📄 দৃঢ় সংকল্প
হিফজুল কুরআন অত্যন্ত গুরুত্বভার একটি কাজ, কেবল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্যক্তিরাই যার সক্ষমতা রাখে। এই প্রকারের লোকেরা মূলত দৃঢ় সংকল্প নামক বিরাট এক গুণের অধিকারী হয়ে থাকেন। এসকল ব্যক্তিদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলা হয়, কেননা তারা উদ্দিষ্ট কর্মসাধনে পরম আগ্রহ পোষণপূর্বক চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রচেষ্টা চালায়। প্রতিটি মুসলিমের অন্তরেই যদিও হিফজুল কুরআনের আগ্রহ-আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান থাকে, কিন্তু কেবল এই ঝোঁকই যথেষ্ট নয়; বরং এর সাথে থাকতে হবে কর্মসাধনের দুর্দান্ত স্পৃহা। আল্লাহ তাআলার এই বাণীর প্রতি ভালো করে লক্ষ করুন,
﴿وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَبِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُورًا﴾
"যে ব্যক্তি পরকাল কামনা করে এবং ঈমানের সঙ্গে সে-জন্য যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করে, এমন লোকদের চেষ্টার পরিপূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হবে।” [সুরা বনি ইসরাইল: ১৯]
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ব্যক্তিমাত্রই পরকালের সফলতা কামনা করে, কিন্তু তাদের মধ্যে সত্যবাদী-মিথ্যাবাদী চিহ্নিত হওয়ার উপায় কী?! সেই উপায় হচ্ছে, প্রথমত ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষেই অন্তরে কর্মের ইচ্ছা পোষণ করবে, এরপর তার এই আগ্রহকে দৃঢ় সংকল্পে রূপ দেবে, তারপর সেই সংকল্পকে একসময় বাস্তবকার্যে পরিণত করবে। বস্তুত এই অবস্থাই আল্লাহ তাআলার বাণী 'যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করা'-এর প্রকৃত ব্যাখ্যা। মুমিন ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে এ কাজ করতে থাকলে একসময় সেটি তার অভ্যাসে পরিণত হবে। এরপর আর তার জীবনে কোনো দিন এমন কাটবে না, যেদিন সে কুরআন তিলাওয়াত, নতুন হিফজ বা পেছনের মুখস্থ অংশকে ঝালিয়ে নিতে প্রচেষ্টায় লিপ্ত হবে না। সত্য বলতে, এই দৃঢ় সংকল্পই ব্যক্তিকে হিফজুল কুরআনের সৌভাগ্যপ্রাপ্তি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়...।
শাদ্দাদ বিন আওস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাবনিকাশ রাখে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর নির্বোধ সেই ব্যক্তি, যে তার নফসের চাহিদা পূরণ করতে থাকে, আবার আল্লাহ তাআলার নিকট [বৃথা] আশা পোষণ করে।” (২৫)
অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে কুরআন হিফজ করতে পারার আশা রাখে, কিন্তু সে ব্যাপারে কোনোরূপ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে না-সে হচ্ছে মূলত নির্বোধ, অলীক বিশ্বাসে আক্রান্ত; দ্বীন ইসলামের স্বভাব-প্রকৃতি অনুধাবনের ব্যাপারে সে ব্যর্থ।
এজন্য বলছি, প্রিয় ভাই, অধ্যয়নরত এই পুস্তিকা শেষ করার সাথে সাথে আজই আপনি কুরআন হিফজের কাজে আত্মনিয়োগ করুন! আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখবেন না যেন...। আর 'অচিরেই করব' বাক্য থেকে বেঁচে থাকুন; আজ নয়, বরং কাল করব-এমন গড়িমসি আপনাকে যেন ধোঁকায় না ফেলে! অনেকের অনেক নেক আমলের সুযোগ নষ্ট হয়ে যায় শুধু এ কারণে যে-তারা ভেবেছিল কাল বা পরশু শুরু করব অথবা ওই কাজটা শেষ হলে এই কাজটায় মনোযোগ দেবো...। অতএব, দৃঢ় প্রতিজ্ঞাপূর্বক আপনি আপনার সন্তানদের নিয়ে আজই এই মহান কর্মে আত্মনিয়োগ করুন!
