📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 যাকে সংবোধন করা হয় তার সংবোধনের ভিত্তিতে কোরআনের জটিলতা

📄 যাকে সংবোধন করা হয় তার সংবোধনের ভিত্তিতে কোরআনের জটিলতা


আলোচনার শুরুতেই আমরা লেখেছি, কোন একটি বক্তব্য কারো জন্য খুবই সহজ এবং কারো জন্য খুবই জটিল হতে পারে। কোরআন মজীদের ক্ষেত্রে এদিক দিয়েও লক্ষ্য করা প্রয়োজন। বলাবাহুল্য, রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর আমলের মুসলমানদের জন্যে কোরআন মজীদ ছিল যথেষ্ট সহজবোধ্য। কিন্তু সে সহজবোধ্যতা 'পরবর্তী যুগের লোকদের জন্যে রয়নি। কারণ, তারা নিজেদের পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও ঘটনাবলী, আপন যুগের প্রচলিত নিয়ম-রীতি এবং নিজের জাতির বিশ্বাস ও কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। কোরআন যেকোন বিষয়ে যেকোন ইশারা-ইঙ্গিত করেছে, সঙ্গে সঙ্গে তারা তা বুঝে নিতে পারতেন। এমনকি সেসব আয়াতসমূহ বুঝতেও তাঁদের কোন জটিলতার সম্মুখীন হতে হত না, যাতে কোন বিশেষ ঘটনা কিংবা কোন বিশেষ ব্যক্তি সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে ও সূক্ষ্ম ইশারা বা ইঙ্গিত করা হত। কোন একটি আয়াত অবতীর্ণ হল আর তার কোন একটা শব্দে তাঁরা কোন বিশেষ ইঙ্গিত-সংকেতের গন্ধ পেলেন কি না পেলেন, সাথে সাথে তার যথার্থ লক্ষ্যের প্রতি অংগুলি নির্দেশ করে দিতেন এবং উদ্দেশ্যের গভীরতা পর্যন্ত এমনভাবে পৌঁছে যেতেন যেন রাখাঢাকা কোন বিষয়ই ছিল না। বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝতে চেষ্টা করা যাক। কোরআন মজীদের বহু আয়াত আছে, যাতে আবু লাহাব সম্পর্কে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে 'ইঙ্গিত করা হয়েছে। সেসব আয়াতে যে ব্যক্তিত্ব প্রচ্ছন্ন রয়েছে, তার প্রতি সাহাবায়ে কেরামের দৃষ্টি যত সহজে পড়তে পারত, তত সহজে আমাদের দৃষ্টি সেদিকে ধাবিত হতে পারে না। তাঁরা আকার-অবয়ব সম্পর্কে ভাল করে জানতেন বলে অদৃশ্য রসনা থেকে কোন একটি কথা নিঃসৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বিঘ্নে তার উদ্দেশ্য বুঝে নিতেন। কোন কোন আয়াতে সাহাবাদের কারো কোন বিশেষ প্রশংসা অথবা কারো কোন বিশেষ কাজের নিন্দা করা হলে তা কোরআন অবতরণকালের লোকেরা যত সহজে ধরে নিতে পারতেন, পরবর্তী শতাব্দীসমূহের লোকদের পক্ষে সে বিষয়টি যে তত সহজে ধরে নেয়া সম্ভব নয়, তা বলা নিষ্প্রয়োজন।
আমল-আকীদার ব্যাপারটিও একই রকম। কোরআন মজীদে এমন একটি সূরাও হয়ত নেই, যাতে সেযুগের বিশ্বাস কিংবা কাজ-কর্ম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়নি। কিন্তু যেভাবে প্রসিদ্ধ কোন বিষয় বর্ণনা করা হয়, তেমনি সংক্ষিপ্তভাবে সেগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে দেয়া হয়েছে; বিস্তারিত বর্ণনারীতি তাতে অবলম্বন করা হয়নি। যেমন, সূরা আনআমে আরবদের কোন কোন কাজ বা আমল ও বিশ্বাস বা আকীদা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছেঃ
وَجَعَلُوا لِلَّهِ مِمَّا ذَرَأَ مِنَ الْحَرْثِ وَالْأَنْعَامِ نَصِيبًا فَقَالُوا هَذَا لِلَّهِ بِزَعْمِهِمْ وَهُذَا لِشُرَكَاتِنَا فَمَا كَانَ لِشُرَكَائِهِمْ فَلَا يَصِلُو إِلَى اللَّهِ وَمَا كَانَ لِلَّهِ فَهُوَ يَصِلُ إِلَى شُرَكَائِهِمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ - وَكَذَالِكَ زَيَّنَ لِكَثِيرٍ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ قَتَلَ أَوْلَادِهِمْ شُرَكَاءَهُمْ لِيُرْدُوهُمْ وَلِيَلْبِسُوا عَلَيْهِمْ دِينَهُمْ - وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا فَعَلُوهُ فَذَرْهُمْ وَمَا يَفْتَرُونَ - وَقَالُوا هَذِهِ أَنْعَامَ وَحَرْثٌ حجرٌ لا يَطْعَمُهَا إِلَّا مَنْ نَشَاءُ بِزَعْمِهِمْ وَأَنْعَامَ حُرِّمَتْ ظُهُورُهَا وَأَنْعَامُ لا يَذْكُرُونَ اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا افْتِرَاهُ عَلَيْهِ - سَيَجْزِيهِمْ بِمَا كَانُوا يَفْتَرُونَ . وَقَالُو مَا فِي بُطُونِ هَذِهِ الْأَنْعَامِ خَالِصَةٌ لِذُكُورِنَا وَمُحَرَّمَ عَلَى أَزْوَاجِنَا وَإِن يَكُن مَّيْتَةٌ فَهُمْ فِيهِ شُرَكَاءُ سَيَجْزِيهِمْ وَصَفَهُمْ إِنَّهُ حَكِيمٌ عَلِيمٌ . قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ قَتَلُوا أَوْلَادَهُمُ سَفَهَا لِغَيْرِ عِلْمٍ وَحَرَّمُوا مَا رَزَقَهُمُ اللَّهُ قَدْ ضَلُّوا وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ - (١٤١ - ۱۳۷ আনআম)
আর তারা আল্লাহ্র সৃষ্ট ফসল ও চতুষ্পদ পশুসমূহের মধ্যে একটা অংশ সাব্যস্ত করল এবং নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বলল, এটা হচ্ছে আল্লাহর জন্যে আর এটা আমাদের (অন্যান্য) অংশীদারদের জন্যে। বস্তুত যে অংশটি তাদের অংশীদারদের জন্যে সাব্যস্ত তা আল্লাহ্ পেতে পারেন না, আর যে অংশটি আল্লাহ্র জন্যে তা তাদের অংশীদাররা পেতে পারে। কি যে মন্দ সিদ্ধান্ত! তেমনিভাবে অনেক মুশরিকের দৃষ্টিতে তাদের অংশীদাররা তাদের সন্তানদের- কে হত্যা করার বিষয়টিকে উত্তম করে দেখিয়েছে, যাতে তাদেরকে ধ্বংসে পতিত করা যায় এবং যাতে তাদের ধর্মকে তাদের কাছে সন্দিগ্ধ করে তোলা যায়। আর যদি আল্লাহ্ চাইতেন, তা হলে তারা এমনটি করতে পারত না। সুতরাং তাদের এবং তাদের নিন্দাবাদ ছেড়ে দাও। আর তারা বলে, এই চতুষ্পদ এবং ফসল অস্পৃশ্য; এগুলো খেতে পারবে না, কিন্তু আমরা যদি ইচ্ছা করি তবে তা স্বতন্ত্র কথা। নিজেদের ধারণা অনুযায়ী আরও কিছু চতুষ্পদ জীব রয়েছে, সেগুলোর পিঠ হারাম এবং কিছু চতুষ্পদ রয়েছে, যাতে আল্লাহ্ নাম নেয়া হয় না, আল্লাহ্র প্রতি নিন্দাচ্ছলে। আল্লাহ্ তাদের নিন্দাবাদের শীঘ্রই তাদেরকে প্রতিফল দেবেন। আর তারা বলে, এই চতুষ্পদের পেটে যে বাচ্চাটি রয়েছে, তা পুরুষদের জন্যে নির্ধারিত এবং আমাদের স্ত্রীদের জন্য হারাম। আর যদি তা মৃত জন্মায়, তা হলে তারা তাতে সমান সমান অংশীদার হবে। আল্লাহ শীঘ্রই তাদেরকে (স্বকল্পিত) বিশ্লেষণের বদলা দেবেন। নিঃসন্দেহে তিনি অভিজ্ঞানসম্পন্ন, জ্ঞানী। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা বোকামির দরুন কোন রকম জ্ঞান-বুদ্ধি ছাড়াই নিজেদের সন্তানদের হত্যা করে দিয়েছে এবং আল্লাহ্ তাদেরকে যে জীবিকা দান করেছেন, সেগুলোকে আল্লাহ্র প্রতি বিদ্বেষবশত হারাম করেছে। এরা ভ্রষ্ট হয়ে গেছে; সরল পথে নেই।
এ আয়াতগুলোতে কিছু কাল্পনিকতা ও কুসংস্কারের বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। এর বর্ণনাভঙ্গি সংক্ষিপ্ত ও ইংগিতপূর্ণ। এতে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে, যাদেরকে এই কাহিনী শোনানো হচ্ছে তারা সে সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিফহাল। কাজেই ভাষালংকারের দাবী ছিল যেন এর বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া না হয়। কিন্তু পরবর্তীদের জন্যে, যারা সে যুগটি শেষ হয়ে যাবার পর এসেছে, ঐসব সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত যথাযথ বুঝে ওঠা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। সে সমস্ত বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ দিতে গেলে তাদের মনে বহু প্রশ্ন দেখা দেবে, যার উত্তর দিতে গিয়ে সে যুগের ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস ও কার্যকলাপ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া অপরিহার্য।
ব্যাপারটি আরও একটা উদাহরণের মাধ্যমে বুঝে নেয়া যায়। সূরা আনফালে বলা হয়েছে : وَمَا كَانَ صَلَاتُهُمْ عِنْدَ الْبَيْتِ الأَمْكَاءٌ وَتَصْدِيَةٌ
খানায়ে কা'বার সামনে তাদের নামায তালি বাজানো আর শীষ দেয়া ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
আজকের দিনে আরবদের সে এবাদত-উপাসনার স্বরূপ কল্পনা করাটা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু যে যুগে কোরআন নাযিল হয়েছিল, তখনকার লোকদের জন্যে এর চাইতে সাধারণ ও জানা বিষয় আর দ্বিতীয় একটিও হতে পারত না। তারা শুধু যে নামাযের পরিপূর্ণ রূপ ও তাৎপর্য জানতেন তাই নয়, বরং ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে নিজেরাও এ নামাযই পড়তেন।
আরো একটি উদাহরণ সূরা আ'রাফ থেকে নেয়া যায়। বলা হয়েছে: وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا أَبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا قُلْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ أَتَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ .
আর যখন কোন অশ্লীল কাজ করে, তখন বলে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এ কাজ করতে দেখেছি। তা ছাড়া আল্লাহ্ আমাদেরকে এ নির্দেশই দিয়েছেন। বলে দাও, আল্লাহ্ অশ্লীলতার নির্দেশ দেন না। তোমরা কি আল্লাহর প্রতি এমন কাজের অপবাদ আরোপ করছ, যার ব্যাপারে তোমাদের জানা নেই?
কোরআন নাযিল হওয়ার যুগে যারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা বুঝেছেন, মক্কাবাসীর উলঙ্গ অবস্থায় খানায়ে কা'বা তওয়াফের সাথে আয়াতটি সম্পৃক্ত। অথচ এতে উলঙ্গ হয়ে তওয়াফ করার কথা কোথাও উল্লেখ নেই। বেশীর চেয়ে বেশী সূক্ষ্ম একটা ইঙ্গিত রয়েছে মাত্র। কিন্তু বক্তব্যের আনুপূর্বিক ধারাটা এমন ছিল যে, যারা মক্কাবাসীর সে অবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তাদের ধারণা শুধু সেদিকেই ধাবিত হতে পারত। অবশ্য পরবর্তী যুগের লোকদের বিষয়টি যথাযথ বুঝতে গিয়ে বিরাট জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তার কারণ, তাদের সামনে ছিল শুধুমাত্র বক্তব্যের আনুপূর্বিক যোগসূত্র; সে অবস্থা ও পরিবেশ তাঁদের সামনে ছিল না, যদ্দরুন এ আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। যদিও শব্দাবলী এবং বক্তব্যের আনুপূর্বিক যোগসূত্র যথার্থ উদ্দেশের প্রতি পথনির্দেশের জন্য অপর্যাপ্ত নয়, তবুও সেই সংগে পরিবেশ এবং পরিস্থিতিরও যদি সাহায্য পাওয়া যায়, তা হলে প্রকৃত বাস্তবতা আপনিই সামনে এসে যায়।
উল্লিখিত আয়াতটির সাথে সাথেই বলা হয়েছে:
يُبَنِّى أَدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ - قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرزق - (اعراف ۳۱ - ৩২)
হে আদম সন্তানগণ! প্রত্যেকবার মসজিদে সমবেত হওয়ার সময় তোমরা উত্তম সজ্জা গ্রহণ করে নাও এবং পানাহার কর আর অপব্যয় করো না। কারণ, আল্লাহ অপব্যয়ীকে পছন্দ করেন না। তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, কে হারাম করল আল্লাহ্র সাজ সজ্জাকে, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র রুজিকে, যা তিনি বান্দাদেরকে দান করেছেন?
এ আয়াতটিও উপরোল্লিখিত বিষয়ের সাথেই সম্পৃক্ত। এতে উলঙ্গ তওয়াফ করার আসল দর্শনটা বুঝা যাচ্ছে যে, আরবদের এই বোকামিসুলভ কাজটি তাদের অন্যান্য বহু কাজের মতই প্রকৃতপক্ষে একটা আবেগ নির্ভর আচরণ ছিল। এই নির্লজ্জ কাজটি তারা এজন্যে গ্রহণ করেছিল যে, তারা একে বৈরাগ্য ও পরহেযগারী বলে ধারণা করত। তাদের ধারণায় পোশাক-পরিচ্ছদ হল দাম্ভিকতা ও শোভ-সৌন্দর্যের বস্তু-সামগ্রী। কাজেই তারা তওয়াফের সময় তা খুলে ফেলত, যাতে আল্লাহর ঘরের তওয়াফ সেই পার্থিব মলিনতা থেকে পবিত্র থাকে। কোরআন মজীদ উল্লিখিত আয়াতে তাদের সে ধারণার খন্ডন করেছে যে, আল্লাহ্-ভক্তির এহেন ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত যে, আল্লাহ যেসব নেয়ামত বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো মানুষ নিজের জন্যে হারাম করে রাখবে। বরং এই নেয়ামতসমূহের দ্বারা উপকৃত হওয়া উচিত। কারণ, সেগুলো সৃষ্টির উদ্দেশ্যই আল্লাহ্ বান্দাদের উপকার সাধন। অবশ্য অপব্যয় নাজায়েয। এ থেকে বেঁচে থাকা কর্তব্য।
বলাবাহুল্য, উক্ত আয়াতের যথার্থ মর্ম অনুধাবন করতে পারা উলঙ্গাবস্থায় তওয়াফ করার দর্শনটির অবগতির ওপর নির্ভরশীল, যদিও এই দর্শনটি আয়াতের শব্দাবলী থেকেই বেরিয়ে আসছে। বরং এ বিষয়টি মেনে নেয়া ছাড়া আয়াতটির কোন যথার্থ ব্যাখ্যা করাই সম্ভব নয়। কিন্তু এর শব্দগুলোতে এমন ব্যাপকতা রয়েছে, যদি বিষয়গুলো সামনে না থাকে এবং বক্তব্যের পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রতি লক্ষ্য না করে, তা হলে আয়াতটির যথার্থ উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌছুতে গিয়ে যথেষ্ট অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু যাঁদের সামনে এসব কার্যকলাপ এবং দর্শন উভয়টিই রয়েছে, তাঁদের পক্ষে আয়াতটি বুঝতে গিয়ে কি অসুবিধা থাকতে পারত? উপাখ্যান যেহেতু নিজেদেরই ছিল, তাই কথাটি মুখ দিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথে তার যাবতীয় তাৎপর্য আয়নার মত সামনে এসে উপস্থিত হয়ে গেল। এমনি করে সূরা বাকারায় হজ্জের আহকাম বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
فَإِذَا قَضَيْتُمُ مُّنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُوا اللهَ كَذِكْرِكُمْ أَبَاءَكُمْ أَوْ أَشَدُّ ذِكْرًا . (بقرة - ٦٠٠)
- হজ্জের যাবতীয় ফরযগুলো যখন সম্পাদন করে ফেলবে তখন আল্লাহকে স্মরণ করো, যেমন করে স্মরণ করতে নিজেদের পিতা-পিতামহের কথা, বরং তার চেয়েও বেশী করে স্মরণ করো।
পূর্ববর্তী ওলামা-মনীষীদের কাছ থেকে আমাদের কাছে كذكر كم اباءكم এর যে ব্যাখ্যা এসে পৌঁছেছে, তাতে বলা হয়েছে:
وكانوا اذا قضوا مناسكهم وقفوا بين المسجد بمنى وبين الجبل فبعد دون فضائل اباء هم ويذكرون محاسن ايامهم .
হজ্জের আরকান ও ফরযসমূহ সম্পাদন শেষে লোকেরা মিনায় অবস্থিত মসজিদ এবং পাহাড়ের মাঝামাঝি এক জায়গায় বসে পড়ত এবং নিজেদের পিতা- পিতামহের গৌরব ও তাদের কৃতিত্বের কথা বর্ণনা করত।
আয়াতের শব্দাবলী যদিও উল্লিখিত বিবরণের দিকে ইঙ্গিত করেছে, কিন্তু এই ইঙ্গিত ধরে নেয়া তাদের পক্ষে সহজ নয় যারা পরিস্থিতি, ঘটনাস্থল এবং আরবদের রুচি সম্পর্কে পুরোপুরিভাবে ওয়াকিফহাল নয়। অবশ্য যারা কোরআন নাযিলের সময় উপস্থিত ছিলেন এবং তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তাঁদের পক্ষে বিষয়টি বুঝা মোটেই কঠিন নয়।
তেমনিভাবে যেকোন কালের কথা ও বক্তব্য তখনকার অসংখ্য কৃষ্টিগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের সাথে জড়িত থাকে। ফলে সে কথাটির প্রকৃত সৌন্দর্য, তার যথার্থ বলিষ্ঠতা তখনও পর্যন্ত উপলব্ধি করা যায় না, যতক্ষণ না সে কথা বা বক্তব্যের পরিবেশ নিজের আশেপাশে তৈরী করে নেয়া যায়। যেমন, কোরআনের এক জায়গায় বলা হয়েছে:
إِنَّمَا اتَّخَذْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَوْثَانًا مُوَدَّةً بَيْنَكُمْ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا ثُمَّ يَوْمَ الْقِيمَةِ يَكْفُرُ بَعْضُكُمْ بِبَعْضٍ وَ يَلْعَنُ بَعْضُكُمْ بَعْضًا وَمَأْوَاكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِّن نَّاصِرِينَ -
তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে পারস্পরিক বন্ধুত্বের জন্য পার্থিব জীবনে অন্য আশ্রয় বানিয়ে নিয়েছ। অতঃপর কেয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরকে অভিসম্পাত করবে। বস্তুত তোমাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম, আর তোমাদের কোন সহায় থাকবে না।
ا مُوَدَّةً بَيْنَكُمْ فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا - এ আয়াতে ( سُورَةً প্রয়োজন। এতে তৎকালীন রাজনীতির একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা বুঝতে না পারলে আয়াতটির ব্যাখ্যায় কোন কোন অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক আবরণমুক্ত হতে পারে না।
আরব এবং অন্যান্য পৌত্তলিক জাতিসমূহে পৌত্তলিকতাটা শুধু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসই ছিল না, বরং তাদের যাবতীয় রাজনৈতিক এবং সামগ্রিক সম্পর্কও এরই সাথে জড়িত ছিল। ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের পৃথক পৃথক মূর্তি ছিল এবং প্রচলিত নিয়ম ছিল। কোন্ গোত্র যখন অন্য কোন গোত্রের সাথে ঐক্য স্থাপন করতে চাইত, তখন তারা সে গোত্রের মূর্তির উপাসনায় অংশ নিত। আবার যখন কোন গোত্র অপর গোত্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইত, তখন এই বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা করে দিত। এরপরে পারস্পরিক সমস্ত রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যেত। লক্ষ্য করার বিষয়, যাঁদের সামনে বাস্তব এই পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল, তাদের পক্ষে এ আয়াতের মর্ম উপলব্ধি করতে কি অসুবিধা হতে পারে? শুনল আর বুঝে নিল। কিন্তু আমরা, যতক্ষণ পর্যন্ত সে সময়কার রাজনীতি সম্পর্কে সম্যক অবগত হতে না পারব, এই শব্দসমষ্টির তাৎপর্য কিংবা এতে যে বলিষ্ঠতা রয়েছে তার কি বুঝব?
