📄 কোরআনের বিন্যাস
কোরআন মজীদ বুঝার ক্ষেত্রে অপর যে বিষয়টির প্রতি সতর্কতা অপরিহার্য এবং যা যথার্থ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নির্ধারণে একটি সিদ্ধান্তমূলক কারক হিসাবে গণ্য হতে পারে, তা হল বক্তব্যের বিন্যাস। বিন্যাস অর্থ হল, প্রতিটি সূরারই একটা বিশেষ স্তম্ভ বা বিষয়বস্তু থাকা এবং সূরার সমস্ত আয়াত অত্যন্ত বিজ্ঞোচিত সামঞ্জস্য ও ধারাবাহিকতার সাথে সেই বিষয়বস্তুটির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা। সূরাটির বারংবার পাঠের ফলে যখন সূরার স্তম্ভটি সৃস্পষ্ট হয়ে যায় এবং সূরার আয়াতগুলোর সম্পর্কও যখন তৎসঙ্গে সামনে এসে যায়, তখন সূরাটি বিভিন্ন আয়াতের একটি সংমিশ্রণের পরিবর্তে অত্যন্ত সুন্দর ও সুগঠিত একটি এককে পরিণত হয়। কোরআন বুঝার জন্য এই বিন্যাস বুঝা প্রাথমিক বিষয়। যতক্ষণ না এই বিন্যাসটি বুঝে আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোন সূরার প্রকৃত মূল্যায়ন এবং তার প্রকৃত দর্শনই পরিষ্কার হতে পারে না; সে সূরার বিভিন্ন আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা নির্ধারণও সম্ভব নয়। কিন্তু এ বিষয়টি যথেষ্ট কঠিন। সেজন্যেই আমাদের মহামান্য তফসীরকারগণ সেদিকে খুব কমই মনোযোগ দিয়েছেন। আর কেউ কেউ কিছুটা মনোযোগ দিয়ে থাকলেও তা ছিল একান্তই ভাসা ভাসা। ফলে তাঁরাও এ বিষয়ে তেমন লাভজনক কোন অবদান রাখতে পারেননি। বরং তাঁরা একটি সূরার বিভিন্ন আয়াতের মধ্যে যে ধরনের সম্পর্ক দেখিয়েছেন তা একান্ত লৌকিকতা বলেই প্রতীয়মান হয়। এ ধরনের সম্পর্ক যেকোন দুটি বিষয়ের মধ্যে স্থাপন করা যেতে পারে, তা সেগুলো পরস্পর যতই সম্পর্কহীন হোক না কেন। 'নযমে কোরআন' বা কোরআনের বিন্যাস বলতে আমাদের উদ্দেশ্য এই ধরনের লৌকিক বিন্যাস নয়; বরং সে বিন্যাসই আমাদের উদ্দেশ্য যা কোন উৎকৃষ্টতর বিজ্ঞজনোচিত নিবন্ধে হতে পারে এবং মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী (রঃ) তাঁর তফসীর 'নিযামুল কোরআন'-এ তা তুলে ধরেছেন।
সাধারণভাবে যেহেতু তফসীরকার আলেমগণ বিষয়টির প্রতি খুবই অল্প মনোযোগ দিয়েছেন, এমনকি অনেকে কোরআনের অবিন্যস্ততাকেই তার নিপুণতা বলে সাব্যস্ত করেছেন, সেজন্যে অনেকে কোরআনে বিন্যাসানুসন্ধানকে নিষ্প্রয়োজন প্রয়াস বলে গণ্য করেন। তাঁদের মতে কোরআন মজীদে বিন্যাস অনুসন্ধান করতে যাওয়া পাহাড় খুঁড়ে সৃষিক বের করারই মত। তাঁদের মতে কোরআন মজীদের প্রত্যেকটি সূরা বিক্ষিপ্ত উপদেশ ও বিধি-নিষেধ সম্বলিত নির্দেশ সমষ্টি এবং এদিকটি সামনে রেখেই তার তেলাওয়াত করা বাঞ্ছনীয়। বলাবাহুল্য, এ ধরনের যাঁদের ধারণা (এবং এদের সংখ্যাই বেশী), তারা এতটা পরিশ্রম ও অধ্যবসায় স্বীকার করতে পারেন না, যা কোরআনের বিন্যাস অনুসন্ধান করতে প্রয়োজন। সে কারণেই সর্বপ্রথম কর্তব্য হচ্ছে, মানুষের মনে এ বিশ্বাস সৃষ্টি করে দেয়া যে, কোরআনের মধ্যে বাস্তবিকই বিন্যাস রয়েছে। এখানে আমরা কোরআনের বিন্যস্ততার কিছু যুক্তি-প্রমাণ পেশ করব।
১. এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম যে বিভ্রান্তির অপনোদন প্রয়োজন তা হচ্ছে কোরআন মজীদে বিন্যাসের দাবীদার আলেমগণ শুধু এ যুগেই আবির্ভূত হননি; বরং পূর্বেও অনেকে এ দাবী করেছেন এবং কেউ কেউ কোরআনের বিন্যাস সম্পর্কে গ্রন্থও রচনা করেছেন। আল্লামা সুয়ূতী (রঃ) তাঁর 'এস্কান'-এ লেখেছেন:
"আল্লামা আবু জাফর ইবনে জুবাইর আবু হাইয়্যান কোরআনের বিন্যাস সম্পর্কে একটি বিশেষ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার নাম রেখেছেন "আলবুরহান ফী মুনাসিবাতি তারতীবে সূরাতিল কোরআন'। আর আমাদের সমসাময়িকদের মধ্যে শায়েখ বোরহানুদ্দীন বাকায়ীর তফসীর 'নাজমিদ্দুরার ফী তানাসিবিল আয়াতে ওয়াসূয়ার' গ্রন্থটিও এ বিষয়েই লিখিত হয়েছে।"
আল্লামা সুয়ূতী (রঃ) এ বিষয়ে নিজের একটি গ্রন্থের কথাও উল্লেখ করেছেন যাতে তিনি কোরআনের বিন্যাস ছাড়া কোরআনের অলৌকিকত্বের বিষয়টিও বিশ্লেষণ করেছেন এবং সে প্রসঙ্গেই কোরআনের সুবিন্যস্ততার গুরুত্ব তিনি নিম্নলিখিতভাবে স্বীকার করেছেন:
"শৃংখলা ও বিন্যাসের জ্ঞানটি অত্যন্ত উত্তম জ্ঞান। কিন্তু বিষয়টি কঠিন হওয়ার কারণে তফসীরকারগণ এর প্রতি খুব কমই মনোনিবেশ করেছেন। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশী নিয়মানুবর্তী ছিলেন। তিনি বলতেন, "হেকমতে কোরআন বা কোরআনী জ্ঞানের প্রকৃত ভান্ডার তার ধারাবাহিকতা ও বিন্যাসের ভেতরেই লুকিয়ে আছে।"
ইমাম রাযী (রঃ) তাঁর তফসীরে বিন্যাসের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখেছেন। অবশ্য এ ব্যাপারে তাঁর প্রচেষ্টা তেমন একটা লাভজনক প্রমাণিত হয়নি। কারণ, কোরআনের বিন্যস্ততা প্রতীয়মান করার জন্য যে পরিশ্রমের প্রয়োজন ছিল, সেজন্যে তাঁর মত পরিব্যস্ত লোকের পক্ষে সময় দেয়ার অবকাশ ছিল না। তথাপি এ বিষয়টির গুরুত্ব তিনি যতটা অনুভব করতেন তাঁর তফসীরের জায়গায় জায়গায় তা প্রকাশ করেছেন। অতএব ولو جعلناه قرانا اعجميا لقالوا আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে তিনি লেখেছেন-
"অনেকে বলেন, এ আয়াতটি সেসব লোকের উত্তরে অবতীর্ণ হয়েছে যারা দুষ্ট বুদ্ধি প্রণোদিত হয়ে বলত যে, কোরআন যদি অনারব ভাষায় অবতীর্ণ হত তবেই ভাল ছিল। কিন্তু এ ধরনের কথা বলা আমার মতে আল্লাহর কিতাবের প্রতি কঠিন অবিচার। এর অর্থ তো এই দাঁড়ায় যে, কোরআনের আয়াত-গুলোতে একটির সাথে অপরটির কোন যোগসূত্রই নেই। অথচ এতে কোরআনে হাকীমের ওপর একটা বিরাট আপত্তি উত্থাপন করা হয়। এমতাবস্থায় কোরআনকে মু'জেযা বলে মেনে নেয়া তো দূরের কথা, একে একটা বিন্যস্ত গ্রন্থ বলাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমার মতে সঠিক বক্তব্য হল, এই সূরাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি সুসংবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত কালাম।
অতপর তিনি প্রায় আঠারটি ছত্রে সূরার সংক্ষিপ্ত তফসীর লেখে বলেন: "যেসব লেখক বাস্তব সত্য অস্বীকারে অভ্যস্ত নন, তাঁরা স্বীকার করে নেবেন যে, সূরাটির তফসীর যদি সেভাবে করা হয় তা হলে সমগ্র সূরাটিকে একই বিষয়বস্তু সম্বলিত দেখা যাবে এবং এর প্রতিটি আয়াত একই তাৎপর্যের ইঙ্গিত করবে।"
এ পর্যায়েরই একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ লেখক হচ্ছেন আল্লামা মখদুম মহায়েমী (রঃ)। তাঁর তফসীর 'তাফসীরুর রাহমান ওয়া-তাইসীরুল মান্নান।' সেটি 'তফসীরে মহায়েমী' নামে প্রসিদ্ধ। তাতে তিনি কোরআনের আয়াতসমূহের বিন্যস্ততার বর্ণনা দিতে যথাসাধ্য চেষ্ট করেছেন। তবে একথা স্বতন্ত্র যে, সে প্রশ্নে তিনি সফল হয়েছেন কিনা? আর যদি হয়েও থাকেন তবে কতটা?
