📄 ধন্যবাদ, প্রিয় শত্রু
নিশ্চয়ই সকল কিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা এবং একমাত্র তিনিই সবকিছু করতে সক্ষম, সবকিছুর প্রতি অনুগ্রহকারী একমাত্র তিনি। সুতরাং তিনি দয়া না করলে আর কে করবে? তিনিই আল্লাহ, যিনি তাঁর বিশাল ক্ষমতা ও রহমতে যাবতীয় বিপদ-মুসিবত অপসারণ করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ ﴿ وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَ يَসْقِينِ إِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِيْنِ ﴿ وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ ﴿ وَالَّذِي اطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي খাটীঅতী ইয়োমাদ দীন
“যিনি আমাকে পয়দা করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে (অন্ধকারে) চলার পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমাকে আহার্য দেন। তিনিই আমার পানীয় যোগান। আর আমি যখন রোগাক্রান্ত হই তখন তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন। তিনি আমার মৃত্যু ঘটাবেন, তিনি আমাকে আবার নতুন জীবন দেবেন। বিচারের দিন তাঁর কাছ থেকে আমি এ আশা করব যে, তিনি আমার গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন।” (সূরা ২৬; শু'আরা ৭৮-৮২)
অতএব, তাঁর শেফা ছাড়া কোনো শেফা নেই, তাঁর বিপদমুক্তি ছাড়া কোনো বিপদমুক্তি নেই এবং তাঁর শক্তি ছাড়া কোনো শক্তি নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যদি আল্লাহ তাআলা তোমাকে কোনো দুঃখ-কষ্ট দেন, তাহলে তিনি ছাড়া অন্য কেউ নেই তা দূরীভূত করার। আর তিনি যদি তোমার কোনো কল্যাণ চান, তাহলে তাঁর সে কল্যাণ রদ করারও কেউ নেই। তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যাকে চান তাকেই কল্যাণ পৌঁছান, তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা ১০; ইউনুস ১০৭)
এ কারনেই আইয়ুব (আ) যখন ইজ্জত এবং মহত্ত্বের মালিক, ক্ষমার একমাত্র অধিকারী, শেফাদানকারী, সকলের জন্যে যথেষ্ট, স্বীয় নির্দেশ এবং বিশাল ক্ষমতার দ্বারা সকল বিপদ অপসারণকারী মহান আল্লাহর নিকট চরম অসুস্থতার মুহূর্তে কায়মনোবাক্যে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আহ্বান করলেন। আল্লাহ তাআলার ভাষায়,
وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّةَ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّحِمِينَ
“স্মরণ করুন! যখন আইয়ুব (আ) তাঁর মালিককে ডেকে বলেছিলেন, হে আল্লাহ আমাকে এক কঠিন অসুখ পেয়ে বসেছে, আমায় আপনি সুস্থ করে দিন, আপনিই হচ্ছেন দয়ালুদের সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।” (সূরা ২১; আম্বিয়া ৮৩)
যাবতীয় পবিত্রতা ও গুণগান আপনারই জন্যে, আপনি আমাদেরকে আপনার নিকট চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমাদেরকে তা কবুলের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম, তার যে কষ্ট ছিল তা আমি দূর করে দিলাম, তাঁকে তাঁর পরিবার-পরিজন ফিরিয়ে দিলাম, তাদের সবাইকে আমার কাছ থেকে বিশেষ দয়া এবং আমার বান্দাদের জন্যে উপদেশ হিসেবে আরো সমপরিমাণ দান করলাম।” (সূরা ২১; আম্বিয়া ৮৪)
সুতরাং, রোগীর উচিত বেশি বেশি দু'আ করা এবং কবুলের পূর্ণ আস্থা-বিশ্বাস সহকারে আল্লাহর নিকট চাওয়া যে, তিনি তাঁকে সুস্থ করবেন, রোগমুক্ত করবেন আর সে যেন আল্লাহর সুন্দর নামগুলো দিয়ে দু'আ করে।
📄 “বাহাসে নামেন না কেন?”
