📄 কোরআন ও পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থসমূহ
কোরআনের জ্ঞানান্বেষীর পক্ষে পূর্ববর্তী গ্রন্থরাজির (আসমানী) প্রতিও লক্ষ্য রাখা কর্তব্য। যদিও শরীয়তের হুকুম-আহকাম এবং ধর্ম সম্পর্কিত তত্ত্বাবলী মানার ব্যাপারে আমরা পূর্ববর্তী গ্রন্থরাজির মুখাপেক্ষী নই- সূর্যালোকে পথ দেখাবার জন্যে তারকারাজির সাহায্য যদিও নিষ্প্রয়োজন, তাই মুসলমানরা কোরআন আগমনের পর বিকৃত গ্রন্থসমূহের প্রতি আগ্রহী হয়নি। তথাপি কোন কোন জরুরী বিষয় এমনও আছে, যার জন্যে পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থসমূহের পর্যালেচনা যথেষ্ট উপকারী হয়ে থাকে।
একথা যদিও সবারই জানা যে, কোরআন আসমানী গ্রন্থসমূহেরই অন্তর্ভুক্ত এবং আমাদের পয়গম্বর (সাঃ) নবী পরম্পরার বিশেষ ব্যক্তিত্ব, তথাপি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের পর্যালোচনায় বিভিন্ন রকম ফায়দা হতে পারে। এতে আমাদের সামনে কোরআনের প্রকৃত মাহাত্ম্য অঙ্কিতর স্পষ্টভারে উদ্ভাসিত হবে, কোরআনের বহুবিধ ইঙ্গিত-ইশারা আবরণ মুক্ত হয়ে উঠবে এবং আহলে কিতাবদিগকে স্বীকার করাবার জন্যে বহু যুক্তি-প্রমাণ সংগৃহীত হবে। আর শেষ বিষয়টি এ যুগের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিপন্ন হয়ে উঠবে। কারণ, কোরআনের কোন কোন উদ্ধৃতি সম্পর্কে আহলে কিতাবদের উত্থাপিত আপত্তিসমূহের যথার্থ ও অকাট্য জওয়াব দেয়া তখনই সম্ভব, যখন 'তাওরাত', 'ইন্জীল' এবং তৎসম্পর্কিত যাবতীয় সাহিত্য সম্পর্কে বিশেষজ্ঞসুলভ দৃষ্টি থাকবে।
কোরআন মজীদে বর্ণিত সেসব ইশারা-ইঙ্গিতের ব্যাপারটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, যা আহলে কিতাবদের সাথে সম্পৃক্ত। কোরআনের ওপর প্রাথমিক পর্যায়ে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে হয় ছিলেন আহলে কিতাব, যারা নিজেদের ঘরের কথা সম্পর্কে ভালভাবেই অবগত ছিলেন, না হয় ছিলেন মুসলমান, যাঁরা আহলে কিতাবদের সাথে সৎসম্পর্কের দরুন তাদের ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস এবং তাদের ঐতিহ্য সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত ছিলেন। সে কারণেই কোরআন মজীদ আহলে কিতাবদের বিশ্বাস, তাদের মন-মানসিকতা, তাদের বিকৃতি এবং তাঁদের ঐতিহাসিক ঘটনাপঞ্জি প্রভৃতি সম্পর্কে এমন সংক্ষেপ ইঙ্গিত দান করেছে, যাঁর সঠিক ধারণা করতে পারা একান্তই কঠিন ব্যাপার। তবে তা তখনই সম্ভব যখন আহলে কিতাবদের ধর্মীয় পুস্তক এবং তাদের ধর্ম সংক্রান্ত সাহিত্যভাণ্ডার সম্পর্কে পুরোপুরি দখল থাকবে।
অতপর কোরআন মজীদ কোন কোন জায়গায় তাদের গ্রন্থসমূহের উদ্ধৃতি এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যাতে বুঝা যায় যে, কোরআন নিজেস্ত চায়, "র্ধেন গবেষণার ক্ষেত্রে তাদের গ্রন্থসমূহের পর্যলোচনাও করা হয়। যেমন, এরশাদ হয়েছেঃ
لَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِن بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِي الصَّالِحُونَ
অর্থাৎ, আমি যবুর গ্রন্থে উল্লেখান্তে লেখে দিয়েছি যে, পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে আমার সেসব বান্দা যারা সৎকর্মশীল।
অন্য আরেক জায়গায় বলা হয়েছে: إِنَّ هَذَا لَفِي الصُّحُفِ الْأُولَى صُحُفِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى .
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই একথা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে লিপিদ্ধ হয়েছে ইবরাহীম ও মূসার গ্রন্থে।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর প্রতি কোরআনের ইঙ্গিত ইচ্ছের ।
وَقَضَيْنَا إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ فِي الْكِتَابِ لَتُفْسِدُنَّ فِي الْأَرْضِ مَرَّتَيْنِ .
অর্থাৎ, আর আমি বনী ইসরাঈলদের কিতাবে বলে দিয়েছি যে, তোমরা পৃথিবীতে দুটি দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে।
বস্তুত পরিপূর্ণ সমালোচনা ও গবেষণামূলকভাবে যদি পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের পর্যালোচনা করা যায়, তা হলে কোরআন শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে উপকৃত হতে পারে।
কিন্তু সেসব গ্রন্থের ব্যাপারে আল্লাহ্ তাআলা কোরআনকেই কষ্টি পাথর সাব্যস্ত করেছেন। যেসব ব্যাপারে পূর্ববর্তী গ্রন্থ ও কোরআনের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেবে সেখানে আমরা কোরআনকেই গ্রহণ করব এবং অন্যান্য গ্রন্থকে বর্জন করব। ইমাম হামীদুদ্দীন ফারাহী সেসব গ্রন্থের দ্বারা যেভাবে উপকৃত হয়েছেন এবং যেভাবে সেগুলোর ভ্রান্তি আর কোরআনের সত্যতা প্রমাণ করেছেন, তা যদিও তাঁর প্রায় সমস্ত রচনায়ই বিধৃত, কিন্তু 'জবীহ' নামক পুস্তিকায় তার বলিষ্ঠতা প্রণিধানযোগ্য। পূর্ববর্তী ওলামাদের মধ্যে আহলে কিতাবদের সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়ার অভিজ্ঞতা সরাসরি ছিল বলে বুঝা যায়।
কোরআন শিক্ষার্থীর জন্যে উপকারী কতিপয় বিষয় এখানে উল্লেখ করা হল। কিন্তু উল্লিখিত এসব বাহ্যিক উপকরণই মুখ্য নয়। অবশ্য যদি এসব বিষয়ের সাথে পূর্বাপর বর্ণিত অন্যান্য বিষয়সমূহের প্রতিও পুরোপুরি গুরুত্ব আরোপ করা হয়, তা হলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, শিক্ষার্থীর পথ যথেষ্ট- সুগম হবে এবং এ পথে অধিকতর সফলতা লাভে সমর্থ হবে। এসব পর্যায় অতিক্রম করার পরেও কোন শিক্ষার্থীর পক্ষে এমন (বদ্ধমূল) ধারণা করে নেয়া সমীচীন নয় যে, এতেই সে কোরআনের সম্যক জ্ঞান অর্জন করে ফেলতে পারবে। বরং এ ব্যাপারটি সম্পূর্ণভাবেই আল্লাহ তাআলার তৌফিকদানের ওপর নির্ভরশীল। তিনিই পথ প্রশন্ত করে দেন এবং তিনিই যাবতীয় জটিলতার সমাধানের পথে আলোর দিশা দান করেন। সুতরাং কোরআন শিক্ষার্থীর মন-মানস সর্বদা সেদিকেই নমিত রাখা উচিত। যা কিছু লাভ করা যায় সে জন্য কৃতজ্ঞ আর যা লাভ হয়নি তার জন্য আশান্বিত থাকবে। কোন বিষয়েই গর্বিত অথবা নিরাশ হয়ে পড়বে না। তাছাড়া কোরআনকে কখনও ব্যবসা কিংবা যশৎলাভের উপকরণে পরিণত করবে না। বর্তমানকালে যারা এসব পথ অতিক্রম না করেই গবেষণা ও উদ্ভাবনার স্তরে পৌঁছে গেছে, তাদের পক্ষে সত্যিকারভাবে না কোরআনের কোন সঠিক খেদমত করা সম্ভব, না সম্ভব মুলমানদের কোন উপকার সাধন। আল্লাহ্ এহেন লোকদের অনিষ্ট থেকে কোরআনকেও মুক্ত রাখুন এবং মুসলমানদেরকেও বাঁচান; এই প্রার্থনা।