📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 আধুনিকতাবাদীদের পদ্ধতি

📄 আধুনিকতাবাদীদের পদ্ধতি


আধুনিকতাবাদী বলতে সেসমস্ত লোককে বুঝানো হয়েছে, যারা আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তাধারা ও মতবাদে প্রভাবিত হয়ে নিজেদের কিছু কিছু বিশেষ মতাদর্শ তৈরী করে নিয়েছেন এবং তারই ভিত্তিতে কোরআন মজীদকে ঢেলে সাজাতে প্রয়াস পেয়েছেন। আর এতে তারা ক্ষেত্রবিশেষে এমনি বাড়াবাড়ির আশ্রয় নিয়েছেন যে, অন্যান্য যাবতীয় বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণভাবে চোখ বন্ধ করে নিয়েছেন। এমনিভাবে আধুনিকতাবাদীরা পাশ্চাত্য চিন্তাধারা ও মতাদর্শকে নিজেদের পথনির্দেশক নির্ধারণ করে একান্ত নির্দয়তার সাথে কোরআনকেও সেই মতাদর্শের পেছনে পেছনে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছেন। আমাদের সমাজে এই তফসীর পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেছেন স্যার সৈয়দ আহমদ মরহুম। তারপর থেকে এই ফেতনা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। আল্লাহই বলতে পারেন, তাঁর পবিত্র গ্রন্থ আর কতকাল এ ধরনের মূর্খ ও প্রবৃত্তির দাসদের যথেচ্ছ বিচরণের ক্ষেত্র হয়ে থাকবে।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 উল্লেখিত পদ্ধতিসমূহের পর্যালোচনা

📄 উল্লেখিত পদ্ধতিসমূহের পর্যালোচনা


এবার আমরা উল্লিখিত পদ্ধতিগুলোর পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেষ্টা করব, এগুলোর প্রকাশ্য ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো কি কি?
সর্বাগ্রে রেওয়ায়েতাশ্রয়ীদের পদ্ধতিকেই ধরা যাক। এতে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, উল্লিখিত সমস্ত পদ্ধতির মধ্যে এটাই সর্বাধিক পবিত্র ও নিরাপদ তফসীর পদ্ধতি। এ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এই যে, এতে তফসীর করতে গিয়ে রসূলে করীম (সঃ), সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) ও পূর্ববর্তী মনীষীদের বাণী ও মতামতের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। আর এ কথা সকলেই জানেন যে, কোরআন মজীদের তফসীর করার অধিকার হুযুরে আকরাম (সঃ)-এর চাইতে বেশী আর কারোই থাকতে পারে না। তাই নবী করীম (সঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর তফসীর অপেক্ষা যথার্থ ও বিশুদ্ধ তফসীরও অন্য কারও হতে পারে না। কিন্তু এ পদ্ধতিতে কয়েকটি ত্রুটিও রয়েছে, যা কোন জ্ঞানী ব্যক্তিই অস্বীকার করতে পারেন না।
১. তফসীরের ক্ষেত্রে হুযুরে আকরাম (সঃ) থেকে ধারাবাহিক বর্ণনা খুব কমই রয়েছে। তেমনিভাবে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর তফসীর সংক্রান্ত বর্ণনাও খুব বেশী নেই। তাই আমাদের তফসীর গ্রন্থসমূহ পরবর্তী ব্যাখ্যাতাদের মতামত ও বর্ণনায় ভরপুর হয়ে আছে। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, পরবর্তী ব্যাখ্যাতাদের সে মর্যাদা কোথায়, যাতে তফসীরের বেলায় সেগুলোর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভর করা যাবে।
