📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 হেকমতের শিক্ষা

📄 হেকমতের শিক্ষা


তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে 'হেকমতের' শিক্ষা। 'হেকমত' সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই 'হেকমত' কোরআনের একটা অংশ, না তা থেকে বিচ্ছিন্ন কোন বিষয়? আমাদের বিশ্বাস, আল্লাহ্র কালাম কোরআন মজীদ যেমন আল্লাহ্ আয়াত, নিদর্শন ও আহকাম বা বিধানসমূহকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে, তেমনিভাবে হেকমত বা জ্ঞান, দর্শন, তত্ত্ব ও রহস্যসমূহকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিন্তু আমাদের এ দাবী অবশ্য তাঁদের ধারণার বিরুদ্ধে যাবে, যাঁদের মতে হেকমত বলতে হাদীস কিংবা অন্যান্য কতিপয় জ্ঞানকে উদ্দেশ করা হয়েছে। আর যেহেতু কোন কোন বিশিষ্ট মনীষীর মতও তাই, যেমন ইমাম শাফেয়ী (রঃ) প্রমুখ। কাজেই বিষয়টি উপেক্ষা করা কঠিন। অতএব, দেখতে হবে, যাঁরা হেকমত বলতে হাদীস বুঝেন, তাঁদের প্রমাণ কি?
তাঁদের প্রমাণ হচ্ছে যে, আলোচ্য আয়াতে 'হেকমত' শব্দটি 'কিতাব' শব্দের সংগে এসেছে। আর তারা 'কিতাব' অর্থে সামগ্রিকভাবে কোরআন মজীদকে বুঝেন। কাজেই অপরিহার্যভাবেই 'হেকমত' শব্দের দ্বারা অন্য কোন কিছু বুঝতে হয় (যা কোরআন নয়)। আর বলাই বাহুল্য, কোরআনের পরে হাদীস ছাড়া অন্য কোন বস্তু এ শব্দের অর্থ হতেই পারে না।
কিন্তু উল্লিখিত বিতর্কের দ্বারা একথা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, প্রমাণটি যথেষ্ট শক্ত নয়। আমাদের ব্যাখ্যানুসারে উল্লিখিত আয়াতে 'কিতাব' অর্থ বিধান ও নির্দেশাবলী। কাজেই 'হেকমত'-এর জন্য স্বয়ং কোরআন মজীদেই যথেষ্ট জায়গা রয়েছে-এর দ্বারা হাদীস কিংবা কোরআন বহির্ভূত অন্য কোন বস্তু উদ্দেশ করা অপরিহার্য নয়। অবশ্য এটা স্বতন্ত্র কথা যে, হাদীসেও (বিপুল) হেকমত রয়েছে। হাদীসের মর্যাদা বহু ঊর্ধ্বে। গোটা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য কোরআনের অব্যবহিত পরেই তার স্থান। এতেও কোরআনী হেকমত বা দর্শনের এক বিপুল ভাণ্ডার নিহিত। তা ছাড়া হাদীসেই যদি হেকমত না থাকবে, তা হলে থাকবে কোথায়? কিন্তু একথা যথার্থ নয় যে, আলোচ্য আয়াতে 'হেকমত' শব্দটি হাদীস অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন কারণ-উপকরণ এ ধারণার পরিপন্থী। তার কয়েকটির প্রতি আমরা এখানে ইংগিত করছি -
১। বেশ কতিপয় আয়াতে 'হেকমত' বুঝাতে গিয়ে (يتلی )ইউতলা(,انزل )উনযিলা) ও (اوحی )উহিয়া) প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ব্যবহার হাদীসকে বুঝাবার উদ্দেশে কোরআনের কোথাও নেই। যেমন-
وَأَنْزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ مَالَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ .
আর আল্লাহ্ তোমার প্রতি কিতাব ও হেকমত অবতীর্ণ করেছেন এবং সেসব বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা তোমরা (ইতিপূর্বে) জানতে না। অন্য জায়গায় আছে-
وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللهِ وَالْحِكْمَةِ .
তোমাদের ঘরে আল্লাহর যেসব আয়াত এবং হেকমত পাঠ করা হয়, সেগুলো স্মরণ রেখো। আরো এক জায়গায় ধর্মের মৌলিক বিষয়সমূহের আলোচনার পর বলা হয়েছে-
ذَالِكَ مِمَّا أُوحِيَ إِلَيْكَ رَبُّكَ مِنَ الْحِكْمَةِ -
তোমাদের পরওয়ারদেগার তোমাদের কাছে যে হেকমত ওহী (প্রত্যাদেশ) করেছেন, এটা তারই মধ্য থেকে।
২। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোরআন মজীদের দলিল-প্রমাণগুলোকে 'হেকমতে বালেগাহ' শব্দে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং স্বয়ং কোরআন মজীদকে 'কোরআনে হাকীম' ও 'কিতাবে হাকীম' বলে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন, বলা হয়েছেঃ يس - وَالْقُرْآنِ الْحَكِيمِ - حِكْمَةَ بَالِغَةً فَمَا تُغْنِ النُّذُرُ .
৩। হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ
وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ .
স্মরণ কর, যখন আমি তোমাকে কিতাব, হেকমত, তওরাত এবং ইঞ্জীল-এর শিক্ষা দিয়েছি।
এ আয়াতে কিতাব ও হেকমতের পর এরই ব্যাখ্যাস্বরূপ তওরাত ও ইঞ্জীল-এর উল্লেখ করা হয়েছে। 'কিতাব' শব্দের ব্যাখ্যা করা হয়েছে তওরাত আর হেকমত-এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে ইঞ্জীল। পণ্ডিত মনীষীরা জানেন যে, তওরাত প্রধানত আইন-কানুন ও সাংবিধানিক বিষয় সম্বলিত গ্রন্থ আর ইঞ্জিল হচ্ছে যুক্তি-প্রমাণ ও উপদেশাবলীর একটা সংকলন। প্রথমোক্তটিতে যুক্তি-প্রমাণ ও উপদেশের অংশ অতি অল্প। পক্ষান্তরে শেষোক্তটিতে নীতি-বিধানের আলোচনা নামমাত্র। সংবিধান ও আইন-কানুন সম্পর্কে ইঞ্জীল তওরাতের প্রত্যয়ন করেই দায়িত্বমুক্ত হয়ে যায়। তওরাতের এই সাংবিধানিক গুরুত্বের কারণেই তাকে 'কিতাব' শব্দে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং ইঞ্জীলকে তার যুক্তি-দর্শন ও উপদেশাবলীর জন্য 'হেকমত' বলা হয়েছে।
অপরপর কয়েকটি আয়াতেও এ ধারণার সমর্থন পাওয়া যায়। বলা হয়েছেঃ
وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَاتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ .
হযরত ঈসা যখন প্রকৃষ্ট ও প্রকাশ্য মু'জেযা নিয়ে আগমন করলেন, তিনি আমন্ত্রণ জানালেন, হে জনগণ! আমি তোমাদের কাছে 'হেকমত' নিয়ে এসেছি এবং এমন কোন কোন বিষয় নিয়ে এসেছি যা নিয়ে তোমরা বিবাদ করছ, যাতে করে সেগুলো বিশ্লেষিত করতে পারি।
এ সব কারণ-প্রকরণের ভিত্তিতে 'হেকমত' বলতে 'হাদীস' অর্থ করা আমাদের মতে যথার্থ নয়। প্রকৃতপক্ষে এ ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল 'কিতাব' এবং 'হেকমত' শব্দ দুটির একত্রিত হয়ে যাওয়ার দরুন। কিন্তু আমরা যে দিকটি বিশ্লেষিত করেছি, তার আলোকে 'কিতাব' ও হেকমতের পরিসীমা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। যার পরে আর কোন ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ থাকে না।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 হেকমত শব্দের আভিধানিক বিশ্লেষণ

📄 হেকমত শব্দের আভিধানিক বিশ্লেষণ


এবার সংক্ষেপে 'হেকমত'কে অভিধান এবং তার ব্যবহারের আলোকেও দেখে নেয়া বাঞ্ছনীয়। মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী তাঁর 'মুফ্রাদাতুল কোরআন' গ্রন্থে এ শব্দটির সবিস্তার আলোচনা করেছেন। নিম্নে তারই প্রয়োজনীয় সার-সংক্ষেপ তুলে দেয়া হয়েছে-
অভিধানে ‘হুকুম’ অর্থ মীমাংসা করা, সিদ্ধান্ত নেয়া। তা ন্যায়ই হোক কিংবা অন্যায়, যথার্থ হোক অথবা ভ্রান্ত। কোরআনে আছে— مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ (তোমাদের কি হল। কেমন ফয়সালা করছ তোমরা!) أَفَحُكُمُ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ (তারা কি জাহেলিয়াত যুগের মীমাংসা কামনা করে?)
তা ছাড়া এই শব্দটি সে শক্তির উদ্দেশেও বলা হয়, যার আলোকে এ মীমাংসা সম্পাদিত হয়। তখন তার অর্থ হয় বিচার-বুদ্ধি। রইল ‘হেকমত’ শব্দটি। এটি সে শক্তির জন্য বলা হয়, যা যথার্থ মীমাংসার উৎসমূল। হযরত দাউদ (আঃ)-এর প্রশংসা উপলক্ষে আল্লাহ্ বলেছেন أَتَيْنَاهُ الْحِكْمَةَ وَفَصْلَ الْخِطَابِ - (আমি তাঁকে ‘হেকমত’ এবং সিদ্ধান্তমূলক কথা বলার যোগ্যতা দিয়েছি।)
এখানে ক্রিয়াকে সে শক্তির পরে বলা হয়েছে, যা সে ক্রিয়ার উৎসমূল। আর সিদ্ধান্ত বা মীমাংসা যেমন হেকমতের কার্যকলাপের প্রতিক্রিয়া, তেমনিভাবে নৈতিক পবিত্রতা এবং শিষ্টাচারও তারই ক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। সে জন্যেই আরবের অধিবাসীরা এ শব্দটি সে শক্তিকে বুঝার জন্য ব্যবহার করত, যা বুদ্ধির পরিপক্বতা এবং শিষ্টাচার উভয়ের জন্যেই ব্যাপক। আর বুদ্ধিমান ও শিষ্টাচারীকে বলা হত ‘হাকীম’। তেমনিভাবে ‘হেকমত’ শব্দটি ‘প্রকৃষ্ট সংশোধন’ অর্থেও ব্যবহৃত হত, যার উদ্দেশ্য এমন প্রজ্ঞাপূর্ণ কথাকে বুঝানো, যা মন ও মেধা উভয়ের কাছেই পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। ‘হেকমত’ শব্দটি এ সমস্ত অর্থেই আরবী ভাষায় ব্যবহৃত। আর যেহেতু আরবরা শব্দটির এ সমস্ত দিক সম্পর্কেই সম্যক অবগত ছিল, কাজেই কোরআন এবং পয়গম্বর (সঃ) একে ব্যবহার করেছেন।
এ প্রসংগে মহানবী (সঃ) বলেছেন, কবিতার মধ্যে কোন কোনটা ‘হেকমত’। অর্থাৎ, সব কবিতাই পথভ্রষ্টতা নয়; কিছু কবিতা এমনও রয়েছে যাতে সত্য কথা বলা হয়েছে এবং কল্যাণের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। অতপর আল্লাহ্ তাআলা একে তার সর্বাধিক উত্তম অর্থে ব্যবহার করেছেন; অর্থাৎ, ওহীর অর্থে। ওহীকে যেমন ‘নূর’, ‘প্রমাণ’, ‘যিকর’, ‘রহমত’ প্রভৃতি শব্দের দ্বারা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তেমনিভাবে ‘হেকমত’ শব্দের দ্বারাও তার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন, (আল্লাহ্) নিজের সত্তার জন্য ‘হাকীম’ ও ‘আলীম’ শব্দ ব্যবহার করেছেন .....।
ওপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, 'হেকমত' বক্তব্য ও বক্তা উভয়ের মধ্যেই বিদ্যমান থাকে। তার তাৎপর্য হচ্ছে সেই দৃঢ়তা ও পরিপক্বতা, যা একান্তই বুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। আগুনের অস্তিত্ব যেমন উষ্ণতার দ্বারা প্রতীয়মান হয়, তেমনিভাবে 'হেকমত' (প্রজ্ঞা)-ও তার ক্রিয়াকলাপেই চেনা যায়। এটা যখন কারো ভেতর সৃষ্টি হয়, তখন তার মধ্যে সত্য উপলব্ধি করার মত একটা যোগ্যতাও জন্মায়। তখন তার মুখ দিয়ে যে কথাটি বেরোয় তা হয় সত্য ও যথার্থ। আর তার দ্বারা যে কার্যানুষ্ঠানই হয় তা হয় সঠিক ও নির্ভুল। কোরআন মজীদে বর্ণিত হযরত লোকমানের কাহিনীতে তার কার্যক্রম সম্পর্কেই বর্ণনা রয়েছে। তা ছাড়া হাদীসেও তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ জিনিসটিই আল্লাহ্র 'হাত', আল্লাহ্'চোখ'। যে এতে দেখে, তার রাতটিও দিনের মতই উজ্জ্বল হয়ে যায়। সে সংকীর্ণ অন্ধকার পথেও হুমড়ি-হোঁচট থেকে মুক্ত থাকে। সে বিন্দুতে বিশাল সমুদ্র প্রত্যক্ষ করে। সে কারণেই শরীয়তের ছোট একটি নির্দেশকে পর্বততুল্য জ্ঞান করে। অন্যের কাছে যে বিষয়ের গুরুত্ব একটা নুড়ি অপেক্ষা বেশী নয়, সে তারই মধ্যে দেখতে পায় হীরার দ্যুতি।
এমনিভাবে এটা (হেকমত) যখন কোন বাক্যে নিহিত থাকে, তখন সে বাক্য মেধাপথে মনের গভীরে গিয়ে প্রবেশ করে। যাবতীয় দোদুল্যমান অবস্থার তখন পরিসমাপ্তি ঘটে যায়, প্রতিটি সন্দেহ-সংশয় ধুয়ে-মুছে যায়, প্রতিটি অহেতুক দাবী বাতিল করে দেয়, প্রতিটি মিথ্যা যুক্তি ধসে পড়ে।
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا .
'সত্য এসে গেছে, মিথ্যা শেষ হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা স্থিতিহীন।' আর এই হচ্ছে কোরআন মজীদের বৈশিষ্ট্য।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 একটি লক্ষ্যণীয় বিষয়

📄 একটি লক্ষ্যণীয় বিষয়


এক্ষেত্রে হেকমতের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্য একটি প্রয়োজনীয় তাৎপর্য বুঝে নেয়া বাঞ্ছনীয়। তাতে প্রসংগক্রমে তওরাত এবং কোরআন মজীদের পারস্পরিক পার্থক্যটাও পরিষ্কার হয়ে যাবে।
কোরআন মজীদে তওরাতের যেসব গুণ-বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে, তাতে কোথাও হেকমতের উল্লেখ নেই। বরং কোন কোন জায়গায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, তওরাত হচ্ছে সংবিধান আর ইঞ্জীল হেকমত। অবশ্য কোন কোন ক্ষেত্রে তার উপদেশ সম্বলিত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। যেমন:
وَكَتَبْنَا لَهُ فِي الْأَلْوَاحِ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ مَوْعِظَةٌ وَ تَفْصِيلًا لِكُلِّ شَيْءٍ . (اعراف - ١٤٤)
আমি তার জন্যে লওহ্ তথা পটের ওপর সমস্ত বিষয় উৎকীর্ণ করে দিয়েছি। উপদেশবাণী এবং প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত (বিবরণ)।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, 'উপদেশবাণী' কি? আমরা যতটা লক্ষ্য করেছি, উপদেশও ' হেকমতেরই একটি শাখা; সরাসরি হেকমত নয়। হেকমত বা অভিজ্ঞান উপদেশ অপেক্ষা অনেক ঊর্ধ্বের বিষয়। আর আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে এ বিষয়টি সব ব্যক্তি কিংবা দলসমূহকেই দেয়া হয়, যারা বুদ্ধির পরিপক্বতায় পৌঁছতে পারে। যে পর্যন্ত কোন জাতি মেধার দিক দিয়ে শৈশবের পর্যায়ে অবস্থান করে, আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে হেকমতের দ্বারা ভূষিত করেন না, বরং জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার জন্য তাদেরকে দেয়া হয় একটি শরীয়তী নীতিমালা। আর চিন্তা-ভাবনার সাধারণ ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য সাধারণ বুদ্ধি ও যুক্তিগ্রাহ্য উপদেশাবলী দান করা হয়েছে। সূরা আ'রাফের এক আয়াতে এই বাস্তবতার প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। হযরত মূসা (আঃ) যখন 'তুর' পর্বতে গিয়ে উপস্থিত হন, তখন তিনি আল্লাহকে দেখার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। তাতে আল্লাহ্ উত্তর দেন, "তুমি আমাকে দেখতে পারবে না, আমার জ্যোতির ছটা পাহাড় পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না; আর মানুষের তো কোন প্রশ্নই ওঠে না।" অতএব, আল্লাহ্ যখন নিজের নূরের ছটা পাহাড়ের ওপর নিক্ষেপণ করলেন, পাহাড় খন্ড-বিখন্ড হয়ে গেল আর হযরত মূসা (আঃ) অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। তারপর যখন জ্ঞান ফিরে এল, সাথে সাথে তিনি তওবা করলেন-
قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ .
বললেন, হে আমার পরওয়ারদেগার! এখন আমি তোমার দিকে ফিরে এসেছি। আমি প্রথম অনুগত বান্দায় পরিণত হচ্ছি।
আল্লাহ বললেন-
يَا مُوسَى إِنِّي اصْطَفَيْتُكَ عَلَى النَّاسِ بِرِسَالَتِي وَبِكَلَامِي فَخُذْ مَا أَتَيْتُكَ وَكُنْ مِنَ الشَّاكِرِينَ .
