📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কোরআনের আয়ত দু’রকম

📄 কোরআনের আয়ত দু’রকম


মোটামুটিভাবে উল্লিখিত আয়াতের অর্থ এই যে, কোরআনে দু'রকমের আয়াত রয়েছে। প্রথমত আহকাম বা বিধান সম্বলিত আর দ্বিতীয়ত দ্ব্যর্থবোধক; মুহকামাত এবং মুতাশাবেহাত। মুহকামাত নিজ অর্থে এবং উদ্দেশে সম্পূর্ণ পরিষ্কার। সেগুলোতে কোন দিক দিয়েই কোন রকম দ্বিবিধতার সন্দেহ নেই, সেগুলোর সম্পর্ক আমাদের প্রচ্ছন্ন বিশ্বাস এবং বৈষয়িক জীবনের সাথে। কাজেই আমরা সেগুলোর সমস্ত দিককেই নিজেদের আওতায় নিতে পারি এবং যুক্তি-প্রমাণের কষ্টি পাথরে যাচাই করে নিয়ে সেগুলোর ব্যাপারে সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।
মুতাশাবেহাতের অবস্থা এর থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম। নিয়মানুসারে যেহেতু সেগুলো যুক্তি-প্রমাণের সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত; কাজেই সেগুলোর ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করতে বিবেককে কোন রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না, কিন্তু সেগুলোর যোগসূত্র যেহেতু এই অনুভূতির জগত থেকে অনেক ঊর্ধ্বে, কাজেই সেগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ আমাদের যুক্তি-বুদ্ধিতে সংকুলান হয় না।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কোরআনের পাঠক দু’রকম

📄 কোরআনের পাঠক দু’রকম


কোরআনের আয়াত যেমন দু'রকমের, তেমনিভাবে কোরআনের পাঠকও দু'রকমের। প্রথমত সেসব লোক, যারা নিজের নিয়ত এবং উদ্দেশ্য স্থির করে নিয়ে সেদিকে অগ্রসর হয় এবং তাদের উদ্দেশ্য কল্যাণ ও হেদায়াতলাভ ছাড়া আর কিছুই থাকে না। কোরআন সঙ্গে সঙ্গে এসব লোকের হাত ধরে নিজের পরিচর্যায় টেনে নেয়। তারা কোরআনের আয়াতে মুহকামাতসমূহের মাঝে নিজের আত্মার পূর্ণ পরিতৃপ্তি এবং বিশ্বাস ও বৈষয়িক জীবনের পক্ষে পরিপূর্ণ দিশা লাভ করতে পারে। দীর্ঘ পথভ্রষ্টতার পর তাদের মনে হয়, যেন তারা মন-মস্তিষ্কের পরম প্রশান্তির বেহেশতে আরোহণ করেছে। তাদের মনের সমস্ত জ্বালা নিবারিত হয়ে যায়। ধন্দ-সন্দেহের কাঁটা একে একে খসে যেতে থাকে। মুতাশাবেহাতের কোন ভয়-ভীতি আর তাদের মনকে ভীত করতে পারে না। কারণ, সেগুলোও নিয়ম-নীতির দিক দিয়ে যুক্তি-বুদ্ধির ওপরই প্রতিষ্ঠিত। আর মোটামুটিভাবে সেগুলোর প্রতি ঈমান আনতে কিংবা বিশ্বাস স্থাপন করতে বিবেককে কোন রকম বাধার সম্মুখীন হতে হয় না। শুধু এটুকু যে, সেগুলোর খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে কোন বিস্তারিত ধারণা বিবেকের আওতায় আসে না। কিন্তু এটা এমন কোন বিষয় নয়, যা অস্বীকৃতি কিংবা অনীহার কারণ হতে পারে। আমাদের কাছে যদি ৯৯ টাকা থাকে তাহলে তা বেড়ে একশত হয়ে গেলে উত্তম, কিন্তু তা না হলে কি আমরা সে ৯৯ টাকা পকেট থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেব? কাজেই এসব আয়াতের বেলায় তারা আল্লাহর প্রতি ধাবিত হয় এবং বলে,
امَنَّا بِهِ كُلُّ مِّنْ عِنْدِ رَبِّنَا
অর্থাৎ আমরা এগুলোর ওপর ঈমান এনেছি- এগুলো সবই আমাদের পরওয়ারদেগার কর্তৃক অবতীর্ণ। আর তাদের এ উক্তি তাদের নির্বুদ্ধিতাপ্রসূত নয়, বরং তাদের বুদ্ধি-বিবেকের পরিপক্বতারই ফল। বস্তুতঃ কোরআন তাদেরকে الرُّسِخُونَ فِي الْعِلْمِ )জ্ঞান পক্ক)-এর মহান উপাধিতে ভূষিত করেছে।
কারণ, আয়াতে মুতাশাবেহাত বা দ্ব্যর্থবোধক আয়াতসমূহ সম্পর্কে তাদের এই নিরঙ্কুশ স্বীকারোক্তি প্রকৃতপক্ষে তাদের বুদ্ধির পরাকাষ্ঠা, বিবেচনা শক্তির চরম উৎকর্ষ এবং জ্ঞানের পরিপক্বতারই সর্ববৃহৎ প্রমাণ বহন করে। এর অর্থ এই যে, তারা সন্দেহ-সংশয়ের বিষয়টিকে অমূলক বলে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এ সম্পর্কে তাদের কোন রকম দ্বিধা-দ্বন্দু অবশিষ্ট নেই। শুধুমাত্র এর বিশেষ বিশেষ দিক সম্পর্কে প্রকৃষ্ট ধারণার অপেক্ষা। আর এ ব্যাপারেও তারা আশান্বিত যে, শীঘ্রই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাদের মনস্তুষ্টি বিধান করবেন। আর কখনও যদি এসব সন্দেহ, অস্থিরতা এবং উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় আর তাতে মানসিক প্রশান্তিতে কোনরূপ বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, তখন সাথে সাথে তাদের কণ্ঠে এই প্রার্থনা আবৃত্ত হতে থাকে যা এ আয়াতের পরেই অবতীর্ণ হয়েছে -
ربنا لا تزغ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً ط إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ .
অর্থাৎ, হে আমাদের পরওয়ারদেগার! আমাদেরকে হেদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরকে বিপথগামী করো না। তোমার কাছ থেকে আমাদের রহমত দান কর। তুমিই মহান দাতা।
দ্বিতীয় দল হল তাদের, যারা নিজেদের নিয়তের সুষ্ঠুতা ছাড়াই নিজেদের ইচ্ছা ও চাহিদার সমর্থন যোগাবার জন্যে কোরআন পাঠ করে এবং কোরআনের ওপর নিজেদের যাবতীয় ইচ্ছাকে ন্যস্ত করার পরিবর্তে কোরআনকে নিজেদের ইচ্ছার বশীভূত করে নিয়ে তাকে যথেচ্ছ ব্যবহার করতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য থাকে সুপথপ্রাপ্তির পরিবর্তে নিজেদের স্থিরীকৃত কোন বিশেষ মতবাদের পক্ষে সমর্থন লাভ করা। অর্থাৎ, যাদের সাথে তাদের মতবিরোধ তাদের জব্দ করার জন্যে তাতে বিভিন্ন প্রশ্ন এবং উল্টা-সিধা বিতর্কের পথ খুঁজে বের করাই থাকে তাদের লক্ষ্য। কাজেই এটাই স্বাভাবিক যে, এরা যখন কোরআন পাঠ করবে, তখন 'মুহকামাত'-এর পরোয়া না করাই এদের পক্ষে স্বাভাবিক। কারণ, তাতে তাদের মতলব সাধিত হবার নয়। শান্তি কিংবা আমল বা অনুসরণের পথপ্রাপ্তি তাদের উদ্দেশ্য নয়, যার ফলে মানসিক প্রশান্তি লাভ সম্ভব। বরং আসলে তাদের উদ্দেশ্য থাকে ত্রুটি-বিচ্যুতির অনুসন্ধান। কাজেই গোটা কোরআনে শুধুমাত্র সে বিষয়গুলোই তাদের মনঃপূত যা তাদের মনস্কামনা এবং কামনা-বাসনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা নিজেদের প্রতিপক্ষের মুখ বন্ধ করার জন্যে বিশেষ উপযোগী।
যাদের গবেষণা-অনুসন্ধানের এহেন প্রকৃতি, কোরআনের মুহকামাতের প্রতি তাদের কোনরূপ আগ্রহ থাকতে পারে না। তারা শুধুমাত্র মুতাশাবেহাতের দিকেই এগিয়ে যাবে এবং যেসব ব্যাপার মোটামুটি মেনে নেয়াই তাদের জন্যে যথেষ্ট ছিল, তারা সেগুলোর খুঁটিনাটির প্রতি অধিকতর আগ্রহান্বিত হয়ে যাবে। আর একান্ত ইহুদীদের মত যাদের মনে এ ব্যাপারে প্রশ্ন ছিল যে, দোযখের আগুনের মাঝে আবার গাছ কেমন করে থাকতে পারে। (আর এ প্রশ্নের কারণেই তারা নিজেদের জন্যে আল্লাহ্ হেদায়াতের দ্বার চিরতরে বন্ধ করে নিয়েছিল।) এরাও নানা রকম সন্দেহ সৃষ্টি করবে আর এভাবে নিজেদেরকে আল্লাহ্র হেদায়াত থেকে বঞ্চিত করে রাখবে।
এ ধরনের লোকদের একটি বৈশিষ্ট্য হল এই যে, এরা নিজেদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধির একক ধারক-বাহক বলে মনে করে। কিন্তু কোরআনে বর্ণিত আয়াতে তাদেরকে একান্ত নির্বোধ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বস্তুতঃ এদের চেয়ে বেশী নির্বোধ হবেই বা কে, যাদের সবচেয়ে বড় বাসনা এই যে, সমগ্র কোরআনে এমন কোন বিষয় প্রাপ্ত হবে, যা তাদের মনোবাসনার সাথে সুসমঞ্জস হবে অথবা যার ভিত্তিতে কোরআনের বিরুদ্ধে নানারূপ প্রশ্ন করতে পারবে? যেকোন লোক যদি বিজ্ঞানের নয়শত নিরানব্বইটি নীতিকে এজন্যে প্রত্যাখ্যান করে যে, তার হাজারতম নীতিটি তার খুঁটিনাটি বিষয়কে 'সম্পূর্ণভাবে' পরিবেষ্টিত করতে পারেনি, তাহলে তার চেয়ে নির্বোধ আর কে হতে পারে? এখানে 'সম্পূর্ণভাবে' কথাটার উপর আমি বিশেষভাবে জোর দিতে চাই এ জন্যে যে, মুতাশাবেহাত বা বিতর্কিত আয়াত জ্ঞান-বুদ্ধি বহির্ভূত কোন বিষয় নয়, বরং সেগুলো জ্ঞান-বুদ্ধির সীমানারই অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য এগুলোর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আমরা বুঝতে পারি না। কারণ, আমাদের জ্ঞান ও শিক্ষার যাবতীয় অভিজ্ঞতাই সেসবের উপস্থাপনে অসমর্থ।
