📄 শিরক্মুক্ত থেকে সাধ্যানুযায়ী ‘আমল করা
শিকমুক্ত ঈমান ও 'আমলের গুরুত্ব সর্বাধিক। ঈমান ও 'আমলের কোথাও সামান্য শির্ক থাকলে আল্লাহ তা বরদাশত করবেন না। কিন্তু তিনি অন্য সকল কিছু মাফ করবেন বলে তিনি কুরআনেও ঘোষণা দিয়েছেন যা পূর্বে বিস্তরিত দলীলসহ আলোকপাত করা হয়েছে। শিরকমুক্তভাবে যতটুকু 'আমল করা হবে তা-ই আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই শির্ক থেকে মুক্ত থেকে সাধ্যানুযায়ী 'আমল করে যাওয়াই মু'মিনের দায়িত্ব। হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا ابْنَ آدَمَ مَهُمَا عَبَدْتَنِي وَرَجَوْتَنِي وَلَمْ تُشْرِكْ بِي شَيْئًا غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ مِنْكَ وَإِنِ اسْتَقْبَلْتَنِي بِمِلْءِ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ خَطَايَا وَذُنُوبًا اسْتَقْبَلْتُكَ بِمِلْئِهِنَّ مِنَ الْمَغْفِرَةِ وَأَغْفِرُ لَكَ وَلَا أُبَالِي
“হে আদম সন্তান! তুমি আমার যতটুকুই 'ইবাদাত করো এবং ভালো আশা করো যদি তুমি আমার সাথে কোনো কিছুকে অংশী স্থাপন না করো তাহলে তোমার 'আমল যা-ই হোক না কেন তোমাকে আমি ক্ষমা করে দেবো। তুমি যদি আসমান ও জমিন ভরা অপরাধ ও গুনাহ নিয়ে আমার সামনে উপস্থিত হও তাহলে আমিও আসমান ও জমিন ভরা ক্ষমা নিয়ে তোমার সামনে উপস্থিত হবো এবং আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো, এতে আমি কাউকে পরোয়া করি না।”২৬১
অন্য একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
مَنْ عَلِمَ أَنِّي ذُوْ قُدْرَةٍ عَلَى مَغْفِرَةِ الذُّنُوبِ غَفَرْتُ لَهُ وَلَا أُبَالِي مَا لَمْ يُشْرِكْ بِي شَيْئًا»
"যে ব্যক্তি জানলো ও বিশ্বাস করলো যে আমি গুনাহ মাফ করার ক্ষমতা রাখি এবং আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক স্থাপন করলো না তাহলে আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো, এ ক্ষেত্রে আমি কারও পরোয়া করবো না।"২৬২
টিকাঃ
২৬১. সহীহ আল জামি: ৪৩৪১, হাদীসটি সহীহ।
২৬২. সহীহ আল জামি' : ৪৩৩০, হাদীসটি সহীহ।
📄 আল্লাহ্র সাথে ‘আমলে সালেহ্-এর ব্যবসা করা
দুনিয়ার লাভের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য তো আমরা অনেকেই করি। কিন্তু আখিরাতের ব্যবসা কয়জন করি? এ রকমেরই একটি ব্যবসার অফার আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারদের দিয়েছেন। সে ব্যবসার মূলধন হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এবং আল্লাহর পথে নিজ অর্থ-সম্পদ ও জীবন দিয়ে জিহাদ করা। এই ব্যবসার মুনাফা বা লাভ আল্লাহ দিবেন। আর তা হলো এসব ব্যবসায়ীদের গুনাহ মাফসহ অন্যান্য অনেক কিছু। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنْجِيكُمْ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ . تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ * يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ وَأُخْرَى تُحِبُّونَهَا نَصْرٌ مِنَ اللَّهِ وَفَتْحٌ قَرِيبٌ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