টিকাঃ
২৫. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৬০, জামে তিরমিযি: ২৪৫৯, মুসনাদে আহমাদ: ১৭১২৩।
📄 কুরআন হিফজের মূল্য অনুধাবন
যে ব্যক্তি কোনো বিষয় বা বস্তুর মূল্য অনুধাবন করতে পারে, সে তার জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের চেষ্টা-মেহনত ও ত্যাগতিতিক্ষা করতে সক্ষম হয়। এই চিত্র জাগতিক বিষয়াদির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; মানুষ যখন কোনো কাজের মূল্য এবং তার মাধ্যমে আগত লাভের ব্যাপারে অবগত থাকে, স্বাভাবিকভাবেই সে তার পেছনে অধ্যবসায়ে লিপ্ত হয়ে থাকে।
পরকালীন ব্যাপারটিও তা থেকে ভিন্ন কিছু নয়। আপনি যখন কোনো আমলের প্রতিদানের মূল্য অনুধাবন করতে পারবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি আপনার আগ্রহ-উদ্দীপনা বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণত, কোনো এক ব্যক্তি কিয়ামুল লাইল বা জামাতে নামাজ পড়ার বিস্তারিত ফজিলত, পক্ষান্তরে অন্য একজন শুধু এটুকু জানে যে এগুলো বেশ ভালো কাজ, অতএব তারা দুজন যেমন সমান নয়, ঠিক তেমনইভাবে, যে ব্যক্তি বিস্তারিতভাবে কুরআনের ফজিলত জানে, সেও এই গ্রন্থের একটু-আধটু ফজিলত জানা ব্যক্তির অনুরূপ নয়...।
প্রিয় ভাই, নিম্নে আমরা কুরআন সম্পৃক্ত কিছু ফজিলতের কথা উল্লেখ করছি। তবে আমাদের অনুল্লেখিত বাণীও রয়ে গেছে প্রচুর পরিমাণে...।
১. হযরত আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কুরআনের অধিকারীরা হচ্ছে আল্লাহর পরিজন এবং তাঁর বিশেষ বান্দা।” (২৬)
২. ইবনু উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, "দুটি বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে ঈর্ষা(২৭) করা যায় না। প্রথমত, যাকে আল্লাহ তাআলা কুরআনের জ্ঞান দান করেছেন আর সে দিন-রাত তা তিলাওয়াত করতে থাকে। দ্বিতীয়ত, যাকে আল্লাহ তাআলা সম্পদ দান করেছেন আর সে দিন- রাত তা থেকে দান করতে থাকে।”(২৮)
৩. ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যার হৃদয়ে কুরআনের কিছুই নেই, সে বিধ্বস্ত ঘরের মতো।”(২৯)
৪. আবদুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “[কিয়ামতের দিন] কুরআনের অধিকারী ব্যক্তিকে বলা হবে, তিলাওয়াত করতে থাকো আর উচ্চে আরোহণ করতে থাকো; দুনিয়াতে যেভাবে তারতিলের সাথে পাঠ করতে, ঠিক সেভাবেই তারতিলের সাথে পাঠ করে যাও। যে আয়াতে তোমার পাঠ সমাপ্ত হবে, সেখানেই হবে তোমার স্থান।”(৩০)
অতএব, আলোচিত হাদিসগুলোর মাধ্যমে কুরআন হিফজের মূল্য সম্পর্কে ধারণা লাভের পর এবার আপনার অবশ্যকর্তব্য হলো, এই কাজের জন্য সময়, চেষ্টা-সাধনা এবং চিন্তাভাবনা ব্যয়ে আত্মনিয়োগ করা। বস্তুত আল্লাহই একমাত্র তওফিকদাতা!
