📄 বিশ্বাস ও আদর্শের ভিত্তিতে কুরআন মানব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে
কুরআন গোটা মানব সমাজকে নিজের দিকে আহ্বান জানায় এবং নিজের উপস্থাপিত মতাদর্শ গ্রহণ করার ও মেনে চলার আহ্বান জানায়:
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا অর্থ : তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহ্র রজ্জুকে (আল কুরআনকে) আঁকড়ে ধরো এবং পৃথক পৃথক ভাগভাগ হয়োনা। (সূরা ৩ আলে ইমরান: আয়াত : ১০৩)
আল্লাহ্র রজ্জু আল কুরআন মানব সমাজের জন্যে এক মহা অনুগ্রহ। এ মহা গ্রন্থকে যারা জেনে নেয় এবং তাতে প্রদত্ত বিশ্বাস ও ব্যবস্থাকে যারা মেনে নেয়, তারা পরস্পরের জানের দুশমন থেকে থাকলেও প্রাণের বন্ধু হয়ে যায়। এ কিতাব মানব সমাজকে একমুখী এবং ঐক্যবদ্ধ করে দেয়। পরস্পরকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রিয়তম ভাই বানিয়ে দেয়:
وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا অর্থ: স্মরণ করো তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা: তোমরা ছিলে পরস্পরের দুশমন। অত:পর তিনি তোমাদের অন্তরগুলোকে প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছেন। ফলে তাঁরই অনুগ্রহে তোমরা হয়ে গেলে পরস্পর ভাই ভাই। (সূরা ৩ আলে ইমরান: আয়াত ১০৩)
ইসলাম মুমিনদেরকে কর্মপন্থা ও কর্মপদ্ধতিগত মতপার্থক্যের স্বাধীনতা দিয়েছে। কুরআন-সুন্নায় যেসব বিষয়ের দিক নির্দেশনা দেয়া হয়নি, সেসব বিষয়ে গবেষণা ইজতিহাদ করে মত প্রতিষ্ঠা করার স্বাধীনতা দিয়েছে; কিন্তু কুরআন-সুন্নায় প্রদত্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনাবলী ও নীতিমালার ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করার অধিকার মুমিনদের দেয়নি। এই নীতিতে মুমিনরা ঐক্যবদ্ধ।
📄 কুরআন মানুষকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে বিভক্ত করে
পক্ষান্তরে যারা কুরআনের আহবানে সাড়া দেয়না, কুরআন উপস্থাপিত ম্যাসেজকে মেনে নেয়না, তারা কুরআনের পথ থেকে পৃথক হয়ে যায়। তাদের পথ আলাদা আর কুরআন ওয়ালাদের পথ আলাদা। মূলত কুরআন মানব সমাজকে দুইভাগে ভাগ করে দেয়:
১. কুরআন গ্রহণকারী মানবদল।
২. কুরআন বর্জনকারী মানবদল।
এ জন্যেই কুরআনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ও বিশেষণ হলো 'আল ফুরকান'। ফুরকান মানে- (সত্যাসত্যের) বিভক্তকারী, পার্থক্যকারী, (the criterion between right and wrong)। মহান আল্লাহ বলেন :
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَ بَيِّنَتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ অর্থ: রমযান মাস! এ মাসেই নাযিল করা হয়েছে আল কুরআন- যা মানবজাতির জীবন যাপনের পথ নির্দেশ, সঠিক পথ নির্দেশের সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং (সত্যাসত্যের মধ্যে) পার্থক্যকারী ও বিভক্তকারী। (সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ১৮৫)
تَبْرَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَلَمِينَ نَذِيرًا অর্থ: মহা মহীয়ান তিনি, যিনি তাঁর দাসের প্রতি নাযিল করেছেন আল ফুরকান (বিভক্তকারী ও পার্থক্যকারী কিতাব), যাতে সে বিশ্ববাসীর জন্যে সতর্ককারী হয়। (সূরা ২৫ আল ফুরকান: আয়াত ১)
