📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 তফসীরের বিভিন্ন যুগ ও তার বৈশিষ্ট্য

📄 তফসীরের বিভিন্ন যুগ ও তার বৈশিষ্ট্য


এ সত্য সর্বজনস্বীকৃত যে, আমাদের ইতিহাসের প্রাথমিক যুগটিই হচ্ছে তফসীরে কোরআনের সবচেয়ে মহান যুগ। কারণ, কোরআনের শিক্ষা গ্রহণ ও দানের যাবতীয় শর্তাবলী এবং পরিবেশের সুষ্ঠুতা সে যুগেই পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল। অতপর নবুয়তের আমল শেষ হওয়ার পর ইসলামী শিক্ষার অবনতি, অনারব শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ, আরবী ভাষার বিকৃতির দরুন বিভিন্ন বেদআত বা আধুনিকায়নের ফেতনা-ফাসাদের আবির্ভাব ঘটেছে এবং যেহেতু ধর্মের প্রকৃত ভিত্তি ছিল কোরআন, কাজেই স্বাভাবিকভাবে সংস্কারপন্থী, বেদআতী বা আধুনিকতাকামীদের বাণ এরই ওপর পড়েছে। এই ফেতনা প্রতিহত করার উদ্দেশে সুন্নতানুসারী ও সত্যান্বেষীরা এই মতবাদ গ্রহণ করেছেন যে, কোরআনের তফসীরের ক্ষেত্রকে সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে যথাসম্ভব শুধুমাত্র হুযুরে আকরাম (সঃ), সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এবং তাবেঈন (রঃ)-গণের বাণী এবং মতের ওপর বিশ্বাস করা হবে, যাতে করে সংস্কারবাদী বা বেআতপন্থীরা আল্লাহর কালামের অপব্যাখ্যার কোন সুযোগ পেতে না পারে।
প্রকৃতপক্ষে একটি ফেতনা থেকে অব্যাহতি লাভের জন্যে এটা ছিল একটা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা এবং রোগের একটা সময়োচিত চিকিৎসা। যেসব দল নিজেদের বেদআতী মতবাদের সমর্থনে কোরআনকে ব্যবহার করত, তাদের জন্যে সে পথ বন্ধ করে দেয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।
এই নীতিমালার ভিত্তিতে রচিত সর্ববৃহৎ ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হল আল্লামা ইবনে জারীর কৃত তফসীর। এতে এমন সব বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে যা পূর্ববর্তীদের উদ্ধৃতি হিসেবে বর্ণিত। তাঁর রীতি হচ্ছে, প্রত্যেকটি আয়াতের নীচে পূর্ববর্তীদের সব মতামত কোন রকম আলোচনা-সমালোচনা না করে একত্রিত করে দেয়া। আর তাঁর মতে যে মতটি অগ্রাধিকারযোগ্য তা সব শেষে উল্লেখ করা। তিনি যথাসম্ভব সে মতকেই অগ্রাধিকার দান করেন, যাতে অন্যান্য মতামতও অন্তর্ভুক্ত। অনেক ক্ষেত্রে তিনি ব্যাকরণে দ্বারাও প্রমাণ উপস্থাপন করেন। কিন্তু না তাতে রেওয়ায়েত সম্পর্কে কোন পর্যালোচনা করা হয়েছে, না কোরআন, কোরআনের ইতিহাস কিংবা বিচক্ষণতা প্রভৃতি বিভিন্ন দিক নিয়ে কোন আলোচনা করা হয়েছে। সে জন্যে এতে যেসব অতিমূল্যবান রত্ন রয়েছে, সেগুলো অসমর্থিত ও দুর্বল রেওয়ায়েতের স্তূপের নীচে তলিয়ে গেছে। সুতরাং যে পর্যন্ত স্বয়ং কোরআনের আলো আমাদের পথ প্রদর্শন না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেগুলোর সন্ধান করা দুষ্কর। এসব কারণেই এই মহাগ্রন্থের দ্বারা উপকৃত হতে হলে যথার্থ সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে এর পর্যালোচনা করা একান্ত প্রয়োজন।
মাননীয় গ্রন্থকার স্বীয় গ্রন্থে শুধুমাত্র মতামতসমূহকে একত্রিত করে দিয়েছেন। আলোচনা-সমালোচনার দায়িত্ব জ্ঞানী পাঠকদের ওপর ন্যস্ত করেছেন। যদি এ দায়িত্বও তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিতেন, তাহলে হয়ত মতামত ও হাদীসের এহেন বিপুল সম্ভার আমাদের হস্তগত হতে পারত না। ইতিমধ্যেই কোথাও তাঁর জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে একথা পড়ে বিস্মিত হয়েছি যে, তাঁর সঞ্চয়ী লেখনী যে বিপুল সম্ভার সংগ্রহ করেছে, যদি তাঁর জীবনের রচনাকালকে সামনে রেখে তার হিসাব করা হয়, তাহলে তার গড় দাঁড়াবে দৈনিক চল্লিশ পৃষ্ঠা। এমন একটি গতিশীল লেখনী যদি রচনা ও সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে আলোচন-পর্যালোচনার জটিলতায় জড়িয়ে পড়ত, তাহলে নিঃসন্দেহে পূর্ববর্তীদের মতামতের একটি বিপুল অংশ থেকে আমরা বঞ্চিতই রয়ে যেতাম।
তারপরে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও জনপ্রিয় তফসীর হচ্ছে "তফসীরে ইবনে কাসীর"। কিন্তু আসলে এটা 'তফসীরে ইবনে জারীর'-এরই সার-সংক্ষেপ। নতুন ব্যাপার শুধু এতটুকু যে, হাদীস বিশারদদের রীতি অনুযায়ী এতে বর্ণিত মতামতের ওপর সমালোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া কোরআন মজীদের অন্যান্য রীতি-পদ্ধতি সম্পর্কে এতেও কোন প্রকার বাদানুবাদ করা হয়নি। আর শুধুমাত্র এতটুকু পরিবর্ধন তেমন বিশেষ কোন ফায়দার ব্যাপার নয়।
তফসীরের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি হল ইমাম রাযী (রঃ) কৃত তফসীর। এই তফসীরটি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত হয়েছে। এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে, এ হিসেবে তা একটি অতুলনীয় গ্রন্থ। কিন্তু এসব দার্শনিক বক্তব্য এর ওপর এমনই ব্যাপ্তি লাভ করেছে এবং ইমাম সাহেব আশ'আরিয়া মতবাদের সমর্থনে এতে কোরআনকে এমন নির্দয়ভাবে 'ব্যবহার করেছেন যে, কোরআন বুঝার পক্ষে গ্রন্থটি শুধু যে অনুপকারী প্রতিপন্ন হয়ে গেছে তাই নয়, বরং অত্যন্ত অপকারী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য কেউ যদি দার্শনিক বিতর্ক এবং আ'শআরিয়া কিংবা মু'তাযেলা মতবাদের বিরোধ সম্পর্কে আগ্রহী হয় অথবা সে সম্পর্কে জানতে চায় যে, (তৎকালীন) দার্শনিকরা কোরআন কিভাবে বুঝেছেন, তা হলে তার জন্যে এটাই সবচেয়ে উত্তম গ্রন্থ।
