📘 কুরআন বোঝার পথ ও পাথেয় > 📄 সীরাত ও সুন্নাহ দ্বারা কুরআন বুঝার উদাহরণ

📄 সীরাত ও সুন্নাহ দ্বারা কুরআন বুঝার উদাহরণ


• কুরআন মজিদে 'আকিমুস সালাত' বলে সালাত কায়েম করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সালাত আদায়ের নিয়ম-পদ্ধতি, শর্ত-শরায়েত, আরকান আহকাম এবং সালাতে করণীয় ও বর্জনীয়, রাকাত সংখ্যা, রুকু ও সাজদা সংখ্যা, সালাত নষ্ট হবার কারণ সমূহ বলা হয়নি। ফলে শুধুমাত্র কুরআনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দ্বারা সঠিক নিয়মে সালাত আদায় করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। এ কারণে রসূল সা. বলেছেন :

صَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي
'তোমরা ঠিক সেভাবে সালাত আদায় করো, যেভাবে আদায় করতে দেখছো আমাকে।' (সহীহ্ বুখারি)

তাই, রসূলের সুন্নাহ ছাড়া সালাত আদায় করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

• একইভাবে কুরআন মজিদে বলা হয়েছে : 'ওয়া আ-তুয যাকাত'- যাকাত প্রদান করো। কিন্তু যাকাতের মালের বিবরণ, নেসাব, কোন্ মালে কি হারে যাকাত দিতে হবে, যাকাতের অর্থের সময়কালের কথা কুরআনে বলা হয়নি। কুরআনে কেবল অর্থ সম্পদ ও ফল ফসলের যাকাত দিতে এবং যাকাত ব্যয়ের খাত উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যাকাতের নিয়ম পদ্ধতি, শর্ত শরায়েত জানার জন্যে অবশ্যই সুন্নতে রসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

• রসূল সা. কুরআনের অতিরিক্ত আইন প্রণয়ন করেছেন। যেমন কুরআন একজন পুরুষের জন্যে রক্ত সম্পর্ক, দুধপান ও আদর্শিক কারণে বিভিন্ন শ্রেণীর নারীকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু হাদিস থেকে জানা যায়, রসূল সা. ফুফু এবং ভ্রাতৃ কন্যাকে, খালা এবং বোনের কন্যাকে একত্রে বিয়ে করতে (স্ত্রী বানাতে) নিষিদ্ধ করেছেন। কুরআনে নিষিদ্ধ করা হয়নি, কিন্তু রসূল সা. গৃহপালিত গাধা এবং নখর সম্পন্ন হিংস্র পশু-পাখি খাওয়া হারাম করেছেন।

• কোনো আয়াতের বা শব্দের ব্যাখ্যা বুঝতে না পারলে, কিংবা কঠিন মনে হলে, কিংবা কোনো প্রশ্ন সৃষ্টি হলে সাহাবীগণ রসূল সা. কে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। তখন তিনি সেটির সঠিক মর্ম বা ব্যাখ্যা বলে দিতেন। যেমন নিম্নোক্ত আয়াতটি :

الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيْمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ

অর্থ: নিরাপত্তা তো কেবল তাদের জন্যে এবং সত্য-সরল পথে কেবল তারাই পরিচালিত, যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের ঈমানে যুলুম-এর সংমিশ্রণ ঘটায়নি।' (সূরা ৬ আন'আম : আয়াত ৮২)

এ আয়াতটি খুব কঠিন মনে করে সাহাবীগণ তা নিয়ে রসূল সা.-এর সাথে কথা বলেন। তারা তাঁকে বলেন: 'আমাদের মধ্যে কে আছে, যে যুলুম করে না?' তখন তিনি বলেন: এর অর্থ তোমরা যা বুঝেছো তা নয়, এখানে যুলুম-এর অর্থ 'শিরক'। তোমরা কুরআনে দেখো (সূরা ৩১ লোকমান: আয়াত ১৩) আল্লাহ তাঁর এক দাসের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন:

إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
অর্থ: নিশ্চয়ই শিরক এক বিরাট যুলুম।' (সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম)

• সূরা আল কাউছারে বলা হয়েছে: 'আমরা তোমাকে কাউছার দিয়েছি।' কিন্তু সাহাবীগণ 'কাউছার' কি জিনিস তা বুঝতে পারেননি। তখন রসূল সা. তাদের বলে দিলেন:

الْكَوْثَرُ نَهْرٌ أَعْطَانِيهِ رَبِّي فِي الْجَنَّةِ
কাউছার একটি নদী/ নির্ঝরণী, আমার প্রভু জান্নাতে এটি আমাকে দান করেছেন। (সূত্র: সহীহ মুসলিম, মুসনাদে আহমদ)

• 'খায়রা উম্মাতিন' মানে কি? রসূল সা. খায়রা উম্মাতিন সম্পর্কে সাহাবীগণের জিজ্ঞাসার ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিম্নরূপ:

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ قَالَ خَيْرُ اللنَّاسِ لِلنَّاسِ يَأْتُونَ بِهِمْ فِي السَّلاسِلِ فِي أَعْنَا قِهِ حَتَّى يَنْ خُلُونَ فِي الإِسْلَامِ

