📘 কুরআন বোঝার পথ ও পাথেয় > 📄 কুরআন অধ্যয়নের আদব

📄 কুরআন অধ্যয়নের আদব


একজন মুমিন মুমিনার কুরআন পড়া, অধ্যয়ন করা, কুরআনের কথা শুনা, কুরআন বুঝা এবং কুরআন শিক্ষাদান ও কুরআনের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নিয়মগুলো মেনে চলা আবশ্যক:

১. শয়তানের ধোকা প্রতারণা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে আরম্ভ করা:
فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَنِ الرَّجِيمِ
অর্থ: যখন তুমি কুরআন পাঠ করবে, তখন অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে নাও। (সূরা ১৬ আন নাহল : আয়াত ৯৮)
সুতরাং কুরআন পাঠ আরম্ভ করার সময় প্রত্যেক মুমিনকে বলতে হবে: أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
অর্থ: আমি আল্লাহ্র কাছে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই।

২. দয়াময় সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর নামে আরম্ভ করা :
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ
অর্থ: পড়ো তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। (সূরা ৯৬ আলাক : ১)
সুতরাং 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম' বলে কুরআন পড়া আরম্ভ করুন।

৩. পূর্ণ মনোযোগী হয়ে এবং নিরবতার সাথে অধ্যয়ন করা:
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
অর্থ: যখন কুরআন পাঠ করা হয় (কুরআন/কুরআনের কথা শুনানো হয়), তখন মনোযোগের সাথে শুনবে এবং নিরবতা অবলম্বন করবে, যাতে করে তোমরা রহমত লাভ করো। (সূরা ৭ আল আরাফ: আয়াত ২০৪)

৪. তারতীলের সাথে বুঝে বুঝে যথাযথ ভাব প্রকাশ করে পাঠ করা:
وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلا
অর্থ: ধীরস্থির ভাবে বুঝে বুঝে ভাব প্রকাশের ভঙ্গিতে কুরআন পাঠ করো। (সূরা ৭৩ মুযযামমিল: আয়াত ৪)

৫. কুরআনের মর্মে প্রবেশ করে এবং চিন্তা ভাবনা ও গবেষণা করে পাঠ করা:

৬. চিন্তা গবেষণা করা এবং উপদেশ গ্রহণের সংকল্প নিয়ে পাঠ করা:
كِتَبٌ اَنْزَلْتُهُ اِلَيْكَ مُبَرَك لِيَد بَرُوا أَيْتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُوا الْأَلْبَابِ
অর্থ: আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক কল্যাণময় কিতাব, যাতে করে মানুষ এর আয়াত সমূহ নিয়ে চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করে এবং বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ২৯)

৭. অনুসরণ ও মেনে চলার সংকল্প নিয়ে পাঠ করা:
وَهُذَا কِتَبٌ اَنْزَلْتُهُ مُবْرَكَ فَاتَّبِعُوهُ
অর্থ: আমি অবতীর্ণ করেছি এক কল্যাণময় কিতাব, সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করো। (সূরা ৬ আনআম: আয়াত ১৫৫)

৮. অল্প অল্প করে অধ্যয়ন করা এবং শিক্ষা দান করা:
وَقুরْآنًا فَرَقْنَهُ لِتَقْرَأَهُ عَلَى النَّاسِ عَلَى مُكْثَ وَنَزَّلْنَهُ تَنْزِيلاهُ
অর্থ: এ কুরআন আমরা ভাগে ভাগে অল্প অল্প করে নাযিল করেছি, যাতে করে তুমি তা মানুষকে পাঠ দিতে পারো বিরতি দিয়ে দিয়ে। এ উদ্দেশ্যে আমি এটাকে পর্যায়ক্রমে নাযিল করেছি। (সূরা ১৭ ইসরা: আয়াত ১০৬)

৯. পাঠকালে হৃদয় বিগলিত হওয়া এবং হৃদয়ে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হওয়া
أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْশَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحقِّ .
অর্থ: ঈমানদারদের কি এখনো হৃদয় বিগলিত হবার সময় হয়নি আল্লাহর স্মরণে এবং তিনি যে সত্য নাযিল করেছেন তার দ্বারা? (সূরা ৫৭ আল হাদিদ: আয়াত ১৬)

