📄 গোনাহ পরিত্যাগ করা
যে হৃদয় গোনাহর নেশায় আসক্ত, সে হৃদয়ও কি কুরআন ধারণ করতে পারে!! বস্তুত, বান্দা যত গোনাহে লিপ্ত হয়, তার হৃদয় তত কলুষিত হয়, আর তা যত বেশি কলুষিত হয়, এই পবিত্র কিতাব ধারণের ওপর তত বেশি শক্তি হারাতে থাকে...।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “বান্দা যখন একটি গোনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। এরপর যখন সে গোনাহর কাজ পরিহার করে তওবার সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তার অন্তর তখন পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে আর এভাবে তার পুরো অন্তর কালো দাগে ঢেকে যায়। এটাই সেই মরিচা, যা বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে,
'কখনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের মনে জং (মরিচা) ধরিয়েছে।[সুরা মুতাফফিফিন: ১৪]
এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল স্পষ্ট গোনাহই নয়, বরং আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্দেহ-সংশয়জনক গোনাহ থেকেও বেঁচে থাকতে আদেশ করেছেন। যেমন নুমান বিন বশির রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “হালালও স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ-দুরের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়, যার জ্ঞান অনেক মানুষেরই নেই। যে ব্যক্তি সে-সব সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়ে পড়বে, তার উদাহরণ সেই রাখালের ন্যায়, যে তার গবাদি পশু বাদশাহর সংরক্ষিত চারণভূমির আশেপাশে চরায়-বিধায় পশুগুলো সেখানে ঢুকে পড়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। জেনে রেখো, প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে; আর আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা হচ্ছে তাঁর নিষিদ্ধ কাজসমূহ। আরও জেনে রেখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন সুস্থ-সুষ্ঠু হয়ে যায়, পুরো শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর সেটা যখন নষ্ট হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন অসুস্থ-অসুস্থ হয়ে পড়ে-আর সে গোশতের টুকরোটি হলো 'কলব' (অন্তর)।” (৩৬)
এই বোধ ইমাম শাফিয়ি রহ. পেয়েছিলেন তাঁর শায়খ ইমাম ওয়াকি রহ.-এর প্রায়োগিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে। ইমাম শাফিয়ি রহ.-এর আশ্চর্যজনক ধী-শক্তির খ্যাতি ছিল, কোনোকিছু কেবল একবার দেখেই তিনি মুখস্থ করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু একদিন তিনি লক্ষ করলেন, তার মেধা স্বভাবসুলভ কাজ করছে না। তখন তিনি তার শায়খ ওয়াকি রহ.-এর নিকট গিয়ে স্মরণশক্তির বিভ্রাটের কথা জানালেন। উত্তরে তিনি বললেন, আমার মনে হয় এটা তোমার কোনো গোনাহর কারণে হচ্ছে। তখন শাফিয়ি রহ.-এর ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল, একবার বাতাসের কারণে এক মহিলার পায়ের গোড়ালির কাপড় উঠে যায় আর সেখানে তাঁর নজর পড়ে। তখন তিনি বুঝতে পারলেন, এ-ই সেই গোনাহ, যা তার স্মরণশক্তিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তখন তিনি জ্ঞান-প্রজ্ঞায় ভরপুর অপূর্ব সেই পঙক্তি-চতুষ্টয় রচনা করেন। তিনি বলেন,
شَكُوتُ إِلى وكيع سوء حفظى فَأَرْشَدَنِي إِلَى تَركِ المعاصي
وقال : إِنَّ العِلم نور ونورُ اللهِ لا يُهدى لعاصى
"স্মরণবিভ্রাটের অভিযোগে এলাম ওয়াকির নিকট, গোনাহ ত্যাগের নসিহতে করলেন পথনির্দেশ...। শুধালেন, ইলম যে এক আলোক, রবের সেই আলোক অর্জিত হয় না কোনো পাপিষ্ঠের।
সুবহানাল্লাহ! এই গোনাহই যখন ইমাম শাফিয়ির স্মরণশক্তিতে গোলযোগ তৈরি করেছিল, তাহলে এবার আমরা আশা করি বুঝতে পারব, কেন মাঝেমধ্যে কুরআন হিফজ আমাদের জন্য এতটা কঠিন হয়ে পড়ে!!
