📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কালামের জটিলতা ও সহজবোধ্যতার তিনটি দিক

📄 কালামের জটিলতা ও সহজবোধ্যতার তিনটি দিক


কোন কালাম বা বাণীকে জটিল কিংবা সহজ বলতে হলে তিনটি দিক বিবেচনা করতে হয়ঃ
১। স্বয়ং বাণী হিসেবে। অর্থাৎ, যদি কোন বাক্যের শব্দসমূহ দুর্বোধ্য হয়, বিন্যাসে জটিলতা থাকে, ব্যাকরণিক নিয়ম এবং পরিভাষা যদি সাধারণভাবে প্রচলিত রীতি-বিরুদ্ধ হয়, রূপক-উপমিতি যদি দুর্বোধ্য হয় এবং তুলনাগুলো যদি অস্বচ্ছ হয়, তা হলে সে কালাম বা বাণীকে জটিল বলা যাবে। পক্ষান্তরে শব্দ চয়ন, পরিভাষা প্রভৃতি যদি সাধারণ হয়, বাক্যবিন্যাসে কোন রকম জটিলতা না থাকে এবং ব্যাকরণের প্রচলিত নিয়মের প্রতি যদি যথাযথ লক্ষ্য রাখা হয়, তা হলে সে বাণী বা কালামকে সহজ, মার্জিত এবং জটিলতা বর্জিত বলা যাবে। মির্যা গালেবের যে কাব্য বেদিলের রীতিতে বিন্যস্ত, তা যেকোন লোকের পক্ষে কঠিন এবং বিস্বাদ বলে মনে হবে। কিন্তু যে অংশ তাঁর নিজস্ব রীতিতে বিন্যস্ত, সেগুলো সাবলীলতা, অলঙ্কার ও হৃদয়গ্রাহিতার একান্ত বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
২। বিষয়বস্তু হিসেবে। কোন কোন বিষয়বস্তু নিজেই খুব সহজ হয়। যেমন, কিস্সা-কাহিনী, গল্প-উপন্যাস এবং আইন প্রভৃতি। আর কিছু বিষয় আছে, যা নিজেই জটিল। যেমন-দর্শন, তর্কশাস্ত্র, জ্যামিতি, গণিত, সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতি। প্রথমোক্ত বিষয়সমূহ বিশেষ চিন্তা-ভাবনা কিংবা বিচার-গবেষণার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু দর্শন গ্রন্থ গল্প-উপন্যাসের মত পাঠ করে বুঝা সম্ভব নয়।
৩। যাকে সম্বোধন করা হবে, তার প্রেক্ষিতে। গালেবের একটা অতি সাধারণ গযলও প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠকের জন্য অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু একজন বিশেষজ্ঞ তাঁর অতি কঠিন কবিতাটিও অতি সহজে বুঝে নিতে পারেন।
এসব বিষয়ের প্রেক্ষিতে এখন কোরআন মজীদের সহজবোধ্যতা ও সরলতার কথা চিন্তা করুন। কোরআন মজীদ এমন এক বাণী, যার অলঙ্কারের কোন উদাহরণ আরব, আজম তথা গোটা বিশ্বে নেই। এমন বাণী সম্পর্কে প্রথমোক্ত বিষয়ের দিক দিয়ে কোন আলোচনাই আসতে পারে না। কারণ, বাণীর এহেন ত্রুটি বাস্তব অসমর্থতার দরুনই সৃষ্টি হতে পারে। পক্ষান্তরে কোরআন মজীদ যাঁর বাণী, তিনি যাবতীয় ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। কাজেই কোরআন মজীদ যে যুগে অবতীর্ণ হয়েছে, সে যুগের ভাষা অলঙ্কার ও সাহিত্য শৈলীর যাবতীয় গুণ-বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। এমনকি সে যাদেরকে উদ্দেশ করে বক্তব্য রেখেছে, তারা পৃথিবীতে বাণী শিল্পের সবচাইতে উত্তম সমালোচক ছিল এবং তার প্রতিটি অক্ষরের প্রতি বিদ্বিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও একথা স্বীকার করত যে, এটা একান্তই 'জাদু'। কোরআন তাদের কাছে দাবী করেছে যে, তোমরা এর মত একটি মাত্র সূরা উপস্থাপন কর এবং প্রয়োজনবোধে তোমরা সেজন্য যাবতীয় আসমানী ও যমিনী শক্তিগুলোকে সমবেত করে নাও। কিন্তু তাদের কাছে এ দাবীর এ ছাড়া আর কোন উত্তরই ছিল না যে, 'এটা একান্তই জাদু'।
এমন একটি কালাম বা বাণীতে ব্যাকরণের সাধারণ নিয়ম-নীতির প্রতি লক্ষ্য রাখা, অপ্রচলিত দুর্বোধ্য শব্দাবলী ও পরিভাষার ব্যবহার বর্জন, জটিল ও বিভ্রান্তিকর দ্ব্যর্থবোধক শব্দাবলীর ব্যবহার থেকে বেঁচে থাকা এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয়গুলো এমনই প্রাথমিক পর্যায়ভুক্ত, যে ব্যাপারে আদপেই কোন প্রশ্ন ওঠতে পারে না। সুতরাং এ দিক দিয়ে নিঃসন্দেহে দাবী করা যেতে পারে যে, কোরআন মজীদ একান্তই প্রকৃষ্ট ও সহজ বাণী।
অতপর দ্বিতীয় প্রেক্ষাপটে চিন্তা করা যেতে পারে- অর্থাৎ, বিষয় নির্বাচন ও বর্ণনাভঙ্গির দিক দিয়ে। কোরআন মজীদ স্বীয় আলোচ্য বিষয় ও বর্ণনাভঙ্গির দিক দিয়ে কোন্ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত? যাঁরা কোরআন মজীদের বিভিন্নমুখী বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল তাঁরা এ প্রশ্নের এ উত্তরই দেবেন যে, এটি উল্লিখিত উভয় শ্রেণী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এর সম্পর্কে সাধারণভাবে মুসলমানদের মধ্যে একটা অস্পষ্ট ধারণা সৃষ্টি হয়ে আছে যে, কোরআন আইন-কানুন ও নির্দেশাবলীর একটা সংগ্রহ। এই বিভ্রান্তিতে যেমনি ভুগছে সাধারণ মানুষ, তেমনি ভুগছেন বহু আলেমও। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত লোকেরাও এ ধরনের বিভ্রান্তির শিকার হয়ে আছেন। এর কারণ সম্ভবত এই যে, এরা হারাম-হালাল নির্দেশক একটা মাপকাঠির ঊর্ধ্বে 'দ্বীন'কে অন্য কোন কিছু কল্পনাই করতে পারে না। কাজেই ফেকাহ শাস্ত্রের মৌলিক ও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে যাবার পর অনেকেই কোরআন মজীদের তেলাওয়াতকে শুধুমাত্র বরকতের বিষয় হিসেবে গণ্য করে থাকে। ইলমুল একীন বা সত্য দর্শন সৃষ্টি করা এবং জ্ঞান ও চেতনা বিকাশের দৃষ্টিভঙ্গিতে একে আর তেমন উপকারী বলে বিবেচনা করা হয় না। এসব ধারণা সৃষ্টির এবং বিভ্রান্তির একটা ইতিহাস রয়েছে, যার বিশ্লেষণের স্থান এটা নয়। তথাপি কয়েকটি কারণ সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়া অত্যন্ত জরুরী।