“হে মু'মিনগণ! আমি কি তোমাদের এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দেব, যা তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দেবে। তা হচ্ছে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন- সম্পদ ও জীবনপণ করে জিহাদ করবে; এটাই তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বোঝ। তিনি তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতে দাখিল করবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং চিরস্থায়ী আবাসস্থল জান্নাতে অতি উত্তম ঘর তোমাদেরকে দান করবেন; এটা মহাসাফল্য। এবং আরও একটি অনুগ্রহ দেবেন যা তোমরা পছন্দ কর; আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য এবং আসন্ন বিজয়; মু'মিনদেরকে এর সুসংবাদ দান করুন।”২৬৩
টিকাঃ
২৬৩. সূরা আস্ সফ্ ৬১: ১০-১৩।
📄 ভালো কাজ (হাসানাত) করা
আমরা সবাই গুনাহ করি। আবার ভালো কাজও করি। কিন্তু জানি না যে, কোন ভালো কাজে কীভাবে বা কত পরিমাণ গুনাহ মাফ হয়। কুরআন-হাদীসে অনেক এমন ভালো কাজের কথা বলা আছে যা করা সামান্য সময়ের ব্যপার বা খুবই কম কষ্টে সেগুলো করা যায় কিন্তু সেগুলোর ফযীলত অনেক বেশি। কোন কোন 'আমল আছে যা জীবনের সমস্ত গুনাহ মুছে দেয় যদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয় আবার কোন 'আমল রয়েছে গুনাহগার ব্যক্তিকে এমনভাবে নিষ্পাপ করে দেয় যেভাবে সে যেদিন মায়ের পেট থেকে জন্মলাভ করেছে আবার এমন কিছু 'আমলও আছে যা গুনাহগারের জীবনের পূর্বের ও পরের সমস্ত গুনাহ মুছে দেয়। এসব 'আমল যদি মানুষ জানত তাহলে তারা অবশ্যই তা করত।
কুরআন ও হাদীসে এমন অনেক ভালো কাজের কথা বর্ণিত হয়েছে যে কাজগুলো করলে আল্লাহ তা'আলা মু'মিন-মুত্তাক্বীদের পাপসমূহ দূর করবেন এবং তাদের গুনাহগুলো মাফ করে দিবেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ ﴾
"হে মু'মিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তাহলে তিনি তোমাদের জন্য ফুরকান২৬৪ প্রদান করবেন, তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ দূর করবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল।"২৬৫
অন্য এক আয়াতে তিনি আরও বলেন,
﴿وَمَنْ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَيَعْمَلْ صَالِحًا يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴾
"আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তিনি তার পাপসমূহ মোচন করে দিবেন এবং তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।"২৬৬
আরেক আয়াতে তিনি বলেন:
﴿وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا﴾
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে বিশাল করে দেন।"২৬৭
আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন:
﴿وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ لَهُمْ مَا يَشَاءُونَ عِنْدَ رَبِّهِمْ ذَلِكَ جَزَاءُ الْمُحْسِنِينَ لِيُكَفِّرَ اللهُ عَنْهُمْ أَسْوَأَ الَّذِي عَمِلُوا وَيَجْزِيَهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ الَّذِي كَانُوا يَعْمَلُونَ﴾
"আর যে সত্য নিয়ে এসেছে এবং যে তা সত্য বলে মেনে নিয়েছে, তারাই হল মুত্তাকী। তাদের জন্য তাদের রব-এর কাছে তা-ই রয়েছে যা তারা চাইবে। এটাই মু'মিনদের পুরস্কার। যাতে তারা যেসব মন্দ কাজ করেছিল, আল্লাহ তা ঢেকে দেন এবং তারা যে সর্বোত্তম 'আমল করত তার প্রতিদানে তাদেরকে পুরস্কৃত করেন।"২৬৮
