📘 কোরআন হাদিসের মানদণ্ডে সুফিবাদ 📄 ৬) নবী-রাসূলদের সম্পর্কে সূফীদের ধারণা

📄 ৬) নবী-রাসূলদের সম্পর্কে সূফীদের ধারণা


নবী-রাসূলদের ব্যাপারে সুফীদের বিভিন্ন ধারণা রয়েছে। তাদের কতিপয়ের কথা হচ্ছে-
خضنا بحراً وقف الأنبياء بساحله
অর্থাৎ আমরা এমন সাগরে সাঁতার কাটি, নবীগণ যার তীরে দাঁড়িয়ে থাকেন। অর্থাৎ সুফীগণ এমন মর্যাদায় পৌঁছতে পারেন, যা নবীদের পক্ষেও সম্ভব নয়।

📘 কোরআন হাদিসের মানদণ্ডে সুফিবাদ 📄 ৭) অলী-আওলীয়াদের ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস

📄 ৭) অলী-আওলীয়াদের ব্যাপারে তাদের বিশ্বাস


অলী-আওলীয়াদের ক্ষেত্রে সুফীদের আকীদা হচ্ছে, তাদের কেউ নবীদের চেয়ে অলীগণকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, অলীগণ এবং আল্লাহর মাঝে কোন পার্থক্য নেই। আল্লাহর সকল গুণই অলীদের মধ্যে বর্তমান। যেমন সৃষ্টি করা, রিযিক প্রদান করা, কাউকে জীবন দান করা, কাউকে মৃত্যু দান করা ইত্যাদি আরও অনেক। এ জাতীয় বিশ্বাস যে শির্ক তাতে বিন্দু মাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।

📘 কোরআন হাদিসের মানদণ্ডে সুফিবাদ 📄 ৮) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি

📄 ৮) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি


সুফীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নূরের তৈরী মনে করে। তারা নিম্নের বানোয়াট হাদীছটিকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে থাকে।
أول ما خلق الله تعالى نوري
অর্থাৎ আল্লাহ্ তাআলা সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন শব্দে একই অর্থে সুফীদের কিতাবে সনদবিহীন ভাবে এই বানোয়াট হাদীছটি উল্লেখিত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় এই আমাদের দেশের অধিকাংশ সুন্নী মুসলমানও এই আকীদাই পোষণ করে থাকে। অথচ কুরআন ও সহীহ হাদীছের ভাষ্য থেকে জানা যায় যে, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরী ছিলেন না এবং তিনি সর্বপ্রথম সৃষ্টিও ছিলেন না। সহীহ হাদীছ থেকে জানা যায় যে, আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
إن أول شيء خلقه الله تعالى القلم ، وأمره أن يكتب كل شيء يكون
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম যে জিনিষটি সৃষ্টি করেছেন, তা হচ্ছে কলম। তারপর কলমকে কিয়ামত পর্যন্ত যা হবে তা লিখতে বললেন। (সিলসিলায়ে সাহীহা, হাদীছ নং- ১৩৩)

তিনি আরও বলেনঃ
إِنَّ أَوَّلَ مَا خَلَقَ اللهُ القلم فقال: له اكتب قالَ: رَبِّ وَمَاذَا أَكتُبُ قَالَ: اكْتُبْ مَقَادِيرَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ
আল্লাহ্ তাআলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে তাকে বললেনঃ লিখ। কলম বললঃ হে আমার প্রতিপালক! কী লিখব? আল্লাহ্ বললেনঃ কিয়ামত পর্যন্ত আগমণকারী প্রতিটি বস্তুর তাকদীর লিখ।

আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নূরের তৈরীও ছিলেন না। তিনি মাটির তৈরী মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ. হে নবী! আপনি বলুন যে, আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। (সূরা কাহাফঃ ১১০) এ ছাড়া কুরআনের আরও অনেক আয়াত দ্বারা প্রমাণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনী আদমেরই একজন ছিলেন। সুতরাং সমস্ত বনী আদম যেহেতু মাটির তৈরী, তাই তিনিও একজন মাটির তৈরী মানুষ ছিলেন। কেবল ফেরেশতাকেই আল্লাহ নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে সহীহ বুখারীতে আয়েশা (রাঃ) এর হাদীছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
خُلِقَتْ الْمَلَائِكَةُ مِنْ نُورٍ وَخُلِقَ الْجَانَّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ
ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে নূর থেকে। জিনদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়া বিহীন অগ্নি থেকে। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ঐ বস্তু থেকে যার বিবরণ তোমাদের কাছে পেশ করা হয়েছে। (সহীহ মুসলিম) সুতরাং তিনি মাটির তৈরী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ্ তাকে নবুওয়ত ও রেসালাতের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে সুফীরা আরও বিশ্বাস করে যে, তিনি হচ্ছেন সৃষ্টিজগতের কুব্বা তথা গম্বুজ। তিনি আরশে সমাসীন। সাত আসমান, সাত যমীন আরশ-কুরসী, লাওহে মাহফুয, কলম এবং সমগ্র সৃষ্টি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ কথার সত্যতা যাচাই করতে বুসেরীর কাসীদাতুল বুরদার একটি লাইন দেখুনঃ
فإنَّ من جودك الدنيا وضرتها + ومن علومك علم اللوح والقلم
হে নবী! আপনার দয়া থেকেই দুনিয়া ও আখেরাত সৃষ্টি হয়েছে। আর আপনার জ্ঞান থেকেই লাওহে মাহফুয ও কলমের জ্ঞান উদ্ভাসিত হয়েছে।

সুফীদের কতিপয় লোকের বিশ্বাস যে, তিনি হচ্ছেন সর্বপ্রথম সৃষ্টি। এটিই প্রখ্যাত সুফী সাধক ইবনে আরাবী ও তার অনুসারীদের আকীদা। কতিপয় সুফীবাদের মাশায়েখ এমতকে সমর্থন করেন না; বরং তারা এ কথাগুলোর প্রতিবাদ করেন এবং তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মানুষ মনে করেন ও তাঁর রেসালাতের স্বীকৃতি প্রদান করেন। তবে তারা রাসূলের কাছে শাফাআত প্রার্থনা করেন, আল্লাহর কাছে তাঁর উসীলা দিয়ে দুআ করেন এবং বিপদে পড়ে রাসূলের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকেন। আসুন দেখি বুসেরী তার কবিতায় কি বলেছেনঃ
يا أكرم الخلق ما لي من ألوذ به + سواك عند حلول الحوادث العمم
হে সৃষ্টির সেরা সম্মানিত! আমার জন্য কে আছে আপনি ব্যতীত, যার কাছে আমি কঠিন বালা মসীবতে আশ্রয় প্রার্থনা করবো? (নাউযুবিল্লাহে)

সুফীবাদের সমর্থক ভাইদের কাছে প্রশ্ন হলো বুসেরীর কবিতার উক্ত লাইন দুটির মধ্যে যদি শির্ক না থাকে, তাহলে আপনারাই বলুন শির্ক কাকে বলে? পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশের মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাসে শির্ক মিশ্রিত এ জাতীয় কবিতা পাঠ্য করা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী এগুলো পাঠ করে ইসলামী শিক্ষার নামে শির্ক ও বিদআতী শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। আমাদের জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষকগণ যদি শির্ক মিশ্রিত সিলেবাস নির্ধারণ করে তা দিয়ে আমাদের জাতি গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন, তাহলে আমরা তাওহীদের সঠিক শিক্ষা পাবো কোথায়?