১। প্রথম কথাটি হল, আমাদের ওলামা সম্প্রদায়ের সাধারণ ভুল ধারণা যে, ধর্মের ব্যাপারে যুক্তির কোন অবকাশ নেই। তাঁদের ধারণা, আমরা যেসব বিষয়ের ওপর ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন করি তা নবী ও রসূলগণ বলে গেছেন বলেই করে থাকি। আর নবী-রসূলগণকে কোন যৌক্তিক প্রমাণের দ্বারা নয়, বরং মু'জেযা বা অলৌকিক কার্যকলাপের দ্বারা চিনতে পারি। ধর্মের ব্যাপারে যদি যুক্তির কোন প্রবেশাধিকার থাকত, তা হলে ওহীর কি প্রয়োজন ছিল? তা ছাড়া গায়েবের ওপর ঈমান আনার সংজ্ঞাই বা দেয়া হবে কেন? সহজ কথা এই যে, যাদের কাছে 'দ্বীন' বা ধর্ম এমনি একটা সহজ ও তুচ্ছ বিষয় বলে গণ্য, তারা কোরআন মজীদকে কতিপয় আদেশ ও নিষেধের নীতিমালার অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতেই পারে না। তা ছাড়া এহেন নীতিমালাকে বুঝার জন্যে নিশ্চয়ই বিশেষ চিন্তা-গবেষণার প্রয়োজন তাদের কাছে নেই। যে কেউ একে পড়ে অতি সহজভাবে বুঝে নিতে পারবে।
২। দ্বিতীয় কারণটি হল, গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচলন। যাঁরা দর্শন ও তর্কশাস্ত্রের পর্যালোচনায় মনোনিবেশ করেছেন, তাঁরা কোরআন মজীদকে করা ও না করার বিষয়সমূহের একটা বিক্ষিপ্ত সংগ্রহ এবং ওয়াজ-নসীহতের একটি বিশুষ্ক পাণ্ডুলিপির অতিরিক্ত মর্যাদা দেননি। তাঁরা অত্যন্ত নিম্নমানের এবং প্রকৃতি ও হেদায়াতের পথ থেকে ভ্রষ্ট দর্শনের নিগড়ে জড়িয়ে গেছেন। তাঁরা ধারণা করে নিয়েছেন যে, তৌহীদ ও রেসালাত বিষয়েও দর্শনের মাধ্যমেই দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা যেতে পারে। ধর্মও আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যর্থ। এই ধারণা তাঁদেরকে কোরআন মজীদ থেকে বহু দূরে সরিয়ে দিয়েছে। যেহেতু গ্রীক চিন্তা-দর্শন দীর্ঘকাল পর্যন্ত মানুষের মন-মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল, কাজেই তার প্রভাব মানুষের মনের ওপর এমনভাবে ছেয়ে ছিল যে, কারও কাছে কোরআনের প্রকৃত মাহাত্ম্য কিছুটা বিকশিত হয়ে থাকলেও সে সাধারণ প্রচলিত মতাদর্শের বিরুদ্ধে কিছু বলার মত সাহস করতে পারেনি।
৩। তৃতীয় কারণটি হচ্ছে, তদানীন্তন আরবদের মূর্খতা সম্পর্কে সাধারণ বিশ্বাস, যার প্রতি ইতিপূর্বে আমরা ইঙ্গিত করেছি। পরিতাপের বিষয়, আরবদের সম্পর্কে আমাদের ওলামা সম্প্রদায় এবং আধুনিক শিক্ষিত সমাজ উভয়েই সমানভাবে একই বিভ্রান্তিতে পড়ে রয়েছেন। আলেমদের কাছে তো কোরআনের কোন মাহাত্ম্যই প্রকাশ পায় না, যে পর্যন্ত না তদানীন্তন আরবদেরকে চতুষ্পদ জন্তু অপেক্ষাও নিকৃষ্ট প্রতিপন্ন করা হয়। আর আধুনিক শিক্ষিত সমাজ ইসলামের আবির্ভাবকালীন জাহেল ও বন্য আরবদের মধ্যে মেধা-মস্তিষ্কের সামান্যতম যোগ্যতা কিংবা সামর্থ্যের কথা কল্পনাই করতে পারেন না। তাঁদের ধারণা, কোরআন মজীদ শুধুমাত্র কতিপয় নির্দেশ এবং কতিপয় উপদেশ বাণীর সহজ-সরল একটা সংকলন মাত্র। কাজেই কেউ যদি কোন আরবী পত্র-পত্রিকা বা পুস্তক-পুস্তিকার কোন রকমে উল্টা-সিধা তরজমা করতে সমর্থ হয়েই যেতে পারে, তা হলে সে কোরআনের তফসীর প্রণয়নেরও অধিকার লাভ করে ফেলে। অথচ আরবদের সম্পর্কে এহেন ধারণা একান্তই অবাস্তব। যিনি তাদের সাহিত্য সম্পর্কে সামান্যও পর্যালোচনা করেছেন, তিনি এই বাস্তবতা কোনক্রমেই অস্বীকার করতে পারেন না যে, মেধা ও মস্তিষ্কের দিক দিয়ে জাহেলিয়াত যুগেও আরবরা তাদের সমকালীন যেকোন জাতি থেকে পিছিয়ে ছিল।
সারকথা, সাধারণ-অসাধারণ সবাই কোরআনকে তার প্রকৃত মান থেকে বহু নিম্নে নামিয়ে দেখেছে। সাধারণ সমাজ মানসিক যাতনা এবং বৈজ্ঞানিক জটিলতা থেকে মুক্ত হয়ে থাকে এবং ধর্মকে তারা শুধু বিশ্বাস হিসেবে মান্য করে। হালাল-হারাম জানা এবং ধর্মের বাহ্যিক রীতি-নীতি ও করণীয় বিষয়সমূহ সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্যই তাদের ধর্মের প্রয়োজন। এই প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পর তাদের অতিরিক্ত অন্য কোন কিছুর প্রয়োজনও থাকে না আর তারা এর চাইতে বেশী কোন কিছু চিন্তাও করতে পারে না। পক্ষান্তরে আলেম সমাজ সাধারণতঃ তদানীন্তন আরবদের প্রতি তাদের কুধারণার ফলে কোরআন মজীদের প্রতি মনোনিবেশ করতে পারেন না। তাঁরা কোরআন মজীদকে আইন-কানুন ও নির্দেশাবলীর একটা সংকলন হিসেবে দেখেছেন, যাতে প্রাসঙ্গিকভাবে ওয়াজ -নসীহত আকারে বিগত জাতিসমূহের কিছু কাহিনী এবং পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ও কার্যকলাপ প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া কোন কোন জায়গায় তৌহীদ, আখেরাত প্রভৃতি সম্পর্কেও স্কুল দলিল-প্রমাণের উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে, যা সাধারণ সমাজের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। যারা কোরআনকে মুজেযার ভিত্তিতে স্বীকার করত তাদের জন্য এর অতিরিক্ত কোন কিছুর প্রয়োজন আদৌ ছিল না। কিন্তু যারা এর 'চাইতে বেশী কোন কিছুর প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন, তারা কোরআনকে পাশ কাটানো গ্রীক দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে মজে গেছেন।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কোরআন নাযিলের উদ্দেশ্য

📄 কোরআন নাযিলের উদ্দেশ্য


কোরআন সম্পর্কে এর চেয়ে বেশী খারাপ ধারণার বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। তাই তা দূর করার চেষ্টা করা কর্তব্য।
সর্বাগ্রে এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা দরকার যে, কোরআন নাযিলের উদ্দেশ্য কি?