২. তদুপরি আমাদের মুহাদ্দেসীন (রঃ)-এর বর্ণনামতেও তফসীর সংক্রান্ত রেওয়ায়েতগুলোতে সাবধানতার প্রতি ততটা লক্ষ্য রাখা হয়নি, যতটা রাখা হয়েছে সাংবিধানিক ও আইন-কানুন সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহের প্রতি। হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রঃ) তফসীর সংক্রান্ত রেওয়ায়েতসমূহের অমৌলিকতার ব্যাখ্যা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় করেছেন। আর এ প্রসঙ্গে তাঁর ব্যাখ্যার গুরুত্ব সম্পর্কে সবাই জানেন। কাজেই আমাদের তফসীর গ্রন্থসমূহ যেসব ভিত্তিহীন রেওয়ায়েতে ভরে রয়েছে, সেগুলোর শুদ্ধাশুদ্ধের পার্থক্য করা অত্যন্ত কঠিন।
৩. এসব রেওয়ায়েতের পরীক্ষা-পর্যালোচনা করে তাতে যে সারবস্তু রয়েছে, যদি সেগুলো পৃথক করা সম্ভব হয়ও, তবুও এককভাবে সেগুলোকে তফসীরের জন্য সিদ্ধান্তমূলক বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করা কোনক্রমেই সঠিক হতে পারে না। কারণ, এসব রেওয়ায়েত বিশুদ্ধতার মাপকাঠিতে পরিপূর্ণভাবে টিকে যাবার পরেও ধারণার সন্দেহ থেকে মুক্ত নয়। কাজেই যদি কোরআন মজীদের তফসীরের ক্ষেত্রে এককভাবে এগুলোকেই সিদ্ধান্তসূচক বিষয় হিসেবে মেনে নেয়া হয়, তা হলে কোরআন মজীদের অকাট্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা কোনক্রমেই সহ্য করা যায় না। সুতরাং অন্যান্য যুক্তি-প্রমাণের সমন্বয়ে নিঃসন্দেহে এসব রেওয়ায়েত কোরআন মজীদের সঠিক মর্ম সাব্যস্তকরণে যথেষ্ট সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এককভাবে এগুলোর সাহায্যে কোন অকাট্য সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।
৪. আমাদের তফসীর গ্রন্থসমূহে একটি আয়াত, বরং কোন কোন সময় একেকটি শব্দের ব্যাপারে ব্যাখ্যাতা-বিশ্লেষকদের একাধিক বক্তব্য কোন রকম দলিল-প্রমাণের আলোচনা ব্যতিরেকেই উদ্ধৃত করে দেয়া হয়। এসর বক্তব্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধীও হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই এ কথা বলাই বাহুল্য যে, তফসীরের এই পদ্ধতি একান্তই ভুল। কোরআন মজীদ যেহেতু প্রমাণের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ অকাট্য, সেহেতু উল্লিখিত একাধিক বক্তব্যের মধ্য থেকে সেগুলোই গ্রহণ করা কর্তব্য যা কোরআন মজীদের পূর্বাপর ধারাবাহিকতা এবং অন্যান্য নিদর্শনাবলী অনুযায়ী প্রমাণিত হবে। অন্যথায় কোরআনের অকাট্যতা আশঙ্কার সম্মুখীন হয়ে পড়ে।