📘 কোরআন হাদিসের মানদণ্ডে সুফিবাদ 📄 ৯) ফেরাউন ও ইবলীসের ক্ষেত্রে সূফীদের বিশ্বাস

📄 ৯) ফেরাউন ও ইবলীসের ক্ষেত্রে সূফীদের বিশ্বাস


সুফীদের কতিপয় লোক ইবলীস ও ফেরাউনকে পরিপূর্ণ ঈমানদার ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বান্দা মনে করে। সুফী দর্শনের মতে ইবলীস সর্বোত্তম সৃষ্টির অন্তর্ভূক্ত এবং সে পরিপূর্ণ ঈমানদার। আর মিশরের ফেরাউন সম্পর্কে সুফীদের কতিপয়ের কথা হচ্ছে, ঈমানের পরিপূর্ণ হাকীকত অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিল বলেই সে একজন সৎ লোক ছিল। ফিরআউনের কথা: ‘আনা রব্বুকুমুল আ'লা’ (আমি তোমাদের মহান প্রভু) এর তাৎপর্য বর্ণনা করতে গিয়ে সুফীরা বলে: ফিরআউন নিজের ভিতরে উলুহীয়াতের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিল বলেই এ রকম কথা বলেছে। কেননা তাদের মতে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুই আল্লাহ। সুতরাং প্রতিটি সৃষ্টিই এবাদত পাওয়ার অধিকার রাখে। সুতরাং যে ব্যক্তি ইবলীসের এবাদত করল, সে আল্লাহরই এবাদত করল এবং যে ফিরআউনের এবাদত করল সে আল্লাহরই এবাদত করল। (নাউযুবিল্লাহ)

মানসুর হাল্লাজ এবং ইবনে আরাবী মনে করে, শয়তানকে আল্লাহর রহমত থেকে বিতারিত করা হয় নি এবং সে জাহান্নামীও নয়। সে তাওবা করে পরিশুদ্ধ হয়ে জান্নাতী হয়ে গেছে। হাল্লাজ সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছে যে, শয়তান ও ফিরআউন হচ্ছে তার আদর্শ ও ইমাম। এই জাতীয় কথা যে বাতিল ও মিথ্যা তার প্রতিবাদ ছাড়াই ইসলাম সম্পর্কে সামান্য ধারণার অধিকারী অতি সহজেই বুঝতে পারেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوا وَعَشِيّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ.
সকালে ও সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফেরাঊন গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর। (সূরা মুমিন: ৪৬)

ইবলীস আল্লাহর আদেশ অমান্য করে তাঁর রহমত থেকে বিতারিত হয়ে কাফেরে পরিণত হয়েছে। কিয়ামতের দিন সে তার অনুসারীসহ জাহান্নামে প্রবেশ করবে। এটি কুরআন ও সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ
এবং যখন আমি আদমকে সেজদাহ করার জন্য ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলাম, তখনই ইবলিস ব্যতীত সবাই সিজদাহ করলো। সে (নির্দেশ) পালন করতে অস্বীকার করল এবং অহংকার প্রদর্শন করলো। ফলে সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। (সূরা বাকারা: ৩৪) আল্লাহ্ তাআলা ইবলীসের জাহান্নামী হওয়া সম্পর্কে বলেন:

قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلَّا تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِين (১২) قالَ فَاهْبط مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَنْ تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ (১৩) قَالَ أَنْظِرْنِي إِلى يَوْমِ يُبْعَثُونَ (১৪) قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ (১৫) قَالَ فَبِمَا أَعْوَيْتَنِي لَأَقْعُدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ (১৬) ثُمَّ لَآتِيَنَّهُمْ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْথَرَهُمْ شَاكِرِينَ (১৭) قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَدْءُومًا مَدْحُورًا لِمَنْ تَبِعَكَ مِنْهُمْ لأَمْلأَنَّ جَهَنَّمَ مِنْكُمْ أَجْمَعِينَ

আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কিসে সেজদাহ করতে বারণ করল? সে বলল: আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা। বললেন তুই এখান থেকে যা। এখানে অহংকার করার কোন অধিকার তোর নাই। অতএব, তুই বের হয়ে যা। তুই হীনতমদের অন্তর্ভুক্ত। সে বলল: আমাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ্ বললেন: তোকে সময় দেয়া হল। সে বলল: আপনি আমাকে যেমন উদ্ভ্রান্ত করেছেন, আমিও অবশ্য তাদের জন্যে আপনার সরল পথে বসে থাকবো। এরপর তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বামদিক থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না। আল্লাহ্ বললেন: বের হয়ে যা এখান থেকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়ে। তাদের যে কেউ তোর পথে চলবে, নিশ্চয় আমি তোদের সবার দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করে দিব। (সূরা আরাফ: ১২-১৮)

ফন্ট সাইজ
15px
17px