📄 আল কুরআন দ্বারা চিকিৎসা করানোর ব্যাপারে দলীল কী?
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আমি কুরআনে যা কিছু নাযিল করি তা হচ্ছে ঈমানদারদের জন্যে (তাদের রোগের) উপশমকারী ও রহমত। কিন্তু এ সত্ত্বেও তা যালিমদের জন্যে ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না।” (সূরা ১৭; বনী ইসরাঈল ৮২)
কুরআনে কারীমের এ মহান আয়াত নিয়ে যিনি গবেষণা করবেন তিনি নিশ্চিতভাবে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন যে, কুরআন নিরাময় এবং রহমত। এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এ হচ্ছে আল্লাহর সে কালাম, যার সামনের অথবা পেছনের কোনো দিক থেকেই বাতিল আসতে পারে না। সকল পবিত্রতা সে সত্তার জন্যে, যার নির্দেশ কাফ এবং নূন-এর মধ্যে নিহিত। তিনি যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান তখন বলেন, “হয়ে যাও”। আর তখনই তা হয়ে যায়। কাজেই আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়িত ও প্রতিষ্ঠিত হবে। যদি শুধু তাঁর নির্দেশের মধ্যে এমন প্রভাব থাকে তাহলে তাঁর সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ কালামের প্রভাব কেমন হবে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “অতএব, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা, এ কুরআনের এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে আর আরেক প্রান্ত তোমাদের হাতে। একে তোমরা আঁকড়ে ধর, কখনো তোমরা ধ্বংস হবে না। এরপর কখনো তোমরা পথহারা হবে না।” (আত-তারগীব ১/৭৯)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “তোমরা যাবতীয় রোগ-ব্যাধির নিরাময়ে (চিকিৎসায়) দু'টো জিনিসকে আঁকড়ে ধর- মধু ও কুরআন।” মধু সম্পর্কে যেমনটি আমরা জানি, এটি সে আল্লাহর সৃষ্টি, যিনি সবকিছু সূক্ষ্ম ও দৃঢ় করে বানিয়েছেন। তিনি মধু মক্ষিকার অন্তরে এমন অনুভূতি ঢেলে দিয়েছেন, সে যেন আল্লাহর সহজ করে দেওয়া রাস্তাসমূহে চলে হরেক রকমের ফল থেকে খাবার আহরণ করে অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে এমন মধু তৈরি করে যাতে মানুষদের জন্যে সুস্থতা রয়েছে। যদি মধুর এমন নিরাময়কারী শক্তি থাকে, তাহলে শরীর মন এবং আত্মার উপর আল্লাহর কালামের কেমন শক্তি এবং প্রভাব হতে পারে? নিঃসন্দেহে সেটি রহমত এবং সুস্থতা ছাড়া আর কিছু নয়।
ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, মানসিক ও শারীরিক, দুনিয়া এবং আখিরাতের যাবতীয় রোগ-ব্যাধির পরিপূর্ণ চিকিৎসা হচ্ছে আল-কুরআন। তবে এ থেকে নিরাময় লাভের তাওফীক সবাইকে দেওয়া হয় না। আর সবাই এর উপযুক্তও নয়। রোগী সততা, আস্থা, পরিপূর্ণ কবুল, অকাট্য বিশ্বাস এবং এর যাবতীয় শর্ত পূরণের মাধ্যমে যদি এ কুরআনকে উত্তমভাবে তার রোগের উপর প্রয়োগ করে তাহলে কোনো ব্যাধিই কখনো এর মোকাবিলা করতে পারবে না। যাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবের বুঝ দান করেছেন, সে-ই কেবল এ থেকে সার্বিক সুস্থতা লাভ করে ধন্য হয়। কুরআন যাকে নিরাময় করবে না, আল্লাহও তাকে নিরাময় করবে না। আর যার জন্যে কুরআন যথেষ্ট নয়, আল্লাহও তার জন্যে যথেষ্ট হবেন না।
📄 রোগ থেকে বেঁচে থাকা চিকিৎসার চেয়ে উত্তম