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আমি কুরআনে যা কিছু নাযিল করি তা হচ্ছে ঈমানদারদের জন্যে (তাদের রোগের) উপশমকারী ও রহমত। কিন্তু এ সত্ত্বেও তা যালিমদের জন্যে ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না।” (সূরা ১৭; বনী ইসরাঈল ৮২)
কুরআনে কারীমের এ মহান আয়াত নিয়ে যিনি গবেষণা করবেন তিনি নিশ্চিতভাবে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন যে, কুরআন নিরাময় এবং রহমত। এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এ হচ্ছে আল্লাহর সে কালাম, যার সামনের অথবা পেছনের কোনো দিক থেকেই বাতিল আসতে পারে না। সকল পবিত্রতা সে সত্তার জন্যে, যার নির্দেশ কাফ এবং নূন-এর মধ্যে নিহিত। তিনি যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান তখন বলেন, "কুন" হয়ে যাও। আর তখনই তা হয়ে যায়। কাজেই আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়িত ও প্রতিষ্ঠিত হবে; আর তা "কুন" শব্দের মধ্যে। যদি শুধু তাঁর "কুন" শব্দের মধ্যে এমন প্রভাব থাকে তাহলে তাঁর সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ কালামের প্রভাব কেমন হবে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “অতএব, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা, এ কুরআনের এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে আর আরেক প্রান্ত তোমাদের হাতে। একে তোমরা আঁকড়ে ধর, কখনো তোমরা ধ্বংস হবে না। এরপর কখনো তোমরা পথহারা হবে না।” (আত-তারগীব ১/৭৯)
আর ইবনে মাসউদের হাদীস, যা ইবনে মাজাহ ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “তোমরা যাবতীয় রোগ-ব্যাধির নিরাময়ে (চিকিৎসায়) দু'টো জিনিসকে আঁকড়ে ধর— মধু ও কুরআন।” আর মধু সম্পর্কে যেমনটি আমরা জানি, এটি সে আল্লাহর সৃষ্টি, যিনি সবকিছু সূক্ষ্ম ও দৃঢ় করে বানিয়েছেন। যদি মধু, যা একটা সময়ের পর নষ্ট হয়ে যায় তার এমন নিরাময়কারী শক্তি থাকে, তাহলে শরীর মন এবং আত্মার উপর আল্লাহর কালামের কেমন শক্তি এবং প্রভাব হতে পারে? নিঃসন্দেহে সেটি রহমত এবং সুস্থতা ছাড়া আর কিছু নয়।
যেমনটি ইবনুল কাইয়্যেম আল যাউজিয়্যাহ তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আত-তিববুন নববী-তে বলেছেন, 'স্রষ্টাপ্রদত্ত আর মানবীয় চিকিৎসা, দৈহিক আর আত্মীক চিকিৎসা এবং আসমানী আর যমিনী চিকিৎসাকে একত্রিত করা হয়েছে এ হাদীসে। মানুষ যদি কুরআন এবং মধুর দ্বারা চিকিৎসা করে তাহলে সে দু'শক্তিকে একত্রিত করলো, আসমানী শক্তি আর যমিনী শক্তি। যাকে কুরআন সুস্থ করে না, তাকে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সুস্থ করতে পারবে না।
📄 ধন্যবাদ, হে আবু বকর ও উমর!
