📘 কুরআন-হাদীসের আলােকে গুনাহ মাফের উপায় > 📄 মু'মিনদের একে অপরের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা

📄 মু'মিনদের একে অপরের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা


যে কোন মু'মিন ব্যক্তি নিজে নিজে দু'আ করলে আল্লাহ তা'আলা তা যেমন কবুল করেন তেমনি কোন মু'মিন অপর কোন মু'মিনের জন্য যদি ক্ষমা প্রার্থনা করে বা দু'আ করে তাহলে তাও আল্লাহ কবুল করেন। নাবীগণের মধ্য থেকে আমরা দেখতে পাই ইউসুফ আলাইহিস-এর প্রতি চরম অবিচার করে তার ভাইয়েরা যে অন্যায় করেছিলেন তার জন্য অনুতপ্ত হয়ে তারা তাদের পিতা ইয়া'কূব আলাইহিস-কে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলেছিলেন এবং তাদের অনুরোধ শুনে তিনি আল্লাহর কাছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। এ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তাদের কথপোকথন উল্লেখ করেছেন এভাবে,
قَالُوا يَا أَبَانَا اسْتَغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا إِنَّا كُنَّا خَاطِئِينَ قَالَ سَوْفَ أَسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ)
"তারা বলল, 'হে আমাদের পিতা, আপনি আমাদের গুনাহ মাফের জন্য ক্ষমা চান। নিশ্চয় আমরা ছিলাম গুনাহকারী'। তিনি বললেন, 'অচিরেই আমি তোমাদের জন্য আমার রব-এর নিকট ক্ষমা চাইব, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু'।"১৮৪
আল্লাহ তা'আলা সর্বশেষ নাবী মুহাম্মাদ -কেও একাধিকবার আদেশ করেছেন মু'মিন নর-নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে। যেমন আল্লাহ বলেন :
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
"অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের জন্য নম্র হয়েছিলে। আর যদি তুমি রূঢ়ভাষী (কঠোর স্বভাবের), কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তাদেরকে মাফ করে দাও এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালোবাসেন। "১৮৫
অন্য আয়াতে তিনি বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِذَا كَانُوا مَعَهُ عَلَى أَمْرٍ جَامِعٍ لَمْ يَذْهَبُوا حَتَّى يَسْتَأْذِنُوهُ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَأْذِنُونَكَ أُولَئِكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ فَإِذَا اسْتَأْذَنُوكَ لِبَعْضِ شَأْنِهِمْ فَأُذَنْ لِمَنْ شِئْتَ مِنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمُ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رحِيمٌ
"মু'মিন শুধু তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনে এবং তাঁর সাথে কোন সমষ্টিগত কাজে থাকলে অনুমতি না নিয়ে চলে যায় না। নিশ্চয় তোমার কাছে যারা অনুমতি চায় তারাই কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনে; সুতরাং কোন প্রয়োজনে তারা তোমার কাছে বাইরে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে তোমার যাকে ইচ্ছা তুমি অনুমতি দেবে এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। "১৮৬
নাবী-কে মু'মিন নারীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার আদেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন,
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا جَاءَكَ الْمُؤْمِنَاتُ يُبَايِعْنَكَ عَلَى أَنْ لَا يُشْرِكْنَ بِاللَّهِ شَيْئًا وَلَا يَسْرِقْنَ وَلَا يَزْنِينَ وَلَا يَقْتُلْنَ أَوْلَادَهُنَّ وَلَا يَأْتِينَ بِبُهْتَانٍ يَفْتَرِينَهُ بَيْنَ أَيْدِيهِنَّ وَأَرْجُلِهِنَّ وَلَا يَعْصِينَكَ فِي مَعْرُوفٍ فَبَايِعُهُنَّ وَاسْتَغْفِرْ لَهُنَّ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رحِيمٌ)
