📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 আয়াতের তেলাওয়াত ও পবিত্রতা

📄 আয়াতের তেলাওয়াত ও পবিত্রতা


প্রথম বিষয়টি হচ্ছে আয়াতের তেলাওয়াত। অর্থাৎ, আল্লাহ্ তাআলার আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনানো। 'আয়াত' শব্দটি কোরআন মজীদে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে উল্লিখিত আয়াতে এ শব্দটি দলিল-প্রমাণ ও যুক্তির অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য কোরআন মজীদের বিশেষ করে সে অংশটিকে নির্দেশ করা যা দলিল-প্রমাণ ও যুক্তি-সম্বলিত। কোরআন মজীদের জন্য এ শব্দটি ব্যবহার করার মূল উদ্দেশ্য হল সেই বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করা, যাতে বুঝা যায়, কোরআন তার শিক্ষার জন্যে নিজেই প্রমাণ ও যুক্তিপূর্ণ; বাইরের কোন যুক্তি-প্রমাণের মুখাপেক্ষী নয়।
যাঁরা কোরআন মজীদের অবতরণধারা সম্পর্কে অবগত, তাঁরা জানেন, হুযূরে আকরাম (সাঃ)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির প্রাথমিক পর্যায়ে কোরআন মজীদের যে অংশটি নাযিল হয়েছে, সেটি 'দ্বীন'-এর সেই মূলনীতি সংক্রান্ত, যা সমগ্র ধর্মের জন্য ভিত্তিস্বরূপ। যেমন করে একটি দালান বা প্রাসাদ ততক্ষণ পর্যন্ত নির্মিত হতে পারে না, যতক্ষণ না তার বুনিয়াদ সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। তেমনিভাবে কোন ধর্মের প্রতিষ্ঠাও ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তার মূলনীতিসমূহ যথাযথভাবে মানুষের মন-মস্তিষ্কে বদ্ধমূল না হবে। ইসলামের গোটা ব্যবস্থাও তিনটি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তৌহীদ, আখেরাত ও রেসালাত। এই তিনটি বিষয়ের বুনিয়াদ প্রকৃতি, চক্রবাল ও দিস্মন্ডলের অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত দলিল-প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কোরআন মজীদও সর্বাগ্রে এসব ভিত্তিকেই মজবুত করেছে। আর এগুলোর প্রতিষ্ঠা ও দৃঢ়তার ফলে সেসব ভুল ও বিভ্রান্তিকর চিহ্ন আপনা থেকেই মুছে গেছে যা শিরক অবলম্বন করে আখেরাত ও নবুয়তের প্রতি অস্বীকৃতির দরুন সৃষ্টি হয়েছিল। কোরআন এ সকল ভিত্তিকে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং কি কি প্রমাণপঞ্জির মাধ্যমে মানুষের ভুল আকীদা ও বিশ্বাসসমূহ খন্ডন করেছে, এসব প্রশ্নের উত্তর যথেষ্ট বিশ্লেষণ সাপেক্ষ।
এখানে আমরা শুধু এতটুকু বলতে চাই যে, এক্ষেত্রে ‘আয়াত’ বলতে কোরআনের সে অংশকে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা বিষয়ক দলিল-প্রমাণকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রাথমিক পর্যায়ে কোরআনের যে যে অংশ নাযিল হয়েছে তা ফেকাহ শাস্ত্রীয় নির্দেশাবলী থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এতে শুধু ধর্মের সেই মৌলিক ও সাংগঠনিক বিষয়সমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা ‘দ্বীন’-এর সমগ্র ব্যবস্থাপনা ও নীতিমালার গাঁথুনি সদৃশ। লক্ষ্য করলে বুঝা যায়, যুক্তির দিক দিয়েও তাই হওয়া উচিত। কারণ, কোন শিক্ষাই একটা মৌলিক ভিত্তির অবর্তমানে টিকে থাকতে পারে না। আমরা যখন কোন দালান তৈরী করি, তখন তার ছাদ বা অলিন্দ থেকে কখনও আরম্ভ করি না; বরং সর্বাগ্রে তার ভিত্তিটাকে সুদৃঢ় করে নিই। ধর্মের অবস্থাও তাই। এর সমস্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো কতিপয় মৌলিক নীতিমালার আওতাভুক্ত। কাজেই যে পর্যন্ত সেই নীতিমালা সুদৃঢ় না হবে, সে পর্যন্ত আনুষঙ্গিক বিষয় ও তার শাখা-প্রশাখার উদ্ভব এবং টিকে থাকা অসম্ভব।
আর মানব প্রকৃতির অভ্যন্তরই হচ্ছে সেই নীতিমালার উৎসমূল। কাজেই প্রকৃতি যদি কাল্পনিকতা ও কুসংস্কারের আবর্জনায় আচ্ছন্ন হয়ে না যায়, তা হলে নবুয়তের প্রথম আলোর পরশেই তা মন-মানসে উজ্জ্বলভাবে প্রতিবিম্বিত হয়।
يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارُ .
সত্বর তার তেলে অগ্নিস্পর্শের পূর্বেই প্রদীপ্ত হয়ে ওঠবে।
কিন্তু মানুষের প্রকৃতি যদি দুষ্ট চিন্তা-ভাবনা, বিকৃত কল্পনা এবং মিথ্যা ও শূন্যগর্ভ বিশ্বাসের পঙ্কে অপবিত্র হয়ে যায়, তা হলে তাকে পরিষ্কার করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তা যথার্থভাবে পরিষ্কার না হবে, কোন রকম ভাল শিক্ষা গ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব হতে পারে না। যেমন, একজন পেটের রোগীর পক্ষে অতি উত্তম খাবারও হজম করা সম্ভব হয় না। সেজন্যে প্রথমে সে রোগীর রোগ নির্ণয় করে ওষুধ দেয়া প্রয়োজন। তারপর তার পেট যখন সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে যাবে, তখনই তাকে পুষ্টিকর খাবার দেয়া যেতে পারে। এর আগে যদি পুষ্টিকর খাবার দেয়া হয়, তা হলে তার স্বাস্থ্য কিছুতেই তা গ্রহণ করতে পারবে না। সুতরাং কোরআনে হাকীমে সূরা আনয়ামের এক আয়াতে এমনি ধরনের পঙ্কিলতায় আচ্ছন্ন লোকদের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে-
وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَدُ فِي السَّمَاءِ - كَذَالِكَ يَجْعَلُ الله الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ -
আর আল্লাহ্ যাকে গোমরাহ করতে চান, তার অন্তরকে সংকীর্ণ করে দেন, সে যেন শূন্যে বিচরণ করেছে। এভাবে আল্লাহ্ তাদের ওপর অপবিত্রতাকে জমিয়ে দেন, যারা ঈমান আনে না।
বস্তুত আয়াতের তেলাওয়াতের পর উল্লিখিত আয়াতে যে পবিত্রতার উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সেটা হচ্ছে আয়াতের তেলাওয়াতেরই ফল। আল্লাহর আয়াতসমূহের তেলাওয়াতে মানুষের মন থেকে যখন মিথ্যা ধ্যান-ধারণা ও কু-বিশ্বাসের মূলগুলো উপড়ে যায়, তখন তার মনোভূমি সুষ্ঠু বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার বীজ বপনের জন্যে সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং উপযোগী হয়ে ওঠে।
একথা যথাস্থানে সপ্রমাণিত যে, আল্লাহ্ মানুষের প্রকৃতিতে ভাল-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যেমন মানুষ সুন্দর-অসুন্দরের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে, সাদা-কালোর প্রভেদ বুঝতে পারে এবং সুগন্ধ ও দুর্গন্ধ ধরতে পারে, তেমনিভাবে তাদের প্রকৃতির অভ্যন্তরেও একটি আলো রয়েছে, যা সৎ ও অসৎ-এর মাঝে পার্থক্য করার ব্যাপারে তাদেরকে পথ প্রর্দশন করে। সূরা কিয়ামার এক আয়াতে বলা হয়েছে-
بَلِ الْاِنْسَانُ عَلٰى نَفْسِهِ بَصِيْرَةٌ .
বরং মানুষ নিজের মন সম্পর্কে সচেতন। অন্য এক স্থানে রয়েছে--
فَاَلْهَمَهَا فُجُوْرَهَا وَ تَقْوٰهَا
বস্তুত তাকে তার পাপকর্ম ও পরহেযগারী সম্পর্কে ইল্‌হাম করে দেয়া হয়েছে। আরেক জায়গায় বলা হয়েছে--
اِنَّا هَدَيْنٰهُ السَّبِيْلَ .
নিশ্চয়ই আমি তাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছি।
যাদের এই আলো রিপু ও কামনা-বাসনার অনুসরণ এবং দুনিয়ার মায়া-মোহের দরুন নিভে যায়, তারা আত্মিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ মৃতে পরিণত হয়। নবী-রসূলগণ তাঁদের শিক্ষার সুতীব্র আলোকচ্ছটা যত প্রবলভাবেই তাদের ওপর সম্পাত করুন না কেন, তাদের মৃত আত্মায় কোন স্পন্দনই পরিলক্ষিত হয় না। এমনি লোকদের ব্যাপারে এরশাদ হয়েছে-
إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتٰى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِيْنَ .
হে নবী, তুমি মৃতদের শোনাতে পারবে না। কালাদেরও তোমার ডাক শোনাতে সক্ষম হবে না যখন তারা পেছন ফিরে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। আরেক আয়াতে বলা হয়েছে
إِنَّمَا يَسْتَجِيبُ الَّذِينَ يَسْمَعُونَ وَالْمُوْتَى يَبْعَهُهُمُ اللَّهُ ثُمَّ إِلَيْهِ يُرْجَعُونَ .