টিকাঃ
* সুনানুল কুবরা লিন-নাসায়ি: ৭৯৭৭।
২৭. এই হাদিসে মূলত রূপকার্থে ঈর্ষা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, এই দুই ক্ষেত্রেও ঈর্ষার মূল অর্থ অনুযায়ী অন্যের নিয়ামত দূরীভূত হওয়ার কামনা করা বৈধ নয়; শুধু এটুকু কামনা করার অবকাশ রয়েছে, আল্লাহ তার নিয়ামতও বহাল রাখুন, পাশাপাশি আমাকেও তার মতো নিয়ামতে সিক্ত করুন। একে আরবিতে ‘গিবতা’ শব্দে ব্যক্ত করা হয়। (সম্পাদক)
২৮. সহিহ বুখারি: ৫০২৫, সহিহ মুসলিম: ৮১৫।
২৯. জামে তিরমিযি: ২৯১৩।
৩০. জামে তিরমিযি: ২৯১৪।
📄 হিফজকৃত নিয়াবলীর ওপর আমল করা
স্বাভাবিকভাবেই তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ধ্বংস সে ব্যক্তির জন্য, যে ইলম শিখল, কিন্তু তদনুযায়ী আমল করল না!
হযরত আনাস বিন মালিক রা. বলেন, “কিছু কুরআন তিলাওয়াতকারীকে খোদ কুরআন অভিসম্পাত করতে থাকে।”(৩১)
কিন্তু কুরআন কেন তার তিলাওয়াতকারীকে অভিশাপ দেয়?! কারণ, সে কুরআন পড়ে, মুখস্থ করে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে সে অনুযায়ী আমল করে না।
সে সুদের আয়াতগুলো পড়ে ও মুখস্থ করে এবং সে জানে যে সুদের লেনদেনকারী ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে—কিন্তু তারপরও সে সুদের কারবার করে! সে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের আয়াত পাঠ করে ও মুখস্থ করে, তাদের মর্যাদা ও তাদের কষ্ট দেওয়ার শাস্তির ব্যাপারে জানে—তারপরও সে পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়! বস্তুত এগুলোই তাকে অভিশাপের উপযুক্ত বানায়...। আমরা আল্লাহর নিকট এসব থেকে আশ্রয় কামনা করছি।
কুরআনের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হবে, সাইয়িদুনা উমর রা. সে ব্যাপারে দারুণ পথ বাতলে দিয়েছেন। তার জীবন থেকে জানা যায়, তিনি যখনই নতুন কিছু মুখস্থ করতেন, সে অনুযায়ী আমল করতেন; এরপর অন্য কিছু মুখস্থের উদ্যোগ নিতেন। কেননা, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কুরআন এমন কোনো গ্রন্থ নয়, যা কেবল মুখস্থ করা বা বরকত লাভের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে; বরং কুরআন مسلمانوں জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, সামাজিক জীবনের ছোট-বড় সকলকিছু পরিচালনার ক্ষেত্রেই এই গ্রন্থে দিকনির্দেশনা ও বিধিবিধান বিদ্যমান রয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاتَّبِعُوا أَحْسَنَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَّبِّكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ بَغْتَةً وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
"আপন রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ হওয়া উত্তম বিষয়ের অনুসরণ করো তোমাদের উপর অতর্কিতে ও অজ্ঞাতসারে আজাব চলে আসার পূর্বেই।” [সুরা যুমার: ৫৫]
তিনি আরও বলেন:
وَهَذَا كِتَبٌ أَنْزَلْنَهُ مُبْرَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
"এটি আমার অবতীর্ণ করা বরকতময় এক গ্রন্থ। অতএব, এর অনুসরণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চলো—যাতে তোমরা করুণাপ্রাপ্ত হও।” [সুরা আনআম: ১৫৫]
এ জন্যই, যে ব্যক্তি এই কিতাব হিফজ করল, কিন্তু তাকে আমলে পরিণত করল না, প্রকৃতপক্ষে সে এই কিতাবের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং গুরুত্বই উপলব্ধি করতে পারল না।
