📘 কুরআন-হাদীসের আলােকে গুনাহ মাফের উপায় > 📄 গামিদ গোত্রের ব্যভিচারিণী মহিলার তাওবাহ্

📄 গামিদ গোত্রের ব্যভিচারিণী মহিলার তাওবাহ্


রাসূলুল্লাহ-এর যুগে গামিদী গোত্রের এক মহিলা যেনার কারণে গর্ভবতী হয়ে রাসূলুল্লাহ-এর কাছে এসে তাওবাহ্ করে গুনাহ থেকে পবিত্র হতে চেয়েছিল। খাঁটি তাওবার সে ঘটনাও হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করেছিল। ঘটনাটি নিম্নরূপ:
قَالَ فَجَاءَتِ الْغَامِدِيَّةُ فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللهِ إِنِّي قَدْ زَنَيْتُ فَطَهِّرْنِي. وَإِنَّهَ رَدَّهَا فَلَمَّا كَانَ الْغَدُ قَالَتْ يَا رَسُولَ اللهِ لِمَ تَرُدُّنِي لَعَلَّكَ أَنْ تَرُدَّنِي كَمَا رَدَدْتَ مَاعِرًا فَوَاللَّهِ إِنِّي لَحَبْلَى . قَالَ « إِمَّا لَا فَاذْهَبِى حَتَّى تَلِدِي ». فَلَمَّا وَلَدَتْ أَتَتْهُ بِالصَّبِيِّ فِي خِرْقَةٍ قَالَتْ هَذَا قَدْ وَلَدْتُهُ. قَالَ « اذْهَبِى فَأَرْضِعِيهِ حَتَّى تَفْطِمِيهِ»، فَلَمَّا فَطَمَتْهُ أَتَتْهُ بِالصَّبِيِّ فِي يَدِهِ كِسْرَةُ خُبْرٍ فَقَالَتْ هُذَا يَا نَبِيَّ اللَّهِ قَدْ فَطَمْتُهُ وَقَدْ أَكَلَ الطَّعَامَ فَدَفَعَ الصَّيِّ إِلَى رَجُلٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ ثُمَّ أَمَرَ بِهَا فَحُفِرَ لَهَا إِلَى صَدْرِهَا وَأَمَرَ النَّاسَ فَرَجَمُوهَا فَيُقْبِلُ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ بِحَجَرٍ فَرَى رَأْسَهَا فَتَنَضَّحَ الدَّمُ عَلَى وَجْهِ خَالِدٍ فَسَبَّهَا فَسَمِعَ نَبِيُّ اللهِ لا سَبَّة إِيَّاهَا فَقَالَ مَهْلًا يَا خَالِدُ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةً لَوْ تَابَهَا صَاحِبُ مَكْسٍ لَغْفِرَ لَهُ. ثُمَّ أَمَرَ بِهَا فَصُلِّي عَلَيْهَا وَدُفِنَتْ
একদিন গামিদী গোত্রের এক মহিলা রাসূলুল্লাহ-এর নিকট আগমন করলো এবং বলল, হে আল্লার রাসূল! আমি ব্যভিচার করেছি। সুতরাং আপনি আমাকে পবিত্র করুন। তখন তিনি তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন। পরবর্তী দিন আবার ঐ মহিলা আগমন করলো এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনি কি আমাকে ঐভাবে ফিরিয়ে দিতে চান, যেমন ভাবে আপনি মা'ইযকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন? আল্লাহর শপথ, নিশ্চয় আমি গর্ভবতী। তখন তিনি বললেন, যদি (ফিরে যেতে না চাও), তবে (আপাততঃ এখনকার মত) চলে যাও এবং সন্তান প্রসবকাল সময় পর্যন্ত অপেক্ষা কর।
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর যখন সে সন্তান প্রসব করল তখন সে সন্তানকে এক টুকরা কাপড়ের মধ্যে নিয়ে রাসূলুল্লাহ-এর কাছে আগমন করলেন এবং বললেন, এই সন্তান আমি প্রসব করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন: যাও তাকে (সন্তানকে) দুধ পান করাও গিয়ে। দুধপান করানোর সময় শেষ হলে পরে এসো। এরপর যখন তার দুধপান করানোর সময় শেষ হল তখন ঐ মহিলা শিশু সন্তানটিকে নিয়ে তার কাছে আগমন করলো এমন অবস্থায় যে, শিশুটির হাতে এক টুকরা রুটি ছিল। এরপর বললো, হে আল্লাহর নাবী! (এইতো সেই শিশু) তাকে আমি দুধপান করানোর কাজ শেষ করেছি। সে এখন খাদ্য খায়। তখন শিশু সন্তানটিকে তিনি কোন একজন মুসলিমকে প্রদান করলেন। এরপর তার ব্যাপারে (ব্যভিচারের শাস্তি প্রদানের) আদেশ দিলেন। তার বুক পর্যন্ত গর্ত খনন করা হল এরপর জনগণকে (তার প্রতি পাথর নিক্ষেপের) নির্দেশ দিলেন। তারা তখন তাকে পাথর মারতে শুরু করল। খালিদ ইবনু ওয়ালীদ একটি পাথর নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং মহিলার মাথায় নিক্ষেপ করলেন, তাতে তার মুখমণ্ডলে রক্ত ছিটকে পড়লো। তখন তিনি মহিলাকে গালি দিলেন। নাবী গালি শুনতে পেলেন। তিনি বললেন, সাবধান! হে খালিদ! সেই মহান আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার জীবন, জেনে রেখো! নিশ্চয় সে এমন তাওবাহ্ করেছে, যদি কোন যুলুমবাজ (চাঁদাবাজ) ব্যক্তিও এমন তাওবাহ্ করতো তবে তারও ক্ষমা হয়ে যেতো। এরপর তার জানাযার সলাত আদায়ের নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তার জানাযায় সলাত আদায় করা হলো। এরপর তাকে দাফন করা হলো।২৩৬