এ মতেরই আরেক মনীষী আল্লামা ওলীউদ্দীন মালভী। কোরআনের বিন্যাস সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য হচ্ছে এইঃ "যারা মনে করেন, কোরআনের অবতরণ যেহেতু সময় ও অবস্থার দাবী অনুসারে অল্প অল্প করে হয়েছে, সেহেতু এতে বিন্যস্ততার সন্ধান করা উচিত নয়- তাদের বিরাট বিভ্রান্তি ঘটেছে। কোরআন মজীদের অবতারণ নিঃসন্দেহে অবস্থার প্রেক্ষিতে অল্প অল্প করে ঘটেছে, কিন্তু যেভাবে তা সংকলিত করা হয়েছে, তাতে গভীর অভিজ্ঞানের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে।"
মুসলিম সমাজের প্রসিদ্ধ ও বিদগ্ধ ওলামায়ে কেরামের উপরোল্লিখিত বক্তব্য এ বিষয়ে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, কোরআন মজীদে বিন্যাসের প্রবক্তা শুধুমাত্র মাওলানা হামীদুদ্দীন (রঃ) কিংবা তাঁর শিষ্যবর্গই নন, বরং অন্যান্য ওলামাও বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন এবং তার সাক্ষ্যও দিয়েছেন।
তদুপরি বিষয়টির আরো একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, যেসব আলেম 'বিন্যাস'কে অস্বীকার করেছেন, তাঁরাও এর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব উপলদ্ধি করেছেন। তার প্রমাণ, যে ওলামা বিন্যাসের প্রবক্ত নন, তাঁরাও অধিকাংশ সময় ব্যাখ্যার সমর্থনে কালাম বা বক্তব্যের অগ্র-পশ্চাৎ সম্পর্ক তুলে ধরেন। আর একথা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, অগ্র-পশ্চাৎ সম্পর্ককে তখনই দলিল হিসাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে, যখন তাকে একটা সুবিন্যস্ত কালাম বলে স্বীকার করা হবে।
প্রসিদ্ধ তফসীরগুলোতে এ বিষয়টি ইবনে জারীর (রঃ)-এর তফসীরেও পরিলক্ষিত হয় এবং কাশ্শাফেও। তাঁদের দুজনই অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন আয়াতের বিভিন্ন ব্যাখ্যার মধ্যে সে ব্যাখ্যাটিতেই অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন এবং অগ্রাধিকার দেন, যেটিকে তাঁরা কালামের বিন্যাসের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখতে পান। এতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, যদিও তাঁরা কোরআনের বিন্যস্ততাকে তার জটিলতার দরুন সব ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করে দেয়ার নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখতে পারেননি, কিন্তু যেখানেই বিন্যাসের মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে তাকে একটি বক্তব্যের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসাবে স্বীকার করে নিয়ে প্রমাণস্বরূপ উপস্থাপন করেছেন। ইমাম রাযী (রঃ)-এর আলোচনা আমরা এক্ষেত্রে করছি না। তার কারণ, কোরআনের বিন্যাস প্রশ্নে তিনি উপরোল্লিখিত মনীষীদ্বয় থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। তিনি কালামের বিন্যস্ততার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের (যেমন তাঁর বক্তব্যের দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যায়, যা আমরা ওপরে উদ্ধৃত করেছি।) কঠিন প্রবক্তা ছিলেন। তিনি প্রত্যেকটি আয়াতের বেলায়ই তা বর্ণনা করতে চেষ্টা করেন, যদিও তাতে যেমন আমরা নিবেদন করেছি, তিনি তেমন একটা সফলকাম হতে পারেননি।
যাঁরা নিজেদের ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে কোরআনের বিন্যাসকে অস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁরা সে অস্বীকৃতির পক্ষে যে দলিল-প্রমাণ উপস্থিত করেছেন, সেগুলো এতই দুর্বল যে, অন্যদেরকে বাদ দিয়ে তাঁরা নিজেরাও তাতে আশ্বস্ত হতে পারেননি। তাঁরা বলেন, কোরআন মজীদ প্রয়োজন ও অবস্থার প্রেক্ষিতে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয়েছে বলে তাতে কোন বিন্যাস নেই। তাঁদের এ দলিলটি শুধুমাত্র এ বাস্তবতার দ্বারাই খন্ডিত হয়ে যায় যে, লম্বা সূরাসমূহের কোন কোনটি এবং ছোট সূরার অধিকাংশগুলো গোটা গোটাই একবারে অবর্তীর্ণ হয়েছে। বলাবাহুল্য, এসব সূরার অবিন্যস্ততার ব্যাখ্যা উল্লিখিত দলিলের দ্বারা হতে পারে না। কাজেই ইমাম রাযী (রঃ) এরই ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে সে আপত্তি তুলেছেন, যা আমরা ওপরে উদ্ধৃত করে এসেছি।
আমাদের মতে, এঁদের অস্বীকৃতির কারণ কোন দলিল-প্রমাণ নয়; বরং শুধুমাত্র এ কারণে যে, তাঁদের ধারণায় কোরআনে বিন্যস্ততার দাবী করা এবং সব ক্ষেত্রে তা তুলে ধরতে না পারা একটা বিরাট দুর্বলতার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। তাতে ইসলাম বিরোধীরা কোরআনের ওপর প্রশ্ন করার একটা পথ পেয়ে বসবে। এবং তা গোটা উম্মত বা মুসলিম জাতির জন্য হবে একান্ত ক্ষতিকর। এ বিষয়টি থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশেই তাঁরা বিন্যাসকে গোড়াতেই অস্বীকার করে দেয়া সমীচীন বিবেচনা করেছেন। তাঁরা যদিও কাজটি নেক নিয়তে করেছেন, কিন্তু এতে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, এই অস্বীকৃতির অপকারিতা তার চেয়ে বহুগুণ বেশী হয়েছে, যার থেকে কোরআনকে রক্ষা করতে গিয়ে তাঁরা এ পথ অবলম্বন করেছিলেন। এ ব্যাপারে সঠিক পথ এই ছিল যে, বিন্যাসকে যতটা সম্ভব প্রতীয়মান করতে চেষ্টা করতেন আর যেখানে সম্ভব না হত সেখানে কালামের একটা প্রকাশ্য দোষকে বিচক্ষণতা প্রমাণ করতে চেষ্টা না করে নিজেদের জ্ঞানের স্বল্পতা বলে স্বীকার করে নিতেন।
৩. যাঁরা কোরআনের সংগ্রহ এবং সংকলন সম্পর্কিত রেওয়ায়াতসমূহের প্রতি লক্ষ্য করেছেন, তাঁরা এই বাস্তবতা অস্বীকার করতে পারেন না যে, কোরআন যদিও অল্প অল্প করে নাযিল হয়েছে, কিন্তু আয়াতসমূহকে হুযুর আকরাম (সঃ)-এর নির্দেশানুযায়ী বিন্যস্ত করা হয়েছে। যে আয়াতই অবতীর্ণ হত হুযুর (সঃ) স্বয়ং সূরার ভেতরে তার স্থান নির্ধারণ করে দিতেন এবং ওহী লেখক সাহাবিগণকে আদেশ দিতেন যে, এ আয়াতগুলোকে অমুক সূরার অমুক জায়গায় লেখে রাখ। ওহী লেখক সাহাবিগণও হুযুরের হেদায়াত অনুসারে সেসব আয়াত তাঁরই নির্ধারিত জায়গায় লেখে রাখতেন। সুতরাং এ বিষয়ে সমগ্র জাতি একমত যে, আয়াতসমূহের বিন্যাস হুযুরে আকরাম (সঃ)-এর হুকুম মোতাবেকই হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কোরআন মজীদে যদি বিন্যস্ততাই না থাকবে, তা হলে মহানবী (সঃ) এ ধরনের নির্দেশ দিতেন কেন? তা হলে তো অবতরণকালীন বিন্যাসই ছিল উত্তম। যেভাবে আয়াত অবতীর্ণ হতে থাকত, সেভাবেই সেগুলো লিখিয়ে রাখতেন। অবতরণকালীন বিন্যাস বাদ দিয়ে যখন একটা বিশেষ বিন্যাস ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তখন বিষয়টি চিন্তা করতে হবে যে, তা হলে এই নয়া বিন্যাস পদ্ধতি গ্রহণ করার কি কারণ থাকতে পারে? পরিষ্কার কথা যে, এ প্রশ্নের যথার্থ ও সঠিক উত্তর একটাই হতে পারে। আর তা হচ্ছে, এই বিন্যাস বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্য অনুসারে স্থাপিত। ওপরে আমরা আল্লামা মালভী (রঃ)-এর যে বক্তব্য উদ্ধৃত করে এসেছি, তাতে এদিকেই ইঙ্গিত বুঝা যায়।
আমাদের এ মতের সমর্থন এর দ্বারাও হয় যে, কোরআন মজীদের কোন হুকুম নাযিল হওয়ার পর যদি এমন কোন আয়াত অবতীর্ণ হয়, যা সে হুকুমের কোন প্রকার সংশোধন কিংবা লঘুকরণ সম্পর্কে আল্লাহ্ তাআলা যে আয়াত নাযিল করতেন তা সাবেক মূল আয়াতের যত দীর্ঘ দিন পরেই নাযিল হোক না কেন, সাধারণত তাকে সাবেক হুকুমের পাশেই স্থান দেয়া হেয়েছে। এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত কোরআনেও বিদ্যমান রয়েছে। আর যদি কোথাও এ নিয়মের ব্যতিক্রম করা হয়ে থাকে, তবুও বাক্যবিন্যাস এবং বিষয়বস্তুর প্রকৃত গুরুত্ব উপেক্ষা করা হয়নি।
কোরআন মজীদে পৃথক পৃথক সূরার স্থাপনা এবং তার কোনটার দীর্ঘ এবং কোনটার হ্রস্ব হওয়াও এরই প্রমাণ যে, কোরআন মজীদে বিন্যস্ততা রয়েছে। কোরআন যদি একটা অবিন্যস্ত কিতাবই হয়, তা হলে পৃথক পৃথক সূরা গঠন করার কি প্রয়োজন ছিল? প্রতিটি বুদ্ধিমান ব্যক্তিই এ কথা বুঝতে পারেন যে, সূরাসমূহের বিষয়বস্তুই যদি পৃথক পৃথক না হত এবং প্রতিটি সূরাই যদি সুনির্দিষ্টভাবে ঐক্যসূত্রে গাঁথা বিশেষ একটি ভিত্তি সম্বলিত না হত, তা হলে তেলাওয়াত ও মুখস্থ করার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সহজ বিন্যাস হত এই যে, কোরআন যারা সংগ্রহ করেছেন তাঁরা আয়াতের একেকটা সমষ্টি নিয়ে সমান সমান সূরায় ভাগ করে বসিয়ে দিতেন। কিন্তু তাঁরা যখন এমন করেন নি, বরং পৃথক পৃথক সূরা গঠন করেছেন, যার কোনটা ছোট কোনটা বড়, তখন তার কারণ এ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না যে, এসব সূরার বিষয়বস্তুই ভিন্ন ভিন্ন এবং প্রত্যেকটি সূরাই বিষয়বস্তুর ঐক্যে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।
