📄 লেখক পরিচিতি
আবু ফিদা মুহাম্মাদ ইজ্জত মুহাম্মাদ আরিফ
তারজামা ইলা আল-লুগাতিল বেনগালিয়াহ: হাফিয মাহমুদ আল হাসান
মানবজীবনের প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ের মৌলিক নীতিমালা যে কুরআনে পেশ করা হয়েছে, সেখানে অবশ্যই সব রকম সুস্থতারও নিশ্চয়তা রয়েছে। আল্লাহর নেক বান্দাগণ কুরআন থেকে যেসব রোগের চিকিৎসা খুঁজে বের করেছেন, এটি তার একটি সংকলন। কুরআনের তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য নিয়ে যুগে যুগে যেমনি গবেষণা চলছে, তেমনি কুরআন থেকে চিকিৎসা গ্রহণের প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ কুরআনকে “রোগের উপশমকারী ও রহমত” হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর মানসিক ও শারীরিক এমন কোনো রোগ থাকতেই পারে না, যার নিরাময় কুরআনে নেই। প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর কর্তব্য হলো, গভীর বিশ্বাস, নেক আমল ও পবিত্র জীবনযাপনের মাধ্যমে নিজের কল্যাণ, হেফাযত ও সুস্থতার প্রয়োজনে কুরআন থেকে ফায়দা হাসিলের জন্য সচেষ্ট হওয়া।
📄 মহান আল্লাহ ছাড়া ক্ষতিকে অপসারণ করার আর কেউ নেই
নিশ্চয়ই সকল কিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা এবং একমাত্র তিনিই সবকিছু করতে সক্ষম, সবকিছুর প্রতি অনুগ্রহকারী একমাত্র তিনি। সুতরাং তিনি দয়া না করলে আর কে করবে? তিনিই আল্লাহ, যিনি তাঁর বিশাল ক্ষমতা ও রহমতে যাবতীয় বিপদ-মুসিবত অপসারণ করবেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যিনি আমাকে পয়দা করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে (অন্ধকারে) চলার পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাকে আহার্য দেন। তিনিই আমার পানীয় যোগান। আর আমি যখন রোগাক্রান্ত হই তখন তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন। তিনি আমার মৃত্যু ঘটাবেন, তিনি আমাকে আবার নতুন জীবন দেবেন। বিচারের দিন তাঁর কাছ থেকে আমি এ আশা করব যে, তিনি আমার গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন।” (সূরা ২৬; শু'আরা ৭৮-৮২)
অতএব, তাঁর শেফা ছাড়া কোনো শেফা নেই, তাঁর বিপদমুক্তি ছাড়া কোনো বিপদমুক্তি নেই এবং তাঁর শক্তি ছাড়া কোনো শক্তি নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যদি আল্লাহ তাআলা তোমাকে কোনো দুঃখ-কষ্ট দেন, তাহলে তিনি ছাড়া অন্য কেউ নেই তা দূরীভূত করার। আর তিনি যদি তোমার কোনো কল্যাণ চান, তাহলে তাঁর সে কল্যাণ রদ করারও কেউ নেই। তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যাকে চান তাকেই কল্যাণ পৌঁছান, তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা ১০; ইউনুস ১০৭)
এ কারনেই আইয়ুব (আ) যখন ইজ্জত এবং মহত্ত্বের মালিক, ক্ষমার একমাত্র অধিকারী, শেফাদানকারী, সকলের জন্যে যথেষ্ট, স্বীয় নির্দেশ এবং বিশাল ক্ষমতার দ্বারা সকল বিপদ অপসারণকারী মহান আল্লাহর নিকট চরম অসুস্থতার মুহূর্তে কায়মনোবাক্যে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আহ্বান করলেন। আল্লাহ তাআলার ভাষায়, “স্মরণ করুন! যখন আইয়ুব (আ) তাঁর মালিককে ডেকে বলেছিলেন, হে আল্লাহ আমাকে এক কঠিন অসুখ পেয়ে বসেছে, আমায় আপনি সুস্থ করে দিন, আপনিই হচ্ছেন দয়ালুদের সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।” (সূরা ২১; আম্বিয়া ৮৩)
যাবতীয় পবিত্রতা ও গুণগান আপনারই জন্যে, আপনি আমাদেরকে আপনার নিকট চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমাদেরকে তা কবুলের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম, তার যে কষ্ট ছিল তা আমি দূর করে দিলাম, তাঁকে তাঁর পরিবার-পরিজন ফিরিয়ে দিলাম, তাদের সবাইকে আমার কাছ থেকে বিশেষ দয়া এবং আমার বান্দাদের জন্যে উপদেশ হিসেবে আরো সমপরিমাণ দান করলাম।” (সূরা ২১; আম্বিয়া ৮৪)
সুতরাং, রোগীর উচিত বেশি বেশি দু'আ করা এবং কবুলের পূর্ণ আস্থা-বিশ্বাস সহকারে আল্লাহর নিকট চাওয়া যে, তিনি তাঁকে সুস্থ করবেন, রোগমুক্ত করবেন আর সে যেন আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নামগুলো দিয়ে দু'আ করে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহর রহমত তাকে ঢেকে ফেলবে এবং আল্লাহ তার ওপর থেকে বিপদ সরিয়ে দেবেন। অতএব, সকল পবিত্রতা আল্লাহর জন্যে; বনি আদম কতই না দুর্বল।
📄 আল কুরআন দ্বারা চিকিৎসা করানোর ব্যাপারে দলীল কী?
