📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 উদ্দেশ্যের পবিত্রতা

📄 উদ্দেশ্যের পবিত্রতা


সর্বাগ্রে নিয়ত বা উদ্দেশ্যের পবিত্রতা প্রয়োজন। উদ্দেশ্যের পবিত্রতার অর্থ হচ্ছে, একমাত্র হেদায়াত লাভের উদ্দেশেই কোরআন পাঠ করা। অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়। হেদায়াতপ্রাপ্তি ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকলে শুধু যে কোরআনের যথার্থ বরকত লাভ থেকেই বঞ্চিত হতে হবে তাই নয়, বরং কোরআন থেকে অজ্ঞ অবস্থায় যতটা দূরত্ব রয়েছে, তার চেয়েও অনেক বেশী দূরে সরে পড়ার আশংকা রয়েছে। মানুষ কোরআনের ব্যাখ্যাতা কিংবা মুফাস্সের বলবে, অথবা যথাশীঘ্র কোরআনের একটা তফসীর লেখে খ্যাতি এবং মুনাফা লাভ করার উদ্দেশে যদি পাঠ করা হয়, তাহলে হয়ত তার সে উদ্দেশ্য পূরণ হয়েও যেতে পারে; কিন্তু কোরআনের যে জ্ঞান, তা থেকে সে বঞ্চিত হয়ে পড়বে। তেমনিভাবে কারও যদি কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে থাকে এবং সে নিজের দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনে প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশে কোরআনের প্রতি ধাবিত হয়, তাহলে হয়ত কোরআন থেকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনে কিছু কিছু ইতস্তত বিক্ষিপ্ত যুক্তি-প্রমাণও সংগ্রহ করে নিতে পারে, কিন্তু তার এহেন গর্হিত কাজের জন্যে কোরআনের জ্ঞান লাভের দ্বার তার জন্যে সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে যাবে।
কোরআন মজীদকে আল্লাহ্ তা'আলা একটি হেদায়াত-গ্রন্থ হিসেবে নাযিল করেছেন এবং প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে তিনি হেদায়াত লাভের প্রেরণাও দান করেছেন। যদি এই প্রেরণার ভিত্তিতে মানুষ কোরআনের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তাহলে সে নিজের চেষ্টা এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত তৌফিক ও সামর্থ্য অনুসারে কোরআনের কল্যাণ লাভ করতে পারে। আর যদি এই প্রেরণা ব্যতীত অন্য কোন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কোরআনকে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে 'যেমন কর্ম তেমন ফল' -এই মূলনীতির ভিত্তিতে সেও তাই পাবে যা সে অনুসন্ধান করে। কোরআন মজীদের এই বৈশিষ্ট্যের জন্যেই আল্লাহ্ তা'আলা এর সম্পর্কে বলেছেন—"আল্লাহ্ এর মাধ্যমে অনেককে গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট করেন এবং অনেককে হেদায়াত বা কল্যাণ দান করেন।" তাছাড়া এই মূলনীতি বর্ণনার পরেও পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন— গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট তাদেরকেই করেন, যারা না-ফরমান। অর্থাৎ, যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত সরল পথ পরিহার করে এবং হেদায়াত বা কল্যাণ থেকে অকল্যাণ আহরণের চেষ্টা করে। আল্লাহ্ তাদেরকে সে জিনিসই দান করেন, তারা যার জন্যে লালায়িত হয়। কা'বায় গিয়েও যদি কেউ দেবমূর্তির কথাই স্মরণ করে, তাহলে তার জন্যে তওহীদের মহিমা উন্মোচন কিছুতেই সম্ভব নয়। যদি কেউ ফুলের মধ্যে থেকেও কাঁটা আহরণে আগ্রহী হয়, তাহলে কিছুতেই সে ফুলের সুবাস ও সৌরভ লাভের অধিকারী হতে পারে না। কেউ যদি নিজের বিকৃত মানসিকতার কারণে চিকিৎসাকেও রোগ বিবেচনা করে, তাহলে তার রোগ বাস্তবিকই চিকিৎসার অতীত। নিরাময়ের পরিবর্তে রোগ বৃদ্ধিই তার জন্যে স্বাভাবিক। এদিকে লক্ষ্য করেই কোরআনে হাকীমের সূরা বাকারার নিম্ন বর্ণিত আয়াতে ইংগিত করা হয়েছে:
أولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَلَةَ بِالْهُدَى فَمَا رَبِحَتْ تِجَارَتُهُمْ وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ (بقرة (١٦)
অর্থাৎ, 'এরাই সেসব লোক, যারা হেদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতাকে গ্রহণ করেছে। সুতরাং তাদের এই সওদা তাদের জন্যে লাভজনক হয়নি এবং তারা হেদায়াতপ্রাপ্ত হতে পারেনি।' (সূরা বাকারা; ১৬)

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কোরআনে হাকীমকে একটি উচ্চতর বাণী হিসাবে মানতে হবে

📄 কোরআনে হাকীমকে একটি উচ্চতর বাণী হিসাবে মানতে হবে


দ্বিতীয় শর্ত হল, কোরআন হাকীমকে একটি উচ্চতর এবং উৎকৃষ্টতর বাণী বলে মেনে নিয়ে সেভাবে তা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। মনে যদি কোরআন মজীদের সম্মান ও গুরুত্ব না থাকে, তাহলে কেউ তাকে বুঝবার জন্যে এবং তার রহস্য ও নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে সে পরিমাণ শ্রম ব্যয় করতে পারে না যা তার জ্ঞানভাণ্ডার থেকে উপকৃত হওয়ার জন্যে প্রয়োজন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে অনেকের কাছে কথাটা একান্ত অদ্ভুত বলেই মনে হবে যে, একটি গ্রন্থ সম্পর্কে তাকে জানার আগেই শুভ ধারণা সৃষ্টি করে নিতে হবে যে, এটা অত্যন্ত জ্ঞানপূর্ণ এবং একান্ত উচ্চ মানের একটি গ্রন্থ! কিন্তু লক্ষ্য করলেই বুঝা যাবে, কোরআন মজীদ সম্পর্কে এ ধরনের শুভ ধারণা সৃষ্টি হওয়া একান্ত যুক্তিসংগত ব্যাপার।
কোরআনের একটি বিরাট ইতিহাস রয়েছে। তার কীর্তিও বিপুল। মন-মস্তিষ্কের পরিবর্তন সাধনে এ গ্রন্থ যে অলৌকিকতা প্রদর্শন করেছে, আজও পর্যন্ত অন্য কোন গ্রন্থ তা প্রদর্শন করতে পারেনি। তাছাড়া আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, পৃথিবীর বিপুল সংখ্যক অধিবাসী একে শুধু একটি গ্রন্থ হিসেবেই মান্য করে না, বরং আসমানী এবং ঐশী গ্রন্থ হিসেবে সম্মানও করে। একে 'লওহে মাহফুজ' তথা আল্লাহর আরশ থেকে অবতীর্ণ গ্রন্থ হিসেবে শ্রদ্ধা করে। একে একটি অনন্য বাণী বলে মান্য করে। যার কোন তুলনা না মানুষের পক্ষে উপস্থাপন করা সম্ভব, না জিনদের পক্ষে। এমন একটি বাণী, যার অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে এহেন প্রমাণ এবং ধারণা বিদ্যমান, তা যথার্থই অতি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। আর মানুষ তাকে বুঝবার অধিকার তখনই অর্জন করতে পারে, যখন তার এই গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য তাদের মনে বদ্ধমূল হবে। পক্ষান্তরে এই গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য যদি মানুষের সামনে না থাকে, তাহলে মানুষের মন-মস্তিষ্কের পক্ষে তাকে এহেন আয়োজনের অধিকারী বলে বিবেচনা করা কিছুতেই সম্ভব নয়, যতটা তার কাম্য। কোন ভূমিখন্ড সম্পর্কে যদি জানা থাকে যে, সেখান থেকে সোনা আহরিত হচ্ছে এবং এক কালে সেখান থেকে বহু সোনা আহরিত হয়েছে, তাহলে এ আশাই করা হবে যে, খনন করা হলে সেখান থেকে সোনাই বের হবে। তখন সে স্থানটির এই গুরুত্বের ভিত্তিতেই তা থেকে ফায়দা লাভের আয়োজন করা হবে এবং সেখানে শ্রম নিয়োগ করা হবে। কিন্তু যদি কোন খনিকে এমন কল্পনা করে নেয়া যায় যে, এটি নিঃশেষিত হয়ে গেছে কিংবা খনন করা হলে বড় জোর কিছু অংগার অথবা চুনা পাথরই পাওয়া যেতে পারে, তাহলে এতে কেউ এতটুকু সময়ও নষ্ট করতে চাইবে না। অগত্যা যদি নষ্ট করেও তবে এতটুকুই করবে যতটা লাভবান হওয়ার আশা করবে।
আমি উল্লিখিত সতর্কতা উচ্চারণের প্রয়োজন এজন্যে মনে করছি যে, কোরআন মজীদ সম্পর্কে এমন কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, যার বর্তমানে কোরআন থেকে যথাযথ উপকার লাভ করতে হলে যে পরিমাণ মনোযোগের প্রয়োজন, তাকে ততটা মনোযোগের যোগ্য বিবেচনা করা সম্ভব নয়। এসব ভ্রান্ত ধারণা কোরআনের স্বীকৃতিদানকারী এবং অস্বীকারকারী উভয় শ্রেণীর মধ্যেই রয়েছে। অবশ্য অস্বীকারকারীরা অন্তত এতটুকু স্বীকার করে যে, কোন এক বিশেষ যুগে এ গ্রন্থের মাধ্যমে কিছু কিছু সংস্কার সাধিত হয়েছে। কিন্তু তাদের মতে সে যুগ আর এখন নেই। তাছাড়া বেদুঈনদের সহজ-সরল জীবনের সমস্যাবলীর জন্যে যদিও এটি উপকারী হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান জটিলতার যুগে জটিলতর সব সমস্যার সমাধানের পক্ষে এ গ্রন্থ যথেষ্ট নয়।
আর যারা এ গ্রন্থের প্রতি স্বীকৃতি দেন, তাদের মধ্যেও আবার অনেকে একে শুধুমাত্র হারাম-হালালের ব্যাখ্যাদানকারী একটি বিধান-পুস্তক বলে মনে করেন। এসব বিধানকে পৃথকভাবে সংকলিত করে নিলে তাদের দৃষ্টিতে এর যেটুকু গুরুত্ব অবশিষ্ট থাকে, তাহল শুধু বরকত লাভের দিক। আবার এদের অনেকের মতে, এটা মৃত্যু-কষ্ট লাঘব এবং ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশে ব্যবহারযোগ্য একটি পবিত্র গ্রন্থ মাত্র। আর যেভাবে খৃস্টানরা এ ধরনের গ্রন্থকে পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তেমনিভাবে এ শ্রেণীর মুসলমানরাও কোরআনকে পকেটেই পুরে রাখে। এমনি ধরনের ভুল' ধারণার বশবর্তী মুসলমানরা কোরআন থেকে সেই উপকারিতা কিছুতেই লাভ করতে পারে না, যার জন্যে সেটি অবতীর্ণ হয়েছে। এদেরকে সে ব্যক্তির সাথে তুলনা করা চলে, যার হাতে শক্তিশালী কামান তুলে দিয়ে তার দ্বারা শত্রুর দুর্গকে চুরমার করে দিতে বলা হল, কিন্তু সে এই শক্তিশালী কামানকে মাছি মারার একটি কল বিবেচনা করে বসল এবং এমনি ধরনের হীন উদ্দেশে তার ব্যবহার শুরু করে দিল।