কোরআনে আদম (আঃ) ও শয়তানের কাহিনী বিভিন্ন সূরায় বর্ণনা করা হয়েছে। এই কাহিনী পাঠে জানা যায়, শয়তান যখন আল্লাহ্ তাআলার হুকুমের বিরুদ্ধে ঈর্ষা ও অহঙ্কারের দরুন আদমকে সেজদা করতে অস্বীকার করে বসে, তখন আল্লাহ শয়তানকে হুকুম করেন-
قَالَ فَاهُبِطُ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَنْ تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَا خَرُجُ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ .
জান্নাত থেকে বেরিয়ে যা। এ বিষয়ে অহঙ্কার করার কোন অধিকারই তোর নেই। বেরিয়ে যা। তুই নিকৃষ্ট অপদস্থদের অন্তর্ভুক্ত।
এতে শয়তান কিছু সময় চাইল এবং ঈর্ষার তোড়ে বললঃ
قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَا قُعْدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ثُمَّ لَا عَنَهُمُ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَ مِنْ خَلْفِهِمْ وَ عَنْ أَيْمَانِهِمْ وَ عَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرُهُمْ شَاكِرِينَ .
যেহেতু তুমি আমাকে গোমরাহ করেছ, আমি তাদেরকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে সকল পথ আগলে বসব। তারপর আমি তাদের কাছে সামনের দিক দিয়ে, পেছন দিক দিয়ে, ডান ও বাম দিক দিয়ে আসব। আর তখন তুমি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবে না।
শেষ পর্যন্ত শয়তান আদমকে বিভ্রান্তিতে ফেলার উদ্দেশে আল্লাহ তাআলার নিকট কিছু সময় চেয়ে নিল এবং তাদেরকে ধোঁকা দিতেও কামিয়াব হয়ে গেল। ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁদের দু'জনকে (আদম ও হাওয়াকে) জান্নাত থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশ এল। অতএব, আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি নির্দেশ দিলেন-
اُهْبِطُوا بَعْضُكُمْ بِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَّتَاعُ إِلَى حِينٍ
তোমরা বেরিয়ে যাও। তোমরা একে অন্যের শত্রুতে পরিণত হয়েছ এবং তোমাদের জন্য একটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকা ও তা উপভোগ করা নির্ধারিত হয়েছে।
আদম এবং তাঁর সন্তান-সন্ততির জন্য পৃথিবীর এই আশ্রয়টি ছিল অত্যন্ত কঠিন। শয়তানের সঙ্গে তাঁদেরকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়, যে কিনা ঈর্ষার জ্বালা ও প্রতিশোধের উন্মাদনায় এমনি মত্ত যে, প্রথম দিনেই চরম পত্র দিয়ে বসে— 'আমি তাদের অগ্র-পশ্চাত সব দিক দিয়ে এসে তাদের পথভ্রষ্ট করব এবং তাদের অধিকাংশকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়ব।' অপর দিকে সে এমনই চতুর ও ধূর্ত যে, একই তুড়িতে আদমের দৃঢ়তার সমস্ত বন্ধনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমতাবস্থায় রহমতে এলাহীর দায়িত্ব ছিল আদমকে এমন একটা অস্ত্র সরবরাহ করা, যা সেই ধূর্ত শত্রু শয়তানের মোকাবিলা করতে গিয়ে কাজে আসবে এবং তাঁর সন্তান-সন্ততি শয়তানের অবিরাম আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। অতএব আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আদম (আঃ) ও তাঁর সন্তান-সন্ততিকে শয়তানের মোকাবিলা করার জন্য সে অস্ত্র সরবরাহ করেছেন এবং নিম্নে বর্ণিত ভাষায় তাঁদেরকে সান্ত্বনা দিয়েছেন-
فَاِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ .
আমার তরফ থেকে অবশ্য আসবে তোমাদের জন্য হেদায়াত (নবী ও শরীয়ত), যারা আমার হেদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের জন্যে না কোন ভয়-ডর আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে।
এ ওয়াদাই সূরা আ'রাফের ৩৫ তম আয়াতেও করা হয়েছে-
يَا بَنِي آدَمَ إِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ رُسُلٌ مِنْكُمْ يَقُصُّونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي فَمَنِ اتَّقَى وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ .
হে বনী আদম! যখন তোমাদেরই মধ্য থেকে তোমাদের জন্য কোন নবী আসেন এবং তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তখন তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। যারা পরহেযগারী অবলম্বন করবে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেবে তাদের জন্য চিন্তা ও ভয়ের কোন কারণ নেই।
শয়তানের দ্বারা দুনিয়াতে ভয় এবং আখেরাতে চিন্তার যে সম্ভাবনা আদমের ছিল, আল্লাহ্ এই অঙ্গীকারের মাধ্যমে তা দূর করে দিয়েছেন।
এখানে এই কাহিনীর নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করব না। তবে শুধু এতটুকু দেখিয়ে দেয়া হবে যে, কোরআনে হাকীম যে মানবীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করেছে এবং মানব জাতির বিকাশের যে ইতিহাস বর্ণনা করেছে, তাতে প্রতীয়মান হয় যে, মানব চরিত্রে যেখানে অসংখ্য গুণ-বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, সেখানে এমন একটি শূন্যতাও রয়েছে, যার ফলে আল্লাহর তরফ থেকে নবী-রসূলগণের আগমন না ঘটলে তারা শয়তানের ফেতনা থেকে নিরাপত্তা লাভ করতে পারত না; বরং তখন প্রতি পদে পদে তাদের জন্য ভয় ছিল প্রকৃতির নিয়ম থেকে সরে গিয়ে পথভ্রষ্টতার অতল গহ্বরে পতিত হওয়ার। অতএব, দুনিয়ায় আদম সন্তানদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নবী-রসূল পাঠানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। তাঁরা পৃথিবীর এই পরীক্ষা ক্ষেত্রে মানুষকে প্রকৃতি ও প্রতিভার কথা স্মরণ করিয়েছেন এবং সত্য-সরল পথের দিকে হেদায়াত করেছেন।
যাঁরা কোরআন সম্পর্কে ওয়াকিফহাল তাঁরা জানেন, কোরআনের পরিভাষায় শয়তান শব্দের অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। জিনদের মাঝে যেমন শয়তান রয়েছে, তেমনি মানুষের মাঝেও। যেভাবে এরা মানুষের ক্রিয়াকলাপ বা আমল -আখলাককে বিভ্রান্ত করে তেমনিভাবে এরা মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির প্রতিও আক্রমণ চালিয়ে তাকে অকেজো করে দেয়। যেমন, সূরা নাস-এর এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন-
الَّذِي يُوَ سُوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجَنَّةِ وَالنَّاسِ .