তোমার আমন্ত্রণ কবুল করবে শুধুমাত্র তারাই, যারা শোনে। আর যারা মৃত; আল্লাহ্ই তাদেরকে তুলবেন। অতপর তাদের তাঁর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
সূরা বাকারার শুরুতে যেসব লোকের অন্তরে মোহর মারার উল্লেখ করা হয়েছে তারা এমনি ধরনের লোক। কিন্তু যাদের অন্তরে এ আলোর জ্যোতি বিদ্যমান, তা যতই আবছা এবং দুর্বল হোক না কেন, নবিগণ আয়াতের তেলাওয়াতের মাধ্যমে তাকে উজ্জ্বল করে দেন।
এ ব্যাখ্যার পর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নবী করীম (সঃ) আমাদের প্রকৃতিগ্রাহ্য পন্থায়ই আমাদের পবিত্রতা সাধন করেছেন। আমাদের প্রকৃতির মধ্যে ভাল ও মন্দ চিনে নেবার যে মৌলিক যোগ্যতা বিদ্যমান, তিনি সর্বাগ্রে সেগুলোকে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন করে উদ্ভাসিত করে তুলেছেন এবং তারপর সেগুলোর ওপর নিজের শিক্ষার বুনিয়াদ স্থাপন করেছেন।
কিন্তু পবিত্রতা সাধনের ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে, এটি কোন একক ও সহজ কাজ নয়। বরং কয়েকটি অংশে সংযোজিত। এর আলোচ্য বিষয় হচ্ছে মানব হৃদয়, যা জ্ঞান ও অনুশীলন- এই দুটি বিষয়ে সংগঠিত। এ কারণে পবিত্রতারও দুটি দিক রয়েছে। জ্ঞানের পবিত্রতা ও আমল বা অনুশীলনের পবিত্রতা। এই প্রেক্ষাপটে পবিত্রতা মানুষের সমস্ত আমল এবং যাবতীয় বিশ্বাসের ওপর পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। যেহেতু মানুষের যাবতীয় আমল বা কর্মের উৎসমূল হচ্ছে আকীদা বা বিশ্বাস, কাজেই পয়গম্বর (সঃ) তাঁর শিক্ষায় সর্বপ্রথম এই আকীদা অর্থাৎ, মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধির পবিত্রতা সাধন করেন।
জ্ঞানের পবিত্রতা অর্থ হচ্ছে, মানুষের জ্ঞান যাবতীয় মলিনতা ও আবর্জনা থেকে এমন পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠবে, যাতে করে সে চিন্তা-দর্শনের যাবতীয় ক্ষেত্রে যে কোন স্খলন-পতন থেকে বেঁচে থাকতে পারে। যদি কখনও রিপু বা শয়তানের প্রতারণায়-তাতে কিছু আবর্জনা জমে ওঠে, তখন যাতে সামান্য লক্ষ্যের মাধ্যমেই তা অপসারিত হয়ে যায়। আর আমল বা ধর্মের পবিত্রতার অর্থ জীবনের কোন উত্থান-পতনেই যেন মানুষের কোন পদক্ষেপ রৈপিক কামনা-বাসনার নেতৃত্বে উত্থিত হতে না পারে। বরং প্রত্যেকটি পদক্ষেপই যেন আল্লাহ্ তাআলার ইচ্ছা অনুযায়ী হয় এবং রিপুর দুর্বুদ্ধিতা কিংবা উত্তেজনার দরুন কোন ভ্রান্ত কার্যকলাপ সংঘটিত হয়ে গেলেও যেন অবগতির সঙ্গে সঙ্গে ভ্রান্ত সেই পদক্ষেপের জন্য অনুতাপ সহকারে তার সংশোধন করে নিতে পারে। সূরা আরাফে এমনি লোকদের প্রশংসায় এরশাদ হয়েছে-
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَنِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمُ مُبْصِرُونَ .
যাদের মনে আল্লাহর ভয় রয়েছে, কখনও যদি তাদের ওপর শয়তানের ছোঁয়া লেগে যায়, তখন সঙ্গে সঙ্গে তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং সহসাই তাদের আত্মোপলব্ধি ফিরে আসে।
এবার শুধু ইলম বা জ্ঞানের পবিত্রতার বিষয়টি নিয়েই চিন্তা করা যাক। এর কতগুলো দিক হতে পারে, দেখা যাক। একজন কৃষক, যে ক্ষেতে লাঙ্গল চালায়, সেও চিন্তা-ভাবনা করে আর একজন দার্শনিক, যিনি সৃষ্টি-রহস্যের জটিলতার সমাধান খুঁজে বের করেন, তিনিও চিন্তা-ভাবনা করেন। কিন্তু এ দু'জনের চিন্তা-ভাবনায় বিপুল পার্থক্য। কৃষকের চিন্তার যেখানে শেষ, দার্শনিকের চিন্তার প্রথম ধাপটিও তার চাইতে বহু বহু গুণ এগিয়ে। আর একজন দার্শনিকের চিন্তা-ভাবনার যেখান থেকে সূচনা, তা সাধারণ মানুষের যাবতীয় জ্ঞান ও বিদ্যার সপ্তর্ষিমন্ডলের ঊর্ধ্বে।
তেমনিভাবে তাদের একজনের সন্দেহ-সংশয় হচ্ছে অন্যের অনুকরণজনিত, যাতে সত্য ও বাস্তবতার সাধারণ আঘাত সহ্য করারও শক্তি থাকে না। ফলে অতি সহজেই তা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় (অল্পেই তারা সন্দেহমুক্ত হয়ে যেতে পারে)। পক্ষান্তরে অন্য জনের ভ্রষ্টতাসমূহ তার স্বপক্ষে যুক্তি ও দর্শনের বহু দলিল-প্রমাণ এনে উপস্থাপিত করে। সেগুলোকে পরাভূত করার জন্যে অধিকতর শক্তিশালী প্রমাণের প্রয়োজন হয়। কাজেই কোরআন যদি গোটা মানব জাতির সমস্ত শ্রেণীর পবিত্রতা সাধনের জন্যে এসে থাকে, তা হলে তার যুক্তি এবং প্রমাণ উভয়টিই সন্তোষজনক হওয়া প্রয়োজন। প্রথম ব্যক্তিকে সে যা দেবে তার মান যেন কোনক্রমেই তার যোগ্যতা ও বুদ্ধির ঊর্ধ্বে না হয় এবং তার ভুল -ভ্রান্তির সংশোধনকল্পে এমন সহজ-সরল ও হৃদয়গ্রাহী যুক্তি-প্রমাণ উত্থাপন করবে, যাতে সেগুলোর আকর্ষণীয়তায়ই সে মুগ্ধ হয়ে পড়ে। তেমনিভাবে দ্বিতীয় লোকটিকে যা শেখাবে, তার মান এমন উচ্চ হতে হবে, যাতে তার মন সন্তুষ্ট হতে পারে এবং তার আত্মায় একটা প্রশান্তির সৃষ্টি করে। আর এভাবে তার কাছ থেকে যা ছিনিয়ে নেবে, সেগুলোকে এমনি অটল ও সুদৃঢ় যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে ছিনিয়ে নেবে, যাতে দর্শন, কিংবা যুক্তিশাস্ত্রের কোন শক্তিই তা উদ্ধার করতে না পারে।