এ বিষয়টিরই বিশ্লেষণকল্পে সূরা বাকারার সে আয়াতটিও একটি চমৎকার উদাহরণ, যা মদ্যপান ও জুয়ার নিষেধাজ্ঞা প্রসংগে অবতীর্ণ হয়েছে। বলা হয়েছে:
وَيَسْتَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمَ كَبِيرٌ وَ مَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَاثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَّفْعِهِمَا - (بقره - ২১৯)
তারা তোমার কাছে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এগুলোতে মহাপাপ রয়েছে এবং মানুষের জন্যে কিছু উপকারিতাও বটে। তবে সেগুলোর পাপ উপকারিতার তুলনায় অনেক বেশী।
এ আয়াতটি সম্পর্কে একটি সাধারণ ভুল বুঝাবুঝি রয়েছে। মানুষ মনে করে, মদ্যপান ও জুয়ার যে উপকারিতার কথা কোরআন স্বীকার করেছে, সেগুলো তাদের চিকিৎসা বিষয়ক এবং ব্যক্তিগত। অথচ কথাটি কোনক্রমেই ঠিক নয়। কোরআন যে উপকারিতার কথা স্বীকার করেছে, তা হচ্ছে তাদের কৃষ্টিগত, নৈতিক ও সামাজিক উপকারিতা। কোন বস্তুর চিকিৎসা বিষয়ক এবং ব্যক্তিগত উপকারিতা একে তো কোরআনের আলোচ্য বিষয় নয়, দ্বিতীয়ত যদি মদে কিছু উপকারিতা থেকেও থাকে, তবে দুনিয়ার এমন কোন্ ক্ষতিকর বস্তুটি রয়েছে, যাতে উপকারিতারও একটা না একটা দিক বিদ্যমান নেই? তা হলে মদ আর জুয়ার ভেতরে এমন কি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যার জন্য কোরআন মজীদকে সেগুলোর হারাম হওয়ার কথা ঘোষণা করতে গিয়ে সেগুলোর উপকারিতার বিষয়টিও স্বীকার করতে হবে? অন্যান্য বহু বস্তু হারাম করা হয়েছে। সেগুলো কি সম্পূর্ণভাবেই উপকারিতা বিবর্জিত ছিল? তা যদি না হয়ে থাকে, তবে সেগুলোর সম্পর্কে এই স্বীকৃতি দেয়া হল না কেন? শূকরের মধ্যে কি উপকারিতার কোন একটি দিকও ছিল না?
আমাদের মতে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এ ভুলের সংশোধনকল্পে অবশ্য আয়াতে উল্লিখিত نفع ও اثم (নাফা ও ইম্) দুটি শব্দের তুলনাই যথেষ্ট। যদি বিষয় দুটির ব্যক্তিগত উপকারিতা-অপকারিতার প্রতি ইঙ্গিত করা উদ্দেশ্য হত, তাহলে نفع (নাফা) বা উপকারিতার বিপরীতে ضرر (জরর) বা অপকারিতা কিংবা এরই সমার্থক কোন শব্দ আসত। اثم (ইম্) পাপ শব্দটি আসত না, যা কিনা আরবী ভাষায় দৈহিক অপকারিতা অথবা তার অর্থে ব্যবহৃত হয় না, বরং নৈতিক স্খলন বুঝাবার জন্যে ব্যবহৃত হয়।
কারও মনে হয়ত প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, মদ বা শরাব এবং চিকিৎসা কিংবা ব্যক্তিগত উপকারিতার বিষয়টি তো সহজই ছিল যে, তার কোন কোন দিক ছিল মোটামুটিভাবে জানা। কিন্তু সেগুলোর সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক উপকারিতা আবার কি, যা কোরআন স্বীকার করে নিয়েছেঃ এ প্রশ্নের যথার্থ উত্তর আজ কালকার লোকদের জন্য সম্যকভাবে হৃদয়ঙ্গম করা যথেষ্ট কষ্টকর। কারণ, যে মদ্যপান ও জুয়া খেলা আমাদের সামনে রয়েছে, তা আপাদমস্তক ক্ষতিকর ও হাঙ্গামা সৃষ্টির কারণ। এতে উপকারিতার সামান্যতম সম্ভাবনাটিও নেই। এগুলো শরীর, মন, ব্যক্তি, সমাজ সবার জন্যেই সমানভাবে অভিশাপ। অবশ্য আরবদের মধ্যে মদ্যপান ও জুয়ার সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক দিক দিয়ে একটি গুরুত্ব ছিল।
তাদের সমাজে এতদুভয় দুরাচারই সদাচারের পথ ধরে ঢুকত। তারা এ দুটি জিনিসকেই মেহমানদারী বা আতিথেয়তা এবং দানশীলতার সবচেয়ে বড় উপকরণ বলে জানত। সে কারণেই তারা সেসব লোককে অত্যন্ত হেয় দৃষ্টিতে দেখত, যারা মদ্যপান এবং জুয়া থেকে বিরত থাকত। যারা তৎকালীন সংস্কৃতি সম্পর্কে অবগত তারা আমাদের এই বিবৃতি অস্বীকার করতে পারেন না। জাহেলিয়াত আমলের যেকোন কবির কবিতা পড়লেই দেখা যাবে, তারা সে দুটি জিনিসকেই সবচেয়ে বড় নেকীর কাজ হিসেবে উপস্থাপন করবেন, যাকে আমাদের বর্তমান সমাজে সবচাইতে খারাপ বলে মনে করা হয়। কারণ, গরীবদের সহায়তা, আত্মীয়-বন্ধুদের আপ্যায়ন-অভ্যর্থনা, বেওয়া-বিধবাদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং অনাথ-এতীমদের সাহায্যের সবচেয়ে বড় ব্যবস্থা এ দুটি বিষয়ের মাঝেই নিহিত ছিল।
আরবের অতিথিপরায়ণ এবং সুরাসক্তদের রীতি ছিল, শীতের সময়ে যখন আরবে প্রায়ই দুর্ভিক্ষ দেখা দিত, তখন তারা মদ্যপানের আসর বসাত এবং শরাবের নেশায় বিভোর হয়ে বহু মূল্যবান উট জবাই করে সেগুলোর মাংস একত্রে স্তূপীকৃত করে সেগুলোকে বাজিতে লাগিয়েই জুয়া খেলত এবং যারা জিতত তারা মাংসগুলো গরীব- দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করে দিত।
জুয়া এবং শরাবের এই ছিল মহিমা, যার ভিত্তিতে কোরআনে যখন সেগুলো হারাম ও নিষিদ্ধ হওয়ার নির্দেশ অবতীর্ণ হয়, তখন মানুষ অবাক হয়ে যায় যে, এমন একটা জনহিতকর উপকারী বিষয়কে ইসলাম হারাম করল কেন? কোরআন তাদের উত্তরে এ বিষয়টি অবশ্য স্বীকার করে নিল যে, শরাব এবং জুয়ায় কোন কোন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উপকারিতা অবশ্যই আছে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ সত্যটিও প্রকাশ করে দিয়েছে যে, এগুলোর সাংস্কৃতিক অপকারিতার তুলনায় এগুলোর উপকারিতার দিকটা অতি নগণ্য। সে কারণেই এগুলোকে নিষিদ্ধ ও হারাম করা যাচ্ছে।
এ বিষয়টিও স্মরণ রাখার যোগ্য যে, কোরআন মদ-জুয়ার আলোচনা অতিথি পরায়ণতার শিক্ষা প্রসঙ্গে করেছে, যাতে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, এ জিনিসগুলো আরবদের মধ্যে দুরাচার নয় বরং মহদাচারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা এগুলো শুধু ভোগ-বিলাস ও খেলাধুলা হিসেবেই গ্রহণ করেনি, বরং সমাজের একটা বিরাট মহিমা মনে করে গ্রহণ করেছিল।
এখন চিন্তা করা প্রয়োজন যে, এসব উপাখ্যান যাদের জানা ছিল, তাদের ( قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ ) (বলে দাও, এগুলোতে মহাপাপ রয়েছে এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারিতাও আছে।)-এর প্রকৃত তাৎপর্য পর্যন্ত পৌঁছতে জটিলতাটা কি ছিল, কিন্তু পরবর্তী যুগে যখন এ সমস্ত বিষয় দৃষ্টির অন্তরাল হয়ে গেছে, তখন ব্যাখ্যার এ দিকটি কেমন করে মানুষের সামনে আসতে পারত?