কোন রকম মতবিরোধ ব্যতীত সমস্ত কোরআনে সূরাসমূহের বর্তমান যে বিন্যাস, তাও এ বিষয়েরই একটা বিরাট প্রমাণ যে, কোরআন মজীদ একটি সুবিন্যস্ত গ্রন্থ। তার মানে, কোরআনের সূরাগুলোকে যেভাবে আগে-পরে সাজানো হয়েছে, তাও কোন একটা কারণ ছাড়া হয়নি; হতে পারে না। সেজন্য এই প্রশ্নটি নিয়ে চিন্তা করতে হবে যে, এই অগ্রপশ্চাৎ কোন মূলনীতির ভিত্তিতেই হয়ে থাকবে। বাহ্যিক দিক দিয়ে এই অগ্রপশ্চাতের ব্যাপারে সূরাসমূহের হ্রস্বতা কিংবা দীর্ঘতারই সবচেয়ে বেশী দখল থাকা উচিত ছিল, কিন্তু কোরআন মজীদের ওপর চোখ রাখামাত্র যে কেউ অনুমান করে নিতে পারেন যে, কোরআনে এ বিষয়টির এতটুকু লক্ষ্য রাখা হয়নি। কারণ, এই বিন্যাসে সূরা ফাতেহাকে সূরা বাকারার পূর্বে স্থান দেয়া হয়েছে। অথচ এ দুটো সূরার আয়তনে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তেমনিভাবে সূরা কাওসার- যেটি কিনা কোরআন মজীদের সবচাইতে ছোট সূরা- এমন কতিপয় সূরার পূর্বে স্থাপন করা হয়েছে, যেগুলো আয়তনের দিক দিয়ে তার চাইতে বড় বা দীর্ঘ। এ কথাও স্বীকৃত যে, এই বিন্যাসও অবতরণকালীন বিন্যাস নয়। কারণ, অবতরণের দিক দিয়ে প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েত অনুযায়ী কোর আনে সর্বপ্রথম সূরা 'ইকরা'কে স্থান দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু সবাই জানেন, তাকে রাখা হয়েছে কোরআনের সর্বশেষ পারাটিতে। এই পরিস্থিতি মানুষকে সূরার পরিমাণ এবং অবতরণের অগ্রপশ্চাৎ ছাড়াও বর্তমান পূর্বাপরতার ব্যাপারে অন্য কোন কারণ অনুসন্ধানে বাধ্য করে। আমাদের মতে বর্তমান এই পূর্বাপরতার কারণ হচ্ছে সূরার মর্মগত সামঞ্জস্য। হয়ত আমাদের দাবী সম্পর্কে কেউ এ আপত্তি উত্থাপন করে বসবেন যে, সূরাসমূহের বিন্যাস তো সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর আমলেই হয়েছে। কাজেই এর রহস্য বা তাৎপর্য সম্পর্কে মাথা ঘামানো নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের মতে তাঁদের এ ধারণা যথার্থ নয়। প্রথমত সূরাসমূহের ধারাবাহিকতা হুযুরে আকরাম (সঃ)-এর নির্দেশ অনুসারেই সাব্যস্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত কিছুক্ষণের জন্য যদি ধরেও নেয়া যায় যে, সূরাসমূহের ক্রমবিন্যাস সাহাবা (রাঃ)-দের মতেই হয়েছে, তাতে একথা কেন অপরিহার্য হয়ে পড়বে যে, সাহাবাগণ সূরাগুলোকে এমনি কোন প্রকার মর্মগত সামঞ্জস্য ছাড়াই একত্রিত করে দিয়ে থাকবেন? অথচ এ ব্যাপারে সবাই অবগত যে, সূরা 'বারাআত-এর স্থান নির্ধারণ নিয়ে যখন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল, তখন শেষ পর্যন্ত কোরআন মজীদের বিন্যাসের সাহায্যেই বিষয়টির সমাধান হয়েছিল এবং মর্মগত সামঞ্জস্যের ভিত্তিতেই সূরা 'আনফাল'-এর পরে স্থান দেয়া হয়েছিল।
আমরা একথা তাঁদের ধারণার প্রেক্ষিতে বলেছি, যাঁরা বলেন যে, সূরাসমূহের ক্রমবিন্যাস সাহাবাদের যুগে এবং তাঁদেরই মতে সাব্যস্ত হয়েছে। তা না হলে আমাদের মতে আল্লাহ্ তাআলার নির্দেশানুযায়ী হুযুরে আকরাম (সঃ) নিজেই সূরাসমূহকে বিন্যস্ত করেছেন। আমাদের এ দাবীর সমর্থন কোরআন ও হাদীস উভয়ের দ্বারাই হয়।
আল্লাহ তাআলা সূরা 'কিয়ামাহ'-তে এরশাদ করেছেন-
إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْأْنَهُ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعُ قُرْآنَهُ، ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ .
নিঃসন্দেহে আমার দায়িত্ব হল কোরআনকে সংকলিত করা এবং শুনানো। অতএব যখন আমি শুনাই, তখন যা শুনানো হয় তার অনুসরণ কর। অতঃপর আমার দায়িত্বে রয়েছে তার বিশ্লেষণ।
মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী (রঃ) উল্লিখিত আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে বলেছেন:
এ আয়াতটিতে তিনটি বিষয় বলা হয়েছে। একটি হল কোরআন মজীদ নবুয়তের আমলেই হুযুরে আকরাম (সঃ)-কে বিশেষ ক্রমবিন্যাস মোতাবেক শুনিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ, এ ওয়াদা যদি হুযুর (সঃ)-এর পরে বাস্তবায়িত করা উদ্দেশ্য হত, তা হলে হুযুরকে এই সংগ্রহ ও ক্রমবিন্যাসের অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হত না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে- দ্বিতীয় কেরাত অনুযায়ী-যা জমা করার পরে হয়েছে। হুযুরের প্রতি নির্দেশ হল, আপনি উম্মতকে কোরআন শোনান। আর একথা বুদ্ধি ও বিবেচনার দিক দিয়ে অসম্ভব যে, হুযুরের প্রতি কোন একটি নির্দেশ প্রচারের উদ্দেশে এসেছে, অথচ তা তিনি উম্মত পর্যন্ত পৌঁছে দেননি।
কোরআনে বলা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغُ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِن رَبِّكَ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ .
হে রসূল! তোমার প্রতি যে বস্তুটি অবতীর্ণ করা হয়েছে তা মানুষের মাঝে পৌঁছে দাও। যদি তুমি তা না কর, তা হলে তার অর্থ এই হবে যে, তুমি নিজের রেসালাতের ফরয আদায় করলে না।
এই সাধারণ নির্দেশের দাবী হল সেই শেষ কেরাত অনুযায়ী, যা লওহে মাহফুযে রয়েছে, হুযুর আকরাম (সঃ) মানুষকে কোরআন মজীদ শুনিয়েছেন। এই শেষ কেরাতটি আমলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া অত্যাবশ্যক।
তৃতীয় কথাটি হচ্ছে সংগ্রহ ও ক্রমবিন্যাসের পরে আল্লাহ্ তাআলা যদি কোন সাধারণ নির্দেশকে অসাধারণ কিংবা কোন অসাধারণ নির্দেশকে সাধারণ করতে চেয়ে থাকেন, অথবা কোন বিষয়কে পূর্ণতা দান করতে ইচ্ছা করে থাকেন, তবে এ সমস্তই করে দিয়েছেন। কোরআন মজীদ হুযুরে আকরাম (সঃ)-এর যুগেই এ সমস্ত ধাপ অতিক্রম করে নিয়েছে। এ সত্যটি সবাই জানেন যে, মহানবী (সঃ) মানুষকে গোটা গোটা সূরা শোনাতেন। আর এটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, যদি না কোরআন মজীদ একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস অনুযায়ী তাঁকে শোনানো হয়ে থাকে। এই ক্রমবিন্যাস অনুযায়ীই সাহাবিগণ হুযুরের নিকট কোরআনের শিক্ষা নিয়েছেন। রেওয়ায়েতে এ বিষয়টি বিশদভাবে বলা হয়েছে যে, তিনি আয়াতসমূহকে যথার্থ জায়গায় স্থাপন করার নির্দেশ দান করতেন আর তাঁর এ নির্দেশ যথাযথ বাস্তবায়িতও হত। পরে যদি কোন বিশ্লেষণমূলক আয়াত অবতীর্ণ হত, তখন সেটিকেও যথাস্থানে লেখে রাখা হত। এভাবে কোরআন মজীদ যখন পরিপূর্ণ হয়ে যায়, তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) (বিশুদ্ধ হাদীস মতে) হুযুর আকরাম (সঃ)-এর কাছে শেষবার পূর্ণ কোরআন শোনালেন। এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবার পর কোরআন মজীদের বিন্যাস সংক্রান্ত বহু জটিলতার সমাধান আপনা থেকে হয়ে যায়। (তফসীর: সূরা কিয়ামাহ্)
ইমাম হামীদুদ্দীন ফারাহী (রঃ) কর্তৃক কোরআন থেকে গৃহীত উপরোল্লিখিত পর্যালোচনা দ্বারা অত্যন্ত পরিচ্ছন্নভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, কোরআন মজীদ যেভাবে এবং যে বিন্যাসের সাথে আমাদের এ যুগে বিদ্যমান, এ বিন্যাস আল্লাহ্ তাআলার নির্দেশ ও হেদায়াত অনুযায়ী নবুয়তের আমলে পূর্ণতা লাভ করেছিল। কিন্তু যেহেতু তখন আরবদের মধ্যে লেখাপড়ার চর্চা ছিল অল্প এবং কাগজ-কলম প্রভৃতি লেখার উপকরণগুলোও ছিল একান্ত দুষ্প্রাপ্য, তাই দীর্ঘকাল ধরে কোরআন মজীদ সংরক্ষণ করা হয়েছিল খেজুরের পাতা, হাড়, শিলাখণ্ড এবং হাফেযদের বক্ষপটে। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-ই হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি নবী করীম (সঃ)-এর দেয়া ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী বিক্ষিপ্ত আয়াতসমূহকে গ্রন্থায়িত করেন। অতপর হযরত ওসমান (রাঃ) নিজের শাসনামলে সে সংগ্রহ থেকে আরো কতিপয় কপি করিয়ে সেগুলো বিভিন্ন ইসলামী রাষ্ট্রে পাঠিয়েছেন।
কোরআন মজীদের সুবিন্যস্ত হওয়ার আরো একটি বড় প্রমাণ এই যে, কোরআন সর্বজনস্বীকৃতভাবে একটা উচ্চতর মানের কালাম। বস্তুত এমন কোন কালামই উচ্চ মানের কালাম হতে পারে না, যা সুবিন্যস্ত নয়। যেকোন কালামের প্রকৃত গঠন হচ্ছে তার বিন্যস্ততা। বিন্যাসকে পৃথক করে নিলে কালাম বা রচনা শুধু যে তার সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য থেকেই বঞ্চিত হয়ে পড়ে তাই নয়, বরং তখন গোটা রচনাটি সম্পূর্ণভাবে অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। যে কালাম বা রচনা বিন্যাস বিবর্জিত, মানুষ সেটিকে মূর্খতার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করে এবং অন্তত কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তিই তা নিয়ে সময়ের অপচয় করতে রাজি হয় না। কোরআন মজীদ সম্পর্কে এ কথা সারা দুনিয়াই অবগত যে, সে আরবদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছে, যেন তারা তার মত কোন একটা সূরা উপস্থাপন করে। কিন্তু আরববাসীরা তাদের বাগ্মিতা, সালঙ্কার ভাষাজ্ঞান সম্পর্কিত সমস্ত গর্ব সত্ত্বেও কোরআনের সে চ্যালেঞ্জের উত্তরে কোন একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সূরাও উপস্থাপন করতে পারেনি।