১০. কুরআন অধ্যয়ন ও অনুধাবনের মাধ্যমে ঈমান তাজা করা :
وَاِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ أَيْتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا
অর্থ: আর যখন তাদের শুনানো হয় আল্লাহর আয়াত, তখন তা বৃদ্ধি করে দেয় তাদের ঈমান।

📘 কুরআন বোঝার পথ ও পাথেয় > 📄 কুরআন বুঝার পথ ও পাথেয়-৫ : আল্লাহর বাণী বাহক নবী রসূলগণের মূল দাওয়াত কী ছিলো?

📄 কুরআন বুঝার পথ ও পাথেয়-৫ : আল্লাহর বাণী বাহক নবী রসূলগণের মূল দাওয়াত কী ছিলো?


কুরআন বুঝতে হলে নবী রসূলগণের দাওয়াতের বিষয়বস্তু এবং তাদের মূল দাওয়াত কী ছিলো তা ভালোভাবে হৃদয়ে গেঁথে নিতে হবে। কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে সকল নবী রসূলের মতো আখেরি রসূল মুহাম্মদ সা.ও মানুষকে একই দাওয়াত দিয়েছিলেন। তাঁদের সকলের দাওয়াতের বিষয়বস্তু ছিলো একই। সকল নবী রসূলের মূল দাওয়াত (মিশন) ছিলো একটিই। তাহলো:

১. আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা শুধুমাত্র এক আল্লাহর দাসত্ব, আনুগত্য ও হুকুম পালন করো এবং একনিষ্ঠভাবে শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত ও উপাসনা করো। এটাই জীবন যাপনের সঠিক পথ।

নবী রসূলগণের আরো কয়েকটি মৌলিক দাওয়াত ছিলো নিম্নরূপ:
২. আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর ব্যাপারে সতর্ক সচেতন হও।
৩. এক আল্লাহর দাসত্ব করো এবং তাগুত (false gods)-দের পরিহার করো।
৪. আমার (রসূলের) আনুগত্য করো। সীমা লঙ্ঘনকারী, অপরাধী, পাপিষ্ঠ নেতাদের আনুগত্য করো না।
৫. আমি তোমাদের জন্যে বিশ্বস্ত রসূল (নেতা)।
৬. আমি আমার এ দাওয়াত ও পরিশ্রমের জন্যে তোমাদের কাছে কোনো প্রকার পারিশ্রমিক চাইনা। আমার পারিশ্রমিকের দায়িত্ব আল্লাহর।

এ বিষয়গুলো সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
অর্থ: তোমার পূর্বে আমি যে রসূলই পাঠিয়েছি, তার কাছে অহী করেছি : নি:সন্দেহে আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা কেবল আমারই দাসত্ব- আনুগত্য ও উপাসনা করো। (সুরা ২১ আল আম্বিয়া: আয়াত ২৫)

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولاً أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
অর্থ: আমি প্রতিটি জনপদেই রসূল পাঠিয়েছি। তারা জনগণকে দাওয়াত দিয়েছে : তোমরা শুধুমাত্র এক আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য করো, আর মিথ্যা খোদাদের (false gods) পরিত্যাগ করো। (সূরা ১৬ আন নহল: আয়াত ৩৬)

আল্লাহর রসূল নূহ, সালেহ, হুদ, শুয়াইব আলাইহিমুস সালাম তাঁদের নিজ নিজ জাতিকে এই দাওয়াতই দিয়েছিলেন:
يُقَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِّنْ إِلَهِ غَيْرَهُ
অর্থ: হে আমার জাতি! তোমরা শুধুমাত্র এক আল্লাহর দাসত্ব, আনুগত্য ও উপাসনা করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই। (সূরা ১১ হুদ: আয়াত ৫০, ৬১; সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ৫৯, ৬৫, ৭৩, ৮৪, ৮৫)