বিষয়টি আরও অধিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন মনে করলে সূরা নূরে লক্ষ্য করা যেতে পারে। তাতে সামাজিক সংস্কারের ব্যাপারে বেশ কতিপয় নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে। বাহ্যত সেগুলো বুঝতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু গভীরভাবে তলিয়ে সেগুলোর উদ্দেশ্য হৃদয়ঙ্গমের চেষ্টা করতে গেলে তৎকালীন সমাজের অবস্থা সম্পর্কে মনে প্রশ্ন জাগে এবং মনে হয়, বক্তব্য তার বিশ্লেষণের জন্য এসব বিষয়ে অবগতির অপেক্ষা রাখে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে যে পর্যন্ত বিস্তারিতভাবে পরিস্থিতিটি সামনে না আসে, মনের সন্দেহ দূর হয় না। তেমনি সূরা বারাআত প্রভৃতিকে হৃদয়ঙ্গম করতে হলে সে যুগের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বিপ্লব -আন্দোলন এবং সমস্ত ধর্মীয় দলগুলো সম্পর্কে অবগত হওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যা ইসলামের আর্বিভাবের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল।
যা হোক, প্রত্যেক যুগের বাণীতেই সে যুগের সংস্কৃতি, নৈতিকতা, রাজনীতি ও ধর্মের এমন সব তাৎপর্য নিহিত থাকে, যেগুলো জানা ছাড়া সেই বাণীর বহু গুণ-বৈশিষ্ট্য ও সূক্ষ্মতা পরিষ্কারভাবে বিকশিত হতে পারে না। বস্তুত এ বিষয়টি শুধু কোরআনের বেলায়ই প্রযোজ্য নয়, বরং যেকোন বাণীর বেলায়ই তাই। হোমার এবং শেক্সপিয়ারকে পরিপূর্ণভাবে বুঝতে হলেও তাই করতে হয়। বহু বাহ্যিক বিষয়ের সাহায্যে নিজেদের চারপাশে হোমার ও শেক্সপিয়ারের পরিবেশ সৃষ্টি করে নিতে চেষ্টা করি আমরাও। হোমার-শেক্সপিয়ার তো তবুও বহু প্রাচীন কাহিনী। তাদের সংস্কার আর আমাদের সংস্কারের ব্যবধান শুধু যুগেরই নয়, বরং উভয়ের বর্ণ-গোত্র এবং/দেশ-আবাসও বিভিন্ন। মীর এবং গালেবকেই ধরা যাক। তাঁরা তো আমাদের এ উপমহাদেশেরই কবি ছিলেন, কিন্তু তাঁদেরকে বুঝতে গিয়ে কি আমাদের সেসব বিষয়গুলোর মুখাপেক্ষী হতে হয় না।
আল-ইসলাহ-এর প্রথম সংখ্যায় ইমাম হামীদুদ্দীন ফারাহী (রঃ) প্রণীত 'কোরআনের বিন্যাস ও সংবিধান' শীর্ষক প্রবন্ধের নিম্নোদ্ভূত কয়েকটি লাইন গভীর মনোযোগসহ পড়া যেতে পারে।
১. কোরআন যে যুগে নাযিল হয়েছিল, তার সম্যক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা সম্পর্কে আমাদের অবহিত হওয়া প্রয়োজন।
২. আমাদের জানা প্রয়োজন, তখনকার ইহুদী, খ্রীস্টান, মুর্শিক ও অন্যান্যদের ধর্ম- বিশ্বাস কি ছিল।
৩. আমাদের প্রয়োজন আরবের সাধারণ সংস্কার-কুসংস্কারগুলো আবিষ্কার করা।
৪. আমাদের জানা প্রয়োজন, কোরআন নাযিল হওয়ার সময় নতুন কি কি ঘটনা ঘটেছিল এবং তাতে আরবদের বিভিন্ন দলের মধ্যে কি ক্রিয়া -প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। কি কি দেশী ও সামাজিক ঝগড়া সৃষ্টি হয়েছিল এবং গোটা আরবে কি আলোড়ন ঘটে গিয়েছিল?
৫. আমাদের আরও জানা দরকার, তখন আরবের সাহিত্য রুচি কি ছিল। তারা কোন্ ধরনের কথাবার্তা শুনতে এবং বলতে অভ্যস্ত ছিল। তখনকার আসর-বৈঠকে তাদের বক্তব্য কেমন করে উপস্থাপন করত। রহস্যজনক ও সংক্ষিপ্ত বিষয়সমূহ এবং ভাষার অলঙ্কার ও গঠন প্রভৃতি ব্যাপারে কোন্ প্রণালীকে তারা কেমন করে ব্যবহার করত?
৬. এবং অতঃপর আমাদের এ কথাও জানতে হবে যে, আরবদের ধারণায় নৈতিকতার ভাল ও মন্দের মাপকাঠি কি ছিল?

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 পূর্ববর্তী মনীষীদের তফসীর রীতি

📄 পূর্ববর্তী মনীষীদের তফসীর রীতি


উল্লিখিত কারণেই পূর্ববর্তী প্রবীণ ওলামা-মনীষীদের তফসীরের রীতি ছিল এই যে, তাঁরা সর্বপ্রথম কোরআনকে কোরআনের সাহায্যে বুঝতে চেষ্টা করতেন। তারপর কোন জটিলতা থেকে গেলে সেগুলোর সমাধান অনুসন্ধান করতেন হুযূর আকরাম (সঃ)-এর বাণী ও তাঁর কাজকর্মে। তারপরেও যদি কোন বিষয়ের কোন দিক বিশ্লেষণসাপেক্ষ রয়ে গেলে তার সমাধানের উদ্দেশে সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনা-বিবৃতির সাহায্য নিতেন। কারণ কোরআন মজীদ সেসব লোকের অবস্থা ও ঘটনাবলীর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে এবং যাদেরকে সে সর্বপ্রথম সম্বোধন করেছে, তাঁরা কোরআন মজীদের তত্ত্ব-রহস্য এবং তার ইঙ্গিত ও তাৎপর্যসমূহ যত সুন্দরভাবে বুঝতে পারতেন, তেমনটা আর কারও পক্ষে, বিশেষত, যাদের তখনকার অবস্থা সম্যকভাবে জানা নেই, সম্ভব ছিল না। সুতরাং আল্লামা সুয়ূতী তাঁর 'এক্কান'-এ তফসীরের নিয়ম বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন:
আলেমগণ বলেছেন, কেউ যদি কোরআন মজীদের তফসীর করতে চায়, তা হলে প্রথমে কোরআন মজীদের মাধ্যমেই তার তফসীর করা উচিত। এতে এক জায়গায় যে বিষয়ের বর্ণনা দুর্বোধ্যভাবে, রয়েছে অন্যত্র তার ব্যাখ্যা করে দেয়া হয়েছে। আর যে বিষয়টি একখানে সংক্ষিপ্ত অন্যত্র তা বিস্তারিত বলা হয়েছে। ইবনে জাওযী (রঃ) একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাতে কোরআনের সেসব আয়াতের ব্যাপারে প্রশ্ন করেছেন যেগুলো এক জায়গায় দুর্বোধ্য অন্যত্র বিস্তারিত। কিন্তু আমি দুর্বোধ্য বিষয়গুলোর ব্যাপারে সেগুলোর উদাহরণসমূহের প্রতি ইঙ্গিত করেছি। কোথাও তাতে ফল না হলে (অর্থাৎ কোরআনের তফসীর কোরআনেরই দ্বারা সম্ভব না হলে) সুন্নত বা হাদীসে তার তফসীর সন্ধান করতে হবে। কারণ, সুন্নত হল কোরআনের ব্যাখ্যাতা বা মুফাসসের। হযরত ইমাম শাফেয়ী (রঃ) বলেছেন, মহানবী (সঃ)-এর যাবতীয় সিন্ধান্তই পবিত্র কোরআন থেকে উদ্ভাবিত। 'আল্লাহ্ বলেছেন ا نا انزلنا اليك الكتاب....। হুযুর বলেন, আমাকে কোরআন দেয়া হয়েছে এবং তার সাথে তারই মত আরেকটি জিনিস অর্থাৎ সুন্নত। অতএব সুন্নতেও যখন তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না, তখন সাহাবাদের বাণীর প্রতি লক্ষ্য করতে হবে; তাঁরাই কোরআনের বিষয়ে সবচেয়ে বেশী অবগত। কারণ, তাঁরা কোরআনের অবতরণকালের সমস্ত অবস্থা ও রীতি-পদ্ধতিসমূহ স্বয়ং দেখেছেন। তদুপরি তাঁরা পরিপূর্ণ জ্ঞান-বুদ্ধি ও নেক আমলের গুণেও বিভূষিত ছিলেন।
তফসীরের এ রীতিটি সম্পূর্ণ প্রকৃতিগ্রাহ্য। আসল জিনিস হল কোরআনের শব্দাবলী এবং তার নিজের ব্যাখ্যা। তারপর মহানবী (সঃ)-এর সুন্নত। আর তৃতীয় পর্যায়ে সাহাবায়ে কেরামের বাণীসমূহ।
এতে এই সত্যটি পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, যাঁরা মহানবী (সঃ)-এর ব্যাখ্যা এবং সাহাবায়ে কেরামের বাণীসমূহের আলোকে কোরআন মজীদ বুঝতে চান, তাঁরা কোরআনের শব্দমালার গুরুত্ব বাতিল করতে চান না। ওপরে আমরা যেসব মতামত ও বাণী উদ্ধৃত করেছি, তাতে তফসীরের জন্য কোরআনের শব্দাবলী এবং তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণই মূল ভিত্তি সাব্যস্ত হয়। বলা হয়েছে (القرآن يفسر بعضه بعضا) কোরআনের এক অংশ অপর অংশের ব্যাখ্যাদান করে)। অবশ্য কোন বিষয় যদি কোরআন মজীদের বর্ণনাতে পরিষ্কার না হয়, তবে কি করতে হবে? যেকোন স্বাধীন চিন্তা-চেতনাসম্পন্ন লোকও এ প্রশ্নের এ উত্তরই দেবেন যে, এ ধরনের জটিলতার ক্ষেত্রে সবচাইতে উত্তম পথের সন্ধান দিতে পারে মহানবীর হাদীস ও সাহাবায়ে কেরামের বাণীসমূহ। যাঁর প্রতি কোরআন নাযিল হয়েছে এবং যাঁদের সংশোধন ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশে অবতীর্ণ হয়েছে, তাঁরা একে যতটা উত্তমভাবে বুঝতে পারেন, ততটা অন্য কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কিন্তু এই পথনির্দেশের পন্থা কি হবে?