জুহায়নাহ্ গোত্রের এক ব্যভিচারীণী মহিলার তাওবার ক্ষেত্রেও গামিদী গোত্রের মহিলার ঘটনার মত ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। ঘটনাটি নিম্নরূপ:
عن أبي نُجَيْدِ عِمْرَانَ بنِ الحُصَيْنِ الخُزَاعِي رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا : أَنَّ امْرَأَةً مِنْ جُهَيْنَة أَتَتْ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَهِيَ حُبْلَى مِنَ الزَّنْيِ ، فَقَالَتْ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، أَصَبْتُ حَدًّا فَأَقِمْهُ عَلَى ، فَدَعَا نَبِيُّ اللَّهِ ﷺ وَلِيَّهَا ، فَقَالَ : أَحْسِنُ إِلَيْهَا ، فَإِذا وَضَعَتْ فَأْتِنِي فَفَعَلَ فَأَمَرَ بِهَا نبي الله ﷺ ، فَشُدَّتْ عَلَيْهَا ثِيَابُهَا، ثُمَّ أَمَرَ بِهَا فَرُجِمَتْ، ثُمَّ صَلَّى عَلَيْهَا. فَقَالَ لَهُ عُمَرُ : تُصَلَّى عَلَيْهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَقَدْ زَنَتْ ؟ قَالَ : لَقَدْ تَابَتْ تَوْبَةٌ لَوْ قُسِمَتْ بَيْنَ سَبْعِينَ مِنْ أَهْلِ المَدِينَةِ لَوَسِعَتْهُمْ، وَهَلْ وَجَدْتَ أَفْضَلَ مِنْ أَنْ جَادَتْ بِنَفْسِهَا لِلَّهِ - عَزَّ وَجَلَّ - ؟!»
আবু নুজাইদ 'ইমরান ইবনুল হুসাইন আল খুযা'ঈ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জুহায়নাহ্ গোত্রের এক নারী আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর নিকট হাজির হল। সে যিনার কারণে গর্ভবতী ছিল। সে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি দণ্ডনীয় অপরাধ করে ফেলেছি তাই আপনি আমাকে শাস্তি দিন!' আল্লাহর নাবী তার আত্মীয়কে ডেকে বললেন, "তুমি একে নিজের কাছে যত্ন সহকারে রাখ এবং সন্তান প্রসবের পর একে আমার নিকট নিয়ে এসো।" সুতরাং সে তাই করল (অর্থাৎ প্রসবের পর তাকে রাসূল ﷺ-এর কাছে নিয়ে এল)।
আল্লাহর নাবী তার কাপড় তার (শরীরের) উপর মজবুত করে বেঁধে দেয়ার আদেশ দিলেন। অতঃপর তাকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলার আদেশ দিলেন। অতঃপর তিনি তার জানাযার সলাত আদায় করলেন। 'উমার তাঁকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এই মহিলার জানাযার সলাত আদায় করলেন, অথচ সে ব্যভিচার করেছিল?' তিনি বললেন, "('উমার! তুমি জান না যে,) এই মহিলাটি এমন বিশুদ্ধ তাওবাহ্ করেছে, যদি তা মদীনার ৭০ জন লোকের মধ্যে বণ্টন করা হত তাহলে তা তাদের সকলের জন্য যথেষ্ট হত। এর চেয়ে কি তুমি কোন উত্তম কাজ পেয়েছ যে, সে আল্লাহর জন্য নিজের প্রাণকে কুরবান করে দিল?"২৩৭

টিকাঃ
২৩৬. সহীহ মুসলিম: ৪৫২৮।
২৩৭. সহীহ মুসলিম: ৪৫২৯।

📘 কুরআন-হাদীসের আলােকে গুনাহ মাফের উপায় > 📄 তাবুক যুদ্ধে না যাওয়া তিন সাহাবীর তাওবাহ্

📄 তাবুক যুদ্ধে না যাওয়া তিন সাহাবীর তাওবাহ্


সাময়িকের জন্য ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনজন প্রখ্যাত সাহাবী তাবুকের যুদ্ধে যাননি। তাদের এই না যাওয়ার অপরাধ থেকে তারা কীভাবে তাওবাহ্ করেছেন তারই বর্ণনা পাওয়া যাবে নীচের দীর্ঘ হাদীসটিতে।
