📄 ইখলাস
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা অবলম্বন। কেননা, মানুষ যখন কোনো কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে মূল লক্ষ্য রাখে না, তখন তার সেই কাজ হয় নিষ্ফল ও ব্যর্থ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ ﴾
“আপনি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি এই প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ করা হয়েছিল, যদি আল্লাহর সাথে শরিক স্থির করা হয়, তবে আপনার সমস্ত কর্মকাণ্ড হবে নিষ্ফল এবং আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [সুরা যুমার: ৬৫]
অতএব, সাবধান! সংযত হোন কুরআনের বিনিময়ে সম্মান-মর্যাদা কামনা থেকে; বিরত হোন বৈষয়িক উন্নতি বা ইমামতির পদ বাগিয়ে নিতে চাওয়া থেকে; বেঁচে থাকুন কুরআনের কারি হিসেবে প্রসিদ্ধি পাওয়ার ইচ্ছা থেকে; দূরত্ব বজায় রাখুন কুরআনের বিনিময়ে সম্পদ বা দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ হাসিল থেকে...।
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণযোগ্য ইলম যদি কেউ দুনিয়াবি স্বার্থ লাভের জন্য অর্জন করে, তবে কিয়ামতের দিন সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না।” (১৭)
ইমাম মুসলিম রহ. আবু হুরাইরা রা.-এর সূত্রে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, যেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে গৌণ রেখে মানুষের সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কাজ করার ভয়াবহতা স্পষ্ট আকারে বিবৃত হয়েছে।
আবু হুরাইরা রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, "কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বিচার করা হবে একজন শহিদের। তাকে উপস্থিত করা হলে আল্লাহ তার ওপর যে-সমস্ত নিয়ামত দান করেছিলেন, সে কথা উল্লেখ করবেন এবং সে তা স্বীকারও করবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, এর বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছিলে? সে বলবে, শহিদ হওয়া পর্যন্ত আমি আপনার পথে যুদ্ধ করে গেছি...। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; বরং তুমি যুদ্ধ করেছিলে লোকে যেন তোমাকে বীর-বাহাদুর বলে প্রশংসা করে; আর তা বলাও হয়েছে! এরপর আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী তাকে উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
এমনিভাবে এমন অন্য এক ব্যক্তির বিচার করা হবে, যে ইলম অর্জন ও বিতরণ করেছে এবং কুরআন মাজিদ অধ্যয়ন করেছে। তাকে হাজির করা হলে আল্লাহ তাআলা তার ওপর যে-সমস্ত নিয়ামত দান করেছিলেন, সে-কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন এবং সে তা স্বীকারও করবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, নিয়ামত পেয়ে বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছ? জবাবে সে বলবে, আমি ইলম অর্জন করেছি, অপরকে তা শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কুরআন অধ্যয়ন করেছি। জবাবে আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; তুমি তো ইলম অর্জন করেছিলে লোকে যেন তোমাকে আলেম বলে, কুরআন তিলাওয়াত করেছিলে লোকে যেন তোমাকে কুরআনের কারি বলে; আর তেমনটি হয়েছেও! তারপর আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ী তাকেও উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