তা হবে এই যে, একটি আয়াতের ওপর তার শব্দাবলীর আলোতে পরিপূর্ণভাবে লক্ষ্য করতে হবে, কোরআন মজীদে যে সমস্ত আয়াত উল্লিখিত আয়াতের অনুরূপ, সেগুলোর আলোকেও তা ভাল করে দেখে নিতে হবে, পূর্বাপর আয়াতের সাথে তার সামঞ্জস্য এবং ব্যাকরণিক গঠন- প্রকৃতির দিক দিয়েও বিচার-বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু এই সমস্তের পরেও পুরোপরি সন্তুষ্টি না এলে বুঝতে হবে, আয়াতের শব্দাবলী আরও একটা কিছু চাইছে। কিন্তু সে বিষয়টি যদি সাধারণভাবে অনুধাবন করা না যায় তবে এক্ষেত্রে আমরা মহানবী (সঃ)-এর হাদীস এবং সাহাবায়ে কেরামের বাণীর শরণাপন্ন হই। আর তাতে যদি এমন কোন বিষয় পেয়ে যাই, যাতে সে আয়াতের সমস্ত জটিলতা পরিষ্কার হয়ে যায়, তারপরে আর আয়াতের শব্দগুলোর মর্ম উদ্ধারের জন্য অন্য কোন কিছুর অপেক্ষা থাকে না। ব্যাকরণিক গঠন ও অগ্রপশ্চাৎ সম্পর্কের যাবতীয় চাহিদাই পূর্ণ হয়ে থাকে, তবে সে বিষয়টি যদি যথার্থ ও বিশুদ্ধভাবে উদ্ধৃত হয়ে থাকে, তা হলে আমরা তা গ্রহণ করব।
পক্ষান্তরে আয়াতের শব্দাবলী কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখুক আর নাই রাখুক, কোন কথা রেওয়ায়েতের সংগ্রহে দেখতে পেলেই খামাখাই এনে তার সাথে লাগিয়ে দেব না অথবা গঠন ও আনুপূর্বিক সংযোগ, সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়াত, হাদীস ও সাহাবায়ে কেরামের বাণীর প্রকাশ্য বিরোধী হলে তা গ্রহণ করব না। এ ধরনের বাড়াবাড়ির কারণেই মানুষের মধ্যে হাদীস ও পূর্বর্তী বর্ণনাসমূহের প্রতি একটা খারাপ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে এবং এমন সব ধারণার বিস্তার ঘটেছে, যা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করে এসেছি। যাঁরা অনুসন্ধান -গবেষণা করেন, কোন কালেই তাঁদের এ ধর্ম ছিল না। তাঁরা কোরআনের তফসীরের ব্যাপারে সর্বদা কোরআনকেই অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছেন।
অবশ্য কোন বিষয় বিশ্লেষণসাপেক্ষ হলে এবং সঠিক হাদীস ও পূর্ববর্তী বর্ণনার দ্বারা তার বিশ্লেষণ হয়ে গেলে তাঁরা তাতেই সন্তুষ্ট থাকতেন। আর এটা এমন একটা ব্যাপার যার বৈধতা সম্পর্কে কারো কোন দ্বিমত নেই।
এখন রইল, এই হাদীস অথবা 'আসার'গুলোকে একান্তভাবেই শুদ্ধ ও প্রমাণিত হতে হবে; মওজু বা জাল হলে চলবে না। বস্তুত এটাও এমন একটা বিষয়, যার ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। আমাদের ওলামা সম্প্রদায় নিজেরাও বিষয়টির গুরুত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এতকানে আছেঃ
তফসীরের কয়েকটি উৎস রয়েছে। তন্মধ্যে চারটি মূলনীতিস্বরূপ। প্রথমত, সেসব উদ্ধৃতি, যা মহানবী (সঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং এটাই অগ্রগণ্য। কিন্তু এতে দুর্বল ও মওজু থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব। কারণ, এ ধরনের রেওয়ায়েত সংখ্যা বিপুল। সে কারণেই ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বলেছেন, তিনটি বিষয় আছে, যার কোন আমল নেই; তফসীর, মালাহেম ও মাগাজী।
একথা কেউই বলেন না যে, শুদ্ধাশুদ্ধ সব রকমের রেওয়ায়েতের ওপরই বিশ্বাস করতে হবে। বরং সবাই বলেন যে, পরিপূর্ণ যাচাইয়ের পর যেসব রেওয়ায়েতই গ্রহণযোগ্য বেরোবে এবং বর্ণনা ও ব্যবহারের সমস্ত মূলনীতিতে যাচাই করার পর যথার্থভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে, শুধু সেসব রেওয়ায়েতই গ্রহণ করা যেতে পারে। আমরা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এই মত স্থির করেছি যে, শুদ্ধ রেওয়ায়েত এবং কোরআনের মধ্যে কোন বিরোধ নেই; বরং কোরআন মজীদের সবচেয়ে উত্তম তফসীরই হচ্ছে শুদ্ধ রেওয়ায়েত, প্রমাণিত 'আসার' এবং মহানবী (সঃ) যা কিছু করেছেন, যা কিছু বলেছেন তার সবই কোরআন থেকে নির্গত। ওপরে প্রসঙ্গক্রমে হযরত ইমাম শাফেয়ীর একটি উদ্ধৃতি বর্ণিত হয়েছে যে, হুযুর (সঃ) যত বিচার-মীমাংসা করেছেন, সবই কোরআন মজীদ থেকে নেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে:
قال الشافعي (رح) كلما حكم به رسول الله صلى الله عليه وسلم فهو مما فهمه من القرآن .
এমতাবস্থায় কোরআন এবং হাদীসের মাঝে বিরোধ হবে কেমন করে? সাধারণত মানুষ হাদীসের বিরাট সংগ্রহের মধ্যে শুধু এতটুকু অংশকেই কোরআন সম্পর্কিত বলে মনে করে, যা 'তফসীর পরিচ্ছেদ' শিরোনামে সংযোজিত রয়েছে। আর বাকী অংশকে কোরআনের সাথে সম্পর্কহীন বলে মনে করে। পক্ষান্তরে হাদীস সম্পূর্ণভাবেই কোরআনের জ্ঞান। হাদীসের ওপর যদি গভীরভাবে লক্ষ্য করা যায়, তাহলে হাদীস ও কোরআনের যে গভীরতর সম্পর্ক, তা অতি পরিষ্কারভাবে সামনে এসে যায়।
তথাপি হাদীসের মান মূলের মত নয় বরং শাখার মত। মূল হচ্ছে কোরআন মজীদ। এটি যেমন পূর্ববর্তী সমস্ত কিতাবসমূহের জন্য কষ্টি পাথরের মত, তেমনিভাবে পরবর্তী সমস্ত কিতাবের জন্যও। কখনও কোন রেওয়ায়েত এবং আয়াতের মধ্যে কোন রকম বিরোধ দেখা দিলে আয়াতের কোন রকম রূপক বিশ্লেষণ করা চলবে না, কিন্তু, রেওয়ায়েতের ব্যাখ্যা করা চলবে। আয়াত যথাস্থানে বহাল থাকবে। কোরআন গবেষকদের রীতি সব সময়ই তাই ছিল। মসুখ বা রহিতকরণ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী (রঃ)-এর মত ফেকাহশাস্ত্রের মূলনীতি বিষয়ক সমস্ত কিতাবেই বর্ণিত রয়েছে। তাঁর মতে সুন্নাহ্ কখনই কোরআন মজীদের কোন আয়াতকে রহিত করতে পারে না। অবশ্য এ মতের বিরোধীরা এ বিষয়টি নিয়ে তাঁর প্রচুর সমালোচনা করেছেন। এমনকি 'মুসাল্লামুস্ সুবৃত' গ্রন্থের ব্যাখ্যাতা একে অন্যায় বাড়াবাড়ি পর্যন্ত বলেছেন। কিন্তু প্রকৃত ও যথার্থ মত এটাই।
'ফেকাহশাস্ত্রের মূলনীতি' গ্রন্থে ইমাম সাহেবের যুক্তি-প্রমাণাদি উদ্ধৃত রয়েছে। এ শাস্ত্রে তাঁর নিজেরও রচনা রয়েছে। তাতেও তিনি নিজ মতামত সম্পর্কে যুক্তি-প্রমাণ উত্থাপন করেছেন। আল্লামা আমুদীও তাঁর কিতাবে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বরং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রঃ) এবং অধিকাংশ আলেমের মতও তাই, যাঁরা হাদীস ও রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন। কাজেই ফেকাহশাস্ত্রের ওলামা ও তর্কশাস্ত্রের পন্ডিতদের মত আলাদা হতে যাবে কেন?
যা হোক, হাদীসসমূহকে এই মর্যাদায় রেখে যদি কোরআন মজীদ বুঝতে চেষ্টা করা হয়, তা হলে তাতে কোরআন বুঝার ব্যাপারে যথেষ্ট মূল্যবান সাহায্য লাভ হবে। কোন রকম জটিলতাই সৃষ্টি হবে না। আমাদের মতে, হাদীসকে উল্লিখিত মর্যাদা থেকে বাড়িয়ে দেখা অনেকটা বাড়াবাড়ি এবং এর চাইতে নীচে নামানো দুর্ভাগ্য ও আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল। যারা ইদানীং হাদীসসমূহকে বাদ দিয়ে কোরআন বুঝতে চান, তাঁদের তুলনা সেই যৌবনোন্মত্ত চপল যুবকের মত, যে কোন নৌকা-ভেলা ছাড়াই মহাসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ে আর মনে মনে ধারণা করে, সাঁতরেই এ সাগর পাড়ি দেবে! এই দুঃসাহস বাহ্হ্বার যোগ্য হতে পারে, কিন্তু প্রকারান্তরে তা আত্মহত্যারই নামান্তর, যা আল্লাহ কখনই ক্ষমা করবেন না।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 শানে নুযূল

📄 শানে নুযূল


ওপরে রেওয়ায়েত ও হাদীস সম্পর্কে আমরা যে মৌলিক আলোচনা করেছি, তা রেওয়ায়েত ও কোরআন মজীদের মধ্যকার সম্পর্ক পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বিশেষভাবে শানে নুযূল সম্পর্কে মানুষের মনে এমন কিছু কিছু প্রশ্নের উৎপত্তি হয়, যেগুলো দূরীকরণকল্পে সে মৌলিক আলোচনার পরেও বিষয়টির বিশেষ বিশেষ দিকগুলো সামনে রেখে কয়েকটি ছত্র লেখে দেয়া প্রয়োজন।
তফসীরের কিতাবসমূহের স্পষ্ট পর্যালোচনা করতে গিয়ে সাধারণত একটা জটিলতার সম্মুখীন হতে হয় যে, প্রায় সব আয়াতের নীচেই শানে নুযূল হিসাবে একটা না একটা ঘটনা বিবৃত থাকে। বরং কোন কোন সময় একই আয়াতের শানে নুযূল হিসেবে একাধিক ঘটনাও বর্ণনা করা হয়। পক্ষান্তরে, অনেক সময় সেসব ঘটনার মধ্যে বিরোধ, এমনকি বৈপরীত্যও দেখা যায়। আর সাধারণত এসব ঘটনা এমন বিস্ময়কর এবং আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এতই বৈসাদৃশ্যপূর্ণ, যা মানতে মন সংকোচ বোধ করে। এ ধরনের রেওয়ায়েত বা উদ্ধৃতি সম্পর্কে মানুষের মনে দু'রকমের সংশয় রয়েছে। প্রথমত এসব ঘটনার অধিকাংশই এমন, যার সাথে মূলত আয়াতের কোন সম্পর্কই নেই। দ্বিতীয়ত যদি প্রতিটি আয়াত সম্পর্কেই এক বা একাধিক ঘটনাকে শানে নুযূল মেনে নেয়া হয়, তা হলে কোরআন মজীদে নিয়ম-শৃঙ্খলা বা ক্রমবিন্যাসের অন্বেষণ অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, শৃঙ্খলার দাবী হল ধারাবাহিকতা। অথচ প্রত্যেকটি আয়াতেরই কোন বিশেষ ঘটনার সাথে সম্পর্ক থাকাটা এই ধারাবাহিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ সন্দেহটি সূরা আন'আম-এর তফসীর করতে গিয়ে হযরত ইমাম রাযী (রঃ)-এর মনেও উদয় হয়েছিল এবং তিনি তার কোন সন্তোষজনক উত্তর না দিয়েই এগিয়ে গিয়েছেন। সুতরাং - واذا جاءك الذين يؤمنون بايتنا আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে তিনি লেখেছেন:
এখানে আমার সামনে একটা জটিল প্রশ্ন রয়েছে। তা হল, সবই এ ব্যাপারে একমত যে, পূর্ণ এই সূরাটিই একবারে নাযিল হয়েছে। ঘটনা যদি তাই হয়,, তবে সূরাটির প্রত্যেকটি আয়াত সম্পর্কে একথা বলা কেমন করে সম্ভব হতে পারে যে, এটি অমুক ঘটনা প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে?