প্রকৃতপক্ষে এটা কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়ে উপস্থিত বঞ্চিতদেরই কথা। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এ আয়াত সর্বযুগের পরিপক্ক জ্ঞানী এবং ব্যক্তিত্বের অস্তিত্বের কথা প্রকাশ করেছে। ইতিহাসের সব যুগেই কোরআনের পাঠকেরা এই দুটি দলে বিভক্ত ছিল। একটি পরিপক্ক জ্ঞান ও যথার্থ চিন্তাশীল; দ্বিতীয়টি ফাসাদ সৃষ্টিকারী ও দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন। এক দলের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু ছিল কোরআনের মুহামাত সম্পর্কিত অংশ। কারণ, হেদায়াত প্রাপ্তিই ছিল তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। এ দলটি কোরআনের দ্বারা বিপুল উপকার ও সৎ-সরল পথের সন্ধান পেয়েছে। দ্বিতীয় দলটি হল দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন ও অপব্যাখ্যাকারীদের। কোরআনকে এরা হেদায়াতপ্রাপ্তির জন্যে নয়, বরং ফাসাদ সৃষ্টির জন্যেই পাঠ-পর্যালোচনা করেছে। তাদের উদ্দেশ্য অসৎ এবং ইচ্ছা ছিল কুটিল। ফলে স্বভাবতই এরা কোরআনের সে অংশটুকুই খুঁজে বের করেছে, যা মুতাশাবেহাত সম্পর্কিত এবং যাতে মানব বুদ্ধিকে একান্তভাবে সংযত রাখতে না পারলে এবং আল্লাহ্ একান্ত মেহেরবানী সাথে না থাকলে প্রতি পদে পদেই হোঁচট খাবার সম্ভাবনা থাকে।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন কোরআন অবতীর্ণ করেছেন ঈমান ও আমলের শিক্ষা এবং আত্মা ও মন-মানসের পরিশুদ্ধির জন্যে; মস্তিষ্কের উদ্‌ভ্রান্তি কিংবা বাঁকা বিতর্কের জন্যে নয়। সুতরাং তার আশীষ বা উপকারিতা সে-ই লাভ করতে পারে, যে পবিত্র মন এবং মুক্ত কান নিয়ে এর নিকটবর্তী হবে; বিবাদ সৃষ্টিকারী মস্তিষ্ক এবং জটিলতা সৃষ্টিকারী বুদ্ধি নিয়ে নয়। সূরা কাফ-এ এরশাদ হচ্ছেঃ إِنَّ فِي ذَالِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبَ أَوْ الْقَى السَّمْعَ وَ هُوَ شَهِيدٌ অর্থাৎ, এর মাঝে সে ব্যক্তির জন্যে স্মারক বাণী রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সজাগ হৃদয় অথবা এমন শ্রবণশক্তি, যা শ্রবণানুরাগী। আর সূরা 'সাফফাতে' হৃদয় সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, তা হবে 'সালীম'- (সালীম অর্থ সুস্থ)। বলা হয়েছে إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهُ بِقَلْبِ سَلِيمٍ (কিন্তু যে লোক আল্লাহর নিকট সুস্থ বিবেক নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেছে।) সূরা 'কাফ'-এ এরশাদ হয়েছে وَجَاءَ بِقَلْبٍ مُنِيبٍ )যে লোক আগ্রহান্বিত হৃদয় নিয়ে এসেছে)। এ দুটি শব্দের (سَلِمٍ এবং مُنِيِّبٍ) দ্বারা একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহর কালাম যারা শুনতে আসবে, তারা সুস্থ বিবেক এবং আগ্রহান্বিত হৃদয় নিয়ে আসবে। দাম্ভিক এবং উগ্র হৃদয় নিয়ে নয়। কারণ, এহেন হৃদয়ের উপর আল্লাহ্র তরফ থেকে মোহর আঁটা থাকে। ফলে এরা আল্লাহর বাণীর মর্ম উপলব্ধি করতে পারে না। الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي أَيَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ أَتَاهُمُ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدِ اللَّهِ وَ عِنْدَ الَّذِينَ آمَنُوا كَذَا لِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ
কোরআন সম্পর্কিত চিন্তা-গবেষণার প্রথম পর্যায়েই যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, তা হল এই যে, এদিকে শুধুমাত্র সে পদক্ষেপই শুভ ও কল্যাণকর হবে, যা ঈমান এবং সৎকাজের সামর্থ্য লাভের জন্যে হবে। এই একটি মাত্র বাসনা ছাড়া কারো মাঝে অন্য যেকোন বাসনার যৎসামান্য সংমিশ্রণ থাকলে তার জন্যে কোরআনের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যাবে। বস্তুত মানব প্রচেষ্টার কোন চাবিকাঠিই সে রুদ্ধ দুয়ার উন্মুক্ত করতে পারে না। কথা শুনে সাথে সাথে তার অনুসরণ এবং কার্যকরী করার জন্যে প্রচেষ্টা চালালেই কোরআন অতি উত্তম। আর ধাপে ধাপে ঈমান ও আমলের পথে আমরা যতটা দৃঢ়তা অবলম্বন করতে থাকব, ততটাই তার বরকত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। অন্যথায় তা হবে না। আমরা কোরআনের বাণী জানতে চাই সত্য, কিন্তু সক্রিয় সাহস কিংবা কার্যকরী মনোবল অর্জন করতে পারি না। অথবা নিজেদের মনোবাসনাকে তার মোকাবিলায় বর্জন করতে পারি না কিংবা শুধুমাত্র এজন্যে তা পড়তে চাই যাতে আমাদের মাঝে অনুসন্ধান এবং গবেষণার যে আগ্রহ বিদ্যমান অথবা আমাদের যেসব নিজস্ব চিন্তাধারা রয়েছে, তার পক্ষে কোরআন থেকে কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারি। তা হলে, কোরআন আমাদের জন্যে বঞ্চিতি ছাড়া আর কিছুই সরবরাহ করবে না।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 হেদায়েত ও পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি

📄 হেদায়েত ও পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি


ওপরে আমরা যে দুটি দলের কথা উল্লেখ করেছি, তা একান্তভাবেই ছিল নীতিগত বিভক্তি। কোরআন মজীদ নিজে আমাদেরকে বিস্তারিতভাবে বলে দিয়েছে কোন্ ধরনের লোক কোরআন থেকে হেদায়াত হাসিল করতে পারবে, আর কারা তা থেকে কোন রকম ফায়দালাভে বঞ্চিত থাকবে।
হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতার ব্যাপারে একটি নীতিগত সত্য এই যে, এটা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ প্রদত্ত সামর্থ্য ও অসামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল। যাদেরকে আল্লাহ্ সামর্থ্য দান করেন, তারাই এই কিতাব থেকে যথাযথ ফায়দা হাসিল করতে পারে। আর যাদেরকে আল্লাহ্ এই সামর্থ্য থেকে বঞ্চিত করেছেন, তারা এই কিতাবের ফায়দা লাভ থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। কোরআন এই নীতির বর্ণনা প্রসঙ্গেই বলেছে:
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمُ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ .
অর্থাৎ, এই কিতাব, যেটি আমি তোমার ওপর অবতীর্ণ করেছি, তোমাদেরকে (অজ্ঞানতার) অন্ধকার থেকে মুক্ত করে (জ্ঞানের) আলোর দিকে নিয়ে যেতে। তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে মহাপ্রশংসিত আল্লাহর পথের দিকে। অর্থাৎ, কোরআনের উদ্দেশ্য হল মানুষকে গোমরাহী এবং পথভ্রষ্টতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করে ঈমান ও হেদায়াতের আলোর দিকে নিয়ে আসা। আর এ কাজ একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। বর্ণিত হয়েছে- با ذن ربهم অর্থাৎ, এতে নবীর কোন হাত নেই যে, তিনি যাকে চাইবেন তাকেই ঈমান ও হেদায়াত দান করতে পারবেন। বরং এটা আল্লাহর হাতে- তিনি যাকে ইচ্ছা ঈমান ও হেদায়াত দান করে ধন্য করেন, আর যাকে ইচ্ছা ভ্রষ্টতার খাদে নিক্ষেপ করেন। তার এই ইচ্ছাটাও আবার একটা বিশেষ নীতি অনুযায়ী হয়ে থাকে। কি সে নীতি? এর উত্তর কোরআন বিভিন্ন জায়গায় দিয়েছে। বিশেষত সূরা বাকারার জ্ঞান শিক্ষা বিষয়ক পরিচ্ছেদে তুলনামূলকভাবে বেশী বিশ্লেষিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা বিষয়টির ব্যাখ্যাকল্পে তারই উদ্ধৃতি তুলে ধরছি। এরশাদ হচ্ছেঃ
اللهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمُ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا اللهُ الَّذِينَ النُّورِ أولِيا مُهُمُ الطَّاغُوتِ يُخْرِجُونَهُمْ مِنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ -
অর্থাৎ, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ তাদের সহায়। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান। পক্ষান্তরে যারা কুফরের আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সহায় হল তাগুত, যা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। বস্তুত ওরাই হল জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানেই থাকবে ওরা অনন্তকাল।
অর্থাৎ, আল্লাহ্ এবং তাঁর কিতাবের পথ-নির্দেশ শুধুমাত্র ঈমানদারদের জন্যেই নির্দিষ্ট; কাফেররা এ থেকে বঞ্চিত। কাফেরদের সহায় হল তাগুত। সে তাদেরকে আলোর পথে চলতে বাধার সৃষ্টি করে। কখনও কোন আলোর ছটা তাদের মস্তিষ্কে বিকিরিত হলেও সাথে সাথে সেই তাগুত ওদেরকে ঠেলে নিয়ে অন্ধকারের যবনিকায় লুকিয়ে রাখে, যাতে করে আলোর রহস্য সম্পর্কে তারা অবহিত হতে না পারে।
অতঃপর আল্লাহ্ তাদের উদাহরণ বর্ণনা করেছেন, যাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন কিংবা যাদেরকে অন্ধকারেই ছেড়ে দেয়া হয়। সে জন্যে তিন শ্রেণীর লোক নির্ধারণ করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَّ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ أَتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِ وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أَحْيِ وَأُمِيتُ قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللهَ يَا تِى بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةً عَلَى عُرُوشِهَا - قَالَ أَنَّى يُحْيِ هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا فَا مَاتَهُ * اللهُ مِانَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ ، قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ . قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ فَا نُظُرُ إِلَى طَعَامِكَ وَ شَرَا بِكَ لَمْ يَتَسَنَهُ وَانْظُرُ إلَى حِمَارِكَ وَ لِنَجْعَلَكَ أَيَةٌ لِلنَّاسِ وَانْظُرُ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيءٍ قَدِيرٌ - وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنُ قَالَ بَلَى وَلكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي - قَالَ فَخُذُ أَرْبَعَةٌ مِّنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلَ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِّنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُوهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعيًا - وَأَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ .
অর্থাৎ, তুমি কি সে লোকের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করনি, যে লোক ইব্রাহীমের সাথে তার পালনকর্তা সম্পর্কে বিতর্কে প্রবৃত্ত হয়েছিল এ জন্যে যে, আল্লাহ্ তাকে সাম্রাজ্য দিয়ে রেখেছিলেন? যখন ইব্রাহীম (আঃ) বললেন, আমার পালনকর্তা তো তিনিই, যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দান করেন। তখন সে বললঃ আমিই তো বাঁচাই এবং মারি। ইব্রাহীম বললেনঃ (আচ্ছা তা হলে) আল্লাহ্ তো সূর্যকে পূর্ব দিক দিয়ে উদিত করেন, তুমি তাকে পশ্চিম দিক দিয়ে উদিত কর দেখি। এ প্রশ্নে সে অবিশ্বাসী কাফের হতভম্ব হয়ে গেল। বস্তুত আল্লাহ্ অত্যাচারী যালেম জাতিকে হেদায়াত দান করেন না।
কিংবা তোমরা কি সে লোকের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করেছ, যে লোক এক বিধ্বস্ত জনপদের উপর দিয়ে যাচ্ছিল (আর) বলছিল, এ জনপদের মৃত্যুর পর আল্লাহ্ কেমন করে তা পুনরুজ্জীবিত করবেন? তখন আল্লাহ্ তাকে একশত বছরকাল মৃত অবস্থায় রাখলেন (এবং) তারপর তাকে পুনরায় জীবিত করলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, (এ অবস্থায়) তুমি কত দিন ছিলে? সে বলল— একদিন কিংবা একদিনেরও কিছু কম সময়। তিনি বললেন, বরং তুমি (এ অবস্থায়) একশত বছর ছিলে। এখন তোমার খাদ্য বস্তুগুলোর প্রতি লক্ষ্য কর, কোন কিছুই বিনষ্ট হয়নি। পক্ষান্তরে তোমার (বাহন) সে গাধাটির দিকে লক্ষ্য কর। আর আমি এমন করেছি এ জন্যে যাতে করে তোমার বিশ্বাস বদ্ধমূল হয় এবং তোমাকে মানুষের জন্যে, উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারি। অতঃপর (তোমার সে গাধার) হাড়গুলোর প্রতি লক্ষ্য কর— দেখ, কেমন করে আমি সেগুলোকে জুড়ে খাড়া করি এবং কেমন করে তাতে মাংসের আস্তরণ পরাই। অতএব, যখন তার সামনে প্রকৃত সত্য বিকশিত হয়ে গেল, তখন সে বলল, আমি নিশ্চিত বিশ্বাস করি, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সবকিছুর উপরে শক্তিমান।
তাছাড়া স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেন, হে পরওয়ারদেগার! কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত কর তা আমাকে প্রত্যক্ষ দেখিয়ে দাও। (আল্লাহ) বললেন, তুমি কি তা বিশ্বাস কর না? ইবরাহীম বললেন, অবশ্যই বিশ্বাস করি, তবুও আমার মনের স্থিরতার জন্যে (এ আবেদন)। তখন আল্লাহ্ বললেন, তা হলে চারটি পাখীকে জবাই করে (সেগুলোর গোস্ত ভাল করে) নিজ হাতে মিলিয়ে নাও। অতঃপর এক এক অংশ গোস্ত বিভিন্ন পাহাড়ে রেখে দাও আর তাদের চেহারা চিনে রেখো। তারপর তাদেরকে ডাক, (দেখবে), সেগুলো তোমার কাছে ছুটে আসবে। আর বিশ্বাস করো, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই মহাপরাক্রমশালী ও সুবিজ্ঞ।
এসব আয়াত যেসব ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে, সেসব বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। এখানে আমরা শুধু এ সত্যটিই জানতে চাই, যা এসব আয়াতে নিহিত রয়েছে এবং যে বিষয়ের বর্ণনাভঙ্গি পথ প্রদর্শন করে। এসব আয়াত পূর্ববর্তী আয়াত اَللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا এর পরেই বর্ণিত হয়েছে। এতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলছেন যে, তারা কারা, যারা আঁধার থেকে আলোর দিকে আসতে আগ্রহী? আর তারাই বা কারা, যারা আলো থেকে আঁধারে লুকাতে চায়। কাজেই বর্ণনাভঙ্গি এবং বাক্যধারা-
ا لَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَ إِبْرَاهِيمَ (তুমি কি সে লোকের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করনি, যে লোক ইবরাহীম (আঃ)-এর সাথে বিতর্কে প্রবৃত্ত হয়েছে?) অনুযায়ী দুটি বাক্যই পূর্ববর্ণিত আয়াতের সাথে সম্পৃক্ত বলে বুঝা যায়। তারপর আমরা যখন এসব আয়াতের বিষয়বস্তুর প্রতি লক্ষ্য করি, তখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পূর্ববর্তী আয়াতে যে বিষয়টি সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছিল, এসব আয়াতে তাই বিশদ ব্যাখ্যা ও উদাহরণ সহকারে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে, কি ধরনের লোকেরা আল্লাহ প্রদত্ত আলো থেকে বঞ্চিত থেকে যায় আর কি ধরনের লোক হেদায়াতপ্রাপ্ত হতে পারে। তাহলে আসুন, আয়াতগুলোকে যথার্থভাবে বিশ্লেষণ করে বুঝতে চেষ্টা করা যাক। আয়াতগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলে তিন ধরনের লোকের প্রকৃতির বর্ণনা পাওয়া যায়।
প্রথমত, সেসব লোক, যারা ধন-সম্পদ আর রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের নেশায় উন্মত্ত হয়ে পড়েছে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সামনে আল্লাহর হেদায়াতের আলো উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু সে দাম্ভিক প্রমত্ততার দরুন কোন বিষয়েই চিন্তা করতে চায়নি। ইবরাহীম (আঃ)-এর কথার সাথে সাথেই তাঁর সাথে কূট তর্কে প্রবৃত্ত হয়েছে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তার বিতর্কের যথার্থ জওয়াবও দেন এবং সে জওয়াবে সে সম্পূর্ণ হতভম্বও হয়ে পড়ে, কিন্তু তথাপি সে ঈমান ও হেদায়াতের পথ খুঁজে পায় না। কারণ, আল্লাহর যে আলো তা একান্তভাবেই অনুসন্ধানকারীর জন্যে। যারা এ ব্যাপারে কূট তর্কে লিপ্ত হয়, যদিও সে আলোতে তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়, তথাপি তারা ঈমানের পথ হাতড়ে পায় না। কারণ, اللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ -(আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন না)।
দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক হল তারা, যারা জ্ঞান, ঈমান, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সন্ধানী। আর এসব বিষয় লাভ করার জন্যে তারা সত্যান্বেষীদের পথই অনুসরণ করে। তারা জ্ঞানের মিথ্যা দাবীদারদের মত এবং তর্কবাজদের মত গ্রামে-গঞ্জে, মসজিদে-মাদ্রাসায় এবং দরগা-আখড়ায় বিতর্ক সভার আয়োজন করে বেড়ায় না। না মনে সাধারণ সন্দেহ উপস্থিত হলে সেগুলোকে কয়েক পাতায় ছেপে সারা দেশময় নিজের জ্ঞানের ঢোল পিটিয়ে বেড়াবার চেষ্টা করে। বরং চিন্তাশীল মস্তিষ্ক এবং বিবেচনাশীল মানসের ন্যায় তারা নির্জনতা আর নীরবতার অনুরাগী হয়ে পড়ে। তারা গ্রাম-গঞ্জের ভিড় থেকে বহুদূরে চলে যেতে চায়। নগরীর কোলাহলকে তারা ভয় পায়। তারা মনে করে, শিক্ষানুশীলনের কোন জায়গা খুঁজে পেলে নিজের সেসব প্রশ্নের সমাধানকল্পে সেখানেই বসে পড়বে, যে জন্যে সে সর্বক্ষণ ব্যাকুল। সুতরাং নীরব-নির্জনতার সন্ধান করতে গিয়ে এক সময় হয়ত বা যেকোন বিধ্বস্ত নগরীর উপর দিয়ে চলে যেতে থাকে আর তার বিধ্বস্ত দেয়াল-প্রাচীর, তার ভাঙ্গাচোরা দ্বার-খিলান, তার অবনত মস্তক মেহরাব, তার বিক্ষিপ্ত ইট-গাঁথুনি আর তার ভয়াবহ নীরবতা তার জন্যে শিক্ষা এবং অন্তর্জানের এক বিপুল দিগন্ত উন্মোচিত করে দেয়। তার মনের অন্বেষা সাথে সাথেই সেখানে কাঙিক্ষত বিষয়বস্তু খুঁজে পায়। যে প্রশ্নের সমাধান চিন্তায় তার মন-মস্কিষ্ক বহু ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়েও সমাধান খুঁজে পায়নি, স্থান ও পরিবেশের প্রভাবে তার মনের প্রশ্ন আবার দাগ কাটে, দোদুল্যমান অনিশ্চয়তার জ্বালা আর অস্থিরতার কাঁটা আবার সজীব হয়ে উঠে আর তখন অস্বীকৃতি ও হটকারিতার দম্ভের সাথে নয়, বরং একান্ত অন্বেষা এবং আপাদমস্তক আবেগ ও আর্তচিৎকার করে উঠে : أَنَّى يُحْيِي هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا তা কি করে হবে যে, আল্লাহ্ একে পুনরায় জীবিত করে দেবেন!