এমনইভাবে এমন এক ব্যক্তির বিচার হবে, যাকে আল্লাহ তাআলা সচ্ছলতা এবং সর্ববিধ বিত্ত-বৈভব দান করেছিলেন। তাকে উপস্থিত করা হলে আল্লাহ তার ওপর যে-সমস্ত নিয়ামত দান করেছেন, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন এবং সে তা স্বীকারও করবে। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, এসব নিয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছ? জবাবে সে বলবে, যতসব খাতে সম্পদ ব্যয় করা আপনি পছন্দ করতেন, আপনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার সমস্ত খাতেই আমি সম্পদ ব্যয় করেছি। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; বরং তুমি তা করেছিলে লোকে যেন তোমাকে দানবীর বলে অভিহিত করে; আর তা করাও হয়েছে! অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হলে তাকেও উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (১৮)
সম্ভাব্য বিষয় ছিল, জাহান্নামের আগুন সর্বপ্রথম প্রজ্বলিত হবে কোনো হত্যাকারী, ব্যভিচারী বা মদপানকারীর জন্যে; কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর সন্তুষ্টির তোয়াক্কা না করে মানুষের সন্তুষ্টি কামনার ভয়াবহতা স্পষ্ট করতে চেয়ে সে দিবসে প্রথম ফায়সালা করার সিদ্ধান্ত নিলেন এমন এক দলের, যারা আমলে ছিল নিষ্ঠাহীন; যারা আমলের সওয়াব বা রবের সন্তুষ্টির ধার ধারেনি-কেবলই দুনিয়ার স্বার্থের পেছনে হন্যে হয়ে ছুটেছে...।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমরা কুরআন শিক্ষা করো এবং তার মাধ্যমে জান্নাত প্রার্থনা করো-সেই জাতি আসার পূর্বে, যারা তা শিক্ষা করবে জাগতিক স্বার্থ লাভের উদ্দেশ্যে। মনে রাখবে, তিন শ্রেণির লোক কুরআন শিক্ষা করে থাকে-কিছু লোক তা নিয়ে গর্ব-অহংকার করে, কিছু লোক তার মাধ্যমে স্বার্থ হাসিল করে আর কিছু লোক মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যেই তার তিলাওয়াত করে।” (১৯)
বান্দার ইখলাস যতটা শক্তিশালী হবে, খোদার কাছে তার পুণ্যের হিসেবও ততটা পুষ্ট হবে। যেমন সহিহ বুখারি ও মুসলিমে ইখলাসের বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে ধারণ করতে পারে, উমর রা. থেকে তেমন একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে-তিনি বলেন, "আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, প্রতিটি আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল; মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ীই প্রতিফল পাবে। অতএব, যার হিজরত হবে জাগতিক উদ্দেশ্যে অথবা কোনো নারীকে বিয়ের জন্যে, তবে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে, যে জন্যে সে হিজরত করেছে।” (২০)
কোনো আমলের দ্বারা বান্দার নেক নিয়তের পরিমাণ যত বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহর কাছে তার আমলের প্রতিদানও ততটা বড় হবে। উল্লেখ্য, কখনো বান্দা একটি পুণ্য-কাজের মাধ্যমেই একাধিক নেক নিয়ত রাখতে পারে। আর হিফজুল কুরআনের ক্ষেত্রেও সেই সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ আপনি যে নিয়তগুলো করতে পারেন:
১. অধিক কুরআন তিলাওয়াতের নিয়ত কেননা একজন হাফেজ তার স্মৃতিশক্তি ব্যবহার করে সর্বস্থানেই কুরআন তিলাওয়াত করতে সক্ষম হয়; সে এমন স্থানেও তা তিলাওয়াত করতে পারে, যেখানে কুরআন শরিফ বের করার পরিবেশ নেই। যেমন ধরুন, সে পথে হাঁটছে বা গাড়ি চালাচ্ছে কিংবা গাড়ির ভেতর প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে সেখানে কুরআন বের করার সুযোগ নেই অথবা সে এমন কোথাও আছে, যেখানে হাতের কাছে কুরআন শরিফ নেই—যেমন ক্লিনিকে, অফিসে, সফরে বা অন্য কোথাও...। অথচ সে স্পষ্ট জানে, কুরআনের একেকটি অক্ষর পাঠে রয়েছে দশটি করে নেকি; রয়েছে এমন প্রতিদান, বান্দার পক্ষে যা অনুমান করাও অসম্ভব!