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কোরআনের চাহিদানুযায়ী নিজের পরিবর্তন সাধনের দৃঢ় সংকল্প

📄 কোরআনের চাহিদানুযায়ী নিজের পরিবর্তন সাধনের দৃঢ় সংকল্প


কোরআনে হাকীম থেকে যথাযথ উপকার লাভের জন্যে তৃতীয় শর্তটি হল এই যে, মনে কোরআনের চাহিদা অনুসারে বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ দিক থেকে নিজেকে পরিবর্তন করার সুদৃঢ় সংকল্প বিদ্যমান থাকতে হবে। কোন লোক যখন কোরআনকে গভীর মনোনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করে, তখন পদে পদেই সে অনুভব করে, কোরআনের চাহিদা এবং দাবী তার স্কুল ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সে দেখতে পায়, তার পূর্বকল্পিত ধ্যান-ধারণাগুলোও কোরআনের সাথে পার্থক্যপূর্ণ আর তার আচার-আচরণও কোরআন কর্তৃক নির্ধারিত সীমারেখা বহির্ভূত। তখন সে নিজের বাহ্যিক দিকটিকেও কোরআন থেকে অনেক দূরে দেখতে পায় এবং তার অভ্যন্তরকেও কোরআনের পরিপন্থী বলে অনুভব করে। এহেন বিরোধ-বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হবার পর একজন দৃঢ় সংকল্প সত্যান্বেষী ব্যক্তি এ সিদ্ধান্তই গ্রহণ করে যে, যাই ঘটুক না কেন, আমি নিজেকে কোরআনের চাহিদা মোতাবেক অবশ্যই গঠন করে নেব। সুতরাং সে চরম ত্যাগ স্বীকার করে যেকোন রকম বিপদাপদ সহ্য করে নিজেকে কোরআনের চাহিদা অনুযায়ী গঠন করতে চেষ্টা করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজেকে কোরআনের ছাঁচে গঠন করতে সমর্থও হয়। কিন্তু যারা দৃঢ় সংকল্প নয় তারা সে ব্যবধান দূর করার সাহসই করতে পারে না, যা তারা নিজের এবং কোরআনের মধ্যে প্রতিবন্ধক দেখতে পায়। তারা অনুভব করে, যদি আমি নিজের আকীদা -বিশ্বাসসমূহকে কোরআন অনুযায়ী তৈরী করতে চেষ্টা করি, তাহলে আমাকে মানসিক এবং স্নায়ুবিক দিক থেকে পুনর্বার জন্মগ্রহণ করতে হবে। সে দেখতে পায়, আমি যদি নিজের চরিত্র ও কার্যকলাপকে কোরআনের ছাঁচে গড়তে চেষ্টা করি, তাহলে আমার নিজস্ব পরিবেশ আমার জন্যে সম্পূর্ণভাবে অপরিচিত হয়ে পড়বে। তার মনে এমন ধারণারও সৃষ্টি হয় যে, আমি যদি নিজেকে এসব উদ্দেশ্য সাধনে পরিব্যস্ত করে ফেলি, যা কোরআন আমার কাছে দাবী করে, তাহলে আমি যে আনন্দ-ও মুনাফা লাভ করছি, তা লাভ করা তো দূরের কথা, জেল-ফাঁসির মত সুকঠিন সাজা ভোগ করাও বিচিত্র নয়। সে স্পষ্ট দেখতে পায়, যদি আমার জীবিকার উপকরণগুলোকে কোরআন কর্তৃক নির্ধারিত হালাল-হারামের কষ্টি পাথরে যাচাই করি, তাহলে আমি এখন যে আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসে দিন কাটাচ্ছি, তা থেকে বঞ্চিত হয়ে