কা'ব ইবনু মালিক-এর পুত্র 'আবদুল্লাহ২৩৮ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (আমার পিতা) কা'ব ইবনু মালেক-কে ঐ ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি, যখন তিনি তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ-এর পিছনে থেকে যান। তিনি বলেন, 'আমি তাবুক যুদ্ধ ছাড়া যে যুদ্ধই রাসূলুল্লাহ করেছেন তাতে কখনোই তাঁর পিছনে থাকিনি। (অবশ্য বদরের যুদ্ধ থেকে আমি পিছনে রয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বদরের যুদ্ধে যে অংশগ্রহণ করেনি, তাকে ভর্ৎসনা করা হয়নি।) আসল ব্যাপার ছিল রাসূলুল্লাহ ও মুসলিমগণ কুরাইশের কাফেলার পশ্চাদ্ধাবনে বের হয়েছিলেন। (শুরুতে যুদ্ধের নিয়ত ছিল না।) পরিশেষে আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে ও তাঁদের শত্রুকে (পূর্বঘোষিত) ওয়াদা ছাড়াই একত্রিত করেছিলেন।
আমি আক্বাবার রাতে (মিনায়) রাসূলুল্লাহ -এর সাথে উপস্থিত ছিলাম, যখন আমরা ইসলামের উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলাম। আক্বাবার রাত অপেক্ষা আমার নিকটে বদরের উপস্থিতি বেশী প্রিয় ছিল না। যদিও বদর (অভিযান) লোক মাঝে ওর চাইতে বেশী প্রসিদ্ধ। (কা'ব বলেন) আর আমার তাবুকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ -এর পিছনে থাকার ঘটনা এরূপ যে, এই যুদ্ধ হতে পিছনে থাকার সময় আমি যতটা সমর্থ ও সচ্ছল ছিলাম অন্য কোন সময় ছিলাম না। আল্লাহর কসম! এর পূর্বে আমার নিকট কখনো দু'টি সওয়ারী (বাহন) একত্রিত হয়নি। কিন্তু এই (যুদ্ধের) সময়ে একই সঙ্গে দু'টি সওয়ারী আমার নিকট মজুদ ছিল।
রাসূলুল্লাহ-এর নিয়ম ছিল, যখন তিনি কোন যুদ্ধে বের হওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন 'তাওরিয়া' করতেন (অর্থাৎ সফরের গন্তব্যস্থলের নাম গোপন রেখে সাধারণ অন্য স্থানের নাম নিতেন, যাতে শত্রুরা টের না পায়)। এই যুদ্ধ এভাবে চলে এল। রাসূলুল্লাহ ভীষণ গরমে এই যুদ্ধে বের হলেন এবং দূরবর্তী সফর ও দীর্ঘ মরুভূমির সম্মুখীন হলেন। আর বহু সংখ্যক শত্রুরও সম্মুখীন হলেন। এই জন্য তিনি মুসলিমদের সামনে বিষয়টি স্পষ্ট করে দিলেন; যাতে তাঁরা সেই অনুযায়ী যথোচিত প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ফলে তিনি সেই দিকও বলে দিলেন, যেদিকে যাবার ইচ্ছা করেছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে অনেক মুসলিম ছিলেন এবং তাদের কাছে কোন হাজিরা বহি ছিল না, যাতে তাদের নামসমূহ লেখা হবে। এই জন্য যে ব্যক্তি (যুদ্ধে) অনুপস্থিত থাকত সে এই ধারণাই করত যে, আল্লাহর অহী অবতীর্ণ ছাড়া তার অনুপস্থিতির কথা গুপ্ত থাকবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই যুদ্ধ ফল পাকার মৌসুমে করেছিলেন এবং সে সময় (গাছের) ছায়াও উৎকৃষ্ট (ও প্রিয়) ছিল, আর আমার টানও ছিল সেই ফল ও ছায়ার দিকে।
সুতরাং রাসূলুল্লাহ ﷺ ও মুসলিমরা (তাবুকের যুদ্ধের জন্য) প্রস্তুতি নিলেন। আর (আমার এই অবস্থা ছিল যে,) আমি সকালে আসতাম, যেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে আমিও (যুদ্ধের) প্রস্তুতি নেই। কিন্তু কোন ফয়সালা না করেই আমি (বাড়ী) ফিরে আসতাম এবং মনে মনে বলতাম যে, আমি যখনই ইচ্ছা করব, যুদ্ধে শামিল হয়ে যাব। কেননা, আমি এর ক্ষমতা রাখি। আমার এই গড়িমসি অবস্থা অব্যাহত রইল এবং লোকেরা জিহাদের আয়োজনে প্রবৃত্ত থাকলেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ ও মুসলিমরা একদিন সকালে তাবুকের জিহাদে বেরিয়ে পড়লেন এবং আমি প্রস্তুতির ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে পারলাম না। আমি আবার সকালে এলাম এবং বিনা সিদ্ধান্তেই (বাড়ী) ফিরে গেলাম। সুতরাং আমার এই অবস্থা অব্যাহত থেকে গেল। ওদিকে মুসলিম সেনারা দ্রুতগতিতে আগে বাড়তে থাকল এবং যুদ্ধের ব্যাপারও ক্রমশঃ এগুতে লাগল। আমি ইচ্ছা করলাম যে, আমিও সফরে রওয়ানা হয়ে তাদের সঙ্গ পেয়ে যাই। হায়! যদি আমি তাই করতাম (তাহলে কতই না ভালো হত)! কিন্তু এটা আমার ভাগ্যে হয়ে উঠল না। এদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চলে যাওয়ার পর যখনই আমি লোকের মাঝে আসতাম, তখন এ জন্যই দুঃখিত ও চিন্তিত হতাম যে, এখন (মদীনায়) আমার সামনে কোন আদর্শ আছে তো কেবলমাত্র মুনাফিক্ব কিংবা এত দুর্বল ব্যক্তিরা যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমাহ যোগ্য বা অপারগ বলে গণ্য করেছেন।
