📄 অনুবাদকের কথা
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় আমিই কুরআন নাজিল করেছি আর আমিই তা হেফাজত করব।’ [সুরা হিজর: ৯]
কুরআন একমাত্র গ্রন্থ, যার হেফাজতের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তাআলা গ্রহণ করেছেন। এটি আসমানি প্রতিশ্রুতি। আর ‘আল্লাহ কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।’ [সুরা আলে ইমরান: ৯]
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণে কুরআন সংরক্ষণের বিস্ময়করসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। যেমন তিনি উম্মাহর বহু সন্তানের বুকে কুরআনের ছবি এঁকে দিয়েছেন আর তাকে করেছেন সহজ, এর হিফজকে করেছেন আয়ত্তসাধ্য। ফলে কুরআনের শব্দ আজও সংরক্ষিত, অর্থ সুরক্ষিত এবং কুরআনের আমলি রূপ উম্মাহর মাঝে প্রতিষ্ঠিত।
এমনইভাবে যে ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, সে ভাষা ও তার পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতাও সুরক্ষিত, যে মহান ব্যক্তিত্বের ওপর তা অবতীর্ণ হয়েছিল, তাঁর জীবনচরিতও অবিকৃত, এমনকি যাদের সম্বোধন করে এসেছে ঐশী এ বার্তা, তাদের জীবনেতিহাস পর্যন্ত আমাদের নিকট অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত অবস্থায় বিদ্যমান।
আজ চৌদ্দশত বছর পরেও শত-হাজার-লাখ মুসলিম সন্তান এ গ্রন্থ বুকে ধারণ করে আছে। হাজারো কূটপ্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র, হাজারো যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞ কুরআনের প্রতিরূপকে বিকৃত করতে পারেনি। বস্তুত, কুরআন একটি পরশপাথর—এর সংস্পর্শে যা আসে, যে আসে, সবই দামি ও মর্যাদাবান হয়ে ওঠে।
যে মাসে এ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, সে মাস বাকি এগারো মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ; যে রাতে এ কুরআন এসেছে, সে রাত অন্যসব রাতের তুলনায় মর্যাদাপূর্ণ; যে নবীর ওপর এ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, তিনিও সর্বশ্রেষ্ঠ এবং শেষ ও সমগ্র জাহানের দায়িত্বপ্রাপ্ত। এমনকি ইসলামের চৌদ্দশ বছরের সোনালি ইতিহাসে যারা কোনোভাবে কুরআনের সংস্পর্শে এসেছে, তারাই সফলকাম হয়েছে—পৌঁছে গেছে মর্যাদার শিখরে...।
দ্বীনি ইলমের সমৃদ্ধি-প্রত্যাশী প্রতিটি ব্যক্তির জন্যই কুরআন ও হাদিসের ‘নুসুস’ (টেক্সট) মুখস্থ থাকা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। হিফজুল কুরআন এবং হিফজুল হাদিস দুটোই এ ক্ষেত্রে সমানভাবে দরকারি। তবে কুরআনুল কারিমের হাফেজ প্রতিটি মানুষ আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত ‘কুরআন-সংরক্ষণকারী দলের’ অন্তর্ভুক্ত হবেন—কারণ, তিনি তাদের এক মহা নিয়ামতে ঋদ্ধ করে এই মূল্যবান গ্রন্থের হাফেজ বানিয়েছেন, তাদের সম্মান বৃদ্ধি করেছেন আর তাদের পুণ্যের ভাগ করেছেন সমৃদ্ধ; মুমিন জাতিকে নির্দেশ প্রদান করেছেন, তারা যেন তাদের মর্যাদা দান করে, অন্যদের ওপর তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, “আল্লাহ তাআলা এ গ্রন্থের দ্বারা কাউকে সম্মানিত করেন, কাউকে করেন অপদস্থ।” (১)
ড. রাগিব সারজানি বর্তমান সময়ের একজন আলোচিত লেখক; নন্দিত ইতিহাসবিদ। তাঁর মতো বরেণ্য মানুষ এর বৈষয়িক গুরুত্ব অনুধাবন করে শ্রেষ্ঠ হাফেজদের অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগতভাবে গবেষণালব্ধ বিষয়াদির মাধ্যমে বক্ষ্যমাণ পুস্তিকা রচনা করেছেন। পুস্তিকা না বলে একে বরং একটি রুটিন বা কার্যবিধি বলা যায়।