হে মূসা! আমি আমার পয়গাম এবং আমার বাক্যের দ্বারা তোমাকে মানুষের মধ্যে বিশিষ্টতা দান করলাম। সুতরাং আমি যা দিলাম তা গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।
فَخُذْ مَا أَتَيْتُكَ وَكُنْ مِنَ الشَّاكِرِينَ -
এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর- এর শব্দগুলোর প্রতি লক্ষ্য করে দেখুন। বর্ণনারীতিতে পরিষ্কার বুঝা যায়, হযরত মূসা (আঃ) পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভের অভিলাষ ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ্ বললেন, এমন অভিলাষ করো না; পরিপূর্ণ পরিচয়ের চাপ পাহাড়-পর্বতও সহ্য করতে পারে না। তা তুমি কেমন করে সহ্য করবে? কাজেই যেটুকু পেলে তাইতে সন্তুষ্ট থাক আর আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করা।
বিষয়টিতে সে সত্যের প্রতিই ইংগিত করা হয়েছে যে, হযরত মূসা (আঃ)-এর জাতি পরিপূর্ণ হেকমত লাভের যোগ্য হতে পারেনি। তাদেরকে শুধু সংবিধান এবং উপদেশ দেয়া হয়েছে। কারণ, তাদের মন-মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা তার বেশী সহ্য করার উপযোগী ছিল না। হযরত মূসা (আঃ)-এর পর যেসব নবী আগমন করেন, তাঁরা ধীরে ধীরে বনী ইসরাঈলকে হেকমতের সাথে কিছুটা পরিচিত করাতে চাইলেন, কিন্তু তারা তার এতটুকু মর্যাদা দেয়নি। এমনকি হযরত ঈসা (আঃ) এলেন। তাঁকে আল্লাহ্ তাআলা হেকমত সম্বলিত কিতাব দান করলেন। কিন্তু স্বয়ং ঈসা (আঃ)-এর বর্ণনা অনুসারে তখনও পর্যন্ত বনী ইসরাঈলের মেধাগত সামর্থ্য পরিপূর্ণ হেকমত বা অভিজ্ঞতা ধারণ করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে তিনি বললেন, "তোমাদের প্রতি আমার অনেক কিছু বলার ছিল, কিন্তু তোমরা সেসব বিষয় সহ্য করতে পারবে না।" অতঃপর তিনিও পরিপূর্ণ হেকমত শিক্ষাদানের বিষয়টি উত্তরসুরির দায়িত্বে রেখে দুনিয়া থেকে অন্তর্হিত হলেন।
এই উত্তরসুরি যখন এলেন, তখন আল্লাহ্ তাঁকে এমন এক গ্রন্থ দান করলেন, যা তওরাতের মত শুধু সংবিধানই নয়, বরং ইঞ্জীলের মত হেকমত এবং উপদেশও বটে। তদুপরি হেকমতের সে অংশটিও এতে রয়েছে যার শিক্ষাকে হযরত মসীহ নিজের জাতির অযোগ্যতার দরুন মুলতবী রেখে দিয়েছিলেন। কিতাব ও হেকমতের এই হচ্ছে সমন্বয়, যাকে আমরা 'কোরআন' নামে অভিহিত করি। যেহেতু এ গ্রন্থটি পরিপূর্ণ হেকমতে ভরপুর, কাজেই এতে সম্যক পরিচয় লাভের সে সকল দ্যুতিও সংরক্ষিত, যার অতি সামান্য বিকিরণে গোটা 'তুর' পর্বত খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গিয়েছিল, হযরত মূসা (আঃ)-কে জ্ঞান হারাতে হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ্ যখন চাইলেন, এমন একজন মানুষ জন্মিয়ে দিলেন, যিনি সে দায়িত্বের বোঝা তুলে নিলেন, যার চাপ সহ্য করা তুরের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। সূরা হাশরের নিম্ন আয়াতে কোরআনে হাকীমের এই বাস্তব সত্যটির প্রতিই ইংগিত করা হয়েছে-
لَوْ أَنْزَلْنَا هُذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ .
আমি যদি কোরআনকে পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করতাম, তা হলে তোমরা তাকে দেখতে সে নুয়ে পড়ত এবং আল্লাহর ভয়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যেত।
এই হল রহস্য যে, তওরাতের পক্ষে একইবারে অবতীর্ণ হওয়া সম্ভব হয়েছে, কিন্তু কোরআনে হাকীমের অবতরণ একইবারে হয়নি, বরং অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয়েছে যাতে করে মানুষ ক্রমান্বয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেই বিদ্যুচ্ছটাগুলো সহ্য করে নেয়ার যোগ্য হয়ে ওঠে এবং সেগুলোকে ধারণ করতে পারে। কাফের-মুশরিকরা ইহুদীদের প্ররোচনায় মহানবী (সঃ)-এর প্রতি প্রশ্ন তুলত যে, কোরআন মজীদ তওরাতের মত গোটাটাই একইবারে নাযিল হয় না কেন? এর উত্তরে আল্লাহ্ বললেন لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ এর কারণ, যাতে করে একে বহন করার জন্য আমি তোমাদের মন-মস্তিষ্ককে সমর্থ করে তুলতে পারি।) লক্ষ্য করার বিষয়, যে পবিত্র বক্ষ اَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ -এর নূরের জ্যোতিতে পরিপূর্ণ ছিল, তাঁর পক্ষেও কোরআনকে বহন করা সহজ কাজ ছিল না। তা হলে সাধারণ মানুষের অবস্থাটা কি দাঁড়াত, যাদের যোগ্যতা এবং নবীর যোগ্যতায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য?
