📄 কুরআনের সাথে পথ চলুন
যে ব্যক্তি কুরআন বিমুখ, তার দুনিয়ার জীবন হবে অশান্তিকর এবং আখিরাতের জীবনে সে হবে অন্ধ। আল্লাহ তায়ালা তাঁর কালামে পাকে বলেন:
فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَى وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنْ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ أَعْمَى قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنْتُ بَصِيرًا قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ أَيْتُنَا فَنَسِيْتَهَا ج وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنْسَى
অর্থ: অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হুদা (কিতাব, জীবন যাপন ব্যবস্থা ও রসূল) আসবে, তখন যারাই আমার হুদার অনুসরণ করবে, তারা না বিপথগামী হবে, আর না হবে দুর্ভাগা। আর যে কেউ আমার যিকর (হুদা, কিতাব) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার দুনিয়ার জীবন হবে দুর্বিষহ আর কিয়ামতের দিন তাকে আমরা হাশর করবো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে: প্রভু! আমিতো চক্ষুষ্মান ছিলাম, আমাকে অন্ধ করে হাশর করলে কেন? তিনি বলবেন: 'যেমন করে তোমার কাছে আমার আয়াত (কিতাব) এসেছিল, কিন্তু অবজ্ঞা করে তুমি তা থেকে দূরে সরেছিলে, ঠিক সে রকমই আজ তোমার প্রতি অবজ্ঞা করা হয়েছে। (সূরা ২০ তোয়াহা: আয়াত ১২৩-২৬)
কিয়ামতের দিন স্বয়ং মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ সা. আল্লাহর কাছে তাঁর নিজের লোকদের বিরুদ্ধেই কুরআন পরিত্যাগ করার অভিযোগ উত্থাপন করবেন:
وَقَالَ الرَّسُولُ يُرَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا হ্যদা الْقُرْآنَ مَهْجُورًا
অর্থ: এবং (বিচারের দিন) স্বয়ং রসূলই (অভিযোগ করে) বলবে: 'প্রভু! আমার লোকেরাই এই কুরআনকে পরিত্যাগ করে রেখেছিল।' (সূরা ২৫ ফুরকান: ৩০)
সুতরাং কুরআনের সাথে জীবন জুড়ে নেয়া এবং কুরআনের সাথে পথ চলা ছাড়া কোনো মানুষের উপায় নেই, বিশেষ করে কোনো মুমিনের তো এ ছাড়া কোনো গত্যন্তরই নেই।
টিকাঃ
* এটি ১৮ জানুয়ারি ২০০৮ তারিখে রাজধানীর বিয়াম অডিটরিয়ামে অনুষ্ঠিত কুরআন ভিত্তিক ৮ম TOT ক্লাসে উপস্থাপিত লেখকের বক্তব্য।
📄 যারা কুরআন জানে আর যারা জানেনা তাদের উপমা
যেসব লোক আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান রাখে এবং তার ভিত্তিতে জীবন যাপন করে, আর যারা এই জ্ঞান থেকে বঞ্চিত- এই উভয়ের পার্থক্য আল্লাহ পাক পরিষ্কার করে দিয়েছেন এক অনুপম উপমা দিয়ে। তিনি বলেন:
أَفَمَنْ كَانَ عَلَى بَيِّنَةٍ مِّن رَّبِّهِ كَمَنْ زُيِّنَ لَهُ سُوءُ عَمَلِهِ وَاتَّبَعُوا أَهْوَاءَهُمْ مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ ۖ فِيهَا أَنْهَرٌ مِّن مَّاءٍ غَيْرِ آسِنٍ ۖ وَأَنْهَرٌ مِّن لَّبَنٍ لَّمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ ۖ وَأَنْهَرٌ مِّنْ خَمْرٍ لَّذَّةٍ لِّلشَّرِبِينَ ۖ وَأَنْهَرٌ مِّنْ عَسَلٍ مُّصَفًّى ۖ وَلَهُمْ فِيهَا مِن كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ ۖ كَمَنْ هُوَ خَالِدٌ فِي النَّارِ وَسُقُوا مَاءً حَمِيمًا فَقَطَّعَ أَمْعَاءَهُمْ