সম্পূর্ণ রাস্তা রাসূল আমাকে স্মরণ করলেন না। তাবুক পৌঁছে যখন তিনি লোকের মাঝে বসেছিলেন, তখন আমাকে স্মরণ করলেন এবং বললেন, "কা'ব ইবনু মালেকের কী হয়েছে?" বানু সালেমাহ (গোত্রের) একটি লোক বলে উঠল, “হে আল্লাহর রাসূল! তার দুই চাদর এবং দুই পার্শ্ব দর্শন (অর্থাৎ ধন ও তার অহঙ্কার) তাকে আঁকে দিয়েছে।" (এ কথা শুনে) মু'আয ইবনু জাবাল বললেন, "বাজে কথা বললে তুমি। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তার ব্যাপারে ভালো ছাড়া অন্য কিছু জানি না।" রাসূলুল্লাহ নীরব থাকলেন।
এসব কথাবার্তা চলছিল এমতাবস্থায় তিনি একটি লোককে সাদা পোশাক পরে (মরুভূমির) মরীচিকা ভেদ করে আসতে দেখলেন। রাসূলুল্লাহ বললেন : "তুমি যেন আবূ খাইসামাহ হও।" (দেখা গেল) সত্যিকারে তিনি আবূ খাইসামাহ আনসারীই ছিলেন। আর তিনি সেই ব্যক্তি ছিলেন, যিনি একবার আড়াই কিলো খেজুর সদাকাহ করেছিলেন বলে মুনাফিক্বরা (তা অল্প মনে করে) তাঁকে বিদ্রুপ করেছিল।'
কা'ব বলেন, 'অতঃপর যখন আমি সংবাদ পেলাম যে, রাসূলুল্লাহ তাবুক থেকে ফেরার সফর শুরু করে দিয়েছেন, তখন আমার মনে কঠিন দুশ্চিন্তা এসে উপস্থিত হল এবং মিথ্যা অজুহাত পেশ করার চিন্তা করতে লাগলাম এবং মনে মনে বলতে লাগলাম যে, আগামীকাল যখন রাসূল ফিরবেন, সে সময় আমি তাঁর রোষাণল থেকে বাঁচব কী উপায়ে? আর এ ব্যাপারে আমি পরিবারের প্রত্যেক বুদ্ধিমান মানুষের সহযোগিতা চাইতে লাগলাম। অতঃপর যখন বলা হল যে, রাসূলুল্লাহ-এর আগমন একদম নিকটবর্তী, তখন আমার অন্তর থেকে বাতিল (পরিকল্পনা) দূর হয়ে গেল। এমনকি আমি বুঝতে পারলাম যে, মিথ্যা বলে আমি কখনই বাঁচতে পারব না। সুতরাং আমি সত্য বলার দৃঢ় সংকল্প করে নিলাম।
এদিকে রাসূলুল্লাহ সকালে (মদীনায়) পদার্পণ করলেন। তাঁর অভ্যাস ছিল, যখন তিনি সফর থেকে (বাড়ি) ফিরতেন, তখন সর্বপ্রথম তিনি মাসজিদে দু' রাক'আত সলাত আদায় করতেন। তারপর (সফরের বিশেষ বিশেষ খবর শোনাবার জন্য) লোকেদের জন্য বসতেন। সুতরাং এই সফর থেকে ফিরেও যখন পূর্বের মতো কাজ করলেন, তখন মুনাফিক্বরা এসে তাঁর নিকট ওযর-আপত্তি পেশ করতে লাগল এবং কুসম খেতে আরম্ভ করল। এরা সংখ্যায় আশি জনের কিছু বেশী ছিল। রাসূলুল্লাহ তাদের বাহ্যিক ওযর গ্রহণ করে নিলেন, তাদের বায়'আত নিলেন, তাদের জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং তাদের গোপনীয় অবস্থা আল্লাহকে সঁপে দিলেন। অবশেষে আমিও তাঁর নিকট হাজির হলাম।
অতঃপর যখন আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তখন তিনি রাগান্বিত ব্যক্তির হাসির মত মুচকি হাসলেন। অতঃপর তিনি বললেন, "সামনে এসো!" আমি তাঁর সামনে এসে বসে পড়লাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কেন জিহাদ থেকে পিছনে রয়ে গেলে? তুমি কি বাহন ক্রয় করনি?" আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম! আমি যদি আপনি ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোন লোকের কাছে বসতাম, তাহলে নিশ্চিতভাবে কোন মিথ্যা ওযর পেশ করে তার অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে যেতাম। বাকচাতুর্য (বা তর্ক-বিতর্ক করার) অভিজ্ঞতা আমার যথেষ্ট রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, যদি আজ আপনার সামনে মিথ্যা বলি, যাতে আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন, তাহলে অতি সত্বর আল্লাহ তা'আলা (অহী দ্বারা সংবাদ দিয়ে) আপনাকে আমার উপর অসন্তুষ্ট করে দেবেন।