বিষয়টির আরও একটি প্রণিধানযোগ্য দিক রয়েছে। তাহল নবী-রসূলগণের ব্যাপারে একথা সবারই জানা যে, তাঁরা নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বেও পরিপূর্ণ জ্ঞান-বুদ্ধির অধিকারী। তাঁরা নিজেদের পবিত্র-পরিচ্ছন্ন প্রকৃতির আলোকে জ্ঞান ও কর্মের সেসকল ধাপ অতিক্রম করে নিতেন যা অন্যেরা ওহী ও ইলহামের দিকনির্দেশনা সত্ত্বেও অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু ইলম ও আমলের এমন সুউচ্চ মর্যাদা লাভ সত্ত্বেও রসূলগণের তৃষ্ণা ও আগ্রহাতিশয্য যথাস্থানে অব্যাহত থেকে যেত। যতক্ষণ পর্যন্ত ওহীরূপী রহমত অবতীর্ণ না হত ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের সে তৃষ্ণার অবসান হত না। তাঁরা নিজেদের আগ্রহাতিশয্য দূর করার জন্য এবং নিজের অন্তরকে অধিকতর আলোময় করে তোলার উদ্দেশে সর্বক্ষণ আল্লাহর ওহীর জন্য অপেক্ষা করে থাকতেন। ওহীর এ জ্যোতি তাঁদের এতই প্রিয় ছিল যে, তাঁরা ক্রমাগত তা বৃদ্ধির জন্য উদগ্রীব হয়ে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা করতে থাকতেন -
رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا
হে আমার পালনকর্তা! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দাও।
আর তা লাভ করার পর জড়জগতের যাবতীয় সাহায্য-সহায়তার ব্যাপারে তাঁরা সম্পূর্ণ পরাঙ্মুখ এবং দুনিয়ার সমস্ত বিরোধিতার ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে যেতেন। সুতরাং সূরা হিজরে ইসলাম বিরোধীদের মন্দাচার ও ধূর্ততার আলোচনার পর নবী করীম (সঃ)- কে এভাবে সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে-
فَاصْفَحِ الصَّفْحَ الْجَمِيلَ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ الْخَلَّاقُ الْعَلِيمُ وَلَقَدْ سَبْعًا مِنَ الْمَثَانِي وَ الْقُرْآنَ الْعَظِيمِ لَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ وَلَا تَحْزَنُ عَلَيْهِمْ وَاخْفِضُ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ .
অতএব সুন্দরভাবে ক্ষমা করে দাও। নিশ্চয়ই তোমার পালনকর্তা সৃষ্টিকারী এবং পরিজ্ঞাত। আর আমি তোমাকে দান করেছি সাতটি পুনরাবৃত্ত বিষয় এবং কোরআনে হাকীম। তা ছাড়া আমি তাদের (কাফেরদের) কোন কোন দলকে যা কিছু দেবার দিয়েছি। সেদিকে দেখো না কিংবা সেজন্য দুঃখ করো না। আর যারা মুমিন তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করো।
এ আয়াতটি সেই সত্যেরই একটি প্রকৃষ্ট সাক্ষ্য যে, কোরআন মজীদ এবং তার আয়াতসমূহের মাঝে যে শক্তি নিহিত রয়েছে, তা দুনিয়ার যাবতীয় ধন-সম্পদ এবং সৈন্যসেনার মধ্যেও নেই। ইমাম মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী উল্লেখিত আয়াতের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা প্রসংগে লেখেছেনঃ
আল্লাহ্ তাআলা মহানবী (সঃ) কে বলেন, এই আধ্যাত্মিক সৈন্য-সেনার দ্বারা তুমি তার চেয়ে অনেক বেশী সাহায্য পেতে পারবে, যতটা তুমি পার্থিব শক্তি-সামর্থ্যবানদের দ্বারা আশা কর। সুতরাং নামায পড় এবং কোরআন তেলাওয়াতে দৃঢ় থাক। আর যেসব নামাযী মুসলমান তোমার সাথে রয়েছে তাদেরকে সাথে নিয়ে মুশরিকীন এবং বিরুদ্ধবাদীদের ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে যাও।
এতে প্রতীয়মান হয় যে, ইলম ও আমলের অস্বাভাবিক শক্তি যোগ্যতার প্রতিভূ নবী-রসূলগণ (আঃ) ও অধিকতর পবিত্রতা অর্জনের জন্যে এই আয়াতসমূহের মুখাপেক্ষী ছিলেন। এসব আয়াতের দিশাতেই তাঁরা সঠিক লক্ষ্যের সন্ধান লাভ করেছেন। এগুলোর জ্যোতিতেই তাঁদের আত্মার দ্বার উন্মোচিত হয়ে গেছে এবং আলোয় আলোকময় হয়ে ওঠেছে। তখন তাঁর প্রেমে আত্মা পাগলপারা হয়ে رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا )রাব্বি যিদনী ইলমান)-এর জপ করতে শুরু করেছে। আর আকাঙিক্ষত জ্ঞান লাভ হওয়ার সময় তার উন্মাদনা, আত্মবিস্মৃতি এবং আগ্রহ ও ক্ষিপ্রতার অবস্থা এমনি পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, গায়েবী শিক্ষাগুরু তাঁকে لَا تَعْجَلُ بِالْقُرْآنِ )লাতা জাল্ বিল্ কোরআন) অর্থাৎ কোরআনের ব্যাপারে ক্ষিপ্র হয়ো না বলে সাদর ভর্ৎসনা করেন।
যে কোরআনে হাকীমের আয়াতসমূহের এহেন মর্যাদা, তাকে এমন কিছু আইন-কানুন বা নীতি-নিয়ম, কিছু ওয়াজ-নসীহত বা উপদেশবাণী আর কতিপয় গল্প-কাহিনীর বিক্ষিপ্ত একটা সংকলন মাত্র বলে ধারণা করা এবং একে বুঝবার জন্য শুধু সামান্য চিন্তা-ভাবনা ছাড়া অন্য কোন কারণ-উপকরণের সাহায্যের দরকার আছে বলে মনে না করা একান্তই পরিতাপের বিষয় এবং মারাত্মক বিভ্রান্তি।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কিতাবের তা’লীম

📄 কিতাবের তা’লীম