তফসীরের চতুর্থ গ্রন্থ হল আল্লামা যামাঙ্গারী (রঃ) প্রণীত 'তফসীরে কাশাফ'। এর ধারা উল্লিখিত গ্রন্থরাজি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। আল্লামা যামাঙ্গরীর লক্ষ্য সধারণতঃ কোরআনের পাঠ ও বাকপদ্ধতি। তিনি প্রথমত ভাষা, এ'রাব (স্বরচিহ্ন) এবং বাক্যের পারস্পরিক সামঞ্জস্য সম্পর্কে আলোচনা করেন। অতপর সতর্কতার সাথে বিভিন্ন রেওয়ায়েতও উদ্ধৃত করেন। তাঁর একটি বৈশিষ্ট্য খুবই মূল্যবান, তিনি সাধারণতঃ ভাষা, অভিধান বা এ'রাব (স্বরচিহ্ন)-এর ক্ষেত্রে সঠিক মতবাদ গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে ইমাম রাযী নিজেও তাঁর যোগ্যতা স্বীকার করেন। এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিরোধ সত্ত্বেও ইমাম রাযী তাঁর ব্যাকরণিক ও আভিধানিক গবেষণাকে প্রায়ই স্বীয় গ্রন্থে নির্দ্বিধায় কোন রদবদল ব্যতীত উদ্ধৃত করেছেন। এসব দিক দিয়ে কোরআন শিক্ষার্থীর জন্য এ গ্রন্থটি ফলপ্রসূ বলে বিবেচিত। কিন্তু ইমাম রাযী যেমন আ'শআরিয়া মতবাদের প্রবক্তা, তেমনিভাবে আল্লামা যামাখশারীও মু'তাযেলা মতবাদের মুখপাত্র। পক্ষান্তরে আল্লাহর কালামের সাথে এই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অবিচার যে, মানুষ এর অনুসরণের পরিবর্তে একে নিজেদের কোন বিশেষ মতাদর্শের পেছনে চালাতে চেষ্টা করে।
এগুলোই তফসীরের মৌলিক গ্রন্থ, যা সাধারণতঃ জ্ঞানী মনীষীদের সামনে রয়েছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে অন্যান্য যেসব গ্রন্থ রয়েছে সেগুলো প্রকৃতপক্ষে এ কয়টি গ্রন্থ থেকেই সংকলিত। কোন কোন তফসীর সূফীবাদের ধারায়ও রচিত হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর প্রমাণ পদ্ধতি কিংবা আলোচনা রীতিতে বিশেষ মতাদর্শের প্রতি আকর্ষণ অতি প্রবল। কোরআনকে যারা রেওয়ায়েত কিংবা শব্দ ও ভাষার আলোকে বুঝতে চান, তাঁরা এসব গ্রহণ করতে পারেন না। এমন কোন তফসীরও আমার নজরে পড়েনি। কাজেই আমরা সেগুলোর ব্যাপারে সুবিবেচিত মতামত ব্যক্ত করতে পারছি না। অবশ্য সাধারণ পর্যালোচনাকালে কোন কোন সূফী মনীষীবৃন্দের যেসব মত সামনে এসেছে, তাতে একান্তই নিরাশ হতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ "সারখীল" সূফীচক্রের সাথে সম্পৃক্ত জনৈক বুযুর্গ-
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنْذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنْذِرُهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ . ختَمَ اللهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَى سَمْعِهِمْ وَعَلَى أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ .
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই যারা কুফরী করেছে, তাদের ভীতি প্রদর্শন কর আর না কর উভয়টাই সমান; তারা ঈমান আনবার নয়। আল্লাহ্ তাদের অন্তরে এবং কানে মোহর এঁটে দিয়েছেন এবং তাদের চোখে পর্দা পড়ে গেছে।
-আয়াতের তফসীর প্রসঙ্গে বলেছেন, 'যারা আল্লাহ্ বিশ্বাসকে নিজের অন্তরে গোপনে লুকিয়ে রেখেছে, তাদের প্রতি ভীতি প্রদর্শন কর আর নাই কর, দুইই সমান, তারা ঈমান আনবে না। কারণ, তারা আমাকে ছাড়া কোন কিছুরই গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। আল্লাহ্ তাদের অন্তরে বিশ্বাস ভরে তার ওপর মোহর এঁটে দিয়েছেন। এখন আর তাতে অন্য কারও ঢোকার ব্যবস্থা নেই।' সম্ভবতঃ এসব মত যুক্ত করে দেয়া হয়েছে- আল্লাহ্ করুন তহি যেন হয়। কিন্তু একথা সাধারণভাবে জানা আছে, তফসীর সম্পর্কে সূফীবাদের যেসব বর্ণনা বা মত বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লিখিত দেখা যায়, তাতে মতাদর্শের আকর্ষণের প্রাধান্যই পরিলক্ষিত হয়। বরং এগুলোতে বাতেনিয়াত বা অভ্যন্তরিকতার গন্ধ পাওয়া যায়। যে কারণে ভাষা ও অভিধানবিমুখতা অপরিহার্য। যারা এ ধরনের গ্রন্থ পর্যালোচনা করেছেন, তারা হয়ত আমাদের এ মতের বিরোধিতা করতে পারবেন না।
এ ব্যাখার দ্বারা বুঝা গেল যে, প্রাথমিক যুগের পরে কোরআনের তফসীরের ক্ষেত্রে প্রথম যে পদক্ষেপটি নেয়া হয়েছে, তাই হয়েছে ভ্রান্ত। যদিও একটা সৎ উদ্দেশ্যই এদিকে অনুপ্রাণিত করেছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, এর আশানুরূপ ফল লাভ হয়নি। বরং বলা যেতে পারে, এভাবে একটা ফেতনার দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করতে গিয়ে অন্য এক ফেতনার দ্বার খুলে দেয়া হয়েছে। বেদআতপন্থী ও ভ্রান্তচারীদের স্বেচ্ছাচার এবং অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্যে পূর্ববর্তীদের উদ্ধৃতি ও বর্ণনার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু পরে এসব বর্ণনা-উদ্ধৃতির প্রতি নিবিষ্টতা এত বেশী বেড়ে গেছে যে, সেগুলোর যাচাই-বাছাইর বিষয়টিও লুপ্ত হয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে সত্য ও সঠিক বর্ণনার সাথে রূপক কল্পকাহিনী এবং বিভ্রান্তিকর ইসরাঈলী প্রচারণার একটি বিরাট অংশও সেসব তফসীর গ্রন্থে ঢুকে পড়েছে।
