📘 কুরআন বোঝার পথ ও পাথেয় > 📄 কুরআন দ্বারা কুরআন ব্যাখ্যার উদাহরণ

📄 কুরআন দ্বারা কুরআন ব্যাখ্যার উদাহরণ


কুরআনে বর্ণিত সংক্ষিপ্ত ও সারকথা সম্বলিত শব্দ এবং আয়াতগুলো একই প্রসঙ্গের বিস্তারিত ও ব্যাখ্যামূলক আয়াত দ্বারা বুঝা ও ব্যাখ্যা করাকে বলা হয় 'কুরআন দ্বারা কুরআন বুঝা এবং কুরআন দ্বারা কুরআনের তফসির (ব্যাখ্যা) করা। এই একই কথা বলেছেন ইবনে জারির তাবারি, ইবনে কাসির, ইবনে তাইমিয়া এবং অন্যান্য মুফাসসির এবং উসূলুত তাফসির প্রণেতাগণ। এর উদাহরণ রয়েছে কুরআনে ব্যাপক। কয়েকটি উদাহরণ এখানে উপস্থাপন করা হলো:

• সূরা বাকারার শুরুতেই সাফল্য লাভকারীদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে:
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ 'যারা গায়েব-এর প্রতি ঈমান আনবে........।' (সূরা ২ বাকারা: আয়াত ৩)
এটি ঈমানের বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ সারকথা। এ ধরণের সংক্ষিপ্ত কথা কুরআনে বার বার এসেছে। যেমন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا 'নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে........।' (সূরা ৯৮ আল বাইয়্যেনা: আয়াত ৭)
إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا 'তবে যারা ঈমান এনেছে.......।' (সূরা ১০৩ আল আসর: আয়াত ৩)
'ঈমান আনা' বা 'গায়েব এর প্রতি ঈমান আনা' বলতে কিসের এবং কোন্ কোন্ বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা বুঝায় তা এসব আয়াতে বলা হয়নি। কিন্তু এর ব্যাখ্যা কুরআনেই আছে অন্যান্য আয়াতে। যেমন:
وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ ، وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
অর্থ: আর যারা ঈমান আনবে যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে তার প্রতি এবং যা তোমার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে সেগুলোর প্রতি, আর একীন রাখবে আখিরাতের প্রতি।' (সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ৪)
وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَئِكَةِ وَالْكِتُبِ وَالنَّبِيِّنَ
অর্থ: বরং সত্য-ন্যায়ের পথ হলো ঐ ব্যক্তির পথ, যে ঈমান আনে আল্লাহর প্রতি, শেষ দিনের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আল কিতাবের প্রতি এবং নবীদের প্রতি.......।' (সূরা ২ বাকারা: আয়াত ১৭৭)

• সূরা বাকারায় আদম আ. এর ভুল করার পর তাঁর তওবা করা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَّبِّهِ كَلِمَةً فَتَابَ عَلَيْهِ
অর্থ : অতএব আদম প্রাপ্ত হলো তার প্রভুর পক্ষ থেকে কয়েকটি কথা, এর ফলে কবুল করা হয় তার তওবা ............।' (সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ৩৭)
ক্ষমা চাওয়া এবং তওবা কবুল করার জন্যে আদম আলাইহিস সালামকে কী কথা আল্লাহ শিখিয়ে দিয়েছেন, তা এ আয়াতে উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু এর ব্যাখ্যা আছে সূরা আ'রাফে। সেখানে বলা হয়েছে:
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْلَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَسِرِينَ
অর্থ: তারা উভয়ে বলে উঠলো 'আমাদের প্রভু! আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করে ফেলেছি, এখন তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন না করো, তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বো।” (সূরা ৭ আল আরাফ: আয়াত ২৩)

• সূরা ৮৩ আল মুতাফফিফীনের ১ম আয়াতে বলা হয়েছে: وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ অর্থ: 'ধ্বংস মুতাফফিফীনদের জন্যে।'
'এখানে 'মুতাফফিফীন' কথাটি কঠিন এবং ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। কিন্তু একই সূরার ২য় এবং ৩য় আয়াতে এর ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। বলা হয়েছে:
الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ وَإِذَا كَالُوا هُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ
অর্থ: (মুতাফফিফীন হলো তারা) যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণ পরিমাণ দাবি করে। কিন্তু মানুষকে মেপে বা ওজন করে দেয়ার সময় প্রাপ্যের চাইতে কম দেয়।' (সূরা ৮৩ আল মুতাফফিফীন : আয়াত ২-৩)