সে জন্যই জ্ঞান-বুদ্ধি এবং মন-মস্তিষ্কের নিম্নলিখিত যোগ্যতা প্রয়োজন।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কোরআন মজীদ চিন্তা-গবেষণার ক্ষেত্র

📄 কোরআন মজীদ চিন্তা-গবেষণার ক্ষেত্র


এই সবিস্তার আলোচনার সার-সংক্ষেপ এই দাঁড়াচ্ছে যে, কোরআন মজীদ সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করা একান্তই ভুল যে, তা শুধুমাত্র আইন-কানুন ও সংবিধানের একটা সংকলন এবং সেই বাক্যশ্রেণীভুক্ত, যা বুঝার জন্য বিশেষ কোন মানসিক প্রচেষ্টা কিংবা চিন্তা-গবেষণার আদৌ প্রয়োজন নেই। যে কেউ আরবী কোন রচনার শুদ্ধাশুদ্ধ তরজমা করতে পারবে সে-ই কোরআন মজীদেরও তফসীর বা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে পারে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সাধারণ শিক্ষার দিক দিয়ে কোরআন একান্তই পরিষ্কার ও সহজ। প্রত্যেকেই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এর দ্বারা উপকৃত হতে পারে। জীবনকে যে গতিতে অতিবাহিত করতে হবে, কোরআন প্রথম দৃষ্টিতেই সেদিকে দিশা দেয়। করার মত যাবতীয় বিষয় এবং না করার মত প্রতিটি কাজ সম্পর্কে কোন রকম জটিলতা না রেখে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বাতলে দেয়। হারাম-হালাল বা বৈধ-অবৈধের সীমানা সুনির্দিষ্ট শব্দ ও অতি সাধারণ বাক্যের মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু এরই সঙ্গে সঙ্গে সে নিজের অভ্যন্তরে এক সুগভীর দর্শন-অভিজ্ঞানও নিহিত রাখে। যার গভীরতা অথৈ, যার বিস্তৃতি অনন্ত। আর সে গভীরতায় পৌঁছার জন্যে শুধুমাত্র আরবী ভাষাজ্ঞানই যথেষ্ট নয়; বরং সুগভীর চিন্তা-গবেষণারও প্রয়োজন। শুধুমাত্র সাঁতরানোই যথেষ্ট নয়; বরং তলিয়ে দেখারও প্রয়োজন। সাধারণ পথিকের মত শুধু হেঁটে যাওয়া উচিত নয় বরং প্রতিটি পদক্ষেপে বিরতি নিয়ে প্রতিটি রন্ধ্রের অনুসন্ধান করে দেখা প্রয়োজন। তাও শুধু একবার নয় বরং যেমন হাদীসে বর্ণিত রয়েছে, 'বারবার দেখা কর্তব্য'। এটি উপর্যুপরি পর্যালোচনা আর ক্রমাগত চিন্তা-গবেষণারই বিষয়। মহানবী (সঃ) এরশাদ করেছেনঃ
تعاهدوا هذا القرآن فوالذي نفس محمد بيده لهو اشد تفلنا من الابل في عنقها (للشيخين)
এজন্যেই কোরআনের নিগূঢ় তত্ত্ব-রহস্যের ওপর চিন্তা-গবেষণার জন্য অত্যন্ত বিচক্ষণ ও মেধাবী সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) সমন্বয়ে বিভিন্ন পরিষদ কায়েম করা হয়েছিল। হুযুরে আকরাম এ ধরনের পরিষদ গঠনের জন্যে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় মানুষকে উৎসাহিত করতেন। আবু দাউদ গ্রন্থে উদ্ধৃত রয়েছে-
ما اجتمع قوم في بيت من بيوت الله يتلون كتاب الله ويتدارسونه بينهم الا نزلت عليهم السكينة وغشيتهم الرحمة وحفتهم الملئكة وذكرهم الله فيمن عنده .
যারা কোন জায়গায় একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং পরস্পরে কোরআনের পর্যালোচনার জন্য বিভিন্ন মজলিস স্থাপন করে, তাদের ওপর আল্লাহর তরফ থেকে শান্তি ও রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হয়। ফেরেশতারা তাদেরকে চারদিক থেকে পরিবেষ্টন করে থাকেন এবং আল্লাহ তাআলা নিজের ঘনিষ্ঠদের মাঝে তাদের নিয়ে আলোচনা করেন।
এ হাদীসটির দ্বারা শুধু এ কথাই বুঝা যায় না যে, এ ধরনের মজলিস গঠনে বিরাট বরকত রয়েছে, বরং সাথে সাথে এ কথাও প্রতীয়মান হয় যে, মহানবী (সঃ)-এর আমলেও এ বিষয়টির ব্যাপক প্রচলন ছিল। তখনও কোরআন মজীদের আলোচনা-পর্যালোচনার উদ্দেশে জায়গায় জায়গায় মজলিস অনুষ্ঠিত হত। তাতে সাহাবায়ে কেরাম অংশগ্রহণ করতেন। কোরআনের আয়াত ও তার বক্তব্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন। হুযুরে আকরাম (সঃ) নিজেও কোন কোন সময় এসব মজলিসে অংশগ্রহণ করতেন। এমনকি কোন কোন রেওয়ায়েতের দ্বারা বুঝা যায়, হুযুর (সঃ) এসব আলোচনা সভাকে যিকির-আযকারের মজলিস অপেক্ষা বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন এবং আবেদ-যাহেদের কোন এক মজলিস ছেড়ে তিনি জ্ঞানচর্চার মজলিসে এ কথা বলে গিয়ে বসেছিলেন যে, "আমি প্রশিক্ষক নিযুক্ত করে প্রেরিত হয়েছি।"
চিন্তা করার বিষয়, সাহাবায়ে কেরাম কিসের চিন্তা-ভাবনা করতেন? কোরআনের ভাষা ছিল তাঁদের নিজেদেরই ভাষা; তাতে তার বর্ণনাভঙ্গি ও তার রীতি-পদ্ধতিও তাঁদেরই; আলোচনার বিষয়টি নিশ্চয়ই চিন্তা-ভাবনা কিংবা বিতর্কানুষ্ঠানের মত ছিল না। কোরআন যেসব অবস্থা ও ঘটনার ওপর অবতীর্ণ হত, সেগুলোও ছিল তাঁদেরই নিজস্ব বিষয়। সেগুলো জানার জন্য তাঁদের গভীর চিন্তা-ভাবনা কিংবা চেষ্টা-চরিত্রের প্রয়োজন হওয়ারও কথা নয়। ইশারা-ইঙ্গিতের সম্পর্কও সেসব বিষয়ের প্রতিই হত, যা নিয়ে তাঁরা দৈনন্দিন বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করতেন। এক কথায় সংস্কার, বিশ্বাস, কাজকর্ম এবং ভাল-মন্দ যেসব বিষয়ে কোরআন আলোচনা করত, তার সবই ছিল তাঁদের নিজেদেরই উপাখ্যান। বিগত জাতিসমূহের ইতিহাসের ওপর