'তা'লীমে কিতাব' অর্থ কোরআনের শিক্ষা। কিন্তু আয়াতের এ প্রসঙ্গটি ওপরে আলোচিত হয়ে গেছে। 'হেকমত' সম্পর্কে পৃথকভাবে আলোচনা করা হবে। কাজেই কিতাব বলতে সমগ্র কোরআনকে উদ্দেশ করা যায় না। বরং এর শুধুমাত্র সে অংশটুকু হতে পারে, যা আদেশ-নিষেধ এবং নীতি-পদ্ধতি ও আইন-কানুন সংক্রান্ত। এভাবে বিষয়টিকে নির্দিষ্ট করার কারণ এই যে, কোরআনের বিভিন্ন স্থানে 'কিতাব' শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, যার কয়েকটি প্রসিদ্ধ অর্থ নিম্নরূপ-
১। আসমানী 'কিতাব'-যা আম্বিয়ায়ে কেরামের ওপর নাযিল হয়েছে। যেমন, ذَالِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيْهِ এটি একটি আসমানী কিতাব বা গ্রন্থ, যাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
২। আল্লাহ্ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত সিদ্ধান্ত এবং নির্দিষ্ট নিয়তি। যেমন, وَمَا أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ إِلَّا وَلَهَا كِتَابٌ مَعْلُوْمٌ. আর আমি কোন জনপদকেই ধ্বংস করিনি, কিন্তু তার জন্য একটা নির্দিষ্ট অবকাশ ছিল।
৩। বিধি-বিধান ও আইন-কানুন। যেমন, لا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ .
বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা করো না, যতক্ষণ না আইন কর্তৃক নির্ধারিত সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায়।
৪। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সিদ্ধান্তসমূহের রেজিস্টার বা দপ্তর। যেমন, وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٌ - কাঁচা বা চিঠা এমন কোন বিষয়ই নেই যে একটি প্রকৃষ্ট ‘কিতাবে’ লিখিত নেই।
৫। আমলনামা বা কর্ম বিবরণী। যেমন أَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ. কিন্তু সেব্যক্তি যে তার আমলনামা ডান হাতে পাবে।
আমাদের ধারণা, নিম্নের আলোচ্য আয়াতসমূহে 'কিতাব' শব্দটি আদেশ-নিষেধ সংক্রান্ত নির্দেশ এবং বিধি-বিধান অর্থেই ব্যবহার করা হয়েছে।
কোরআন মজীদে এই অর্থে 'কিতাব' শব্দের ব্যবহার যথেষ্ট স্পষ্ট। সুতরাং সূরা বাকারার যেখান থেকে সংবিধান পরিচ্ছেদ আরম্ভ হয়, প্রায় বিধানই كُتِبَ (কাতাবা) অথবা كُتِبَ (কুতিবা) শব্দের দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ - كُتِبَ عَلَيْكُمُ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتَ - كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالَ - كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ.
প্রভৃতি। আবার অনেক জায়গায় পরিষ্কারভাবেই 'কিতাব' শব্দের দ্বারা প্রচলিত আইনকে উদ্দেশ করা হয়েছে। যেমন, وَلَا تَعْزُمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ . . .
'কিতাব' শব্দের অর্থ হচ্ছে ইদ্দতের সময়। সূরা আহযাবে রয়েছে- وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللهِ এ আয়াতে 'কিতাব অর্থ উত্তরাধিকার আইন।
ফলকথা, কোরআন মজীদে আইন ও সংবিধান অর্থে 'কিতাব' শব্দটির ব্যবহার যথেষ্ট পরিচিত। আর যেহেতু আলোচ্য আয়াতে কোরআন মজীদের সাংগঠনিক উপাদানসমূহের বিশ্লেষণ উপলক্ষে এতে কি কি উপাদান বিদ্যমান তাও বলে দেয়া হয়েছে, কাজেই স্থান-কাল ও পাত্রের চাহিদা অনুযায়ী এখানে 'কিতাব' বলতে সংবিধান ও আইন বিষয়ক অংশটিকেই বুঝতে হয়।
এ ব্যাখ্যার দ্বারা খোদায়ী শিক্ষার তাৎপর্য পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়, তাতে আমাদের প্রকৃতির চাহিদার প্রতি এতটা লক্ষ্য রাখা হয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদেরকে যাবতীয় অস্বাভাবিক জঞ্জালমুক্ত না করা হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আইন বা সংবিধানের আনুগত্যের কোন দায়-দায়িত্ব আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি।
প্রকৃতির উদাহরণ অনেকটা পাকস্থলীর মত। পাকস্থলী যেমন দূষিত খাদ্যের ব্যবহার কিংবা তাতে আবর্জনা জমা হয়ে গেলে তার খাদ্যস্পৃহা হারিয়ে বসে এবং তখন কোন সুস্বাদু বস্তুতেও কোন আগ্রহ সঞ্চার করতে পারে না, তেমনিভাবে বাজে কল্পনা ও কুসংস্কারের প্রবলতার দরুন প্রকৃতিও তার উৎকর্ষণস্পৃহা হারিয়ে ফেলে এবং অতপর কোন সৎকর্মের প্রতিও আকৃষ্ট হতে পারে না। কাজেই এমতাবস্থায় যেমন একজন কবিরাজ প্রথমে পাকস্থলীকে দূষিত আবর্জনা থেকে মুক্ত করে তার খাদ্য গ্রহণের আগ্রহ যথাস্থানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন, তেমনিভাবে একজন আধ্যাত্মিক চিকিৎসকও অন্তরকে প্রাকৃতিক যাবতীয় অপরিচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করে তাতে প্রকৃত ক্ষুধার সঞ্চার করেন। এ আগ্রহ সঞ্চারিত হয়ে যাবার পর শরীয়ত ও দ্বীনের প্রতিটি বিষয় গ্রহণ করার জন্য তেমনিভাবে সে উদগ্রীব হয়ে ওঠবে, যেমন একজন তৃষ্ণার্ত পানির জন্যে এবং একজন ক্ষুধার্ত খাবারের জন্যে উদগ্রীব হয়েও উঠে। কোরআন মজীদ এ অবস্থার প্রতি এভাবে আলোকপাত করেছেঃ
رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا تُنَادِى لِلْإِيْمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ .
হে পরওয়ারদেগার! আমরা একজন আহবানকারীকে শুনেছি, তোমার প্রতি ঈমান আনার জন্য আহবান করে যাচ্ছে যে, হে মানবকুল! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। অতএব, আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদিগকে ক্ষমা করে দাও এবং আমাদিগকে পাপমুক্ত করে দাও। আর আমাদের মৃত্যু দাও তোমার অনুগত বান্দাদের সাথে।
এতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসে যায়।
১। গোটা শরীয়তের উৎসমূল হচ্ছে প্রকৃতির কতিপয় মৌলিক তত্ত্ব। 'এক' থেকেই যেমন শ' এবং হাজারের উদ্ভব হয়, তেমনিভাবে সেই কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের অনুষংগ ও ফলাফলের প্রেক্ষিতেই ধর্মের সমস্ত বিশ্বাস ও কর্ম অস্তিত্ব লাভ করে। সেজন্যেই ইসলামকে বলা হয়েছে প্রকৃতির ধর্ম।
فطرة اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ - ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
এটি আল্লাহ্রই বানানো প্রকৃতি, যার ভিত্তিতে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ্র (তৈরী) প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ বৈধ নয়। এটাই হচ্ছে (ইবরাহীম কর্তৃক প্রচারিত) সহজ-সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা উপলব্ধি করে না।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 হেকমতের শিক্ষা

📄 হেকমতের শিক্ষা


তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে 'হেকমতের' শিক্ষা। 'হেকমত' সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই 'হেকমত' কোরআনের একটা অংশ, না তা থেকে বিচ্ছিন্ন কোন বিষয়? আমাদের বিশ্বাস, আল্লাহ্র কালাম কোরআন মজীদ যেমন আল্লাহ্ আয়াত, নিদর্শন ও আহকাম বা বিধানসমূহকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে, তেমনিভাবে হেকমত বা জ্ঞান, দর্শন, তত্ত্ব ও রহস্যসমূহকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিন্তু আমাদের এ দাবী অবশ্য তাঁদের ধারণার বিরুদ্ধে যাবে, যাঁদের মতে হেকমত বলতে হাদীস কিংবা অন্যান্য কতিপয় জ্ঞানকে উদ্দেশ করা হয়েছে। আর যেহেতু কোন কোন বিশিষ্ট মনীষীর মতও তাই, যেমন ইমাম শাফেয়ী (রঃ) প্রমুখ। কাজেই বিষয়টি উপেক্ষা করা কঠিন। অতএব, দেখতে হবে, যাঁরা হেকমত বলতে হাদীস বুঝেন, তাঁদের প্রমাণ কি?
তাঁদের প্রমাণ হচ্ছে যে, আলোচ্য আয়াতে 'হেকমত' শব্দটি 'কিতাব' শব্দের সংগে এসেছে। আর তারা 'কিতাব' অর্থে সামগ্রিকভাবে কোরআন মজীদকে বুঝেন। কাজেই অপরিহার্যভাবেই 'হেকমত' শব্দের দ্বারা অন্য কোন কিছু বুঝতে হয় (যা কোরআন নয়)। আর বলাই বাহুল্য, কোরআনের পরে হাদীস ছাড়া অন্য কোন বস্তু এ শব্দের অর্থ হতেই পারে না।
কিন্তু উল্লিখিত বিতর্কের দ্বারা একথা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, প্রমাণটি যথেষ্ট শক্ত নয়। আমাদের ব্যাখ্যানুসারে উল্লিখিত আয়াতে 'কিতাব' অর্থ বিধান ও নির্দেশাবলী। কাজেই 'হেকমত'-এর জন্য স্বয়ং কোরআন মজীদেই যথেষ্ট জায়গা রয়েছে-এর দ্বারা হাদীস কিংবা কোরআন বহির্ভূত অন্য কোন বস্তু উদ্দেশ করা অপরিহার্য নয়। অবশ্য এটা স্বতন্ত্র কথা যে, হাদীসেও (বিপুল) হেকমত রয়েছে। হাদীসের মর্যাদা বহু ঊর্ধ্বে। গোটা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য কোরআনের অব্যবহিত পরেই তার স্থান। এতেও কোরআনী হেকমত বা দর্শনের এক বিপুল ভাণ্ডার নিহিত। তা ছাড়া হাদীসেই যদি হেকমত না থাকবে, তা হলে থাকবে কোথায়? কিন্তু একথা যথার্থ নয় যে, আলোচ্য আয়াতে 'হেকমত' শব্দটি হাদীস অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন কারণ-উপকরণ এ ধারণার পরিপন্থী। তার কয়েকটির প্রতি আমরা এখানে ইংগিত করছি -
১। বেশ কতিপয় আয়াতে 'হেকমত' বুঝাতে গিয়ে (يتلی )ইউতলা(,انزل )উনযিলা) ও (اوحی )উহিয়া) প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ব্যবহার হাদীসকে বুঝাবার উদ্দেশে কোরআনের কোথাও নেই। যেমন-
وَأَنْزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ مَالَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ .
আর আল্লাহ্ তোমার প্রতি কিতাব ও হেকমত অবতীর্ণ করেছেন এবং সেসব বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা তোমরা (ইতিপূর্বে) জানতে না। অন্য জায়গায় আছে-
وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَى فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللهِ وَالْحِكْمَةِ .
তোমাদের ঘরে আল্লাহর যেসব আয়াত এবং হেকমত পাঠ করা হয়, সেগুলো স্মরণ রেখো। আরো এক জায়গায় ধর্মের মৌলিক বিষয়সমূহের আলোচনার পর বলা হয়েছে-
ذَالِكَ مِمَّا أُوحِيَ إِلَيْكَ رَبُّكَ مِنَ الْحِكْمَةِ -
তোমাদের পরওয়ারদেগার তোমাদের কাছে যে হেকমত ওহী (প্রত্যাদেশ) করেছেন, এটা তারই মধ্য থেকে।
২। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোরআন মজীদের দলিল-প্রমাণগুলোকে 'হেকমতে বালেগাহ' শব্দে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং স্বয়ং কোরআন মজীদকে 'কোরআনে হাকীম' ও 'কিতাবে হাকীম' বলে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন, বলা হয়েছেঃ يس - وَالْقُرْآنِ الْحَكِيمِ - حِكْمَةَ بَالِغَةً فَمَا تُغْنِ النُّذُرُ .
৩। হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ
وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ .
স্মরণ কর, যখন আমি তোমাকে কিতাব, হেকমত, তওরাত এবং ইঞ্জীল-এর শিক্ষা দিয়েছি।
এ আয়াতে কিতাব ও হেকমতের পর এরই ব্যাখ্যাস্বরূপ তওরাত ও ইঞ্জীল-এর উল্লেখ করা হয়েছে। 'কিতাব' শব্দের ব্যাখ্যা করা হয়েছে তওরাত আর হেকমত-এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে ইঞ্জীল। পণ্ডিত মনীষীরা জানেন যে, তওরাত প্রধানত আইন-কানুন ও সাংবিধানিক বিষয় সম্বলিত গ্রন্থ আর ইঞ্জিল হচ্ছে যুক্তি-প্রমাণ ও উপদেশাবলীর একটা সংকলন। প্রথমোক্তটিতে যুক্তি-প্রমাণ ও উপদেশের অংশ অতি অল্প। পক্ষান্তরে শেষোক্তটিতে নীতি-বিধানের আলোচনা নামমাত্র। সংবিধান ও আইন-কানুন সম্পর্কে ইঞ্জীল তওরাতের প্রত্যয়ন করেই দায়িত্বমুক্ত হয়ে যায়। তওরাতের এই সাংবিধানিক গুরুত্বের কারণেই তাকে 'কিতাব' শব্দে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং ইঞ্জীলকে তার যুক্তি-দর্শন ও উপদেশাবলীর জন্য 'হেকমত' বলা হয়েছে।
অপরপর কয়েকটি আয়াতেও এ ধারণার সমর্থন পাওয়া যায়। বলা হয়েছেঃ
وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَاتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالْحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ .
হযরত ঈসা যখন প্রকৃষ্ট ও প্রকাশ্য মু'জেযা নিয়ে আগমন করলেন, তিনি আমন্ত্রণ জানালেন, হে জনগণ! আমি তোমাদের কাছে 'হেকমত' নিয়ে এসেছি এবং এমন কোন কোন বিষয় নিয়ে এসেছি যা নিয়ে তোমরা বিবাদ করছ, যাতে করে সেগুলো বিশ্লেষিত করতে পারি।
এ সব কারণ-প্রকরণের ভিত্তিতে 'হেকমত' বলতে 'হাদীস' অর্থ করা আমাদের মতে যথার্থ নয়। প্রকৃতপক্ষে এ ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল 'কিতাব' এবং 'হেকমত' শব্দ দুটির একত্রিত হয়ে যাওয়ার দরুন। কিন্তু আমরা যে দিকটি বিশ্লেষিত করেছি, তার আলোকে 'কিতাব' ও হেকমতের পরিসীমা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। যার পরে আর কোন ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ থাকে না।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 হেকমত শব্দের আভিধানিক বিশ্লেষণ

📄 হেকমত শব্দের আভিধানিক বিশ্লেষণ


এবার সংক্ষেপে 'হেকমত'কে অভিধান এবং তার ব্যবহারের আলোকেও দেখে নেয়া বাঞ্ছনীয়। মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী তাঁর 'মুফ্রাদাতুল কোরআন' গ্রন্থে এ শব্দটির সবিস্তার আলোচনা করেছেন। নিম্নে তারই প্রয়োজনীয় সার-সংক্ষেপ তুলে দেয়া হয়েছে-
অভিধানে ‘হুকুম’ অর্থ মীমাংসা করা, সিদ্ধান্ত নেয়া। তা ন্যায়ই হোক কিংবা অন্যায়, যথার্থ হোক অথবা ভ্রান্ত। কোরআনে আছে— مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ (তোমাদের কি হল। কেমন ফয়সালা করছ তোমরা!) أَفَحُكُمُ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ (তারা কি জাহেলিয়াত যুগের মীমাংসা কামনা করে?)