অর্থ: যে ব্যক্তি তার প্রভুর প্রেরিত প্রমাণের (কিতাবের জ্ঞানের) ভিত্তিতে জীবন যাপন করে, তার সাথে কী তুলনা ঐ ব্যক্তির, যে নিজের খেয়াল খুশি মতো জীবন যাপন করে আর তার মন্দ কর্মকাণ্ড তাকে চমৎকৃত করে? (এদের উপমাটা এরকম) যেমন মুত্তাকিদের প্রতিশ্রুত জান্নাত! তাতে রয়েছে নির্মল-পরিচ্ছন্ন পানির নহর। অপরিবর্তনীয় স্বাদের দুগ্ধ-নহর, সুরা পায়ীদের জন্যে সুস্বাদু সুরার নহর, রয়েছে পরিশোধিত-পরিচ্ছন্ন মধুর অবারিত নহর। সেখানে তাদের জন্যে আরো রয়েছে সব ধরণের ফলমূল আর তাদের প্রভুর ক্ষমা। এদের সাথে কী তুলনা ঐ ব্যক্তির, যে চিরকাল থাকবে আগুনে এবং যাকে পান করানো হবে টগবগে ফুটন্ত গরম পানি আর তাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে তার নাড়ি ভুড়ি? (সূরা ৪৭ মুহাম্মদ: আয়াত ১৪-১৫)
এ আয়াতগুলো থেকে জানা গেলো:
১. কুরআন হলো আল্লাহ প্রদত্ত 'হুদা' (জীবন যাপন ব্যবস্থা)।
২. কুরআনের সাথে পথ চললে না বিপথগামী হবার আশঙ্কা থাকে, আর না থাকে দুর্ভাগা হবার আশঙ্কা।
৩. কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেই সৃষ্টি হয় অশান্তি আর দুর্বিষহ জীবন।
৪. কুরআনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে পরকালে অন্ধত্ব।
৫. কুরআন থেকে নিজের দূরত্ব সৃষ্টি করলেই পরকালে রসূল কর্তৃক অভিযুক্ত সাব্যস্ত হতে হবে।
৬. কুরআনের সাথে পথ চলা মানে প্রমাণের ভিত্তিতে বা আল্লাহ প্রদত্ত কিতাবের জ্ঞানের ভিত্তিতে জীবন যাপন করা।
৭. কুরআনের সাথিত্ব ত্যাগ করা মানে-মনগড়া পথে চলা এবং মন্দ কর্মকাণ্ডকে চমৎকার মনে করা।
৮. কুরআনের সাথে পথ চলা মানে-জান্নাতের সুখ আর প্রশান্তির পথে চলা।
৯. কুরআনের জ্ঞানার্জন না করে মনগড়া পথে চলা মানে- জাহান্নামের আগুন আর ফুটন্ত পানির জ্বালাময় জীবন যাপনের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
📄 কুরআনের সাথে পথ চলতে হলে বুঝতে হবে কুরআন
قَدْ جَاءَكُمْ بَصَائِرُ مِنْ رَبِّكُمْ ، فَمَنْ أَبْصَرَ فَلِنَفْسِهِ ، وَمَنْ عَمِي فَعَلَيْهَا
অর্থ: তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে জ্ঞানের উজ্জ্বল আলো। এখন যে কেউ সেদিকে দৃষ্টি দেবে তা তার জন্যেই কল্যাণকর। আর যে কেউ তা থেকে চোখ বন্ধ করে রাখবে তা তার জন্যেই ক্ষতিকর। (সুরা ৬ আন'আম : আয়াত ১০৪)
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَরَحْمَةٌ وَবুশ্ৰَى لِلْمُসْلِمِينَ
অর্থ: আমরা তোমার প্রতি আল কিতাব নাযিল করেছি। এতে রয়েছে প্রতিটি বিষয়ের সুস্পষ্ট বিবরণ। রয়েছে অনুগতদের জন্যে জীবন যাপনের দিক-নির্দেশনা আর অনুকম্পা। (সূরা ১৬ আন নহল: আয়াত ৮৯)
اومَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَنْ مَثَلَهُ فِي الظُّلُمَتِ لَيْسَ بِخَارِجِ مِنْهَا ،
অর্থ: যে ছিলো মৃত (অজ্ঞ-অন্ধ), তারপর আমরা তাকে জীবন (অহীর জ্ঞান) দিয়েছি এবং মানব সমাজে চলার জন্যে আলো (জ্ঞান ভিত্তিক জীবন ব্যবস্থা) দিয়েছি, তার কী তুলনা ঐ ব্যক্তির সাথে, যে নিমজ্জিত রয়েছে অন্ধকার রাশিতে, যেখান থেকে সে বের হবার নয়। (সূরা ৬ আন'আম: আয়াত ১২২)
📄 কুরআন বুঝার মানে কি?