যারা মানুষের মনে ওয়াসওয়াসা বা সন্দেহের সৃষ্টি করে জিনও মানুষের মধ্য থেকে।
সূরা বাকারার এক আয়াতে রয়েছে-
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ أَمَنُوا قَالُوا أَمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ
এরা যখন মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়, বলে : আমরা ঈমান এনেছি। পক্ষান্তরে যখন নিজেদের সঙ্গী শয়তানের সাথে মিলিত হয়, বলে: আমরা তোমাদেরই সাথে রয়েছি। তাদের ধূর্ততা, পথভ্রষ্টতা এবং মানুষকে গোমরাহ করার কলাকৌশল সম্পর্কে পারদর্শিতার অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-
اِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمُ .
সে' এবং তার দল তোমাদেরকে সেখান থেকে লক্ষ্য করে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। এতে বুঝা যাচ্ছে, এ পৃথিবীতে গোমরাহী ও বিভ্রান্তি যেকোন রূপ ধরে এবং যেকোন দিক থেকে আসুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তা শয়তানের পক্ষ থেকেই আসে। আর জিন ও মানুষের মধ্যে যে দুষ্ট সত্তা সৃষ্টিকে আল্লাহ্র সরল পথ থেকে ভ্রষ্ট ও বিচ্যুত করে, তাদের সবাই শয়তান। শয়তানের রূপ অসংখ্য এবং তার ফাঁদ অগণিত। মানুষের মধ্যে আল্লাহ্ তাআলা জাহেরী ও বাতেনী বা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ যত ক্ষমতা দান করেছেন, সে সবগুলোর অবস্থানই তার জানা। সেসব ক'টি দরজা দিয়েই সে ঢুকতে পারে এবং প্রতিটি রাস্তা দিয়ে বেরিয়েও আসতে পারে। সে রক্ত হয়ে শিরায় শিরায় প্রবাহিত হতে পারে। আবার কামনা-বাসনা ও আবেগের আকার ধরে উত্তেজিত করে। হৃদয়ে রূপ-লাবণ্য হয়ে প্রলুব্ধ করে। প্রেম হয়ে মনের গভীরে তাড়নার সৃষ্টি করে। আশা ও অনুরাগের মায়ায় উচ্ছ্বসিত করে তোলে। আবার নিরাশার ফাঁদ পেতে ধরাশায়ী করে দেয়। অসংখ্য উপদেশমূলক গল্প-কাহিনী এবং দার্শনিক তত্ত্ব তার সংগ্রহে রয়েছে। কখনও সে একজন তার্কিকের মত যুক্তি উত্থাপন করে, কখনও দার্শনিকের মত বিশ্ব রহস্য ও সৃষ্টিতত্ত্বের শিক্ষা দান করে। আবার কখনও বিজ্ঞ রাজনীতিকের মত রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম বিষয়সমূহের বর্ণনা দিতে থাকে। কিন্তু যখন এই সমস্ত উপায়-উপকরণ প্রয়োগ করেও আদম সন্তানের বিরোধিতা ও শত্রুতার আগুন প্রশমিত হয় না, তখন অনেক সময় নবুয়তের দাবীদার হয়ে নবুয়তী করতে আরম্ভ করে। এহেন ধূর্ত ও চতুর শত্রুর অনিষ্ট থেকে মানবকুলকে রক্ষা করার জন্য মহান পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে যে গ্রন্থ দেয়া হবে, তা যদি শুধুমাত্র কতিপয় নিয়ম-নীতি বা আইন-কানুন কিংবা কিছু সংখ্যক উপদেশাবলীর সরল-সহজ একটি সংকলনে পরিণত হয়, তা হলে লক্ষ্য করে দেখুন, এহেন মামুলি একটা হাতিয়ার শয়তানের মত ভয়ঙ্কর শত্রুর মোকাবিলায় কতটুকু কাজে লাগতে পারে!
এটা ছিল একটা প্রাসঙ্গিক বিষয়। আসল কথা হচ্ছে, আদি সেই প্রতিজ্ঞার ভিত্তিতেই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বনী আদমের পথ প্রদর্শনের জন্য নবী-রসূল এবং আসমানী গ্রন্থরাজি নাযিল করেছেন। এমনকি আখেরী নবী (হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কেও একই উদ্দেশে পাঠিয়েছেন, যাঁর সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে, তাঁর বয়ে আনা আলোর জ্যোতি অনন্তকাল পর্যন্ত দুনিয়ায় থাকবে। কোরআনে হাকীমে সূরা জুমুআর এক আয়াতে রসূল (সঃ)-এর প্রশংসা প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে-
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمُ ابْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ .
তিনিই (সেই পরওয়ারদেগার) যিনি নিরক্ষরদের মাঝে তাদেরই একজনকে রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হেকমত বা বিজ্ঞানের শিক্ষা দান করেন।
এটা হযরত ইবরাহীমের সে দোয়া কবুল করারই ঘোষণা, যাতে তিনি নিবেদন করেছিলেনঃ
رَبَّنَا وَابْعَثُ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمُ ابْتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمُ -
ইয়া পরওয়ারদেগার! তাদের মাঝে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ কর, যিনি তোমার আয়াত পাঠ করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমতের তালীম দেবেন এবং তাদের আত্মাকে পবিত্র করে তুলবেন।
এ আয়াতটিতে মহানবী (সঃ)-এর চারটি বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দেয়া হয়েছে- (১) আয়াত পাঠ। (২) পবিত্রকরণ। (৩) কিতাবের তালীমদান এবং (৪) হেকমত বা অভিজ্ঞানের শিক্ষাদান।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 আয়াতের তেলাওয়াত ও পবিত্রতা

📄 আয়াতের তেলাওয়াত ও পবিত্রতা


প্রথম বিষয়টি হচ্ছে আয়াতের তেলাওয়াত। অর্থাৎ, আল্লাহ্ তাআলার আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনানো। 'আয়াত' শব্দটি কোরআন মজীদে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে উল্লিখিত আয়াতে এ শব্দটি দলিল-প্রমাণ ও যুক্তির অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য কোরআন মজীদের বিশেষ করে সে অংশটিকে নির্দেশ করা যা দলিল-প্রমাণ ও যুক্তি-সম্বলিত। কোরআন মজীদের জন্য এ শব্দটি ব্যবহার করার মূল উদ্দেশ্য হল সেই বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করা, যাতে বুঝা যায়, কোরআন তার শিক্ষার জন্যে নিজেই প্রমাণ ও যুক্তিপূর্ণ; বাইরের কোন যুক্তি-প্রমাণের মুখাপেক্ষী নয়।