এই যাচাইহীনতার একটা দুখঃজনক পরিণতি এই দাঁড়িয়েছে যে, প্রতিটি আয়াত সম্পর্কে, শুদ্ধ ও ভ্রান্ত বর্ণনা উদ্ধৃতির এমন এক বিপুল স্তূপ একত্রে সংগৃহীত হয়েছে, যার ফলে কোন একটি আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তাতে করে মানুষ শুদ্ধ ও অশুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য করে এই জটিলতার সমাধান প্রচেষ্টার পরিবর্তে প্রতিটি আয়াতের ব্যাপারে অধিকতর বর্ণনা ও মতামত উদ্ধৃত করে দিতে পারাকেই কোরআন সংক্রান্ত জ্ঞানের পরাকাষ্ঠা বলে মনে করেছে। অথচ এই মোটা কথাটা সাধারণ বুদ্ধিতেও বুঝা যায় যে, একটি আয়াতের সঠিক বিষয়বস্তু শুধু একটিই হতে পারে। কিন্তু একে তো বর্ণনাসমূহের যথার্থ পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইর কাজটি খুব সহজ ছিল না। দ্বিতীয়ত সঠিক বর্ণনার দ্বারা যে মতামত সপ্রমাণিত হতে হবে সেগুলোর পূর্বাপর যোগসূত্র এবং শব্দ ও চয়ন পদ্ধতির সাহায্যে কোন একটি মতকে প্রাধান্য দেয়া ছিল তার চাইতেও কঠিন কাজ, কাজেই যা কিছু উদ্ধৃত রয়েছে সেগুলোকে হুবহু নকল করে দেয়ার মধ্যেই সবাই মঙ্গল বিবেচনা করেছেন এবং নিজের জ্ঞান-বুদ্ধিকে আলোচনা-সমালোচনা, যাচাই-বাছাইয়ের মাথা ব্যথা থেকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছেন।
বলাবাহুল্য, তফসীরের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রেওয়ায়েতের উপরই সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করা কোরআনের অকাট্যতা ব্যাহত করারই শামিল। এতে কোরআন মজীদের শব্দাবলীর সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায় এবং সম্পূর্ণ নির্ভরতা রেওয়ায়েতের উপর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তা ছাড়া রেওয়ায়েতও আবার তফসীর সংক্রান্ত রেওয়ায়েত- যার ব্যাপারে পর্যালোচকদের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এগুলোতে রেওয়ায়েতের সাধারণ রীতিনীতির খুব কমই পরোয়া করা হয়েছে।
পরবর্তীকালে দর্শন ও তর্কশাস্ত্রের প্রবলতার দরুন যখন কোরআনের পবিত্র দরবারে তার্কিক বিতর্ক এবং দার্শনিক বাগবিতন্ডার অনুপ্রবেশ ঘটে, তখন এই জটিলতা অধিকতর বেড়ে যায়। এ পর্যন্ত তো অনেকটা মঙ্গল ছিল যে, কোরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ব্যাপারটি রেওয়ায়েত পর্যন্তই সীমিত ছিল; প্রত্যেকটি বিষয়ের ধারাবাহিকতা ভুল হোক কি শুদ্ধ হোক- ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, কাতাদাহ প্রমুখ পর্যন্ত গিয়ে পৌছাত, কিন্তু এখন তাঁরাও একই দলে গিয়ে মিশেছেন, যাঁরা উদ্ধৃতি অপেক্ষা যুক্তির প্রতি আকৃষ্ট এবং কোরআন মজীদের প্রতিটি আয়াতকে নিজের কাঠামোতে ঢেলে সাজাতে উৎসাহী। কোরআনের শব্দাবলীর প্রভাব ইতিপূর্বেই তিরোহিত হয়ে গিয়েছিল। সে কারণে তাদের পথে রেওয়ায়েতের প্রতিবন্ধকতা ছাড়া অন্য কোন বাধাই ছিল না। এই প্রতিবন্ধকতাকে ধর্মীয় পবিত্রতা এবং জনপ্রিয়তার দরুন অনেকটা সম্মানিত বলে মনে করা হত। ফলে তা সহসাই বিলুপ্ত করে দেয়া সম্ভব ছিল না। এই জটিল- তার সমাধান করতে গিয়ে তাঁরা রেওয়ায়েত ও বর্ণনা-উদ্ধৃতির বিপুল সংগ্রহ থেকে যেটা নিজ নিজ প্রয়োজন ও চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেছেন ঠিক ততটুকুই তুলে নিয়েছেন। আর বাকীগুলোতে কোনরকম হস্তক্ষেপ না করে প্রতিপক্ষের জন্যে রেখে দিয়েছেন। যেসব আয়াত স্বনির্ধারিত মতবাদের সাথে সুসমঞ্জস বলে মনে হয়েছে সেগুলোকে নিজের সমর্থনে ব্যবহার করেছেন এবং যেগুলো বাহ্যত কিছুটা বিরোধী বলে মনে হয়েছে সেগুলোকে আয়াতে মুতাশাবিحات (দ্ব্যর্থবোধক)-এর তালিকায় তুলে রেখেছেন। এভাবে একই আয়াত কোন এক দলের মতে মুহকাম (অকাট্য) এবং অন্য দলের মতে মুতাশাবিহ্ (দ্ব্যর্থবোধক) হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। বস্তুত মনসূখ বা রহিতকরণ ধারার ফলে ইতিপূর্বেই কোরআনের একটা বিরাট অংশ উম্মতের জন্য উদ্দেশ্যহীন হয়ে গিয়েছিল। তদুপরি উল্লিখিত সাম্প্রদায়িক বিভক্তির দরুন আরো একটি বিরাট অংশকে আয়াতে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হল।
এসব মতবিরোধ পরবর্তী পর্যায়ে আরও একটি গোলযোগের জন্ম দিয়েছে। অর্থাৎ, সমস্ত শাব্দিক প্রমাণের যথার্থতা সন্দিগ্ধ হয়ে গেছে। ফলে জনমনে এমন একটা ধারণার উদয় হয়েছে যে, যেহেতু শব্দ ও বাক্যের মূল ভিত্তি সম্পূর্ণত উদ্ধৃতি-নির্ভর এবং উদ্ধৃতি একটি কাল্পনিক বিষয়, কাজেই শাব্দিক কোন প্রমাণ অকাট্য বিবেচিত হতে পারে না। বস্তুত এর ফল দাঁড়ায় এই, যেসব আয়াত তার উদ্দেশ্যে একান্তই প্রকৃষ্ট ছিল, সেগুলোকেও যদি কোন দল নিজেদের গৃহীত মতবাদের বিরোধী মনে করেছে তা হলে আয়াতে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছে।
ইমাম রাযী (রঃ) বলেনঃ "জানা উচিত, স্থানটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক সম্প্রদায়ই দাবী করে যে, যেসব আয়াত তাদের মতবাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেগুলোই মুহকাম বা অকাট্য। আর যেগুলো তাদের প্রতিপক্ষের মতবাদের সমর্থক সেগুলো মুতাশাবিহাত বা দ্ব্যর্থবোধক। সুতরাং মু'তাযেলা সম্প্রদায়ের দাবী হল, فَمَنْ فَلْيُؤْمِنُ আয়াতটি মুহকাম। আর وَمَا تَشَاعُونَ আয়াতটি মুতাশাবিহ। অথচ আহলে সুন্নতের দাবী এর বিপরীত। কাজেই এজন্যে একটি যথারীতি নীতি নির্ধারণ করা কর্তব্য।" (তফসীরে কবীরঃ খন্ড ২, পৃঃ ২৯২)
ইমাম সাহেবের ভাষায় এই নীতিটি হল : "আমি বলি, যখন কোন একটি শব্দ দ্ব্যর্থবোধক হবে এবং এর একটি অর্থ প্রবল ও অন্য অর্থ দুর্বল হয় আর আমরা যদি দুর্বল অর্থ পরিহার করে সবল অর্থ ব্যবহার করি, তা হলে তা হবে মুহকাম। আর সবল অর্থ পরিহার করে যদি দুর্বল অর্থ প্রয়োগ করি, তা হলে তা হবে মুতাশাবিহ। আর তখনই আমরা বলব, সবলকে বর্জন করে দুর্বলকে গ্রহণ করতে হলে তার সমর্থক কোন প্রমাণের প্রয়োজন। সে প্রমাণটি শাব্দিকও হতে পারে অথবা যুক্তিভিত্তিকও হতে পারে। (তফসীরে কবীরঃ খন্ড ২, পৃঃ ৫৯২)