কোরআনের এই সাহিত্যিক ও মর্মগত মাহাত্ম্যের বিবেচনায় প্রথম যে জিনিসটি তাতে থাকা উচিত, তাই হচ্ছে বিন্যাস। কারণ, বিচ্ছিন্ন ও বিন্যাস বিবর্জিত কোন গ্রন্থের পক্ষেই আরব বাগ্মী ও আলঙ্কারিকদেরকে প্রভাবিত করা সম্ভব ছিল না।
এখানে লক্ষণীয়, কোরআন যে বিস্মিত ও হতভম্ব করে দেয়ার মত এক বিষয়, তার প্রমাণ, কোরআন যেখানেই আরবদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছে সেখানেই তাদের কাছে নিজের মত একটি গ্রন্থ কিংবা দশটি আয়াত অথবা হাদীস (حديث من مثله হাদীস মিম মিস্লিহী) বা কমসে কম একটি সূরা উপস্থিত করার দাবী করেছে, এর চাইতে কম দাবী করেনি। কারণ, এর চাইতে কম হতে গেলে কালাম বা রচনার বিন্যাসশৈলীর প্রকাশ ঘটে না, যা প্রকৃতপক্ষে তার মূল প্রাণ। সে কারণেই আরব-আজমের সমস্ত ভাষাতত্ত্ববিদ মনীষীবৃন্দ এ বিষয়ে ঐকমত্যে উপনীত হয়েছেন যে, কালাম বা রচনার আসল প্রাণ হচ্ছে তার বিন্যাস। এর মাধ্যমেই তার যাবতীয় গুণ-বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটতে পারে। এই বাস্তবতা স্বীকার করে নিতে কারও মনে যদি দ্বিধার সৃষ্টি হয়, তা হলে তিনি ভালর চাইতে ভাল যেকোন সালঙ্কার রচনা নিয়ে তার বিন্যাস নষ্ট করে দিয়ে দেখতে পারেন। দেখা যাবে, তখন সে রচনার যাবতীয় শক্তি মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
কোরআনের সুবিন্যস্ততা সম্পর্কে আমরা এই কয়েকটি প্রমাণ এ উদ্দেশেই উপস্থিত করেছি যে, পাঠক মহোদয়ের কারো মনে যদি এমন কোন ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয় যে, কোরআন একটা বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত গ্রন্থ এবং এই অবিন্যাস্ততাই তার আদত বৈশিষ্ট্য, তা হলে যেন সে ভুলটি দূর হয়ে যেতে পারে এবং যাতে কোরআন বুঝতে গিয়ে পূর্ণ ভরসা সহকারে তার সুবিন্যস্ততাকে পথপ্রদর্শক করে নিতে পারেন।
📄 বিন্যাস অনুসন্ধানের মূলনীতি
কিন্তু কোরআনের সুবিন্যস্ত কালাম হওয়ার দলিল-প্রমাণ বর্ণনা করার চাইতে সে মূলনীতিগুলো বর্ণনা করা বেশী জরুরী, যা সে বিন্যাসের অনুসন্ধান করতে গিয়ে দিশারীর ভূমিকা পালন করতে পারবে। কেউই কোরআনের সুবিন্যস্ততা এ কারণে অস্বীকার করে না যে, তাঁর কাছে তার কোন গুরুত্বই নেই কিংবা তার অস্তিত্বের প্রমাণ তার জন্যে স্পষ্ট নয়, বরং তাঁদের অস্বীকৃতির প্রকৃত কারণ হচ্ছে এই যে, বিন্যাসের অনুসন্ধান এবং তাঁর নির্ণয় করাটা আসলেই যথেষ্ট জটিল কাজ। এই জটিল বিষয়টিকে যদি কোনক্রমে সহজ করে নেয়া যায়, তা হলে তার মূল্য-মর্যাদা এবং কোরআনের মর্মোদ্ধারে তার গুরুত্ব অস্বীকার করার কোন অবকাশ কারও নেই।
আমাদের পক্ষে এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতে বিন্যাস অনুসন্ধানের মূলনীতি বর্ণনা করাটা যথেষ্ট কঠিন, বরং প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কয়েকটি সাক্ষাতও এতদুদ্দেশে যথেষ্ট হতে পারে না। কাজেই সঠিক পন্থা হচ্ছেপূর্ণ বিস্তৃতি সহকারে শুধু সে মূলনীতিগুলো বলে দেয়া, যা কোরআনের বিন্যাস অন্বেষণে পথনির্দেশ করবে। তারপর সে মূলনীতিগুলো কিভাবে প্রয়োগ করতে হবে সে বিষয়ের অনুশীলন। মূলনীতি সম্পর্কে যতটা জানার প্রয়োজন সেজন্যে এ যুগের সবচেয়ে মহান খাদেমে কোরআন মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী (রঃ)-এর রচনাসমূহের অধ্যয়ন করা যেতে পারে। বিশেষ করে তাঁর রচিত 'দালায়েলুন্নিযাম' গ্রন্থটির অধ্যয়নে মূলনীতি আয়ত্ত করার ব্যাপারে জ্ঞানীদের জন্য তেমন কোন জটিলতা থাকবে না। কিন্তু এই মূলনীতিগুলোর যথার্থ প্রয়োগ এবং তার দ্বারা উপকৃত হওয়াটা জ্ঞানার্জনের আগ্রহ এবং অন্বেষার ওপরই নির্ভরশীল।
এ ক্ষেত্রে আমরা যে সেবাটুকু করতে পারি তা হল শুধু এই যে, এমন কিছু কিছু ইশারা-ইঙ্গিত দিয়ে দেয়া, যা বিন্যাসানুসন্ধানে সহায়ক হতে পারে। আমাদের ধারণা মতে বিন্যাসের অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনটি কারণে সর্বাধিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। সেগুলো সম্পর্কেই কিছু উপকারী ইঙ্গিত দিয়ে দেয়া প্রয়োজন। সেগুলো যদি বাস্তবায়িত করা যায়, তা হলে অনেক জটিলতারই সমাধান হয়ে যাবে।
সর্বপ্রথম যে বিষয়টির দরুন মানুষ কোরআনের বিন্যাসের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠতে পারে না, তা হল, প্রাচীন আরবী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যসমূহের সাথে পরিচয়হীনতা। আরবী ভাষায় বিশ্লেষণ ও সংক্ষেপায়ন এবং-দীর্ঘায়ন ও হ্রস্বায়নের যে রীতি রয়েছে এবং যেগুলোকে আরব বাগ্মী ও বাকশিল্পীরা অত্যন্ত স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতেন, আমরা নিজেদের ভাষায় সাধারণত সে বিষয়গুলোর সাথে যথার্থভাবে পরিচিত নই। সেজন্যে কোরআনে যখন সেগুলোর সম্মুখীন হতে হয়, তখন তা আমাদের আয়ত্তে আসে না। উন্নত মানের আরবী সাহিত্যের সাথে যাদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তাঁরা জানেন, আরবী ভাষায় কিভাবে একটা বিশেষ বিন্দু থেকে কথা আরম্ভ হয় এবং কথার পিঠে কথা তৈরী হতে থাকে। এমনকি একটা বিশেষ সীমারেখায় পৌঁছে গিয়ে তা আবার সেই কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসে। একদিকে এই বিস্তৃতি অপর দিকে তারই মধ্যে সংক্ষেপায়ন ও হ্রস্বায়নের বিচিত্র কলাকৌশল থাকে বিদ্যমান, যার সাথে একমাত্র আরবী সাহিত্য বিশারদরাই পরিচিত হতে পারেন। অন্যদের পক্ষে এসব বিষয় বুঝা কঠিন। একটা দাবী উত্থাপিত হয় আর তারই সঙ্গে সঙ্গে আলোচিত হয় তার দলিল-যুক্তি। কিন্তু পরিষ্কার করে দেয়া হয় না যে, এটাই তার প্রমাণ। বরং এ বিষয়টি শুধু বর্ণনা প্রেক্ষিতের ভরসার ওপরই ছেড়ে দেয়া হয়। তেমনিভাবে একটা উত্তর দেয়া হবে, কিন্তু এ কথা পরিষ্কার করে বলা হবে না যে, এটা অমুক প্রশ্নের উত্তর কিংবা অমুক সন্দেহের জওয়াব। এ বিষয়টিকেও বর্ণনার আনুপূর্বিক সম্পর্ক কিংবা শ্রোতার মেধার ভরসার ভিত্তিতেই বর্জন করা হবে। কখনও কোন বিশেষ প্রাসঙ্গিক বর্ণনার ভেতরে দৃষ্টি আকর্ষণ হিসেবে কিংবা অপ্রাসঙ্গিকভাবে একটি বাক্য চলে আসবে এবং তা কোন কোন সময় এতই সুদীর্ঘ হবে যে, শ্রোতা যদি অন্যমনস্ক হন, তা হলে হয়ত মূল প্রসঙ্গই হারিয়ে ফেলবেন। একটি কাহিনী কিংবা উপাখ্যান বলা হবে এবং তার ভেতরকার সমস্ত অংশই বাদ দিয়ে দেয়া হবে, সেগুলো একজন বিচক্ষণ শ্রোতার পক্ষে নিজেই জুড়ে নেয়া উচিত। অনেক সময় কিছু বিশেষ পরিণতি সামনে রেখে একটি কথা বলে দেয়া হবে, কিন্তু এ কথা বলা হবে না যে, কথাটি কোন্ বিষয়ের প্রেক্ষিতে এখানে বলা হল।
এ ধরনের অসংখ্য দিক রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে কোন লোক ততক্ষণ পর্যন্ত যথার্থভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠতে পারে না যতক্ষণ না প্রাচীন আরবী সাহিত্য এবং জাহেলিয়াত আমলের বাগ্মী-বক্তাদের রচনা বা বক্তব্যের সাথে ভালভাবে পরিচিত হবেন। আর কোরআন যেহেতু উন্নততর আরবী সাহিত্যের যাবতীয় পবিত্র বৈশিষ্ট্যসমূহে মন্ডিত, সেহেতু এসকল বিষয়ের অজ্ঞতা কোরআনের বিন্যাস উপলব্ধির পথে বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
দ্বিতীয়ত যে কারণে কোরআনের বিন্যাস বুঝতে গিয়ে অত্যন্ত কষ্ট পোহাতে হয়, তা হল সাধারণত মানুষ এ বিষয়টি নির্দিষ্ট করতে পারেনি যে, কোরআন মজীদ কোন্ শ্রেণীর কালাম বা রচনা? এটা কি সে ধরনেরই কোন রচনা যে ধরনের হয়ে থাকে শাস্ত্রীয় রচনাসমূহ। কিংবা এটা কি কবিদের রচনার মত? অথবা গণকদের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন বিষয়? এর ধরনটা কি বক্তাদের বক্তৃতার মত? আরবের কাফেররা একে কবি এবং গণকদের বাকরীতির সাথে তুলনা করত। আর ইদানীংকার লোকেরা সাধারণত এতে একটি শাস্ত্রীয় রচনাশৈলীর সন্ধান করে। অথচ এতদুভয়ের একটিও যথার্থ নয়। কোরআন মজীদ যদি উল্লিখিত কোন এক শ্রেণীর রচনার সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে তা হলে সেটি হচ্ছে তৎকালীন আরব বাগ্নীদের কালাম। কিন্তু এ শ্রেণীর সাথেও তার সম্পর্ক একান্ত আপেক্ষিক। এ কথা বলা কিন্তু ঠিক হবে না যে, সম্পূর্ণতই এটা বাগ্মীদের বক্তব্যের বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।
একে বাগ্মীদের বক্তৃতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলতে গিয়ে আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে কোরআনের প্রতিটি সূরা তার পরিবেশের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কাজেই এ বিষয় বুঝার জন্য সবচাইতে প্রয়োজনীয় কথা হল, প্রথমে সে পরিবেশকে বুঝতে চেষ্টা করা যে পরিবেশের তাগিদে বা যে পারিপার্শ্বিকতার প্রেরণায় তার অবতরণ ঘটেছিল। সে পরিবেশ বুঝার লক্ষ্যে কখনও কোরআন বহির্ভূত কোন কিছুর অপেক্ষা রাখে না। এ পরিবেশ স্বয়ং কোরআনের আলোকেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তবে এটা সাব্যস্ত করার প্রয়োজন আছে যে, সে তাগিদ বা প্রেরণাগুলো কি; যা এই কালামের দাবী রাখতে পেরেছে? এই তাগিদগুলো যখন নির্ধারিত হয়ে যায়, তখন সে সূরার বিন্যাসও সুস্পষ্টভাবে সামনে এসে হাযির হয় এবং কালাম তার পরিবেশের সাথে এমন সুন্দরভাবে খাপ খেয়ে যায় যে, তখন যেকোন লোক স্বতস্ফূর্তভাবে চিৎকার করে ওঠে- এই জামাটি সেই শরীরের জন্যই তৈরী হয়েছিল