কুরআনের অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفِي النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ)
"আর তুমি সলাত কায়েম কর দিনের দু'প্রান্তে এবং রাতের প্রথম অংশে২৬৯। নিশ্চয় ভালোকাজসমূহ মন্দকাজগুলোকে মিটিয়ে দেয়। এটি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ।”২৭০
আবূ যার বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
اتَّقِ اللهَ حَيْثُمَا كُنْتَ وَأَتَّبِعُ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَن
"তুমি যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহকে ভয় কর এবং পাপ হয়ে গেলে পুণ্য কর, যা পাপকে মুছে ফেলবে। আর মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার কর।"২৭১
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ)
“আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করলে অথবা নিজেদের প্রতি যুল্ম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে? আর তারা যা করেছে, জেনে শুনে তাদের কর্মের উপর অটল থাকে না।”২৭২
এ আয়াতের ব্যাপারে প্রখ্যাত সাহাবী ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস্‘উদ বলেন,
"هذه الآية خير لأهل الذنوب من الدنيا وما فيها"
“গুনাহগারদের জন্য এই আয়াতটি দুনিয়া ও দুনিয়ার মাঝে যা আছে তার থেকেও উত্তম।”২৭৩
প্রখ্যাত তাবি‘ঈ ইবনু সীরীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"أعطانا الله هذه الآية مكان ما جعل لبني إسرائيل في كفارات ذنوبهم"
“আল্লাহ তা‘আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের পাপসমূহ মোচনের জন্য যে পদ্ধতি দিয়েছিলেন তার বদলে আমাদেরকে এই আয়াত দান করেছেন।”২৭৪
আবুল ‘আলিয়া (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
قال رجل : يا رسول الله لو كانت كفاراتنا ككفارات بني إسرائيل ، فقال النَّبِيُّ ﷺ : اللهم لا نبغيها - ثلاثا - ما أعطاكم الله خير مما أعطى بني إسرائيل ، كانت بنو إسرائيل إذا أصاب أحدهم الخطيئة ، وجدها مكتوبة على بابه وكفارتها ، فإن كفّرها كانت خزيا في الدنيا ، وإن لم يكفرها كانت له خزياً في الآخرة ، فما أعطاكم الله خير مما أعطى بني إسرائيل قال : وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمُ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَحِيمًا"
এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কাফফারাহ্ (গুনাহ মোচনের) পদ্ধতি যদি বানী ইসরাঈলের গুনাহ মোচনেরপদ্ধতির মত হতো! এ কথা শুনে নাবী বলেন, হে আল্লাহ! আমরা এমন পদ্ধতি চাই না। (এই দু'আ তিনবার বললেন।) তারপর তিনি বললেন, "বানী ইসরাঈলকে পাপ মোচনের জন্য যে পদ্ধতি দেয়া হয়েছিল তার থেকে আল্লাহ তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা উত্তম। বানী ইসরাঈলের কেউ যখন কোন পাপ করে ফেলতো সেটি এবং তার কাফ্ফারা সে তার ঘরের দরজায় লেখা দেখতে পেত। যদি সে ঐ পাপের কাফফারা আদায় করতো তাহলে তা তার জন্য দুনিয়ায় অপমানের কারণ হতো আর যদি সে তার কাফফারাহ্ আদায় না করতো তাহলে তা তার জন্য আখিরাতে অপমানের কারণ হবে। আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা বানী ইসরাঈলকে যা দিয়েছেন তার থেকে উত্তম।" তারপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন,২৭৫
(وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمُ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا)
"আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করবে কিংবা নিজের প্রতি জুলুম করবে তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, সে আল্লাহকে পাবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু হিসেবে।"২৭৬
মহান করুণাময় আল্লাহর একটি অনুগ্রহ এই যে, তিনি বান্দার নেক 'আমলকেও পাপনাশকরূপে নির্ধারণ করেছেন। সে কথা আল্লাহ স্বয়ং পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন।
ইবনু মাস্'ঊদ বলেন, এক ব্যক্তি এক মহিলাকে চুমা দিয়ে ফেলে। পরে সে নাবী-এর নিকট এসে বিষয়টি জানায়। তখন আল্লাহ তা'আলা این আয়াত অবতীর্ণ করেন,
(وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ)
"আর তুমি সলাত কায়েম কর দিনের দু'প্রান্তে এবং রাতের প্রথম অংশে। নিশ্চয় ভালোকাজ মন্দকাজকে মিটিয়ে দেয়। এটি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ।"২৭৭
লোকটি জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসূল! এ কি শুধু আমার জন্য?' তিনি বললেন, 'না, এ আমার সকল উম্মাতের জন্য।'২৭৮
উক্ত ঘটনার ব্যাপারে আনাস বলেন, এক ব্যক্তি নাবী-এর কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি দণ্ডনীয় অপরাধ করে ফেলেছি; তাই আমার উপর দণ্ড প্রয়োগ করুন।' ইতোমধ্যে সালাতের সময় হল। সেও আল্লাহর রাসূল-এর সাথে সলাত আদায় করল। সলাত শেষ করে সে পুনরায় বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয় আমি দণ্ডনীয় অপরাধ করে ফেলেছি; তাই আমার উপর আল্লাহর কিতাবে ঘোষিত দণ্ড প্রয়োগ করুন।' তিনি বললেন, "তুমি কি আমাদের সাথে সলাত আদায় করেছ?” সে বলল, 'জী হ্যাঁ।' তিনি বললেন, "নিশ্চয় তোমার অপরাধ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।"২৭৯
উক্ত হাদীসে 'দণ্ডনীয় অপরাধ' বলতে সেই অপরাধ উদ্দেশ্য নয়, যাতে শরীয়তে নির্ধারিত দণ্ড আছে; যেমন, মদপান, ব্যভিচার প্রভৃতি। কেননা এমন দণ্ডনীয় অপরাধ সালাত আদায় করলেই ক্ষমা হয়ে যাবে না। আর সে দণ্ড প্রয়োগ না করাও শাসকের জন্য বৈধ নয়। উল্লেখ্য বা, উপর্যুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে শাসক ইচ্ছা করলে 'তা'যীর' বা স্বল্পতম দৈহিক শাস্তি দিতে পারেন। তবে যেহেতু লোকটি নিজ থেকে অপরাধ স্বীকার করে বিচার প্রার্থনা করেছেন তাই তার 'তা'যীর' মওকুফ করে দেয়া হয়েছে।
আবূ 'উসমান বলেন, একদা একটি গাছের নিচে আমি সালমান-এর সাথে (বসে) ছিলাম। তিনি গাছের একটি শুষ্ক ডাল ধরে হেলিয়ে দিলেন। এতে ডালের সমস্ত পাতাগুলো ঝড়ে গেল। অতঃপর তিনি বললেন, 'হে আবূ উসমান! তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করবে না যে, কেন আমি এরূপ করলাম?' আমি বললাম, কেন করলেন? তিনি বললেন, একদিন আমিও আল্লাহর রাসূল-এর সাথে গাছের নিচে ছিলাম। তিনি আমার সামনে অনুরূপ করলেন; গাছের একটি শুষ্ক ডাল ধরে হেলিয়ে দিলেন। এতে তার সমস্ত পাতা ঝড়ে পড়ল। অতঃপর বললেন, "হে সালমান! তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করবে না কি যে, কেন আমি এরূপ করলাম?” আমি বললাম, কেন করলেন? তিনি উত্তরে বললেন, কোনো মুসলিম ব্যক্তি যখন সুন্দরভাবে উযূ করে পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করে তখন তার পাপরাশি ঠিক ঐভাবেই ঝড়ে যায়, যেভাবে এই পাতাগুলো ঝড়ে গেল। আর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন,