অতঃপর শাব্দিক প্রমাণ সম্পর্কে ইমাম রাযীর অভিমত: "শাব্দিক প্রমাণ কখনও অকাট্য হতে পারে না। কারণ, প্রত্যেকটি শাব্দিক প্রমাণই আভিধানিক ও ব্যাকরণিক উদ্ধৃতির ওপর নির্ভরশীল। আর এ সমুদয় বিষয়ই কল্পনাপ্রসূত। আর যা কল্পনাপ্রসূত বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল তা অধিকতর কাল্পনিক। কাজেই প্রমাণিত হয় যে, শাব্দিক প্রমাণাদি কখনই অকাট্য হতে পারে না।"
শাব্দিক প্রমাণের কাল্পনিকতা এবং তা গ্রহণের অযোগ্য প্রমাণিত হয়ে যাওয়ার পর শুধু একটা বিষয়ই থেকে যায়। তা হল মানুষের জ্ঞান বা বুদ্ধি। কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধি বলতে সে জ্ঞান নয়, যা আল্লাহ্ তায়ালা যেকোন মানুষকেই দান করেছেন; বরং সে জ্ঞান যা যৌক্তিক মতামত এবং দার্শনিক বিতর্কে সমর্থ। এটা মেনে নিলে কোরআনের অর্থ চলে যায় তার্কিক বিতর্কবিদদের হাতে। সুতরাং এ সম্পর্কে ইমাম রাযী বলেনঃ
"কোন বিষয় যখন তার জায়গায় অকাট্য ও নিশ্চিত হবে, তখন তার সম্পর্কে কাল্পনিক ও দুর্বল যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে কোন মন্তব্য করা জায়েয নয়। যেমন, আল্লাহর কালাম لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا (আল্লাহ্ কারও উপর তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত চাপ-আরোপ করেননি) আয়াত সম্পর্কে অকাট্য প্রমাণের দ্বারা সাব্যস্ত হয়ে গেছে যে, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের এমন চাপের সম্মুখীন করেন। আমরা এ আয়াতের বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে নিম্নে এর সমর্থনে পাঁচটি অতি দুঢ় প্রমাণ উদ্ধৃত করছি। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আয়াতের বাহ্যিক অর্থ আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়। ইমাম রাযী এবং অন্যান্য সমস্ত আশায়েরা মতাবলম্বী মুফাস্সেরগণ এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে তাদের সাধ্যাতীত গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন, যা পালন করার ক্ষমতা তাদের মধ্যে তিনি দেননি। এ বিষয়টির সমর্থনে তিনি সূরা বাকারার ৬ষ্ঠ আয়াত এবং উল্লিখিত আয়াতের প্রেক্ষিতে কতিপয় যুক্তি-প্রমাণ বর্ণনা করেছেন। এ ছাড়াও তাঁর তফসীরে যে কোনখানে প্রয়োজন বোধ করেছেন তার প্রমাণসমূহের বিশ্লেষণ করেছেন। বস্তুত উল্লিখিত আয়াতকে তিনি নিজস্ব মতবাদের সম্পূর্ণ বিরোধী এবং প্রতিপক্ষ মু'তাযেলা মতবাদের সমর্থক বলে লক্ষ্য করেছেন। কাজেই এই বিরোধ থেকে বাঁচার জন্যে প্রথমত তিনি এর বাক্যবিন্যাস পরিবর্তন করেছেন, কিন্তু তাতেও যখন সন্তুষ্ট হতে পারেননি, তখন নিজের তীক্ষ্ণ যুক্তির আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। পক্ষান্তরে যুক্তির বিশেষ অস্ত্রটি প্রয়োগ করেও যখন পরিপূর্ণ আত্মতুষ্টি লাভ করতে পারেননি, তখন বের করে নিলেন সেই তলোয়ার, যার আঘাতের সামনে কোন কিছুই প্রতিবন্ধক থাকে না। অর্থাৎ, ঘোষণা করে বসলেন যে, যদিও আয়াতটি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলছে যে, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদেরকে সাধ্যাতীত কোন বাধ্যবাধকতার সম্মুখীন করেন না, কিন্তু যখন একটি দুটি নয়, পাঁচ পাঁচটি যৌক্তিক প্রমাণের মাধ্যমে সাব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে যে, আল্লাহ্ সাধ্যাতীত বাধ্যবাধকতা আরোপ করেন, তখন কোরআনের একটি মাত্র আয়াত— যার প্রমাণ সম্পূর্ণভাবে শ্রবণ ও কল্পনার ওপর নির্ভরশীল, সে কেমন করে এহেন (যৌক্তিকতার) সুদৃঢ় দুর্গকে ধ্বংস করতে পারে?
উল্লিখিত বিশ্লেষণের ফলাফল দাঁড়ায় নিম্নরূপ:
১। প্রাথমিক যুগের পরে কোরআনের তফসীরের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে রেওয়ায়েত ও পূর্ববর্তী বর্ণনাসমূহের ওপর নির্ভর করা হয়। আর এতে এমনই বাড়াবাড়ি করা হয় যে, সত্য-মিথ্যা বা ভাল-মন্দ যেকোন রকম কল্পকাহিনী এবং মিথ্যা ও অলীক রেওয়ায়েতসমূহ তফসীর গ্রন্থসমূহে স্থান পায়। তদুপরি সেসব রেওয়ায়েতের ওপর এত বেশী নির্ভর করা হয়, যাতে কোরআনের বাক্যাবলীর প্রমাণিত বিষয়গুলো পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।
২। তর্কশাস্ত্র এবং দর্শনের বাড়াবাড়ি কোরআন মজীদের অকাট্যতাকে আরও সন্দিগ্ধ করে ফেলেছে। কারণ, তার্কিকদের তথাকথিত যৌক্তিক-প্রমাণাদির মোকাবিলায় স্বয়ং কোরআনের বাক্যাবলীর প্রমাণগুলো সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। ফলে কোরআনের তফসীরের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ নির্ভরশীলতা সেসব প্রমাণপঞ্জির মধ্যে সীমিত হয়ে গেছে, যা ছিল আমাদের তর্কবিদদের একান্তই মস্তিষ্ক প্রসূত।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 প্রতিক্রিয়া

📄 প্রতিক্রিয়া


যাঁরা সেসব তফসীরের সাহায্যে কোরআন বুঝার চেষ্টা করেছেন, উপরোল্লিখিত বিষয়গুলোর কারণে তাঁদেরকে সম্পূর্ণভাবে নিরাশ হতে হয়েছে এবং সময়ের গতিবিধির সাথে সাথে এই নৈরাশ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি আজ আমরা এই সমস্যার সম্মুখীন যে, এক দল সর্বশক্তি নিয়োগের মাধ্যমে রেওয়ায়েত ও হাদীসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসেছে। তাদের দাবী হচ্ছে যে, সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) কোরআনকে তার বাক্যাবলীর মাধ্যমেই বুঝে নিতেন। এজন্য তাঁদের যেমন কোন রেওয়ায়েতের প্রয়োজন হয়নি, তেমনি তাঁরা তর্কবিদদের যুক্তিরও মুখাপেক্ষী ছিলেন না। অথচ বর্তমানে কোরআন বুঝা এবং বুঝানোর জন্যে ইবনে জারীর, ইমাম রাযী, কাজী বয়যাবী এবং ইমাম সুয়ূতী প্রমুখের গ্রন্থের ওপর নির্ভর করতে হবে কেন?