অনেকে এই তাগিদ বা প্রেরণাগুলো নির্ধারণ করতে গিয়ে শানে নুযূল সংক্রান্ত সেসব রেওয়ায়েতের শরণাপন্ন হন যা তফসীরের কিতাবসমূহে উদ্ধৃত রয়েছে। কিন্তু এ রীতিটি একান্তই ভুল। শানে নুযূল সংক্রান্ত রেওয়ায়েতগুলো কোরআনের বিন্যস্ততা বিনষ্ট করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী কারিকার অধিকারী এবং এগুলোর বেশীর ভাগই ভিত্তিহীন। কাজেই এ ব্যাপারে কোরআনের ইশারা-ইঙ্গিতের আলোকেই আসল পটভূমিকা বুঝে নিতে চেষ্টা করা হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম ও সঠিক পন্থা। কালাম কাদেরকে সম্বোধন করছে? এবং যাদেরকে সম্বোধন করছে তাদের মধ্যে কাদেরকে প্রত্যক্ষভাবে করছে আর কাদেরকে পরোক্ষভাবে? সে কোন জটিলতা সম্বোধিত ব্যক্তি যার সম্মুখীন এবং সে জটিলতার দরুন কি কি প্রশ্ন তুলেছে, যার উত্তরের জন্য শত্রু-মিত্র সবাই অপেক্ষা করে আছে? তা ছাড়া শত্রুদের বিরোধিতা কোন্ পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হয়েছে আর মিত্রতা রয়েছে কোন্ পর্যায়ে? বিরোধীদের দলে কোন্ কোন্ দল কি কি অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এসে যোগ দিয়েছে? এবং স্বপক্ষীয় দলগুলো কোন্ দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা করছে? এ বিষয়গুলো যখন জানা হয়ে যাবে, তখন কালামের সমস্ত বিন্যাস আপনা থেকেই সামনে এসে উপস্থিত হবে। এসব বিষয়ই কালামের ব্যাকরণের ভেতর থেকে কথা বলে। কাজেই পরিশ্রম করে যদি সেগুলো নির্দিষ্ট করে নেয়া যায় তখন কোরআনের একটি সূরা পাঠ করে মনের মধ্যে এমন অবস্থারই সৃষ্টি হয় যা একজন অতি উত্তম বক্তার অতি উত্তম বক্তৃতা শুনেও সৃষ্টি হয় না।
এ প্রসঙ্গের তৃতীয় জটিলতাটি হচ্ছে সম্বোধনের জটিলতা। কোরআন মজীদের ওপর যারা গভীরভাবে চিন্তা করেন, তারা যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশী জটিলতার সম্মুখীন হন, তা হল কোরআনে খানিক পরে পরে বরং কোন সময় একই আয়াতের মাঝে সম্বোধনের পরিবর্তন হতে থাকে, এ মাত্র মুসলিমদেরকে সম্বোধন করা হচ্ছিল, এখনই মুশরিকদের করা হচ্ছে। এখনই আলোচনা চলছিল আহলে কিতাবদের (যারা কোন আসমানী কিতাবের অনুসারী তাদেরকেই আহলে কিতাব বলা হয়।) হঠাৎ মুসলমানদেরকে লক্ষ্য করে বলা হচ্ছে। এখনই একবচনের পদ ব্যবহৃত হচ্ছিল- অমনি বহুরচনে চলে এল। এমনিভাবে সম্বোধনের পটও পরিবর্তিত হতে থাকে। এখনই সম্বোধন করা হচ্ছিল সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে, হঠাৎ তা পরিবর্তিত হয়ে রসূলুল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে গেল।
এখনই রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর মুখ দিয়ে কোন বিষয় আলোচিত হচ্ছিল, সহসা হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর মুখ থেকে নিঃসৃত হতে লাগল। যাদের সম্বোধন করা হচ্ছে এবং যে সম্বোধন করেছেন তাদের এই পরিবর্তিত হতে থাকা একজন নবাগতকে অত্যন্ত হতবুদ্ধি করে দেয়। তা ছাড়া এহেন দ্রুত রিবর্তনের মুখে বিন্যাসধারা বজায় রাখা খুবই কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
কোরআন মজীদ অনেকাংশে আৱৰ বাগ্মীদের বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেভাবে একজন বক্তা শুধু নিজের দিক পরিবর্তন এবং চোখের ঘূর্ণন ও ভ্রুর সংকোচনের দ্বারা, বরং কোন কোন সময় কথার ধারা পরিবর্তন এবং সাধারণ চাহনিতে নিজের সম্বোধনের ধারা বক্তৃতার ভেতরেই পরিবর্তন করতে থাকেন, তেমনিভাবে কোরআন মজীদেও সম্বোধানের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। আর যদি পাঠক কালামের পটভূমির প্রতি লক্ষ্য রাখতে পারে তা হলে সম্বোধনের বিবর্তনের কারণে কোন ঝামেলা-জটিলতারই সম্মুখীন হতে হয় না বরং তখন তিনি কালামের গতিধারার সাথে সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে থাকেন। কিন্তু এর কোন কোন দিক রয়েছে, যা সহজে সবার আয়ত্তে আসে না। তা ছাড়া সেগুলো আয়ত্ত করার জন্যে প্রচুর অনুশীলন ছাড়া আয়ত্তে আসতেও পারে না।
এখানে আমরা মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী (রঃ)-এর তফসীর নিযামুল কোরআনের ভূমিকা থেকে এবং সম্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ বিষয়ক পরিচ্ছেদ থেকে প্রয়োজনীয় সার-সংক্ষেপ উদ্ধৃত করে দিচ্ছি, যাতে এই জটিলতার সমাধানে অনেকটা সাহায্য লাভ হতে পারে। পঞ্চদশ অধ্যায়ে মাওলানা বলেনঃ
মুসলমানমাত্রই এ বিষয়ে একমত যে, সমগ্র কোরআন আল্লাহ্ তাআলার কালাম। অর্থাৎ, একে আল্লাহ্ রসূলে করীম (সঃ)-এর ওপর নাযিল করেছেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সমগ্র কোরআনের সমস্ত সম্বোধনই আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকেই হয়েছে। যেমন,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
আমরা তোমারই বন্দেগী করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। আয়াতে পরিষ্কারভাবেই সম্বোধনটি রয়েছে বান্দাদের পক্ষ থেকে। আলেমগণ এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ্ তাআলা এ সূরাটি বান্দাদেরকে শিখিয়েছেন যে, এভাবে বল। কিন্তু এখানে 'বল' কথাটি উহ্য। কাজেই (তাদের) সে বিশ্লেষণকে কেমন করে স্বীকার করা যায়? এমনি প্রশ্ন সৃষ্টি হয় সম্বোধনের লক্ষ্যের ব্যাপারেও। অর্থাৎ, সম্বোধন কাকে করা হচ্ছে? প্রত্যেক সম্বোধনেরই দুটি দিক হতে পারে। প্রথমত এই যে, সম্বোধনটি কোন্ দিক থেকে হয়েছে। দ্বিতীয়ত সম্বোধনটি কার প্রতি? আর এতদুভয়টি কখনও হয় সাধারণ কিন্তু উদ্দেশ্য থাকে নির্দিষ্ট। আবার কখনও হয় নির্দিষ্ট কিন্তু উদ্দেশ্য থাকে সাধারণ। আর যেহেতু এই পরিবর্তন এবং নির্দিষ্টতা ও অনির্দিষ্টতার দরুন অর্থের দিক দিয়ে বিরাট গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে যায়, সেজন্যে এগুলোর নির্ধারণকল্পে এমন মূলনীতি অনুসন্ধান করা আবশ্যক যা যেকোন জটিলতায় পথ প্রদর্শন করতে পারে।
সম্বোধনে একটি থাকে উৎস আর একটি থাকে অন্ত। উৎস আল্লাহ্ তাআলা হবেন অথবা জিবরাঈল (আঃ) কিংবা রসূল (সঃ) বা মানুষ। তেমনিভাবে অন্তও হয় হবেন আল্লাহ্ তাআলা, না হয় রসূলে করীম (সঃ) অথবা মানুষ। মানুষের মধ্যে মুসলমান হবেন অথবা মুনাফেক। আহলে কিতাব হবে অথবা হযরত ইসরাঈলের বংশধর কিংবা এদের মধ্য থেকে দুটি, তিনটি অথবা সব ক'টি। আহলে কিতাবের মধ্যে হয় হবে ইহুদী, না হয় হবে নাসারা (খ্রীস্টান) অথবা উভয়টি। এটা তো গেল প্রকাশ্য দিক। এখন এ সমুদয়ের সংমিশ্রণের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, উৎসতে আল্লাহ্, রসূল এবং জিবরাঈলের মধ্যে সংমিশ্রণ ঘটে। এক্ষেত্রে যদি কেউ পরিপূর্ণ নিবিষ্টতা ছাড়া কোরআন পাঠ করতে থাকে, তা হলে তার পক্ষে এই পার্থক্য করাই কঠিন হয়ে পড়বে যে, আসলে বক্তা কে? নবী করীম (সঃ) এবং হযরত জিবরাঈল হলেন আল্লাহর রসূল বা দূত। তাঁরা কখনও প্রেরকের বক্তব্য উদ্ধৃত করেন আবার কখনও সে বক্তব্যটি নিজেই সম্পাদন করে দেন, যা আল্লাহ্ তাআলা তাদের মুখে প্রকাশ করিয়েছেন। হযরত জিবরাঈলও আল্লাহ্ই দূত। তিনি কখনও নবী করীম (সঃ)-এর সাথে শুধুমাত্র আল্লাহর বাণীর প্রচারক হিসেবে কথা বলেন, আবার কখনও তাঁর শিক্ষক হিসেবে।
কোরআন মজীদে এ সমস্ত দিক বা অবস্থাগুলোই একটা অপরটার সাথে মিলেমিশে কোন রকম সতর্কতা ব্যতিরেকেই প্রকাশ পেতে থাকে। ফলে এগুলো নির্দিষ্ট করা বড় কঠিন হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে বক্তব্যের যোগসূত্র ছাড়া এ ব্যাপারে পথ প্রদর্শন করার মত অন্য কোন সূত্রই নেই। তা ছাড়া এ বিষয়টি বিশেষভাবে কোরআন মজীদের বেলায়ই নয়, বরং এটা আসমানী গ্রন্থসমূহের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য বলে মনে হয়।
এ ব্যাপারে সাধারণ নিয়ম হল যে, কালাম বা বক্তব্য যখন প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে হবে, তখন তাতে মহত্ত্ব, আতঙ্ক, শক্তি ও আড়ম্বরের প্রকাশ থাকবে। সেজন্যে এ ধরনের বক্তব্য বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রকাশ পায়। বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝে নেয়া প্রয়োজন। সূরা 'ইকরা'-র শুরু হয় হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর মুখ থেকে। কিন্তু যখন কাফেরদের প্রতি ক্রোধ প্রকাশের ক্ষেত্র উপস্থিত হয়, তখন সরাসরিভাবে আল্লাহ্ পক্ষ থেকে হয়ে যায়। বলা হয়:
كَلَّا لَئِنْ لَّمْ يَنْتَهِ لَنَسْفَعًا بِالنَّاصِيَةِ.