এবার ধরা যাক দার্শনিকদের তফসীর পদ্ধতি। দার্শনিকদের পদ্ধতিতে মৌলিক ত্রুটি হচ্ছে এতে নিজেদের দার্শনিক মতাদর্শকে ভিত্তি সাব্যস্ত করে কোরআনকে সে অনুযায়ী তৈরী করে নিতে চেষ্টা করা হয়েছে এবং যেখানেই কোরআন তাদের মতাদর্শের সাথে অসমঞ্জস হয়েছে, সেক্ষেত্রে নিজেদের মতাদর্শের সংশোধন করার পরিবর্তে এবং কোরআনকে কোরআনের মত থাকতে দেয়ার পরিবর্তে কোনক্রমে কোরআনকে ভেঙ্গেচুরে নিজেদের মতাদর্শের অনুযায়ী ' করে তোলাই ছিল তাঁদের একান্ত প্রচেষ্টা। পূর্বসূরি মনীষীবৃন্দের বক্তব্য থেকেও তাঁরা সেটুকুই গ্রহণ করেছেন, যাতে তাঁদের নিজেদের মতাদর্শের সমর্থন পাওয়া গেছে। আর যেসব বক্তব্য তাঁদের মতের বিরোধী, সেগুলো সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। এ ধরনের বহু উদাহরণ আমরা ইমাম রাযী (রাঃ)-এর তফসীরে পেতে পারি। তিনি অনেক সময় 'আশায়েরা' মতাদর্শের যথার্থতা প্রমাণ করতে গিয়ে তফসীরের সীমাকে এমনভাবেই লংঘন করেছেন যে, কোন আয়াত যদি পরিষ্কারভাবে আশায়েরা মতবাদের বিরোধী পরিলক্ষিত হয়েছে, তা হলে তার খণ্ডন করতে গিয়ে এমন কথা বলতেও দ্বিধাবোধ করতেন না যে, আমাদের যে মূলনীতি দার্শনিক দলিল-প্রমাণের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, তা শুধুমাত্র এ কারণে আহত হতে পারে না যে, একটি আয়াতের শব্দাবলী তার বিরোধী-যার প্রমাণ সম্পূর্ণত শ্রবণশক্তির ওপর নির্ভরশীল। অথচ তফসীরের এহেন প্রবণতার ফলে কোরআন যে একটি হেদায়াতদানকারী কিতাব তার যথার্থতা নিরর্থক হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে কোরআন মজীদকে পথপ্রদর্শক এবং নেতৃত্বের মর্যাদা হারিয়ে কতিপয় দার্শনিক মতবাদের অনুসারী হয়ে চলতে হয়। আর অন্য শব্দে বলতে গেলে, এটা কোরআন যে আল্লাহর কালাম প্রকারান্তরে তারই অস্বীকৃতি।
অতঃপর তফসীরের গ্রন্থাবলীর অনুসারীদের পদ্ধতিটিতেও যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি বিদ্যমান, তা ফেকাহশাস্ত্রের ইমাম বা ফেকাহশাস্ত্রের গ্রন্থসমূহের অনুসারীদের মাঝেও রয়েছে। ফেকাহশাস্ত্রের ইমামগণ কিংবা ফেকাহ গ্রন্থসমূহ যেমন নিজস্বভাবে কোন সনদ নয়, বরং প্রকৃত সনদ হচ্ছে আল্লাহর কালাম ও মহানবীর হাদীস বা সুন্নাহ এবং ফেকাহ শাস্ত্রের ইমাম কিংবা গ্রন্থের যেমন শুধুমাত্র সেটুকুই অনুসরণযোগ্য যেটুকু কোরআন ও সুন্নাহর কষ্টি পাথরে যাচাইয়ের দ্বারা প্রমাণিত, তেমনিভাবে আমাদের তফসীর গ্রন্থসমূহের মধ্যেও নিজস্ব পরিমন্ডলে কোন একটিরও সনদ হওয়ার উপযোগিতা নেই; সেগুলোরও সেসব কথাই যথার্থ ও সঠিক হতে পারে যা যথার্থ বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক ও রেওয়ায়েতের কষ্টি পাথরের যাচাইয়ে টিকে থাকবে। সেজন্যই শুধুমাত্র এতটুকু বলে দেয়াই যথার্থতার প্রমাণ হতে পারে না যে, ইমাম রাযী (রঃ) কিংবা ইবনে জারীর (রঃ)-এর তফসীরে তা রয়েছে। বরং তা সঠিক কিনা তার ফয়সালা করার জন্য সম্পূর্ণভাবে অন্যান্য সূত্রের সাহায্য নিতে হবে।