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আমি কুরআনে যা কিছু নাযিল করি তা হচ্ছে ঈমানদারদের জন্যে (তাদের রোগের) উপশমকারী ও রহমত। কিন্তু এ সত্ত্বেও তা যালিমদের জন্যে ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না।” (সূরা ১৭; বনী ইসরাঈল ৮২)
কুরআনে কারীমের এ মহান আয়াত নিয়ে যিনি গবেষণা করবেন তিনি নিশ্চিতভাবে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন যে, কুরআন নিরাময় এবং রহমত। এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এ হচ্ছে আল্লাহর সে কালাম, যার সামনের অথবা পেছনের কোনো দিক থেকেই বাতিল আসতে পারে না। সকল পবিত্রতা সে সত্তার জন্যে, যার নির্দেশ কাফ এবং নূন-এর মধ্যে নিহিত। তিনি যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান তখন বলেন, “হয়ে যাও”। আর তখনই তা হয়ে যায়। কাজেই আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়িত ও প্রতিষ্ঠিত হবে। যদি শুধু তাঁর নির্দেশের মধ্যে এমন প্রভাব থাকে তাহলে তাঁর সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ কালামের প্রভাব কেমন হবে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “অতএব, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা, এ কুরআনের এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে আর আরেক প্রান্ত তোমাদের হাতে। একে তোমরা আঁকড়ে ধর, কখনো তোমরা ধ্বংস হবে না। এরপর কখনো তোমরা পথহারা হবে না।” (আত-তারগীব ১/৭৯)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “তোমরা যাবতীয় রোগ-ব্যাধির নিরাময়ে (চিকিৎসায়) দু'টো জিনিসকে আঁকড়ে ধর- মধু ও কুরআন।” মধু সম্পর্কে যেমনটি আমরা জানি, এটি সে আল্লাহর সৃষ্টি, যিনি সবকিছু সূক্ষ্ম ও দৃঢ় করে বানিয়েছেন। তিনি মধু মক্ষিকার অন্তরে এমন অনুভূতি ঢেলে দিয়েছেন, সে যেন আল্লাহর সহজ করে দেওয়া রাস্তাসমূহে চলে হরেক রকমের ফল থেকে খাবার আহরণ করে অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে এমন মধু তৈরি করে যাতে মানুষদের জন্যে সুস্থতা রয়েছে। যদি মধুর এমন নিরাময়কারী শক্তি থাকে, তাহলে শরীর মন এবং আত্মার উপর আল্লাহর কালামের কেমন শক্তি এবং প্রভাব হতে পারে? নিঃসন্দেহে সেটি রহমত এবং সুস্থতা ছাড়া আর কিছু নয়।
ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, মানসিক ও শারীরিক, দুনিয়া এবং আখিরাতের যাবতীয় রোগ-ব্যাধির পরিপূর্ণ চিকিৎসা হচ্ছে আল-কুরআন। তবে এ থেকে নিরাময় লাভের তাওফীক সবাইকে দেওয়া হয় না। আর সবাই এর উপযুক্তও নয়। রোগী সততা, আস্থা, পরিপূর্ণ কবুল, অকাট্য বিশ্বাস এবং এর যাবতীয় শর্ত পূরণের মাধ্যমে যদি এ কুরআনকে উত্তমভাবে তার রোগের উপর প্রয়োগ করে তাহলে কোনো ব্যাধিই কখনো এর মোকাবিলা করতে পারবে না। যাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবের বুঝ দান করেছেন, সে-ই কেবল এ থেকে সার্বিক সুস্থতা লাভ করে ধন্য হয়। কুরআন যাকে নিরাময় করবে না, আল্লাহও তাকে নিরাময় করবে না। আর যার জন্যে কুরআন যথেষ্ট নয়, আল্লাহও তার জন্যে যথেষ্ট হবেন না।
📄 রোগ থেকে বেঁচে থাকা চিকিৎসার চেয়ে উত্তম
