📄 সূফীবাদের পরিভাষায় সূফী কাকে বলে?
১. সুফী শব্দটি صوف বা (পশম) থেকে উদগত হয়েছে। কারণ, সূফীরা সহজ সাধারণ জীবন যাপনের অংশ হিসাবে পশমী কাপড় পরিধান করতেন।
২. মোল্লা জামী বলেন, শব্দটি صفاء (পবিত্রতা ও স্বচ্ছতা) থেকে নির্গত হয়েছে। কেননা তারা পূতপবিত্র ও স্বচ্ছ জীবন যাপন করতেন। সুফীর সংজ্ঞায় বর্ণিত এই কথাটি ঠিক নয়। কারণ সূফীরা নিজেদেরকে صوفي বলে উল্লেখ করেন। صفاء শব্দ থেকে সুফীর উৎপত্তি হয়ে থাকলে তারা নিজেদেরকে صفائي সাফায়ী বলতেন। অথচ এই মতবাদে বিশ্বাসী কোন লোক নিজেকে সাফায়ী বলেন না। বরং সুফী বলেন। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, সুফী হচ্ছেন ঐ ব্যক্তি, যিনি পশমী ও মোটা কাপড় পরিধান করেন এবং দুনিয়ার ভোগ-বিলাস পরিহার করে সরল সোজা ও সাদামাটা জীবন যাপন করেন।
📄 সূফীবাদের বিভিন্ন তরীকার বিবরণ
সুফীদের রয়েছে বিভিন্ন তরীকা। স্থান ও কাল অনুযায়ী অসংখ্য সুফী তরীকা আত্ম প্রকাশ করার কারণে এর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য সুফী তরীকা আত্ম প্রকাশ করেছে। তার মধ্যে নিম্নের কয়েকটি তরীকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায়ই সুফী তরীকার পীর ও মুরীদদের মুখে এ সমস্ত তরীকার নাম উচ্চারণ করতে শুনা যায়। এ সমস্ত তরীকা হচ্ছেঃ
১) কাদেরীয়া তরীকাঃ আব্দুল কাদের জিলানীকে (মৃত ৫৬১ হিঃ) এ তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুফীরা দাবী করে থাকেন। কিন্তু নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও তাঁর জীবনী অধ্যয়ন করলে জানা যায় যে, তিনি কোন তরীকা প্রতিষ্ঠা করে যান নি। তাঁর নামে যে সমস্ত কারামত বর্ণনা করা হয় তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
২) নকশবন্দীয়া তরীকাঃ মুহাম্মাদ বাহাউদ্দীন নকশবন্দীকে (মৃত ৭৯১ হিঃ) এই তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
৩) চিশতিয়া তরীকাঃ খাজা মঈন উদ্দীন চিশতীকে (মৃত ৬২০ হিঃ) এ তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ভারতের আজমীরে তাঁর মাজার রয়েছে। হিন্দু-মুসলিম সকলেই এ মাজার যিয়ারত করে থাকে।
৪) মুজাদ্দেদীয়া তরীকাঃ মুজাদ্দে আলফে ছানীকে (মৃত ১০৩৪ হিঃ) এই তরীকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবী করা হয়।
৫) সোহরাওয়ার্দী তরীকাঃ শিহাব উদ্দীন উমার সোহরাওয়ার্দীর (মৃত ৬৩২ হিঃ) নামে এই তরীকাটির নিসবত করা হয়। এই পাঁচটি তরীকার নামই আমাদের দেশের সুফীদের মুখে ব্যাপকভাবে উচ্চারণ করতে শুনা যায়।
📄 সূফীবাদের স্তর পরিক্রমা