আধুনিকতাবাদীদের পদ্ধতিতেও হুবহু সেসব ত্রুটি-বিচ্যুতিই রয়েছে যা মুতাকাল্লেমীন বা দার্শনিকদের পদ্ধতিতে বিদ্যমান। দার্শনিকরা যেমন গ্রীক দর্শনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে নিজেদের কিছু বিশেষ বিশেষ মতাদর্শ তৈরী করে নিয়ে সেগুলোকে শরীয়তের সার্টিফিকেট দেয়ার উদ্দেশ্যে ভেঙ্গেচুরে দিয়েছেন, তেমনিভাবে যারা পাশ্চাত্যের আধুনিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে পড়েছেন, তাঁরাও নিজেদের সেসব মতামত কিংবা চিন্তাধারাকে মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলার প্রয়াসে অত্যন্ত ধৃষ্টতার সাথে কোরআন মজীদের ওপর হাত সাফাই করেছেন। মিসরের আল্লামা তানতাভী এবং ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ মরহুম এবং তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণকারীরা যা কিছু লিখেছেন, তা পড়লে অনুমান করা যাবে যে, আমাদের পূর্ববর্তী দার্শনিকরা তবুও কিছুটা মান রেখেছিলেন; তাঁরা নিজেদের মতবাদের সমর্থনের সঙ্গে সঙ্গে কোরআনের ভাষা, ব্যাকরণ, বর্ণনাধারা কিংবা অন্তত আনুক্রমিক হাদীস বা সুন্নাহর প্রতি লক্ষ্য রেখেছিলেন। কিন্তু আমাদের আধুনিকতানুরাগীরা যাবতীয় সীমার বাঁধন ছিন্ন করেছেন এবং এমনি নির্লজ্জভাবে ছিন্ন করেছেন যেন মনে হয়, তাদের ধারণা মতে বর্তমান জগতে পড়ালেখা জানা লোকই রয়নি। বলাবাহুল্য, এ ধরনের তফসীরকে তফসীর বলাই ঠিক নয়, বরং এগুলোকে কোরআনের বিকৃতি বলাই বাঞ্ছনীয়।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 তফসীরের বিশুদ্ধ মূলনীতি

📄 তফসীরের বিশুদ্ধ মূলনীতি


এখন আমরা পাঠকবর্গের সামনে তফসীরের সে মূলনীতি উপস্থাপন করব, যা আমাদের মতে সঠিক ও বিশুদ্ধ এবং যার বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দেয় আমাদের বুদ্ধি ও আমাদের জ্ঞান এবং যা রেওয়ায়েত অনুসারেও বিশুদ্ধ বলেই মনে হয়। আমাদের মতে এ মূলনীতিগুলোর প্রতিই আমাদের পূর্ববর্তী মনীষীরাও লক্ষ্য রেখেছিলেন।
এসব মূলনীতি দু'প্রকার: প্রথমত সেগুলো- যাতে কারও কল্পনা বা সন্দেহ-সংশয়ের কোনই হাত নেই; সেগুলো কোন প্রকার মতপার্থক্য ব্যতিরেকেই কোরআনের তফসীরের উৎস। এসব মূলনীতির সাহায্যে যে তফসীর প্রণীত হবে, আমাদের ব্যবহারিক ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং আমাদের জ্ঞানের অভাবের দরুন অবশ্য তাতেও ভুল-ভ্রান্তির অবকাশ থাকবে, কিন্তু মূলনীতির নিরিখে তাই হবে বিশুদ্ধ ও সঠিক তফসীর। তাছাড়া নিজের ফলাফলের দিক দিয়েও তা বিশুদ্ধতার সবচেয়ে বেশী নিকটবর্তী হবে।
দ্বিতীয়ত সেসব মূলনীতি, যা কল্পনাপ্রসূত। অর্থাৎ, কোরআন মজীদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে সেগুলো যথেষ্ট সহায়ক তো বটেই এবং সেগুলোর নির্দেশনায় উদ্দেশ্যের বিকাশ ও জটিলতার সমাধানে মূল্যবান সাহায্যও লাভ হয়। কিন্তু যেহেতু এতে কল্পনা বা সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ রয়েছে, কাজেই সেগুলোর নির্দেশনা শুধুমাত্র ততটুকুই নেয়া উচিত, যতটা কোরআনের মূল বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে এবং তাতে কোরআনের কোন ইঙ্গিত কিংবা সংকেতের বিকাশ ঘটে।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 তফসীরের চারটি চূড়ান্ত মূলনীতি