সব ধরনের না হলেও অনেক ব্যাধিই শয়তানের কারণে হয়ে থাকে, কেননা শয়তানই হচ্ছে অনিষ্টতার অগ্নিগর্ভ আর ফাসাদের কূপ। যে সকল রোগের মূল কারণ শয়তান, তার মধ্যে কিছু রয়েছে মানসিক, যেমন: মৃগী রোগ, হিংসা, যাদু। আর কিছু রয়েছে দৈহিক। যেমন: প্যারালাইসিস, শ্বেত বিক্ষিপ্ত শুভ্রতা, ফোঁড়া, মস্তিষ্ক বিকৃতি, এইডস ইত্যাদি। যদিও বাহ্যিকভাবে এগুলো রোগজীবাণু ভাইরাস-এর সংক্রমণে হয়ে থাকে। তবে তার গোড়াতে রয়েছে শয়তান, সে-ই মূলত এ জাতীয় বিষাক্ত জীবাণু ছড়িয়ে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “(হে নবী!) আপনি আমার বান্দা আইয়ুবের কথা স্মরণ করুন। যখন সে তার মালিককে ডেকে বলেছিলো (হে আল্লাহ), শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলে দিয়েছে।” (সূরা ৩৮; সোয়াদ ৪১)
এ কারণে যে ব্যক্তি রোগের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা, নিষ্কৃতি ও মুক্তি চায় তার জন্যে অতীব জরুরী হলো শয়তানকে নিজের মন এবং শরীর থেকে দূরে রাখা। আর আয়াতুল কুরসী'র মাধ্যমেই তা সম্ভব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তুমি যখন তোমার বিছানায় ঘুমাতে যাবে তখন আয়াতুল কুরসী পড়। তাহলে গোটা সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার উপর হেফাযতকারী থাকবে। সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান তোমার নিকট আসতে পারবে না। (সহীহ বুখারী: ৩২৭৫)
বিসমিল্লাহ-এর মর্যাদাও অনুরূপ। যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করতে আসে এবং বিসমিল্লাহ বলার মাধ্যমে প্রবেশ করে আর বিসমিল্লাহ বলে খাবার গ্রহণ করে, তখন শয়তান বলে, তোমাদের জন্যে এখানে রাত কাটানোর সুযোগ নেই এবং রাতের খাবারও নেই। এভাবেই বিসমিল্লাহ-এর বরকতে মানুষ নিজের নফস, পরিবার পরিজন এবং স্বীয় ঘরকে যাবতীয় বিপদ এবং রোগ-ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে পারবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিও না; শয়তান ঐ ঘর থেকে পালিয়ে যায়, যে ঘরে সুরাতুল বাকারা তিলাওয়াত করা হয়।” (সহীহ মুসলিম: ৭৮০১) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সূরা ইখলাছ এবং মুআউয়েযাতাইন [সূরা ফালাক ও নাস] সকাল সন্ধ্যায় তিনবার বল। তাহলে এটি তোমার সবকিছুর জন্যেই যথেষ্ট হয়ে যাবে।
ইবলিসই হচ্ছে মানুষের দুর্ভাগ্য, রোগব্যাধি এবং যাবতীয় নৈরাশ্যের মূল। যখনই মানুষ এ অভিশপ্ত শত্রু থেকে মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইবে এবং একনিষ্ঠতা, বিশ্বাস ও সততার সাথে তার ওপর তাওয়াক্কুল করবে, তখন যত্ন ও হেফাযতের দ্বারা আল্লাহর রহমত তাকে বেষ্টন করে নেবে এবং তার জন্যে সুস্থতা সহজ হয়ে যাবে। অন্তরসমূহ যখন প্রশান্তি লাভ করে, বক্ষসমূহ তখন উন্মুক্ত হয়ে যায়, আত্মসমূহ শান্ত হয়, শরীর শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সাধারণত এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, মানুষদের মধ্যে নেককার লোকেরা দৈহিক দিক থেকে সুস্থ-সবল আর চেহারার দিক থেকে উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী হয়ে থাকে।