হয়ত রোজ-রোজকার জীবিকা সংগ্রহের জন্যেই চিন্তান্বিত হয়ে পড়তে হবে। এসব আশঙ্কার মোকাবিলায় দৃঢ়তা অবলম্বন করা এবং এগুলোর মোকাবিলা করার জন্য সুকঠিন মনোবল সঞ্চয় করা যার তার কাজ নয়। শুধুমাত্র দুঃসাহসী ব্যক্তিরাই এহেন কঠিন ঘাঁটি পার হতে পারে। দুর্বল স্নায়ুর লোকেরা এখানে এসেই মনোবল হারিয়ে ফেলে; গতি পরিবর্তন করে নেয়। আর যারা নিজেদের দুর্বলতা গোপন করার পক্ষপাতী নয়; তারা এই বলে নিজেদের অনুসৃত পথেই চলতে শুরু করে যে, কোরআনের নির্দেশিত পথ নিঃসন্দেহে একান্ত যথার্থ; কিন্তু এতে চলা অতি কঠিন। কাজেই আমরা সে পথেই চলব, আমাদের রিপু যে পথে নিয়ে যায়। কিন্তু যারা নিজেদের দুর্বলতাকে সংকল্প এবং প্রতারণাকে বিশ্বাস হিসেবে উপস্থাপন করতে আগ্রহী, তারা নিজেদের এই আগ্রহ বিভিন্ন উপায়ে পূর্ণ করে থাকে। কেউ কেউ অপারগতা এবং বাধ্যতার ছলে নিজেদের জন্যে অবৈধকে বৈধ এবং হারামকে হালাল করে নেয়। কেউ কেউ নানারূপ ছলচাতুরী ও অপব্যাখ্যার মাধ্যমে মিথ্যার ওপর সত্যের রং লাগিয়ে নেয়। আর কেউ কেউ সময়ের চাহিদা কিংবা আপাত সুবিধা খুঁজতে চেষ্টা করে। কেউ কেউ কালামুল্লাহর এমন অপব্যাখ্যার চেষ্টাও করে যেমন ইহুদীরা করেছিল। আর অনেকে কুফর ও ঈমানের মাঝামাঝি একটা পথ বের করে নিতে সচেষ্ট হয়। অর্থাৎ, কোরআনের যে অংশটুকু তাদের নিজেদের মনোমত বলে মনে হয়, তারই অনুসরণ করে আর যে অংশটুকু তাদের মনোমত নয় তা বর্জন করে।
এই সমস্ত পথই শয়তান কর্তৃক উদ্ভাবিত। এর যেকোন পথই মানুষ অবলম্বন করবে, সে পথ সরাসরি ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। কৃতকার্যতা এবং কল্যাণের পথ একমাত্র এই যে, মানুষ নিজেকে কোরআনের ছাঁচে ঢেলে নেয়ার সাহস করে সে জন্যে যেকোন রকম ত্যাগের জন্যে উদ্বুদ্ধ হবে। কিছুকাল আল্লাহ্র তরফ থেকে এ পথের পরীক্ষা চলতে থাকে। কিন্তু যদি এতে দৃঢ়তা অবলম্বন করতে চেষ্টা করে, তাহলে তার জন্যে সৌভাগ্য ও কৃতকার্যতার পথ খুলতে শুরু করে, একটি দরজা যদি বন্ধ হয়ে যায়, আল্লাহ্ তার জন্যে অন্য আরেকটি দরজা খুলে দেন। একটি পরিবেশ থেকে যদি সে উৎক্ষিপ্ত হয়, তাহলে অন্য একটি তাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসে। কোন এলাকা যদি তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে, তাহলে অন্য এলাকা তার জন্যে কোল পেতে দেয়। এই সত্যের প্রতি লক্ষ্য করেই কোরআনে হাকীমে এরশাদ হচ্ছে:
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا (ط) وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ -
অর্থাৎ, আর যারা আমার পথে চেষ্টা করবে আমি অবশ্যই তাদের জন্যে পথ খুলে দেব। আর আল্লাহ্ কল্যাণব্রতীদের সাথে রয়েছেন।- (আল-আন্কাবৃত, ৬৯)

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 মনোনিবেশ সহকারে চিন্তা করা

📄 মনোনিবেশ সহকারে চিন্তা করা