পক্ষান্তরে আমি যদি আপনাকে সত্য কথা বলি, তাহলে আপনি আমার উপর অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু আমি আল্লাহর নিকট এর সুফলের আশা রাখি। (সেহেতু আমি সত্য কথা বলছি যে,) আল্লাহর কসম! (আপনার সাথে জিহাদে যাওয়ার ব্যাপারে) আমার কোন অসুবিধা ছিল না। আল্লাহর কসম! আপনার সাথ ছেড়ে পিছনে থাকার সময় আমি যতটা সমর্থ ও সচ্ছল ছিলাম ততটা কখনো ছিলাম না।" রাসূলুল্লাহ বললেন: "এ লোকটি নিশ্চিতভাবে সত্য কথা বলেছে। বেশ, তুমি এখান থেকে চলে যাও, যে পর্যন্ত তোমার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা কোন ফায়সালা না করবেন।"
আমার পিছনে পিছনে বানু সালামাহ্ (গোত্রের) কিছু লোক এল এবং আমাকে বলল যে, "আল্লাহর কুসম! আমরা অবগত নই যে, তুমি এর পূর্বে কোন পাপ করেছ। অন্যান্য পিছনে থেকে যাওয়া লোকেদের ওজর পেশ করার মত তুমিও কোন ওজর পেশ করলে না কেন? তোমার পাপ মোচনের জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল যে, রাসূলুল্লাহ তোমার জন্য (আল্লাহর নিকট) ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।" কা'ব বলেন, 'আল্লাহর কসম! লোকেরা আমাকে আমার সত্য কথা বলার জন্য তিরস্কার করতে থাকল। পরিশেষে আমার ইচ্ছা হল যে, আমি দ্বিতীয়বার রাসূলুল্লাহ -এর কাছে গিয়ে প্রথম কথা অস্বীকার করি (এবং কোন মিথ্যা ওজর পেশ করে দেই।) আবার আমি তাদেরকে বললাম, "আমার এ ঘটনা কি অন্য কারো সাথে ঘটেছে?" তাঁরা বললেন, "হ্যাঁ। তোমার মত আরো দু'জন সমস্যায় পড়েছে। (রাসূল -এর নিকটে) তারাও সেই কথা বলেছে, যা তুমি বলেছ এবং তাদেরকে সেই কথাই বলা হয়েছে, যা তোমাকে বলা হয়েছে।"
আমি তাদেরকে বললাম, "তারা দু'জন কে কে?" তারা বলল, "মুরারাহ ইবনু রাবী' আমরী ও হিলাল ইবনু উমাইয়্যাহ্ ওয়াক্বিফী।" এই দু'জন যাঁদের কথা তারা আমার কাছে বর্ণনা করল, তাঁরা সৎলোক ছিলেন এবং বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন; তাঁদের মধ্যে আমার জন্য আদর্শ ছিল। যখন তারা সে দু'জন ব্যক্তির কথা বলল, তখন আমি আমার পূর্বেকার অবস্থার (সত্যের) উপর অনড় থেকে গেলাম (এবং আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা দূরীভূত হল। যাতে আমি তাদের ভর্ৎসনার কারণে পতিত হয়েছিলাম)। (এরপর) রাসূলুল্লাহ লোকেদেরকে পিছনে অবস্থানকারীদের মধ্যে আমাদের তিনজনের সাথে কথাবার্তা বলতে নিষেধ করে দিলেন।'
কা'ব বলেন, 'লোকেরা আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেল।' অথবা বললেন, 'লোকেরা আমাদের জন্য পরিবর্তন হয়ে গেল। পরিশেষে পৃথিবী আমার জন্য আমার অন্তরে অপরিচিত মনে হতে লাগল। যেন এটা সেই পৃথিবী নয়, যা আমার পরিচিত ছিল। এভাবে আমরা ৫০টি রাত কাটালাম। আমার দুই সাথীরা তো নরম হয়ে ঘরের মধ্যে কান্নাকাটি আরম্ভ করে দিলেন। কিন্তু আমি গোত্রের মধ্যে সবচেয়ে যুবক ও বলিষ্ঠ ছিলাম। ফলে আমি ঘর থেকে বের হয়ে মুসলিমদের সাথে সলাতে হাজির হতাম এবং বাজারসমূহে ঘোরাফেরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলত না।
আমি রাসূলুল্লাহ -এর নিকটে হাজির হতাম এবং তিনি যখন সলাতের পর বসতেন, তখন তাঁকে সালাম দিতাম, আর আমি মনে মনে বলতাম যে, তিনি আমার সালামের জওয়াবে ঠোঁট নাড়াচ্ছেন কিনা? তারপর আমি তাঁর নিকটেই সলাত পড়তাম এবং আড়চোখে তাঁকে দেখতাম। (দেখতাম,) যখন আমি সলাতে মনোযোগী হচ্ছি, তখন তিনি আমার দিকে তাকাচ্ছেন এবং যখন আমি তাঁর দিকে দৃষ্টি ফিরাচ্ছি, তখন তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন!