﴿وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَيِ النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ اللَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ۚ ذَٰلِكَ ذِكْرَىٰ لِلذَّاكِرِينَ﴾
"আর তুমি সলাত কায়েম কর দিনের দু'প্রান্তে এবং রাতের প্রথম অংশে। নিশ্চয় ভালোকাজ মন্দকাজকে মিটিয়ে দেয়। এটি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ।"২৮০
'আমলে সালেহ বা সৎকর্ম করলে পাপ মোচন হয়, সে কথা আরো একটি হাদীসে স্পষ্ট হয়।
নাবী বলেছেন:
﴿فِتْنَةُ الرَّجُلِ فِي أَهْلِهِ وَمَالِهِ وَنَفْسِهِ وَوَلَدِهِ وَجَارِهِ يُكَفِّرُهَا الصِّيَامُ وَالصَّلَاةُ وَالصَّدَقَةُ وَالْأَمْرُ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهَى عَنِ الْمُنْكَرِ﴾
"মানুষের পরিবার, ধন-সম্পদ, নিজ, সন্তান-সন্ততি ও প্রতিবেশীর ব্যাপারে কৃত পাপকে সিয়াম, সলাত, দান-সাদাক্বাহ্, সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ (ইত্যাদি পুণ্যকর্ম) নাশ করে দেয়।"২৮১
দৈনন্দিন জীবনের প্রত্যেক 'ইবাদাত ও সৎকর্ম পাপসমূহকে নিশ্চিহ্ন করে। নিশ্চয় এটা তার জন্য মহান করুণাময়ের বিশেষ করুণা। পাপধ্বংসী বহু নেক 'আমলের ফলে সে নিষ্পাপ হয়ে ওঠে।
টিকাঃ
২৬৪. অর্থাৎ তিনি তোমাদের মধ্যে আন্তরিক দৃঢ়তা, বিচক্ষণ ক্ষমতা ও সুন্দর হিদায়াত সৃষ্টি করে দিবেন যার মাধ্যমে তোমরা হক ও বাতিলের পার্থক্য করতে পারবে। (যুবদাতুত্ তাফসীর)
২৬৫. সূরা আল আনফাল ০৮: ২৯।
২৬৬. সূরা আত্ তাগা-বুন ৬৪: ০৯।
২৬৭. সূরা আত্ব ত্বলাক্ব ৬৫:০৫।
২৬৮. সূরা আয যুমার ৩৯: ৩৩-৩৫।
২৬৯. দিনের প্রথম প্রান্তে ফজরের সলাত, দ্বিতীয় প্রান্তে যোহর ও আসরের সলাত আর রাতের প্রথম অংশে মাগরিব ও ইশার সলাত। [তাফসীর ইবনু কাসীর, তাইসীরু কারীমির রহমান]।
২৭০. সূরা হূদ ১১: ১১৪।
২৭১. জামি আত্ তিরমিযী: ১৯৮৭, হাদীসটি হাসান বা হাসান সহীহ।
২৭২. সূরা আ-লি ‘ইমরা-ন ০৩: ১৩৫।
২৭৩. জামিউল উলূম ওয়াল হিকাম।
২৭৪. জামিউল উলূম ওয়াল হিকام।
২৭৫. ইবনু রাজাব আল হাম্বালী, জামিউল উলূম ওয়াল হিকাম, ঘটনাটি ইমাম ইবনু জারীর আত্ তাবারী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ করেছেন।
২৭৬. সূরা আন্ নিসা ০৪: ১১০।
২৭৭. সূরা হূদ ১১ : ১১৪।
২৭৮. সহীহুল বুখারী : ৫২৬; সহীহ মুসলিম : ৭১৭৭।
২৭৯. সহীহুল বুখারী : ৬৮২৩; সহীহ মুসলিম : ৭১৮২।
২৮০. সূরা হূদ ১১: ১১৪; মুসনাদ আহমাদ: ২৩৭৫৮; হাদীসটি হাসান লিগাইরিহী।
২৮১. সহীহুল বুখারী: ৫২৫; সহীহ মুসলিম: ৭৪৫০।
📄 ধৈর্যধারণ ও ‘আমলে সালেহ্ করা
জীবন চলার পথে ধৈর্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে ঈমান আনার পরে ধৈর্যধারণ বেশি দরকারী। ধৈর্যের সাথে সাথে 'আমলে সালেহ করাও জরুরি। তাহলেই ক্ষমা মিলবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
(إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ)
"তবে যারা সবর করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যই রয়েছে ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান।"২৮২
টিকাঃ
২৮২. সূরা হূদ ১১: ১১।