আবু উবাইদ রহ. শ্রেষ্ঠতম তাবিয়ি দাহহাক বিন মুযাহিম রহ.-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ আশ্চর্যজনক এক বাণী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআন শিখে ভুলে যায়, সেটা কেবল তার গোনাহর কারণেই হয়ে থাকে...। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ )
'তোমাদের উপর যে-সব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল।' [সুরা শুরা: ৩০]
আর আল্লাহর কুরআন ভুলে যাওয়া তো বড়সড় বিপদগুলোর অন্তর্ভুক্ত! (৩৭)
টিকাঃ
**. জামে তিরমিযি: ৩৩৩৪।
**. সহিহ বুখারি: ৫২, সহিহ মুসলিম: ১৫৯৯।
৩৭. শুয়াবুল ঈমান: ১৮১৩।
📄 দোয়া
যে মাধ্যমটি কখনো নিরাশার সম্মুখীন হয় না, তা হলো নিষ্ঠা ও সততার সাথে মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে দোয়া করা। আর আমিও আল্লাহ পাকের নিকট দোয়া করি, তিনি আপনাকে কুরআনুল কারিম হিফজ করার নিয়ামত দান করুন, আপনার নিয়ত তার সন্তুষ্টির জন্য একনিষ্ঠ করে দিন এবং কুরআন অনুযায়ী আমল করা আপনার জন্য সহজ করুন।
প্রিয় ভাই, দোয়ার জন্য আপনি নিজে কিছু সময় নির্বাচন করে নিন। বিশেষ করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সময়গুলোতে দোয়া করার নির্দেশনা দিয়েছেন...। যেমন: রাতের শেষ প্রহরে, নামাজের শেষে, রমজানের শেষ দশকে—বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে, বৃষ্টি চলাকালীন বা সফরে থাকা অবস্থায় ইত্যাদি।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি, হিফজুল কুরআনের জন্য বিশেষ কোনো দোয়া বা নির্দিষ্ট কোনো নামাজ নেই। নির্দিষ্ট দোয়া বা নামাজের যে-সব কথা প্রচলিত রয়েছে, সেগুলো সব ভিত্তিহীন। আপনার মনে যে দোয়া আসে, তা দিয়েই আল্লাহকে ডাকুন—যে ভাষা বা শব্দ আসে, তা-ই বলতে থাকুন। আল্লাহর নিকট দোয়া করি, তিনি আপনার ডাকে সাড়া দিন।
📄 মর্ম বুঝে হিফজ করা
যে ব্যক্তি হিফজকৃত আয়াতসমূহের মর্ম বুঝতে পারবে, নিঃসন্দেহে তার জন্য হিফজ করা অত্যন্ত সহজ হবে। বিশেষত সে-সব সুরা, যেগুলোতে নানান ঘটনা বর্ণিত হয়েছে অথবা যে-সব আয়াতের প্রসিদ্ধ শানে নুজুল (পটভূমি) রয়েছে। তেমনইভাবে যে-সব আয়াত ফিকহি বিধান সংবলিত, যেমন: অজু, কসম বা জিহারের কাফফারা, রোজা, ভুলক্রমে হত্যার রক্তপণ ইত্যাদি, যেগুলোর হিফজও সহজ হবে বলে আশা করি।
যে ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ কুরআন হিফজ করতে চায়, তার জন্য উচিত হচ্ছে সহজ কোনো তাফসিরগ্রন্থের সহায়তা নেওয়া। তাহলে অল্প সময়ে ও সংক্ষেপে অর্থের মর্ম বুঝতে সুবিধা হবে। উদাহরণস্বরূপ যে গ্রন্থগুলো সহায়ক হতে পারে:
১. মুখতাসারু ইবনে কাসির
২. মুখতাসারুত তাবারি
৩. তাফসিরুস সাদি (تفسير السعدي)
৪. তাফসিরু মুহাম্মদ ফরিদ ওয়াজদি
৫. তাফসিরুল জালালাইন, ইত্যাদি।
তবে কোনো আয়াত বা সুরার বিস্তারিত তাফসির জানতে চাইলে প্রসিদ্ধ পূর্ণাঙ্গ তফসির গ্রন্থগুলোর শরণাপন্ন হতে হবে। যেমন:
১. তাফসিরে ইবনে কাসির
২. তাফসিরে কুরতুবি
৩. ফি যিলালিল কুরআন
৪. আল-আসাস ফিত-তাফসির, ইত্যাদি। (৩৮)
আমি আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, এই মহান গ্রন্থই আমাদের জীবনের একমাত্র সংবিধান। অতএব, যে ব্যক্তি তা অনুযায়ী আমল করতে চায়, তার জন্য আয়াতসমূহের সঠিক ও শাশ্বত ব্যাখ্যা জানা আবশ্যক। বস্তুত, মর্মসহ একটি আয়াত হিফজ করাও মর্ম না বুঝে দশটি আয়াত হিফজের চেয়ে উত্তম।
টিকাঃ