কোরআনে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, সেসবও ছিল তাঁদের দৈনন্দিনের চর্চা। ইহুদী-নাসারাদের ধারণা, বিশ্বাস কিংবা ঘটনা প্রভৃতির বিষয়ে কোরআন যে ইঙ্গিত করেছে, তার সাথেও তাঁরা একান্ত সম্পর্কের পর্যায়ে যথাযথভাবেই ওয়াকিফহাল ছিলেন। তা হলে কোরআনে এমন কোন্ বিষয়টি ছিল, যার ওপর তাঁদেরকে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করতে হত? বাস্তবে পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, তাঁরা চিন্তা-ভাবনা করতেন এবং তা সাধারণ চিন্তা-ভাবনা নয়, বরং এমন চিন্তা-ভাবনা, যার কোন দৃষ্টান্ত বর্তমান গবেষণা পর্যালোচনার যুগেও অল্পই পাওয়া যেতে পারে। সুতরাং 'মোয়াত্তা' গ্রন্থে উদ্ধৃত এক রেওয়ায়েতে আছে-
ان عبد الله ابن عمر مكث على سورة البقرة ثماني سنين تعليمها
অর্থাৎ, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ক্রমাগত আট বছর যাবত সূরা বাকারার ওপর গবেষণা করেছেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমরকে ওসব উপত্যকার একটিও পাড়ি দেয়ার প্রয়োজন ছিল না, বর্তমানে কোরআন মজীদের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে যা অতিক্রম করতে হয়। তাঁর পথ ছিল অত্যন্ত সহজ ও পরিষ্কার। কোরআন মজীদের জ্ঞান-গবেষণার জন্য যেসব বিষয়ের আমরা মুখাপেক্ষী, সেসবগুলো থেকে না হলেও অধিকাংশগুলো থেকেই তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। তাঁর চিন্তা-গবেষণার বিষয় ছিল শুধুমাত্র কোরআনের তত্ত্ব রহস্য ও হেকমত বা অভিজ্ঞান। আমাদের প্রচলিত বিদ্যা ও কলাকৌশলের এসব আবেষ্টনীও তাঁর চারপাশে ছিল না। শুধু একটি মাত্র গ্রন্থ ছিল, যার জ্ঞান-অনুশীলন, পর্যালোচনা ও শিক্ষাদানই তাঁর জীবনের এবং জীবনের সমস্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তথাপি সবাই দেখলেন, তিনি কোরআন মজীদের একেকটি সূরার ওপর আট আট বছর ধরে গবেষণা চালিয়েছেন। তাঁকে না শিখতে হয়েছিল কোরআনের ভাষা, না জড়াতে হয়েছিল তার শানে নযুল এবং নাসেখ-মসুখ (রহিত ও রহিতকারী) আয়াতের বিতর্কে। ভাষা ছিল তাঁরই ভাষা। তাঁরই ছিল রুচি। ধারণা-কল্পনা তাঁরই। অবস্থা, বিষয়-আসয়, আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস ও কার্যকারণ সবই ছিল তাঁদেরই।
তথাপি একেকটি সূরার ওপর আট আট বছর চিন্তা-গবেষণা করার পরও তিনি পরিতৃপ্ত হতেন না। এমতাবস্থায় আমাদের পক্ষে— যারা কোরআনের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে অপরিচিত এবং যাদের তার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য শতাধিক বিষয় সম্পর্কে জানতে হয়, এমন ধারণা করা কেমন করে বৈধ হতে পারে যে, কোরআন মজীদ একটা খোলা গ্রন্থ; যা বুঝার জন্য কোন বিশেষ প্রচেষ্টা কিংবা ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই?
এটা সাহাবায়ে কেরামের জীবনের প্রকৃষ্ট সাক্ষ্য। তাছাড়া স্বয়ং কোরআন মজীদের প্রতি লক্ষ্য করলেও দেখা যায়, এতে এমন কোন সূরা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যাতে চিন্তা-ভাবনা আর গবেষণা-পর্যালোচনার জন্য আহ্বান জানানো হয়নি। প্রতি পদে পদে لَّكُمْ تَعْقِلُونَ (যাতে তোমরা বুঝ), কয়েক আয়াত পরে পরেই لَّكُمْ تَفَكَّرُونَ (যাতে তোমরা মনোনিবেশ সহকারে লক্ষ্য কর), لَّكُمْ تَذَكَّرُونَ (যাতে তোমরা স্মারক গ্রহণ কর), প্রভৃতি বিষয়ের আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে।
সূরা 'ক্বাফ'-এ কোরআন মজীদকে উপলব্ধি করার জন্য শর্ত আরোপ করা হয়েছে -
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبُ أَو القَى السَّمْعَ وَ هُوَ شَهِيدٌ
নিঃসন্দেহে এতে স্মারকবাণী রয়েছে সে লোকের জন্য; যার প্রাণ আছে কিংবা মনোনিবেশ সহকারে কথা শোনে।
অর্থাৎ, কোরআন মজীদের দ্বারা উপকৃত হতে হলে প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে, বুকের ভেতরে এমন একটি সজাগ অন্তর থাকবে, যা যাবতীয় জ্ঞানের উৎস। আর জাগ্রত অন্তর যদি নাও থাকে, অন্তত এমন শ্রবণশক্তি থাকবে যে, পরিপূর্ণ একাগ্রতা সহকারে মনোযোগ দিয়ে কোরআনের বাণীতে নিবিষ্ট হয়ে যায়, যাতে কোরআন যেন কর্ণকুহরে অন্তরের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। যদি এগুলোর কোনটাই না থাকে, তবে এমন লোকের পক্ষে কোরআন দ্বারা উপকৃত হওয়া অসম্ভব। কোরআন বুঝার জন্যে; তা উপলব্ধি করার জন্যে এ দুটি বিষয়ের একটির উপস্থিতি অপরিহার্য- হয় মানুষের অন্তরের দুয়ার উন্মুক্ত থাকবে এবং জ্ঞান-দর্শনের আলো তার মধ্যে প্রজ্বলিত থাকবে, আর না হয় নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কে সে এ জন্যে উন্মুক্ত করে দেবে এবং পরিপূর্ণ আগ্রহের সাথে তাকে স্বাগত জানাবে।
যারা এ দুটি বিষয় থেকে বঞ্চিত তারা কোরআন মজীদের মহিমালাভেও বঞ্চিত।
সূরা মুহাম্মদের এক আয়াতে তাঁদেরই চিত্র এভাবে আঁকা হয়েছে-
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبِ أَقْفَالُهَا .
