📄 কুরআন কার বাণী
কুরআন কার বাণী? কার প্রেরিত গ্রন্থ? কুরআন যে মহাবিশ্বের মালিক ও প্রভু মহান আল্লাহর বাণী এ বিষয়টি আকাশে সূর্যের অস্তিত্ব, সৌরজগতে পৃথিবীর অস্তিত্ব, পৃথিবীতে রাত- দিনের আগমন, মানুষের অস্তিত্ব এবং মানুষের জীবন মৃত্যুর মতোই মীমাংসিত। এ মীমাংসার বিপক্ষে 'টু' শব্দটি করারও কোনো বাস্তবতা নেই এবং তা করতে মানুষ সম্পূর্ণ অক্ষম।
تلك ايت الله نتلوها عليك بالحق
অর্থ: এগুলো আল্লাহর আয়াত আমরা তিলাওয়াত করছি তোমার প্রতি নিশ্চিতরূপে। (সূরা ৩ আলে ইমরান: আয়াত ১০৮)
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَهُ ، قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ
অর্থ: তারা কি বলে যে, সে (মুহাম্মদ) এটি (এ কুরআন) নিজেই রচনা করেছে? (হে মুহাম্মদ!) তুমি তাদের বলো: তোমাদের অভিযোগের ব্যাপারে তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তবে এর (এ কুরআনের) অনুরূপ একটি সূরা রচনা করে দেখাও। আর এ কাজে আল্লাহ ছাড়া যাদের সাহায্য নিতে চাও - নাও। (সূরা ১০ ইউনুস: আয়াত ৩৮)
وَمَا كَانَ هَذَا الْقُرْآنُ أَنْ يُفْتَرَى مِنْ دُونِ اللَّهِ
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া এ কুরআন কারো পক্ষে রচনা করা সম্ভব নয়। (সূরা ১০ ইউনুস: আয়াত ৩৭)
এ কুরআনের মতো কোনো বাণী মানুষের পক্ষে আজো রচনা সম্ভব হয়নি এবং কখনো হবে না। এ বিষয়ে আমরা একটু আগেই বিস্তারিত আলোচনা করে এসেছি।
টিকাঃ
* এটি ১৭ জুলাই ২০০৯ তারিখে রাজধানীর বিয়াম অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি আয়োজিত টট্ (TOT) ক্লাসের ২৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত লেখকের বক্তব্য।
📄 কুরআনের মূল বিষয়বস্তু কী?
আল কুরআনের মূল বিষয়বস্তু মানুষ (the human race, mankind)। কারণ মহান আল্লাহ কুরআন মজিদ নাযিল করেছেন: ১. মানুষের জন্যে, ২. মানুষের নিকট এবং ৩. মানুষকে তার কল্যাণের পথ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। এ প্রসঙ্গের প্রমাণ গোটা কুরআন মজিদ। দুয়েকটি আয়াত দেখুন:
إِنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ لِلنَّাসِ بِالْহَقِّ ۚ
অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা নাযিল করেছি তোমার প্রতি এই কিতাব মানুষের জন্যে সত্যসহ। (সূরা ৩৯ যুমার: আয়াত ৪১)
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ
অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা নাযিল করেছি তোমার নিকট এই কিতাব সত্যসহ যাতে করে (তা দ্বারা) তুমি মানুষের মাঝে ফায়সালা করো। (সূরা ৪ নিসা : আয়াত ১০৫)
অর্থ : لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ : যাতে মানব সম্প্রদায় সুষম ব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। (সূরা ৫৭ হাদীদ : আয়াত ২৫)
কুরআনের মূল বিষয়বস্তু যে মানুষ, পুরো কুরআনই এর সাক্ষী। একজন বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি কুরআন পাঠ করলেই বিষয়টি তার কাছে পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে।
📄 কুরআনের মূল লক্ষ্য কী?
মহাগ্রন্থ আল কুরআনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে তার ইহকালীন ও পরকালীন প্রকৃত মুক্তি, কল্যাণ, শান্তি ও সাফল্যের পথ প্রদান করা এবং পথ প্রদর্শন করা, যাতে করে সে তার মুক্তি, কল্যাণ, শান্তি ও সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللهِ نُورٌ وَكِتَبٌ مُّبِينٌ ، يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السلم ويُخْرِجُهُم مِنَ الظُّلُمتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيرٍ
অর্থ: আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে একটি আলো এবং একটি কিতাব। এর সাহায্যে আল্লাহ তাঁর সন্তোষের অনুসারীদের পরিচালিত করেন 'শান্তির পথে' এবং তাদের বের করে আনেন অন্ধকাররাশি থেকে আলোতে এবং তাদের পরিচালিত করেন সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর। (সূরা ৫: ১৫-১৬)
إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ
অর্থ: নিশ্চয়ই এ কুরআন পথ প্রদর্শন করে সেই দিকে যা সবচাইতে সঠিক। (সূরা ১৭ ইসরা: আয়াত ৯)
يأَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمْ بُرْهَانٌ مّিন رَّبِّكُمْ وَانْزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُّبِينًا فَلَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَاعْتَصَمُوا بِهِ فَسَيُدْخِلْهُمْ فِي رَحْمَةٍ مِّنْهُ وَفَضْلٍ لا وَيَهْدِيهِمْ إِلَيْهِ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا .
অর্থ : হে মানুষ! তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে একটি প্রমাণ। আর সেই সাথে আমি তোমাদের কাছে নাযিল করেছি এক উদ্ভাসিত আলো। এখন যারা (তার আলোকে) ঈমান আনবে আল্লাহ্র প্রতি আর আঁকড়ে ধরবে সেই আলো, তিনি তাদের দাখিল করবেন তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের মধ্যে এবং (এ উদ্দেশ্যে) তাদেরকে তাঁর দিকে পরিচালিত করবেন সিরাতুল মুস্তাকিমে। (সূরা ৪ নিসা : আয়াত ১৭৪-১৭৫)
وَاللَّهُ يَدْعُوا إِلَى دَارِ السَّلْمِ ، وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
অর্থ: (হে মানুষ!) আল্লাহ তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছেন শান্তির ঘরের দিকে এবং তিনি যাকে চান সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করেন। (সূরা ১০ ইউনুস: আয়াত ২৫)
📄 কুরআনের মূল উদ্দেশ্য কী?
আল কুরআনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে তার প্রকৃত মুক্তি, কল্যাণ, শান্তি ও সাফল্যের পথ অবলম্বন ও অনুসরণের:
১. আহবান জানানো, উদ্বুদ্ধ করা, উৎসাহিত করা এবং প্রেরণা দান করা।
২. এ পথে চলার শুভ পরিণতির বর্ণনা দেয়া এবং সুসংবাদ দেয়া।
৩. এ পথের পরিচয় তুলে ধরা এবং এ পথে চলার বিস্তারিত কর্মনীতি ও কর্মপদ্ধতি পেশ করা।
৪. এপথের উপযুক্ত বিশ্বাস, চারিত্রিক গুণাবলী এবং করণীয় ও বর্জনীয় সমূহ অবহিত করে মুক্তি ও সাফল্য লাভের যোগ্যতা অর্জনের আহবান জানানো।
৫. ভ্রান্ত পথে চলার অশুভ পরিণতির বর্ণনা দেয়া এবং সতর্ক করা।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কুরআনের বাহক মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ সা. কে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন:
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّাসِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
অর্থ : আর আমি তোমার প্রতি আয যিকর (আল কুরআন) নাযিল করেছি, যেনো তুমি তা মানুষের সামনে পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরো, যাতে করে তাদের জন্যে যা (যে চলার পথ) নাযিল করা হয়েছে, তা (গ্রহণ করার বিষয়টি) তারা ভেবে চিন্তে দেখতে পারে। (সূরা ১৬ আন নহল: আয়াত ৪৪)
قُلْ يَأَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمُ الْحقُّ مِن رَّبِّكُمْ ، فَمَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ ، وَمَنْ ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ، وَمَا أَنَا عَلَيْكُمْ بَوَكِيلٍ
অর্থ: (হে মুহাম্মদ! মানুষকে) বলে দাও হে মানুষ! তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে মহাসত্য (আল কুরআন)। সুতরাং যে কেউ সঠিক পথ গ্রহণ করবে, সঠিক পথ গ্রহণে তারই কল্যাণ হবে। আর যে কেউ ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করবে, ভ্রান্ত পথ তারই ক্ষতির কারণ হবে। আমি তোমাদের দায় দায়িত্ব বহনকারী নই। (সূরা ১০ ইউনুস: আয়াত ১০৮)
وَاللَّهُ يَدْعُوا إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ ، وَيُبَيِّنُ أَيْتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يتذكرونه
অর্থ: আল্লাহ তাঁর ইচ্ছায় আহবান জানাচ্ছেন জান্নাতের দিকে এবং ক্ষমার দিকে আর তিনি তাঁর আয়াত সমূহ মানুষের জন্যে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করছেন, যাতে করে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ২২১)
سَابَقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا كَعَرْضِ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ .
অর্থ: তোমরা প্রতিযোগিতা করে দৌড়ে আসো তোমাদের প্রভুর ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে যার প্রশস্ততা আসমান জমিনের প্রশস্ততার মতো। সেটি প্রস্তুত রাখা হয়েছে ঐসব লোকদের জন্যে যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রসূলের প্রতি। (সূরা ৫৭ আল হাদিদ: আয়াত ২১)
وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ ، وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ،
অর্থ: আর এটিই হলো আমার প্রদত্ত সিরাতুল মুস্তাকিম। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করো। এর বাইরের পথ সমূহের অনুসরণ করো না। তাহলে তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। (সূরা ৬: আয়াত ১৫৩)
وَهُذَا كِتَبْ أَنْزَلْنَهُ مُبْرَكَ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
অর্থ: আমাদের অবতীর্ণ এই কিতাব বরকতময়। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করো এবং সতর্ক হও। আশা করা যায় তোমরা অনুকম্পা প্রাপ্ত হবে। (সূরা ৬ আনআম: আয়াত ১৫৫)