"হে নাবী! যখন মু'মিন নারীরা তোমার কাছে এসে এই মর্মে বাই'আত করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কোন কিছু শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, তারা জেনে শুনে কোন অপবাদ রচনা করে রটাবে না এবং সৎকাজে তারা তোমার অবাধ্য হবে না। তখন তুমি তাদের বাই'আত গ্রহণ করো এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"১৮৭
রাসূলুল্লাহ কারো জন্য প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা কবুল করতেন এবং যার জন্য তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তাকে তিনি মাফ করে দিতেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا
"আর আমি যে কোন রাসূল প্রেরণ করেছি তা কেবল এ জন্য, যেন আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদের আনুগত্য করা হয়। আর যদি তারা যখন নিজেদের প্রতি যুগ্ম করেছিল তখন তোমার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইতেন তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তাওবাহ্ কবুলকারী, দয়ালু হিসেবে পেত।"১৮৮
নাবী সাধারণভাবে পৃথিবীর সকল মু'মিন নর-নারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। নিম্নের আয়াতের বাস্তবায়ন তিনি করতেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
"হে নাবী! তুমি নিজের জন্য এবং মু'মিন নর-নারীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।"১৮৯
সহীহ মুসলিম-এর ৬২৩৪ নং হাদীসে এ আয়াতের বাস্তবায়নের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ কারো খাবার খেলে তার জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। একদিন তিনি এক বাড়িতে দা'ওয়াত খেয়ে তাদের জন্য দু'আ করেছেন এভাবে,
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهُمْ فِي مَا رَزَقْتَهُمْ وَاغْفِرْ لَهُمْ وَارْحَمْهُمْ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা বা-রিক লাহুম ফী মা- রযাকতাহুম ওয়াগফির লাহুম ওয়ারহামহুম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছেন তাতে বরকত দান করুন এবং তাদেরকে মাফ করুন আর তাদের ওপর রহম করুন। ১৯০
নাবী অন্য এক ঘটনায় আল্লাহর প্রিয় বান্দার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করতে আদেশ দিয়েছেন। ১৯১ তিনি মুসলিমদের মধ্যে যারা মারা গেছেন তাদের জন্য নিজে ক্ষমা চাইতেন এবং সাহাবীদেরকে তাদের জন্য ক্ষমা চাইতে আদেশ দিতেন।
মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার জন্য মাফ চাওয়ার আদেশ দিয়ে তিনি বলেছেন,
اسْتَغْفِرُوا لِأَخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ فَإِنَّهُ الْآنَ يُسْأَلُ»
"তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তার জন্য দৃঢ়তার দু'আ করো। কেননা তাকে এখনই প্রশ্ন করা হবে। "১৯২
তবে কোন অমুসলিম বা মুনাফিকের জন্য ক্ষমা চাওয়া বৈধ নয়। এরূপ কোন দু'আ আল্লাহ কবুল করবেন না। তাই ইস্তিগফার করতে হবে মু'মিন-মুসলিমদের জন্য। মু'মিনদের জন্য কখন কিভাবে ইস্তিগফার করতে হবে তার বিস্তারিত বর্ণনা বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। আমাদের উচিত সাধারণভাবে পৃথিবীর সকল মু'মিন-মুসলিমের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং নির্দিষ্টভাবে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, পাড়া-প্রতিবেশী, ছাত্র-শিক্ষক, অফিসের বস-সহকর্মী-কর্মচারী, জীবিত-মৃত ইত্যাদি ব্যক্তিদের জন্য নাম ধরে ক্ষমা চাওয়া।