আল্লাহর রসূল ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর জাতির লোকদের বার বার বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ ، هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمُه
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার রব এবং তোমাদেরও রব। সুতরাং তোমরা শুধুমাত্র তাঁরই দাসত্ব- আনুগত্য ও উপাসনা করো। এটাই সঠিক পথ। (সূরা ৩ আলে ইমরান : আয়াত ৫১; সূরা ১৯ মরিয়ম: আয়াত ৩৬; সূরা ৪৩ যুখরুফ: আয়াত ৬৪)

আখেরি রসূল মুহাম্মদ সা. মানুষের সামনে এই একই দাওয়াত পেশ করেন:
يأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ
অর্থ: হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই মহান প্রভুর দাসত্ব- আনুগত্য ও উপাসনা করো, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। (সূরা ২ বাকারা: আয়াত ২১)

নূহ আ. তাঁর জাতিকে বলেছিলেন:
أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاتَّقُوهُ وَأَتِيْعُونِ
অর্থ: তোমরা আল্লাহর দাসত্ব করো, তাঁকে ভয় করো আর আমার আনুগত্য করো। (সূরা ৭১ নূহ: আয়াত ০৩)

নূহ, হুদ, সালেহ, লুত, শুয়াইব আলাইহিমুস সালাম তাঁদের নিজ নিজ জাতিকে বলেছিলেন:
إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ
অর্থ: আমি তোমাদের জন্যে একজন বিশ্বস্ত রসূল। অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আর আমার কথা মেনে নাও। (সূরা ২৬ শোয়ারা: আয়াত ১০৭-৯, ১১০, ১২৬, ১৩১, ১৪৪, ১৬২-৩, ১৭৮-৯)

নবীগণ মানুষকে বলেছেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونَ وَلَا تُطِيعُوا أَمْرَ الْمُسْرِفِينَ
অর্থ: অতএব তোমরা আল্লাহর ব্যাপারে সতর্ক হও, তাঁকে ভয় করো এবং আমার কথা মেনে চলো। আর পাপিষ্ঠ ও সীমা লঙ্ঘনকারী নেতাদের কথা শুনো না। (সূরা ২৬ শোয়ারা: আয়াত ১৫০)

নবীগণ যে নিঃস্বার্থ ভাবে আল্লাহর জন্যে কাজ করছেন, তা তাঁরা জনগণকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন:
وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرِ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَلَمِينَ
অর্থ: এ কাজের জন্যে আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাইনা। আমার প্রতিদানের দায়িত্ব মহাজগতের মালিকের উপর। (সূরা ২৬ শোয়ারা : আয়াত ১০৯, ১২৭, ১৪৫, ১৬৪, ১৮০)

নবীগণের দাওয়াতের এই মূল কথাগুলো আপনার স্মৃতিতে ধারণ করুন। তারপর কুরআন পড়ুন, দেখবেন, কুরআন বারবার (repeatedly) এই একই দাওয়াত দিচ্ছে, একই আহবান জানাচ্ছে। গোটা কুরআনেই আপনি দেখতে পাবেন, এক আল্লাহ্র দাসত্ব, আনুগত্য ও হুকুম পালনের আহবান, নবীগণের আনুগত্য ও অনুসরণের আহবান। দাওয়াত ও আহবানের এই মূল কথাগুলো মাথায় রেখে কুরআন পাঠ করলে আপনার জন্যে কুরআন বুঝা সহজ হয়ে যাবে।

টিকাঃ
* এটি ১৬ অক্টোবর ২০০৭ তারিখে বিয়াম অডিটরিয়াম অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ TOT ক্লাসে প্রদত্ত লেখকের বক্তব্য।

📘 কুরআন বোঝার পথ ও পাথেয় > 📄 কুরআন বুঝার পথ ও পাথেয়-৮ : আংশিক নয় সমগ্র কুরআন দৃষ্টিতে রাখুন