অবশেষে যখন আমার সাথে মুসলিমদের বিমুখতা দীর্ঘ হয়ে গেল, তখন একদিন আমি আবূ ক্বাতাদাহ-এর বাগানে দেয়াল ডিঙ্গিয়ে (তাতে প্রবেশ করলাম।) সে (আবূ ক্বাতাদাহ) আমার চাচাতো ভাই এবং আমার সর্বাধিক প্রিয় লোক ছিল। আমি তাকে সালাম দিলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! সে আমাকে সালামের জওয়াব দিল না। আমি তাকে বললাম, "হে আবূ ক্বাতাদাহ! আমি তোমাকে আল্লাহর কুসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি জান যে, আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি?" সে নিরুত্তর থাকল। আমি দ্বিতীয়বার কুসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। এবারেও সে চুপ থাকল। আমি তৃতীয়বার কুসম দিয়ে প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলে সে বলল, "আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই বেশী জানেন।" এ কথা শুনে আমার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু বইতে লাগল এবং যেভাবে গিয়েছিলাম, আমি সেই ভাবেই দেয়াল ডিঙ্গিয়ে ফিরে এলাম।
এরই মধ্যে একদিন মদীনার বাজারে হাঁটছিলাম। এমন সময় শাম দেশের কৃষকদের মধ্যে একজন কৃষককে- যে মদীনায় খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করতে এসেছিল-বলতে শুনলাম, কে আমাকে কা'ব ইবনু মালেককে দেখিয়ে দেবে? লোকেরা আমার দিকে ইঙ্গিত করতে লাগল। ফলে সে ব্যক্তি আমার নিকটে এসে আমাকে 'গাসসান'-এর বাদশার একখানি পত্র দিল। আমি লিখা-পড়া জানতাম, তাই আমি পত্রখানি পড়লাম। পত্রে লিখা ছিল:
'অতঃপর আমরা এই সংবাদ পেয়েছি যে, আপনার সঙ্গী (মুহাম্মাদ) আপনার প্রতি দুর্ব্যবহার করেছে। আল্লাহ আপনাকে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত অবস্থায থাকার জন্য সৃষ্টি করেননি। আপনি আমাদের কাছে চলে আসুন; আমরা আপনার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করব।'
পত্র পড়ে আমি বললাম, "এটাও অন্য এক বালা (পরীক্ষা)।" সুতরাং আমি ওটাকে চুলোয় ফেলে জ্বালিয়ে দিলাম। অতঃপর যখন ৫০ দিনের মধ্যে ৪০ দিন গত হয়ে গেল এবং অহী আসা বন্ধ ছিল। এই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ-এর একজন দূত আমার নিকট এসে বলল, "রাসূলুল্লাহ তোমাকে তোমার স্ত্রী থেকে পৃথক থাকার আদেশ দিচ্ছেন!" আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আমি কি তাকে তালাক দেব, না কী করব?" সে বলল, "তালাক নয় বরং তার নিকট থেকে আলাদা থাকবে, মোটেই ওর নিকটবর্তী হবে না।" আমার দুই সাথীর নিকটেও এই বার্তা পৌঁছে দিলেন। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, "তুমি পিত্রালয়ে চলে যাও এবং সেখানে অবস্থান কর-যে পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা এ ব্যাপারে কোন ফায়সালা না করেন।"
(আমার সাথীদ্বয়ের মধ্যে একজন সাথী) হিলাল ইবনু উমাইয়ার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ -এর কাছে এসে বলল, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! হিলাল ইবনু উমাইয়াহ খুবই বৃদ্ধ মানুষ, তার কোন খাদেমও নেই, সেহেতু আমি যদি তার খিদমত করি, তবে আপনি কি এটা অপছন্দ করবেন?" তিনি বললেন, "না, (অর্থাৎ তুমি তার খিদমত করতে পার।) কিন্তু সে যেন (মিলন উদ্দেশে) তোমার নিকটবর্তী না হয়।" (হিলালের স্ত্রী বলল, "আল্লাহর কসম! (দুঃখের কারণে এ ব্যাপারে) তার কোন সক্রিয়তা নেই। আল্লাহর কসম! যখন থেকে এ ব্যাপার ঘটেছে তখন থেকে আজ পর্যন্ত সে সর্বদা কাঁদছে।"
(কা'ব বলেন,) 'আমাকে আমার পরিবারের কিছু লোক বলল যে, "তুমিও যদি নিজ স্ত্রীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট অনুমতি চাইতে, (তাহলে তা তোমার জন্য ভালো হত।) তিনি হিলাল ইবনু উমাইয়ার স্ত্রীকে তো তার খিদমত করার অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন।" আমি বললাম, "এ ব্যাপারে আমি রাসূলুল্লাহ -এর নিকট অনুমতি চাইব না। জানি না, যখন আমি রাসূলুল্লাহ -এর নিকটে অনুমতি চাইব, তখন তিনি কী বলবেন। কারণ, আমি তো যুবক মানুষ।"