অতপর পাশ্চাত্যানুরাগীরা এসব ধারণাকে অধিকতর রং লাগিয়ে ফলাও করেছে। এরা কোরআন মজীদ কিংবা ইসলামী শরীয়ত সম্পর্কে কথিত-বর্ণিত যেসব বিষয় জেনেছে, সেগুলো তাদের রুচি ও যুক্তির সাথে পুরোপুরিভাবে খাপ খায়নি। আর যা তারা জানতে পারেনি, সেগুলো না জানার গ্লানি স্বীকার করতেও রাজি হতে পারেনি। ফলে সম্পূর্ণভাবে হাদীস ও রেওয়ায়েতের যথার্থতাকেই অনেকে অস্বীকার করে বসেছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে যে, রেওয়ায়েতের অস্তিত্বও স্বীকার করব না এবং সেগুলো না জানার গ্লানিও মেনে নেব না। তারা দাবী করে যে, কোরআন মজীদ তো একটা অতি সহজ ও সরল গ্রন্থ। এতে প্রথমে সম্বোধন করা হয়েছে আরবদেরকে, যারা একান্তই বর্বর ও বেদুঈন ছিল, শুধু মোটা কথাই তারা বুঝতে পারত। কাজেই এমন জাতিকে এমন একটি গ্রন্থ দান করা— যার নিগূঢ় তত্ত্ব-রহস্য সম্পর্কে বলা হয়, এর বিস্ময়করতা কোন দিনই শেষ হবার নয়; একটা অর্থহীন কথা ছাড়া আর কিছু নয়। তদুপরি এমনটি আল্লাহ্ হেকমত বা অভিজ্ঞানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কোরআন মজীদ সারা বিশ্ব মানবের জন্য হেদায়াত ও সুপথপ্রাপ্তির সনদ হিসেবে নাযিল হয়েছে। কাজেই তার সহজবোধ্য হওয়া অপরিহার্য। পক্ষান্তরে তা যদি সূক্ষ্ম তত্ত্ব ও নিগূঢ় রহস্যবহুল হয়, তা হলে পৃথিবীর তাবৎ মানুষ তার উপকারিতা থেকে বঞ্চিত রয়ে যাবে। সর্বোপরি তাতে করে বান্দাদের ওপর আল্লাহ্র প্রমাণও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে না। এসব ধারণার প্রেক্ষিতে তারা কোরআনের সেসব আয়াতকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে, যেগুলো তাদের ধারণা মতে কোরআনের সহজবোধ্যতা প্রকাশ করে। তা ছাড়া হাদীস ও রেওয়ায়েতসমূহকে তারা এই বলে বর্জন করে যে, এগুলো সবই কাল্পনিক বিষয়। যদি কোরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বা তফসীরের ভিত্তি এসব কাল্পনিক বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তা হলে কোরআনের অকাট্যতা বিনষ্ট হয়ে পড়বে। এভাবে নির্বিঘ্নে তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, কোরআন বুঝার জন্যে আরবী ভাষার জ্ঞান ছাড়া অন্য কোন কিছুরই প্রয়োজন নেই। এসব ধারণা ও মতামতের প্রেক্ষিতে এখন আমাদের বক্তব্য হচ্ছে-

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কালামের জটিলতা ও সহজবোধ্যতার তিনটি দিক

📄 কালামের জটিলতা ও সহজবোধ্যতার তিনটি দিক


কোন কালাম বা বাণীকে জটিল কিংবা সহজ বলতে হলে তিনটি দিক বিবেচনা করতে হয়ঃ
১। স্বয়ং বাণী হিসেবে। অর্থাৎ, যদি কোন বাক্যের শব্দসমূহ দুর্বোধ্য হয়, বিন্যাসে জটিলতা থাকে, ব্যাকরণিক নিয়ম এবং পরিভাষা যদি সাধারণভাবে প্রচলিত রীতি-বিরুদ্ধ হয়, রূপক-উপমিতি যদি দুর্বোধ্য হয় এবং তুলনাগুলো যদি অস্বচ্ছ হয়, তা হলে সে কালাম বা বাণীকে জটিল বলা যাবে। পক্ষান্তরে শব্দ চয়ন, পরিভাষা প্রভৃতি যদি সাধারণ হয়, বাক্যবিন্যাসে কোন রকম জটিলতা না থাকে এবং ব্যাকরণের প্রচলিত নিয়মের প্রতি যদি যথাযথ লক্ষ্য রাখা হয়, তা হলে সে বাণী বা কালামকে সহজ, মার্জিত এবং জটিলতা বর্জিত বলা যাবে। মির্যা গালেবের যে কাব্য বেদিলের রীতিতে বিন্যস্ত, তা যেকোন লোকের পক্ষে কঠিন এবং বিস্বাদ বলে মনে হবে। কিন্তু যে অংশ তাঁর নিজস্ব রীতিতে বিন্যস্ত, সেগুলো সাবলীলতা, অলঙ্কার ও হৃদয়গ্রাহিতার একান্ত বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
২। বিষয়বস্তু হিসেবে। কোন কোন বিষয়বস্তু নিজেই খুব সহজ হয়। যেমন, কিস্সা-কাহিনী, গল্প-উপন্যাস এবং আইন প্রভৃতি। আর কিছু বিষয় আছে, যা নিজেই জটিল। যেমন-দর্শন, তর্কশাস্ত্র, জ্যামিতি, গণিত, সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতি। প্রথমোক্ত বিষয়সমূহ বিশেষ চিন্তা-ভাবনা কিংবা বিচার-গবেষণার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু দর্শন গ্রন্থ গল্প-উপন্যাসের মত পাঠ করে বুঝা সম্ভব নয়।
৩। যাকে সম্বোধন করা হবে, তার প্রেক্ষিতে। গালেবের একটা অতি সাধারণ গযলও প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠকের জন্য অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু একজন বিশেষজ্ঞ তাঁর অতি কঠিন কবিতাটিও অতি সহজে বুঝে নিতে পারেন।
এসব বিষয়ের প্রেক্ষিতে এখন কোরআন মজীদের সহজবোধ্যতা ও সরলতার কথা চিন্তা করুন। কোরআন মজীদ এমন এক বাণী, যার অলঙ্কারের কোন উদাহরণ আরব, আজম তথা গোটা বিশ্বে নেই। এমন বাণী সম্পর্কে প্রথমোক্ত বিষয়ের দিক দিয়ে কোন আলোচনাই আসতে পারে না। কারণ, বাণীর এহেন ত্রুটি বাস্তব অসমর্থতার দরুনই সৃষ্টি হতে পারে। পক্ষান্তরে কোরআন মজীদ যাঁর বাণী, তিনি যাবতীয় ত্রুটি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। কাজেই কোরআন মজীদ যে যুগে অবতীর্ণ হয়েছে, সে যুগের ভাষা অলঙ্কার ও সাহিত্য শৈলীর যাবতীয় গুণ-বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। এমনকি সে যাদেরকে উদ্দেশ করে বক্তব্য রেখেছে, তারা পৃথিবীতে বাণী শিল্পের সবচাইতে উত্তম সমালোচক ছিল এবং তার প্রতিটি অক্ষরের প্রতি বিদ্বিষ্ট হওয়া সত্ত্বেও একথা স্বীকার করত যে, এটা একান্তই 'জাদু'। কোরআন তাদের কাছে দাবী করেছে যে, তোমরা এর মত একটি মাত্র সূরা উপস্থাপন কর এবং প্রয়োজনবোধে তোমরা সেজন্য যাবতীয় আসমানী ও যমিনী শক্তিগুলোকে সমবেত করে নাও। কিন্তু তাদের কাছে এ দাবীর এ ছাড়া আর কোন উত্তরই ছিল না যে, 'এটা একান্তই জাদু'।