📄 কুরআন বুঝার পথ ও পাথেয়-৮ : আংশিক নয় সমগ্র কুরআন দৃষ্টিতে রাখুন


একজন কুরআনের বাহক, কুরআনের কর্মী ও কুরআনওয়ালা ব্যক্তিকে- ১. কুরআন বুঝার জন্যে, কুরআন জানার জন্যে, ২. মানুষকে কুরআন বুঝানোর জন্যে, শিখানোর জন্যে, জানানোর জন্যে, ৩. কুরআনের প্রশিক্ষণ, দরস ও তফসির প্রদানের জন্যে, ৪. কুরআনের দাওয়াত ও তবলীগের জন্যে, কুরআনের প্রচার ও প্রসারের জন্যে, ৫. কুরআনের অনুসরণ ও অনুবর্তনের জন্যে, ৬. ব্যক্তিজীবন ও সমাজের সামগ্রিক ক্ষেত্রে কুরআন প্রবর্তন ও প্রচলনের কাজ করার জন্যে, ৭. মানব জীবনকে কুরআনের রঙে সাজিয়ে গুছিয়ে গড়ে তোলার জন্যে, ৮. আল্লাহর বাণী ও বিধানকে প্রকাশ, প্রতিষ্ঠা ও বিজয়ী করার কাজে আত্মনিয়োগ করার জন্যে- অবশ্যই সমগ্র কুরআন অধ্যয়ন করতে হবে, কুরআনের সামগ্রিক নলেজ আয়ত্ত করতে হবে। গোটা কুরআনকে সবসময় চোখের সামনে রাখতে হবে। চিন্তা চেতনায় সবসময় সমগ্র কুরআনকে ধারণ করতে হবে।

সাধারণত দেখা যায়, আমাদের দেশে কিছু ভুল চিন্তা, ভুল দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভুল কর্মপদ্ধতি এ ক্ষেত্রে চালু আছে। তাহলো সাধারণত-
০১. একদিকে কিছু লোক ফায়দা-ফযিলত হাসিলের জন্যে কুরআন মজিদের কিছু কিছু সূরা বা খণ্ডাংশ না বুঝে নিয়মিত পড়েন। অপরদিকে অন্যকিছু লোক দরস প্রদান করা বা মৌখিক তফসির করার জন্যে কুরআন মজিদের নির্দিষ্ট কয়েকটি খণ্ডাংশ অধ্যয়ন করেন। এ প্রক্রিয়ায় সমগ্র কুরআন অধ্যয়ন করা এবং সমগ্র কুরআন বুঝে নেয়ার বিষয়টি তাদের কাছে গৌণ হয়ে থাকে।
০২. মাদ্রাসা এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সিলেবাসও তথৈবচ। সেখানে সমগ্র কুরআন পড়ানো হয় না, পড়ানো হয় কিছু কিছু সূরা বা অংশ।
০৩. অল্প সংখ্যক ছাড়া সামগ্রিকভাবে উলামায়ে কিরামের অবস্থাও করুণ। তাঁরাও সমগ্র কুরআন নিয়ে ভাবেন না, সমগ্র কুরআন স্টাডি করেন না। ছাত্র জীবনে যা পড়েছেন অধিকাংশই তার উপর নির্ভর করেন।
০৪. যেসব সংগঠন সংস্থা ইসলামি আন্দোলনের কাজ করছেন, সমাজে ইসলাম প্রবর্তনের চেষ্টা সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন, কুরআন জানা-বুঝার ক্ষেত্রে তাদের ঘাটতিও নগণ্য নয়। তাদের জনশক্তির জন্যে তৈরি করা সিলেবাসেরও পূর্ণাঙ্গতা নেই।

একটি বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আমরা শিক্ষিত লোকেরা, খাস্ করে আধুনিক শিক্ষিত লোকেরা যখনই কোনো বই পড়ি, সেটা হক আদায় করেই পড়ার চেষ্টা করি। কোনো লেখকের কোনো বই যখন পড়ি, তখন তা আগাগোড়াই পড়ি। পুরোটা না পড়লে মন অতৃপ্ত থেকে যায়। কিন্তু কুরআনের ব্যাপারটা আমরা সেভাবে নিইনা। সওয়াবের জন্যে, ফায়দা হাসিলের জন্যে, বিপদ দূর করার জন্যে, দরস দেয়ার জন্যে, শিক্ষাদানের জন্যে অংশ বিশেষ পড়ি। এভাবে পড়লে কুরআনের হক আদায় হয় না এবং এভাবে কুরআন বুঝাও সম্ভব নয়। কুরআনের পূর্ণাঙ্গ চেতনা ধারণা করাও এভাবে সম্ভব নয়।