এটাই আল্লাহ্ নিয়ম। তিনি যখনই কোনো রসূল পাঠিয়েছেন, রসূল নিজে এবং তাঁর প্রতি অবতীর্ণ কিতাব ছিলো মানুষকে এক বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধকারী এবং বিশ্বাস অবিশ্বাসের ভিত্তিতে বিভক্তকারী। তাই ঈসা মসীহ আলাইহিস্ সালাম ইসরায়েলীদের বলেছিলেন:
"আমি মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড় করাইতে আসিয়াছি; ছেলেকে পিতার বিরুদ্ধে; মেয়েকে মায়ের বিরুদ্ধে, বউকে শাশুড়ির বিরুদ্ধে দাঁড় করাইতে আসিয়াছি।” (মথি/১০: ৩৫)
সুতরাং কুরআনের ভিত্তিতে মানুষ দুইভাগে বিভক্ত:
১. কুরআনের প্রতি বিশ্বাসী মানব সমাজ এবং
২. কুরআনের প্রতি অবিশ্বাসী মানব সমাজ।
📄 কুরআনের প্রতি অবিশ্বাসী মানব সমাজ
কুরআনের প্রতি অবিশ্বাসী মানব সমাজ কয়েকভাগে বিভক্ত:
১. প্রথম গ্রুপ: যারা কুরআন দেখেওনি, পড়েওনি এবং কুরআনে কী আছে সে সম্পর্কে কিছুই জানেনা। তাদেরকে কেউ কুরআনের কথা বলেওনি, শুনায়ওনি এবং কুরআন পড়তেও দেয়নি।
২. দ্বিতীয় গ্রুপ: এদের অবস্থাও প্রথম গ্রুপের মতোই। তবে এরা এতোটুকু জানে যে, কুরআন মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ। সুতরাং ওটা মুসলমানদের বিষয়। ঐ গ্রন্থের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
৩. তৃতীয় গ্রুপ: এরা কোনো না কোনো ধর্মীয় গ্রুপ। এরা মনে করে তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থই সঠিক। মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ বানোয়াট। এ ছাড়া এদের বাকি অবস্থা অনেকটা প্রথম গ্রুপের মতোই。
৪. চতুর্থ গ্রুপ: এ গ্রুপ সক্রিয়ভাবে কুরআনের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী। এরা : ক. কুরআন থেকে ভুল বের করার চিন্তা গবেষণায় লিপ্ত। খ. এরা কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা প্রচারের কাজে লিপ্ত। গ. এরা কুরআন সম্পর্কে মিথ্যা প্রচারণা ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজে লিপ্ত। ঘ. এরা কুরআনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে এবং বিভ্রান্তি ছড়ায়। ঙ. এরা কুরআনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, বাধা প্রদান ও যুদ্ধে লিপ্ত。
কুরআন সম্পর্কে এদের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সেগুলো মোটামুুটি এরূপ:
১. 'এটা তো অতীত লোকদের কাহিনী।' (সূরা ফুরকান: আয়াত ৫)
২. 'এটা একটা সুস্পষ্ট ম্যাজিক।' (সূরা যুখরুফ: আয়াত ৩)
৩. 'এটা জ্যোতিষীদের শেখানো কথা।' (আল হাক্কাহ্ : আয়াত ৪২)
৪. 'এটা হলো কবির কবিতা।' (আল হাক্কাহ্: আয়াত ৪১)
৫. 'এটা মুহাম্মদের রচিত কিংবা অন্যরা এসে তাকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে।' (সূরা ২৫ ফুরকান: আয়াত ৪)
৬. 'এটা আরবি ভাষায় কেন নাযিল করা হলো?' (সূরা ৪১: আয়াত ৪৪)
৭. 'এটা মক্কা - মদিনার কোনো মহান ব্যক্তির প্রতি কেন নাযিল হলোনা?' (সূরা যুখরুফ: আয়াত ৩১)
৮. 'এটা এক সঙ্গে একটি গ্রন্থ আকারে কেন নাযিল হলোনা? (সূরা ফুরকান: ৩২)
