📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 মনোনিবেশ সহকারে চিন্তা করা

📄 মনোনিবেশ সহকারে চিন্তা করা


কোরআন থেকে যথার্থ উপকার লাভের জন্যে চতুর্থ শর্তটি হল মনোনিবেশ সহকারে চিন্তা করা। এ সম্পর্কে কোরআন নিজেই বারবার উল্লেখ করেছে- أَفَلا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبِ أَقْفَالُهَا অর্থাৎ, কোরআন সম্পর্কে এরা কি চিন্তা করে না? নাকি এদের হৃদয়ে তালা পড়ে আছে? সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম- যাঁরা কোরআনের প্রাথমিক লক্ষ্য, তাঁরা কোরআনকে অত্যন্ত মনোনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করতেন এবং যাঁরা যত গভীরভাবে চিন্তা করতেন তাঁরা কোরআনের জ্ঞানে ততই সমৃদ্ধ ছিলেন। সাহাবাগণ কোরআন মজীদের পর্যালোচনার জন্যে আলোচনা চক্রও (Forum) স্থাপন করেছিলেন, যাতে উৎসাহী সাহাবায়ে কেরাম একত্রিত হয়ে সমবেতভাবে কোরআন পর্যালোচনা করতেন। এ ধরনের কোরআন পর্যালোচনা চক্রের প্রতি হুযুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও উৎসাহ ছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনার দ্বারা প্রতীয়মান হয়, খোলাফায়ে রাশেদীন, বিশেষ করে হযরত ওমর (রাঃ) এসব কোরআনী আলোচনাচক্র ও কোরআন বিশারদদের প্রতি বিপুল আগ্রহ প্রদর্শন করতেন।
শুধুমাত্র সওয়াবের কাজ হিসেবে কোরআনের শব্দসমূহের আবৃত্তি করে নেয়া এবং কোরআনের অর্থের প্রতি খেয়াল না করা সাহাবায়ে কেরام (রাঃ)-এর রীতি ছিল না। এ ধরনের রীতি তখনই প্রচলিত হয়েছে, যখন থেকে মানুষ কোরআনকে একটা জীবন বিধানের পরিবর্তে কেবলমাত্র বরকত লাভের মাধ্যম হিসেবে ধরে নিয়েছে। যখন জীবনের সাথে কোরআনের সম্পর্ক শুধু এতটুকু রয়ে গেছে যে, এর দ্বারা মুমূর্ষু অবস্থায় মৃত্যু-কষ্ট লাঘব করা যেতে পারবে, আর মৃত্যুর পরে এর মাধ্যমে ঈসালে সওয়াব করা যাবে। যখন জীবনের উত্থান-পতনে পথপ্রদর্শক হওয়ার স্থলে এর কার্যকারিতা শুধুমাত্র এটুকু রয়ে গেছে যে, আমরা যেকোন ভ্রষ্ট পদক্ষেপের উদ্বোধন এর মাধ্যমে করব তাতে এর বরকতে সেই ভ্রষ্টতাও হেদায়াতে পরিণত হবে। যখন থেকে মানুষ কোরআনকে তাবিজ-কবচ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে এবং ভেবে নিয়েছে, যেকোন হীন উদ্দেশ্য সাধনের পথে যাত্রা করার মুহূর্তেও কোরআনের তাবিজ ধারণ করে সাফল্য লাভ করা যেতে পারে।
দুনিয়ায় এমন গ্রন্থ একান্তই বিরল যাকে কোরআনের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই তার যথার্থ উপকারিতা তখনই লাভ করা সম্ভব, যখন তা সম্পূর্ণ মনোনিবেশ সহকারে পাঠ করা হবে। কিন্তু সাথে সাথে এটাও অনস্বীকার্য যে, কোরআনই একমাত্র গ্রন্থ, যা সব সময়ই চোখ বন্ধ করে পাঠ করা যায়। একটা সাধারণ জিনিসও মানুষ যখন পাঠ করে, তখন সর্বাগ্রে নিজের মন-মস্তিস্কে একাগ্রতা সৃষ্টি করে নেয়। কিন্তু কোরআনের ব্যাপারে মানুষের এক অদ্ভুত আচরণ পরিলক্ষিত হয় যে, যখনই তা পাঠ করার ইচ্ছা করে, তখন সর্বাগ্রে নিজ নিজ মন-মস্তিস্কে এমনভাবে পট্টি বেঁধে নেয়, দৈবাৎ যাতে তার কোন শব্দের অর্থ মন-মস্তিস্ককে স্পর্শ করতে না পারে!