📄 তফসীরের চারটি চূড়ান্ত মূলনীতি


তফসীরের চূড়ান্ত চারটি মূলনীতি সম্পর্কে পৃথক পৃথকভাবেই আলোচনা করব। কিন্তু কোরআনের তফসীর করতে গিয়ে সেগুলোর ব্যবহার হবে একই সঙ্গে। আর একত্রে ব্যবহার হলেই সেগুলোর মধ্যে দৃঢ়তা সৃষ্টি হবে, যাতে সেগুলো সন্দেহাতীত হয়ে ওঠবে। পৃথক পৃথকভাবে ব্যবহার করা হলে সেগুলোর অধিকাংশই নিজের অকাট্যতা হারিয়ে ফেলবে।
প্রথম মূলনীতিটি হল- তফসীরের উৎস হিসেবে সে ভাষাকে সাব্যস্ত করা যাতে কোরআন মজীদ অবতীর্ণ হয়েছে। তবে এখানে আমাদের উদ্দেশ্য সে : সাধারণ আরবী ভাষা নয়, যাতে ইদানীংকালে লেখা বা কথা বলা হয়। বর্তমান আরবী ভাষার সাথে কোরআন মজীদের আরবী ভাষার সম্পর্ক নিতান্ত অল্প। কোরআন মজীদ যে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে, তা বর্তমান মিসর ও সিরিয়ার পত্র-পত্রিকা কিংবা সেখানকার লেখক-গ্রন্থকারদের রচনায় খুঁজে পাওয়া যায় না। যাবে না, বরং সে জন্য ইমরাউল কাইস, লাবীদ, যুহাইর, আমর ইবনে কুলসুম, হারেস প্রমুখ এবং আরবের জাহেলিয়াত আমলের খতীব-বক্তাদের বক্তব্যের অন্বেষণ করতে হবে। আর সে বক্তব্যের সাথে এমন গভীর ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি করতে হবে, যাতে করে আসল-নকলের পার্থক্য করা যায়। তার বর্ণনাভঙ্গি এবং পারিভাষিক বিষয়গুলো বুঝতে যাতে কোন অসুবিধা না হয়। তার ভাল-মন্দ দিকগুলো যাতে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়। তার ভেতরে সন্নিহিত সংক্ষিপ্ত বিষয়সমূহের ব্যাখ্যা, তার ইশারা-ইঙ্গিত প্রভৃতি বুঝতে যাতে কোন জটিলতা না থাকে। বলা বাহুল্য, এ কাজটি যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু যারা কোরআন মজীদ বুঝতে চান, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁরা এই কঠিন বিষয়টিকে নিজের জন্যে সহজ করে নিতে পারবেন, কোরআন মজীদ বুঝার ব্যাপারে তফসীর ও অনুবাদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই করতে পারবেন না।
কোরআন মজীদের শব্দ ও বর্ণনাভঙ্গির মর্ম নির্ধারণ করতে হলে শব্দ কিংবা বর্ণনাভঙ্গির সে অর্থটিই গ্রহণ করা কর্তব্য, যা বক্তব্যের সাধারণ ব্যবহারে প্রসিদ্ধ ও প্রচলিত। পক্ষান্তরে সে অর্থ কিছুতেই গ্রহণ করা চলবে না, যা অপ্রচলিত। কোরআন মজীদ প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ আরবী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। তার শব্দ বিরল অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এই মূলনীতিটির প্রতি যাঁরা লক্ষ্য রাখেননি, তাঁরা অনেক সময় শব্দের এমন অর্থও গ্রহণ করেছেন, যা সাধারণত