল আগ্রহ জন্মে আর সাহস করে সে কাজও শুরু করে। পাশাপাশি এ কাজে তার নিয়তও ঠিক থাকে আর তা শেষ করার প্রবল স্পৃহাও লালন করে অন্তরে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না-যেতেই তার উদ্যম-সাহস নড়বড়ে হয়ে পড়ে, এমনকি সেই আমল ধীরগতি পেয়ে একসময় থেমেই যায়...।
📄 পকেটে ছোট কুরআন রাখা
পকেটে একটি ছোট কুরআন শরিফ রাখলে আপনার হিফজ অনেকটা সহজ হবে। আমি অনেক হাফেজের কথা জানি, যারা ৮০ ভাগেরও বেশি হিফজ সম্পন্ন করেছে তাদের ছোট কুরআন থেকে বিভিন্ন জায়গায় ও সময়ের বিরতিগুলো কাজে লাগিয়ে! আয়োজন করে বিশেষভাবে হিফজের জন্য বসা তাদের নিকট জরুরি ছিল না। কেননা, সাধারণত অধিকাংশেরই দিনের লম্বা একটা সময় বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, এক কাজের পর আরেকটি এসে ভিড় করে। তবে এই ব্যস্ততার মাঝেই সময়ের অল্পকিছু ফাঁকফোকরও পাওয়া যায়—আর ইচ্ছে করলে সেগুলো আমরা হিফজের কাজে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু অনেক সময় কুরআন শরিফের অভাবে সময়গুলো অযথা নষ্ট হয়, অতএব সে সময় পকেটে রাখা এই ছোট কুরআনটি আপনার অনেক কাজে আসবে।
ধরুন, আপনি পাবলিক বাসে করে কোথাও যাচ্ছেন, সেখানে প্রত্যেকদিন ১৫ মিনিট, আধা ঘণ্টা বা কখনো এক ঘণ্টা সময়ও চলে যাচ্ছে। অতএব, আপনি চাইলে এই সময়টা কাজে লাগাতে পারেন। এমনইভাবে পথ চলতে চলতে আপনি চাইলে হিফজকৃত অংশের পুনর্পাঠও সেরে নিতে পারেন। প্রথমে একবার গত সপ্তাহে হিফজ করা অংশ পড়লেন, তারপর আরও পূর্বের অংশগুলো পড়তে থাকলেন—একবার শেষ হলে বারবার পড়তে থাকলেন। এতে আপনার হিফজও শক্তিশালী হবে, পাশাপাশি প্রচুর সওয়াবেরও অধিকারী হবেন! এ-ক্ষণে হঠাৎ কোনো আয়াতে আটকে গেলে পকেট থেকে ছোট কুরআন শরিফটি বের করে দেখে নিয়ে আয়াতটি ঠিকঠাকভাবে তিলাওয়াত সম্পন্ন করে নিলেন...।
অথবা কোনো অফিস, লাইন বা কোথাও কিছুর অপেক্ষায় আছেন, কলেজ-ভার্সিটির লেকচারের বিরতির সময়ে বসে, মসজিদে আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে—চাইলে এ সময়গুলোও আপনি কাজে লাগাতে পারেন, চাই একটা আয়াতই হোক না-কেন! কেননা, এভাবে আয়াতে আয়াতে হবে 'রুবু', আর 'রুবু' 'রুবু' মিলে একসময় পুরো কুরআনুল কারিমই শেষ হয়ে যাবে—ইনশাআল্লাহ! (২০)
টিকাঃ
২০. স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের জন্য পকেটে কুরআন রাখার বিষয়টি আরও অনেক সহজসাধ্য। স্মার্টফোনে কুরআনের বিভিন্ন অ্যাপ পাওয়া যায়, যা হিফজে আগ্রহী এবং কুরআন তিলাওয়াত করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের জন্য একটি উত্তম মাধ্যম হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের স্মার্টফোনকে ফেতনা থেকে রক্ষা করে আমলের মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমিন। (সম্পাদক)