আমি মনে করি, হিফজুল কুরআনে আগ্রহী প্রতিটি ব্যক্তির কুরআনের সাথে এই ছোট্ট পুস্তিকাটি থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত যারা সময় পার করে ফেলেছেন—জাগতিক ব্যস্ততার কারণে আর হিফজের সুযোগটুকু পাচ্ছেন না। যারা কলেজ- ভার্সিটিতে পড়ছেন অথবা যাপিত জীবনের গোলকধাঁধায় এমনভাবে আটকে গেছেন, যেখানে হিফজুল কুরআনের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সাহস করতে পারছেন না—তাদের জন্য পুস্তিকাটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। হিফজুল কুরআনের আদ্যোপান্ত শেষ করতে যতগুলো স্তর অতিক্রম করা প্রয়োজন, যতগুলো রুটিন ও কর্মবিধি প্রস্তুতকরণের দরকার, বইটিতে প্রায় সবই তিনি আলোচনা করেছেন।
লেখক যেহেতু বরেণ্য মানুষ, পাশাপাশি তিনি নিজে একজন হাফেজ, তাই কুরআনের কোন অনুলিপি সংগ্রহ করবেন, কীভাবে কোথা থেকে শুরু করবেন, কতদিন সময় বেঁধে নেবেন, কীভাবে ইয়াদ (স্মরণ) রাখবেন, কোন পর্যায়ের মেধাসম্পন্ন লোকের কী পরিমাণ পড়তে হবে, ব্যস্ততার মাঝেও কীভাবে সময় বের করে নিতে হবে ইত্যাদি—সব বিষয়েই তিনি বিন্যস্ত নীতিমালা প্রস্তুত করে দিয়েছেন, বন্ধুবৎসল শিক্ষকের মতো পরামর্শ দিয়ে বাধিত করেছেন। যে-কোনো তবে পুস্তিকাটিতে উল্লেখিত আয়াত, হাদিস ও বাণীসমূহের সূত্র উল্লেখ করা ছিল না। তাই অন্বেষণপূর্বক সেগুলোর সূত্র সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি শেষে গ্রন্থসূত্রও উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া, যে-সমস্ত কথা ব্যাখ্যামূলকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে, সেখানে তৃতীয় বন্ধনী [] ব্যবহার করা হয়েছে।
আমি বলব, ছোট্ট এই পুস্তিকাটি একবার পড়ে সেলফে তুলে রাখার মতো নয়; বরং হিফজ-প্রত্যাশী প্রতিটি ব্যক্তির কুরআনের সাথেই তা থাকা উচিত। বইটি মুসলিম ভাই-বোনদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাক, এটাই আমাদের কামনা।
ছাপার হরফে আমি একদমই নবীন। এটি আমার অনূদিত প্রথম বই। অতএব, ভুলত্রুটি থেকে যাওয়া একদম স্বাভাবিক। আশা করি, বইটির কোনো কথায় বা শব্দ ও বাক্যচয়নে কোনো অসংগতি অনুভূত হলে বিজ্ঞ পাঠক আমাদের সে বিষয়ে অবহিত করবেন। কলেবর ছোট্ট হলেও প্রথম বই হিসেবে কুরআনুল কারিম সংশ্লিষ্ট কাজ করতে পেরে আমি আপ্লুত।
মাকতাবাতুল হাসানের যারা বইটি প্রকাশের পেছনে শ্রম দিয়েছেন, আল্লাহ তাদের উত্তম বিনিময় দিন।
পরিশেষে, নন্দিত লেখক ড. রাগিব সারজানির পথনির্দেশে শুরু হোক আপনার হিফজের পথচলা-আমিন।
দোয়ার মুহতাজ সাদিক ফারহান
টিকাঃ
১. সহিহ মুসলিম: ৮১৭।
📄 প্রাককথন
সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর-আমি তাঁর প্রশংসা আদায় করছি, তাঁর নিকট সাহায্য, ক্ষমা এবং হিদায়াত কামনা করছি; তাঁর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি প্রবৃত্তির অনিষ্ট ও আমাদের মন্দ আমলের আগ্রাসন থেকে! তিনি যাকে পথ দেখান, তাকে কেউ বিপথে নিতে পারে না; আর তিনি যাকে বিপথে রাখেন, তাকে পথে আনার কেউ থাকে না।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক-তাঁর কোনো শরিক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। হে আল্লাহ, আপনার সমস্ত নামের ওসিলা দিয়ে প্রার্থনা জানাচ্ছি, আপনি কুরআনকে করুন আমাদের হৃদয়ের বসন্ত, অন্তরের আলোক এবং দুশ্চিন্তা-দুর্ভোগ দূরীকরণের মাধ্যম...।