** . উল্লিখিত গ্রন্থগুলোর সব বাংলা ভাষায় অনূদিত নেই, তাই কুরআনের অর্থ ও সংক্ষিপ্ত-বিস্তারিত তাফসিরের জন্য এই গ্রন্থগুলো দেখা যেতে পারে, যথা: 'তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন' 'তাফসীরে মা'আরেফুল-কোরআন' 'তাফসীরে ইবনে কাছীর' ইত্যাদি। (সম্পাদক)
📄 সঠিক তাজউইদ (তিলাওয়াতজ্ঞান) জানা
কুরআন পাঠের জন্য তাজউইদজ্ঞান বড়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বস্তুত, কেউ আরবি ভাষাভাষী হলেই সে শুদ্ধরূপে কুরআন পড়তে পারে না। কারণ, কুরআন পাঠের বিশেষ কিছু নীতিমালা আছে, যেগুলো কেবল আল্লাহর কিতাবের জন্যই প্রণীত। আল্লাহ তাআলা চান, আমরা তার কালাম ঠিক সেভাবে পাঠ করি, যে নিয়মে তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরিল আলাইহিস সালাম থেকে শিখে সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন। আর সেই তাজউইদের সাথেই এই মহৎ জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিকতায় আমাদের পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে।
ইনশাআল্লাহ—কিয়ামত পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকবে...।
তাজউইদসহ কুরআন পড়লে হিফজ করাটাও সহজ হয়। এই বিশেষ ধ্বনিজ্ঞান কুরআনকে একেবারে হৃদয়ে গেঁথে দেয়। অতএব, হিফজে আগ্রহী প্রতিটি মুসলিমের অবশ্যকর্তব্য হলো দ্রুত তাজউইদ শিখে নেওয়া। কেননা, হিফজ সমাপ্ত করার পর সেগুলোর তাজউইদ ঠিক করা অনেকটা দুঃসাধ্য। ব্যাপার। ফলে যদি কেউ ভুল তাজউইদে কুরআন হিফজ করে ফেলে, দুর্ভাগ্যবশত সারাজীবন সেভাবেই তাকে কুরআন পড়ে যেতে হবে।
সঠিক তাজউইদসহ কুরআন হিফজ করার দরুন আল্লাহ তাআলার নিকট উত্তম প্রতিদানের আশা করা যায়। সুতরাং, তাজউইদের রীতিশৈলী যত কঠিনই হোক না-কেন, প্রতিটি কুরআন শিক্ষার্থীরই এর জন্য চেষ্টা-সাধনা করা উচিত। কেননা, কুরআন শেখার এ যাত্রার প্রতিটি কসরতই তার প্রতিদানের পাল্লা ভারী করবে। যেমন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কুরআন পড়তে দক্ষ ব্যক্তি সম্মানিত রাসুলগণের সাথে থাকবে। আর যে ব্যক্তি [হিফজ দুর্বলতার দরুন] তার জন্য কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও আটকে আটকে কুরআন পাঠ করে, তার জন্য দ্বিগুণ প্রতিদান রয়েছে।” (৩৯) উল্লেখ্য, সহিহ বুখারির বর্ণনায় প্রথমাংশে রয়েছে, “হাফেজ কুরআন তিলাওয়াতকারী ব্যক্তি..."।
ইমাম নববি রহ. 'সম্মানিত রাসুলগণ'-এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর দ্বারা এখানে মানুষ নবী-রাসুলদেরও উদ্দেশ্য নেওয়া যায়, আবার ফেরেশতা ওহিবাহকদেরও উদ্দেশ্য নেওয়া যায়-তবে যারাই হোক, প্রকৃতপক্ষে উভয় দলই পরম সম্মানিত ও মর্যাদাবান।
একটি বিষয়ে সতর্ক করার প্রয়োজন বোধ করছি, কুরআনের তাজউইদ সরাসরি অভিজ্ঞ কোনো হাফেজ শিক্ষকের নিকট শেখা চাই। কেননা, কোনো বই বা অডিও ক্লিপের উপর নির্ভর করে শুদ্ধ তাজউইদ শেখা অসম্ভব ব্যাপার! তবে প্রথমে শিক্ষকের কাছ থেকে শুনে পরবর্তী সময়ে অডিও ক্লিপ, কম্পিউটার সফটওয়্যার, কুরআনের তিলাওয়াত শোনা বা কোনো তাজউইদের বই ইত্যাদির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
অভিভাবকদের উচিত, শৈশবেই বাচ্চাকে কুরআন হিফজ করানোর জন্য শিক্ষকের ব্যবস্থা করা। আপন সন্তানকে কুরআন হিফজ করানোর বিশাল উপকারের ব্যাপারটি মাথায় রেখে মুসলিম বাবা-মায়েদের জন্য বাচ্চাদের স্মরণশক্তি তেজোদীপ্ত ও প্রখর থাকার এই সময়টিকে যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত...।
টিকাঃ
৩৯. সহিহ মুসলিম: ৭৯৮, সহিহ বুখারি: ৪৯৩৭।