কোরআন থেকে যথার্থ উপকার লাভের জন্যে চতুর্থ শর্তটি হল মনোনিবেশ সহকারে চিন্তা করা। এ সম্পর্কে কোরআন নিজেই বারবার উল্লেখ করেছে- أَفَلا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبِ أَقْفَالُهَا অর্থাৎ, কোরআন সম্পর্কে এরা কি চিন্তা করে না? নাকি এদের হৃদয়ে তালা পড়ে আছে? সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম- যাঁরা কোরআনের প্রাথমিক লক্ষ্য, তাঁরা কোরআনকে অত্যন্ত মনোনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করতেন এবং যাঁরা যত গভীরভাবে চিন্তা করতেন তাঁরা কোরআনের জ্ঞানে ততই সমৃদ্ধ ছিলেন। সাহাবাগণ কোরআন মজীদের পর্যালোচনার জন্যে আলোচনা চক্রও (Forum) স্থাপন করেছিলেন, যাতে উৎসাহী সাহাবায়ে কেরাম একত্রিত হয়ে সমবেতভাবে কোরআন পর্যালোচনা করতেন। এ ধরনের কোরআন পর্যালোচনা চক্রের প্রতি হুযুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও উৎসাহ ছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনার দ্বারা প্রতীয়মান হয়, খোলাফায়ে রাশেদীন, বিশেষ করে হযরত ওমর (রাঃ) এসব কোরআনী আলোচনাচক্র ও কোরআন বিশারদদের প্রতি বিপুল আগ্রহ প্রদর্শন করতেন।
শুধুমাত্র সওয়াবের কাজ হিসেবে কোরআনের শব্দসমূহের আবৃত্তি করে নেয়া এবং কোরআনের অর্থের প্রতি খেয়াল না করা সাহাবায়ে কেরام (রাঃ)-এর রীতি ছিল না। এ ধরনের রীতি তখনই প্রচলিত হয়েছে, যখন থেকে মানুষ কোরআনকে একটা জীবন বিধানের পরিবর্তে কেবলমাত্র বরকত লাভের মাধ্যম হিসেবে ধরে নিয়েছে। যখন জীবনের সাথে কোরআনের সম্পর্ক শুধু এতটুকু রয়ে গেছে যে, এর দ্বারা মুমূর্ষু অবস্থায় মৃত্যু-কষ্ট লাঘব করা যেতে পারবে, আর মৃত্যুর পরে এর মাধ্যমে ঈসালে সওয়াব করা যাবে। যখন জীবনের উত্থান-পতনে পথপ্রদর্শক হওয়ার স্থলে এর কার্যকারিতা শুধুমাত্র এটুকু রয়ে গেছে যে, আমরা যেকোন ভ্রষ্ট পদক্ষেপের উদ্বোধন এর মাধ্যমে করব তাতে এর বরকতে সেই ভ্রষ্টতাও হেদায়াতে পরিণত হবে। যখন থেকে মানুষ কোরআনকে তাবিজ-কবচ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে এবং ভেবে নিয়েছে, যেকোন হীন উদ্দেশ্য সাধনের পথে যাত্রা করার মুহূর্তেও কোরআনের তাবিজ ধারণ করে সাফল্য লাভ করা যেতে পারে।
দুনিয়ায় এমন গ্রন্থ একান্তই বিরল যাকে কোরআনের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই তার যথার্থ উপকারিতা তখনই লাভ করা সম্ভব, যখন তা সম্পূর্ণ মনোনিবেশ সহকারে পাঠ করা হবে। কিন্তু সাথে সাথে এটাও অনস্বীকার্য যে, কোরআনই একমাত্র গ্রন্থ, যা সব সময়ই চোখ বন্ধ করে পাঠ করা যায়। একটা সাধারণ জিনিসও মানুষ যখন পাঠ করে, তখন সর্বাগ্রে নিজের মন-মস্তিস্কে একাগ্রতা সৃষ্টি করে নেয়। কিন্তু কোরআনের ব্যাপারে মানুষের এক অদ্ভুত আচরণ পরিলক্ষিত হয় যে, যখনই তা পাঠ করার ইচ্ছা করে, তখন সর্বাগ্রে নিজ নিজ মন-মস্তিস্কে এমনভাবে পট্টি বেঁধে নেয়, দৈবাৎ যাতে তার কোন শব্দের অর্থ মন-মস্তিস্ককে স্পর্শ করতে না পারে!