তা ছাড়া এই শব্দটি সে শক্তির উদ্দেশেও বলা হয়, যার আলোকে এ মীমাংসা সম্পাদিত হয়। তখন তার অর্থ হয় বিচার-বুদ্ধি। রইল ‘হেকমত’ শব্দটি। এটি সে শক্তির জন্য বলা হয়, যা যথার্থ মীমাংসার উৎসমূল। হযরত দাউদ (আঃ)-এর প্রশংসা উপলক্ষে আল্লাহ্ বলেছেন أَتَيْنَاهُ الْحِكْمَةَ وَفَصْلَ الْخِطَابِ - (আমি তাঁকে ‘হেকমত’ এবং সিদ্ধান্তমূলক কথা বলার যোগ্যতা দিয়েছি।)
এখানে ক্রিয়াকে সে শক্তির পরে বলা হয়েছে, যা সে ক্রিয়ার উৎসমূল। আর সিদ্ধান্ত বা মীমাংসা যেমন হেকমতের কার্যকলাপের প্রতিক্রিয়া, তেমনিভাবে নৈতিক পবিত্রতা এবং শিষ্টাচারও তারই ক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। সে জন্যেই আরবের অধিবাসীরা এ শব্দটি সে শক্তিকে বুঝার জন্য ব্যবহার করত, যা বুদ্ধির পরিপক্বতা এবং শিষ্টাচার উভয়ের জন্যেই ব্যাপক। আর বুদ্ধিমান ও শিষ্টাচারীকে বলা হত ‘হাকীম’। তেমনিভাবে ‘হেকমত’ শব্দটি ‘প্রকৃষ্ট সংশোধন’ অর্থেও ব্যবহৃত হত, যার উদ্দেশ্য এমন প্রজ্ঞাপূর্ণ কথাকে বুঝানো, যা মন ও মেধা উভয়ের কাছেই পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। ‘হেকমত’ শব্দটি এ সমস্ত অর্থেই আরবী ভাষায় ব্যবহৃত। আর যেহেতু আরবরা শব্দটির এ সমস্ত দিক সম্পর্কেই সম্যক অবগত ছিল, কাজেই কোরআন এবং পয়গম্বর (সঃ) একে ব্যবহার করেছেন।
এ প্রসংগে মহানবী (সঃ) বলেছেন, কবিতার মধ্যে কোন কোনটা ‘হেকমত’। অর্থাৎ, সব কবিতাই পথভ্রষ্টতা নয়; কিছু কবিতা এমনও রয়েছে যাতে সত্য কথা বলা হয়েছে এবং কল্যাণের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। অতপর আল্লাহ্ তাআলা একে তার সর্বাধিক উত্তম অর্থে ব্যবহার করেছেন; অর্থাৎ, ওহীর অর্থে। ওহীকে যেমন ‘নূর’, ‘প্রমাণ’, ‘যিকর’, ‘রহমত’ প্রভৃতি শব্দের দ্বারা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তেমনিভাবে ‘হেকমত’ শব্দের দ্বারাও তার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন, (আল্লাহ্) নিজের সত্তার জন্য ‘হাকীম’ ও ‘আলীম’ শব্দ ব্যবহার করেছেন .....।
ওপরের আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, 'হেকমত' বক্তব্য ও বক্তা উভয়ের মধ্যেই বিদ্যমান থাকে। তার তাৎপর্য হচ্ছে সেই দৃঢ়তা ও পরিপক্বতা, যা একান্তই বুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। আগুনের অস্তিত্ব যেমন উষ্ণতার দ্বারা প্রতীয়মান হয়, তেমনিভাবে 'হেকমত' (প্রজ্ঞা)-ও তার ক্রিয়াকলাপেই চেনা যায়। এটা যখন কারো ভেতর সৃষ্টি হয়, তখন তার মধ্যে সত্য উপলব্ধি করার মত একটা যোগ্যতাও জন্মায়। তখন তার মুখ দিয়ে যে কথাটি বেরোয় তা হয় সত্য ও যথার্থ। আর তার দ্বারা যে কার্যানুষ্ঠানই হয় তা হয় সঠিক ও নির্ভুল। কোরআন মজীদে বর্ণিত হযরত লোকমানের কাহিনীতে তার কার্যক্রম সম্পর্কেই বর্ণনা রয়েছে। তা ছাড়া হাদীসেও তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এ জিনিসটিই আল্লাহ্র 'হাত', আল্লাহ্'চোখ'। যে এতে দেখে, তার রাতটিও দিনের মতই উজ্জ্বল হয়ে যায়। সে সংকীর্ণ অন্ধকার পথেও হুমড়ি-হোঁচট থেকে মুক্ত থাকে। সে বিন্দুতে বিশাল সমুদ্র প্রত্যক্ষ করে। সে কারণেই শরীয়তের ছোট একটি নির্দেশকে পর্বততুল্য জ্ঞান করে। অন্যের কাছে যে বিষয়ের গুরুত্ব একটা নুড়ি অপেক্ষা বেশী নয়, সে তারই মধ্যে দেখতে পায় হীরার দ্যুতি।
এমনিভাবে এটা (হেকমত) যখন কোন বাক্যে নিহিত থাকে, তখন সে বাক্য মেধাপথে মনের গভীরে গিয়ে প্রবেশ করে। যাবতীয় দোদুল্যমান অবস্থার তখন পরিসমাপ্তি ঘটে যায়, প্রতিটি সন্দেহ-সংশয় ধুয়ে-মুছে যায়, প্রতিটি অহেতুক দাবী বাতিল করে দেয়, প্রতিটি মিথ্যা যুক্তি ধসে পড়ে।
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا .
'সত্য এসে গেছে, মিথ্যা শেষ হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা স্থিতিহীন।' আর এই হচ্ছে কোরআন মজীদের বৈশিষ্ট্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00