টিকাঃ
১৮৪. সূরা ইউসুফ ১২:৯৭-৯৮।
১৮৫. সূরা আ-লি 'ইমরা-ন ০৩: ১৫৯।
১৮৬. সূরা আন্ নূর ২৪: ৬২।
১৮৭. সূরা আল মুমতাহিনাহ্ ৬০: ১২।
১৮৮. সূরা আন্ নিসা ০৪: ৬৪।
১৮৯. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ১৯।
১৯০. সহীহ মুসলিম: ৫৪৪৯, সুনান আবু দাউদ: ৩৭৩১, জামি' আত্ তিরমিযী: ৩৫৭৬।
১৯১. সহীহ মুসলিম: ৬৬৫৪-৬৬৫৬।
১৯২. সুনান আবু দাউদ: ৩২২৩, হাদীসটি সহীহ।

📘 কুরআন-হাদীসের আলােকে গুনাহ মাফের উপায় > 📄 ইসলামী দণ্ড ভোগ করা

📄 ইসলামী দণ্ড ভোগ করা


কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি কোন দণ্ডযোগ্য অপরাধ করে ফেলে আর তারপর যদি তার এই অপরাধের যথাযথ বিচার হয় এবং বিচারের রায় অনুযায়ী তার ওপর দণ্ড বা শাস্তি বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে তার এই শাস্তি প্রাপ্তিই তার অপরাধের কারণে যে গুনাহ হয়েছে তা মাফ করিয়ে দেবে। যেমন, 'উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত হতে বর্ণিত বায়'আত সম্পর্কিত বিখ্যাত হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
«مَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ»
"আর কেউ এর কোন একটিতে লিপ্ত হয়ে পড়লে এবং দুনিয়াতে তার শাস্তি পেয়ে গেলে, তবে তা হবে তার জন্য কাফ্ফারাহ্। "২৪২
প্রায় একই অর্থে কিছুটা বিস্তারিতভাবে অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
مَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَأُخِذَ بِهِ فِي الدُّنْيَا فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ
"আর যে এগুলো থেকে কিছু করে ফেলবে আর সে জন্য দুনিয়াতে যদি তার শাস্তি হয়ে যায়, তাহলে এটি হবে তার জন্য গুনাহর কাফফারাহ্।”২৪৩
এই সুযোগ শুধু যারা মুসলিম বা মু'মিন তাদের জন্য, কাফিরদের জন্য নয়।
কোন কাফিরের ওপর যখন শাস্তি আসে তখন সে তার অপরাধের কর্মফল হিসেবে সেই শাস্তি ভোগ করে। যেমন, নূহ আলায়হিস সালাম -এর জাতি, 'আদ, সামূদ জাতির শাস্তি, মুরতাদ (ইসলামধর্ম ত্যাগকারী)-এর শাস্তি ইত্যাদি। এসব কাফিরের ওপর শাস্তি আসায় এবং তারা তা ভোগ করায় তাদের অপরাধের গুনাহ মাফ হবে না।
যখন কোন মুসলিম এমন কোন অপরাধ করে ফেলে যার জন্য তার উপর হদ্দ (শরী'আহ নির্ধারিত নির্দিষ্ট কিছু দণ্ড) বা ক্বিসাস কিংবা তা'যীর প্রযোজ্য হয় তখন ঐ অপরাধীর উপর যখন ঐ নির্দিষ্ট শাস্তি বাস্তবায়ন করা হবে তখন তা তার জন্য গুনাহ মাফের উপায় হবে। দণ্ড ভোগ করার কারণে সে তার গুনাহ থেকে মাফ পাবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصُ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ﴾
"আর আমি এতে তাদের উপর অবধারিত করেছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান ও দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমের বিনিময়ে সমপরিমাণ জখম। অতঃপর যে তা ক্ষমা করে দেবে, তার জন্য তা কাফ্ফারা হবে। আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা বিচার-ফায়সালা করবে না, তারাই যালিম।"২৪৪
হাদীসে এসেছে,
«أَنَّ عُبَادَةَ بْنَ الصَّامِتِ مِنْ الَّذِينَ شَهِدُوا بَدْرًا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَمِنْ أَصْحَابِهِ لَيْلَةَ الْعَقَبَةِ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ وَحَوْلَهُ عِصَابَةٌ مِنْ أَصْحَابِهِ تَعَالَوْا بَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَّا تُشْرِكُوا بِاللهِ شَيْئًا وَلَا تَسْرِقُوا وَلَا تَزْنُوا وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ وَلَا تَأْتُوا بِبُهْتَانٍ تَفْتَرُونَهُ بَيْنَ أَيْدِيكُمْ وَأَرْجُلِكُمْ وَلَا تَعْصُونِي فِي مَعْرُوفٍ فَمَنْ وَلَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللهِ وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ بِهِ فِي الدُّنْيَا فَهُوَ لَهُ كَفَّارَةٌ وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَسَتَرَهُ اللَّهُ فَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ إِنْ شَاءَ عَاقَبَهُ وَإِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ»