পরকথা,
আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের যে-সমস্ত নেয়ামত দান করেছেন, তার মাঝে শ্রেষ্ঠতম হলো এই কুরআন। লক্ষ করে দেখুন, মানবকে তার সৃষ্টির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পূর্বে তিনি কুরআন শিক্ষাদানের নেয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন! যেমন সুরা আর- রহমানে তিনি বলেন,
الرَّحْمَنُ، عَلَّمَ الْقُرْآنَ، خَلَقَ الْإِنْسَانَ
"তিনিই তো রহমান-যিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, সৃষ্টি করেছেন মানবকুল।” [সুরা আর-রহমান: ১-৩]
অর্থাৎ কুরআনের জ্ঞানহীন মানুষকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন বলতেই যেন অনীহ এবং এই জ্ঞানের অবিদ্যমানতায় সেই মানব তাঁর নিকট নির্জীব জড়পদার্থের মতোই তুচ্ছ...। এমনইভাবে আল্লাহ তাআলা সুরা আনফালে বলেন,
(يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ)
"হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সেই ডাকে সাড়া দাও, যা তোমাদের জীবন দান করে।” [সুরা আনফাল: ২৪] অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ডাকে সাড়া দেয় না যে মানব, সে যেন প্রাণহীন মৃত কোনো জীব।
একদল মানুষকে আল্লাহ তাআলা মহান নেয়ামতে ঋদ্ধ করেছেন- তিনি তাদের এই মহামূল্যবান গ্রন্থের হাফেজ বানিয়েছেন, তিনি তাদের সম্মান বৃদ্ধি করেছেন, তাদের পুণ্যের ভাগ সমৃদ্ধ করেছেন এবং মুমিন জাতিকে নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন তাদের মর্যাদা দান করে এবং অন্যদের তুলনায় তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করে। একাধিক হাদিসে বিষয়টির কথা এসেছে। যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ তাআলা এ গ্রন্থের মাধ্যমে কাউকে করেন সম্মানিত, কাউকে করেন অপদস্থ।” (২)
এ ছোট্ট বইটিতে আমরা এমন কিছু নির্দেশনা উপস্থাপন করব, যেগুলো হিফজুল কুরআনের গুরুদায়িত্ব পালনে আপনার সহায়ক হবে বলে আমরা আশাবাদী। সে উদ্দেশ্যে এখানে প্রথমে আমরা প্রধান প্রধান দশটি মৌলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করব-বস্তুত হিফজুল কুরআনে আগ্রহী কেউই সেগুলো থেকে অমুখাপেক্ষী নয়। এরপর কিছু সহায়ক নিয়মনীতি উল্লেখ করব, যেগুলোর গুরুত্ব বিচারে যদিও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তবে তা প্রথম দশটি বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা মোটেও হ্রাস করে না। অতএব, সর্বসাকুল্যে এখানে আমরা মোট বিশটি উপায়-উপকরণ নিয়ে আলোচনা করব।
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের তাঁর কিতাব হিফজের, অর্থ অনুধাবনের এবং তদনুযায়ী আমল করার তওফিক দান করেন। পাশাপাশি তিনি আমাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা কুরআনের সম্মান রক্ষা করেছেন, তাকে সমুচ্চ করেছেন, তার রঙে রঙিন হয়েছেন; সর্বোপরি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কুরআনের বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করেছেন।
তাঁর কাছে আরও কামনা করছি, তিনি যেন এই বইটির মাধ্যমে আমার ও সকল পাঠকের পুণ্যের পাল্লা ভারী করেন! বস্তুত তিনি সকল কিছুতেই সক্ষম, বান্দার ডাকে সাড়া প্রদানকারী!