কিছুই নয়, যদি ফিরে না আসে, তা হলে আমি তাকে জুটি ধরে হেঁচড়ে নেই।
অন্তের বেলায় সংমিশ্রণ ঘটে নবী করীম (সঃ) এবং মুমিনদের মধ্যে। কোন কোন সময় বাহ্যত মনে হয় সম্বোধন হুযূরের প্রতি হচ্ছে, অথচ বক্তব্যের লক্ষ্য থাকে উম্মতের দিকে। পয়গম্বর আলাইহিস সালাম যেহেতু উম্মতের প্রতিনিধি বা অভিভাবক হিসেবে তাদের মুখ এবং তাদের কান হওয়ারও মর্যাদা রাখেন, তাই সম্বোধন তাঁকেই করা হয়। তওরাতেও এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে যে, বাহ্যত একবচনের মাধ্যমে হযরত মূসার প্রতি সম্বোধন করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে লক্ষ্য হচ্ছে উম্মত। কোরআন মজীদে এ ধরনের যেসব ক্ষেত্র রয়েছে সেখানে বিন্যাস ও বক্তৃতব্যের ধারাবাহিকতার পথনির্দেশন অনুযায়ী-ই বুঝা যায় প্রকৃতপক্ষে সম্বোধনের লক্ষ্য কে। সূরা তওবাতে একটি আয়াত রয়েছে-
إِنْ تُصِبْكَ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِنْ تُصِبْكَ مُصِيبَةٌ يَقُولُوا قَدْ أَخَذْنَا أَمْرَنَا مِنْ قَبْلُ .
যদি কোন সফলতা লাভ হয়, তখন তাদের কষ্ট হয়। আর যদি কোন বিপদ উপস্থিত হয়, তখন বলে, বেশ হয়েছে; আমরা আগেই আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করে নিয়েছি।
এখানে সম্বোধনটি একবচনের কিন্তু এর উদ্দেশ্য সাধারণ মুসলমান। সুতরাং তার উত্তরেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে। বলছেন:
لَنْ تُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا هُوَ مُوْلَانَا وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنِينَ .
বলে দাও, আমাদের প্রতি কোন বিপদই আসবে না কিন্তু যা আল্লাহ্ আমাদের জন্যে লেখে দিয়েছেন তাই আসবে। তিনি আমাদের মালিক, আর যারা ঈমানদার আল্লাহ্ ওপর ভরসা করাই তাদের কর্তব্য।
তেমনিভাবে সূরা বনী ইসরাইলে দৃশ্যত সম্বোধন করা হয়েছে নবী করীম (সঃ)-কে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সম্বোধনের লক্ষ্য গোটা উম্মত। বলা হয়েছে:
إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرُ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرُهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا .
যদি তোমাদের সামনে তাদের মধ্য থেকে (পিতা-মাতার মধ্য থেকে) একজন কিংবা উভয়েই বৃদ্ধাবস্থায় গিয়ে পৌঁছে, তা হলে তাদেরকে 'না উহ্ বলবে আর না ধমক দেবে; তাদের সাথে আদরের সহিত কথা বলবে।
এমনি ধরনের বহু উদাহরণ রয়েছে যা প্রকাশ্যে অসাধারণ বা বিশেষ হলেও উদ্দেশ্য তার সাধারণ।
তৃতীয় চূড়ান্ত মূলনীতিটি হচ্ছে কোরআনের তফসীর বা ব্যাখ্যা কোরআনের দ্বারাই করা। কোরআন মজীদ کتابا متشابها শব্দে নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছে। যার অর্থ হল, এর এক অংশ অপর অংশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোরআন মজীদে একই বিষয় কোথাও সংক্ষিপ্তভাবে, কোথাও বিস্তারিতভাবে, কোথাও শুধু দাবীর আকারে আসে আবার কোথাও দলিল-প্রমাণসহ। কোথাও কোন বিশেষ বিষয়ের সাথে আবার কোথাও অন্য কিছুর সাথে। একই বিষয়ের এত বৈচিত্র্যের সাথে উপস্থাপিত হওয়ার সবচাইতে বড় ফায়দা এই যে, একটি বিষয় এক জায়গায় বুঝা না গেলে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় জায়গাটিতে বুঝে এসে যায়। এক জায়গায় যদি তার কোন একটি বিশেষ দিক স্পষ্ট না হয়, তা হলে অন্য জায়গায়, অন্য ধারায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ কারণেই কোরআনের তফসীরের সবচাইতে নির্ভরযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য উৎস হচ্ছে স্বয়ং কোরআন। কেউ যদি কোরআন জটিলতাসমূহের মীমাংসা স্বয়ং কোরআনেরই মাধ্যমে করতে চেষ্টা করেন, তা হলে কোন একটি জায়গায় যদি কোন বিষয়ের বিন্যাস স্পষ্ট না হয়, তবে অন্যত্র তা স্পষ্ট হয়ে যায়। এক জায়গায় যদি কোন বিষয়ের দলিল পাওয়া না যায়, তবে অন্যত্র তা পাওয়া যায়। এমনকি অনেক সময় তার বর্ণনাভঙ্গি এবং পরিভাষাগত জটিলতাগুলোও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বারবার সামনে আসার ফলে স্পষ্ট হয়ে যায়। আর যেহেতু কোরআন মজীদের প্রত্যেকটি অংশই সমানভাবে অকাট্য ও চূড়ান্ত, কাজেই এর এক অংশের ব্যাখ্যা অপর অংশের দ্বারা করা হলে তা হয় চূড়ান্তের তফসীর চূড়ান্তের মাধ্যমে। অতএব তখন যে যত বড় বিরোধী বা অস্বীকারকারীই হোক না কেন, কোন রকম কথা বলার অবকাশ কারোই থাকে না।
তফসীরের চতুর্থ অকাট্য ও চূড়ান্ত উৎসটি হচ্ছে প্রসিদ্ধ ও আনুক্রমিক সুন্নাহ। কোরআনের পরিভাষা যেমন, সালাত, যাকাত, ওমরা, হজ্জ, কোরবানী, মসজিদে হারাম, সাফা-মারওয়া, সাঈ, তওয়াফ প্রভৃতির তফসীর আনুক্রমিক সুন্নাহর মাধ্যমেই করা কর্তব্য। কারণ, কোরআন মজীদ এবং শরীয়তের পরিভাষার অর্থ বর্ণনা করার অধিকার হুযুরে আকরাম (সঃ) ব্যতীত অন্য কারো নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একথা চূড়ান্তভাবে জানা থাকতে হবে যে, হুযূরে আকরাম (সঃ) এসৰ পরিভাষার ব্যাখ্যা কিভাবে করেছেন। বস্তুত এ বিষয়ের জামানত হচ্ছে এ সমুদয় পরিভাষার প্রকৃত মর্ম সম্পূর্ণ কার্যকররূপে সুন্নতে মুতাওয়াতেরাহ বা আনুক্রমিক হাদীসের মধ্যে সংরক্ষিত করে দেয়া হয়েছে। আর সুন্নতে মুতাওয়াতেরাহ ঠিক সে সমস্ত মাধ্যমগুলোতে প্রমাণিত, যেসব মাধ্যমে স্বয়ং কোরআন মজীদও প্রমাণিত হয়েছে। উম্মতের যে অনুচ্ছেদ বা আনুক্রমিক বর্ণনা ধারা কোরআনকে আমাদের কাছ পর্যন্ত পৌছেছে সে বর্ণনাধারাই ধর্মের যাবতীয় পরিভাষার কার্যকর মর্মসমূহকেও আমাদের কাছ পর্যন্ত পৌছেছে। সুতরাং কোরআন মজীদকে স্বীকার করা যদি আমাদের ওপর ওয়াজিব হয়, তা হলে পরিভাষাসমূহের সেই রূপকে স্বীকার করাও ওয়াজিব, যা পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে বর্ণিত হয়ে পরবর্তীদের কাছ পর্যন্ত এসেছে। এগুলোর রূপে যদি আংশিক কোন মতবিরোধ থেকেও থাকে, তার কোন ধর্মীয় গুরুত্ব নেই। পাঁচ ওয়াক্তের নামায সবাই জানেন এবং মানেন। রইল এটুকু যে, 'আমীন' জোরে বলতে হবে কি আস্তে। তাতে মতবিরোধ হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের মতবিরোধের কোন গুরুত্ব আমাদের ধর্মে নেই। অবশ্য যে বিষয়গুলো একক বর্ণনাধারায় বর্ণিত হয়ে এসেছে, সেগুলোতে যার মন যে দিকটি গ্রহণ করে সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে, তাই গ্রহণ করে নিতে পারেন। পারস্পরিক বিরোধিতা কিংবা একে অন্যকে খন্ডনের পেছনে পড়তে নেই। কিন্তু যে বিষয়গুলো সুন্নতে মুতাওয়াতেরাহ দ্বারা সপ্রমাণিত ও জ্ঞাত, সেগুলোর বিরোধিতা করা স্বয়ং কোরআনেরই বিরোধিতার শামিল। আর কোরআনের বিরোধিতা যারা করবে আমাদের ধর্মে তাদের জন্যে কোন স্থান নেই।
হাদীসের প্রতি যারা আস্থাহীন-রোযা-নামায, হজ্জ-যাকাত এবং ওমরা ও কোরবানীর মর্ম নিজের মনমত তৈরী করে বর্ণনা করেন; আর গোটা উম্মতের ধারাবাহিক বর্ণনা এসব বিষয়ের যে স্বরূপ সংরক্ষিত করেছে তাতে নিজেদের ব্যাপক কামনা-বাসনা অনুযায়ী সংশোধন ও পরিবর্তন-পরিবর্ধন সাধনে প্রয়াসী হন, তাদের এহেন দুঃসাহস পরিষ্কারভাবে কোরআনকেই অস্বীকার করার নামান্তর। তার কারণ, যে ধারাবাহিকতা বা আনুক্রমিক বর্ণনাধারা কোরআনকে আমাদের কাছ পর্যন্ত পৌছেছে, পরিভাষাসমূহের কার্যকর প্রয়োগে বা রূপকেও সে ধারাবাহিকতাই আমাদের কাছ পর্যন্ত পৌছেছে। কাজেই তারা যদি এগুলো স্বীকার না করেন, তা হলে কোরআনকে স্বীকার করার কোন কারণই অবশিষ্ট থাকে না। এ শ্রেণীর মূর্খজনেরা কোরআনী পরিভাষাসমূহের চূড়ান্ত ও অকাট্য মর্মসমূহকে বদলে দেয়ার যে দুঃসাহস করেছে তার কিছুটা অনুমান সেসব আলোচনার দ্বারা হয়ত হয়ে থাকবে, যা মাঝে-মধ্যেই কোরবানী সম্পর্কে এক শ্রেণীর (জ্ঞানান্ধ) লোকের পক্ষ থেকে পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়ে থাকে। বস্তুত এখন তো তারা দুনিয়া এবং আখেরাত প্রভৃতির মত সর্বজনবিদিত ও প্রসিদ্ধ বিষয়ের মর্মও নিজেদের উদ্দেশ্য ও বাসনা অনুযায়ী গড়ে নিয়েছেন। তাদের মতে, দুনিয়া অর্থ উপস্থিত বা বর্তমান, আর আখেরাত অর্থ ভবিষ্যত। আর কোরআনে নিজের কল্যাণের জন্য ব্যয় করার যে নির্দেশ রয়েছে তার অর্থ এই করা হয় যে, সব কিছুই নিজের বর্তমান প্রয়োজনেই ব্যয় করে ফেলো না, বরং ভবিষ্যতের প্রয়োজনের জন্য কিছু ব্যাঙ্কেও জমা করে রাখ।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী (রঃ) তাঁর তফসীর নিযামুল কোরআনে উল্লেখ করেন:
"এমনিভাবে যাবতীয় শরীয়তী পরিভাষাসমূহ যেমন, নামায, যাকাত, জিহাদ, রোযা, হজ্জ, মসজিদে হারাম, সাফা-মারওয়া এবং হজ্জের মানাসিক প্রভৃতি এবং সেগুলোর সাথে যেসব ক্রিয়াকলাপ সম্পৃক্ত রয়েছে তা সবই ধারাবাহিকতা ও আনুক্রমিকভাবে পূর্ববর্তীদের থেকে পরবর্তীদের পর্যন্ত সুরক্ষিত রয়েছে। এতে সাধারণ আংশিক যে মতানৈক্য রয়েছে তা লক্ষণীয়ই নয়। বিভিন্ন দেশের বাঘের আকার-অবয়বে কিছু না কিছু পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বাঘের অর্থ সবাই জানেন। এমনিভাবে যে নামায উদ্দিষ্ট তা সে নামাযই যা মুসলমানরা পড়েন। যতই না কেন তার রূপে কোন কোন আংশিক বিরোধ থাক। যারা এধরনের সাধারণ বিষয়ে খোঁজাখুঁজি করে, তারা এই দ্বীনে কাইয়্যম বা সুদৃঢ় ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কেই সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞ, যার শিক্ষা কোরআন মজীদ দিয়েছে।
সুতরাং যখনই এ ধরনের পারিভাষিক শব্দের বিষয় উপস্থিত হবে, যার পূর্ণ সীমারেখা এবং চিত্ররূপ কোরআন মজীদে বর্ণিত হয়নি, তখন সঠিক পন্থা হবে, তার যতটা অংশের ব্যাপারে সমগ্র উম্মতের ঐকমত্য রয়েছে ততটাই গ্রহণ করে নিতে হবে। একক বর্ণনার হাদীসসমূহের প্রেক্ষিতে কোন রকম গোঁড়ামি অবলম্বন করা ঠিক নয়। কারণ, তার ফলে নিজেকেও সংশয়ের সম্মুখীন হতে হবে, আর অন্যের কার্যকলাপও ভুল বুঝতে বাধ্য করবে; অথচ এর মীমাংসার জন্যে এমন কোন বিষয় থাকবে না যার মাধ্যমে কোন সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।
📄 তফসীরের অনুমান ভিত্তিক উৎস
এখানে তফসীরের অনুমানভিত্তিক কতিপয় উৎস সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলব। অনুমানভিত্তিক বলতে আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে সেসব উৎস, যার ওপর সর্বাবস্থায় পুরোপুরি নির্ভর করা যায় না; বরং সেগুলোর ভেতরে যেহেতু অনুমান ও সন্দেহ-সংশয়ের সংস্পর্শ রয়েছে, সেজন্যে কোরআনের তফসীরের বেলায় সেগুলোকে ততটুকুই গুরুত্ব দেয়া বাঞ্ছনীয় যতটুকু কোরআনের সাথে আনুকূল্য বিধান করবে। তার কোন বিষয় যদি কোরআনের বিরুদ্ধে যায়, তা হলে সেক্ষেত্রে সেগুলো বর্জিত হবে এবং কোরআনের কথাই হবে চূড়ান্ত।
১. কোরআন তফসীরের অনুমানভিত্তিক উৎসগুলোর মধ্যে সর্বাধিক ও পবিত্র উৎসটি হল বিভিন্ন দুর্বল বর্ণনার মাধ্যমে প্রাপ্ত হাদীসে রসূল এবং সাহাবায়ে কেরামের বাণী। এগুলোর বিশুদ্ধতা ও যথার্থতার ব্যাপারে যদি পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিত হওয়া যেত, তা হলে তফসীরের ক্ষেত্রে এগুলোর মর্যাদাও ঠিক ততটাই হতে পারত যতটা সুন্নতে মুতাওয়াতেরাহর রয়েছে। কিন্তু যেহেতু এগুলোর সঠিকতার ব্যাপারে পূর্ণ ভরসা করা যায় না, সেহেতু তফসীর করতে গিয়ে এগুলোর মধ্য থেকে ততটুকুই গ্রহণ করা যাবে যতটুকু সে সমস্ত চূড়ান্ত ও অকাট্য মূলনীতিসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। সাধারণভাবে বর্ণিত হাদীস ও সাহাবায়ে কেরামের 'আসার'কে গুরুত্ব দিতে গিয়ে যারা কোরআনের ওপরে নিয়ে দাঁড় করায়, তারা প্রকৃতপক্ষে কোরআনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ তাতে হাদীসের মর্যাদাও বৃদ্ধি পায় না। পক্ষান্তরে যারা আদপেই হাদীসকে অস্বীকার করে বসেন তারা সে আলো থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়ে পড়েন, যা কোরআন মজীদের বহু সংক্ষিপ্ত বিষয়ের বিশ্লেষণে সর্বাধিক সহায়ক হতে পারত। এ ব্যাপারে মধ্যম পন্থা হচ্ছে, কোরআন মজীদের সংক্ষিপ্ততার বিশ্লেষণে যেসমস্ত বিশুদ্ধ ও যথার্থ হাদীস সহায়ক হতে পারে, সেগুলোর সাহায্য গ্রহণ করা এবং সেগুলোর মোকাবিলায় অন্য কোন বিষয়কে স্থান না দেয়া। আর হাদীস যদি সুস্পষ্টভাবেই কোরআনের শব্দাবলীর এবং তার বিষয়বস্তুর বিন্যাসধারার বিরোধী হয়, তবে সেসব ক্ষেত্রে বিরত থাকতে হবে। সেসব অবস্থাতে হাদীসকে বর্জন করাই কর্তব্য, যাতে দেখা যাবে, কোরআনের শব্দের সাথে কোনক্রমেই তার সমন্বয় হতে পারছে না। অথবা ঐ হাদীসটি মানতে গেলে দ্বীনের এমন কোন মূলনীতির প্রতি আঘাত আসে, যা মান্য করা অপরিহার্য। সহীহ্ বা বিশুদ্ধ হাদীস বলতে যা বুঝায় এমন খুব কমই দেখা যায়, কোরআনের সাথে যার সামঞ্জস্য হতে পারে না। যাই হোক, এমন সব ক্ষেত্রে কোরআনকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোন অবস্থাতেই তার এ অগ্রাধিকারকে উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু এমন ক্ষেত্র খুব বেশী নেই।
শানে নুযূল সম্পর্কে যেসব রেওয়ায়েত রয়েছে, সেগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর ব্যাপারে এই মূলনীতিগত বাস্তবতার প্রতিও লক্ষ্য রাখা কর্তব্য যে, আমাদের প্রাচীন ওলামা-মনীষীবৃন্দ কোন আয়াতের শানে নুযুলের ব্যাপারে যে নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করেন তাতে তাঁদের উদ্দেশ্য এমন থাকে না যে, হুবহু এ ঘটনাটিই এ আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ। বরং তাতে সাধারণত তাঁদের উদ্দেশ্য থাকে যে, এ ধরনের ঘটনার ব্যাপারে যে কি নির্দেশ তা এ আয়াতে রয়েছে। এই বিষয়টির বিশ্লেষণ আমাদের তফসীরের বিশিষ্ট আলেমগণ করেছেন। তাতে শানে নুযূল সম্পর্কিত বেশীর ভাগ জটিলতারই সমাধান হয়ে যায়। শানে নুযূলের প্রতি শুধু সে সকল ক্ষেত্রেই গুরুত্ব দেয়া উচিত যেখানে কোরআন কোন নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে থাকবে। যেমন, সূরা তাহরীম কিংবা আহযাবে কোরআন কোন কোন ঘটনার প্রতি সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত করেছে। এ ধরনের ঘটনার সবিস্তার বিবরণ হাদীস থেকে জেনে নেয়া বাঞ্ছনীয়, যা কোরআনের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর সে বিষয়গুলো উপেক্ষা করা উচিত, যা স্বীকার করতে কোরআন বাধা দেয় অথবা তা মেনে নিলে এমন সব ব্যক্তির জীবনে কোন কথা আসে যাদের জীবনের সম্পূর্ণ পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতা সম্পর্কে স্বয়ং কোরআন সাক্ষ্য দিয়েছে।
২. এমনিভাবে বিভিন্ন জাতির প্রমাণিত ইতিহাস দ্বারাও কোরআনের তফসীরে সাহায্য নেয়া বাঞ্ছনীয়। কোরআন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে জাতিসমূহের ইতিহাসের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। কোথাও আরবের প্রাচীন জাতি আদ, সামুদ, মাদইয়ান ও কওমে লূত প্রভৃতির ধ্বংসের আলোচনা করেছে, কোথাও হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর মক্কায় আগমন, সেখানে বসতি স্থাপন ও খানায়ে কাবার নির্মাণের ঘটনাবলীর প্রতি আরববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আবার কোথাও ইহুদী-নাসারাদের ইতিহাসের উল্লেখয্যেগ্য ঘটনাবলীর প্রতি ইশারা করেছে। কোথাও কোথাও কোরআনের অবতরণকালীন কোন কোন জাতি এবং তাদের বিশেষ বিশেষ অবস্থার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এমনিভাবে অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনা বা বিষয় রয়েছে, যা কোন না কোনভাবে কোরআনে আলোচিত হয়েছে। এই সমুদয় ইঙ্গিত-ইশারা স্পষ্ট করে বুঝতে হলে সেসব জাতির ইতিহাস এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে মোটামুটিভাবে ওয়াকিফহাল হওয়া আবশ্যক। তা না হলে সেসব উদ্দেশ্য সঠিকভাবে উপলব্ধি করা যায় না, যে জন্যে কোরআন মজীদ এসব ঘটনা বর্ণনা করেছে।