'উবাদাহ্ ইবনু সামিত যিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে বদর যুদ্ধে এবং আকাবার রাতে উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে ছিলেন- তিনি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবীদের একটি দলকে লক্ষ্য করে বললেন, এসো তোমরা আমার কাছে এ কথার উপর বায়'আত কর যে, তোমরা الله তা'আলার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না, তোমরা চুরি করবে না, তোমরা ব্যভিচার করবে না; তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, তোমরা (কারো প্রতি) অপবাদ আরোপ করবে না যা তোমরা নিজে থেকে বানিয়ে নাও, তোমরা নেক কাজ করতে আমার নাফরমানী করবেনা, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এসব শর্ত পূরণ করে চলবে সে আল্লাহ তা'আলার নিকট তার প্রতিদান অবশ্যই পাবে। আর যে এসবের কোন কিছুতে লিপ্ত হয় এবং তাকে এ কারণে দুনিয়াতে আইনানুগ শাস্তি দেয়া হবে, তবে এ শাস্তি তার কাফ্ফারা হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি এ সবের কোনটিতে লিপ্ত হল আর আল্লাহ তা গোপন রাখলেন, তবে তার ব্যাপারটি আল্লাহ তা'আলার যিম্মায় থাকলো। তিনি ইচ্ছে করলে শাস্তি দিবেন আর ইচ্ছে করলে মাফ করবেন। ২৪৫
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ أَخَذَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ كَمَا أَخَذَ عَلَى النِّسَاءِ أَنْ لَّا نُشْرِكَ بِاللهِ شَيْئًا وَلَا نَسْرِقَ وَلَا نَزْنِي وَلَا نَقْتُلَ أَوْلَادَنَا وَلَا يَعْصَهَ بَعْضُنَا بَعْضًا فَمَنْ وَلَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللهِ وَمَنْ أَتَى مِنْكُمْ حَدًّا فَأُقِيمَ عَلَيْهِ فَهُوَ كَفَّارَتُهُ وَمَنْ سَتَرَهُ اللهُ عَلَيْهِ فَأَمْرُهُ إِلَى اللهِ إِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ وَإِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُ».
'উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ আমাদের থেকে অনুরূপ অঙ্গীকার (বায়'আত) নিলেন, যেরূপ অঙ্গীকার নিয়েছেন মহিলাদের থেকে যেন আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করি, চুরি না করি, ব্যভিচার না করি, আমাদের সন্তানদেরকে হত্যা না করি এবং একে অপরের বিরুদ্ধে অপবাদ না দেই। অতএব, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তা পূর্ণ করবে তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে পাবে। আর তোমাদের মধ্যে যদি কেউ এমন কোন অপরাধ করে যাতে (হদ্দ) শরীয়তের শাস্তি অত্যাবশ্যকীয় হয়, অতঃপর তার উপর সেই শাস্তি কার্যকর করা হয়, তবে তা তার অপরাধের কাফফারাহ্ (বদলা) হয়ে যাবে। আর যাকে (যে ব্যক্তির পাপ) আল্লাহ গোপন রাখলেন, তার বিষয় আল্লাহর ইখতিয়ারে। যদি তিনি ইচ্ছা করেন তবে তাকে শাস্তি দিবেন। আর যদি ইচ্ছে করেন তবে তাকে ক্ষমা করে দিবেন। ২৪৬
রাসূলুল্লাহ বলেছেন:
أَيَّمَا عَبْدٍ أَصَابَ شَيْئًا مِّمَّا نَهَى اللهُ عَنْهُ ثُمَّ أُقِيمَ عَلَيْهِ حَدُّهُ كُفْرَ عَنْهُ ذلِكَ الذَّنْبُ
"কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহর নিষেধকৃত কোন অপরাধ করে ফেলে তারপর (শার'ঈ আদালতে বিচারের মাধ্যমে প্রদত্ত রায় অনুযায়ী) তার ওপরে দণ্ড প্রয়োগ করা হয় তাহলে (এই শাস্তির কারণে) তার কৃত অপরাধজনিত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।"২৪৭
উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, কোন মুসলিম যদি এমন কোন অপরাধ করে ফেলে যে অপরাধের কারণে তাকে দণ্ড ভোগ করতে হয় তাহলে তার এই শাস্তি ভোগ করাটাই তার গুনাহ মাফের উপায় হবে। তবে এটি শুধু ঐ গুনাহ মাফের উপায় হবে যে গুনাহের জন্য সে শাস্তি ভোগ করেছে। যেমন, কেউ যদি কাউকে হত্যা করে তারপর হত্যাকারীকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে তাহলে মানুষ হত্যার কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তির যে গুনাহ হয়েছিল তা তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে মাফ হয়ে যাবে।

