📄 মুহাদ্দেসীন ও রেওয়ায়েতাশ্রয়ীদের তফসীর পদ্ধতি
আমাদের তফসীরকারদের মধ্যে সর্বাধিক বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য দল হল মুহাদ্দেসীনও রেওয়ায়েতাশ্রয়ীদের। এ দলের তফসীর পদ্ধতি হচ্ছে, তফসীরের ক্ষেত্রে সত্যিকারভাবে মহানবী (সঃ)-এর বাণী, সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর বিবৃতি এবং তৎপরবর্তী মুফাস্সেরীনের বাণীর ওপর নির্ভর করা। অতএব, তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রচেষ্টা ছিল প্রত্যেকটি আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী বিশ্লেষক ও ব্যাখ্যাতাদের যত মত সংগৃহীত হয়েছে তার সবই জমা করে দেয়া।
পক্ষান্তরে, সেসব মতামত অনেক সময় পারস্পরিক সম্পূর্ণ বিরোধীও হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাতে কোন রকম সামঞ্জস্য বিধানেরও চেষ্টা করা হয়নি। এই নীতিতে সবচেয়ে বড় যে তফসীর প্রণীত হয়েছে এবং আজও বর্তমান, তা হল ইবনে জারীর (রঃ)-এর বিখ্যাত তফসীর। এতে তফসীর সংক্রান্ত সমস্ত রেওয়ায়েত এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও মনীষীবৃন্দের যাবতীয় মতামতের এক বিরাট ভাণ্ডার বর্তমান। পাঠক এতে প্রতিটি আয়াতের প্রেক্ষিতে একাধিক মতামত পেতে পারন। কিন্তু এই পার্থক্য করা সম্ভব হবে না যে, সেগুলোর কোন্টি সঠিক আর কোন্টি সঠিক নয়। রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে যেসব তফসীর এ পর্যন্ত লেখা হয়েছে সেগুলোর অধিকাংশের উৎসই হচ্ছে উল্লিখিত তফসীরখানি। প্রদীপ থেকে যেমন করে প্রদীপ জ্বালিয়ে নেয়া হয়, তেমনি করে এ গ্রন্থেরই আংশিক বর্জন ও সংক্ষেপায়নে বহু গ্রন্থ তৈরী হয়ে গেছে। ইবনে কাসীর (রঃ)-এর বিখ্যাত তফসীরখানিও সে তফসীর থেকেই সংগৃহীত।
📄 দার্শনিকদের পদ্ধতি
মুসলমানদের সম্পর্ক যখন অনারবদের সাথে গড়ে ওঠে এবং তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের সাথে যখন তাদের পরিচয় ঘটে, তখনই ধর্মীয় বিষয় সম্পর্কে চিন্তা করার সে দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব ঘটে, যাকে আমরা ইলমে কালাম বা দর্শনশাস্ত্র বলে অভিহিত করি। এই দর্শনশাস্ত্রও আমাদের মধ্যে বহু মতাদর্শের জন্ম দিয়েছে এবং সেসব মতাদর্শের অনুসারীরা নিজেদের বিশেষ মত ও দৃষ্টিভঙ্গিকে মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলার উদ্দেশে কোরআন মজীদের তফসীর প্রণয়ন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এসব তফসীরের উদ্দেশ্য কোরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের চেয়ে বেশী ছিল সে সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে দলিল-প্রমাণ সংগ্রহ করা, যা এসব তফসীরের প্রণেতাগণ নিজেদের দার্শনিক চিন্তাধারার মাধ্যমে সৃষ্টি করে নিয়েছিলেন। এই পদ্ধতিতে যেসব তফসীর প্রণীত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ তফসীর হচ্ছে দুটি। একটি আল্লামা যামাশরী (রঃ) প্রণীত 'তফসীরে কাশশাফ' এবং অপরটি ইমাম রাযী (রঃ) প্রণীত 'তফসীরে কবীর'। এতদুভয়ের মধ্যে প্রথমোক্তটি মু'তাযেলা মতাদর্শের মুখপত্র আর দ্বিতীয়টিতে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আশায়েরা মতাদর্শের ওকালতি করা হয়েছে। রেওয়ায়েতভিত্তিক তফসীরের ক্ষেত্রে ইবনে জারীর (রঃ)-এর তফসীরের যে মর্যাদা, দার্শনিক পদ্ধতিতে প্রণীত তফসীরসমূহের মধ্যেও ইমাম রাযী ও আল্লামা যামাখশারীর তফসীরের মর্যাদা তেমনি। আর পরবর্তীকালে যাঁরা এই পদ্ধতিতে তফসীর প্রণয়ন করেছেন, তাঁরা প্রধানত এ দুটির চর্বিতই চর্বণ করেছেন মাত্র।