কুরআনের বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা সর্বত্রই 'আল কিতাব' এবং 'আল কুরআন' শব্দ ব্যবহার করেছেন। এর দ্বারা আংশিক নয়, পূর্ণাঙ্গ কুরআনের কথাই তিনি বলেছেন। যেমন:
- নিশ্চয়ই আল কুরআন পথ দেখায় সবচাইতে সঠিক। (আল কুরআন ১৭:০৯) : إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ.
- রমযান মাস। এ মাসেই নাযিল করা হয়েছে আল কুরআন, মানব জাতির জীবন যাপনের ব্যবস্থা হিসেবে। (আল কুরআন ২: ১৮৫) : شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنَ هُدًى لِلنَّاسِ.
- এটি আল কিতাব, এতে কোনো প্রকার সন্দেহ নেই, এটি সচেতন লোকদের পথ প্রদর্শক। (আল কুরআন ২:২) : ذَلِكَ الْكِتَبَ لَا رَيْبَ : فِيهِ : هُدًى للْمُتَّقِينَ.
- নিশ্চয়ই আমরা আল কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্যে। (আল কুরআন ৫৪:৪০) : وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ
- ইয়াসিন! শপথ বিজ্ঞানময় আল কুরআনের। (আল কুরআন ৩৬:১-২) : يسَ وَالْقُرْآنِ الْحَكِيمِ