টিকাঃ
২৪২. সহীহুল বুখারী: ৪৮৯৪, সহীহ মুসলিম: ৪৫৫৮, শব্দ বুখারীর।
২৪৩. সহীহুল বুখারী: ৬৮০১, ৭৪৬৮।
২৪৪. সূরা আল মায়িদাহ্ ০৫: ৪৫।
২৪৫. সহীহুল বুখারী: ৩৮৯২।
২৪৬. সহীহ মুসলিম: ৪৫৬০।
২৪৭. আল মুসতাদরাক 'আলাস্ সহীহায়ন: ৮১৬৭, হাদীসটির সদন সহীহ।

📘 কুরআন-হাদীসের আলােকে গুনাহ মাফের উপায় > 📄 কাবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা

📄 কাবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা


গুনাহ মাফের অন্যতম উপায় হলো কাবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা। কাবীরা বা বড় গুনাহগুলো থেকে বেঁচে থাকলে বান্দার অন্যান্য ছোট ছোট গুনাহগুলো আল্লাহ তা'আলা মাফ করে দিবেন এবং সম্মানীত স্থানে অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
মহান আল্লাহ বলেন:
إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلُكُمْ مُدْخَلًا كَرِيمًا
"তোমরা যদি নিষেধকৃত কবীরা গুনাহগুলো বা বড় পাপসমূহ পরিহার করো তাহলে আমরা তোমাদের ছোট পাপগুলোকে মোচন করে দেব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে (জান্নাতে) প্রবেশ করাবো।"২৪৮
অন্য আয়াতে তিনি বলেন,
﴿الَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ إِلَّا اللَّمَمَ إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ هُوَ أَعْلَمُ بِكُمْ ﴾
"যারা ছোটখাট দোষ-ত্রুটি ছাড়া বড় বড় পাপ ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে, নিশ্চয় তোমার রব ক্ষমার ব্যাপারে উদার, তিনি তোমাদের ব্যাপারে সম্যক অবগত।"২৪৯
উপরি-উল্লিখিত আয়াত দু'টির প্রথমটির দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, কাবীরা গুনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারলে অর্থাৎ কাবীরা গুনাহ না করলে আল্লাহ সগীরা গুনাহকারীকে এমনিতেই মাফ করে জান্নাত দান করবেন। আর দ্বিতীয় আয়াতটিও প্রথম আয়াতের শিক্ষার অনুকূলে বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। মোটকথা সকল ধরনের কাবীরা গুনাহ থেকে দূরে থাকা সগীরা গুনাহ মাফের অন্যতম উপায়।

টিকাঃ
২৪৮. সূরা আন্ নিসা ০৪ : ৩১।
২৪৯. সূরা আন্ নাজ ৫৩ : ৩২।

📘 কুরআন-হাদীসের আলােকে গুনাহ মাফের উপায় > 📄 গায়েব অবস্থায় আল্লাহকে বিশ্বাস করা

📄 গায়েব অবস্থায় আল্লাহকে বিশ্বাস করা


আল্লাহকে আমরা না দেখেই বিশ্বাস করেছি। এটি শুধু ঈমানই নয় বরং সাথে সাথে গুনাহ মাফেরও কারণ। আবার আমরা যখন একা নির্জনে থাকি তখনও আল্লাহকে ভয় করে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকি। এমন যারা করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿إِنَّ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ)
"নিশ্চয় যারা গায়েব অবস্থায় তাদের রবকে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।"২৫০

টিকাঃ
২৫০. সূরা আল মুল্ক ৬৭ : ১২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00