• ব্যাখ্যা সাপেক্ষ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যেসব স্থানে, সেসব স্থানে বা অন্যত্র সেগুলোর ব্যাখ্যা দিয়ে দেয়া হয়েছে। এর বিপুল উদাহরণ রয়েছে কুরআনে। সূরা ১০১ আল কারি'আয় বলা হয়েছে: الْقَارِعَةُ مَا الْقَارِعَةً وَمَا أَدْرَكَ مَا الْقَارِعَةُ অর্থ: মহাপ্রলয়! কী সেই মহাপ্রলয়? তুমি কী করে জানবে সেই মহাপ্রলয় কী?' কিন্তু পরের আয়াত থেকেই 'আল কারি'আর' ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে:
يَوْمَ يَكُونُ النَّاسُ كَالْفَرَاشِ الْمَبْثُوثِ وَتَكُونُ الْجِبَالُ كَالْعِهْنِ الْمَنْفُوشِ
অর্থ: যেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো আর পাহাড়-পর্বত হবে ধূনা রঙিন পশমের মতো। (আয়াত ৪-৫)

• আরেকটি উদাহরণ হলো সূরা ১০৪ আল হুমাযায় : وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ অর্থ: ধ্বংস প্রত্যেক হুমাযা লুমাযার জন্যে।' ব্যাখ্যা সাপেক্ষ হুমাযা লুমাযার ব্যাখ্যা এর পরেই দেয়া হয়েছে:
الَّذِي جَمَعَ مَالاً وَعَدَّدَهُ يَحْسَبُ أَنَّ مَالَهُ أَخْلَد
অর্থ: (হুমাযা লুমাযা হলো সে,) যে অর্থ সম্পদ পুঞ্জীভূত করে এবং বার বার হিসাব করে। সে মনে করে তার অর্থ সম্পদ তাকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখবে।' (আয়াত ২-৩)
সুতরাং 'আল কারি'আ' এবং 'হুমাযা লুমাযার' ব্যাখ্যা কুরআন থেকেই বুঝতে হবে।

• সূরা বাকারার ২২৮ আয়াতে বলা হয়েছে: وَالْمُطَلَّقْتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَثَةَ قُرُوءٍ অর্থ: তালাক প্রাপ্ত নারীরা (পরবর্তী বিয়ের জন্যে) নিজেদেরকে তিন মাসিক কাল বিরত রাখবে।” কিন্তু অন্য একটি আয়াতে এই সাধারণ বিধির একটি ব্যতিক্রম অবকাশ রাখা হয়েছে:
إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ
অর্থ: তোমরা মুমিন নারীদের বিয়ে করার পর 'স্পর্শ' করার আগেই যদি তালাক দাও, তবে তোমাদের জন্যে তাদের কোনো ইদ্দত পালন করতে হবে না। (সূরা ৩৩ আহযাব: আয়াত ৪৯)

• সূরা বাকারার ২৩৪ আয়াতে বলা হয়েছে: وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْনَ مِنْكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُসِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا
অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে ওফাত লাভ করবে, তারা (সেই বিধবারা) যেনো নিজেদেরকে (পরবর্তী বিয়ে থেকে) চারমাস দশদিন বিরত রাখে।' (সূরা ২ বাকারা: আয়াত ২৩৪)
কিন্তু সূরা তালাকের ৪র্থ আয়াতে এই সাধারণ বিধির বাইরে রাখা হয়েছে গর্ভবতী নারীদের। বলা হয়েছে: وأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ
অর্থ: আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল হলো গর্ভপ্রসব করা পর্যন্ত।' (সূরা ৬৫ আত্ তালাক: আয়াত ৪)