এরা কি কোরআনের ওপর চিন্তা করে না? নাকি এদের অন্তরে তালা লেগে রয়েছে?
এখানে মুনাফেকদের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। মুনাফেকরা কোরআন পড়ত, কিন্তু মনোনিবেশ কিংবা একাগ্রতার সাথে নয়, বরং ভাসা ভাসা ও কুটিল মন নিয়ে পড়ত। তারা কোরআনের আয়াতের ওপর থেকে অবহেলাভরে চোখ ঘুরিয়ে নিত। অথচ এর দ্বারা উপকৃত হতে হলে তার ওপর চিন্তা করা ছিল অপরিহার্য। ফলে কোরআন মজীদ তেলাওয়াত করার পরেও তারা অবিশ্বাস ও মন্দাচারে লিপ্ত রয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে তাদের সামনে কোরআনের যথার্থ স্বরূপ উদঘাটিতই হয়নি। এ গ্রন্থের সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে যে, এটা চিন্তা-গবেষণার জিনিস। বরং বলা যেতে পারে, এটা এমন এক গ্রন্থ যা মানুষকে চিন্তা করতে বাধ্য করে। এর বিতর্ক ও প্রমাণরীতি আমাদের নৈয়ায়িকদের বিতর্ক ও প্রমাণরীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। আরোহ ও অবরোহ পদ্ধতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত বের করে শ্রোতাদেরকে হতবাক করে দেয়া কোরআনের রীতি নয়। কোরআন মজীদ দুনিয়ার মানুষকে হতভম্ব করে দেয়ার জন্যে আসেনি, বরং মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও মন-মস্তিস্ককে উজ্জীবিত করার জন্যে এসেছে। সে মানুষের চিন্তা ও প্রমাণের ক্ষমতাগুলোকে প্রশস্ত করে। সেগুলোকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে এবং অতপর সেগুলোকে সে পথে পরিচালিত করে যা প্রকৃতির পথ এবং যাতে কোন ঘুরপাক নেই। কোরআনের সাধারণ নিয়ম হচ্ছে যে, সে যুক্তি-প্রমাণ ও নিদর্শনসমূহের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেয়। প্রমাণ করার কোন কোন দিককে কিছুটা যবনিকামুক্ত করে দেয় এবং ফলাফলের কোন কোন দিকের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে দেয়। যুক্তি শাস্ত্রীয় আরোহ অবরোহ পদ্ধতির সমন্বয় ঘটিয়ে তা থেকে একটা সিদ্ধান্ত বের করার কাজটা কোরআন নিজে করে না, বরং শ্রোতাদের ওপরই ছেড়ে দেয়, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে এবং নিজেই কোরআনের দিশা অনুসারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সে কতিপয় জিনিসের নাম উল্লেখ করে এই বলে নীরবতা অবলম্বন করে যে, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٌ (এরই মধ্যে নিহিত রয়েছে প্রমাণ।) সে দলিল-প্রমাণগুলো কি? সাধারণত সে এর বিস্তারিত কিছু বলে না; বরং এ কাজটি শ্রোতার ওপর ছেড়ে দেয়। তারপর শ্রোতাদের দায়িত্ব হচ্ছে চিন্তা-ভাবনা করে দলিল-প্রমাণ অনুসন্ধান করে নেয়া।
সূরা নাহলের একটি আয়াত গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই কোরআন মজীদের প্রমাণরীতির যথার্থ তাৎপর্য পরিষ্কারভাবে বুঝা যেতে পারে। এরশাদ হয়েছেঃ
هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً لَكُمْ مِنْهُ شَرَابٌ وَمِنْهُ شَجَرٌ فِيهِ تُسِيمُونَ يُنَبِّتُ لَكُمْ بِهِ الزَّرْعَ وَالزَّيْتُونَ وَالنَّخِيلَ وَالْأَعْنَابِ وَمِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ ط إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةٌ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ ، وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ - إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ - وَمَا ذَرَأَ لَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُخْتَلِفًا أَلْوَانُهُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَذَّكَّرُونَ -
তিনিই (সে মহান সত্তা) যিনি তোমাদের জন্যে মেঘমালা থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। তার কিছু তোমাদের পানীয় হিসেবে কাজে লাগে, কিছু শস্যভূমিকে সরস করে। তাতে করে তরুলতা উৎপন্ন হয় আর তোমরা তাতে নিজেদের (পালিত) পশুদের চরাও। এই পানির দ্বারা তিনি তোমাদের জন্য শস্যও উৎপাদন করেন; জয়তুন, খেজুর এবং বিভিন্ন রকমের ফলমূলও।
নিশ্চয়ই বিষয়টিতে মানুষের জন্য একটা বিরাট নিদর্শন রয়েছে, যারা লক্ষ্য করে। আর তিনি রাত্র, দিন ও চন্দ্র-সূর্যকে তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন। আর তেমনি করে গ্রহ-নক্ষত্ররাজিও তোমাদেরই কাজে নিয়োজিত রয়েছে তাঁরই হুকুমে। এতে তাদের জন্যে মহা নিদর্শনসমূহ রয়েছে যারা বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগায়। আর ভূপৃষ্ঠে তোমাদের জন্যে যে নানা রঙ্গেরশস্য সামগ্রী সৃষ্টি করে দিয়েছেন, নিঃসন্দেহে তাতে মানুষের জন্যে একটি নিদর্শন রয়েছে; যারা চিন্তাশীল, যারা ভাবুক তাদের জন্যে।
এখানে ধারাবাহিকভাবে তিনটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে- لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ (যারা গভীরভাবে চিন্তা করে তাদের জন্যে)। لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ (যারা বুদ্ধি বৃত্তিকে কাজে লাগায় তাদের জন্যে)। لِقَوْمٍ يَذَّكَّرُونَ (যারা উপদেশ গ্রহণ করে তাদের জন্য)।