২. মুখস্থ অংশের মাধ্যমে কিয়ামুল লাইলের (২১) নিয়ত লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, অন্যান্য সুরা না জানার দরুন কিয়ামুল লাইলে নির্দিষ্ট কিছু সুরা বারবার পড়তে পড়তে মানুষের মধ্যে অবসাদ চলে আসতে পারে। কিন্তু একজন হাফেজে কুরআন প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন সুরা তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর পুরো কিতাবের স্বাদ নিতে পারে এবং সেই অবসাদটুকু তাকে ছুঁতে পারে না।
৩. কুরআনের ধারকবাহক হওয়ার মর্যাদা লাভের নিয়ত
এই নিয়তের ফলে কিয়ামত দিবসে পুরো কুরআনই আপনার জন্য ঢাল হবে। তা ছাড়া এটি সেই মহান লক্ষ্য, যার জন্যে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে উম্মাহর দেহ-প্রাণ সবকিছু...।
৪. পিতা-মাতাকে কিয়ামত দিবসে মুকুট পরানোর নিয়ত
মুআজ বিন আনাস রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে এবং তদনুযায়ী আমল করে, কিয়ামতের দিন তার পিতা-মাতাকে এমন মুকুট পরানো হবে, সূর্য তোমাদের ঘরে বিরাজমান হলে যে আলো হতো, সেটি তার চেয়েও উজ্জ্বল হবে। তাহলে যে ব্যক্তি কুরআন অনুযায়ী আমল করে, তার [মর্যাদার] ব্যাপারে তোমাদের কী ধারণা!” (২২)
হাদিসটি সনদের বিচারে যদিও দুর্বল, কিন্তু যে-সকল বাবা-মা তার সন্তানদের কুরআনের হাফেজ বানান, তাদের প্রতিদান যে হবে শ্রেষ্ঠতম, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। অতএব, কুরআন হিফজের ক্ষেত্রে সন্তানদের শৈশবকে কাজে লাগানোর জন্য অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে এটি এক সুবিধাজনক বিষয়। আমাদের স্মরণ রাখা উচিত, বাচ্চাদের স্মরণশক্তি প্রাপ্তবয়স্কদের স্মরণশক্তির তুলনায় প্রখর হয়। যেমন প্রবাদ ছিল, বাল্যকালের শিক্ষা পাথরে খোদাই করার মতো (স্থায়িত্ব পায়)।
৫. পরকালীন শাস্তি থেকে বাঁচার নিয়ত
ইমাম দারেমি রহ. আবু উমামা বাহিলি রা. থেকে বর্ণনা করেন, "তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো আর নির্ভরকৃত এসকল [লিখিত] কুরআন যেন তোমাদের প্রবঞ্চিত করতে না পারে। মনে রেখো, আল্লাহ এমন অন্তরকে শাস্তি দেবেন না, যা কুরআনকে প্রকৃতরূপে ধারণ করে থাকে।” (২৩)
৬. অন্যকে শেখানোর নিয়ত
আপনি যখন কুরআন নিজে হিফজ করার পর তা অন্যদের হিফজ করিয়ে, তাজউইদ শিখিয়ে বা তাফসির করে মানুষের কাছে পৌঁছাবেন, তখন প্রমাণিত হয়ে যাবে, আপনি হচ্ছেন এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ একজন। এ কথা আমি বলছি না, বরং বুখারি শরিফে উসমান বিন আফফান রা. থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী এটি! তিনি বলেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে কুরআন শেখে ও শেখায়।” (২৪)
৭. মুসলিম-অমুসলিম সকলের জন্য আদর্শ হবার নিয়ত
আমরা সমাজে একজন দায়িত্বশীল হাফেজ ডাক্তার চাই, আমরা চাই একজন দায়িত্বশীল হাফেজ ইঞ্জিনিয়ার, চাই একজন দায়িত্ববান হাফেজ কৃষক ও হাফেজ কাঠমিস্ত্রি...। আমরা সামাজিক পেশাসমূহে দক্ষতার প্রতি গুরুত্বদানের পাশাপাশি হিফজ ও দায়িত্বশীলতার গুণ সম্পৃক্ত করে দিতে পারলে একটি দাওয়াতি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হবে। এভাবে মানুষরা তাদের পেশাগত দক্ষতা এবং ইসলাম, দায়িত্বশীলতা ও কুরআন হিফজের মাঝে সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবে। বস্তুত এটি হবে এক আদর্শিক দাওয়াতি বিপ্লব, অন্য কোনো আহ্বান যার সমতুল্য হতে সক্ষম হবে না।