সব ধরনের না হলেও অনেক ব্যাধিই শয়তানের কারণে হয়ে থাকে, কেননা শয়তানই হচ্ছে অনিষ্টতার অগ্নিগর্ভ আর ফাসাদের কূপ। যে সকল রোগের মূল কারণ শয়তান, তার মধ্যে কিছু রয়েছে মানসিক, যেমন: মৃগী রোগ, হিংসা, যাদু। আর কিছু রয়েছে দৈহিক। যেমন: প্যারালাইসিস, শ্বেত বিক্ষিপ্ত শুভ্রতা, ফোঁড়া, মস্তিষ্ক বিকৃতি, এইডস ইত্যাদি। যদিও বাহ্যিকভাবে এগুলো রোগজীবাণু ভাইরাস-এর সংক্রমণে হয়ে থাকে। তবে তার গোড়াতে রয়েছে শয়তান, সে-ই মূলত এ জাতীয় বিষাক্ত জীবাণু ছড়িয়ে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “(হে নবী!) আপনি আমার বান্দা আইয়ুবের কথা স্মরণ করুন। যখন সে তার মালিককে ডেকে বলেছিলো (হে আল্লাহ), শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলে দিয়েছে।” (সূরা ৩৮; সোয়াদ ৪১)
এ কারণে যে ব্যক্তি রোগের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা, নিষ্কৃতি ও মুক্তি চায় তার জন্যে অতীব জরুরী হলো শয়তানকে নিজের মন এবং শরীর থেকে দূরে রাখা। আর আয়াতুল কুরসী'র মাধ্যমেই তা সম্ভব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তুমি যখন তোমার বিছানায় ঘুমাতে যাবে তখন আয়াতুল কুরসী পড়। তাহলে গোটা সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার উপর হেফাযতকারী থাকবে। সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান তোমার নিকট আসতে পারবে না। (সহীহ বুখারী: ৩২৭৫)
বিসমিল্লাহ-এর মর্যাদাও অনুরূপ। যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করতে আসে এবং বিসমিল্লাহ বলার মাধ্যমে প্রবেশ করে আর বিসমিল্লাহ বলে খাবার গ্রহণ করে, তখন শয়তান বলে, তোমাদের জন্যে এখানে রাত কাটানোর সুযোগ নেই এবং রাতের খাবারও নেই। এভাবেই বিসমিল্লাহ-এর বরকতে মানুষ নিজের নফস, পরিবার পরিজন এবং স্বীয় ঘরকে যাবতীয় বিপদ এবং রোগ-ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে পারবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিও না; শয়তান ঐ ঘর থেকে পালিয়ে যায়, যে ঘরে সুরাতুল বাকারা তিলাওয়াত করা হয়।” (সহীহ মুসলিম: ৭৮০১) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সূরা ইখলাছ এবং মুআউয়েযাতাইন [সূরা ফালাক ও নাস] সকাল সন্ধ্যায় তিনবার বল। তাহলে এটি তোমার সবকিছুর জন্যেই যথেষ্ট হয়ে যাবে।
ইবলিসই হচ্ছে মানুষের দুর্ভাগ্য, রোগব্যাধি এবং যাবতীয় নৈরাশ্যের মূল। যখনই মানুষ এ অভিশপ্ত শত্রু থেকে মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইবে এবং একনিষ্ঠতা, বিশ্বাস ও সততার সাথে তার ওপর তাওয়াক্কুল করবে, তখন যত্ন ও হেফাযতের দ্বারা আল্লাহর রহমত তাকে বেষ্টন করে নেবে এবং তার জন্যে সুস্থতা সহজ হয়ে যাবে। অন্তরসমূহ যখন প্রশান্তি লাভ করে, বক্ষসমূহ তখন উন্মুক্ত হয়ে যায়, আত্মসমূহ শান্ত হয়, শরীর শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সাধারণত এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, মানুষদের মধ্যে নেককার লোকেরা দৈহিক দিক থেকে সুস্থ-সবল আর চেহারার দিক থেকে উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী হয়ে থাকে।