যাঁরা কোরআন মজীদের অবতরণধারা সম্পর্কে অবগত, তাঁরা জানেন, হুযূরে আকরাম (সাঃ)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির প্রাথমিক পর্যায়ে কোরআন মজীদের যে অংশটি নাযিল হয়েছে, সেটি 'দ্বীন'-এর সেই মূলনীতি সংক্রান্ত, যা সমগ্র ধর্মের জন্য ভিত্তিস্বরূপ। যেমন করে একটি দালান বা প্রাসাদ ততক্ষণ পর্যন্ত নির্মিত হতে পারে না, যতক্ষণ না তার বুনিয়াদ সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। তেমনিভাবে কোন ধর্মের প্রতিষ্ঠাও ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তার মূলনীতিসমূহ যথাযথভাবে মানুষের মন-মস্তিষ্কে বদ্ধমূল না হবে। ইসলামের গোটা ব্যবস্থাও তিনটি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তৌহীদ, আখেরাত ও রেসালাত। এই তিনটি বিষয়ের বুনিয়াদ প্রকৃতি, চক্রবাল ও দিস্মন্ডলের অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত দলিল-প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কোরআন মজীদও সর্বাগ্রে এসব ভিত্তিকেই মজবুত করেছে। আর এগুলোর প্রতিষ্ঠা ও দৃঢ়তার ফলে সেসব ভুল ও বিভ্রান্তিকর চিহ্ন আপনা থেকেই মুছে গেছে যা শিরক অবলম্বন করে আখেরাত ও নবুয়তের প্রতি অস্বীকৃতির দরুন সৃষ্টি হয়েছিল। কোরআন এ সকল ভিত্তিকে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং কি কি প্রমাণপঞ্জির মাধ্যমে মানুষের ভুল আকীদা ও বিশ্বাসসমূহ খন্ডন করেছে, এসব প্রশ্নের উত্তর যথেষ্ট বিশ্লেষণ সাপেক্ষ।
এখানে আমরা শুধু এতটুকু বলতে চাই যে, এক্ষেত্রে ‘আয়াত’ বলতে কোরআনের সে অংশকে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা বিষয়ক দলিল-প্রমাণকে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রাথমিক পর্যায়ে কোরআনের যে যে অংশ নাযিল হয়েছে তা ফেকাহ শাস্ত্রীয় নির্দেশাবলী থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এতে শুধু ধর্মের সেই মৌলিক ও সাংগঠনিক বিষয়সমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা ‘দ্বীন’-এর সমগ্র ব্যবস্থাপনা ও নীতিমালার গাঁথুনি সদৃশ। লক্ষ্য করলে বুঝা যায়, যুক্তির দিক দিয়েও তাই হওয়া উচিত। কারণ, কোন শিক্ষাই একটা মৌলিক ভিত্তির অবর্তমানে টিকে থাকতে পারে না। আমরা যখন কোন দালান তৈরী করি, তখন তার ছাদ বা অলিন্দ থেকে কখনও আরম্ভ করি না; বরং সর্বাগ্রে তার ভিত্তিটাকে সুদৃঢ় করে নিই। ধর্মের অবস্থাও তাই। এর সমস্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো কতিপয় মৌলিক নীতিমালার আওতাভুক্ত। কাজেই যে পর্যন্ত সেই নীতিমালা সুদৃঢ় না হবে, সে পর্যন্ত আনুষঙ্গিক বিষয় ও তার শাখা-প্রশাখার উদ্ভব এবং টিকে থাকা অসম্ভব।
আর মানব প্রকৃতির অভ্যন্তরই হচ্ছে সেই নীতিমালার উৎসমূল। কাজেই প্রকৃতি যদি কাল্পনিকতা ও কুসংস্কারের আবর্জনায় আচ্ছন্ন হয়ে না যায়, তা হলে নবুয়তের প্রথম আলোর পরশেই তা মন-মানসে উজ্জ্বলভাবে প্রতিবিম্বিত হয়।
يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارُ .
সত্বর তার তেলে অগ্নিস্পর্শের পূর্বেই প্রদীপ্ত হয়ে ওঠবে।
কিন্তু মানুষের প্রকৃতি যদি দুষ্ট চিন্তা-ভাবনা, বিকৃত কল্পনা এবং মিথ্যা ও শূন্যগর্ভ বিশ্বাসের পঙ্কে অপবিত্র হয়ে যায়, তা হলে তাকে পরিষ্কার করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তা যথার্থভাবে পরিষ্কার না হবে, কোন রকম ভাল শিক্ষা গ্রহণ করা তার পক্ষে সম্ভব হতে পারে না। যেমন, একজন পেটের রোগীর পক্ষে অতি উত্তম খাবারও হজম করা সম্ভব হয় না। সেজন্যে প্রথমে সে রোগীর রোগ নির্ণয় করে ওষুধ দেয়া প্রয়োজন। তারপর তার পেট যখন সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে যাবে, তখনই তাকে পুষ্টিকর খাবার দেয়া যেতে পারে। এর আগে যদি পুষ্টিকর খাবার দেয়া হয়, তা হলে তার স্বাস্থ্য কিছুতেই তা গ্রহণ করতে পারবে না। সুতরাং কোরআনে হাকীমে সূরা আনয়ামের এক আয়াতে এমনি ধরনের পঙ্কিলতায় আচ্ছন্ন লোকদের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে-
وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَدُ فِي السَّمَاءِ - كَذَالِكَ يَجْعَلُ الله الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ -
আর আল্লাহ্ যাকে গোমরাহ করতে চান, তার অন্তরকে সংকীর্ণ করে দেন, সে যেন শূন্যে বিচরণ করেছে। এভাবে আল্লাহ্ তাদের ওপর অপবিত্রতাকে জমিয়ে দেন, যারা ঈমান আনে না।
বস্তুত আয়াতের তেলাওয়াতের পর উল্লিখিত আয়াতে যে পবিত্রতার উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সেটা হচ্ছে আয়াতের তেলাওয়াতেরই ফল। আল্লাহর আয়াতসমূহের তেলাওয়াতে মানুষের মন থেকে যখন মিথ্যা ধ্যান-ধারণা ও কু-বিশ্বাসের মূলগুলো উপড়ে যায়, তখন তার মনোভূমি সুষ্ঠু বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার বীজ বপনের জন্যে সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং উপযোগী হয়ে ওঠে।
একথা যথাস্থানে সপ্রমাণিত যে, আল্লাহ্ মানুষের প্রকৃতিতে ভাল-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যেমন মানুষ সুন্দর-অসুন্দরের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে, সাদা-কালোর প্রভেদ বুঝতে পারে এবং সুগন্ধ ও দুর্গন্ধ ধরতে পারে, তেমনিভাবে তাদের প্রকৃতির অভ্যন্তরেও একটি আলো রয়েছে, যা সৎ ও অসৎ-এর মাঝে পার্থক্য করার ব্যাপারে তাদেরকে পথ প্রর্দশন করে। সূরা কিয়ামার এক আয়াতে বলা হয়েছে-
بَلِ الْاِنْسَانُ عَلٰى نَفْسِهِ بَصِيْرَةٌ .
বরং মানুষ নিজের মন সম্পর্কে সচেতন। অন্য এক স্থানে রয়েছে--
فَاَلْهَمَهَا فُجُوْرَهَا وَ تَقْوٰهَا
বস্তুত তাকে তার পাপকর্ম ও পরহেযগারী সম্পর্কে ইল্‌হাম করে দেয়া হয়েছে। আরেক জায়গায় বলা হয়েছে--
اِنَّا هَدَيْنٰهُ السَّبِيْلَ .
নিশ্চয়ই আমি তাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছি।
যাদের এই আলো রিপু ও কামনা-বাসনার অনুসরণ এবং দুনিয়ার মায়া-মোহের দরুন নিভে যায়, তারা আত্মিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ মৃতে পরিণত হয়। নবী-রসূলগণ তাঁদের শিক্ষার সুতীব্র আলোকচ্ছটা যত প্রবলভাবেই তাদের ওপর সম্পাত করুন না কেন, তাদের মৃত আত্মায় কোন স্পন্দনই পরিলক্ষিত হয় না। এমনি লোকদের ব্যাপারে এরশাদ হয়েছে-
إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتٰى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِيْنَ .
হে নবী, তুমি মৃতদের শোনাতে পারবে না। কালাদেরও তোমার ডাক শোনাতে সক্ষম হবে না যখন তারা পেছন ফিরে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। আরেক আয়াতে বলা হয়েছে
إِنَّمَا يَسْتَجِيبُ الَّذِينَ يَسْمَعُونَ وَالْمُوْتَى يَبْعَهُهُمُ اللَّهُ ثُمَّ إِلَيْهِ يُرْجَعُونَ .
তোমার আমন্ত্রণ কবুল করবে শুধুমাত্র তারাই, যারা শোনে। আর যারা মৃত; আল্লাহ্ই তাদেরকে তুলবেন। অতপর তাদের তাঁর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
সূরা বাকারার শুরুতে যেসব লোকের অন্তরে মোহর মারার উল্লেখ করা হয়েছে তারা এমনি ধরনের লোক। কিন্তু যাদের অন্তরে এ আলোর জ্যোতি বিদ্যমান, তা যতই আবছা এবং দুর্বল হোক না কেন, নবিগণ আয়াতের তেলাওয়াতের মাধ্যমে তাকে উজ্জ্বল করে দেন।
এ ব্যাখ্যার পর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নবী করীম (সঃ) আমাদের প্রকৃতিগ্রাহ্য পন্থায়ই আমাদের পবিত্রতা সাধন করেছেন। আমাদের প্রকৃতির মধ্যে ভাল ও মন্দ চিনে নেবার যে মৌলিক যোগ্যতা বিদ্যমান, তিনি সর্বাগ্রে সেগুলোকে পবিত্র-পরিচ্ছন্ন করে উদ্ভাসিত করে তুলেছেন এবং তারপর সেগুলোর ওপর নিজের শিক্ষার বুনিয়াদ স্থাপন করেছেন।
কিন্তু পবিত্রতা সাধনের ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে, এটি কোন একক ও সহজ কাজ নয়। বরং কয়েকটি অংশে সংযোজিত। এর আলোচ্য বিষয় হচ্ছে মানব হৃদয়, যা জ্ঞান ও অনুশীলন- এই দুটি বিষয়ে সংগঠিত। এ কারণে পবিত্রতারও দুটি দিক রয়েছে। জ্ঞানের পবিত্রতা ও আমল বা অনুশীলনের পবিত্রতা। এই প্রেক্ষাপটে পবিত্রতা মানুষের সমস্ত আমল এবং যাবতীয় বিশ্বাসের ওপর পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। যেহেতু মানুষের যাবতীয় আমল বা কর্মের উৎসমূল হচ্ছে আকীদা বা বিশ্বাস, কাজেই পয়গম্বর (সঃ) তাঁর শিক্ষায় সর্বপ্রথম এই আকীদা অর্থাৎ, মানুষের জ্ঞান ও বুদ্ধির পবিত্রতা সাধন করেন।
জ্ঞানের পবিত্রতা অর্থ হচ্ছে, মানুষের জ্ঞান যাবতীয় মলিনতা ও আবর্জনা থেকে এমন পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠবে, যাতে করে সে চিন্তা-দর্শনের যাবতীয় ক্ষেত্রে যে কোন স্খলন-পতন থেকে বেঁচে থাকতে পারে। যদি কখনও রিপু বা শয়তানের প্রতারণায়-তাতে কিছু আবর্জনা জমে ওঠে, তখন যাতে সামান্য লক্ষ্যের মাধ্যমেই তা অপসারিত হয়ে যায়। আর আমল বা ধর্মের পবিত্রতার অর্থ জীবনের কোন উত্থান-পতনেই যেন মানুষের কোন পদক্ষেপ রৈপিক কামনা-বাসনার নেতৃত্বে উত্থিত হতে না পারে। বরং প্রত্যেকটি পদক্ষেপই যেন আল্লাহ্ তাআলার ইচ্ছা অনুযায়ী হয় এবং রিপুর দুর্বুদ্ধিতা কিংবা উত্তেজনার দরুন কোন ভ্রান্ত কার্যকলাপ সংঘটিত হয়ে গেলেও যেন অবগতির সঙ্গে সঙ্গে ভ্রান্ত সেই পদক্ষেপের জন্য অনুতাপ সহকারে তার সংশোধন করে নিতে পারে। সূরা আরাফে এমনি লোকদের প্রশংসায় এরশাদ হয়েছে-
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَنِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمُ مُبْصِرُونَ .
যাদের মনে আল্লাহর ভয় রয়েছে, কখনও যদি তাদের ওপর শয়তানের ছোঁয়া লেগে যায়, তখন সঙ্গে সঙ্গে তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং সহসাই তাদের আত্মোপলব্ধি ফিরে আসে।
এবার শুধু ইলম বা জ্ঞানের পবিত্রতার বিষয়টি নিয়েই চিন্তা করা যাক। এর কতগুলো দিক হতে পারে, দেখা যাক। একজন কৃষক, যে ক্ষেতে লাঙ্গল চালায়, সেও চিন্তা-ভাবনা করে আর একজন দার্শনিক, যিনি সৃষ্টি-রহস্যের জটিলতার সমাধান খুঁজে বের করেন, তিনিও চিন্তা-ভাবনা করেন। কিন্তু এ দু'জনের চিন্তা-ভাবনায় বিপুল পার্থক্য। কৃষকের চিন্তার যেখানে শেষ, দার্শনিকের চিন্তার প্রথম ধাপটিও তার চাইতে বহু বহু গুণ এগিয়ে। আর একজন দার্শনিকের চিন্তা-ভাবনার যেখান থেকে সূচনা, তা সাধারণ মানুষের যাবতীয় জ্ঞান ও বিদ্যার সপ্তর্ষিমন্ডলের ঊর্ধ্বে।
তেমনিভাবে তাদের একজনের সন্দেহ-সংশয় হচ্ছে অন্যের অনুকরণজনিত, যাতে সত্য ও বাস্তবতার সাধারণ আঘাত সহ্য করারও শক্তি থাকে না। ফলে অতি সহজেই তা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় (অল্পেই তারা সন্দেহমুক্ত হয়ে যেতে পারে)। পক্ষান্তরে অন্য জনের ভ্রষ্টতাসমূহ তার স্বপক্ষে যুক্তি ও দর্শনের বহু দলিল-প্রমাণ এনে উপস্থাপিত করে। সেগুলোকে পরাভূত করার জন্যে অধিকতর শক্তিশালী প্রমাণের প্রয়োজন হয়। কাজেই কোরআন যদি গোটা মানব জাতির সমস্ত শ্রেণীর পবিত্রতা সাধনের জন্যে এসে থাকে, তা হলে তার যুক্তি এবং প্রমাণ উভয়টিই সন্তোষজনক হওয়া প্রয়োজন। প্রথম ব্যক্তিকে সে যা দেবে তার মান যেন কোনক্রমেই তার যোগ্যতা ও বুদ্ধির ঊর্ধ্বে না হয় এবং তার ভুল -ভ্রান্তির সংশোধনকল্পে এমন সহজ-সরল ও হৃদয়গ্রাহী যুক্তি-প্রমাণ উত্থাপন করবে, যাতে সেগুলোর আকর্ষণীয়তায়ই সে মুগ্ধ হয়ে পড়ে। তেমনিভাবে দ্বিতীয় লোকটিকে যা শেখাবে, তার মান এমন উচ্চ হতে হবে, যাতে তার মন সন্তুষ্ট হতে পারে এবং তার আত্মায় একটা প্রশান্তির সৃষ্টি করে। আর এভাবে তার কাছ থেকে যা ছিনিয়ে নেবে, সেগুলোকে এমনি অটল ও সুদৃঢ় যুক্তি-প্রমাণের মাধ্যমে ছিনিয়ে নেবে, যাতে দর্শন, কিংবা যুক্তিশাস্ত্রের কোন শক্তিই তা উদ্ধার করতে না পারে।