অর্থ: তোমরা খায়রা উম্মাত, মানুষের উপকার ও কল্যাণের জন্যে তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে'-এ আয়াতের ব্যাখ্যায় রসূল সা. বলেছেন: মানুষের জন্যে উপকারি মানুষ হলো তারা, যারা মানুষের গলায় শিকল পরিয়ে নিয়ে আসে, অবশেষে তারা ইসলামে প্রবেশ করে। (সহীহ বুখারি, হাদিস ৪১৯৬, কিতাবুত তাফসীর)

• বাস্তব জীবনেও রসূল সা. ছিলেন কুরআনের পূর্ণ অনুসারী। কুরআন মজিদে তাঁকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে:

خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
অর্থ: ক্ষমা করার পথ গ্রহণ করো, ভালো ও কল্যাণের আদেশ করো এবং অজ্ঞদের (প্রতিশোধ না নিয়ে) এড়িয়ে চলো, over look করো।' (সূরা ৭ আল আরাফ: আয়াত ১৯৯)

রসূলুল্লাহ সা.-এর বাস্তব জীবন ছিলো এ নির্দেশেরই প্রতিচ্ছবি, বাস্তব রূপায়ন।
- তিনি সব সময় সকলের সাথে কোমল আচরণ করতেন।
- তিনি সবাইকে ক্ষমা করে দিতেন।
- নিকৃষ্ট শত্রুর কাছ থেকেও তিনি প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।
- তিনি সকলের কল্যাণ কামনা করতেন, কারো অমঙ্গল কামনা করেননি।

মক্কা বিজয়ের পর তিনি তাঁকে নির্যাতনকারী, তাঁকে ঘরবাড়ি থেকে উৎখাতকারী, তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী, তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী লোকদের তিনি ক্ষমা করে দেন। তিনি তাদের বলেন:

لاَ تَثْرِيْبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ
'আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই।'

মদিনার জীবনে রসূল সা. কে সবচেয়ে বেশি জ্বালাতন করেছে এবং ষড়যন্ত্র করেছে মুনাফিকরা। এই মুনাফিকদের নেতা ছিলো আবদুল্লাহ ইবনে উবাই। মৃত্যুর সময় সে তার ছেলে আবদুল্লাহ রা.-কে অসিয়ত করে যায় এবং সে অনুযায়ী তার মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ রসূল সা.-এর কাছে এসে আরয করে: হে আল্লাহর রসূল! আমার পিতার মৃত্যু হয়েছে। তিনি মৃত্যুর সময় অসিয়ত করে গেছেন- আপনি যেনো তার জানাযা পড়ান এবং আপনার পরিধানের জামা চেয়ে নিয়ে যেনো তার কাফনের কাপড় হিসেবে ব্যবহার করি। একথা শুনে রসূল সা. সাথে সাথে তাঁর জামাটি দিয়ে দেন এবং গিয়ে তার জানাযা পড়ান এবং তার কবরে দাঁড়িয়ে তার জন্যে দোয়া করেন। এ প্রেক্ষিতেই আল্লাহ নাযিল করেন:

وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ
অর্থ: এদের কারো মৃত্যু হলে তুমি তার জানাযা পড়বেনা এবং তার কবরের পাশেও দাঁড়াবেনা। (সূরা ৯ তওবা: আয়াত ৮৪)

اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ ط إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ
অর্থ: তুমি তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করো আর ক্ষমা প্রার্থনা না-ই করো একই কথা, এমনকি তুমি সত্তর বার ক্ষমা প্রার্থনা করলেও আল্লাহ কিছুতেই তাদের ক্ষমা করবেন না। (সূরা ৯ আত তওবা: আয়াত ৮০)

এরপর রসূল সা. আর কোনো মুনাফিকের জানাযা পড়েননি। আল কুরআন একথার স্বীকৃতিও দিয়েছে যে, তিনি ছিলেন পরম দয়ালু, ক্ষমাশীল, কোমল হৃদয়ের অধিকারী:

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ
অর্থ: এটা আল্লাহরই অনুগ্রহ যে, তুমি তাদের প্রতি কোমল। (সূরা ৩ আলে ইমরান : আয়াত ১৫৯)

لَقَدْ جَاءَ كُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْফُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيم
অর্থ: দেখো, তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রসূল। তোমাদের ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া তার জন্যে কষ্ট দায়ক। সে তোমাদের কল্যাণকামী। মুমিনদের প্রতি সে কোমল, স্নেহশীল ও করুণাসিক্ত। (সূরা ৯ আত তাওবা: আয়াত ১২৮)

এ বিষয়গুলো থেকে প্রমাণ হয় রসূল সা.-এর জীবন পদ্ধতি ছিলো কুরআনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

মোটকথা, কুরআন বুঝতে হলে মুহাম্মদ সা.-এর জীবন পদ্ধতি, জীবনাদর্শ তথা তাঁর সীরাত ও সুন্নাহ সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। রসূলের সীরাত ও সুন্নাহ বুঝতে পারলে কুরআন বুঝতে আর কোনো অসুবিধা থাকে না।

টিকাঃ
* এটি ১৮ এপ্রিল ২০০৮ তারিখে রাজধানীর বিয়াম অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত ১১তম কুরআন ভিত্তিক টট্ ক্লাসে উপস্থাপিত লেখকের বক্তব্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00