এই হলো কুরআন হিফজের ক্ষেত্রে কিছু উত্তম নিয়তের উদাহরণ। তবে এ ক্ষেত্রে সকল মুসলমানেরই অন্য আরও অনেক নেক নিয়ত লালনের অবকাশ রয়েছে নিঃসন্দেহে...।
টিকাঃ
১৭ *. সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৫৬।
২০. সহিহ বুখারি: ১, সহিহ মুসলিম: ১৯০৭।
২১. এশার পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত পর্যন্ত রাত জেগে যে-সমস্ত ইবাদত করা হয়, সামগ্রিকভাবে তাকে 'কিয়ামুল লাইল' বলে। এতে তাহাজ্জুদের নামাজসহ অন্যান্য ইবাদত অন্তর্ভুক্ত। (সম্পাদক)
২২. সুনানে আবু দাউদ: ১৪৪৮।
২৩. সুনানে দারেমি: ৩৩৬২।
২৪. সহিহ বুখারি: ৫০২৭।
📄 দৃঢ় সংকল্প
হিফজুল কুরআন অত্যন্ত গুরুত্বভার একটি কাজ, কেবল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্যক্তিরাই যার সক্ষমতা রাখে। এই প্রকারের লোকেরা মূলত দৃঢ় সংকল্প নামক বিরাট এক গুণের অধিকারী হয়ে থাকেন। এসকল ব্যক্তিদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলা হয়, কেননা তারা উদ্দিষ্ট কর্মসাধনে পরম আগ্রহ পোষণপূর্বক চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রচেষ্টা চালায়। প্রতিটি মুসলিমের অন্তরেই যদিও হিফজুল কুরআনের আগ্রহ-আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান থাকে, কিন্তু কেবল এই ঝোঁকই যথেষ্ট নয়; বরং এর সাথে থাকতে হবে কর্মসাধনের দুর্দান্ত স্পৃহা। আল্লাহ তাআলার এই বাণীর প্রতি ভালো করে লক্ষ করুন,
﴿وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَبِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُورًا﴾
"যে ব্যক্তি পরকাল কামনা করে এবং ঈমানের সঙ্গে সে-জন্য যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করে, এমন লোকদের চেষ্টার পরিপূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হবে।” [সুরা বনি ইসরাইল: ১৯]
লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ব্যক্তিমাত্রই পরকালের সফলতা কামনা করে, কিন্তু তাদের মধ্যে সত্যবাদী-মিথ্যাবাদী চিহ্নিত হওয়ার উপায় কী?! সেই উপায় হচ্ছে, প্রথমত ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষেই অন্তরে কর্মের ইচ্ছা পোষণ করবে, এরপর তার এই আগ্রহকে দৃঢ় সংকল্পে রূপ দেবে, তারপর সেই সংকল্পকে একসময় বাস্তবকার্যে পরিণত করবে। বস্তুত এই অবস্থাই আল্লাহ তাআলার বাণী 'যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করা'-এর প্রকৃত ব্যাখ্যা। মুমিন ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে এ কাজ করতে থাকলে একসময় সেটি তার অভ্যাসে পরিণত হবে। এরপর আর তার জীবনে কোনো দিন এমন কাটবে না, যেদিন সে কুরআন তিলাওয়াত, নতুন হিফজ বা পেছনের মুখস্থ অংশকে ঝালিয়ে নিতে প্রচেষ্টায় লিপ্ত হবে না। সত্য বলতে, এই দৃঢ় সংকল্পই ব্যক্তিকে হিফজুল কুরআনের সৌভাগ্যপ্রাপ্তি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়...।
শাদ্দাদ বিন আওস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "বুদ্ধিমান সে ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাবনিকাশ রাখে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর নির্বোধ সেই ব্যক্তি, যে তার নফসের চাহিদা পূরণ করতে থাকে, আবার আল্লাহ তাআলার নিকট [বৃথা] আশা পোষণ করে।” (২৫)
অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে কুরআন হিফজ করতে পারার আশা রাখে, কিন্তু সে ব্যাপারে কোনোরূপ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে না-সে হচ্ছে মূলত নির্বোধ, অলীক বিশ্বাসে আক্রান্ত; দ্বীন ইসলামের স্বভাব-প্রকৃতি অনুধাবনের ব্যাপারে সে ব্যর্থ।
এজন্য বলছি, প্রিয় ভাই, অধ্যয়নরত এই পুস্তিকা শেষ করার সাথে সাথে আজই আপনি কুরআন হিফজের কাজে আত্মনিয়োগ করুন! আজকের কাজ কালকের জন্য ফেলে রাখবেন না যেন...। আর 'অচিরেই করব' বাক্য থেকে বেঁচে থাকুন; আজ নয়, বরং কাল করব-এমন গড়িমসি আপনাকে যেন ধোঁকায় না ফেলে! অনেকের অনেক নেক আমলের সুযোগ নষ্ট হয়ে যায় শুধু এ কারণে যে-তারা ভেবেছিল কাল বা পরশু শুরু করব অথবা ওই কাজটা শেষ হলে এই কাজটায় মনোযোগ দেবো...। অতএব, দৃঢ় প্রতিজ্ঞাপূর্বক আপনি আপনার সন্তানদের নিয়ে আজই এই মহান কর্মে আত্মনিয়োগ করুন!
টিকাঃ
২৫. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৬০, জামে তিরমিযি: ২৪৫৯, মুসনাদে আহমাদ: ১৭১২৩।
📄 কুরআন হিফজের মূল্য অনুধাবন
যে ব্যক্তি কোনো বিষয় বা বস্তুর মূল্য অনুধাবন করতে পারে, সে তার জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের চেষ্টা-মেহনত ও ত্যাগতিতিক্ষা করতে সক্ষম হয়। এই চিত্র জাগতিক বিষয়াদির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; মানুষ যখন কোনো কাজের মূল্য এবং তার মাধ্যমে আগত লাভের ব্যাপারে অবগত থাকে, স্বাভাবিকভাবেই সে তার পেছনে অধ্যবসায়ে লিপ্ত হয়ে থাকে।
পরকালীন ব্যাপারটিও তা থেকে ভিন্ন কিছু নয়। আপনি যখন কোনো আমলের প্রতিদানের মূল্য অনুধাবন করতে পারবেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি আপনার আগ্রহ-উদ্দীপনা বৃদ্ধি পাবে। উদাহরণত, কোনো এক ব্যক্তি কিয়ামুল লাইল বা জামাতে নামাজ পড়ার বিস্তারিত ফজিলত, পক্ষান্তরে অন্য একজন শুধু এটুকু জানে যে এগুলো বেশ ভালো কাজ, অতএব তারা দুজন যেমন সমান নয়, ঠিক তেমনইভাবে, যে ব্যক্তি বিস্তারিতভাবে কুরআনের ফজিলত জানে, সেও এই গ্রন্থের একটু-আধটু ফজিলত জানা ব্যক্তির অনুরূপ নয়...।
প্রিয় ভাই, নিম্নে আমরা কুরআন সম্পৃক্ত কিছু ফজিলতের কথা উল্লেখ করছি। তবে আমাদের অনুল্লেখিত বাণীও রয়ে গেছে প্রচুর পরিমাণে...।
১. হযরত আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কুরআনের অধিকারীরা হচ্ছে আল্লাহর পরিজন এবং তাঁর বিশেষ বান্দা।” (২৬)
২. ইবনু উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, "দুটি বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে ঈর্ষা(২৭) করা যায় না। প্রথমত, যাকে আল্লাহ তাআলা কুরআনের জ্ঞান দান করেছেন আর সে দিন-রাত তা তিলাওয়াত করতে থাকে। দ্বিতীয়ত, যাকে আল্লাহ তাআলা সম্পদ দান করেছেন আর সে দিন- রাত তা থেকে দান করতে থাকে।”(২৮)
৩. ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যার হৃদয়ে কুরআনের কিছুই নেই, সে বিধ্বস্ত ঘরের মতো।”(২৯)
৪. আবদুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “[কিয়ামতের দিন] কুরআনের অধিকারী ব্যক্তিকে বলা হবে, তিলাওয়াত করতে থাকো আর উচ্চে আরোহণ করতে থাকো; দুনিয়াতে যেভাবে তারতিলের সাথে পাঠ করতে, ঠিক সেভাবেই তারতিলের সাথে পাঠ করে যাও। যে আয়াতে তোমার পাঠ সমাপ্ত হবে, সেখানেই হবে তোমার স্থান।”(৩০)
অতএব, আলোচিত হাদিসগুলোর মাধ্যমে কুরআন হিফজের মূল্য সম্পর্কে ধারণা লাভের পর এবার আপনার অবশ্যকর্তব্য হলো, এই কাজের জন্য সময়, চেষ্টা-সাধনা এবং চিন্তাভাবনা ব্যয়ে আত্মনিয়োগ করা। বস্তুত আল্লাহই একমাত্র তওফিকদাতা!