আরবী ভাষায় প্রচলিত নয়। এ ধরনের ভুলের পরিণতি অবশ্য তেমন আশঙ্কাজনক নয়। বেশীর চাইতে বেশী কোন আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রচলিত অর্থের পরিবর্তে অপ্রচলিত অর্থ ধরে নেয়া হয়। কিন্তু এভাবে শব্দের বিরল অর্থ ধরে নিয়ে গোমরাহ বা পথভ্রষ্টের দল যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে, তার হিসাব নিলে বুঝা যায়, প্রচলিত অর্থের পরিবর্তে বিরল অর্থ ব্যবহার করার ফেতনা ধর্মের ওপর কত কঠিন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
কোরআনের ব্যাকরণের ব্যাপারেও সবচেয়ে নিরাপদ ও সন্তোষজনক পন্থা হল, ব্যাকরণের সাধারণ গ্রন্থের পরিবর্তে এর উৎস হিসেবে আরবী বক্তব্যকে গ্রহণ করা। আমাদের ব্যাকরণবিদরা অনুসন্ধান ও গবেষণা স্বল্পতার দরুন কোরআনের অনেক ব্যবহারকে বিরল ব্যবহারের আওতায় উল্লেখ করেছেন। অথচ কোরআন মজীদ আরবের প্রচলিত রীতিতে অবতীর্ণ হয়েছে। কাজেই প্রচলিত রীতি হবে এক রকম আর কোরআন মজীদের রীতি হবে অপ্রচলিত, এমন হতেই পারে না।
মওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী (রঃ) এমন বহু রীতিকে প্রচলিত বলে প্রমাণ করে দিয়েছেন, যেগুলো ব্যাকরণবিদরা অপ্রচলিত বলে সাব্যস্ত করেছিলেন। এর উপকারিতা শুধু এই নয় যে, কোরআন মজীদের গৃহীত রীতিসমূহ বিরল ও ব্যতিক্রমের দ্বিতীয় পর্যায়ের তালিকায় পরিগণিত হওয়ার পরিবর্তে প্রচলিত রীতি-পদ্ধতির প্রাথমিক তালিকায় পরিগণিত হতে পারে, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথার্থ অর্থ নির্ণয় এবং সঠিক ব্যাখ্যা নির্বাচনেও তা প্রচুর প্রভাব বিস্তার করে। সেজন্যেই একে সাধারণ জ্ঞানগত প্রচেষ্টা মনে করে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
ভাষার ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে অলঙ্কারশাস্ত্রের সাথেও যোগাযোগ ঘটবে। বিশেষত এ কারণে যে, আমরা মুসলমানরা কোরআন মজীদকে একটি মু'জেযা বা অলৌকিক বিষয় হিসেবে মান্য করি এবং দাবীও করি যে, কোরআন মজীদের বাগ্মিতা, বাক-চারুতা ও সালঙ্কারত্বের কোন তুলনাই নেই। বলাবাহুল্য, কোরআন মজীদের এসব গুণাবলী যাচাই করার জন্য যে শাস্ত্র সর্বাধিক কার্যকর, তা হল অলঙ্কারশাস্ত্র। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমাদের অলঙ্কারশাস্ত্র সম্পূর্ণভাবেই সেসকল নীতিনির্ভর, যা গ্রীকদের থেকে নেয়া হয়েছে। সুতরাং এ শাস্ত্রটি গ্রীক সাহিত্যের গুণ-বৈশিষ্ট্য এবং অলংকার যাচাইয়ের মানদন্ড হতে পারে, কিন্তু একে কোরআনের গুণ-বৈশিষ্ট্য ও অলঙ্কার যাচাইয়ের কষ্টি সাব্যস্ত করা তা কয়লা মাপার পাল্লা দিয়ে স্বর্ণ বা আশরফী ওজনের অপচেষ্টারই নামান্তর হবে। এতে সন্দেহ নেই যে, আমাদের শাস্ত্রীরা এ শাস্ত্রকে আরবী ভাষার সাহিত্যিক চাহিদা এবং তার বিশেষ ঝোঁক ও অনুরাগসমূহের সাথে পরিচিত করে তোলার চেষ্টায় ত্রুটি করেননি, যাতে