প্রথম প্রশ্নটির সমাধানকল্পে পূর্বোক্ত কোন কোন আলোচনাই যথেষ্ট। অর্থাৎ, তফসীরের প্রকৃত মূলনীতি হচ্ছে, রেওয়ায়েতের আগে মূল আয়াতের শব্দাবলী এবং আনুপূর্বিক বিন্যাস ও ধারাবাহিকতার বিষয় চিন্তা করা। শব্দগুলো যদি তার উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করে দেয়, আয়াতের যথার্থ বিশ্লেষণ যদি বাইরের কোন সাহায্য ছাড়াই পরিষ্কার হয়ে যায়, বিন্যাস যদি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের যাবতীয় শর্ত মোতাবেক হয়ে থাকে, তা হলে এমন কোন ঘটনা আয়াতের সাথে খাটিয়ে দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই, যা তার বিন্যাস ও ধারাবাহিকতা বিধ্বস্ত করে দেয় এবং সুব্যাখ্যাকে আহত করে। অবশ্য শানে নুযূল যদি আয়াতের পরিচ্ছন্ন ও যথার্থ বিশ্লেষণের সমর্থন যোগায়, তা হলে তা অতিরিক্ত আত্মতুষ্টি ও প্রশান্তির কারণ হতে পারে। এ বিষয়টি উপেক্ষা করার কোন কারণও নেই। বিষয়টি উদাহরণের মাধ্যমে এভাবে উপলব্ধি করা বাঞ্ছনীয় যে, একজন চিকিৎসক যেমন একটা ব্যবস্থাপত্র দেখে তার অংশগুলো এবং সেগুলোর পারস্পরিক গঠনবিন্যাস লক্ষ্য করেই বুঝে নিতে পারেন, তা কোন্ রোগের জন্য লেখা হয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে কোরআন মজীদের একজন শিক্ষার্থীকেও আয়াতের উদ্দেশ্যসমূহ, তার অংশসমূহ এবং সেগুলোর পারস্পরিক বিন্যাস লক্ষ্য করে সূরার শানে নুযূল স্বয়ং সূরার ভেতর থেকেই বের করে নেয়া কর্তব্য। অতপর অতিরিক্ত সন্তুষ্টি ও পরিতৃপ্তির লক্ষ্যে সেসব ঘটনাপঞ্জির প্রতি লক্ষ্য করা উচিত, যা শানে নুযূল হিসেবে আয়াতের প্রসংগে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে দুর্বল ও অসমর্থিত রেওয়ায়েতের দ্বারা বিভ্রান্তির আশঙ্কা নেই। তখন কোরআনের আলোই সঠিক পথের দিশা দেবে। যেসব রেওয়ায়েত সঠিক, সেগুলোতে কোন সংশয় সৃষ্টি না হয়ে বরং পরিতুষ্টি ও প্রশান্তি লাভ হবে। পক্ষান্তরে যেসব রেওয়ায়েত সঠিক নয়, সেগুলো আপনা থেকেই সরে যাবে।
ওপরে হযরত ইমাম রাযী (রঃ)-এর যে সন্দেহটির উল্লেখ করা হয়েছে, তাও তেমন একটা জোরালো নয়। গবেষকদের যেসব উত্তর তফসীরের মূলনীতি বিষয়ক গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে, তাতেই তার সমাধান হয়ে যায়। অতএব, আল্লামা সুয়ূতী (রঃ) এ ধরনের সন্দেহের উত্তরে লেখেছেন:
জারাশী (রঃ) তাঁর 'বোরহান' নামক গ্রন্থে লেখেছেন, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীনদের একটা সাধারণ রীতি ছিল যে, যখনই তাঁদের মধ্যে কেউ বলতেন, "এ আয়াতটি অমুক বিষয়ে নাযিল হয়েছে", তখন তার অর্থ এই হত যে, এ আয়াতে অমুক বিষয়ের নির্দেশও রয়েছে। এর এই অর্থ হত না যে, হুবহু অমুক ঘটনাই আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ। সে আয়াতের দ্বারা যেন বিষয়টির যথার্থতা প্রমাণ করা হয়েছে। ঘটনার উদ্ধৃতি নয়।
এ প্রসঙ্গে হযরত শাহ ওলীউল্লাহ দেহলভী (রঃ)-এর গবেষণাও তাই। তিনি 'ফওযুল কবীর' গ্রন্থে লেখেছেন:
সাহাবী ও তাবেয়ীগণের বর্ণনা সংগ্রহ থেকে যা বুঝা যায়, তা হচ্ছে- نزلت في كذا অর্থাৎ এ আয়াত অমুক ঘটনা উপলক্ষে নাযিল হয়েছে মন্তব্য শুধুমাত্র হুযুরে আকরাম (সঃ)-এর সময়ে সংশ্লিষ্ট আয়াতটির বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ঘটনাবলীর ব্যাপারে ব্যবহৃত হত। ما صدق عليه اية বলে যেসব ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোই হচ্ছে ঐ সমস্ত ঘটনাবলী সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মহানবী (সঃ) যেগুলোর উল্লেখ করেছেন। সুতরাং সেসব ঘটনার সাথেই এ আয়াতকে সংশ্লিষ্ট মনে করা ঠিক হবে না। শানে নুযূল সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোর দ্বারা এ কথা কখনও বুঝা যায় না যে, এ আয়াত বা সূরা শানে নুযূলে বর্ণিত ঘটনা বা ব্যক্তি সম্পর্কেই নাযিল হয়েছে। বরং পারিপার্শ্বিক যেসব অবস্থা সংশোধনার্থ সংশ্লিষ্ট আয়াত বা সূরায় জোর দেয়া হয়েছে, ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সেসব ঘটনাই শানে নুযূল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অতএব, সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ মত হল, শানে নুযূল সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোকে আয়াত বা সূরার মর্ম উদ্ধারের সহায়ক হিসেবে গণ্য করা। কেননা, কোরআনের প্রত্যেকটি নিদর্শন ও বক্তব্যই সর্বজনীন আবেদনে সমৃদ্ধ। দেশ-কাল ও পাত্রের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র মানব জাতির জন্য যেহেতু কোরআনের আবেদন, সেহেতু বিশেষ বিশেষ ঘটনাকেন্দ্রিক তফসীর বা ব্যাখ্যা কোন অবস্থাতেই সংগত হবে না। (সংক্ষেপিত)
وانزلت فنزلت 271 فانزل الله قوله نزلت في كذا تك প্রভৃতি পরিভাষার মর্ম সাহাবা ও তাবেয়ী (রঃ)-গণের দৃষ্টিতে কি ছিল এবং শানে নুযূল সম্পর্কে তফসীরের কিতাবগুলোতে যেসব রেওয়ায়েত বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলোর অবস্থাই বা কি তা বুঝা যাচ্ছে। বুঝা যাচ্ছে সেগুলোর মর্যাদা কি, উদ্ভাবন, প্রমাণ উপস্থাপক আর আনুপূর্বিক সম্পর্ক স্থাপনের, নাকি উদ্ধৃতি কিংবা নকলের। প্রশ্নও এখান থেকেই ওঠেছিল। মানুষ বুঝে নিয়েছিল যে, যে আয়াত সম্পর্কে বলা হয়, نزلت في كذا (অমুক বিষয়ে অবতীর্ণ) তখন তাতে তাঁদের উদ্দেশ্য থাকে, হুবহু এ ঘটনাটিই এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ। কিন্তু ওপরে আল্লামা জারাক্শী এবং হযরত শাহ ওলীউল্লাহ দেহলভী (রঃ)-এর যে মতামত উদ্ধৃত করা হয়েছে, তাতে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয়ে গেছে যে, نزلت في كذا কিংবা فانزل الله تعالى প্রভৃতি পরিভাষার উদ্দেশ্য তা নয়, যা সাধারণত লোকেরা বুঝে, বরং এটা প্রমাণ উপস্থাপন ও উদ্ভাবন পর্যায়ের একটা বিষয়। অর্থাৎ, এসব পরিভাষার উদ্দেশ্য হচ্ছে এ আয়াত দ্বারা অমুক বিষয়টি উদ্ভাবিত হয় কিংবা অমুক বিষয়টি প্রমাণ করে। এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জেনে নেয়ার পরে সমস্ত প্রশ্ন ও সন্দেহ আপনা থেকেই শেষ হয়ে যায়।
তফসীর এবং শানে নুযূলের কিতাবসমূহে কোন কোন সময় একই আয়াতের নাযিল হওয়ার কারণ হিসেবে এমন কোন ঘটনা বর্ণনা করা হয়, যার সংঘটনকাল ও আয়াতের অবতরণকাল কোনক্রমেই এক হতে পারে না। আবার অনেক সময় সূরাটি দেখা যায় মদীনায় অবতীর্ণ আর যে ঘটনাটি বর্ণিত হয়ে থাকে, তা হচ্ছে মক্কার জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। তেমনিভাবে কখনও আয়াত হয় মক্কী আর সম্পৃক্ত ঘটনা হয় মদীনার। বরং কোন কোন শানে নুযূল এমনও দেখা যায়, যেগুলোর সংঘটনকাল এবং সে সম্পর্কিত আয়াতটির অবতরণকালের মধ্যে বহু কালের ব্যবধান রয়ে গেছে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থী যদি এ কথা না জানে যে, সাহাবায়ে কেরام ও তাবেয়ীন (রঃ)-এর দৃষ্টিতে শানে নুযূলের প্রকৃত অর্থটা কি, তা হলে পড়তে গিয়ে তাকে প্রচুর অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। বরং তাকে সন্দেহ-সংশয়ের কিংবা অস্বীকৃতির এমন সব অবস্থার সাথে সংগ্রাম করতে হয়, যার বর্ণনা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতদসত্ত্বেও আমরা একথা অস্বীকার করি না যে, শানে নুযূলের ব্যাপারে মানুষ প্রচুর বাড়াবাড়ি করেছে। হয়ত বা এমন কোন আয়াত খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার নীচে কোন একটা কাহিনী উদ্ধৃত করে দেয়া হয়নি এবং হয়ত সাধারণত সেসব কাহিনী এমন ভিত্তিহীন যা হাদীসবেত্তা মনীষীদের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। কোরআন শিক্ষার্থীদেরকে এসব কাহিনীতে জড়ানো উচিত নয়। বরং এটা কোরআন শিক্ষার পক্ষে অনেক সময় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী কোরআনের বিন্যাস বিষয়ে অন্বেষণ করেন (বস্তুত যা কোরআন বুঝার প্রকৃত পথ), তাদের জন্য এসব গল্প-কাহিনীর চাইতে বেশী বাধা দ্বিতীয় একটি নেই। হযরত ইমাম রাযীর মনে যে প্রশ্ন উদয় হয়েছিল এবং যা আমরা বর্ণনা করেছি, তাও এ ধরনের অলীক কাহিনীরই ফসল। এমন ধরনের গল্প-কাহিনীসহ কোন শিক্ষার্থীর পক্ষে প্রকৃত তথ্যের সন্ধান করা সম্ভব নয়।