📄 ইমাম সাহেবের তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শোনা
হিফজুল কুরআনে আগ্রহী ব্যক্তির অবশ্যই মসজিদে জামাতে নামাজ পড়ার ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে। আমার পরামর্শ থাকবে, আপনি এমন কোনো মসজিদ বাছাই করে নিন, যার ইমাম সাহেব নিজে হাফেজ এবং তাজউইদের নিয়মকানুন মেনে বিশুদ্ধ তিলাওয়াত করেন-বিশেষত, তিনি যদি সুন্দর কণ্ঠের পাশাপাশি আয়াতগুলোর মর্মবোদ্ধা কেউ হন...। হাফেজ ইমাম সাহেব কুরআনের বিভিন্ন অংশ থেকে তিলাওয়াত করে থাকেন, এই সুযোগে তার সাথে আপনিও আপনার গতকাল, গত মাস এমনকি গত বছরের হিফজ করা কোনো অংশও শুনে নিতে পারবেন। পাশাপাশি, আপনার মুখস্থ করা হয়নি, এমন অংশের তিলাওয়াতও বারবার শুনতে পারায় পরবর্তী সময়ে তা হিফজ করা আপনার জন্য সহজ হয়ে উঠবে।
'জাহরি' নামাজ (যে নামাজে ইমাম সাহেব উচ্চৈঃস্বরে কিরাআত পড়েন) তথা ফজর, মাগরিব এবং এশার নামাজে ইমামের তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করুন। কোনো আয়াত না বুঝলে সেটা স্মরণে রাখুন, এরপর বাসায় ফিরে তাফসিরের কোনো গ্রন্থ খুলে সেই আয়াতের তাফসিরটুকু দেখে নিন। এতে যেমন আপনার হিফজ শক্তিশালী হবে, সেইসাথে আয়াতের তাফসিরও জানতে পারলেন এবং পরবর্তী সময়ে এর ওপর আমলও করতে পারবেন।
কোনো আয়াত শুনে সন্দেহ হলে নামাজের পর মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগেই কুরআন শরিফ খুলে তা দেখে নিন। যাতে আয়াতের শুদ্ধাশুদ্ধি এবং অক্ষর-শব্দের সঠিক স্থান রপ্ত হয়ে যায়। এর দ্বারা নিজের হিফজ শক্তিশালী করা এবং অর্থ অনুধাবনের বিষয়টি ছাড়াও আপনি নামাজের খুশুখুজুর ব্যাপারটি আদায় করে নিলেন। কেননা, শুধু শরীর নয়; বরং আপনার মনও পুরোপুরিভাবে নামাজের সাথেই ছিল, বিধায় আপনার সওয়াবের পরিমাণও বিরাটাকার ধারণ করল। যেমন হযরত আবু বকর বিন আবদুর রহমান রা. থেকে বর্ণিত রয়েছে, "একদা আম্মার বিন ইয়াসির রা. দু-রাকাত নামাজ আদায় করলে আবদুর রহমান বিন হারেস তাকে বললেন, হে আবুল ইয়াকযান [তাঁর উপনাম], মনে হয় নামাজ একটু হালকা করে পড়লেন! আম্মার রা. বললেন, আমি কি জরুরি কোনো বিষয় ছেড়ে দিয়েছি? আবদুর রহমান রা. বললেন, না, তবে মনে হয় নামাজটি একটু ছোট হয়ে গেল। আম্মার রা. বললেন, ভুল হওয়ার আশঙ্কা ছিল, তাই ছোট করে পড়ে নিলাম। কেননা, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কোনো লোক হয়তো নামাজ পড়ে, অথচ সে নামাজের এক-দশমাংশ, এক-নবমাংশ, এক-অষ্টমাংশ, এক-সপ্তমাংশ (এভাবে তিনি সর্বশেষ সংখ্যা পর্যন্ত বললেন) আদায়কারী বলে গণ্য হয়েছে...।” (৫১) [অর্থাৎ ব্যক্তির মন নামাজে যতটুকু হাজির ছিল, সেই পরিমাণেই তাকে নামাজি বলে গণ্য করা হবে]।
টিকাঃ
৫১. মুসনাদে আহমাদ: ১৮৮৭৯।