কোরআনের দ্বারা যথার্থভাবে উপকৃত হওয়ার জন্যে পঞ্চম শর্ত হল, তার কোন জটিলতার দরুন নিরাশ কিংবা ভগ্নোৎসাহ হওয়ার অথবা কোরআনের প্রতি সন্দিহান বা বিরূপ মন্তব্য করার পরিবর্তে নিজের জটিলতাসমূহ আল্লাহর দরবারে পেশ করে তাঁরই কাছে সাহায্য ও ক্ষমা নির্দেশ কামনা করা। মানুষ কোরআন পাঠ করতে গিয়ে অনেক সময় উপলব্ধি করে যে, সে এমন এক 'কঠিন বাক্যের' চাপের সম্মুখীন হয়েছে, যা তার পক্ষে বহন করাই সম্ভব নয়। তেমনিভাবে সে অনেক সময় মনে করে, তার সামনে এমন জটিলতা এসে হাযির হয়েছে, যার এমন কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্ভবই নয়, যাতে সে সন্তুষ্ট হতে পারবে। এ ধরনের জটিলতা এবং অস্থিরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে সঠিক এবং পরীক্ষিত একমাত্র পথ হচ্ছে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা আর কোরআনের উপর দৃঢ়তা অবলম্বন করা। কোরআন যদি মুখস্থ থাকে তাহলে রাত্রে নামাযের মধ্যে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পাঠ করবে। ইনশাআল্লাহ্ তাতে তার যাবতীয় জটিলতা দূর হয়ে যাবে এবং কোরআনী জ্ঞানের এমন দরজা তার জন্যে উন্মুক্ত হবে, যাতে কোরআনে হাকীমের যাবতীয় জটিলতাই সহজ হয়ে পড়বে। তাছাড়া এমন জটিলতর অবস্থা সৃষ্টি হলে নিম্নলিখিত দোয়া পড়তে থাকলেও উপকার পাওয়া যায়
اللهم اني عبدك وابن عبدك وابن امتك ناصيتي بيدك ماض في حكمك عدل في قضاءك اسئلك بكل اسم هو لك سميت به نفسك وانزلته في كتابك أو علمته أحدا من خلقك ان تجعل القرآن ربيع قلبي ونور صدري وجلاء حزني وذهاب همي وغمی
অর্থাৎ, আয় আল্লাহ্! আমি তোমার দাস। তোমার দাসের এবং তোমার দাসীর পুত্র, আমার ললাট তোমারই হাতের মুঠোয় আবদ্ধ, আমার প্রতি তোমার নির্দেশ জারি রয়েছে। আমার সম্পর্কে তোমার সিদ্ধান্তই যথার্থ। আমি তোমার কাছে তোমার সে সমস্ত নামের মাধ্যমে যা, তোমার রয়েছে, যাতে তুমি নিজেই নিজেকে অভিহিত করেছ অথবা যা তুমি তোমার কিতাবে নাযিল করেছ কিংবা যা তুমি তোমার কোন সৃষ্টিকে শিখিয়েছ প্রার্থনা করছি, তুমি কোরআনকে আমার হৃদয়ের বসন্ত, আমার অন্তরের নূর, আমার চিন্তা হরণকারী এবং আমার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার প্রতিকার বানিয়ে দাও।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00