এমন একটি কালাম বা বাণীতে ব্যাকরণের সাধারণ নিয়ম-নীতির প্রতি লক্ষ্য রাখা, অপ্রচলিত দুর্বোধ্য শব্দাবলী ও পরিভাষার ব্যবহার বর্জন, জটিল ও বিভ্রান্তিকর দ্ব্যর্থবোধক শব্দাবলীর ব্যবহার থেকে বেঁচে থাকা এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয়গুলো এমনই প্রাথমিক পর্যায়ভুক্ত, যে ব্যাপারে আদপেই কোন প্রশ্ন ওঠতে পারে না। সুতরাং এ দিক দিয়ে নিঃসন্দেহে দাবী করা যেতে পারে যে, কোরআন মজীদ একান্তই প্রকৃষ্ট ও সহজ বাণী।
অতপর দ্বিতীয় প্রেক্ষাপটে চিন্তা করা যেতে পারে- অর্থাৎ, বিষয় নির্বাচন ও বর্ণনাভঙ্গির দিক দিয়ে। কোরআন মজীদ স্বীয় আলোচ্য বিষয় ও বর্ণনাভঙ্গির দিক দিয়ে কোন্ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত? যাঁরা কোরআন মজীদের বিভিন্নমুখী বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল তাঁরা এ প্রশ্নের এ উত্তরই দেবেন যে, এটি উল্লিখিত উভয় শ্রেণী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এর সম্পর্কে সাধারণভাবে মুসলমানদের মধ্যে একটা অস্পষ্ট ধারণা সৃষ্টি হয়ে আছে যে, কোরআন আইন-কানুন ও নির্দেশাবলীর একটা সংগ্রহ। এই বিভ্রান্তিতে যেমনি ভুগছে সাধারণ মানুষ, তেমনি ভুগছেন বহু আলেমও। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত লোকেরাও এ ধরনের বিভ্রান্তির শিকার হয়ে আছেন। এর কারণ সম্ভবত এই যে, এরা হারাম-হালাল নির্দেশক একটা মাপকাঠির ঊর্ধ্বে 'দ্বীন'কে অন্য কোন কিছু কল্পনাই করতে পারে না। কাজেই ফেকাহ শাস্ত্রের মৌলিক ও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো পৃথক পৃথকভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে যাবার পর অনেকেই কোরআন মজীদের তেলাওয়াতকে শুধুমাত্র বরকতের বিষয় হিসেবে গণ্য করে থাকে। ইলমুল একীন বা সত্য দর্শন সৃষ্টি করা এবং জ্ঞান ও চেতনা বিকাশের দৃষ্টিভঙ্গিতে একে আর তেমন উপকারী বলে বিবেচনা করা হয় না। এসব ধারণা সৃষ্টির এবং বিভ্রান্তির একটা ইতিহাস রয়েছে, যার বিশ্লেষণের স্থান এটা নয়। তথাপি কয়েকটি কারণ সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়া অত্যন্ত জরুরী।
১। প্রথম কথাটি হল, আমাদের ওলামা সম্প্রদায়ের সাধারণ ভুল ধারণা যে, ধর্মের ব্যাপারে যুক্তির কোন অবকাশ নেই। তাঁদের ধারণা, আমরা যেসব বিষয়ের ওপর ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন করি তা নবী ও রসূলগণ বলে গেছেন বলেই করে থাকি। আর নবী-রসূলগণকে কোন যৌক্তিক প্রমাণের দ্বারা নয়, বরং মু'জেযা বা অলৌকিক কার্যকলাপের দ্বারা চিনতে পারি। ধর্মের ব্যাপারে যদি যুক্তির কোন প্রবেশাধিকার থাকত, তা হলে ওহীর কি প্রয়োজন ছিল? তা ছাড়া গায়েবের ওপর ঈমান আনার সংজ্ঞাই বা দেয়া হবে কেন? সহজ কথা এই যে, যাদের কাছে 'দ্বীন' বা ধর্ম এমনি একটা সহজ ও তুচ্ছ বিষয় বলে গণ্য, তারা কোরআন মজীদকে কতিপয় আদেশ ও নিষেধের নীতিমালার অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতেই পারে না। তা ছাড়া এহেন নীতিমালাকে বুঝার জন্যে নিশ্চয়ই বিশেষ চিন্তা-গবেষণার প্রয়োজন তাদের কাছে নেই। যে কেউ একে পড়ে অতি সহজভাবে বুঝে নিতে পারবে।
২। দ্বিতীয় কারণটি হল, গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচলন। যাঁরা দর্শন ও তর্কশাস্ত্রের পর্যালোচনায় মনোনিবেশ করেছেন, তাঁরা কোরআন মজীদকে করা ও না করার বিষয়সমূহের একটা বিক্ষিপ্ত সংগ্রহ এবং ওয়াজ-নসীহতের একটি বিশুষ্ক পাণ্ডুলিপির অতিরিক্ত মর্যাদা দেননি। তাঁরা অত্যন্ত নিম্নমানের এবং প্রকৃতি ও হেদায়াতের পথ থেকে ভ্রষ্ট দর্শনের নিগড়ে জড়িয়ে গেছেন। তাঁরা ধারণা করে নিয়েছেন যে, তৌহীদ ও রেসালাত বিষয়েও দর্শনের মাধ্যমেই দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করা যেতে পারে। ধর্মও আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যর্থ। এই ধারণা তাঁদেরকে কোরআন মজীদ থেকে বহু দূরে সরিয়ে দিয়েছে। যেহেতু গ্রীক চিন্তা-দর্শন দীর্ঘকাল পর্যন্ত মানুষের মন-মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল, কাজেই তার প্রভাব মানুষের মনের ওপর এমনভাবে ছেয়ে ছিল যে, কারও কাছে কোরআনের প্রকৃত মাহাত্ম্য কিছুটা বিকশিত হয়ে থাকলেও সে সাধারণ প্রচলিত মতাদর্শের বিরুদ্ধে কিছু বলার মত সাহস করতে পারেনি।
৩। তৃতীয় কারণটি হচ্ছে, তদানীন্তন আরবদের মূর্খতা সম্পর্কে সাধারণ বিশ্বাস, যার প্রতি ইতিপূর্বে আমরা ইঙ্গিত করেছি। পরিতাপের বিষয়, আরবদের সম্পর্কে আমাদের ওলামা সম্প্রদায় এবং আধুনিক শিক্ষিত সমাজ উভয়েই সমানভাবে একই বিভ্রান্তিতে পড়ে রয়েছেন। আলেমদের কাছে তো কোরআনের কোন মাহাত্ম্যই প্রকাশ পায় না, যে পর্যন্ত না তদানীন্তন আরবদেরকে চতুষ্পদ জন্তু অপেক্ষাও নিকৃষ্ট প্রতিপন্ন করা হয়। আর আধুনিক শিক্ষিত সমাজ ইসলামের আবির্ভাবকালীন জাহেল ও বন্য আরবদের মধ্যে মেধা-মস্তিষ্কের সামান্যতম যোগ্যতা কিংবা সামর্থ্যের কথা কল্পনাই করতে পারেন না। তাঁদের ধারণা, কোরআন মজীদ শুধুমাত্র কতিপয় নির্দেশ এবং কতিপয় উপদেশ বাণীর সহজ-সরল একটা সংকলন মাত্র। কাজেই কেউ যদি কোন আরবী পত্র-পত্রিকা বা পুস্তক-পুস্তিকার কোন রকমে উল্টা-সিধা তরজমা করতে সমর্থ হয়েই যেতে পারে, তা হলে সে কোরআনের তফসীর প্রণয়নেরও অধিকার লাভ করে ফেলে। অথচ আরবদের সম্পর্কে এহেন ধারণা একান্তই অবাস্তব। যিনি তাদের সাহিত্য সম্পর্কে সামান্যও পর্যালোচনা করেছেন, তিনি এই বাস্তবতা কোনক্রমেই অস্বীকার করতে পারেন না যে, মেধা ও মস্তিষ্কের দিক দিয়ে জাহেলিয়াত যুগেও আরবরা তাদের সমকালীন যেকোন জাতি থেকে পিছিয়ে ছিল।