যদিও প্রশ্নটা একই রকম, যা মক্কার দাম্ভিকেরা এবং তায়েফের উগ্রপন্থী কৃতঘ্নরা করেছিল এবং যার প্রত্যুত্তরে কোরআন তাদেরকে ভর্ৎসনা করেছিল, কিন্তু এখানে প্রশ্নকারীর অভ্যন্তরীণ চিন্তাধারা সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে তাদের প্রশ্নের হোতা ছিল তাদের দম্ভ, আর এখানে নম্রতা আর অসহায়তা। সেখানে বিবাদ-বিতর্কের মত্ততা, আর এখানে রয়েছে প্রশ্নের জ্বালা এবং অস্থিরতার কাঁটা। সেখানে ছিল প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করে দেয়ার বিকট উগ্রতা, আর এখানে আছে ব্যথা এবং ক্ষতের উপশম স্পৃহা। অর্থাৎ, সেটা ছিল মিথ্যারোপ আর এটা হল প্রশ্ন। সেটা ছিল অস্বীকৃতি আর এটা হল সন্দেহ। আর এ দুয়ের পার্থক্য আকাশ পাতালের।
সুতরাং এর সাথে সম্পূর্ণ অন্য রকম ব্যবহার করা হয়। এর সন্দেহ অপনোদনের জন্য বিষয়ের যাবতীয় যবনিকা সরিয়ে দেয়া হয় এবং এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় যাতে তার দেহ-মন পরিপূর্ণ বিশ্বাসের আলোয় ভরপুর হয়ে চিৎকার করে উঠে- নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাশীল
فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
তারপর তৃতীয় ব্যক্তি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) অবতীর্ণ হন। তিনি বলেন: হে পরওয়ারদেগার! আমাকে একটিবার তা দেখিয়ে দাও কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত করবে? প্রশ্ন হল, তা হলে কি এ বিষয়ে তোমার ঈমান ও বিশ্বাস নেই? তিনি বলেন, ঈমান কেন থাকবে না! ঈমান-বিশ্বাস অবশ্যই আছে। তোমার জ্ঞান আর তোমার ক্ষমতার বাইরে কিছুই নেই। তুমি সব কিছুই করতে পার। কিন্তু ইয়া পরওয়ারদেগার! আমি যে ঈমান এবং বিশ্বাসের চেয়েও বেশী কিছু চাই। আমার অন্বেষা যে আরও অনন্ত জ্ঞানের। আমি অন্তর্দৃষ্টির আলোর সাগরে ডুবে যেতে চাই। আমি চাই আমার বুক বিশ্বাস ও শান্তির সূর্যের অনাদি-অনন্ত উদয়াচলে পরিণত হোক। আমি জ্ঞানের আলোকে যা কিছু অনুভব করি তাকে চোখেও যেন দেখতে পাই। তার পরিচয়ে যেন সম্পূর্ণভাবে ডুবে যেতে পারি। তার রঙ্গে যেন সম্পূর্ণ রঙ্গে উঠি। বলে উঠেন- (لِيُطْمَنِنَ قُلْبِى ) (আমার অন্তরের পরিপূর্ণ সান্ত্বনার জন্যে)।
এ অবস্থাটা উল্লিখিত দুটি অবস্থা থেকেই স্বতন্ত্র। এখানে না আছে দাম্ভিকতা ও অস্বীকৃতি, না সন্দেহ-সংশয়। বরং এটা হল অধিকতর প্রত্যয়ের একান্ত অন্বেষা। সুতরাং এক্ষেত্রে আল্লাহর আচরণও তেমনি। তিনি হযরত ইব্রাহীমের অন্তরাত্মাকে শান্তি ও বিশ্বাসের নূরে ভরপুর করে দেন আর তাঁর দৃষ্টির সামনে থেকে যাবতীয় যবনিকা সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত করে দেন।
আলোচ্য তিন ব্যক্তি তিন দলের অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর আলো এই তিন দলের প্রতি তিন রকম আচরণ করে। এক দল দাম্ভিকদের। আল্লাহর নূর তাদের দৃষ্টিকে শুধু ধাঁধিয়েই দেয়, ঈমান ও অন্তর্দৃষ্টি দান করে না। দ্বিতীয় দল হল সন্দিহান ও অস্থির চিত্তদের। আল্লাহর আলো তাদেরকে স্থিরতা ও শান্তি দান করে। আর তৃতীয় দল হল অধিকতর প্রত্যয়ান্বেষীদের। আল্লাহ তাদের হৃদয়ের দুয়ার উন্মুক্ত করে দেন।
এটা আল্লাহ তাআলার সাধারণ নিয়মের বর্ণনা। কল্যাণ ও অকল্যাণ, হেদায়াত ও ভ্রষ্টতার সেই নিয়ম-রীতি, যা সব সময় ছিল এবং সব সময়েই থাকবে। আর হুবহু এই অবস্থাই কোরআন মজীদে মনোনিবেশকারীর সামনেও উপস্থিত হয়। কেউ যদি কোরআনের ব্যাপারে বিতর্কে অবতীর্ণ হতে চায়, আর স্থির করে নেয় যে, তার দলিল-প্রমাণ দ্বারা অন্যের সাথে ঝগড়া-বিবাদে প্রবৃত্ত হবে এবং তার উপদেশাবলীর সাথে বিরোধ করবে, তবে আল্লাহ সে লোকের জন্যে কোরআনের হেদায়াতের সমস্ত দ্বার রুদ্ধ করে দেন। পক্ষান্তরে যে লোক সন্দেহের জ্বালায় অস্থির হয়ে কামনা করছে, কোরআন যেন তার সন্দেহ দূর করে দিয়ে তার পথ প্রদর্শন করে এবং ধীরে ধীরে তাকে বিশ্বাস ও অন্তর্জানের লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। তার প্রতি তেমনি আচরণ করা হয় যা তার জন্য উপযোগী। তিনি তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।
কোরআন মজীদ এবং ওহীর বাহক হুযূরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাথমিক অবস্থাই এ সত্যের ব্যাখ্যার জন্যে যথেষ্ট। নবুয়তপ্রাপ্তির সময় যখন ঘনিয়ে আসে, তখন হুযুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা কি ছিল? পথভ্রষ্ট উদভ্রান্ত এক পৃথিবী, যার চারদিকে ছেয়ে ছিল আঁধার আর আঁধার- তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন একটু আলোর জন্যে। এমন এক আলো, যাতে গোটা দুনিয়ার সামনে মুক্তি এবং হেদায়াতের রুদ্ধ সব পথ উন্মুক্ত হবে। যা হৃদয়-মনের সমস্ত দৃষ্টিকে আলোকিত করে দেবে। যা সন্দেহের সমস্ত অন্ধকারকে মুছে দেবে এবং এ বিশ্বের সে জটিল রহস্যের সমাধান করে দেবে যার উপর সহস্র যবনিকা পড়ে আছে। অভ্যন্তরীণ জ্বালা আর মানসিক তাকে আপাদমস্তক ব্যথায় পরিণত করে দিয়েছিল। তিনি আপাদমস্তক অন্বেষা, অনুসন্ধান আর আকাঙ্ক্ষার উদ্দীপনার প্রতিমূর্তি হয়ে লোকালয়ের প্রতি বিষণ্ণ-বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিলেন। এক মরুপ্রান্তরে এক পাহাড় গহ্বরে ধ্যানমগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিলেন সামনের যবনিকা অপসারণের জন্যে। অপেক্ষা করছিলেন সত্যোদ্ঘাটনের জন্যে। অন্বেষা আর অনুসন্ধান-প্রচেষ্টার এই নিষ্ঠা, আগ্রহ আর আকাঙ্ক্ষার এই একাগ্রতা, চিন্তা-গবেষণার এই নিরবচ্ছিন্নতা এবং গুহাবাসের পরেই এসেছিল 'ইকরা'-এর পয়গাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর ধ্যানমগ্ন বান্দাকে তুলে নিলেন আর তার উপর নিজ অনুগ্রহের প্রকাশ এভাবে করলেন। বললেন- وَوَجَدَكَ ضَآلًّا فَهَدٰى )আমি তোমাকে সত্যান্বেষণে নিষ্ঠাবান পেয়েছি। কাজেই তোমাকে দান করেছি হেদায়াত)।
সুতরাং কোরআন শিক্ষার্থীদের শুরু ও শেষ উভয়টাই নির্ভর করে জ্ঞানান্বেষা এবং নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশের উপর। অনির্ভরতা, দম্ভ, বিবাদ ও বিতর্কের মাধ্যমে এ পথের একটি সোপানও অতিক্রম করা সম্ভব নয়। কোরআনের দিকে মানুষকে শুধু সত্যের অন্বেষণ করার উদ্দেশে এগিয়ে যেতে হবে এবং সত্যের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত কোরআনের গবেষণায় নিয়োজিত থাকতে হবে। চালিয়ে যেতে হবে চিন্তা-ভাবনার জেহাদ। সন্দেহ যতই কঠিন হোক, জটিলতা যতই প্রবল হোক, এক মুহূর্তের জন্যেও নিরাশ হবে না। যে লোক নিষ্কলুষ ইচ্ছা নিয়ে জ্ঞান লাভের চেষ্টা করছে এবং সত্য, ন্যায় ও হেদায়াতের পথে সংগ্রাম করে চলছে, তার পক্ষে সফলতা অনিবার্য। এরশাদ হয়েছে: وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
(যারা আমার পথে চেষ্টা চালিয়ে যাবে আমি তাদের জন্যে আমার পথ অবশ্যই মুক্ত করে দেব।) তার শান্তি-সান্ত্বনার জন্যে মহান পরওয়ারদেগার কঠিনকে সহজ বরং অসম্ভবকে সম্ভব করে দেবেন এবং এমন জায়গা থেকে সে হেদায়াতের উপাদান লাভ করবে, যার কল্পনাও সে করেনি। يَرْزُقُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ .
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মানুষ যদি কোরআনের উপর সুদৃঢ় আস্থা স্থাপন করে, তাতে অনড় থাকে, তাহলে সে সেই মহা নেয়ামতও প্রাপ্ত হয়, যাকে আমরা 'জ্ঞানের বিকাশ' বলে অভিহিত করেছি এবং যার জন্যে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) বিপুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন। সুতরাং কোরআনের বিকাশ ও পূর্ণতার পর আল্লাহ তাআলা হুযুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন- أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ (আমি কি তোমার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দেইনি?)
এ প্রসঙ্গে অতি সূক্ষ্ম তথ্য সূরা মুজাদালায় বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আল্লাহ্ তাআলা দুটি দলের উল্লেখ করেছেন। এক দলের অবস্থা হল এই যে, যখন ধর্মীয় কোন ব্যাপারে তাদের সামনে কোন জটিলতা, কোন সন্দেহ অথবা কোন বাধা উপস্থিত হয়, তখন তারা আল্লাহর সাথে ঝগড়া করে এবং রসূলের প্রতি অভিযোগ উত্থাপন করে। 'মুজাদালাহ' শব্দটি আরবী। এর অর্থ হল ঝগড়া করা। তবে জেদ ধরা এবং একগুঁয়েমি অর্থেও শব্দটির ব্যবহার হয়, যা মূলত প্রেম, বিশ্বাস ও নিষ্ঠার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যে দল আল্লাহ এবং রসূলের প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন হয়ে আপত্তি কিংবা সমালোচনা করে না অথবা কোরআন-হাদীস নিয়ে উপহাস করে না, বরং নিজেদের সন্দেহ বা দ্বিধা-সংশয় একান্ত প্রেম ও ভক্তি সহকারে উত্থাপন করে এবং তার সমাধান কামনা করে। দ্বিতীয় দলের বৈশিষ্ট্য হল বিরোধিতা করা। অর্থাৎ, তাদের প্রকৃত বাসনাই হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা করা। তাঁদের যেকোন কথার বিরূপ সমালোচনা করা এবং নানা রকম সন্দেহ উত্থাপন করা।
প্রথমোক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হল একজন মহিলা। সে কোন একটি বিশেষ ধর্মীয় ব্যাপারে কঠিন সংশয়ের সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু নিজ সংশয়ের জন্যে ধর্মের প্রতি দোষারোপ বা বিরূপ সমালোচনার পরিবর্তে নিজের জটিলতাকে একান্ত বিনয় সহকারে আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের দরবারে উপস্থাপন করে। আল্লাহ তার সবিনয় নিবেদন শোনেন এবং তার জটিলতার সমাধান করে দেন। এরশাদ হচ্ছেঃ
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِيُّ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ .
অর্থাৎ, আল্লাহ সে মহিলার কথা শুনেছেন, যে নিজের স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে 'ঝগড়া' করছিল, আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করছিল এবং আল্লাহ তোমাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনছিলেন। আর আল্লাহ শ্রবণকারী ও দর্শনকারী।
দ্বিতীয় দলটি হল মুনাফিকদের, যারা সব সময়ই শুধু এই সুযোগের সন্ধানে নিয়োজিত থাকে যে, এমন কোন বিষয়ের সন্ধান পাওয়া যায় কিনা যাতে কূট প্রশ্ন কিংবা সমালোচনা করা যাবে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
إِنَّ الَّذِينَ يُحَادُّونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ كُبِتُوا كَمَا كُبِتَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَقَدْ أَنْزَلْنَا آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ وَلِلْكَفِرِينَ عَذَابٌ مُّهِينَ .
অর্থাৎ, যারা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের সাথে ঝগড়া করে, তাদেরকে অপদস্থ করে দেয়া হয়েছে। যেমন করে তাদের আগেও এ ধরনের লোকদেরকে অপদস্থ করা হয়েছে। আর আমি প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট নিদর্শন অবতীর্ণ করেছি। কাফেরদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে অপমানজনক আযাব।
সূরা মুজাদালায় এই দুটি দলের আলোচনা দুটি বিপরীতধর্মী দল হিসেবে করা হয়েছে এবং মানুষকে শিক্ষা দান করাই এর উদ্দেশ্য যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যে আচরণ করা হবে, তা হবে একান্তই সবিনয় নিবেদন ও প্রার্থনার আকারে। তর্ক কিংবা যুক্তির বলে নয়। সুতরাং আল্লাহর দ্বীন কিংবা তাঁর কিতাবের পর্যালোচনা করতে গিয়েও যদি কোন জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে তার সমাধানের একমাত্র পথ হল, যাবতীয় সমস্যা এবং জটিলতা, আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করা। তাঁর কাছেই সমাধান এবং সান্ত্বনার আশা করা। পক্ষান্তরে সহসাই এই জটিলতা বা কূট প্রশ্নের অথবা সমালোচনার উপকরণ তৈরী করে নতুন মতবাদ দাঁড় করাতে চেষ্টা করবে না। কিংবা একে কাটছাঁট করে নিজের চাহিদা অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে চেষ্টা করবে না। যারা এমন করে তাদের জন্যে কোরআনী জ্ঞান লাভের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে অথবা সমালোচনা করতে করতে তা থেকে এতই দূরে সরে পড়বে যে, পরে আর সে দিকে ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা থাকবে না। অথবা কোরআনের ছাঁটকাটের ব্যাপারে এমনই সিদ্ধহস্ত হয়ে দাঁড়াবে যে, ক্রমান্বয়ে কোরআনের প্রতিটি কথাকেই নিজের ইচ্ছানুরূপ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে শুরু করবে। ফলে তাদের অবস্থাও তেমনি হয়ে দাঁড়াবে যেমন হয়েছিল ইহুদীদের। তারা আল্লাহর সমস্ত গ্রন্থরাজিকে নিজেদেরই কামনা-বাসনার সংকলনে পরিণত করে ছেড়েছিল।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 তাকওয়া ও আমল

📄 তাকওয়া ও আমল


কোরআনে হাকীমের জ্ঞান ও গবেষণার জন্যে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় শর্ত হচ্ছে, তাকওয়া বা পরহেযগারী। সূরা বাকারার প্রথম আয়াতেই এরশাদ হয়েছেঃ ذلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ . অর্থাৎ, এটা একটা আসমানী কিতাব বা গ্রন্থ, এ বিষয়ে কোন রকম সন্দেহ নেই। পরহেযগারদের জন্যে হেদায়াতস্বরূপ নাযিল হয়েছে। সূরা লোকমানে এরশাদ হচ্ছে: تِلُكَ أَيْتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ هُدًى وَرَحْمَةً لِلْمُحْسِنِينَ . অর্থাৎ, এটি প্রাজ্ঞ এই গ্রন্থের আয়াত যা হেদায়াত ও রহমত হয়ে অবতীর্ণ হয়েছে সততাসম্পন্নদের জন্যে।
এ ধরনের আরও বহু আয়াত কোরআনে রয়েছে এবং একজন জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীর মনে সব সময়ই একথা উদয় হয় যে, কোরআনকে সৎ ও পরহেযগারদের হেদায়াতের জন্যে কেন নির্ধারিত করা হল? যে কেউ কোরআন পড়বে, কোরআনের মাধ্যমে তারই হেদায়াত হওয়া উচিত- সে মুত্তাকী -পরহেযগার হোক আর নাই হোক, ভাগ্যবান হোক অথবা ভাগ্যহীন হোক, সৎ হোক কিংবা অসৎ। কিন্তু কোরআন এ ব্যাপারে দৃঢ়মত যে, তার দরজা শুধুমাত্র তাদের জন্যেই খোলা হবে যারা পরহেযগার ও সততার গুণাবলীতে ভূষিত। কিন্তু এমন কেন হবে? এ বিষয়টি আমাদের মুফাস্সিরগণের মনেও উদয় হয়েছে এবং তাঁরা এর একটা সমাধানও খুঁজতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিষয়টির একটা বিশেষ দিক রয়েছে, যার প্রতি কেউ সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে লক্ষ্য করেননি। পক্ষান্তরে যথার্থ সত্য ততক্ষণ পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠবে না, যতক্ষণ না এ বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝা যাবে।
কোরআন মজীদের ব্যাপারে একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, এটি মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশের সর্বশেষ সোপান। আল্লাহ মানুষকে ধাপে ধাপে হেদায়াতের পথ প্রদর্শন করেছেন। হেদায়াতের পহেলা ধাপ হল স্বভাব ও প্রকৃতির-হেদায়াত। فَالْهَمَهَا فُجُورَهَا وَ تَقْوَاهَا 97 وَ الَّذِى قَدَّرَ فَهَدَى * প্রভৃতি আয়াতে করা হয়েছে। এ হল চোখ, কান, মন-মস্তিষ্কের পথ প্রদর্শন এবং অনুভূতি, উপলব্ধি ও জ্ঞান-বুদ্ধির হেদায়াত। এই হল প্রকৃতির সেই সাধারণ কাম্য যাতে সমস্ত আদম সন্তান সমভাবে অংশীদার। বরং এর এক অংশের কল্যাণ এতই ব্যাপক যে, জীবজন্তু পর্যন্ত তা থেকে বঞ্চিত নয়। আর এটা সে হেদায়াতেরই ফলশ্রুতি যে, মুরগীর বাচ্চারা দানা কুড়িয়ে খায় এবং হাঁসের বাচ্চারা ডিম থেকে বেরিয়ে আসার সাথে সাথেই পানিতে সাঁতার কাটতে শুরু করে দেয়। বিড়াল ছানারা চোখ ফোটার আগেই জানতে পারে, তাদের খাবারের উৎসমূল কিংবা প্রতিপালনের উপকরণ কোথায় রয়েছে। এ ব্যাপারে মানুষ ও অন্যান্য জীব-জন্তুই সমপর্যায়ভুক্ত। কিন্তু তারা শ্রেষ্ঠত্ব ও বৈশিষ্ট্যের একটা মর্যাদা লাভ করেছে। অর্থাৎ, জ্ঞান-বুদ্ধি, উপলব্ধি-অনুভূতি ও বিচার-বিবেচনার বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। সুতরাং তার প্রকৃতিগত হেদায়াত শুধু এখানেই সীমিত থাকেনি যে, শুধুমাত্র অনাহারেই সন্তুষ্ট থাকে বরং সেগুলোর মাধ্যমে সে নিজের কাজে একটা সুষ্ঠুতা ও ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করে নেয়। অংশ থেকে সমষ্টি তৈরী করে, ভাল-মন্দতে পার্থক্য করে। ইচ্ছা ও অধিকারের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত বিচার ক্ষমতার মাধ্যমে অকল্যাণকে পরিহার করে কল্যাণ গ্রহণ করে।
এ পর্যায়ের পরেই হেদায়াত ও পথ প্রদর্শনের দ্বিতীয় পর্যায়, যা আম্বিয়া ও রসূল (সঃ)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে আরম্ভ হয়েছে। এ পর্যায়ে মানুষ যা কিছু লাভ করেছে, তার সবই সেই প্রারম্ভিক মূলনীতির উপর নির্ভরশীল, যদ্দ্বারা তারা হেদায়াতের প্রাথমিক পর্যায়গুলো অতিক্রম করতে সফল হয়েছে। যেভাবে আমরা কয়েকটি মাত্র বীজ দ্বারা গোটা শস্য-শ্যামল ক্ষেত্র রচনা করি কিংবা কয়েকটি মাত্র বীজ রোপণ করে সবুজ বাগান প্রস্তুত করে ফেলি, তেমনিভাবে প্রকৃতির চাষকৃত কয়েকটি দানাকেও আল্লাহর করুণা বারির প্রতিপালন, প্রকৃতির পরিচর্যা এবং নবী ও রসূলগণের প্রচেষ্টা একটি সুশোভিত কাননে পরিণত করে দিয়েছে এবং তার নামকরণ করেছে শরীয়ত।
কিন্তু প্রকৃতির সেই সাধারণ রীতি অনুযায়ী- যা তার যাবতীয় কার্যক্রমের বৈশিষ্ট্য, এ কাজও ক্রমান্বয়ে পরিণতি লাভ করেছে। সহসাই পরিণতি লাভ করেনি। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সংখ্যক নবী আগমন করেছেন। তাঁরা প্রকৃতির ভূমিকে চাষের উপযোগী করে গঠন করেছেন। তারপর অন্য আরেক দল এসেছেন, যাঁরা সে জমিতে চারা রোপণ করেছেন। তারপর আরেক দলের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁরা সেই চারার উপর ভিত গড়ে তুলেছেন। অতঃপর আরও এসেছেন, যাঁরা সেই ভিত্তির উপর দেয়াল স্থাপন করেছেন। তারপর আল্লাহ তাঁদেরকে পাঠিয়েছেন, যাঁরা সেই দেয়ালের উপর ছাদ ঢালাই করেছেন। আর এভাবে গোটা ইমারতের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এক কোণায় সর্বশেষ ইটের জায়গাটি শূন্য থেকে যায় আর শেষ পর্যন্ত সে সময়ও আসে, যাতে সে ইটটিও যথাস্থানে স্থাপন করা হয়। এবং ঘোষণা করা হয়:
الْيَوْمَ أَكُمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَاتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلَامَ دِينًا .