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা রহ. বলেন, “সবচেয়ে নির্বোধ সে, যে নিজের জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে না; সবচেয়ে জ্ঞানী সে, যে জ্ঞানানুসারে আমল করে। আর লোকদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।” (৩২)
বস্তুত এই বোধ ও মর্মোপলব্ধির ওপরই ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সাহাবা (রিদওয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমাইন)।
আলি বিন আবু তালেব রা. বলেন, “হে ইলমের ধারকবাহকগণ, ইলম অনুযায়ী আমল করো! কেননা, আলেম হলো সেই ব্যক্তি, যে তার ইলম অনুসারে আমল করে এবং তার ইলম তার আমলকে স্বীকৃতি দেয়। অচিরেই ইলমের ধারক এমন একদল লোকের আবির্ভাব ঘটবে, ইলম যাদের কণ্ঠনালিও অতিক্রম করবে না। তাদের আমলকে তাদের ইলম স্বীকৃতি দেবে না, তাদের গোপন আচরণ বাহ্যিক আচরণের বিপরীত হবে, তারা কোনো মজলিসে বসলে গর্ব-অহংকারে লিপ্ত হবে—এমনকি তাদের কোনো সঙ্গী যদি তাদের ছেড়ে অন্য কারও সাথে উঠবস করে, তবে তার প্রতি তারা ক্রোধান্বিত হয়ে উঠবে...। এরা সেই দল, যাদের সে-সব মজলিসের আমল আল্লাহ তাআলা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না।”(৩৩)
ইয়ামামার যুদ্ধে হজরত আম্মার বিন ইয়াসির রা.-ও এই রীতি অবলম্বন করেছিলেন। তিনি যখন হাফেজ মুসলিম মুজাহিদদের সাহস দিতে চাইতেন, তখন দাঁড়িয়ে বলতেন, “হে কুরআনের অধিকারীগণ, কুরআনকে হাতল [আমল] দ্বারা সজ্জিত করো।”(৩৪)
বুঝা গেল, কুরআন হিফজ করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং হিফজের সাথে অবশ্যই আমলের অনুসারী হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, হিফজকৃত অংশের ওপর আমল করা হলে তা নতুন অংশের হিফজ করা সহজ করে তুলবে। যেমন প্রবাদ রয়েছে, যে ব্যক্তি জ্ঞাত ইলম অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ তাকে অজানা বিষয়ের জ্ঞান প্রদান করেন।
অতএব, হিফজকৃত অংশের ওপর আমল মূলত কুরআনের নতুন অংশ হিফজ করার পথে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
টিকাঃ
*. ইহইয়াউ উলুমিদ্বীন: ৩২৪।
*২. সুনানে দারেনি: ৩৪২।
৩৩. সুনানে দারেমি: ৩৯৪।
৩৪. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৬/৩৬৭; [দারুল ইহয়ায়িত তুরাছিল আরাবি, প্রথম সংস্করণ- সূত্র: মাকতাবায়ে শামেলা]
📄 গোনাহ পরিত্যাগ করা
যে হৃদয় গোনাহর নেশায় আসক্ত, সে হৃদয়ও কি কুরআন ধারণ করতে পারে!! বস্তুত, বান্দা যত গোনাহে লিপ্ত হয়, তার হৃদয় তত কলুষিত হয়, আর তা যত বেশি কলুষিত হয়, এই পবিত্র কিতাব ধারণের ওপর তত বেশি শক্তি হারাতে থাকে...।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “বান্দা যখন একটি গোনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। এরপর যখন সে গোনাহর কাজ পরিহার করে তওবার সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তার অন্তর তখন পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে আর এভাবে তার পুরো অন্তর কালো দাগে ঢেকে যায়। এটাই সেই মরিচা, যা বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে,
'কখনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের মনে জং (মরিচা) ধরিয়েছে।[সুরা মুতাফফিফিন: ১৪]
এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল স্পষ্ট গোনাহই নয়, বরং আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্দেহ-সংশয়জনক গোনাহ থেকেও বেঁচে থাকতে আদেশ করেছেন। যেমন নুমান বিন বশির রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “হালালও স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ-দুরের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়, যার জ্ঞান অনেক মানুষেরই নেই। যে ব্যক্তি সে-সব সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়ে পড়বে, তার উদাহরণ সেই রাখালের ন্যায়, যে তার গবাদি পশু বাদশাহর সংরক্ষিত চারণভূমির আশেপাশে চরায়-বিধায় পশুগুলো সেখানে ঢুকে পড়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। জেনে রেখো, প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে; আর আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা হচ্ছে তাঁর নিষিদ্ধ কাজসমূহ। আরও জেনে রেখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন সুস্থ-সুষ্ঠু হয়ে যায়, পুরো শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর সেটা যখন নষ্ট হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন অসুস্থ-অসুস্থ হয়ে পড়ে-আর সে গোশতের টুকরোটি হলো 'কলব' (অন্তর)।” (৩৬)
এই বোধ ইমাম শাফিয়ি রহ. পেয়েছিলেন তাঁর শায়খ ইমাম ওয়াকি রহ.-এর প্রায়োগিক শিক্ষাদানের মাধ্যমে। ইমাম শাফিয়ি রহ.-এর আশ্চর্যজনক ধী-শক্তির খ্যাতি ছিল, কোনোকিছু কেবল একবার দেখেই তিনি মুখস্থ করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু একদিন তিনি লক্ষ করলেন, তার মেধা স্বভাবসুলভ কাজ করছে না। তখন তিনি তার শায়খ ওয়াকি রহ.-এর নিকট গিয়ে স্মরণশক্তির বিভ্রাটের কথা জানালেন। উত্তরে তিনি বললেন, আমার মনে হয় এটা তোমার কোনো গোনাহর কারণে হচ্ছে। তখন শাফিয়ি রহ.-এর ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল, একবার বাতাসের কারণে এক মহিলার পায়ের গোড়ালির কাপড় উঠে যায় আর সেখানে তাঁর নজর পড়ে। তখন তিনি বুঝতে পারলেন, এ-ই সেই গোনাহ, যা তার স্মরণশক্তিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। তখন তিনি জ্ঞান-প্রজ্ঞায় ভরপুর অপূর্ব সেই পঙক্তি-চতুষ্টয় রচনা করেন। তিনি বলেন,
شَكُوتُ إِلى وكيع سوء حفظى فَأَرْشَدَنِي إِلَى تَركِ المعاصي
وقال : إِنَّ العِلم نور ونورُ اللهِ لا يُهدى لعاصى
"স্মরণবিভ্রাটের অভিযোগে এলাম ওয়াকির নিকট, গোনাহ ত্যাগের নসিহতে করলেন পথনির্দেশ...। শুধালেন, ইলম যে এক আলোক, রবের সেই আলোক অর্জিত হয় না কোনো পাপিষ্ঠের।
সুবহানাল্লাহ! এই গোনাহই যখন ইমাম শাফিয়ির স্মরণশক্তিতে গোলযোগ তৈরি করেছিল, তাহলে এবার আমরা আশা করি বুঝতে পারব, কেন মাঝেমধ্যে কুরআন হিফজ আমাদের জন্য এতটা কঠিন হয়ে পড়ে!!
আবু উবাইদ রহ. শ্রেষ্ঠতম তাবিয়ি দাহহাক বিন মুযাহিম রহ.-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ আশ্চর্যজনক এক বাণী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআন শিখে ভুলে যায়, সেটা কেবল তার গোনাহর কারণেই হয়ে থাকে...। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ )
'তোমাদের উপর যে-সব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল।' [সুরা শুরা: ৩০]
আর আল্লাহর কুরআন ভুলে যাওয়া তো বড়সড় বিপদগুলোর অন্তর্ভুক্ত! (৩৭)
টিকাঃ
**. জামে তিরমিযি: ৩৩৩৪।
**. সহিহ বুখারি: ৫২, সহিহ মুসলিম: ১৫৯৯।
৩৭. শুয়াবুল ঈমান: ১৮১৩।