এভাবে আরও দশদিন কেটে গেল। যখন থেকে লোকেদেরকে আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে নিষেধ করা হয়েছে, তখন থেকে এ পর্যন্ত আমাদের পঞ্চাশ রাত পূর্ণ হয়ে গেল। আমি পঞ্চাশতম রাতে আমাদের এক ঘরের ছাদের উপর ফজরের সলাত পড়লাম। সলাত পড়ার পর আমি এমন অবস্থায় বসে আছি যার বর্ণনা আল্লাহ তা'আলা আমাদের ব্যাপারে দিয়েছেন- আমার জীবন আমার জন্য দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও আমার প্রতি সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল- এমন সময় আমি এক চিৎকারকারীর আওয়ায শুনতে পেলাম, সে সাল'আ পাহাড়ের উপর চড়ে উচ্চৈঃস্বরে বলছে, "হে কা'ব ইবনু মালিক! তুমি সুসংবাদ নাও!" আমি তখন (খুশীতে শুকরিয়ার) সাজদায় পড়ে গেলাম এবং বুঝতে পারলাম যে, (আল্লাহর পক্ষ থেকে) মুক্তি এসেছে।
রাসূলুল্লাহ ফজরের সলাত পড়ার পর লোকেদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের তাওবাহ্ কবুল করে নিয়েছেন। সুতরাং লোকেরা আমাদেরকে সুসংবাদ দেয়ার জন্য আসতে আরম্ভ করল। এক ব্যক্তি আমার দিকে অতি দ্রুত গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এল। সে ছিল আসলাম (গোত্রের) এক ব্যক্তি। আমার দিকে সে দৌড়ে এল এবং পাহাড়ের উপর চড়ে (আওয়াজ দিল)। তার আওয়াজ ঘোড়ার চেয়েও দ্রুতগামী ছিল। সুতরাং যখন সে আমার কাছে এল, যার সুসংবাদের আওয়াজ আমি শুনেছিলাম, তখন আমি তার সুসংবাদ দানের বিনিময়ে আমার দেহ থেকে দু'খানি বস্ত্র খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম।
আল্লাহর কসম! সে সময় আমার কাছে এ দু'টি ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর আমি নিজে দু'খানি কাপড় অস্থায়ীভাবে ধার নিয়ে পরিধান করলাম এবং রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশে রওনা হলাম। পথে লোকেরা দলে দলে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমাকে মুবারকবাদ জানাতে লাগল এবং বলতে লাগল, "আল্লাহ তা'আলা তোমার তাওবাহ্ কবূল করেছেন, তাই তোমাকে ধন্যবাদ।" অতঃপর আমি মাসজিদে প্রবেশ করলাম। (দেখলাম,) রাসূলুল্লাহ বসে আছেন এবং তাঁর চারপাশে লোকজন আছে। ত্বালহা ইবনু 'উবাইদুল্লাহ উঠে ছুটে এসে আমার সঙ্গে মুসাফাহা করলেন এবং আমাকে মুবারকবাদ দিলেন। আল্লাহর কসম! মুহাজিরদের মধ্যে তিনি ছাড়া আর কেউ উঠলেন না।'
সুতরাং কা'ব ত্বালহা -এর এই ব্যবহার কখনো ভুলতেন না। কা'ব বলেন, 'যখন আমি রাসূলুল্লাহ -কে সালাম জানালাম, তখন তিনি তাঁর খুশীময় উজ্জ্বল চেহারা নিয়ে আমাকে বললেন, "তোমার মা তোমাকে যখন প্রসব করেছে, তখন থেকে তোমার জীবনের বিগত সর্বাধিক শুভদিনের সুসংবাদ তুমি গ্রহণ কর!" আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল! এই শুভসংবাদ আপনার পক্ষ থেকে, না কি আল্লাহর পক্ষ থেকে?" তিনি বললেন, "না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে।"
রাসূলুল্লাহ যখন খুশি হতেন, তখন তাঁর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে যেত, মনে হত যেন তা একফালি চাঁদ এবং এতে আমরা তাঁর এ (খুশী হওয়ার) কথা বুঝতে পারতাম। অতঃপর যখন আমি রাসূলুল্লাহ -এর সামনে বসলাম, তখন আমি বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল! আমার তাওবাহ্ কবুল হওয়ার দরুণ আমি আমার সমস্ত মাল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের রাস্তায় সাদাক্বাহ্ করে দিচ্ছি।" তিনি বললেন, "তুমি কিছু মাল নিজের জন্য রাখ, তোমার জন্য তা উত্তম হবে।" আমি বললাম, “যাই হোক! আমি আমার খায়বারের যুদ্ধে (প্রাপ্ত) অংশ রেখে দিচ্ছি।"
আর আমি এ কথাও বললাম যে, “হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আমাকে সত্যবাদিতার কারণে (এই বিপদ থেকে) উদ্ধার করলেন। আর এটাও আমার তাওবার দাবী যে, যতদিন আমি বেঁচে থাকব, সর্বদা সত্য কথাই বলব।” সুতরাং আল্লাহর কসম! যখন থেকে আমি রাসূলুল্লাহ -এর সঙ্গে সত্য কথা বলার প্রতিজ্ঞা করলাম, তখন থেকে আজকের দিন পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা কোন মুসলিমকে সত্য কথা বলার প্রতিদান স্বরূপ এর চেয়ে উৎকৃষ্ট কোন পুরস্কার দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। আল্লাহর কসম! আমি যেদিন রাসূলুল্লাহ-এর কাছে এ কথা বলেছি, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি মিথ্যা কথা বলার ইচ্ছা করিনি। আর আশা করি যে, বাকী জীবনেও আল্লাহ তা'আলা আমাকে এ থেকে নিরাপদ রাখবেন।'