৯. 'তারা বলে: হে লোকেরা! তোমরা কুরআন শুনোনা। যেখানেই কুরআনের কথা উচ্চারিত হবে- সেখানেই হৈ হট্টগোল বাধিয়ে দিয়ো।' (সূরা ৪১: ২৬)
১০. 'তারা কুরআনের ব্যাপারে বিরূপ।' (সূরা হজ্জ : আয়াত ৭২)
১১. 'তারা কুরআনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক।' (সূরা হজ্জ : ৭২)
১২. 'তারা কুরআনের আলো নিভিয়ে দিতে চায়' (সূরা আস্সফ : আয়াত ৮)
১৩. 'কুরআন তাদের মানসিক যাতনার কারণ।' (সূরা আল হাক্কাহ : ৫০)
১৪. 'তারা কুরআন থেকে পালায়।' (আল মুদ্দাস্সির: ৪৯-৫০)
১৫. 'তারা কুরআন নিয়ে বিদ্রূপ করে।' (সূরা ৬ : ৬৮)
১৬. 'তারা কুরআনকে ব্যর্থ ও পরাজিত করে দিতে অপতৎপরতা চালায়।' (সূরা সাবা : আয়াত ৫)
📄 কুরআন অমান্যকারীদের ভয়াবহ পরিণতি
وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِايْتِنَا أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَلِدُونَ অর্থ : যারা আমার আয়াত অবিশ্বাস ও অস্বীকার করবে, তারা হবে আগুনের বাসিন্দা। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (সূরা ২ বাকারা: আয়াত ৩৯)
وَالَّذِينَ سَعَوْا فِي ايْتِنَا مُعْجِزِينَ أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مِّن رِجْزِ اليَرْ অর্থ: যারা আমার আয়াতকে ব্যর্থ ও পরাজিত করার অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়, তাদের জন্যে রয়েছে দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক আযাব। (সূরা সাবা : আয়াত ৫)
وَسِيقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ زُمَرًا ، حَتَّى إِذَا جَاءُوهَا فُتِحَتْ أَبْوَابُهَا وَقَالَ لَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِنْكُمْ يَتْلُونَ عَلَيْكُمْ أَيْتِ رَبِّكُمْ وَيُنْذِرُونَكُمْ لِقَاءَ يَوْمِكُمْ هَذَا ، قَالُوا بَلَى وَلَكِنْ حَقَّتْ كَلِمَةُ الْعَذَابِ عَلَى الْكَفِرِينَ قِيلَ ادْخُلُوا أَبْوَابَ جَهَنَّমَ خَلِدِينَ فِيهَا ، فَبِئْسَ مَثْوَى المتكبرين
অর্থ: (কিয়ামতের দিন ফায়সালা হয়ে যাবার পর) অমান্যকারীদের দলে দলে জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা সেখানে পৌঁছামাত্র জাহান্নামের দুয়ারসমূহ খুলে যাবে। তখন জাহান্নামের রক্ষীবাহিনী (বিস্ময়ের সাথে) তাদের জিজ্ঞেস করবে: কী ব্যাপার, তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে কি বাণী বাহকগণ যাননি? তাঁরা কি তোমাদের সামনে আল্লাহ্র আয়াত পেশ করেননি, শুনাননি? আর এই বিচার দিনের সম্মুখীন হতে হবে বলে সতর্ক করেননি?' অমান্যকারীরা বলবে: 'হাঁ, শুনিয়েছিলেন এবং সতর্কও করেছিলেন (কিন্তু আমরা মানি নাই)!'-এই স্বীকৃতি তাদের কোনো কাজে আসবেনা, তখন তো আল্লাহ্র দণ্ড তাদের উপর নির্ধারিত হয়েই গেছে। তখন তাদের বলা হবে : 'প্রবেশ করো জাহান্নামের দরজাসমূহ দিয়ে। এখন থেকে চিরকাল এই শাস্তির মধ্যেই পড়ে থাকবে।' দাম্ভিকদের আবাস কতোইনা নিকৃষ্ট! (সূরা ৩৯ যুমার: আয়াত ৭১-৭২)
এ প্রসঙ্গে আরো দেখুন: সূরা ও আয়াত ৩:১১; ৪:৫৬; ৫:১০, ৮৬; ৬:৩৯, ৪৯, ৫৪, ৬৮, ১৫০, ১৫৭; সূরা ৭: ৯, ৩৬, ৪০, ১৩৬, ১৪৬, ১৪৭, ১৮২ আরো অনেক।