কুরআনের দৃষ্টিতে কুরআন বুঝার মানে হলো :
১. قِرَأَةُ الْقُرْآنِ (কিরাআতুল কুরআন): অর্থাৎ কুরআন পাঠ করা, অধ্যয়ন করা, কুরআনের অর্থ উদ্ধার করা, কুরআন নিয়ে সাধনা করা:
فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَنِ الرَّحِيمِ
অর্থ : যখনই কুরআন পাঠ করতে শুরু করবে, তখন অবশ্যি অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে নিও। (সূরা ১৬ আন্ নহল: আয়াত ৯৮)
২. تَعْلِيمُ الْقُرْآنِ (তালিমুল কুরআন) : অর্থাৎ কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করা, অনুধাবন করা, কুরআন জ্ঞাত হওয়া এবং জানা:
كَمَا أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولًا مِنْكُمْ يَتْلُوا عَلَيْكُمْ أَيَتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُمْ مَالَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ
অর্থ : যেমন আমি তোমাদের থেকেই তোমাদের মাঝে একজন রসূল পাঠিয়েছি। সে তোমাদের কাছে আমার আয়াত তিলাওয়াত করে, তোমাদের তাযকিয়া করে এবং তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ্ তালিম প্রদান করে। (সূরা ২: ১৫১)
৩. تِلَاوَةُ الْقُرْآنِ (তিলাওয়াতুল কুরআন): কুরআন তিলাওয়াত করা মানে- কুরআন পাঠ করা, উপলব্ধি করা, অনুসরণ করা এবং কুরআনের পশ্চাতে চলা :
الَّذِينَ أَتَيْنَهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلَاوَتِهِ
অর্থ: আমি যাদের কিতাব দিয়েছি, তারা তা তিলাওয়াত করে তিলাওয়াতের হক আদায় করে। (সূরা ২ বাকারা: আয়াত ১২১)
৪. تَرْتِيلُ الْقُرْآنِ (তারতিলুল কুরআন): অর্থাৎ কুরআনের ভাব উপলব্ধি করা, ভাবের ভিত্তিতে কুরআন মজিদ পাঠ করা:
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا
অর্থ: এবং তারতিল করো কুরআনকে তারতিল করার মতো। (সূরা ৭৩ মুযযাম্মিল : আয়াত ৪)
৫. تَدَبُّرِ الْقُرْآنِ (তাদাব্বুরিল কুরআন) : কুরআনকে তাদাব্বুর করা মানে- কুরআনের পেছনে চলা, কুরআন অধ্যয়ন করা এবং কুরআন নিয়ে চিন্তা গবেষণা করা:
كِتَبُ أَنْزَلْنَهُ إِلَيْكَ مُبَرَكُ لِيَدَّبَّرُوا أَيْتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُوا الْأَلْبَابِ
অর্থ: এ এক মুবারক (কল্যাণময়) কিতাব আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে করে মানুষ এর আয়াত সমূহ তাদাব্বুর (অনুধাবন, গবেষণা) করে এবং বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। (সূরা ৩৮ : আ. ২৯)
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ
অর্থ: তারা কি কুরআন নিয়ে তাদাব্বুর করে না? (সূরা ৪ নিসা: আয়াত ৮২)
৬. تَفَكَّرِ الْقُرْآنِ (তাফাকুরিল কুরআন): কুরআন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা :
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّাসِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
অর্থ: আর আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি 'আয যিকর' (আল কুরআন) যাতে করে তুমি মানুষকে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দাও- যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে এবং তারা যেনো এ (গ্রন্থ) নিয়ে ফিকির (চিন্তা ভাবনা) করে। (সূরা ১৬ আন নহল: আয়াত ৪৪)
৭. تَفْهِيمُ الْقُرْآنِ (তাফহিমুল কুরআন): কুরআন বুঝে নেয়া, উপলব্ধি করা :
فَفَهَمْنَهَا سُلَيْمَن ، وَكُلًّا أَتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا
অর্থ: সে বিষয়ে আমরা সুলাইমানকে পরিষ্কার বুঝ ও উপলব্ধি প্রদান করেছি এবং তাদের প্রত্যেককেই আমরা প্রদান করেছি প্রজ্ঞা এবং ইলম। (সূরা ২১ : আ. ৭৯)
৮. تَفَقُّهُ الْقُرْآنِ (তাফাকুহিল কুরআন): অর্থাৎ বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা দিয়ে কুরআনের মর্ম ও প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা :
انظُرْ كَيْفَ نُصَرِّفُ الْآيَتِ لَعَلَّهُمْ يَفْقَهُونَ
অর্থ : দেখো, আমরা কী (সুন্দর) ভাবে আয়াত সমূহ বিবৃত করছি, যাতে করে তারা এর মর্ম ও তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারে। (সূরা ৬ আন'আম : ৬৫)
৯. تَذَكَّرُ الْقُرْآنِ (তাযাকুরিল কুরআন): অর্থাৎ কুরআন বুঝে নিয়ে তার শিক্ষা গ্রহণ করা এবং সে শিক্ষানুযায়ী জীবন যাপন করা:
وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍه
অর্থ: আমরা আল কুরআনকে বুঝার এবং শিক্ষা গ্রহণ করার জন্যে সহজ করে নাযিল করেছি। সুতরাং শিক্ষা গ্রহণ করার কেউ আছে কি? (সূরা ৫৪ আল কামার : আয়াত ১৭, ২২, ২৩, ৪০)