কা'ব বলেন: 'আল্লাহ তা'আলা (আমাদের ব্যাপারে আয়াত) অবতীর্ণ করেছেন,
لَقَدْ تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
"আল্লাহ ক্ষমা করলেন নাবীকে এবং মুহাজির ও আনসারদেরকে যারা সংকট মুহূর্তে নাবীর অনুগামী হয়েছিল, এমন কি যখন তাদের মধ্যকার এক দলের অন্তর বাঁকা হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তারপর আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করলেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের প্রতি বড় স্নেহশীল, পরম করুণাময়। আর ঐ তিন ব্যক্তিকেও ক্ষমা করলেন, যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থগিত রাখা হয়েছিল; পরিশেষে পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতি সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল আর তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ ছাড়া আল্লাহর পাকড়াও হতে বাঁচার অন্য কোন আশ্রয়স্থল নেই। পরে তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হলেন, যাতে তারা তাওবাহ্ করে। নিশ্চয় আল্লাহই হচ্ছেন তাওবাহ্ গ্রহণকারী, পরম করুণাময়। হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।”২৩৯
কা'ব ইবনু মালিক বলেন, 'আল্লাহ আমাকে ইসলামের জন্য হিদায়াত করার পর রাসূলুল্লাহ-কে সত্য কথা বলা অপেক্ষা বড় পুরস্কার আমার জীবনে আল্লাহ আমাকে দান করেননি। ভাগ্যে আমি তাঁকে মিথ্যা কথা বলিনি। নয়তো তাদের মত আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম, যারা মিথ্যা বলেছিল। আল্লাহ তা'আলা যখন অহী অবতীর্ণ করলেন, তখন নিকৃষ্টভাবে মিথ্যুকদের নিন্দা করলেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা তাদের ব্যাপারে বললেন,
سَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَكُمْ إِذَا انْقَلَبْتُمْ إِلَيْهِمْ لِتُعْرِضُوا عَنْهُمْ فَأَعْرضُوا عَنْهُمْ إِنَّهُمْ رِجْسٌ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ يَحْلِفُونَ لَكُمْ لِتَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنْ تَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ)
"যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাবে, তারা তখন অচিরেই তোমাদের সামনে শপথ করে বলবে, যেন তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর; অতএব তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর; তারা হচ্ছে অতিশয় ঘৃণ্য, আর তাদের ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম, তা হল তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল। তারা এ জন্য শপথ করবে যেন তোমরা তাদের প্রতি রাজী হয়ে যাও, অনন্তর যদি তোমরা তাদের প্রতি রাজী হয়ে যাও, তবে আল্লাহ তো এমন দুষ্কর্মকারী লোকেদের প্রতি রাজী হবেন না।”২৪০
কা'ব বলেন: 'হে তিনজন! আমাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে রাখা হয়েছিল তাদের থেকে যাদের মিথ্যা কুসম রাসূলুল্লাহ (অজান্তে) গ্রহণ করলেন, তাদের বায়'আত নিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আর রাসূলুল্লাহ আমাদের ব্যাপারটা পিছিয়ে দিলেন। পরিশেষে মহান আল্লাহ সে ব্যাপারে ফায়সালা দিলেন। মহান আল্লাহ বলেন: "আর ঐ তিন ব্যক্তিকেও ক্ষমা করলেন, যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল।" পিছনে রাখার যে বিবৃতি দেয়া হয়েছে তার অর্থ যুদ্ধ থেকে আমাদের পিছনে থাকা নয়। বরং (এর অর্থ) আমাদের ব্যাপারটাকে ঐ লোকেদের ব্যাপার থেকে পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল, যারা তাঁর কাছে শপথ করেছিল এবং ওযর পেশ করেছিল। ফলে তিনি তা কবুল করে নিয়েছিলেন। ২৪১

টিকাঃ
২৩৮. এই 'আবদুল্লাহ কা'ব -এর ছেলেদের মধ্যে তাঁর পরিচালক ছিলেন, যখন তিনি অন্ধ হয়ে যান।
২৩৯. সূরা আত্ তাওবাহ্ ০৯: ১১৭-১১৯।
২৪০. সূরা আত্ তাওবাহ্ ০৯: ৯৫-৯৬।
২৪১. সহীহ মুসলিম: ৭১৯২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00