📄 অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি কুরআনে যাকিছু নাযিল করি তা হচ্ছে ঈমানদারদের জন্যে (তাদের রোগের) উপশমকারী ও রহমত, কিন্তু এ সত্ত্বেও তা যালিমদের জন্যে ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না।” (সূরা ১৭; বনী ইসরাঈল ৮২)
এ মহিমান্বিত আয়াতে কারীমাটি নির্ধারিত করে দিচ্ছে যে, কুরআন থেকে রহমত ও সুস্থতা লাভ করবে এমন একটি দল, যে দলের সদস্যরা কুরআনপন্থী, এতে বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং কুরআনের বিধান মোতাবেক আমলকারী। কিন্তু যারা এ কুরআনের উপর ঈমান আনেনি, কিভাবে কুরআন তাদের উপকার করবে? অথচ তারা এ কুরআনকে অস্বীকার করছে বা পরিত্যাগ করেছে।
ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, কুরআনকে পরিত্যাগকারীর কয়েকটি প্রকার রয়েছে- (১) কুরআন তিলাওয়াত শোনাকে পরিহার করা, (২) এর উপর ঈমান আনয়নকে পরিহার করা এবং (৩) কুরআন দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা এবং বিচার-ফায়সালায় কুরআনের দ্বারস্থ হওয়াকে পরিহার করা।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কঠিন পাথর বৃষ্টির পানিকে গ্রহণ করে না, আর কুরআন হচ্ছে যমিনের জন্যে আসমানের পানি। কাফেরদের অন্তরসমূহকে উদাসিনতা, অস্বীকার, ঘৃণা, মুনাফেকী ও বিমুখতার দ্বারা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যদি তুমি দরজা না খোল তাহলে কিভাবে কল্যাণের দিকে আহ্বানকারী তোমার দরজার কড়া নাড়াবে? সুতরাং, যে ব্যক্তি সন্দেহ পোষণ করে যে, কুরআন তাকে সুস্থ নাও করতে পারে এবং সে কুরআনের দ্বারা চিকিৎসা করার ক্ষেত্রে দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে, সে তো আস্থাহীনতায় ভুগছে। ফলশ্রুতিতে সে তার রবের উপর কু-ধারণা করছে, কাজেই সে তো বঞ্চিত হবেই। প্রভুর দেওয়া কুরআনিক চিকিৎসা তার দৃষ্টিতে সেকেলে অথবা সন্দেহযুক্ত হলে কুরআন তাকে নিরাময় দান করবে না।
📄 আল কুরআনে আয়াতে শিফা (নিরাময়ের আয়াতসমূহ)
শায়খ আবুল কাসেম আল কুশাইরী থেকে বর্ণিত, একবার তার সন্তান মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হলো। তিনি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে স্বপ্নে দেখলেন এবং নবীজি তাকে ‘আয়াতুশ শেফা’র ব্যাপারে নির্দেশ দিলেন। কুরআনের ৬টি স্থানে সেগুলো রয়েছে:
১. وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ (সূরা ৯; তাওবা ১৪)
২. وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَরَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ (সূরা ১০; ইউনুস ৫৭)
৩. يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ (সূরা ১৬; নাহল ৬৯)
৪. وَنُنَزּِلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ (সূরা ১৭; বনী ইসরাঈল ৮২)
৫. وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ (সূরা ২৬; শুআরা ৮০)
৬. قُلْ হূয়া লিল্লাযীনা আমানূ হুদাও ওয়া শিফা (সূরা ৪১; ফুসসিলাত ৪৪)
তিনি বললেন, আমি উক্ত আয়াতগুলো একটি কাগজে লিখলাম। অতঃপর কাগজটিকে পানি দ্বারা ধৌত করলাম এবং তাকে পান করালাম। এতে সে রোগ থেকে এমনভাবে স্বস্তি লাভ করল, যেভাবে কোনো জীবজন্তুকে তার বাঁধন খুলে দিলে স্বস্তি লাভ করে।