-ড. রাগিব সারজানি
টিকাঃ
২. সহিহ মুসলিম: ৮১৭।
📄 জাগ্রত হোক দায়িত্ববোধ
আমি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলতে চাই, কুরআন হিফজ করে হাফেজ হওয়ার সাথে সাথে ব্যক্তির দায়িত্ব বেড়ে যায় বহুগুণ। যাকে আল্লাহ তাআলা এই নিয়ামত দান করেন, তার উপলব্ধি আসা উচিত, কুরআন হিফজের সাথে সাথে তার নবজীবন শুরু হতে যাচ্ছে, কারণ আজ থেকে তার বুকে সংরক্ষিত আছে পবিত্র এক গ্রন্থ। অতএব তার জন্য জরুরি হলো, কুরআন হিফজের পূর্বাপর এক না-রাখা; বরং এই মহান গ্রন্থ হিফজের সাথে সাথে তার ভেতরে বহুমুখী বিপ্লব আসতে হবে। তার ভেতর-বাহির, প্রকাশ্য- অপ্রকাশ্য, সম্পর্ক ও আচার-আচরণ-মোটকথা সবকিছুতেই ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে।
মনে রাখতে হবে, সে এখন কুরআন বহনকারী এক বিশেষ মানুষ। আর এমন মানুষের ভেতর-বাহির সাজাতে হয় কুরআনের ধারকদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়ে...।
মহান সাহাবি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রা. বলেন, "একজন কুরআনের ধারককে চেনা যাবে তার রাতে-যখন লোকেরা ঘুমে বিভোর; চেনা যাবে তার দিনে-যখন বাকিরা রকমারি আহারে মত্ত; চেনা যাবে তার দুঃখবোধে-যখন মানুষ আনন্দে আত্মহারা; চেনা যাবে তার কান্নায়-যখন লোকে হাসিঠাট্টায় লিপ্ত; চেনা যাবে তার নীরবতায়-যখন লোকেরা গল্পে মজে; চেনা যাবে তার বিনয়ে-যখন বাকিরা ডুবে অহম প্রকাশে...।
একজন কুরআনবাহীর হতে হবে বিনয়ী, নম্র; সে কখনো কঠোর ও কটুভাষী হবে না, কখনো চিৎকার-চেঁচামেচি করবে না বা রূঢ় স্বভাবী হবে না।” (৬)
বিখ্যাত তাবেয়ি হজরত ফুজাইল বিন ইয়াজ রহ. বলেন, "একজন কুরআনের ধারক হচ্ছে মূলত ইসলামের পতাকা বহনকারী ব্যক্তি। অতএব, তাঁর জন্য ঠাট্টামশকরাকারী, অনর্থক কাজে লিপ্ত এবং উদাসীন প্রকৃতির লোকের সাথে অংশগ্রহণ-উঠবস করা উচিত নয়!” (৭)
তিনি আরও বলেন, “কুরআনের ধারক যিনি, খলিফা [শাসক] বা এমন কারও কাছে তার কোনো প্রয়োজন থাকতে পারে না।” (৮)
ইবনে মাসউদ রা. এবং ফুজাইল বিন ইয়াজ রহ. যে বৈশিষ্ট্যগুলোর বিবরণ দিলেন, তাতে স্পষ্ট যে—হিফজুল কুরআন হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এক প্রকার প্রশিক্ষণ, যা ব্যক্তি ও জাতি গঠনে অবদান রেখে থাকে। আর মুসলিম জাতিতে যদি এমন গুণসংবলিত ব্যক্তিদের আধিক্য সৃষ্টি হয়, তবে সে জাতি হবে নিশ্চিত অমর, অক্ষয়...।
আল্লাহ পাক হাফেজে কুরআনদের মহান এক দায়িত্ব দিয়েছেন, যা মূলত সর্বোৎकृष्टদেরই দেওয়া হয়ে থাকে। তারা কুরআন ও তার তাজউইদে (কুরআন পাঠের নিয়মকানুন) দক্ষ হওয়ার কারণে তাদের নিকট ইসলামের সুমহান ইবাদত নামাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
আবু মাসউদ আনসারি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি কুরআন পাঠে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী, সে-ই লোকদের নামাজের ইমামতি করবে। সবাই যদি এ ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের হয়, তবে যে ব্যক্তি সুন্নত [নামাজের বিধিবিধান] সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত, সে ইমামের দায়িত্ব পালন করবে। সুন্নাহর ব্যাপারেও যদি সবাই সমান হয়, তবে হিজরতের ক্ষেত্রে যে অগ্রগামী, সে ইমাম হবে। তারা সবাই এ ক্ষেত্রেও যদি সমপর্যায়ের হয়, তবে যে ব্যক্তি ইসলামের ক্ষেত্রে অগ্রগামী, সে ব্যক্তি নামাজ পড়াবে। আর কেউ যেন কোনো ব্যক্তির কর্তৃত্বাধীন স্থানে নামাজ না পড়ায় এবং কারও বাড়িতে তার অনুমতি ব্যতীত তার ব্যক্তিগত আসনে না বসে।” (৯)