অতপর এক জায়গায় বলেছেন, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً (এতে একটি বিরট প্রমাণ রয়েছে। কি সে প্রমাণ? তা কিছুই বলা হয়নি। চিন্তা করলে বুঝা যাবে। অন্য জায়গায় বলেছেন, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ (এতে প্রমাণসমূহ বিদ্যমান)। কি সেসব প্রমাণ এবং কিসের ওপর সে প্রমাণগুলো? এসব প্রশ্নের উত্তর দেননি, বরং বলে দিয়েছেন, যারা বুদ্ধিকে কাজে লাগায়, যারা বুদ্ধির সাহায্য নেয়, তারা নিজেরাই উত্তর পেতে পারবে। তারপর কোন কোন বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً (এতে একটি প্রমাণ বিদ্যমান)। কি সে প্রমাণটি? কোন্ বিষয়ের প্রমাণ? তার কোন উত্তর দেননি, যাতে করে শ্রোতার চিন্তা ও গবেষণা শক্তি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং নিজেই সে উত্তরটি বের করে নেয়।
দলিল-প্রমাণ ও হেকমতের বিষয় বিবৃত করতে গিয়ে কোরআনের সাধারণ ধারা তাই যা ওপরে বলা হল। সে হেকমতের (অভিজ্ঞানের) এক বিপুল, অন্তহীন ভান্ডার নিজের অভ্যন্তরে লুকিয়ে রাখে, যাতে করে মানুষ নিজে, আপন চেষ্টায় সে যবনিকা উন্মেচিত করে তা থেকে যতটা সম্ভব সংগ্রহ করে নেয়। আসল বিষয় হল হেকমত অনুসন্ধানের দক্ষতা সৃষ্টি করা। এই দক্ষতা কারো মাঝে সৃষ্টি হলে সে দেখতে পায়, কোরআন মজীদে লুক্কায়িত সে জ্ঞানভান্ডার কোন কালেই শেষ হওয়ার নয়। সুতরাং স্বয়ং কোরআন মজীদেরই ভাষ্য-
قُل لَّوْ كَانَ الْبَحْرُ مِدَادًا لِكَلِمَاتِ رَبِّي لَنَفِدَ الْبَحْرُ قَبْلَ أَنْ تَنْفَدَ كَلِمَاتٌ رَبِّي وَلَوْ جِئْنَا بِمِثْلِهِ مَدَدًا (الكهف
বলে দাও, আমার পরওয়ারদেগারের কালামসমূহের জন্যে (বাণীসমূহকে লেখার জন্যে) সাগর যদি কালিতে পরিণত হয়, তা হলে আমার পরওয়ারদেগারের বাণীগুলো শেষ হওয়ার আগেই সাগর শুকিয়ে যাবে, আরও এ পরিমাণ কালিও যদি আমরা অতিরিক্ত আনিয়ে দেই। তিরমিযীতে বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। রেওয়ায়েত করেছেন হারেস আওয়ার-
مررت في المسجد فاذا الناس يخوضون في الاحاديث فدخلت على على فاخير تهب فقال او قد فعلوها ؟ قلت نعم - قال اما اني سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول الا انما ستكون فتنة - قلت فما المخرج منها يا رسول الله ؟ قال كتاب الله فيه بناء ما قبلكم وخبر ما بعدكم وحكم ما بينكم هو الوصل لبس بالهزل من جبار قصمة الله ومن ابتغى الهدى فى غيره اضله الله وهو حبل الله المتين وهو الذكر الحكيم وهو الصراط المستقيم وهو الذي لا تزيغ به الاهواء ولا تلتبس به الا لسنة ولا تشبع منه العلماء ولا يخلق على كثرة الرد ولا تنقضي عجائبه وهو الذي لم تنته الجن اذا سمعته حتى قالوا انا سمعنا قرأنا عجبا يحدى الى الرشد فامنابه من قال به صدق من عمل به اجر، ومن حكم به عدل ومن دعا اليه هدى الى صراط مستقيم خذها اليك يا اعور -
আমি মসজিদে ঢুকে দেখলাম, কিছু লোক কোন একটা বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করছে। এমনি সময় হযরত আলী (রাঃ) এলে আমি বিষয়টি সম্পর্কে জানালাম। আলী বললেন, আচ্ছা, তাহলে এসব কথা হচ্ছে! আমি বললাম, জি-হাঁ। তিনি বললেন, মনে রেখো, বিষয়টি আমি হুযুরে আকরাম (সঃ)-এর কাছে শুনেছি; তিনি বলেছেনঃ শীঘ্রই একটা বিরাট ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন করে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে, ইয়া রসূলাল্লাহ? তিনি বললেন, আল্লাহ্র কিতাব। এতে তোমাদের সকল সমস্যার কথাই রয়েছে। যা পরবর্তীকালে আসবে তার সংবাদ রয়েছে। আর যেসব বিষয় তোমাদের মাঝে সৃষ্টি হবে তার মীমাংসা এতে আছে এবং সেগুলোর দু-একটা অতি মোক্ষম কথা। যে উদ্ধত-অবাধ্য একে বর্জন করবে, আল্লাহ্ তার মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেবেন। যে লোক এটাকে বাদ দিয়ে অন্য কোন কিছুকে হেদায়াতের অবলম্বন বানাবে, আল্লাহ্ তাকে গোমরাহ করে দেবেন। আল্লাহ্র সুদৃঢ় রশি এটাই। এটাই হেকমতে পরিপূর্ণ গ্রন্থ। এটাই আল্লাহ্র প্রকৃষ্ট পথ। এর বর্তমানে রিপুজনিত কামনা-বাসনা কাউকে পথভ্রষ্ট করে না, জিহ্বার স্খলন ঘটে না। জ্ঞানীরা এর পর্যালোচনা করে কখনও তৃপ্ত হন না। যতই পড়, পড়ার কোন শেষ নেই। এর জ্ঞান রহস্য কখনও ফুরাবে না। এর পাঠ শোনার সাথে সাথে জিনরা বলে ওঠেছে, ইন্না সামি'না কোরআনান্ আজাবান্ (আমরা এক আশ্চর্য কোরআন শুনেছি)। এর উদ্ধৃতি সহযোগে যে লোক কথা বলে, সত্য বলে। যে এর ওপর আমল করবে, প্রতিদান পাবে। যে এর সাহায্যে বিচার-মীমাংসা করবে, ন্যায় করবে। যে এর প্রতি আমন্ত্রণ জানিয়েছে, সে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সরল-সহজ পথের। হে আ'ওয়ার! তুমি এ কথাগুলো ভাল করে আত্মস্থ করে রাখ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00