এ উপলব্ধিটি শুধু আমাদেরই নয়, বরং হযরত শাহ ওলীউল্লাহ দেহলভী (রঃ)-এরও ছিল। তিনি বলেছেন:
এটা জানবার বিষয় যে, শানে নুযূলের বিরাট অংশেরই কোরআন বুঝার সাথে কোন সম্পর্ক নেই। এর কার্যকরী অংশ অতি অল্প। আর মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক কালবী যে বাড়াবাড়ি করেছেন এবং প্রতি আয়াতের নীচেই একটা না একটা কাহিনী উদ্ধৃত করে দিয়েছেন, তার বড় অংশই মুহাদ্দেসীনের দৃষ্টিতে সঠিক নয় এবং সেগুলোর সনদও গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই একে তফসীরের শর্ত মনে করা একান্তই ভুল। আল্লাহ্র কালামের গবেষণা-পর্যালোচনা এর ওপর নির্ভরশীল সাব্যস্ত করাটা নিজেই নিজেকে আল্লাহর কালাম থেকে বঞ্চিত করার শামিল।
সুতরাং কাহিনী ও ঘটনাসমূহের ব্যাপারে সঠিক মত হচ্ছে ওই কাহিনীগুলো জানার জন্য চেষ্টা করতে হবে, যেগুলোর প্রতি কোরআনের আয়াতসমূহে ইঙ্গিত করা হচ্ছে এবং যেগুলো জানা আয়াতগুলো পরিপূর্ণভাবে বুঝার জন্য প্রয়োজন।
হযরত শাহ ওলীউল্লাহ (রঃ) বলেনঃ
তফসীরকারদের পক্ষে কাহিনীসমূহের মধ্যে দু'রকমের কাহিনী জানা আবশ্যক। প্রথমত সেসব কিস্সা বা কাহিনী, যেগুলোর প্রতি কোরআনের আয়াতসমূহে ইঙ্গিত করা হয়ে থাকে। এ ধরনের আয়াতের ইঙ্গিতগুলো বুঝতে পারা কিসসাগুলো জানা ছাড়া সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত সেসব কাহিনী, যাতে কোন সাধারণ বিষয়কে বিশিষ্টতা দেয়া হয় অথবা এমনি ধরনের অন্য কোন বিষয়, যা প্রকাশ্য অর্থ থেকে সরিয়ে অপর কোন তাৎপর্যের প্রতি নিয়ে যাওয়ার মত। নিঃসন্দেহে এমন ধরনের আয়াতসমূহ সেসব কিসসা-কাহিনীর সাহায্য ছাড়া বুঝা যেতে পারে না।
এখানে উপরোল্লিখিত প্রকারের যেসব কিস্সার প্রতি কোরআনের আয়াতে ইঙ্গিত করা হচ্ছে তার কতিপয় উদাহরণ উল্লেখ করছি। এর একটি চমৎকার উদাহরণ সূরা সুজাদালায় রয়েছে। বলা হয়েছে:
قَدْ سَمِعَ اللهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِي إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ - ( مجادله - ۱)
আল্লাহ তাআলা সে মহিলার কথা শুনে নিয়েছেন, যে তোমার সাথে তার স্বামীর ব্যাপারে ঝগড়া করছিল এবং আল্লাহ্র কাছে অভিযোগ করছিল। আর আল্লাহ্ তোমাদের দু'জনের কথাবার্তাই শুনছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী ও দর্শনকারী।
উল্লিখিত আয়াতে সে মহিলার যে ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা যদি সবিস্তারে জেনে নেয়া যায়, তা হলে এ আয়াতটি বুঝতে গিয়ে যথেষ্ট সাহায্য হতে পারে।
এমনিভাবে সূরা আহযাবের নিম্নলিখিত আয়াতে হযরত যায়েদ এবং হযরত যয়নব (রাঃ)-এর ঘটনার প্রতি সাধারণভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলে বিষয়টিও যথেষ্ট পরিমাণে পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে।
وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللهَ وَتُخْفِى فِي نَفْسِكَ مَا اللهُ مُبْدِيْهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقَّ أَنْ تَخْشُهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنُكَهَا لِكَيْلًا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْ عِبَائِهِمْ إِذَا قَضَومِنْهُنَّ وَطَرًا - (الاحزاب (۳۷)
আর যখন তোমরা বলছিলে, সে লোকের সাথে যার প্রতি আল্লাহ্ রহমত করেছেন যে, নিজের স্ত্রীকে আটকে রাখ এবং আল্লাহকে ভয় কর। আর তোমরা নিজেদের মনে এমন বিষয় গোপন করে রাখতে যা আল্লাহ্ প্রকাশ করতেন। বস্তুত আল্লাহই তার বেশী অধিকারী যে, তাকে ভয় করা হবে। অতএব যায়েদ যখন তার (স্ত্রী) সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে আমি তাকে তোমার সাথে বিয়ে দিয়েছি, যাতে মুমিনদের নিকট বানানো পুত্রদের স্ত্রীদের সম্পর্কে কোন সংশয় থাকতে না পারে, যখন তারা তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে নেয়।
এমনিভাবে সূরা তাহরীমের নিম্নলিখিত আয়াতগুলোতেও কোন কোন ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আয়াতগুলো বুঝার জন্য তা জানা থাকা প্রয়োজন। বলা হয়েছে:
وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضٍ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَنْ بَعْضٍ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنْبَاكَ هُذَا قَالَ نَبَّأَنِي الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ - (تحريم - (٣)
আর মহানবী (সঃ) যখন নিজের বিবিদের মধ্যে কারও সাথে একটি কথা গোপনে বললেন, অতপর যখন সে সে বিষয়ে সংবাদ দিয়ে দিল এবং আল্লাহ নবীর নিকট কথাটি প্রকাশ করে দেন, তখন নবীও তার কিছু প্রকাশ করলেন এবং কিছু গোপন রাখলেন। অতপর যখন তা স্ত্রীর নিকট প্রকাশ করলেন, তখন তিনি বললেন, কে বলে দিয়েছে? বললেন, আমাকে আল্লাহ্ বলেছেন, যিনি জ্ঞানী ও পরিজ্ঞাত।
এই আয়াতটি এবং এ ধরনের অন্যান্য আয়াত ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিকভাবে বুঝে আসতে পারে না, যতক্ষণ না সেসব বিষয় জেনে নেয়া যায়, যেগুলোর প্রতি তাতে ইঙ্গিত করা হচ্ছে। কাজেই এসব ক্ষেত্রে শানে নুযুলের অন্বেষণ নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। কিন্তু এমন ক্ষেত্র কোরআন মজীদে অনেক বেশী নেই; মাত্র কয়েকটি এবং সঠিক ও প্রামাণ্য হাদীসে সাধারণত সেগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, প্রথমে কোরআন মজীদের আয়াতটিতেই মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করতে হবে। তাতেই ঘটনার সমস্ত দিক পরিষ্কারভাবে সামনে এসে যাবে। কিন্তু কোন একটি দিক যদি প্রচ্ছন্ন থেকে যায়, পরিষ্কার করে বুঝে না আসে এবং আযাতের শব্দসমূহ তাকেই খুঁজে বেড়াতে থাকে, তা হলে অতিরিক্ত পরিতৃপ্তির উদ্দেশে সঠিক ও যথার্থ পন্থায় সম্পৃক্ত ঘটনা জেনে নেয়া উচিত। অবশ্য তখনও খেয়াল রাখতে হবে, তা যেন কোরআনের ইঙ্গিতের সাথে পরিপূর্ণ ভাবে সুসমঞ্জস হয়; তার বিরোধী কিংবা বিপরীত যেন না হয়।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 আলোচনার সার সংক্ষেপ

📄 আলোচনার সার সংক্ষেপ


পেছনের পাতাগুলোতে যেসব অর্থ ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে, এক্ষণে সংক্ষেপে আমরা সেগুলোর একটা সারসংক্ষেপ তুলে ধরতে চেষ্টা করব, যাতে করে প্রকৃত বিষয়টি পরিষ্কারভাবে সামনে এসে যেতে পারে।