সুতরাং যথাযথভাবে কুরআন বুঝার জন্যে একটি একক গ্রন্থ হিসেবে কুরআন অধ্যয়ন করুন। কুরআন অধ্যয়নের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে খ্যাতনামা তফসির তাফহীমুল কুরআনের ভূমিকায় বলা হয়েছে:
"যে ব্যক্তি কুরআন সম্পর্কে ভাসাভাসা জ্ঞান লাভ করতে চান তার জন্যে সম্ভবত কুরআন একবার পড়ে নেয়াই যথেষ্ট। কিন্তু যিনি কুরআনের অর্থের গভীরে নামতে চান তার জন্যে তো দু'বার পড়ে নেয়াও যথেষ্ট হতে পারে না। অবশ্যই তাকে বার বার কুরআন পড়তে হবে। প্রতি বার একটি নতুন ভঙ্গিমায় পড়তে হবে। একজন ছাত্রের মতো কলম ও নোটবই সাথে নিয়ে বসতে হবে। জায়গা মতো প্রয়োজনীয় বিষয় নোট করতে হবে।
এভাবে যারা কুরআন পড়তে প্রস্তুত হবেন, কুরআন যে চিন্তা ও জীবন পদ্ধতি উপস্থাপন করতে চায় তার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাটা যেনো তাদের সামনে ভেসে ওঠে, কেবলমাত্র এ উদ্দেশ্যেই তাদের অন্ততপক্ষে দু'বার এ কিতাবটি পড়তে হবে। এ প্রাথমিক অধ্যয়নের সময় তাদের কুরআনের সমগ্র বিষয়বস্তুর উপর ব্যাপকভিত্তিক জ্ঞান লাভ করার চেষ্টা করতে হবে। তাদের দেখতে হবে, এ কিতাবটি কোন্ কোন্ মৌলিক চিন্তা পেশ করে এবং সে চিন্তাধারার উপর কিভাবে জীবন ব্যবস্থার অট্টালিকার ভিত্ গড়ে তোলে? এ সময় কোনো জায়গায় তার মনে যদি কোনো প্রশ্ন জাগে বা কোনো খটকা লাগে, তাহলে তখনি সেখানেই সে সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে বরং সেটি নোট করে নিতে হবে এবং ধৈর্য সহকারে সামনের দিকে অধ্যয়ন জারি রাখতে হবে। সামনের দিকে কোথাও না কোথাও তিনি এর জবাব পেয়ে যাবেন, এরই সম্ভাবনা বেশি। জবাব পেয়ে গেলে নিজের প্রশ্নের পাশাপাশি সেটি নোট করে নেবেন। কিন্তু প্রথম অধ্যয়নের পর নিজের কোনো প্রশ্নের জবাব না পেলে ধৈর্য সহকারে দ্বিতীয় বার অধ্যয়ন করতে হবে। আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দ্বিতীয়বার গভীর মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করার পর কালেভদ্রে কোনো প্রশ্নের জবাব অনুদঘাটিত থেকে গেছে।
এভাবে কুরআন সম্পর্কে একটি ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করার পর এর বিস্তারিত অধ্যয়ন শুরু করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পাঠককে অবশ্যই কুরআনের শিক্ষার এক একটি দিক পূর্ণরূপে অনুধাবন করার পর নোট করে নিতে হবে। যেমন মানবতার জন্যে কোন্ ধরনের আদর্শকে কুরআন পছন্দনীয় গণ্য করছে, অথবা মানবতার জন্যে কোন্ ধরনের আদর্শ তার কাছে ঘৃণার্হ ও প্রত্যাখ্যাত - একথা তাকে বুঝার চেষ্টা করতে হবে। এ বিষয়টিকে ভালোভাবে নিজের মনের মধ্যে গেঁথে নেয়ার জন্যে তাকে নিজের নোট বইতে একদিকে লিখতে হবে 'পছন্দনীয় মানুষ' এবং অন্যদিকে লিখতে হবে 'অপছন্দনীয় মানুষ' এবং উভয়ের নিচে তাদের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী লিখে যেতে হবে। অথবা যেমন, তাকে জানার চেষ্টা করতে হবে, কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের কল্যাণ ও মুক্তি কোন্ কোন্ বিষয়ের উপর নির্ভরশীল এবং কোন্ কোন্ জিনিসকে সে মানবতার জন্য ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক গণ্য করে? এ বিষয়টিকেও সুস্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে জানার জন্য আগের পদ্ধতিই অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ নোট বইয়ে 'কল্যাণের জন্যে অপরিহার্য বিষয়সমূহ' এবং 'ক্ষতির জন্যে অনিবার্য বিষয়সমূহ' এই শিরোনাম দু'টি পাশাপাশি লিখতে হবে।
অতঃপর প্রতিদিন কুরআন অধ্যয়ন করার সময় সংশ্লিষ্ট বিষয় দুটি সম্পর্কে নোট করে যেতে হবে। এ পদ্ধতিতে আকিদা-বিশ্বাস, চরিত্র ও নৈতিকতা, অধিকার ও কর্তব্য, সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, দলীয় সংগঠন শৃঙ্খলা, যুদ্ধ, সন্ধি এবং জীবনের অন্যান্য বিষয়াবলী সম্পর্কে কুরআনের বিধান নোট করতে হবে। অতঃপর প্রতিটি বিভাগের সামগ্রিক চেহারা কি দাঁড়ায়, এবং সবগুলোকে এক সাথে মিলালে কোন্ ধরনের জীবনচিত্র ফুটে ওঠে, তা অনুধাবন করার চেষ্টা করতে হবে।
আবার জীবনের বিশেষ কোনো সমস্যার ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাতে হলে এবং সে ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে হলে সেই সমস্যা সম্পর্কিত প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। এ অধ্যয়নের মাধ্যমে তাকে সংশ্লিষ্ট সমস্যার মৌলিক বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে জেনে নিতে হবে। মানুষ আজ পর্যন্ত সে সম্পর্কে কি কি চিন্তা করেছে এবং তাকে কিভাবে অনুধাবন করেছে? কোন্ কোন্ বিষয় এখনো সেখানে সমাধানের অপেক্ষায় আছে? মানুষের চিন্তার গাড়ি কোথায় গিয়ে আটকে গেছে? এই সমাধানযোগ্য সমস্যা ও বিষয়গুলোকে সামনে রেখেই কুরআন অধ্যয়ন করতে হবে। কোনো বিষয় সম্পর্কে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি জানার এটিই সবচেয়ে ভালো ও সুন্দর পথ। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, এভাবে কোনো বিষয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে কুরআন অধ্যয়ন করতে থাকলে এমন সব আয়াতের মধ্যে নিজের প্রশ্নের জওয়াব পাওয়া যাবে যেগুলো ইতিপূর্বে কয়েকবার পড়া হয়ে থাকলেও এই তত্ত্ব সেখানে লুকিয়ে আছে একথা ঘুর্ণাক্ষরেও মনে জাগেনি"।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00