উল্লেখ্য, অন্য রেওয়ায়াতে 'ইসলামের ক্ষেত্রে অগ্রগামী'-এর স্থলে 'বয়সে প্রবীণ' বলে বর্ণিত রয়েছে।
এমনইভাবে ইসলাম কুরআনের এ সকল ধারককে অন্যদের উপর প্রাধান্য দিয়েছে ফতোয়া দান এবং পরামর্শ ও মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে। কেননা, আল্লাহ যার হৃদয়কে কুরআনের আলোয় আলোকিত করেছেন, সে বাতিলের বিপরীতে হক এবং ভুলের বিপরীতে সঠিক বিষয় অনুধাবনে অধিক সক্ষম হবে। যেমন হজরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, "কুরআনের জ্ঞানী প্রবীণ-যুবা নির্বিশেষে উমর রা.-এর সভাসদ এবং উপদেষ্টা হতেন।” (১০)
যুদ্ধ-জিহাদেও হাফেজে কুরআনরা অন্যদের চেয়ে দৃঢ়পদ হয়ে থাকেন। বরং অন্যদের দায়দায়িত্ব বহনের জন্য তাদেরই নির্বাচন করা হয়ে থাকে, তাদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয় সেনাদল। যেমন প্রসিদ্ধ ইয়ামামার যুদ্ধে মুসলমানরা তখন ময়দানে; যখনই মুসলিম শিবিরে বিপর্যয় দেখা দিত, সেনারা তখন 'হে আহলুল কুরআন' বলে ডেকে তাদের কাছে সাহায্য কামনা করতো। তখন কুরআনের হাফেজরা এগিয়ে আসতেন আর তাদের পেছনে অন্যরাও উদ্যমের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতো। এভাবে এক যুদ্ধেই পাঁচশত হাফেজে কুরআন শহিদ হয়ে যান। তাদের শাহাদাতের পর সেনারা 'হে আহলুল বাকারা' বলে কুরআনের ধারকদের সাহায্য চাইতো। অতঃপর তারাও যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। এভাবে বহু সংখ্যক কুরআনের ধারক শহিদ হয়ে যান...।
বস্তুত এ ধরনের ঘটনা আমাদের নিকট স্পষ্ট করে, কুরআনের ধারকদের ওপর যুগে যুগে কতটা দায়দায়িত্ব অর্পিত থাকত।
তবে কারও এ কথা বলা সংগত হবে না যে, "এটি অনেক ভারী ও গুরুদায়িত্ব, অতএব শুধু শুধু নিজের কাঁধে এই ভার বহন করার কোনো মানে হয় না...!"
বরং এ ক্ষেত্রে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, ইসলামের প্রতিটি বিধানই মূলত আমাদের দায়িত্বের আওতায় পড়ে। যেমন যুদ্ধ-জিহাদ একটি দায়িত্ব, দাওয়াত একটি দায়িত্ব, এমনইভাবে শাসন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলাও একেকটি দায়িত্ব। অতএব, মুসলিমরাই যদি শঙ্কিত হয়ে পিছিয়ে পড়ে, তবে এ সকল দায়িত্ব পালন করতে কে এগিয়ে আসবে, বলুন?! তা ছাড়া, সওয়াব ও প্রতিদান নির্ণীত হয় পরিশ্রম অনুসারে; স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হচ্ছে, যে ব্যক্তি উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে চেষ্টা-সাধনায় লিপ্ত হয় এবং সেই লক্ষ্যে রাত্রি জাগরণ করে, হতোদ্যম ও অলস ব্যক্তি কখনো তার বরাবর হতে পারে না! বস্তুত, এ ক্ষেত্রে নিয়ত ও কর্মোদ্যমতাই মুখ্য, সফলতার ওপর কোনো কিছু নির্ভর করে না। অন্যদিকে মহান আল্লাহ তো আমাদের সামর্থ্য জানেনই—আর তিনিই আমাদের হিসাবনিকাশ গ্রহণ করবেন। [অতএব ভাবনার কিছু নেই]।