অর্থাৎ, আজকের দিনে আমি তোমাদের জীবন ব্যবস্থাকে পূর্ণ করে দিয়েছি এবং তোমাদের জন্যে আমার সমস্ত নেয়ামত পরিপূর্ণ করেছি। আর ইসলামকে ধর্ম হিসেবে তোমাদের জন্যে পছন্দ করেছি।
এই ইমারত বা সৌধের নামই হল 'ইসলাম'। আর আমাদের হাতে এর পরিপূর্ণ ব্লুপ্রিন্ট বা নীল নক্শাই হল কোরআন। এই কোরআন যখন প্রথমাবস্থায় পৃথিবীতে আসে, তখন নিম্নোক্ত তিনটি সম্প্রদায়কে সরাসরি সম্বোধন করে।
১। আরব-যাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক বা আল্লাহ্র সাথে অংশীদারিত্বে বিশ্বাসী। কিন্তু এদের মধ্যেই কেউ কেউ দ্বীনে ইবরাহীমীর স্বভাবসিদ্ধ সরলতায়ও বিশ্বাসী ছিল।
২। ইহুদী-যারা নিজেদের ক্রমাগত অমঙ্গলকামিতা এবং ঔদ্ধত্যের দরুন সম্পূর্ণভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। শুধু ক্ষুদ্র একটি দল তাদের মাঝে সত্যে বিশ্বাসী ছিল।
৩। খৃস্টান-পূর্বপুরুষদের বিপথগামিতা এদেরকেও গোমরাহ করে দিয়েছিল। সামান্য কিছু লোকই শুধু সঠিকভাবে ঈসা (আঃ)-এর ধর্মের উপর বদ্ধমূল ছিল।
এই তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে কোরআন সর্বপ্রথম আরবদেরকে সম্বোধন করেছে। আরবদের সাধারণ নৈতিক জীবনে কতিপয় প্রাকৃতিক গুণ-বৈশিষ্ট্যের অবশেষ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এরা ছিল মূর্তি পূজার এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্যে লালিত। যাতে তাদের মন ও মস্তিষ্কের কাঠামো এমনভাবে বদলে গিয়েছিল যে, কোরআন মজীদের যে শিক্ষা আপাদমস্তক স্বাভাবিক সরলতার যাবতীয় গুণ-মাধুর্যে সুশোভিত ছিল, তাও তাতে যথেষ্ট আয়াসে ঢুকতে পারেনি। সুতরাং তাদের একটা বিরাট অংশ দীর্ঘ দিন কোরআনের শিক্ষা থেকে শুধু অজ্ঞই থাকেনি, বরং তাকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্যে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করেছে। অবশ্য যারা আগে থেকেই দ্বীনে ইব্রাহীমীর স্বাভাবিক সরলতার উপর স্থির বিশ্বাসী এবং মূর্তি উপাসনায় নিরুৎসাহী ছিল, তাদের পক্ষে কোরআনকে গ্রহণ করতে কোন কষ্টই হয়নি। কোরআনের আমন্ত্রণ শুনে তাদের কাছে মনে হয়েছে যেন তারা নিজেদেরই অবচেতন মনে দীর্ঘ দিনের লালিত বাণীর প্রতিধ্বনি শুনছে। কাজেই সঙ্গে সঙ্গে তারা এগিয়ে গিয়ে তাকে বরণ করে নিয়েছে। তাদের জন্যে না কোন মু'জেযা বা অলৌকিকতা প্রদর্শনের প্রয়োজন পড়েছে, না বারবার কোরআনের বাণী তাদের সামনে উপস্থাপন করতে হয়েছে। এরা ছিল তৃষ্ণার্ত। সেজন্যে যখনই তাদের সামনে পানি তুলে ধরা হয়েছে, সাথে সাথে সেদিকে ধাবিত হয়েছে। তাদের দৃষ্টি ছিল হেদায়াতের সন্ধানে মুক্ত প্রসারিত। আর যাদের দৃষ্টি খোলা থাকে, তাদের কাছে আলোর চাইতে বেশী প্রিয় কোন কিছুই থাকে না। সুতরাং আয়না যেমন আলোতে চমকে উঠে, তেমনি করে তারাও আলোর ছোঁয়ায় জ্বলজ্বল করে উঠেছিল। কোরআন মজীদ সূরা 'নূরে' এই সত্যকে এভাবে বিবৃত করেছে যে, প্রকৃতি এবং ওহী- উভয়টি একই শ্রেণীভুক্ত বিষয়। এই উভয়টিই মানুষ একই উৎসমূল থেকে প্রাপ্ত হয়। সঠিক প্রকৃতির উদাহরণ স্বচ্ছ-পরিচ্ছন্ন তেলের মত। তা যেকোন রকম সংমিশ্রণ বা ভেজাল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আগুনের স্পর্শ ছাড়াই তা জ্বলে ওঠার জন্যে তৈরি থাকে। কাজেই ওহী ও ইলহামের স্ফুলিঙ্গ যেই মাত্র তাকে স্পর্শ করে, সংগে সংগে জ্বলে উঠে।
يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيئُ وَلَوْ لَمْ تَمُسَسْهُ نَارٌ - نُورٌ عَلَى نُورٍ يَهْدِى اللهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ .
অর্থাৎ, তার তেল জ্বলে উঠলই বলে, আগুন তাকে স্পর্শ নাই বা করুক। আলোর পরে আলো রয়েছে। আল্লাহ্ নিজের আলোর প্রতি যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন।
ওপরে আমরা যে আয়াতের উদ্ধৃতি পেশ করেছি, তাতে 'মুহসিনীন' এবং 'মুত্তাকীন' শব্দের দ্বারা এমন সব লোককেই বুঝানো হয়েছে। ইহসান বা 'পরোপকার-এর অর্থ একটা হল সাধারণভাবে যা বোঝা যায়। এছাড়া আরও একটা অর্থ আছে। তাহল- নিজের কথা ও কাজকে সম্পূর্ণ সততা, নিঃস্বার্থতা, পূর্ণ সাহস ও দৃঢ়তা এবং নিপুণতার সাথে সমাধা করা। আভিধানিকরা শব্দটির এই নিগূঢ়তার প্রতিও ইংগিত করেছেন। তাছাড়া হাদীসেও 'ইহসান' সম্পর্কে বর্ণিত রয়েছে এবং কোরআন মজীদেও উল্লিখিত অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, যারা প্রকৃতি ও ওহীর আলোকে পরিপূর্ণভাবে উপকৃত হয়েছিলেন। যারা প্রতিকূলতার মুখে একে নিভে যেতে দেয়নি। এমন সব লোকের প্রশংসা করে কোরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, এদেরকে আল্লাহ্ ভালবাসেন। আল্লাহ্ তাদের আমলকে ব্যর্থ হয়ে যেতে দেন না। কোরআন মজীদ তাদের জন্যে হেদায়াত এবং রহমতস্বরূপ। এরা একে বুঝে, এর পর্যালোচনা করে এবং এর শিক্ষা থেকে উপকৃত হয়।
তারপর থাকে দ্বিতীয় দল। তারা নিজেদের প্রকৃতি প্রদত্ত স্বাভাবিক যোগ্যতাসমূহকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ফলে তাদের জন্যে কোরআনের শিক্ষাসমূহ ছিল একান্ত নতুন। তারা কোনক্রমেই একে বুঝতে পারছিল না। এসব শিক্ষা যে মৌলিক নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল, সেসব নীতিমালা তাদের মন-মস্তিষ্ক থেকে মুছে গিয়েছিল। আর সে স্থানটি পূরণ করেছিল কতিপয় অস্বাভাবিক বিশ্বাস ও কুসংস্কার। তাদের স্বভাব কাঠামো এমনই বাঁকা হয়ে গিয়েছিল যে, কোন সোজা বিষয় তাতে প্রবেশই করতে পারছিল না। সুতরাং হুযুরে আকরাম (সঃ) যখন তাদের সামনে কোরআন মজীদ উপস্থাপন করলেন, তখন তারা নিজেদের কানে আঙ্গুল পুরে দিল; তা শুনতে কিংবা বুঝতে অস্বীকার করল। বস্তুত তাদের এই অস্বীকৃতি ছিল বিগত দিনের বহু অস্বীকৃতিরই পরিণতি। তারা হেদায়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে একে গ্রহণ করা থেকে বিরত রয়ে গেল। ফলে পরবর্তী পর্যায়গুলোরও সঙ্গ দিতে পারেনি। আর এটাই ছিল স্বাভাবিক পরিণতি। কোন একজন শিক্ষার্থী ধাপে ধাপেই শিক্ষার পথে এগিয়ে যায়। কোন একটি বিষয়ের প্রাথমিক নিয়ম-পদ্ধতি সম্পর্কে যে সবিশেষ জ্ঞান লাভ না করবে কিংবা যথার্থ অনুশীলন না করবে, সে কখনও সে বিষয়টির উচ্চতর জ্ঞান লাভ করতে পারবে না। কাজেই তাদের বেলায়ও একই অবস্থার উদ্ভব হয়েছে। তারা হেদায়াত এবং সুপথপ্রাপ্তির প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই যখন বঞ্চিত রয়ে যায়, তখন হেদায়াতের পরম বাণী অবতীর্ণ হলে তা বুঝা তাঁদের পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোরআন মজীদের সূরা আ'রাফে বিষয়টির বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে:
تِلْكَ الْقُرَى نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَائِهَا وَلَقَدْ جَاءَتْهُمُ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَمَا كَانُوا لِيُؤْمِنُوا بِمَا كَذَّبُوا مِنْ قَبْلُ كَذَالِكَ يَطْبَعُ اللهُ عَلَى قُلُوبِ الْكَفِرِينَ -
অর্থাৎ, এই হল সেসব জনপদ, যার ঘটনাবলী আমি তোমাদেরকে শুনিয়ে থাকি। নিঃসন্দেহে তাদের কাছে প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী নিয়ে নবী-রসূলগণ অবতীর্ণ হয়েছেন, কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেনি। কারণ, তারা ইতিপূর্বেও অবিশ্বাস করে এসেছে। এভাবে আল্লাহ্ কাফেরদের হৃদয়ে মোহর এঁটে দেন।
বস্তুত তাদের এই নতুন অস্বীকৃতি বিগত অস্বীকৃতিসমূহেরই পরিণতি। বিগত নবীগণ তাদেরকে যে শিক্ষা দান করেছেন, তারা সেসবের প্রতিও অনীহা প্রদর্শন করেছে। তারই ফলে বর্তমানের এই শিক্ষাও তাদের বোধগম্য হচ্ছে না। এ বিষয়টিকেই কোরআন মজীদ নিজের ভাষায় ختم قلب তথা 'হৃদয়ে মোহর আঁটা' বলে আখ্যায়িত করেছে। অর্থাৎ, যেসব লোক আল্লাহর দেয়া নেয়ামত গ্রহণ করতে পর্যায়ক্রমিকভাবে অনীহা প্রকাশ করে, শেষ পর্যন্ত তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যায় এবং তারা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধির যাবতীয় যোগ্যতা হারিয়ে বসে।
এখানে এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, আল্লাহ্ শরীয়ত নাযিল হয়েছে সে অনুযায়ী আমল করার জন্যে। কাজেই তাতে 'ইলম' ও 'আমল' কিংবা 'জানা' ও 'করা' দুটি বিষয় রয়েছে। এতে 'জানা' ঠিক সে বিষয়টিরই নাম যাকে 'কাজে পরিণত করা' বলা হয়। যদি কেউ কোন একটি বিষয় জানে অথচ তার ওপর আমল করতে পারে না, তখন তার কোন জানাই গ্রহণযোগ্য হয় না। এমন জানা অথবা জ্ঞান নিরর্থক হয়ে পড়ে। সে জ্ঞান এবং অজ্ঞানতার মধ্যে কোন পার্থক্যই থাকে না। সে জ্ঞান সম্পূর্ণ নিষ্ফল। এই জ্ঞানের দ্বারা পরবর্তী কোন জ্ঞানের বিকাশ হতে পারে না। আমরা শুধুমাত্র আমাদের ভুল ধারণা এবং বিশ্লেষণের অক্ষমতার দরুন মূর্খতাকেও জ্ঞান বলে অভিহিত করেছি।
