📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 আলোচনার সার সংক্ষেপ

📄 আলোচনার সার সংক্ষেপ


পেছনের পাতাগুলোতে যেসব অর্থ ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে, এক্ষণে সংক্ষেপে আমরা সেগুলোর একটা সারসংক্ষেপ তুলে ধরতে চেষ্টা করব, যাতে করে প্রকৃত বিষয়টি পরিষ্কারভাবে সামনে এসে যেতে পারে।
১. কোরআন মজীদ সে শ্রেণীর কালামের অন্তর্ভুক্ত, যা কোন কোন দিক দিয়ে একান্ত সহজ ও সরল এবং কোন কোন দিক দিয়ে অতি সূক্ষ্ম ও জটিল। সেজন্যই কোরআন একটি স্কুলগ্রন্থ, যা বুঝবার জন্যে কোন চেষ্টা-চরিত্রের কিংবা কোন গভীর চিন্তা-ভাবনার অথবা গভীর অধ্যয়নের প্রয়োজন নেই বলে ধারণা করে নেয়া নিতান্ত ভুল। সাধারণ জ্ঞানের ভিত্তিতে কোরআন সম্পূর্ণ স্পষ্ট; প্রথম দৃষ্টিতেই হারাম হালাল বা বৈধ-অবৈধের সমস্ত সীমানা নির্ধারণ করে দেয় এবং ভাল-মন্দ ও সৎ-অসৎ চিনে নেয়ার জন্য যাবতীয় নিদর্শন ও চিহ্নসমূহ প্রকাশ করে। কিন্তু একই সঙ্গে এতে এমন একটি সূগভীর দর্শন এবং অভিজ্ঞান বা হেকমতও বিদ্যমান, যা অর্জন করতে হলে হালকাভাবে অধ্যয়ন করাই যথেষ্ট নয়, বরং যথেষ্ট মনোনিবেশ সহকারে চিন্তা-গবেষণা করা প্রয়োজন।
২. কোরআন মজীদ সম্পর্কে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত যে, এটি শুধুমাত্র আইন-কানুন ও সংবিধান সম্বন্ধীয় একটি সংকলন এবং বিধি-নিষেধ কিংবা হারাম-হালাল জানার একটা শুষ্ক ও সহজ-সরল নিয়ম-পদ্ধতি। কোরআনের গঠন স্বয়ং তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী তিনটি অংশের দ্বারা হয়েছে। (১) আল্লাহ্র আয়াত অর্থাৎ, দলিল-প্রমাণাদি, (২) কিতাব অর্থাৎ, আইন-কানুন ও সংবিধান (৩) হেকমত অর্থাৎ শরীয়তের মূলতত্ত্ব এবং ধর্মের নির্যাস। প্রথম অংশটি ধর্মের যুক্তি, দ্বিতীয়টি ধর্মের ব্যবস্থা আর তুতীয়টি হচ্ছে ধর্মের দর্শন। কাজেই কোরআন মজীদ একটি চিন্তা-গবেষণার বস্তু। এ জন্যেই সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) তার একেকটি সূরার গবেষণায় আট-আটটি বছর কাটিয়ে দিতেন। তাঁরা তার জটিলতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার উদ্দেশে মজলিস গঠন করতেন। মহানবী (সঃ)-এর কাছে তার জটিলতা নিরসনের জন্যে সাহায্য চাইতেন। বুদ্ধি-বৃত্তির প্রশান্তি, অন্তরাত্মার পবিত্রতা এবং পার্থিব জীবনে জীবিকা অর্জন ও রাজনীতির জন্যে একে সম্পূর্ণভাবে যথেষ্ট বিবেচনা করতেন। আর বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরামের উক্তি, "আল্লাহর কিতাব আমাদের জন্য যথেষ্ট"-এর অর্থও ছিল তাই যে, আমাদের দ্বীন ও দুনিয়া বা ইহলোক ও পরলোক এবং জ্ঞান ও আত্মার যা কিছু চাহিদা, কোরআন সে সমস্তই নিজের মধ্যে সংরক্ষণ করে। এমন নয় যে, তাতে শরীরের জন্য সব কিছু আছে কিন্তু আত্মার প্রশান্তির কোন ব্যবস্থা নেই কিংবা হালাল-হারাম তথা বৈধ-অবৈধের নিয়ম-কানুন তো আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, যা আমাদের জীবিকার অন্বেষণে যথেষ্ট কাজে লাগতে পারে, কিন্তু আমাদের জ্ঞান ও চেতনার ব্যাকুলতা আর মন-মস্তিষ্কের জটিলতাসমূহকে এমনি ছেড়ে দিয়েছে। সেগুলোর সমাধানের জন্য আমাদেরকে গ্রীক দার্শনিক তার্কিকদের যথেচ্ছ বক্তব্য আর সমকালীন গবেষণাবিদদের গবেষণার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে, তাও নয়।
৩. কোরআন মজীদে এমন একটি আয়াতও নেই, যাতে বুঝা যায় যে, এটি তো একটি স্থূল গ্রন্থ। বরং তার বিপরীতে এতে অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যার প্রতিটি ভাষ্য সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা প্রয়োজন। চিন্তা-গবেষণা ছাড়া তার শিক্ষার তাৎপর্য বুঝে আসতে পারে না। যারা কোরআন মজীদকে কোন গভীর তাৎপর্যপূর্ণ গ্রন্থ বলে মনে করেন না এবং
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ
আয়াতটি দ্বারা নিজের সে ধারণার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন, তাদের সে যুক্তি অত্যন্ত দুর্বল ও ভ্রান্ত। উল্লিখিত আয়াতের মর্ম তা নয়, যা সাধারণভাবে মনে করা হয়। এর মর্ম হচ্ছে, কোরআন মজীদকে আল্লাহ্ তাআলা জ্ঞানার্জন ও শিক্ষালাভের জন্য সম্পূর্ণভাবে পর্যাপ্ত এবং অত্যন্ত উপযোগী করে তৈরী করেছেন। এই উদ্দেশে তা সর্বদিক দিয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এতে কোন রকম কমতি নেই; কোন কিছুরই অভাব নেই। يَسَّرْنَا শব্দটি শুধু তার সহজতাকেই প্রকাশ করে না; বরং প্রকৃতপক্ষে তার পরাকাষ্ঠা, তার সামগ্রিকতা এবং তার উপযোগিতাও প্রমাণ করে। আর তাতেই তার সহজবোধ্যতা প্রকাশ পায়। কারণ, যাকে কোন একটি উদ্দেশ্যের জন্য পরিপূর্ণভাবে সাবলীলও করে নেয়া হয়েছে, তা সে উদ্দেশে নিঃসন্দেহে সহজ-সরলও অবশ্যই হবে।
৪. যাঁরা কোরআনের তফসীরের ব্যাপারে শুধুমাত্র রেওয়ায়েতের ওপরেই নির্ভর করেন, তাঁরা নিশ্চিতই বাড়াবাড়ি করেন। অথচ তা বিশেষজ্ঞ মত ও অনুসৃত নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। কোরআন মজীদের তফসীরের ব্যাপারে মূল ভিত্তি হচ্ছে স্বয়ং তারই শব্দ, তারই যুক্তি-প্রমাণ, তারই উপমা-উদাহরণ, তার আনুপূর্বিক যোগসূত্র এবং তারই বিন্যাসের প্রতি লক্ষ্য রাখা। প্রত্যেকটি আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়েই এসব বিষয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। কোন অবস্থাতেই এগুলোকে উপেক্ষা করা যাবে না। কিন্তু এ কথাও অনস্বীকার্য যে, রেওয়ায়েত ও হাদীসের সাহায্য ছাড়া কোরআনের তফসীরের জটিলতার সমাধান হতে পারে না। কোরআন মজীদ যে যুগে অবতীর্ণ হয়েছিল এবং যেসব লোককে প্রাথমিক পর্যায়ে তাতে সম্বোধন করা হয়েছিল, স্বাভাবিকভাবেই সে যুগের অসংখ্য বৈশিষ্ট্য এবং সে জাতির সীমাহীন সমস্যার প্রতি তা ইঙ্গিত করেছে, যাকে পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরার জন্য আমরা তাদের সাহায্য গ্রহণ থেকে মুক্ত হতে পারি না, যাঁরা কোরআনের প্রাথমিক লক্ষ্য। সে লোকদের সাহায্যে উপকৃত হওয়া কোরআনের শব্দাবলীর প্রাধান্যকে খর্ব করা নয়। আর তাতে তার অকাট্যতায়ও সামান্যতম ব্যতিক্রম ঘটে না। কারণ, রেওয়ায়েত ও হাদীসের সাহায্য তখনই গ্রহণ করা হয়, যখন কোরআনের শব্দাবলীও তার সাহায্য গ্রহণের প্রতি ইঙ্গিত করে।
এ দাবী স্বস্থানে যথার্থ যে, কোরআন মজীদ নিজের বোধগম্যতার জন্যে অন্য কোন কিছুর মুখাপেক্ষী নয়। কিন্তু কোরআনের তফসীর বা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রেওয়ায়েত ও হাদীসের সাহায্য নেয়া কোরআনের মুখাপেক্ষিতার প্রমাণ নয়। বরং এতে আমাদেরই মুখাপেক্ষিতা প্রমাণ করে। আর আমাদের মুখাপেক্ষিতা এবং কোরআনের মুখাপেক্ষিতায় বিরাট পার্থক্য। আমরা কোরআন বুঝার জন্য ভাষা, ব্যাকরণ প্রভৃতির সাহায্য নেই, কিন্তু তাতে একথা প্রমাণিত হয় না যে, কোরআন নিজের বোধগম্যতার জন্য সেসব বিষয়ের মুখাপেক্ষী। কাজেই এতে কোরআন মজীদের পরিপূর্ণতায় কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় না।
৫. শানে নুযূল দ্বারাও কোরআনের অকাট্যতায় কোন ব্যাঘাত ঘটে না। শানে নুযূলের তেমন কোন গুরুত্ব নেই যা সাধারণত মনে করা হয়। প্রামাণিকদের নিকট শানে নুযূল হচ্ছে আবিষ্কারধর্মী বিষয়। অর্থাৎ, "আয়াতটি অমুক ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে কিংবা অমুক বিষয়ে নাযিল হয়েছে" বলে সাহাবায়ের কেরামের যে উক্তি, তার অর্থ এই নয় যে, সে আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ হুবহু সে ঘটনাটিই। বরং তার অর্থ সাধারণত এই হয় যে, সে আয়াতটি অমুক নির্দেশ সম্বলিত। অতএব, বিষয়টির তাৎপর্য পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর এ পথের যাবতীয় প্রশ্নের সমাধান আপনা থেকেই হয়ে যায় এবং অতপর সেগুলোর দ্বারাও কোরআনের তফসীরের সেক্ষেত্রেই সাহায্য নেয়া উচিত যেখানে কোরআনের শব্দাবলীও তাই চায় এবং যেখানে কোন জটিলতার সমাধান হয়। বস্তুত এমন জায়গা হযরত শাহ ওলীউল্লাহ (রঃ)-এর ভাষায় গোটা কোরআনে খুব বেশী নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00