দয়াময়ের নিকট প্রার্থনা, তিনি আমাদের সকলকে তার দ্বীনের কাজের জন্য কবুল করুন।
টিকাঃ
*. ইহইয়াউ উলুমিদ্বীন: ২৮৪, আত-তিবয়ান লিন-নববি: ৫৪ (শুধু প্রথমাংশ)।
৭. আত-তিবয়ান লিন-নববি: ৫৫।
৮. আত-তিবইয়ান লিন-নববি: ৫৫। —অর্থাৎ যথাসম্ভব দূরে থাকা। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাকে কুরআনের জ্ঞান দানের মাধ্যমে যে দ্বীনি নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, শাসক এবং তদশ্রেণীয়দের সঙ্গে উঠবসের ফলে সেই নেতৃত্বের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব কমে আসে। (সম্পাদক)
৯. সহিহ মুসলিম: ৬৭৩।
১০. সহিহ বুখারি: ৪৬৪২।
📄 ইসলামে হাফেজে কুরআনের মর্যাদা
পূর্বে উল্লেখিত আলোচনাসমূহের মাধ্যমে এটি প্রতিভাত হয়, ইসলামে কুরআন মুখস্থকারী হাফেজদের রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা, আর তা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ কিয়ামত অবধি....
ইমাম মুসলিম রহ. বর্ণনা করেন, নাফে বিন আবদুল হারেস রা. উসফান নামক স্থানে উমর রা.-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। উমর রা. তাকে মক্কার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চলের ভার কাকে দিয়ে এসেছেন? তিনি বললেন, ইবনু আবযাকে। উমর রা. জিজ্ঞেস করলেন, এই ইবনু আবযা কে? তিনি (নাফে) বললেন, আমাদের একজন 'মাওলা' (১১)। উমর রা. বললেন, আপনি একজন 'মাওলা'-কে তাদের দায়িত্ব দিয়ে এসেছেন?! নাফে বললেন, সে কুরআন পাঠে প্রাজ্ঞ আর ফারায়েজ (উত্তরাধিকার) শাস্ত্রেও অভিজ্ঞ। তখন উমর রা. বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা এ কিতাবের মাধ্যমে অনেক জাতির মর্যাদা উন্নত করেন আর অনেক জাতিকে অবনত করেন। (১২)
জাবের বিন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহিদদের দুজন দুজন করে এক কাফনে রেখে এক কবরে দাফন করছিলেন; তখন তিনি জিজ্ঞেস করতেন, উভয়ের মাঝে কুরআন কে অধিক জানত? তখন যার দিকে ইঙ্গিত করা হতো, তাঁকে আগে কবরে রাখা হতো।” (১৩)
আবু মুসা আশআরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "বয়স্ক মুসলিম, অতিরঞ্জন ও অবহেলা না-করা কুরআনের ধারকবাহক এবং ন্যায়পরায়ণ বাদশাহকে সম্মান করা মূলত আল্লাহ তাআলাকে সম্মান করারই অন্তর্ভুক্ত।” (১৪)
টিকাঃ
১১ ". 'মাওলা' শব্দের একাধিক অর্থ রয়েছে। যেমন আজাদকৃত গোলামকে তার মনিবের দিকে সম্বন্ধ করে অমুকের মাওলা বলা হয়। আবার হালিফকেও মাওলা বলা হয়—হালিফ হচ্ছে, যে দুর্বল ব্যক্তি বা গোত্র কোনো শক্তিশালী, ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোত্রের সহযোগিতাপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে শর্তের ভিত্তিতে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়। তখন তাদের সেই শক্তিশালী ব্যক্তি বা গোত্রের দিকে সম্বন্ধ করে পরিচয় প্রদান করা হয়, যেমন কুরাইশ গোত্রের মাওলা/হালিফ।
এখানে উমর রা.-এর বিস্ময় প্রকাশের কারণ হলো, মক্কায় সম্ভ্রান্ত কুরাইশরা রয়েছে, কিন্তু তুলনামূলক নিম্নশ্রেণির একজনকে তাদের কর্তৃত্ব দিয়ে আসা হয়েছে। (সম্পাদক)
১২. সহিহ মুসলিম: ৮১৭।
১৩ সহিহ বুখারি: ১৩৪৩।
১৪ **. সুনানে আবু দাউদ: ৪৮১০।