কোরআনের দ্বারা যথার্থভাবে উপকৃত হওয়ার জন্যে পঞ্চম শর্ত হল, তার কোন জটিলতার দরুন নিরাশ কিংবা ভগ্নোৎসাহ হওয়ার অথবা কোরআনের প্রতি সন্দিহান বা বিরূপ মন্তব্য করার পরিবর্তে নিজের জটিলতাসমূহ আল্লাহর দরবারে পেশ করে তাঁরই কাছে সাহায্য ও ক্ষমা নির্দেশ কামনা করা। মানুষ কোরআন পাঠ করতে গিয়ে অনেক সময় উপলব্ধি করে যে, সে এমন এক 'কঠিন বাক্যের' চাপের সম্মুখীন হয়েছে, যা তার পক্ষে বহন করাই সম্ভব নয়। তেমনিভাবে সে অনেক সময় মনে করে, তার সামনে এমন জটিলতা এসে হাযির হয়েছে, যার এমন কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্ভবই নয়, যাতে সে সন্তুষ্ট হতে পারবে। এ ধরনের জটিলতা এবং অস্থিরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে সঠিক এবং পরীক্ষিত একমাত্র পথ হচ্ছে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা আর কোরআনের উপর দৃঢ়তা অবলম্বন করা। কোরআন যদি মুখস্থ থাকে তাহলে রাত্রে নামাযের মধ্যে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পাঠ করবে। ইনশাআল্লাহ্ তাতে তার যাবতীয় জটিলতা দূর হয়ে যাবে এবং কোরআনী জ্ঞানের এমন দরজা তার জন্যে উন্মুক্ত হবে, যাতে কোরআনে হাকীমের যাবতীয় জটিলতাই সহজ হয়ে পড়বে। তাছাড়া এমন জটিলতর অবস্থা সৃষ্টি হলে নিম্নলিখিত দোয়া পড়তে থাকলেও উপকার পাওয়া যায়
اللهم اني عبدك وابن عبدك وابن امتك ناصيتي بيدك ماض في حكمك عدل في قضاءك اسئلك بكل اسم هو لك سميت به نفسك وانزلته في كتابك أو علمته أحدا من خلقك ان تجعل القرآن ربيع قلبي ونور صدري وجلاء حزني وذهاب همي وغمی
অর্থাৎ, আয় আল্লাহ্! আমি তোমার দাস। তোমার দাসের এবং তোমার দাসীর পুত্র, আমার ললাট তোমারই হাতের মুঠোয় আবদ্ধ, আমার প্রতি তোমার নির্দেশ জারি রয়েছে। আমার সম্পর্কে তোমার সিদ্ধান্তই যথার্থ। আমি তোমার কাছে তোমার সে সমস্ত নামের মাধ্যমে যা, তোমার রয়েছে, যাতে তুমি নিজেই নিজেকে অভিহিত করেছ অথবা যা তুমি তোমার কিতাবে নাযিল করেছ কিংবা যা তুমি তোমার কোন সৃষ্টিকে শিখিয়েছ প্রার্থনা করছি, তুমি কোরআনকে আমার হৃদয়ের বসন্ত, আমার অন্তরের নূর, আমার চিন্তা হরণকারী এবং আমার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার প্রতিকার বানিয়ে দাও।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00