ইহুদীদের ব্যাপারেও এমনি অবস্থার উদ্ভব হয়েছিল। অধিকাংশ ইহুদী নিজেদের নবীর শিক্ষাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। কোরআনকেও অস্বীকার করল। অথচ তারাই সমকালীন যুগে কোরআনের সর্বাধিক নিকটবর্তী ছিল। কোরআন মজীদ হচ্ছে হেদায়াতের সর্বশেষ ধাপ- আর এরা সে ধাপ থেকে মাত্র এক ধাপ নীচে ছিল। কোরআন সর্বাগ্রে স্বীকার করা এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে একাত্ম হয়ে সমগ্র বিশ্বে তাঁর সত্যতার সাক্ষ্যদান করা ছিল তাদের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু তারাই সর্বাগ্রে তা অস্বীকার করেছে। আর এই অস্বীকৃতির সর্ববৃহৎ কারণ ছিল এই যে, কোরআন মজীদের পূর্বে যেসব হেদায়াত অবতীর্ণ হয়েছিল, তারা আগেই তা অস্বীকার করেছিল। পক্ষান্তরে আল্লাহ্র নিয়মানুসারে কোরআনকে স্বীকার করার জন্যে পূর্ববর্তী হেদায়াতসমূহ স্বীকার করে নেয়া ছিল অপরিহার্য।
পদ্ধতিগতভাবে এ কথা ইবরাহীম (আঃ)-কে প্রথমেই বলে দেয়া হয়েছিল। আল্লাহ্ তাআলা অতপর তাঁকে কতিপয় বিষয়ে পরীক্ষা করলেন। যখন তিনি এসব পরীক্ষায় যথাযথভাবে উত্তীর্ণ হয়ে গেলেন, তখন আল্লাহ্ বললেনঃ
إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا .
অর্থাৎ, "আমি তোমাকে মানুষের জন্যে নেতা নির্ধারণ করতে যাচ্ছি।" তিনি প্রশ্ন করলেনঃ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي অর্থাৎ, আর আমার বংশধর থেকেও কি? উত্তর এলো لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّلِمِينَ অর্থাৎ, আমার এ ওয়াদা যালেমদের ব্যাপারে নয়। আমার এ ওয়াদা শুধুমাত্র তাদেরই সাথে সম্পৃক্ত যারা সতত আমার হেদায়াতের অনুগামী থাকবে, যেকোন অবস্থায় তা কবুল করবে এবং আল্লাহ্র সাথে শরীক করা এবং মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকবে। বস্তুত এরাই আল্লাহ্ হেদায়াতের দ্বারা যথাশীঘ্র বিভূষিত হবে এবং জাতির নেতৃত্বলাভে সমর্থ হবে।
হযরত মূসার সামনে এ কথারই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। তিনি আল্লাহ্ কাছে নিজের জাতির জন্যে দোয়া করেছিলেনঃ
وَاكْتُبْ لَنَا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ إِنَّا هُدُنَا إِلَيْكَ .
অর্থাৎ, আমাদের জন্যে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লেখে দাও; আমরা তোমার প্রতি ধাবিত হয়েছি।
উত্তরে এরশাদ হচ্ছেঃ
عَذَابِي أَصِيبَ بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلِّ شَيْءٍ فَسَاكُتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ .
অর্থাৎ, আমার আযাব তো আমার ইচ্ছানুযায়ী (যারা তার অধিকারী তাদের ওপরই) অবতীর্ণ করি, আর আমার রহমত সবকিছুতে সাধারণভাবে বর্ষিত হয়। সুতরাং আমি তা লেখে দেব তাদেরই জন্যে যারা সততা বা পরহেযগারীতে অনড় থাকবে।
"পরহেযগারীতে অনড় থাকবে" অর্থ হল এই যে, আজ যে প্রতিশ্রুতির বিনিময় হচ্ছে যে, তাতে তারা অটল-অনড় থাকবে; তা লংঘন করবে না, তার সঠিকতায় কোন রকম আঘাত হানবে না। এসব লোকই ভবিষ্যতে আল্লাহর রহমতের অধিকারী হবে। অর্থাৎ, যখন আল্লাহ্ তাআলার সর্বশেষ শরীয়ত; যা এ পৃথিবীতে আল্লাহ্র সর্বশেষ এবং সর্ববৃহৎ রহমত হিসেবে আসবে, তখন তারা তা গ্রহণ করে নেবে; তাকে অস্বীকার করবে না। যারা এই ওয়াদায় অনড় থাকবে না, তারা আগামীতে যেসব রহমত নাযিল হবে, তা থেকেও বঞ্চিত থাকবে। কারণ, তাদের অন্তর কঠিন হয়ে পড়বে এবং তাদের কৃতঘ্নতার ফলে আল্লাহ্ তাআলা তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দেবেন। অতএব, যখন কোরআন মজীদ অবতীর্ণ হয় এবং যখন যে সূরাটি নাযিল হয়, যাতে পরিপূর্ণভাবে ইহুদীদেরকে সম্বোধন করা হচ্ছিল, অর্থাৎ সূরা বাকারা, তখন তার সর্বপ্রথম আয়াতেই বলা হয়; - مُدَيَّ لِلْمُتَّقِينَ )এ গ্রন্থ মুত্তাকী বা পরহেযগারদের জন্যেই শুধু হেদায়াত হিসেবে নাযিল হয়েছে।) অর্থাৎ, একে শুধুমাত্র তারাই গ্রহণ করবে যারা পরহেযগার, যারা নিজেদের ওয়াদা পূরণ করেছে, যারা আল্লাহর নেয়ামতের যথাযোগ্য মূল্য দিয়েছে, যারা নিজেদের নবীর শিক্ষাকে স্মরণ রেখেছে। পক্ষান্তরে যারা এসব বিষয় অস্বীকার করেছে, তারা প্রকারান্তরে এই কোরআনকেও অস্বীকার করেছে। কারণ তাদের কৃতঘ্নতার ফলে আল্লাহ্ তাদের অন্তরে মোহর এঁটে দিয়েছেন। বলা হয়েছেঃ
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنْذِرُهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ خَتَمَ اللهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَى سَمْعِهِمْ وَعَلَى وَأَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ وَلَهُمْ عَذَابُ الِيم-
অর্থাৎ, নিঃসন্দেহে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা আর ভীতি প্রদর্শন না করা উভয়ই সমান; তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ্ তাদের অন্তরে ও তাদের শ্রবণেন্দ্রিয় মোহর এঁটে দিয়েছেন এবং তাদের চোখে পর্দা ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।-(সূরা বাঁকারা)
যারা আল্লাহর সাথে ওয়াদা বা অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করেছে, যারা আল্লাহ্' কর্তৃক স্থাপিত সম্পর্কের ওপর কাঁচি চালিয়েছে, যারা পৃথিবীতে আল্লাহর ন্যায়নীতির শত্রু, তারা কস্মিনকালেও কোরআনের হেদায়াত গ্রহণ করবে না। বরং তারা এর মাধ্যমে হেদায়াতপ্রাপ্তির পরিবর্তে নিজেদের পথভ্রষ্টতা এবং দুষ্কৃতিতে আরও বেশী এগিয়ে যাবে। আর তাতে করে তাদের দুর্ভাগ্যের ওপরে বিশেষ মোহরটিও এঁটেই থাকবে। সুতরাং এরশাদ হয়েছে:
يُضِلُّ بِهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ طَ وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الفَسِقِينَ- الَّذِينَ يُنْقِضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ ما أَمَرَ اللهُ بِهِ أَن يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ هُمُ الْمُخْسِرُونَ.
অর্থাৎ, এর দ্বারা আল্লাহ্ অনেককে পথভ্রষ্ট করেন, আবার অনেককে হেদায়াত দান করেন। পক্ষান্তরে এর দ্বারা সেসব লোককে ছাড়া অন্য কাউকে গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট করেন না, যারা কৃতঘ্ন বা 'নাফরমান, যারা আল্লাহ্র সাথে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যে বিষয়কে আল্লাহ্ একত্রিত করার নির্দেশ দিয়েছেন তাকে বিচ্ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে কলহ-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। বস্তুত তারাই হল অকৃতকার্য।-(সূরা বাকারা)
তাছাড়া এমনি হওয়াও উচিত। আল্লাহ্ হেদায়াত একটি নেয়ামত। এ নেয়ামত তাদেরই প্রাপ্য যারা তার যথার্থ মূল্য দেবে এবং তা থেকে উপকৃত হতে সচেষ্ট হবে। যে লোক নেয়ামতের অমর্যাদা করে, সে কস্মিনকালেও নেয়ামত পাওয়ার যোগ্য নয়। সুপথপ্রাপ্তি এবং পথভ্রষ্টতার ক্ষেত্রে সব সময় এই নীতিই অটল, অনড়। যারা নেয়ামতসমূহকে হৃষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেছে তাদের জন্যে নেয়ামত বর্ধিত হয়েছে। প্রকারান্তরে যারা এর অমর্যাদা করেছে তারা তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বনী ইসরাঈলকে আল্লাহ্ তাঁর এ নীতি সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে অবহিত করে দিয়েছিলেন এবং তাদের সাথে সে মোতাবেক আচরণ করা হয়েছে।
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
অর্থাৎ, আর স্মরণ কর-তোমাদের পালনকর্তা তোমাদেরকে অবহিত করে দিয়েছিলেন যে, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তা হলে তোমাদের জন্যে নেয়ামতকে বাড়িয়ে দেব। আর যদি তোমরা কৃতঘ্নতা প্রদর্শন কর, তা হলে আমার আযাব অত্যন্ত কঠোর। (সূরা ইবরাহীম)
কাজেই বনী ইসরাঈলরা যেহেতু আল্লাহ্ প্রদত্ত নেয়ামতসমূহের প্রতি মর্যাদা দান করেনি, সেহেতু তারা কোরআনের নেয়ামতের দ্বারা উপকৃত হওয়ার অধিকারীও সাব্যস্ত হতে পারেনি। তাছাড়া যেমন বলা হয়, যেব্যক্তি এক পয়সার ব্যাপারে চোর সাব্যস্ত হয়, তাকে লক্ষ টাকার দায়িত্ব দেয়া যায় না, তাই তারাও কোরআনের মহা নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদেরকে কিতাবের অংশবিশেষ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা যখন তাতে সত্যবাদী এবং আমানতদার প্রমাণিত হয়নি, তখন আল্লাহ্ তাদের ওপর নিজের সম্পূর্ণ গ্রন্থের দায়িত্ব কিভাবে অর্পণ করতেন?