সব ধরনের না হলেও অনেক ব্যাধিই শয়তানের কারণে হয়ে থাকে, কেননা শয়তানই হচ্ছে অনিষ্টতার অগ্নিগর্ভ আর ফাসাদের কূপ। যে সকল রোগের মূল কারণ শয়তান, তার মধ্যে কিছু রয়েছে মানসিক, যেমন: মৃগী রোগ, হিংসা, যাদু। আর কিছু রয়েছে দৈহিক। যেমন: প্যারালাইসিস, শ্বেত বিক্ষিপ্ত শুভ্রতা, ফোঁড়া, মস্তিষ্ক বিকৃতি ইত্যাদি। যদিও বাহ্যিকভাবে এগুলো রোগজীবাণু ভাইরাসের সংক্রমণে হয়ে থাকে, তবে তার গোড়াতে রয়েছে শয়তান, সে-ই মূলত এ জাতীয় বিষাক্ত জীবাণু ছড়িয়ে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “(হে নবী!) আপনি আমার বান্দা আইয়ুবের কথা স্মরণ করুন। যখন সে তার মালিককে ডেকে বলেছিলো (হে আল্লাহ), শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলে দিয়েছে।” (সূরা ৩৮; সোয়াদ ৪১)
এ কারণে যে ব্যক্তি রোগের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা, নিষ্কৃতি ও মুক্তি চায় তার জন্যে অতীব জরুরী হলো শয়তানকে নিজের মন এবং শরীর থেকে দূরে রাখা। আর আয়াতুল কুরসী'র মাধ্যমেই তা সম্ভব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তুমি যখন তোমার বিছানায় ঘুমাতে যাবে তখন আয়াতুল কুরসী পড়। তাহলে গোটা সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার উপর হেফাযতকারী থাকবে। সকাল পর্যন্ত কোনো শয়তান তোমার নিকট আসতে পারবে না। (সহীহ বুখারী: ৩২৭৫)
বিসমিল্লাহ-এর মর্যাদাও অনুরূপ। যাবের (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন কোনো ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করতে আসে এবং বিসমিল্লাহ বলার মাধ্যমে প্রবেশ করে আর বিসমিল্লাহ বলে খাবার গ্রহণ করে, তখন শয়তান তার দলবলকে বলে, তোমাদের জন্যে এখানে রাত কাটানোর সুযোগ নেই এবং রাতের খাবারও নেই। এভাবেই বিসমিল্লাহ-এর বরকতে মানুষ নিজের নফস, পরিবার পরিজন এবং স্বীয় ঘরকে যাবতীয় বিপদ এবং রোগ-ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে পারবে।
📄 ভাই ইবনু জিবরিনের চিঠি
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি কুরআনে যা কিছু নাযিল করি তা হচ্ছে ঈমানদারদের জন্যে (তাদের রোগের) উপশমকারী ও রহমত, কিন্তু এ সত্ত্বেও তা যালিমদের জন্যে ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না।” (সূরা ১৭; বনী ইসরাঈল ৮২)
এ মহিমান্বিত আয়াতে কারীমাটি নির্ধারিত করে দিচ্ছে যে, কুরআন থেকে রহমত ও সুস্থতা লাভ করবে এমন একটি দল, যে দলের সদস্যরা কুরআনপন্থী, এতে বিশ্বাস স্থাপনকারী এবং কুরআনের বিধান মোতাবেক আমলকারী। কিন্তু যারা এ কুরআনের উপর ঈমান আনেনি, কিভাবে কুরআন তাদের উপকার করবে? ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, কুরআনকে পরিত্যাগকারীর কয়েকটি প্রকার রয়েছে— (১) কুরআন তিলাওয়াত শোনাকে পরিহার করা, (২) এর উপর ঈমান আনয়নকে পরিহার করা এবং (৩) কুরআন দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা এবং বিচার-ফায়সালায় কুরআনের দ্বারস্থ হওয়াকে পরিহার করা।
সুতরাং, যে ব্যক্তি সন্দেহ পোষণ করে যে, কুরআন তাকে সুস্থ নাও করতে পারে এবং সে কুরআনের দ্বারা চিকিৎসা করার ক্ষেত্রে দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে, সে তো আস্থাহীনতায় ভুগছে। ফলশ্রুতিতে সে তার রবের উপর কু-ধারণা করছে, কাজেই সে তো বঞ্চিত হবেই। প্রভুর দেওয়া কুরআনিক চিকিৎসা তার দৃষ্টিতে সেকেলে অথবা সন্দেহযুক্ত হলে সে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত নয়। কাজেই কুরআন তাকে নিরাময় দান করবে না।