কোরআন মজীদের কোন কোন বিষয়ের বিশ্লেষণকল্পে আমাদের সেসব ঐতিহাসিক বিষয়ের জ্ঞান লাভ করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার প্রমাণিত অংশ খুবই অল্প। কাজেই সেগুলোর যাচাইয়ের জন্যও আমরা কোরআনকেই কষ্টি পাথর হিসাবে নির্দিষ্ট করতে পারি। অর্থাৎ তার যেসব কথা কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী হবে সেগুলোকেই আমরা গ্রহণ করব আর যা কোরআনের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে সেগুলো বর্জন করব।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ্য করলে আমরা অনুমান করতে পারব যে, কোরআন মানবতা ও গোটা মানব জাতির প্রতি যে মহান করুণা করেছে, তা ছাড়াও সে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং ইতিহাসের প্রতি যে অবদান রেখেছে, সারা বিশ্ব মিলে যদি সেগুলোর জন্য কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া জ্ঞাপন করতে চায় তবুও তার যথার্থ প্রাপ্য শোধ করা সম্ভব হবে না। আমাদের ইতিহাসশাস্ত্র ছিল সম্পূর্ণভাবে একটা নিষ্প্রাণ বিষয়। তা থেকে মানুষ যদিও কিছু পেত তবে তা ছিল শুধুমাত্র ইতিহাসের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার রূপকথার আকারে পুনরাবৃত্তি এবং তা থেকে সাময়িকভাবে বাপ-দাদাদের গৌরবের অনুভূতি কে একটা সান্ত্বনা দেয়া। কোরআন ইতিহাসকে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছে। সে তাকে জাতিসমূহের উত্থান ও পতনের এক শিক্ষামূলক উপাখ্যান হিসেবে পেশ করেছে এবং খন্ডনের অযোগ্য যুক্তি-দলিল দ্বারা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, জাতির উত্থান-ওপতনের প্রকৃত কারণ হচ্ছে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত চরিত্র। ইতিহাসকে নতুন এই আঙ্গিক দান করে কোরআন সমগ্র মানব জাতির ইতিহাসকে ইতিপূর্বে প্রচলিত সাধারণ গল্প-কাহিনীর ন্যায় গুরুত্বহীন পর্যায় থেকে উত্তরিত করে গোটা দুনিয়ার পথ প্রদর্শন ও হেদায়াতের জন্যে সর্বাধিক মূল্যবান উপকরণে পরিণত করে দিয়েছে। বিশেষভাবে বনী ইসরাঈল এবং বনী ইসমাঈলদের ইতিহাসের প্রতি কোরআন যে অনুগ্রহ করেছে তার জন্যে গোটা দুনিয়াকেই তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ, এই জাতিদ্বয়ের ইতিহাস শুধু জাতির ইতিহাসই ছিল না, বরং প্রকৃতপক্ষে তা ছিল বিশ্বের কল্যাণকল্পে আবির্ভূত সুউচ্চ মর্যাদাস্পন্ন নবী-রসূলগণের অবদানের ইতিহাস। আর এই ইতিহাসের বিকৃতি (যেমনটি হয়েছিল আরব ও ইহুদীদের হাতে) পৃথিবীর জন্যে ছিল একটা বিরাট দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। এতে হেদায়াত ও পথপ্রাপ্তির সেসমস্ত মাইলফলক নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল যা আল্লাহ্ মনোনীত বান্দারা মানরতাকে পথের দিশা দেয়ার জন্য স্থাপন করেছিলেন। এটা কোরআন মজীদেরই একক অবদান যে, সে ইতিহাসের মুছে যাওয়া সেসব চিহ্নগুলো উদ্ধার করে এমনভাবে পুনঃস্থাপন করেছে যে, কেয়ামত পর্যন্তের জন্য প্রতিটি ফলক চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
তফসীরের অনুমানভিত্তিক উৎসগুলোর মধ্যে তৃতীয়টি হচ্ছে প্রাচীন আসমানী গ্রন্থরাজি। এ সত্য কেউই অস্বীকার করতে পারেন না যে, আমাদের নবী করীম (সঃ) নবী-রসূলগণেরই একজন এবং এই কোরআন মজীদ আসমানী গ্রন্থরাজিরই একটি গ্রন্থ। সুতরাং কোরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অন্যান্য আসমানী গ্রন্থসমূহ থেকে অত্যন্ত মূল্যবান সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। হেদায়াতপ্রাপ্তির ব্যাপারে এখন আর আমরা প্রাচীন গ্রন্থসমূহের মুখাপেক্ষী রইনি। হেদায়াত ও পথ প্রদর্শনের উদ্দেশে যাবতীয় ত্রুটি থেকে মুক্ত আল্লাহ্র সর্বশেষ গ্রন্থটিই আমাদের জন্যে যথেষ্ট। সূর্যোদয়ের পরে যেমন নক্ষত্ররাজি থেকে পথনির্দেশ গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থাকে না- তেমনিভাবে কোরআন অবতীর্ণ হয়ে যাওয়ার পর হেদায়াত গ্রহণের ক্ষেত্রে অপর কোন গ্রন্থেরই প্রয়োজনীয়তা থাকে না। কিন্তু এমন কিছু দিক রয়েছে, যার প্রেক্ষিতে আমাদের পক্ষে প্রাচীন আসমানী গ্রন্থসমূহের ব্যাপারে সরাসরি জ্ঞান অর্জন করা কর্তব্য।
প্রথমত কোরআন মজীদের বহু বাণীর বিশ্লেষণকল্পে আমাদের ওলামা সম্প্রদায়কে আহলে কিতাবদের রেওয়ায়েত নিতে হয়েছে। আর সেই রেওয়ায়েতগুলো যেহেতু সম্পূর্ণতই শোনা কথার ওপর নির্ভরশীল, সেজন্যে সেগুলোর তেমন বৈজ্ঞানিক মূল্য-মর্যাদা নেই। সেগুলো না আহলে কিতাবদের বিরুদ্ধে কোন দলিল হতে পারে, আর নাই বা আমরা নিজেদের কোন দাবী কিংবা যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তি সেগুলোর ওপর স্থাপন করতে পারি। কাজেই সরাসরি সেসব আসমানী গ্রন্থ ও পুস্তক-পুস্তিকার জ্ঞান লাভ করা আমাদের জন্যে প্রয়োজন-যাতে সেসব বিষয়ে কোন কিছু বলতে গেলে তা জেনে শুনে বলতে পারি।
দ্বিতীয়ত কোরআন মজীদ অতীত গ্রন্থসমূহের শিক্ষাকে পরিপূর্ণ করে তোলে এবং সেগুলোতে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে তার সংশোধন দান করে। কাজেই কেউ যখন কোরআনের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন গ্রন্থগুলোও অধ্যয়ন করে, তখন কোরআনের মহত্ত্ব ও গুরুত্ব অনেক বেশী পরিমাণে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং কোরআনের মাধ্যমে এই উম্মতের প্রতি আল্লাহ্ যে কত-বড় অনুগ্রহ করেছেন, তা এক বৈচিত্র্যময় প্রক্রিয়ায় উদ্ভাসিত হয়।
তৃতীয়ত কোরআনে হাকীম বিধি-বিধানের বর্ণনা প্রসঙ্গে এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর আলোচনাক্রমেও বিভিন্ন স্থানে এমন সব ইশারা-ইঙ্গিত করেছে, যেগুলো প্রাচীন আসমানী কিতাবাদির অভিজ্ঞতা ছাড়া পুরোপুরিভাবে স্পষ্ট হতে পারে না। আমাদের মহামান্য মুফাস্সেরীনের অধিকাংশই যেহেতু তওরাত ও ইঞ্জীল-এর সাথে সরাসরিভাবে পরিচিত ছিলেন না, সেহেতু তাঁরা ঐ ধরনের ইঙ্গিত-ইশারার পরিপূর্ণ বিশ্লেষণ দিতে পারেননি।
চতুর্থত কোরআন মজীদও নাসারাদেরকে এ বিষয়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে যে, তারা আল্লাহ্ কর্তৃক প্রদত্ত গ্রন্থের বিকৃতি সাধন করেছে। সেগুলোর ভেতরে এমন বহু বিষয় সংযুক্ত করে দিয়েছে যা ইতিপূর্বে তাতে ছিল না। আর কিছু বিষয় সেগুলোর ভেতর থেকে বের করে দিয়েছে যা ইতিপূর্বে যথেষ্ট বিস্তারিতভাবে তাতে বর্ণিত ছিল। এমনকি অসংখ্য ব্যাপার রয়েছে যাতে তারা নিজেদের আচার-আচরণকে আল্লাহ্ ও তাঁর নবী-রসূলগণের নির্ধারিত রীতি-নীতির প্রকাশ্য বিরোধী বানিয়ে নিয়েছে। অনেক নিষিদ্ধকে সিদ্ধ করে নিয়েছে আবার বহু সিদ্ধকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। এ ধরনের যাবতীয় বিষয়কে প্রামাণ্য করে তোলার জন্য সরাসরি তওরাত ও ইঞ্জীলের প্রতিও নজর থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় আহলে কিতাবদের ওপর যথাযথভাবে যুক্তি স্থাপন সম্ভব নয়।
পঞ্চমত এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও প্রাচীন গ্রন্থসমূহে আল্লাহ্ ও আম্বিয়ায়ে কেরামের বাণী সম্বলিত একটা অংশ রয়েছে যা কোরআন মজীদের সাথে পরিচিত ব্যক্তিরা চিনে নিতে পারেন। আল্লাহ্ ও তাঁর আম্বিয়া (আঃ)-এর বাণী সম্বলিত সে অংশটি প্রকৃতপক্ষে মুমিনদেরই একটা হৃত ভান্ডার। আর মুমিনদেরই সে অধিকার যে, যেখানেই তারা সেই ভান্ডারের সন্ধান পাবে, সেখান থেকেই তা সংগ্রহ করার চেষ্টা করবে।