টিকাঃ
* সুনানুল কুবরা লিন-নাসায়ি: ৭৯৭৭।
২৭. এই হাদিসে মূলত রূপকার্থে ঈর্ষা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, এই দুই ক্ষেত্রেও ঈর্ষার মূল অর্থ অনুযায়ী অন্যের নিয়ামত দূরীভূত হওয়ার কামনা করা বৈধ নয়; শুধু এটুকু কামনা করার অবকাশ রয়েছে, আল্লাহ তার নিয়ামতও বহাল রাখুন, পাশাপাশি আমাকেও তার মতো নিয়ামতে সিক্ত করুন। একে আরবিতে ‘গিবতা’ শব্দে ব্যক্ত করা হয়। (সম্পাদক)
২৮. সহিহ বুখারি: ৫০২৫, সহিহ মুসলিম: ৮১৫।
২৯. জামে তিরমিযি: ২৯১৩।
৩০. জামে তিরমিযি: ২৯১৪।
📄 হিফজকৃত নিয়াবলীর ওপর আমল করা
স্বাভাবিকভাবেই তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ধ্বংস সে ব্যক্তির জন্য, যে ইলম শিখল, কিন্তু তদনুযায়ী আমল করল না!
হযরত আনাস বিন মালিক রা. বলেন, “কিছু কুরআন তিলাওয়াতকারীকে খোদ কুরআন অভিসম্পাত করতে থাকে।”(৩১)
কিন্তু কুরআন কেন তার তিলাওয়াতকারীকে অভিশাপ দেয়?! কারণ, সে কুরআন পড়ে, মুখস্থ করে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে সে অনুযায়ী আমল করে না।
সে সুদের আয়াতগুলো পড়ে ও মুখস্থ করে এবং সে জানে যে সুদের লেনদেনকারী ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে—কিন্তু তারপরও সে সুদের কারবার করে! সে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের আয়াত পাঠ করে ও মুখস্থ করে, তাদের মর্যাদা ও তাদের কষ্ট দেওয়ার শাস্তির ব্যাপারে জানে—তারপরও সে পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়! বস্তুত এগুলোই তাকে অভিশাপের উপযুক্ত বানায়...। আমরা আল্লাহর নিকট এসব থেকে আশ্রয় কামনা করছি।
কুরআনের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হবে, সাইয়িদুনা উমর রা. সে ব্যাপারে দারুণ পথ বাতলে দিয়েছেন। তার জীবন থেকে জানা যায়, তিনি যখনই নতুন কিছু মুখস্থ করতেন, সে অনুযায়ী আমল করতেন; এরপর অন্য কিছু মুখস্থের উদ্যোগ নিতেন। কেননা, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কুরআন এমন কোনো গ্রন্থ নয়, যা কেবল মুখস্থ করা বা বরকত লাভের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে; বরং কুরআন مسلمانوں জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, সামাজিক জীবনের ছোট-বড় সকলকিছু পরিচালনার ক্ষেত্রেই এই গ্রন্থে দিকনির্দেশনা ও বিধিবিধান বিদ্যমান রয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاتَّبِعُوا أَحْسَنَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَّبِّكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ بَغْتَةً وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
"আপন রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ হওয়া উত্তম বিষয়ের অনুসরণ করো তোমাদের উপর অতর্কিতে ও অজ্ঞাতসারে আজাব চলে আসার পূর্বেই।” [সুরা যুমার: ৫৫]