• সূরা আল মায়েদার ১ম আয়াতে বলা হয়েছে: أُحِلَّتْ لَكُمْ بَهِيمَةُ الأَنْعَامِ إِلَّا مَا يُতْلَى عَلَيْكُمْ . অর্থ: হালাল করা হলো তোমাদের জন্যে গবাদি পশু সেগুলো ছাড়া, যেগুলোর কথা বলে দেয়া হবে।' (সূরা ৫ মায়েদা: আয়াত ১)
এছাড়াও সূরা ৬ আল আন'আমের ১৪৫ আয়াতে বলা হয়েছে: قُلْ لا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَى مُحَرَّمًا عَلَى طَاعِمٍ يَطْعَمَهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنْزِيرٍ
অর্থ: বলো: আমার কাছে প্রেরিত অহিতে আহারকারীর আহারের মধ্যে আমি কিছুই হারাম পাই না মৃত (প্রাণী), প্রবাহিত রক্ত এবং শুয়োরের গোশত ছাড়া। এগুলো অবশ্যই অপবিত্র....।' (সূরা ৬ আন'আম : আয়াত ১৪৫)
এ দুটো আয়াত বুঝতে হলে অবশ্যই সূরা ২ আল বাকারার ১৭৩ আয়াত এবং সূরা ৫ আল মায়েদার ৩য় আয়াত একত্র করে বুঝতে এবং ব্যাখ্যা করতে হবে। সে আয়াতগুলো হলো:
إِنَّمَا حَرَّمَ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন মৃত (প্রাণী), রক্ত, শুয়োরের গোশত এবং যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে যবেহ (উৎসর্গ) করা হয়েছে।' (সূরা ২ বাকারা: আয়াত ১৭৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّমُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ قف وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصْبِ
অর্থ: তোমাদের জন্যে হারাম করে দেয়া হলো মৃত (প্রাণী), রক্ত, শুয়োরের গোশত, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে যবেহ (উৎসর্গ) করা পশু, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরা পশু, আঘাতে মৃত পশু, উপর থেকে পড়ে মরা পশু, শিংয়ের গুঁতায় মরা পশু, হিংস্র জানোয়ার কর্তৃক ছিন্ন ভিন্ন করা পশু তবে জ্যান্ত পেয়ে যবেহ করতে পারলে ভিন্ন কথা এবং আস্তানা বা পূজার বেদীতে যবেহ করা পশু......।' (সূরা ৫ আল মায়েদা : আয়াত ৩)

• মদ এবং মাদক সম্পর্কে এককভাবে সূরা বাকারায় বর্ণিত আয়াতটি পড়লে এ সম্পর্কে কুরআনের বিধান জানা সম্ভব নয়। আয়াতটি হলো:
يَسْتَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ ، قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَاثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَّفْعِهِمَا
অর্থ: তারা তোমার কাছে জানতে চাইছে মদ এবং জুয়া সম্পর্কে। তুমি বলো, এগুলোতে আছে কবিরা গুনাহ এবং মানুষের জন্যে কল্যাণ। তবে সেগুলোর কল্যাণের চাইতে পাপটা বড়। (সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ২১৯)
এ প্রসঙ্গে এর পরে অবতীর্ণ সূরা নিসার আয়াতটি থেকেও সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। সেটি হলো:
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلوةَ وَأَنْتُمْ سُكْرَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ
অর্থ: হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না, যতোক্ষণ না তোমরা যা বলো তা বুঝতে পারো।' (সূরা ৪ নিসা: ৪৩)
মূলত মদ, মাদকতা ও নেশাদ্রব্য সম্পর্কে কুরআনের বিধান বুঝতে হলে এ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ সর্বশেষ আয়াতটিও এ সাথে মিলিয়ে পড়তে হবে। তিনটি আয়াতকে সমন্বিত করলেই বিষয়টি ভালোভাবে বুঝা যাবে। এ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ শেষ আয়াতটি হলো:
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ فَاجْتَنِبُوهُ
অর্থ : হে ঈমানদার লোকেরা! মদ, জুয়া আস্তানা এবং ভাগ্য নির্ণায়ক শর নোংরা শয়তানি কর্ম। তোমরা এগুলো বর্জন করো, আশা করা যায় এতে করে তোমরা সাফল্য মন্ডিত হবে। (সূরা ৫ আল মায়িদা: আয়াত ৯০)

এ কারণেই কেউ যদি বার বার কুরআন পড়েন, তাহলে তিনি স্পষ্টই বুঝতে পারবেন কুরআনই কুরআনের বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রদান করছে। তার জন্যে কুরআন উপলব্ধি করা হবে অত্যন্ত সহজ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00