সারকথা, সাধারণ-অসাধারণ সবাই কোরআনকে তার প্রকৃত মান থেকে বহু নিম্নে নামিয়ে দেখেছে। সাধারণ সমাজ মানসিক যাতনা এবং বৈজ্ঞানিক জটিলতা থেকে মুক্ত হয়ে থাকে এবং ধর্মকে তারা শুধু বিশ্বাস হিসেবে মান্য করে। হালাল-হারাম জানা এবং ধর্মের বাহ্যিক রীতি-নীতি ও করণীয় বিষয়সমূহ সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্যই তাদের ধর্মের প্রয়োজন। এই প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পর তাদের অতিরিক্ত অন্য কোন কিছুর প্রয়োজনও থাকে না আর তারা এর চাইতে বেশী কোন কিছু চিন্তাও করতে পারে না। পক্ষান্তরে আলেম সমাজ সাধারণতঃ তদানীন্তন আরবদের প্রতি তাদের কুধারণার ফলে কোরআন মজীদের প্রতি মনোনিবেশ করতে পারেন না। তাঁরা কোরআন মজীদকে আইন-কানুন ও নির্দেশাবলীর একটা সংকলন হিসেবে দেখেছেন, যাতে প্রাসঙ্গিকভাবে ওয়াজ -নসীহত আকারে বিগত জাতিসমূহের কিছু কাহিনী এবং পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের বিশ্বাস ও কার্যকলাপ প্রভৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া কোন কোন জায়গায় তৌহীদ, আখেরাত প্রভৃতি সম্পর্কেও স্কুল দলিল-প্রমাণের উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে, যা সাধারণ সমাজের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। যারা কোরআনকে মুজেযার ভিত্তিতে স্বীকার করত তাদের জন্য এর অতিরিক্ত কোন কিছুর প্রয়োজন আদৌ ছিল না। কিন্তু যারা এর 'চাইতে বেশী কোন কিছুর প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন, তারা কোরআনকে পাশ কাটানো গ্রীক দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে মজে গেছেন।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কোরআন নাযিলের উদ্দেশ্য

📄 কোরআন নাযিলের উদ্দেশ্য


কোরআন সম্পর্কে এর চেয়ে বেশী খারাপ ধারণার বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। তাই তা দূর করার চেষ্টা করা কর্তব্য।
সর্বাগ্রে এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা দরকার যে, কোরআন নাযিলের উদ্দেশ্য কি?
কোরআনে আদম (আঃ) ও শয়তানের কাহিনী বিভিন্ন সূরায় বর্ণনা করা হয়েছে। এই কাহিনী পাঠে জানা যায়, শয়তান যখন আল্লাহ্ তাআলার হুকুমের বিরুদ্ধে ঈর্ষা ও অহঙ্কারের দরুন আদমকে সেজদা করতে অস্বীকার করে বসে, তখন আল্লাহ শয়তানকে হুকুম করেন-
قَالَ فَاهُبِطُ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَنْ تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَا خَرُجُ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ .
জান্নাত থেকে বেরিয়ে যা। এ বিষয়ে অহঙ্কার করার কোন অধিকারই তোর নেই। বেরিয়ে যা। তুই নিকৃষ্ট অপদস্থদের অন্তর্ভুক্ত।
এতে শয়তান কিছু সময় চাইল এবং ঈর্ষার তোড়ে বললঃ
قَالَ فَبِمَا أَغْوَيْتَنِي لَا قُعْدَنَّ لَهُمْ صِرَاطَكَ الْمُسْتَقِيمَ ثُمَّ لَا عَنَهُمُ مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَ مِنْ خَلْفِهِمْ وَ عَنْ أَيْمَانِهِمْ وَ عَنْ شَمَائِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرُهُمْ شَاكِرِينَ .
যেহেতু তুমি আমাকে গোমরাহ করেছ, আমি তাদেরকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে সকল পথ আগলে বসব। তারপর আমি তাদের কাছে সামনের দিক দিয়ে, পেছন দিক দিয়ে, ডান ও বাম দিক দিয়ে আসব। আর তখন তুমি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবে না।
শেষ পর্যন্ত শয়তান আদমকে বিভ্রান্তিতে ফেলার উদ্দেশে আল্লাহ তাআলার নিকট কিছু সময় চেয়ে নিল এবং তাদেরকে ধোঁকা দিতেও কামিয়াব হয়ে গেল। ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁদের দু'জনকে (আদম ও হাওয়াকে) জান্নাত থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশ এল। অতএব, আল্লাহ্ তাঁদের প্রতি নির্দেশ দিলেন-
اُهْبِطُوا بَعْضُكُمْ بِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَّتَاعُ إِلَى حِينٍ
তোমরা বেরিয়ে যাও। তোমরা একে অন্যের শত্রুতে পরিণত হয়েছ এবং তোমাদের জন্য একটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকা ও তা উপভোগ করা নির্ধারিত হয়েছে।
আদম এবং তাঁর সন্তান-সন্ততির জন্য পৃথিবীর এই আশ্রয়টি ছিল অত্যন্ত কঠিন। শয়তানের সঙ্গে তাঁদেরকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়, যে কিনা ঈর্ষার জ্বালা ও প্রতিশোধের উন্মাদনায় এমনি মত্ত যে, প্রথম দিনেই চরম পত্র দিয়ে বসে— 'আমি তাদের অগ্র-পশ্চাত সব দিক দিয়ে এসে তাদের পথভ্রষ্ট করব এবং তাদের অধিকাংশকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়ব।' অপর দিকে সে এমনই চতুর ও ধূর্ত যে, একই তুড়িতে আদমের দৃঢ়তার সমস্ত বন্ধনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমতাবস্থায় রহমতে এলাহীর দায়িত্ব ছিল আদমকে এমন একটা অস্ত্র সরবরাহ করা, যা সেই ধূর্ত শত্রু শয়তানের মোকাবিলা করতে গিয়ে কাজে আসবে এবং তাঁর সন্তান-সন্ততি শয়তানের অবিরাম আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। অতএব আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আদম (আঃ) ও তাঁর সন্তান-সন্ততিকে শয়তানের মোকাবিলা করার জন্য সে অস্ত্র সরবরাহ করেছেন এবং নিম্নে বর্ণিত ভাষায় তাঁদেরকে সান্ত্বনা দিয়েছেন-
فَاِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ .
আমার তরফ থেকে অবশ্য আসবে তোমাদের জন্য হেদায়াত (নবী ও শরীয়ত), যারা আমার হেদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের জন্যে না কোন ভয়-ডর আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে।
এ ওয়াদাই সূরা আ'রাফের ৩৫ তম আয়াতেও করা হয়েছে-
يَا بَنِي آدَمَ إِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ رُسُلٌ مِنْكُمْ يَقُصُّونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي فَمَنِ اتَّقَى وَأَصْلَحَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ .
হে বনী আদম! যখন তোমাদেরই মধ্য থেকে তোমাদের জন্য কোন নবী আসেন এবং তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তখন তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। যারা পরহেযগারী অবলম্বন করবে এবং নিজেকে সংশোধন করে নেবে তাদের জন্য চিন্তা ও ভয়ের কোন কারণ নেই।
শয়তানের দ্বারা দুনিয়াতে ভয় এবং আখেরাতে চিন্তার যে সম্ভাবনা আদমের ছিল, আল্লাহ্ এই অঙ্গীকারের মাধ্যমে তা দূর করে দিয়েছেন।
এখানে এই কাহিনীর নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করব না। তবে শুধু এতটুকু দেখিয়ে দেয়া হবে যে, কোরআনে হাকীম যে মানবীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করেছে এবং মানব জাতির বিকাশের যে ইতিহাস বর্ণনা করেছে, তাতে প্রতীয়মান হয় যে, মানব চরিত্রে যেখানে অসংখ্য গুণ-বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, সেখানে এমন একটি শূন্যতাও রয়েছে, যার ফলে আল্লাহর তরফ থেকে নবী-রসূলগণের আগমন না ঘটলে তারা শয়তানের ফেতনা থেকে নিরাপত্তা লাভ করতে পারত না; বরং তখন প্রতি পদে পদে তাদের জন্য ভয় ছিল প্রকৃতির নিয়ম থেকে সরে গিয়ে পথভ্রষ্টতার অতল গহ্বরে পতিত হওয়ার। অতএব, দুনিয়ায় আদম সন্তানদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নবী-রসূল পাঠানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। তাঁরা পৃথিবীর এই পরীক্ষা ক্ষেত্রে মানুষকে প্রকৃতি ও প্রতিভার কথা স্মরণ করিয়েছেন এবং সত্য-সরল পথের দিকে হেদায়াত করেছেন।
যাঁরা কোরআন সম্পর্কে ওয়াকিফহাল তাঁরা জানেন, কোরআনের পরিভাষায় শয়তান শব্দের অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। জিনদের মাঝে যেমন শয়তান রয়েছে, তেমনি মানুষের মাঝেও। যেভাবে এরা মানুষের ক্রিয়াকলাপ বা আমল -আখলাককে বিভ্রান্ত করে তেমনিভাবে এরা মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির প্রতিও আক্রমণ চালিয়ে তাকে অকেজো করে দেয়। যেমন, সূরা নাস-এর এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন-
الَّذِي يُوَ سُوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجَنَّةِ وَالنَّاسِ .
যারা মানুষের মনে ওয়াসওয়াসা বা সন্দেহের সৃষ্টি করে জিনও মানুষের মধ্য থেকে।
সূরা বাকারার এক আয়াতে রয়েছে-
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ أَمَنُوا قَالُوا أَمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ
এরা যখন মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়, বলে : আমরা ঈমান এনেছি। পক্ষান্তরে যখন নিজেদের সঙ্গী শয়তানের সাথে মিলিত হয়, বলে: আমরা তোমাদেরই সাথে রয়েছি। তাদের ধূর্ততা, পথভ্রষ্টতা এবং মানুষকে গোমরাহ করার কলাকৌশল সম্পর্কে পারদর্শিতার অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-
اِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمُ .
সে' এবং তার দল তোমাদেরকে সেখান থেকে লক্ষ্য করে, যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। এতে বুঝা যাচ্ছে, এ পৃথিবীতে গোমরাহী ও বিভ্রান্তি যেকোন রূপ ধরে এবং যেকোন দিক থেকে আসুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তা শয়তানের পক্ষ থেকেই আসে। আর জিন ও মানুষের মধ্যে যে দুষ্ট সত্তা সৃষ্টিকে আল্লাহ্র সরল পথ থেকে ভ্রষ্ট ও বিচ্যুত করে, তাদের সবাই শয়তান। শয়তানের রূপ অসংখ্য এবং তার ফাঁদ অগণিত। মানুষের মধ্যে আল্লাহ্ তাআলা জাহেরী ও বাতেনী বা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ যত ক্ষমতা দান করেছেন, সে সবগুলোর অবস্থানই তার জানা। সেসব ক'টি দরজা দিয়েই সে ঢুকতে পারে এবং প্রতিটি রাস্তা দিয়ে বেরিয়েও আসতে পারে। সে রক্ত হয়ে শিরায় শিরায় প্রবাহিত হতে পারে। আবার কামনা-বাসনা ও আবেগের আকার ধরে উত্তেজিত করে। হৃদয়ে রূপ-লাবণ্য হয়ে প্রলুব্ধ করে। প্রেম হয়ে মনের গভীরে তাড়নার সৃষ্টি করে। আশা ও অনুরাগের মায়ায় উচ্ছ্বসিত করে তোলে। আবার নিরাশার ফাঁদ পেতে ধরাশায়ী করে দেয়। অসংখ্য উপদেশমূলক গল্প-কাহিনী এবং দার্শনিক তত্ত্ব তার সংগ্রহে রয়েছে। কখনও সে একজন তার্কিকের মত যুক্তি উত্থাপন করে, কখনও দার্শনিকের মত বিশ্ব রহস্য ও সৃষ্টিতত্ত্বের শিক্ষা দান করে। আবার কখনও বিজ্ঞ রাজনীতিকের মত রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম বিষয়সমূহের বর্ণনা দিতে থাকে। কিন্তু যখন এই সমস্ত উপায়-উপকরণ প্রয়োগ করেও আদম সন্তানের বিরোধিতা ও শত্রুতার আগুন প্রশমিত হয় না, তখন অনেক সময় নবুয়তের দাবীদার হয়ে নবুয়তী করতে আরম্ভ করে। এহেন ধূর্ত ও চতুর শত্রুর অনিষ্ট থেকে মানবকুলকে রক্ষা করার জন্য মহান পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে যে গ্রন্থ দেয়া হবে, তা যদি শুধুমাত্র কতিপয় নিয়ম-নীতি বা আইন-কানুন কিংবা কিছু সংখ্যক উপদেশাবলীর সরল-সহজ একটি সংকলনে পরিণত হয়, তা হলে লক্ষ্য করে দেখুন, এহেন মামুলি একটা হাতিয়ার শয়তানের মত ভয়ঙ্কর শত্রুর মোকাবিলায় কতটুকু কাজে লাগতে পারে!
এটা ছিল একটা প্রাসঙ্গিক বিষয়। আসল কথা হচ্ছে, আদি সেই প্রতিজ্ঞার ভিত্তিতেই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বনী আদমের পথ প্রদর্শনের জন্য নবী-রসূল এবং আসমানী গ্রন্থরাজি নাযিল করেছেন। এমনকি আখেরী নবী (হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কেও একই উদ্দেশে পাঠিয়েছেন, যাঁর সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে, তাঁর বয়ে আনা আলোর জ্যোতি অনন্তকাল পর্যন্ত দুনিয়ায় থাকবে। কোরআনে হাকীমে সূরা জুমুআর এক আয়াতে রসূল (সঃ)-এর প্রশংসা প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে-
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمُ ابْتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ .
তিনিই (সেই পরওয়ারদেগার) যিনি নিরক্ষরদের মাঝে তাদেরই একজনকে রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হেকমত বা বিজ্ঞানের শিক্ষা দান করেন।
এটা হযরত ইবরাহীমের সে দোয়া কবুল করারই ঘোষণা, যাতে তিনি নিবেদন করেছিলেনঃ
رَبَّنَا وَابْعَثُ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمُ ابْتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمُ -
ইয়া পরওয়ারদেগার! তাদের মাঝে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ কর, যিনি তোমার আয়াত পাঠ করবেন, তাদেরকে কিতাব ও হেকমতের তালীম দেবেন এবং তাদের আত্মাকে পবিত্র করে তুলবেন।
এ আয়াতটিতে মহানবী (সঃ)-এর চারটি বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দেয়া হয়েছে- (১) আয়াত পাঠ। (২) পবিত্রকরণ। (৩) কিতাবের তালীমদান এবং (৪) হেকমত বা অভিজ্ঞানের শিক্ষাদান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00