কাজেই ইহুদীদের একটা বিরাট অংশ, যারা 'তাওরাত' ও যবুরের শিক্ষা পরিহার করে বৈষয়িক কামনা-বাসনা এবং পার্থিব ভোগ-বিলাসের শিকারে পরিণত হয়ে পড়েছিল, তারা কোরআনের মহান কল্যাণ থেকেও সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়েছে। শুধু একটিমাত্র দল তাদের মধ্যে ন্যায়নিষ্ঠ রয়ে গিয়েছিল- এরাই ছিল কোরআনের আগমন প্রতীক্ষায়। এ বাণীর প্রতিধ্বনি তাদের কানে পৌছার সাথে সাথে তারা তাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। সুতরাং কোরআন যেখানেই ইহুদীদের সাধারণ দুর্ভাগ্য সম্পর্কে আলোচনা করেছে, সেখানেই এই ক্ষুদ্র দলটির ন্যায়নিষ্ঠারও প্রশংসা করেছে।
একই অবস্থা দাঁড়িয়েছে নাসারা তথা খৃস্টানদেরও। এ সম্প্রদায়ের বৃহৎ অংশ- যারা পূর্ববর্তীদের অনুসরণে পথভ্রষ্ট হয়ে ধর্মের যথার্থ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে গিয়েছিল, তারাও কোরআনকে বুঝতে পারেনি। তাদের কাছে কোরআনের শিক্ষাগুলো তাদের চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিরোধী বলে মনে হয়েছে। ফলে তারা তার শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য যাদের মধ্যে সঠিক শিক্ষার আলো তখনও বিদ্যমান ছিল এবং হযরত ঈসা মসীহ (আঃ)-এর ইঙ্গিতের নির্দেশনায় সেগুলোর জন্যে অপেক্ষা করছিল, তারা কোরআন প্রাপ্তির সাথে সাথে পরিপূর্ণ উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কোরআন তাদের সে উদ্দীপনার ছবি এভাবে এঁকেছে:
وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنْزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ - يَقُولُونَ رَبَّنَا أَمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّهْدِينَ - وَمَا لَنَا لَا نُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَمَا جَانَنَا مِنَ الْحَقِّ - وَنَطْمَعُ أَنْ تُدْخِلْنَا رَبَّنَا مَعَ الْقَوْمِ الصَّالِحِينَ .
অর্থাৎ, আর যখন তারা সে বিষয়টি সম্পর্কে শুনতে পেল যা রসূলের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে (অর্থাৎ কোরআন), তখন তোমরা তাদের চোখগুলোর প্রতি লক্ষ্য করে থাকবে যে, অশ্রুসিক্ত হয়ে গেছে। কারণ, তারা সত্যকে চিনে নিতে পেরেছে। তারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা ঈমান এনেছি, তুমি আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও। আর আমরা আল্লাহর প্রতি এবং সে সত্যের প্রতি ঈমান নাইবা আনব কেন? যা আমাদের কাছে এমতাবস্থায় এসে পৌছেছে, যখন আমরা আশান্বিত যে, আমাদের পালনকর্তা আমাদেরকে নেক বান্দাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।- (সূরা মায়েদা)
এ ধরনের সদবিশ্বাসী খৃস্টানরা কালবিলম্ব না করেই ইসলামের আওতাভুক্ত হয়েছে। তারা নিজেদের বিশ্বাস ও আমলকে বিকৃত করেনি, বরং একান্ত সতর্ক ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ শিক্ষার্থীর মত যা কিছু তাদেরকে পড়ানো হয়েছিল, সেগুলো মুখস্থ করে রেখেছিল এবং পরবর্তী পাঠ গ্রহণের জন্যে ব্যাকুল আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।. অতএব আল্লাহ্ এদেরকেই 'মুহসিনীন' খেতাবে ভূষিত করে অনন্য করেছেনঃ
فَأَثَابَهُمُ اللَّهُ بِمَا قَالُوا جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خُلِدِينَ فِيهَا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْمُحْسِنِينَ.
অর্থাৎ, অতএব তাদের এ কথার প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ্ তাদেরকে এমন (জান্নাত) দান করেছেন, যার তলদেশে সতত প্রস্রবণ প্রবাহিত হচ্ছে- তাতে তারা সব সময় অবস্থান করবে। আর মুহসিনীনদের জন্যে এই হল প্রতিদান।
এই বিশ্লেষণের দ্বারা এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল যে, কোরআন মজীদ সম্পর্কে আল্লাহ্ যে বলেছেন, এটা পরহেযগারদের এবং মুহসিনীনদের জন্যে পথপ্রদর্শক, তার অর্থ তার চেয়ে আরও কিছুটা ব্যাপক, যা আমরা সাধারণভাবে মনে করে থাকি। এর অর্থ হচ্ছে যে, কোরআন মজীদ আল্লাহ্ তাআলার এক মহা নেয়ামত। এর জ্ঞান ও গবেষণা তাদেরই ভাগ্যে জোটে, যারা এই নেয়ামতের জন্যে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। আর তাঁর শুকরিয়া হল এই যে, যে উদ্দেশ্যে এটা তাদেরকে দেয়া হয়েছে, তারা সে উদ্দেশেই এর অনুশীলন করবে। আর এটা দেয়ার উদ্দেশ হল বিশ্বাস ও কর্মক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে এর বাস্তবায়ন। তারা যতই এই নেয়ামতের মর্যাদা দান করতে থাকবে, ততই তার বরকতও বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
সে কারণেই সম্পূর্ণ কোরআন মজীদ এক সঙ্গে অবতীর্ণ হয়নি, বরং অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে হুযুরের উম্মতের মূল্যবোধ এবং কৃতজ্ঞতার পূর্ণ পরীক্ষা হয়ে যায়। যেভাবে একজন শিক্ষার্থী কোন একটি বিষয় ধাপে ধাপে অর্জন করে, তেমনিভাবে উম্মতও পর্যায়ক্রমিকভাবে পৃথক পৃথক পাঠ অনুযায়ী একে শিখবে এবং এর শিক্ষা পরিপূর্ণভাবে নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করবে। অতএব, কোরআন নাযিলের যে পদ্ধতিটি ছিল, সেটিই মুসলমানরা তার শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে গ্রহণ করেছে। এর প্রতিটি আয়াতের ওপর চিন্তা-ভাবনা করেছে, বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ করেছে এবং যখন বিশ্বাস ও কার্যক্ষেত্র পরিপূর্ণভাবে আয়ত্ত করে নিয়েছে, তখন পরবর্তী পর্যায়ের দিকে এগিয়ে গেছে। আল্লামা সুয়ূতী (রঃ)-এর 'এত্কান' গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে:
وقد قال ابو عبد الرحمن السلمي حدثنا الذين كانوا يقرؤن کعثمان بن عفان وعبد الله بن مسعود وغيرهما أنهم كانوا اذا تعلموا من النبي صلى الله عليه وسلم عشر ايات لم يتجاوزوها حتى يعلمون مافيها من العلم والعمل قالوا فتعلمنا القرآن والعلم جميعا ولهذا كانوا يبقون مدة في حفظ السورة .
অর্থাৎ, আবু আবদুর রহমান সালামী বলেছেন, আমার কাছে সেসব লোক বর্ণনা করেছেন যাঁরা কোরআন মজীদকে তেমনি পড়তেন এবং পড়াতেন- যেমন ওসমান ইবনে আফ্ফান এবং আবদুল্লাহ ইবনে মসউদ প্রমুখ যে, তাঁদের নিয়ম ছিল, নবী করীম (সঃ)-এর কাছে দশটি আয়াত পড়ে নিলে যতক্ষণ পর্যন্ত সে আয়াতগুলোর সম্পূর্ণ জ্ঞান ও আমল নিজেদের মধ্যে বাস্তবায়িত করে না নিতেন, ততক্ষণ পর্যন্ত পরবর্তী আয়াতের দিকে এগোতেন না। তাঁরা বলেছেন, আমরা কোরআনের শিক্ষা ও অনুশীলন একই সঙ্গে অর্জন করেছি। আর সে কারণেই তাঁরা একেকটি সূরা হেফয করতে (তার যথার্থ বিচার-বিশ্লেষণসহ) বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে:
اقام ابن عمر على حفظ البقرة ثماني سنين .
অর্থাৎ, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর সূরা বাকারার পর্যালোচনা করতে গিয়ে দীর্ঘ আট বছর কাটিয়েছিলেন।
এতে বুঝা যায়, কোরআন সম্পর্কে সাহাবিগণের পর্যালোচনা আমাদের পর্যালোচনা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। তাঁরা কোরআনকে শুধুমাত্র শিক্ষামূলকভাবে জেনে নেয়ারই আগ্রহী ছিলেন না, বরং তাঁদের আগ্রহ ছিল তার শিক্ষা বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করার প্রতিই বেশী। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি আয়াতকে তাঁরা নিজেদের জ্ঞান ও আমলের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত করতে না পারতেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তা থেকে এগিয়ে যেতেন না। আর এই হল সেই কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়ার নিগূঢ় তত্ত্ব, যা নেয়ামতের বৃদ্ধি ও বরকতের কারণ হয়। সুতরাং আল্লাহ্ তাঁদের জ্ঞান-দৃষ্টিকে নিজের জ্যোতিতে উজ্জ্বল করে দিয়েছেন এবং একমাত্র এই গ্রন্থের ইলম ও আমলের দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাতের সুউচ্চ মর্যাদায় তাঁদেরকে অধিষ্ঠিত করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00