ক) শরীয়তঃ ইসলামী জীবন ব্যবস্থার যাবতীয় বিধানকে শরীয়ত বলা হয়। সর্বপ্রথম শরীয়তের পূর্ণ অনুসারী হতে হয়। শরীয়তের যাবতীয় বিধানের মধ্য দিয়ে সুফী তাঁর প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত করে প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে আল্লাহর অনুগত করেন। শরীয়তের পূর্ণ অনুসরণ ব্যতীত কেউ সুফী হতে পারবে না। সুফীরা এ কথাটি জোর দিয়ে বললেও তাদের আচার-আচরণ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ অনেক সুফীকেই দেখা যায় তারা মারেফতের দোহাই দিয়ে শরীয়তের বিধান মানতে আদৌ প্রস্তুত নন।
খ) তরীকতঃ সুফীদের পরিভাষায় তরীকত হচ্ছে; শরীয়তের যাবতীয় বিধান অনুশীলনের পর তাকে আধ্যাত্মিক গুরুর শরণাপন্ন হতে হবে। এ পর্যায়ে তাকে বিনা প্রশ্নে গুরুর আনুগত্য করতে হবে।
গ) মারেফতঃ সুফীদের পরিভাষায় মারেফত হচ্ছে, এমন এক স্তর যার মধ্যে বান্দাহ উপনীত হলে সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে অবগত হতে পারে। এ স্তরে পৌঁছতে পারলে তার অন্তর আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। তখন তিনি সকল বস্তুর আসল তত্ত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেন। মানব জীবন ও সৃষ্টিজীবনের গুপ্ত রহস্য তার নিকট স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে।
ঘ) হাকিকতঃ সুফীদের ধারণায় তাদের কেউ এ স্তরে পৌঁছতে পারলে আন্তরিকভাবে আল্লাহর প্রেমের স্বাদ ও পরমাত্মার সাথে তার যোগাযোগ হয়। এটা হচ্ছে সুফী সাধনার চূড়ান্ত স্তর। এ স্তরে উন্নীত হলে সুফী ধ্যানের মাধ্যমে নিজস্ব অস্তিত্ব আল্লাহর নিকট বিলীন করে দেন।
উপরোক্ত নিয়মে ভক্তদের নামকরণ করা ও স্তরভেদ করা একটি বানোয়াট পদ্ধতি। ইসলামের প্রথম যুগে এগুলোর কোন অস্তিত্ব ছিল না। পরবর্তীতে সুফীরা এগুলো নিজের খেয়াল খুশী মত তৈরী করেছে।
📄 উপসংহার
পরিশেষে বলতে চাই যে, বর্তমানে মুসলিমরা যে সমস্যার সম্মুখীন তার অন্যতম কারণ হচ্ছে সুফীবাদের বিভ্রান্তি। এই পঁচা মতবাদের কারণেই মুসলিম জাতি দুনিয়ার বুকে তাদের মর্যাদা হারিয়েছে। সুবিশাল উছমানী খেলাফতের সুলতানগণ ইসলামের সঠিক আকীদাহ থেকে সরে গিয়ে যখন সুফীবাদের বেড়াজালে আটকে পড়েন তখন থেকে তাদের শক্তিতে ভাটা পড়তে থাকে। এক পর্যায়ে উছমানী সম্রাজ্যের ভিত্তি একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পতনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে।
তাই আজ মুসলিমদের হারানো শক্তি ও মর্যাদা ফেরত পেতে চাইলে খোলাফায়ে রাশেদার যুগের ন্যায় নির্ভেজাল তাওহীদের দিকে ফেরত আসতে হবে। অন্যথায় তারা দ্বীন ও দুনিয়ার উন্নতি ও অগ্রগতি অর্জন করার চেষ্টা করে কখনই সাফল্য লাভ করতে পারবে না।
আল্লাহ্ তাআলার কাছে দুআ করি তিনি যেন পথহারা এই জাতিকে সুফীবাদসহ সকল বিভ্রান্তি থেকে উদ্ধার করেন এবং নির্ভেজাল তাওহীদের দিকে ফেরত আসার তাওফীক দেন।