তিনি আরও বলেন:
وَهَذَا كِتَبٌ أَنْزَلْنَهُ مُبْرَكٌ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
"এটি আমার অবতীর্ণ করা বরকতময় এক গ্রন্থ। অতএব, এর অনুসরণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চলো—যাতে তোমরা করুণাপ্রাপ্ত হও।” [সুরা আনআম: ১৫৫]
এ জন্যই, যে ব্যক্তি এই কিতাব হিফজ করল, কিন্তু তাকে আমলে পরিণত করল না, প্রকৃতপক্ষে সে এই কিতাবের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং গুরুত্বই উপলব্ধি করতে পারল না।
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা রহ. বলেন, “সবচেয়ে নির্বোধ সে, যে নিজের জ্ঞান অনুযায়ী আমল করে না; সবচেয়ে জ্ঞানী সে, যে জ্ঞানানুসারে আমল করে। আর লোকদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।” (৩২)
বস্তুত এই বোধ ও মর্মোপলব্ধির ওপরই ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল সাহাবা (রিদওয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমাইন)।
আলি বিন আবু তালেব রা. বলেন, “হে ইলমের ধারকবাহকগণ, ইলম অনুযায়ী আমল করো! কেননা, আলেম হলো সেই ব্যক্তি, যে তার ইলম অনুসারে আমল করে এবং তার ইলম তার আমলকে স্বীকৃতি দেয়। অচিরেই ইলমের ধারক এমন একদল লোকের আবির্ভাব ঘটবে, ইলম যাদের কণ্ঠনালিও অতিক্রম করবে না। তাদের আমলকে তাদের ইলম স্বীকৃতি দেবে না, তাদের গোপন আচরণ বাহ্যিক আচরণের বিপরীত হবে, তারা কোনো মজলিসে বসলে গর্ব-অহংকারে লিপ্ত হবে—এমনকি তাদের কোনো সঙ্গী যদি তাদের ছেড়ে অন্য কারও সাথে উঠবস করে, তবে তার প্রতি তারা ক্রোধান্বিত হয়ে উঠবে...। এরা সেই দল, যাদের সে-সব মজলিসের আমল আল্লাহ তাআলা পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না।”(৩৩)
ইয়ামামার যুদ্ধে হজরত আম্মার বিন ইয়াসির রা.-ও এই রীতি অবলম্বন করেছিলেন। তিনি যখন হাফেজ মুসলিম মুজাহিদদের সাহস দিতে চাইতেন, তখন দাঁড়িয়ে বলতেন, “হে কুরআনের অধিকারীগণ, কুরআনকে হাতল [আমল] দ্বারা সজ্জিত করো।”(৩৪)
বুঝা গেল, কুরআন হিফজ করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং হিফজের সাথে অবশ্যই আমলের অনুসারী হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, হিফজকৃত অংশের ওপর আমল করা হলে তা নতুন অংশের হিফজ করা সহজ করে তুলবে। যেমন প্রবাদ রয়েছে, যে ব্যক্তি জ্ঞাত ইলম অনুযায়ী আমল করে, আল্লাহ তাকে অজানা বিষয়ের জ্ঞান প্রদান করেন।
অতএব, হিফজকৃত অংশের ওপর আমল মূলত কুরআনের নতুন অংশ হিফজ করার পথে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
টিকাঃ
*. ইহইয়াউ উলুমিদ্বীন: ৩২৪।
*২. সুনানে দারেনি: ৩৪২।
৩৩. সুনানে দারেমি: ৩৯৪।
৩৪. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৬/৩৬৭; [দারুল ইহয়ায়িত তুরাছিল আরাবি, প্রথম সংস্করণ- সূত্র: মাকতাবায়ে শামেলা]