১. কোরআন মজীদ সে শ্রেণীর কালামের অন্তর্ভুক্ত, যা কোন কোন দিক দিয়ে একান্ত সহজ ও সরল এবং কোন কোন দিক দিয়ে অতি সূক্ষ্ম ও জটিল। সেজন্যই কোরআন একটি স্কুলগ্রন্থ, যা বুঝবার জন্যে কোন চেষ্টা-চরিত্রের কিংবা কোন গভীর চিন্তা-ভাবনার অথবা গভীর অধ্যয়নের প্রয়োজন নেই বলে ধারণা করে নেয়া নিতান্ত ভুল। সাধারণ জ্ঞানের ভিত্তিতে কোরআন সম্পূর্ণ স্পষ্ট; প্রথম দৃষ্টিতেই হারাম হালাল বা বৈধ-অবৈধের সমস্ত সীমানা নির্ধারণ করে দেয় এবং ভাল-মন্দ ও সৎ-অসৎ চিনে নেয়ার জন্য যাবতীয় নিদর্শন ও চিহ্নসমূহ প্রকাশ করে। কিন্তু একই সঙ্গে এতে এমন একটি সূগভীর দর্শন এবং অভিজ্ঞান বা হেকমতও বিদ্যমান, যা অর্জন করতে হলে হালকাভাবে অধ্যয়ন করাই যথেষ্ট নয়, বরং যথেষ্ট মনোনিবেশ সহকারে চিন্তা-গবেষণা করা প্রয়োজন।
২. কোরআন মজীদ সম্পর্কে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত যে, এটি শুধুমাত্র আইন-কানুন ও সংবিধান সম্বন্ধীয় একটি সংকলন এবং বিধি-নিষেধ কিংবা হারাম-হালাল জানার একটা শুষ্ক ও সহজ-সরল নিয়ম-পদ্ধতি। কোরআনের গঠন স্বয়ং তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী তিনটি অংশের দ্বারা হয়েছে। (১) আল্লাহ্র আয়াত অর্থাৎ, দলিল-প্রমাণাদি, (২) কিতাব অর্থাৎ, আইন-কানুন ও সংবিধান (৩) হেকমত অর্থাৎ শরীয়তের মূলতত্ত্ব এবং ধর্মের নির্যাস। প্রথম অংশটি ধর্মের যুক্তি, দ্বিতীয়টি ধর্মের ব্যবস্থা আর তুতীয়টি হচ্ছে ধর্মের দর্শন। কাজেই কোরআন মজীদ একটি চিন্তা-গবেষণার বস্তু। এ জন্যেই সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) তার একেকটি সূরার গবেষণায় আট-আটটি বছর কাটিয়ে দিতেন। তাঁরা তার জটিলতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার উদ্দেশে মজলিস গঠন করতেন। মহানবী (সঃ)-এর কাছে তার জটিলতা নিরসনের জন্যে সাহায্য চাইতেন। বুদ্ধি-বৃত্তির প্রশান্তি, অন্তরাত্মার পবিত্রতা এবং পার্থিব জীবনে জীবিকা অর্জন ও রাজনীতির জন্যে একে সম্পূর্ণভাবে যথেষ্ট বিবেচনা করতেন। আর বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরামের উক্তি, "আল্লাহর কিতাব আমাদের জন্য যথেষ্ট"-এর অর্থও ছিল তাই যে, আমাদের দ্বীন ও দুনিয়া বা ইহলোক ও পরলোক এবং জ্ঞান ও আত্মার যা কিছু চাহিদা, কোরআন সে সমস্তই নিজের মধ্যে সংরক্ষণ করে। এমন নয় যে, তাতে শরীরের জন্য সব কিছু আছে কিন্তু আত্মার প্রশান্তির কোন ব্যবস্থা নেই কিংবা হালাল-হারাম তথা বৈধ-অবৈধের নিয়ম-কানুন তো আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, যা আমাদের জীবিকার অন্বেষণে যথেষ্ট কাজে লাগতে পারে, কিন্তু আমাদের জ্ঞান ও চেতনার ব্যাকুলতা আর মন-মস্তিষ্কের জটিলতাসমূহকে এমনি ছেড়ে দিয়েছে। সেগুলোর সমাধানের জন্য আমাদেরকে গ্রীক দার্শনিক তার্কিকদের যথেচ্ছ বক্তব্য আর সমকালীন গবেষণাবিদদের গবেষণার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে, তাও নয়।
৩. কোরআন মজীদে এমন একটি আয়াতও নেই, যাতে বুঝা যায় যে, এটি তো একটি স্থূল গ্রন্থ। বরং তার বিপরীতে এতে অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যার প্রতিটি ভাষ্য সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা প্রয়োজন। চিন্তা-গবেষণা ছাড়া তার শিক্ষার তাৎপর্য বুঝে আসতে পারে না। যারা কোরআন মজীদকে কোন গভীর তাৎপর্যপূর্ণ গ্রন্থ বলে মনে করেন না এবং
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ
আয়াতটি দ্বারা নিজের সে ধারণার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন, তাদের সে যুক্তি অত্যন্ত দুর্বল ও ভ্রান্ত। উল্লিখিত আয়াতের মর্ম তা নয়, যা সাধারণভাবে মনে করা হয়। এর মর্ম হচ্ছে, কোরআন মজীদকে আল্লাহ্ তাআলা জ্ঞানার্জন ও শিক্ষালাভের জন্য সম্পূর্ণভাবে পর্যাপ্ত এবং অত্যন্ত উপযোগী করে তৈরী করেছেন। এই উদ্দেশে তা সর্বদিক দিয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এতে কোন রকম কমতি নেই; কোন কিছুরই অভাব নেই। يَسَّرْنَا শব্দটি শুধু তার সহজতাকেই প্রকাশ করে না; বরং প্রকৃতপক্ষে তার পরাকাষ্ঠা, তার সামগ্রিকতা এবং তার উপযোগিতাও প্রমাণ করে। আর তাতেই তার সহজবোধ্যতা প্রকাশ পায়। কারণ, যাকে কোন একটি উদ্দেশ্যের জন্য পরিপূর্ণভাবে সাবলীলও করে নেয়া হয়েছে, তা সে উদ্দেশে নিঃসন্দেহে সহজ-সরলও অবশ্যই হবে।
৪. যাঁরা কোরআনের তফসীরের ব্যাপারে শুধুমাত্র রেওয়ায়েতের ওপরেই নির্ভর করেন, তাঁরা নিশ্চিতই বাড়াবাড়ি করেন। অথচ তা বিশেষজ্ঞ মত ও অনুসৃত নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। কোরআন মজীদের তফসীরের ব্যাপারে মূল ভিত্তি হচ্ছে স্বয়ং তারই শব্দ, তারই যুক্তি-প্রমাণ, তারই উপমা-উদাহরণ, তার আনুপূর্বিক যোগসূত্র এবং তারই বিন্যাসের প্রতি লক্ষ্য রাখা। প্রত্যেকটি আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়েই এসব বিষয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। কোন অবস্থাতেই এগুলোকে উপেক্ষা করা যাবে না। কিন্তু এ কথাও অনস্বীকার্য যে, রেওয়ায়েত ও হাদীসের সাহায্য ছাড়া কোরআনের তফসীরের জটিলতার সমাধান হতে পারে না। কোরআন মজীদ যে যুগে অবতীর্ণ হয়েছিল এবং যেসব লোককে প্রাথমিক পর্যায়ে তাতে সম্বোধন করা হয়েছিল, স্বাভাবিকভাবেই সে যুগের অসংখ্য বৈশিষ্ট্য এবং সে জাতির সীমাহীন সমস্যার প্রতি তা ইঙ্গিত করেছে, যাকে পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরার জন্য আমরা তাদের সাহায্য গ্রহণ থেকে মুক্ত হতে পারি না, যাঁরা কোরআনের প্রাথমিক লক্ষ্য। সে লোকদের সাহায্যে উপকৃত হওয়া কোরআনের শব্দাবলীর প্রাধান্যকে খর্ব করা নয়। আর তাতে তার অকাট্যতায়ও সামান্যতম ব্যতিক্রম ঘটে না। কারণ, রেওয়ায়েত ও হাদীসের সাহায্য তখনই গ্রহণ করা হয়, যখন কোরআনের শব্দাবলীও তার সাহায্য গ্রহণের প্রতি ইঙ্গিত করে।
এ দাবী স্বস্থানে যথার্থ যে, কোরআন মজীদ নিজের বোধগম্যতার জন্যে অন্য কোন কিছুর মুখাপেক্ষী নয়। কিন্তু কোরআনের তফসীর বা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রেওয়ায়েত ও হাদীসের সাহায্য নেয়া কোরআনের মুখাপেক্ষিতার প্রমাণ নয়। বরং এতে আমাদেরই মুখাপেক্ষিতা প্রমাণ করে। আর আমাদের মুখাপেক্ষিতা এবং কোরআনের মুখাপেক্ষিতায় বিরাট পার্থক্য। আমরা কোরআন বুঝার জন্য ভাষা, ব্যাকরণ প্রভৃতির সাহায্য নেই, কিন্তু তাতে একথা প্রমাণিত হয় না যে, কোরআন নিজের বোধগম্যতার জন্য সেসব বিষয়ের মুখাপেক্ষী। কাজেই এতে কোরআন মজীদের পরিপূর্ণতায় কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় না।
৫. শানে নুযূল দ্বারাও কোরআনের অকাট্যতায় কোন ব্যাঘাত ঘটে না। শানে নুযূলের তেমন কোন গুরুত্ব নেই যা সাধারণত মনে করা হয়। প্রামাণিকদের নিকট শানে নুযূল হচ্ছে আবিষ্কারধর্মী বিষয়। অর্থাৎ, "আয়াতটি অমুক ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে কিংবা অমুক বিষয়ে নাযিল হয়েছে" বলে সাহাবায়ের কেরামের যে উক্তি, তার অর্থ এই নয় যে, সে আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ হুবহু সে ঘটনাটিই। বরং তার অর্থ সাধারণত এই হয় যে, সে আয়াতটি অমুক নির্দেশ সম্বলিত। অতএব, বিষয়টির তাৎপর্য পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর এ পথের যাবতীয় প্রশ্নের সমাধান আপনা থেকেই হয়ে যায় এবং অতপর সেগুলোর দ্বারাও কোরআনের তফসীরের সেক্ষেত্রেই সাহায্য নেয়া উচিত যেখানে কোরআনের শব্দাবলীও তাই চায় এবং যেখানে কোন জটিলতার সমাধান হয়। বস্তুত এমন জায়গা হযরত শাহ ওলীউল্লাহ (রঃ)-এর ভাষায় গোটা কোরআনে খুব বেশী নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00