📄 মুকাল্লেদ বা অনুসরণবাদীদের পদ্ধতি
মুকাল্লেদ বা অনুসরণবাদী বলতে আমাদের উদ্দশ্য ফেকাহশাস্ত্রের ইমাম মহোদয় কিংবা ফেকাহর কিতাবের অনুসরণ নয়, বরং মুফাস্সেরীনের গ্রন্থের অনুসরণ। ইবনে জারীর (রঃ), ইমাম রাযী (রঃ) এবং আল্লামা যামাখশারী (রঃ)-এর পরে তফসীরের যেসব গ্রন্থ প্রণীত হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই উপরোল্লিখিত তফসীরত্রয় থেকেই গৃহীত এবং সেগুলোরই সার-সংক্ষেপ। সেগুলোর পর এমন তফসীর খুব কমই লেখা হয়েছে, যার স্বতন্ত্র কোন ভিত্তি রয়েছে। এমনকি ধীরে ধীরে তফসীর প্রণয়নের সাধারণ নিয়মই দাঁড়িয়ে যায় যে, যাই কিছু লেখা হোক না কেন, উল্লিখিত তফসীরের যেকোন একটির সনদ অনুসারে লেখতে হবে। কোরআনের কোন অনুবাদ কিংবা তার কোন তফসীরকে প্রামাণ্য হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট বলে মনে করা হতে থাকে যে, প্রতিটি বিষয়ের সনদ তফসীরের পূর্ববর্তী কোন না কোন গ্রন্থে পাওয়া যাবে। কাজেই আমাদের এ যুগে কোরআন মজীদের যেসব তরজমা বা তফসীর প্রকাশিত হয়েছে, সেসবের সবচাইতে বড় কোন বৈশিষ্ট্যের কথা যদি উল্লেখ করা যায়, তা হলে সম্ভবত তা হচ্ছে এসব তরজমা বা তফসীরের প্রতি পূর্ববর্তী তফসীরের সমর্থন রয়েছে। তাঁদের মধ্যে কেউই সেই সীমানা অতিক্রম করতে সাহস করেননি, যা ইবনে জারীর, ইমাম রাযী, ইমাম সুয়ূতী, ইমাম শাওকানী ও ইমাম বয়যাবী রহমাতুল্লাহি আলাইহিম নির্ধারণ করে দিয়ে গেছেন। সাধারণত তরজমা কিংবা তফসীরের বেলায় সেসব মতের ঊর্ধ্বে কোন কথা বলার বা মত প্রকাশের প্রয়োজন অনুভব করা হয় না, যা পূর্ববর্তী তফসীরসমূহের কোন একটি থেকে উদ্ধৃত হয়ে থাকে। এমন উদাহরণ খুব কমই পাওয়া যাবে যে, এই সহজ ও নিরাপদ পন্থা ছেড়ে কোরআনের জটিলতাসমূহের সমাধানের পথে কোন দুঃসাহসী পদক্ষেপ গৃহীত হয়ে থাকবে।
📄 আধুনিকতাবাদীদের পদ্ধতি
আধুনিকতাবাদী বলতে সেসমস্ত লোককে বুঝানো হয়েছে, যারা আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তাধারা ও মতবাদে প্রভাবিত হয়ে নিজেদের কিছু কিছু বিশেষ মতাদর্শ তৈরী করে নিয়েছেন এবং তারই ভিত্তিতে কোরআন মজীদকে ঢেলে সাজাতে প্রয়াস পেয়েছেন। আর এতে তারা ক্ষেত্রবিশেষে এমনি বাড়াবাড়ির আশ্রয় নিয়েছেন যে, অন্যান্য যাবতীয় বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণভাবে চোখ বন্ধ করে নিয়েছেন। এমনিভাবে আধুনিকতাবাদীরা পাশ্চাত্য চিন্তাধারা ও মতাদর্শকে নিজেদের পথনির্দেশক নির্ধারণ করে একান্ত নির্দয়তার সাথে কোরআনকেও সেই মতাদর্শের পেছনে পেছনে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছেন। আমাদের সমাজে এই তফসীর পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেছেন স্যার সৈয়দ আহমদ মরহুম। তারপর থেকে এই ফেতনা ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। আল্লাহই বলতে পারেন, তাঁর পবিত্র গ্রন্থ আর কতকাল এ ধরনের মূর্খ ও প্রবৃত্তির দাসদের যথেচ্ছ বিচরণের ক্ষেত্র হয়ে থাকবে।