আরবী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য যাচাইর ব্যাপারেও কাজে লাগতে পারে। কিন্তু তাঁরা এ ব্যাপারে আরবী কাব্যধারার সীমা থেকে অগ্রসর হননি। এতেও তাঁরা অতটুকুই সফল হয়েছেন, দুটি অসমঞ্জস বস্তুর সম্মিলন ঘটাতে গিয়ে কেউ যতটুকু সফল হতে পারেন। যাই হোক, এ শাস্ত্রের দ্বারা যদি কিছু সম্ভব হয়ও, তবে শুধু আরবী কাব্যের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যের নির্ণয় সম্ভব হতে পারে, কিন্তু কোরআন মজীদের সাহিত্যিক সৌন্দর্য-সৌকর্য ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এর দ্বারা সম্ভব নয়। বরং তাতে সবচাইতে বড় আশঙ্কা এই যে, যদি এ শাস্ত্র সামনে রেখে কোরআন মজীদের গুণ-বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়, তা হলে কোরআনকে মু'জেযা হিসেবে মেনে নেয়া তো দূরের কথা, তাকে অলঙ্কার ও ভাষাশিল্পের দিক দিয়ে একটা উৎকৃষ্টতর গ্রন্থ বলে অস্বীকার করে বসাও বিচিত্র নয়। কোরআন মজীদ এমন একটা কালাম বা বাণী, যা ওহীর উৎস থেকে উৎ- সারিত হয়েছে, যা আরব-আজমের সর্বাধিক সুবক্তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে, যাতে সাগরের গতি এবং ঝড়ের শক্তি রয়েছে, যা বিদ্যুত চমকের মত সমগ্র আরব ভূমিকে প্রকম্পিত করে দিয়েছে এবং মুহূর্তের মধ্যে একেকজন মহাজ্ঞানীর মন-মস্তিষ্ক বদলে দিয়েছে। এমন গ্রন্থের সাহিত্যিক গুণ-বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্তমান অলঙ্কারশাস্ত্রের মাপকাঠিতে পরিমাপ করতে চেষ্টা করা গজ নিয়ে আকাশসমূহের পরিধি পরিমাপের চেষ্টারই শামিল।
এখানে আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানিয়ে দিচ্ছি যে, এ বিষয়ে মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী (রঃ)-এর কিতাব 'বালাগাত' প্রকাশিত হয়েছে। এতে মাওলানা সাহেব প্রাচীন অলঙ্কারশাস্ত্রের ত্রুটি-বিচ্যুতিসমূহের বিস্তারিত সমালোচনার পর কোরআনের অলঙ্কার যাচাইয়ে তার অপরাগতা প্রমাণ করে দিয়েছেন এবং সাথে সাথে সেসব মূলনীতিও নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা কোরআনে হাকীমের ভাষা অলংঙ্কার যাচাইয়ের মাপকাঠির ভূমিকা পালন করতে পারে। এখন যে কাজটি বাকী রয়ে গেছে তা হল, মাওলানা সাহেব যে মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন, কোরআনের গবেষণা এবং জাহেলিয়াত যুগের আরব কথাশিল্পী ও কবিদের কথা ও কাব্য অনুসারে সে মূলনীতিসমূহের অধিকতর উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও সাক্ষ্য-প্রমাণ একত্রিত করে দেয়া, যাতে এ শাস্ত্রের অধ্যয়নকারীরা সহজে তার দ্বারা উপকৃত হতে পারে। এটা আল্লাহ্র একান্ত অনুগ্রহ যে, এদিকে কিছু দিনের মধ্যে জাহেলিয়াত আমলের সাহিত্যসম্ভার থেকে বেশ কিছু অংশ প্রকাশিত হয়ে গেছে, যা এ কাজে জ্ঞানী-মনীষীদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00