বিষয়টির আরও একটি প্রণিধানযোগ্য দিক রয়েছে। তাহল নবী-রসূলগণের ব্যাপারে একথা সবারই জানা যে, তাঁরা নবুয়তপ্রাপ্তির পূর্বেও পরিপূর্ণ জ্ঞান-বুদ্ধির অধিকারী। তাঁরা নিজেদের পবিত্র-পরিচ্ছন্ন প্রকৃতির আলোকে জ্ঞান ও কর্মের সেসকল ধাপ অতিক্রম করে নিতেন যা অন্যেরা ওহী ও ইলহামের দিকনির্দেশনা সত্ত্বেও অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু ইলম ও আমলের এমন সুউচ্চ মর্যাদা লাভ সত্ত্বেও রসূলগণের তৃষ্ণা ও আগ্রহাতিশয্য যথাস্থানে অব্যাহত থেকে যেত। যতক্ষণ পর্যন্ত ওহীরূপী রহমত অবতীর্ণ না হত ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের সে তৃষ্ণার অবসান হত না। তাঁরা নিজেদের আগ্রহাতিশয্য দূর করার জন্য এবং নিজের অন্তরকে অধিকতর আলোময় করে তোলার উদ্দেশে সর্বক্ষণ আল্লাহর ওহীর জন্য অপেক্ষা করে থাকতেন। ওহীর এ জ্যোতি তাঁদের এতই প্রিয় ছিল যে, তাঁরা ক্রমাগত তা বৃদ্ধির জন্য উদগ্রীব হয়ে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা করতে থাকতেন -
رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا
হে আমার পালনকর্তা! আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দাও।
আর তা লাভ করার পর জড়জগতের যাবতীয় সাহায্য-সহায়তার ব্যাপারে তাঁরা সম্পূর্ণ পরাঙ্মুখ এবং দুনিয়ার সমস্ত বিরোধিতার ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে যেতেন। সুতরাং সূরা হিজরে ইসলাম বিরোধীদের মন্দাচার ও ধূর্ততার আলোচনার পর নবী করীম (সঃ)- কে এভাবে সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে-
فَاصْفَحِ الصَّفْحَ الْجَمِيلَ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ الْخَلَّاقُ الْعَلِيمُ وَلَقَدْ سَبْعًا مِنَ الْمَثَانِي وَ الْقُرْآنَ الْعَظِيمِ لَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ وَلَا تَحْزَنُ عَلَيْهِمْ وَاخْفِضُ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ .
অতএব সুন্দরভাবে ক্ষমা করে দাও। নিশ্চয়ই তোমার পালনকর্তা সৃষ্টিকারী এবং পরিজ্ঞাত। আর আমি তোমাকে দান করেছি সাতটি পুনরাবৃত্ত বিষয় এবং কোরআনে হাকীম। তা ছাড়া আমি তাদের (কাফেরদের) কোন কোন দলকে যা কিছু দেবার দিয়েছি। সেদিকে দেখো না কিংবা সেজন্য দুঃখ করো না। আর যারা মুমিন তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করো।
এ আয়াতটি সেই সত্যেরই একটি প্রকৃষ্ট সাক্ষ্য যে, কোরআন মজীদ এবং তার আয়াতসমূহের মাঝে যে শক্তি নিহিত রয়েছে, তা দুনিয়ার যাবতীয় ধন-সম্পদ এবং সৈন্যসেনার মধ্যেও নেই। ইমাম মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহী উল্লেখিত আয়াতের তাৎপর্য সম্পর্কে আলোচনা প্রসংগে লেখেছেনঃ
আল্লাহ্ তাআলা মহানবী (সঃ) কে বলেন, এই আধ্যাত্মিক সৈন্য-সেনার দ্বারা তুমি তার চেয়ে অনেক বেশী সাহায্য পেতে পারবে, যতটা তুমি পার্থিব শক্তি-সামর্থ্যবানদের দ্বারা আশা কর। সুতরাং নামায পড় এবং কোরআন তেলাওয়াতে দৃঢ় থাক। আর যেসব নামাযী মুসলমান তোমার সাথে রয়েছে তাদেরকে সাথে নিয়ে মুশরিকীন এবং বিরুদ্ধবাদীদের ব্যাপারে বেপরোয়া হয়ে যাও।
এতে প্রতীয়মান হয় যে, ইলম ও আমলের অস্বাভাবিক শক্তি যোগ্যতার প্রতিভূ নবী-রসূলগণ (আঃ) ও অধিকতর পবিত্রতা অর্জনের জন্যে এই আয়াতসমূহের মুখাপেক্ষী ছিলেন। এসব আয়াতের দিশাতেই তাঁরা সঠিক লক্ষ্যের সন্ধান লাভ করেছেন। এগুলোর জ্যোতিতেই তাঁদের আত্মার দ্বার উন্মোচিত হয়ে গেছে এবং আলোয় আলোকময় হয়ে ওঠেছে। তখন তাঁর প্রেমে আত্মা পাগলপারা হয়ে رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا )রাব্বি যিদনী ইলমান)-এর জপ করতে শুরু করেছে। আর আকাঙিক্ষত জ্ঞান লাভ হওয়ার সময় তার উন্মাদনা, আত্মবিস্মৃতি এবং আগ্রহ ও ক্ষিপ্রতার অবস্থা এমনি পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, গায়েবী শিক্ষাগুরু তাঁকে لَا تَعْجَلُ بِالْقُرْآنِ )লাতা জাল্ বিল্ কোরআন) অর্থাৎ কোরআনের ব্যাপারে ক্ষিপ্র হয়ো না বলে সাদর ভর্ৎসনা করেন।
যে কোরআনে হাকীমের আয়াতসমূহের এহেন মর্যাদা, তাকে এমন কিছু আইন-কানুন বা নীতি-নিয়ম, কিছু ওয়াজ-নসীহত বা উপদেশবাণী আর কতিপয় গল্প-কাহিনীর বিক্ষিপ্ত একটা সংকলন মাত্র বলে ধারণা করা এবং একে বুঝবার জন্য শুধু সামান্য চিন্তা-ভাবনা ছাড়া অন্য কোন কারণ-উপকরণের সাহায্যের দরকার আছে বলে মনে না করা একান্তই পরিতাপের বিষয় এবং মারাত্মক বিভ্রান্তি।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কিতাবের তা’লীম

📄 কিতাবের তা’লীম


'তা'লীমে কিতাব' অর্থ কোরআনের শিক্ষা। কিন্তু আয়াতের এ প্রসঙ্গটি ওপরে আলোচিত হয়ে গেছে। 'হেকমত' সম্পর্কে পৃথকভাবে আলোচনা করা হবে। কাজেই কিতাব বলতে সমগ্র কোরআনকে উদ্দেশ করা যায় না। বরং এর শুধুমাত্র সে অংশটুকু হতে পারে, যা আদেশ-নিষেধ এবং নীতি-পদ্ধতি ও আইন-কানুন সংক্রান্ত। এভাবে বিষয়টিকে নির্দিষ্ট করার কারণ এই যে, কোরআনের বিভিন্ন স্থানে 'কিতাব' শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, যার কয়েকটি প্রসিদ্ধ অর্থ নিম্নরূপ-
১। আসমানী 'কিতাব'-যা আম্বিয়ায়ে কেরামের ওপর নাযিল হয়েছে। যেমন, ذَالِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيْهِ এটি একটি আসমানী কিতাব বা গ্রন্থ, যাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
২। আল্লাহ্ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত সিদ্ধান্ত এবং নির্দিষ্ট নিয়তি। যেমন, وَمَا أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ إِلَّا وَلَهَا كِتَابٌ مَعْلُوْمٌ. আর আমি কোন জনপদকেই ধ্বংস করিনি, কিন্তু তার জন্য একটা নির্দিষ্ট অবকাশ ছিল।
৩। বিধি-বিধান ও আইন-কানুন। যেমন, لا تَعْزِمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ .
বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা করো না, যতক্ষণ না আইন কর্তৃক নির্ধারিত সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায়।
৪। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সিদ্ধান্তসমূহের রেজিস্টার বা দপ্তর। যেমন, وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٌ - কাঁচা বা চিঠা এমন কোন বিষয়ই নেই যে একটি প্রকৃষ্ট ‘কিতাবে’ লিখিত নেই।
৫। আমলনামা বা কর্ম বিবরণী। যেমন أَمَّا مَنْ أُوتِيَ كِتَابَهُ بِيَمِينِهِ. কিন্তু সেব্যক্তি যে তার আমলনামা ডান হাতে পাবে।
আমাদের ধারণা, নিম্নের আলোচ্য আয়াতসমূহে 'কিতাব' শব্দটি আদেশ-নিষেধ সংক্রান্ত নির্দেশ এবং বিধি-বিধান অর্থেই ব্যবহার করা হয়েছে।
কোরআন মজীদে এই অর্থে 'কিতাব' শব্দের ব্যবহার যথেষ্ট স্পষ্ট। সুতরাং সূরা বাকারার যেখান থেকে সংবিধান পরিচ্ছেদ আরম্ভ হয়, প্রায় বিধানই كُتِبَ (কাতাবা) অথবা كُتِبَ (কুতিবা) শব্দের দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ - كُتِبَ عَلَيْكُمُ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتَ - كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالَ - كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ.
প্রভৃতি। আবার অনেক জায়গায় পরিষ্কারভাবেই 'কিতাব' শব্দের দ্বারা প্রচলিত আইনকে উদ্দেশ করা হয়েছে। যেমন, وَلَا تَعْزُمُوا عُقْدَةَ النِّكَاحِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ . . .
'কিতাব' শব্দের অর্থ হচ্ছে ইদ্দতের সময়। সূরা আহযাবে রয়েছে- وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللهِ এ আয়াতে 'কিতাব অর্থ উত্তরাধিকার আইন।
ফলকথা, কোরআন মজীদে আইন ও সংবিধান অর্থে 'কিতাব' শব্দটির ব্যবহার যথেষ্ট পরিচিত। আর যেহেতু আলোচ্য আয়াতে কোরআন মজীদের সাংগঠনিক উপাদানসমূহের বিশ্লেষণ উপলক্ষে এতে কি কি উপাদান বিদ্যমান তাও বলে দেয়া হয়েছে, কাজেই স্থান-কাল ও পাত্রের চাহিদা অনুযায়ী এখানে 'কিতাব' বলতে সংবিধান ও আইন বিষয়ক অংশটিকেই বুঝতে হয়।
এ ব্যাখ্যার দ্বারা খোদায়ী শিক্ষার তাৎপর্য পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়, তাতে আমাদের প্রকৃতির চাহিদার প্রতি এতটা লক্ষ্য রাখা হয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদেরকে যাবতীয় অস্বাভাবিক জঞ্জালমুক্ত না করা হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আইন বা সংবিধানের আনুগত্যের কোন দায়-দায়িত্ব আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি।
প্রকৃতির উদাহরণ অনেকটা পাকস্থলীর মত। পাকস্থলী যেমন দূষিত খাদ্যের ব্যবহার কিংবা তাতে আবর্জনা জমা হয়ে গেলে তার খাদ্যস্পৃহা হারিয়ে বসে এবং তখন কোন সুস্বাদু বস্তুতেও কোন আগ্রহ সঞ্চার করতে পারে না, তেমনিভাবে বাজে কল্পনা ও কুসংস্কারের প্রবলতার দরুন প্রকৃতিও তার উৎকর্ষণস্পৃহা হারিয়ে ফেলে এবং অতপর কোন সৎকর্মের প্রতিও আকৃষ্ট হতে পারে না। কাজেই এমতাবস্থায় যেমন একজন কবিরাজ প্রথমে পাকস্থলীকে দূষিত আবর্জনা থেকে মুক্ত করে তার খাদ্য গ্রহণের আগ্রহ যথাস্থানে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন, তেমনিভাবে একজন আধ্যাত্মিক চিকিৎসকও অন্তরকে প্রাকৃতিক যাবতীয় অপরিচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করে তাতে প্রকৃত ক্ষুধার সঞ্চার করেন। এ আগ্রহ সঞ্চারিত হয়ে যাবার পর শরীয়ত ও দ্বীনের প্রতিটি বিষয় গ্রহণ করার জন্য তেমনিভাবে সে উদগ্রীব হয়ে ওঠবে, যেমন একজন তৃষ্ণার্ত পানির জন্যে এবং একজন ক্ষুধার্ত খাবারের জন্যে উদগ্রীব হয়েও উঠে। কোরআন মজীদ এ অবস্থার প্রতি এভাবে আলোকপাত করেছেঃ
رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا تُنَادِى لِلْإِيْمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ .
হে পরওয়ারদেগার! আমরা একজন আহবানকারীকে শুনেছি, তোমার প্রতি ঈমান আনার জন্য আহবান করে যাচ্ছে যে, হে মানবকুল! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। অতএব, আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদিগকে ক্ষমা করে দাও এবং আমাদিগকে পাপমুক্ত করে দাও। আর আমাদের মৃত্যু দাও তোমার অনুগত বান্দাদের সাথে।
এতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসে যায়।
১। গোটা শরীয়তের উৎসমূল হচ্ছে প্রকৃতির কতিপয় মৌলিক তত্ত্ব। 'এক' থেকেই যেমন শ' এবং হাজারের উদ্ভব হয়, তেমনিভাবে সেই কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের অনুষংগ ও ফলাফলের প্রেক্ষিতেই ধর্মের সমস্ত বিশ্বাস ও কর্ম অস্তিত্ব লাভ করে। সেজন্যেই ইসলামকে বলা হয়েছে প্রকৃতির ধর্ম।
فطرة اللهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ - ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
এটি আল্লাহ্রই বানানো প্রকৃতি, যার ভিত্তিতে মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ্র (তৈরী) প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ বৈধ নয়। এটাই হচ্ছে (ইবরাহীম কর্তৃক প্রচারিত) সহজ-সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা উপলব্ধি করে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00