📄 আল কুরআন সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে অনির্বাণ সত্য
যারা মনে করে, কুরআন আল্লাহ্র বাণী নয়, কুরআন অকাট্য প্রমাণ ও যুক্তি দিয়ে তাদের অভিযোগ খণ্ডন করেছে। কুরআনের প্রমাণ ও যুক্তির বিপক্ষে আজো কেউ কোনো প্রমাণ এবং যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেনি। দেখুন আল্লাহর বাণী:
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَذَا إِلَّا إِنَّكَ فَتِرِيهُ وَأَعَانَهُ عَلَيْهِ قَوْمٌ أَخَرُونَ فَقَدْ جَاءُوا ظُلْمًا وَ زُورًاه وَقَالُوا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ اكْتَتَبَهَا فَهِيَ تُمْলَى عَلَيْهِ بُكْرَةً واميلاه قُلْ أَنْزَلَهُ الَّذِي يَعْلَمُ السِّرَّ فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ .
অর্থ: অমান্যকারীরা বলে এ (কুরআন) তো মিথ্যা মনগড়া জিনিস। (মুহাম্মদ) নিজেই তা রচনা করেছে আর অপর কিছু লোক তাকে একাজে সহযোগিতা করেছে।'-মূলত এই (অমান্যকারী) লোকেরা উদ্ভাবন করেছে এক মহা অন্যায় ও ডাহা মিথ্যা কথা। তারা আরো বলে: এ (কুরআন) তো পূর্বকালের লোকদের কাহিনী যা সে লিখিয়ে নিয়েছে, আর সকাল সন্ধ্যা তারা তাকে (এ কাহিনী) শুনাচ্ছে।' (হে মুহাম্মদ) তাদের বলো এই বাণী নাযিল করেছেন তো তিনি, যিনি মহাবিশ্ব এবং এই পৃথিবীর সমস্ত রহস্য অবগত। (সূরা ২৫ ফুরকান: ৪-৬)
أَمْ يَقُولُونَ افتره ، قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُم صدقين
অর্থ: তারা কি বলে যে মুহাম্মদ নিজে এটি (এ কুরআন) রচনা করেছে? (হে মুহাম্মদ!) তাদের বলো তোমরা যদি তোমাদের এই অভিযোগে সত্যবাদী হয়ে থাকো, তবে এর (এই কুরআনের) মতো একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এসো। এ কাজে আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের সহযোগিতা নিতে চাও- তাদেরকেও ডেকে নাও।' (সূরা ১০ ইউনুস: আয়াত ৩৮)
وَمَا كَانَ هَذَا القُرْآنُ أَن يُফْتَرَى مِنْ دُونِ اللَّهِ অর্থ: এ কুরআন এমন কোনো জিনিস নয়, যা আল্লাহ্র নিকট থেকে অহী আসা ছাড়াই রচনা করা সম্ভব হতে পারে। (সূরা ১০ ইউনুস: আয়াত ৩৭)
قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسَ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هُذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا
অর্থ: (হে মুহাম্মদ!) তাদের বলো: মানুষ এবং জিন সবাই মিলেও যদি এ কুরআনের মতো কিছু আনার (রচনা করার) চেষ্টা করে, তা পারবেনা, এমনকি তারা যদি একে অপরের সাহায্যও করে। (সূরা ১৭ ইসরা: আয়াত ৮৮)
কুরআন আল্লাহর শাশ্বত বাণী হবার ব্যাপারে যুক্তি কী বলে? এখানে আমরা কুরআন আল্লাহর বাণী হবার ব্যাপারে কয়েকটি যুক্তি উপস্থাপন করছি:
০১. নিরক্ষর অনাভিলাষী ব্যক্তির হৃদয়পটে মহা জ্ঞানভাণ্ডার: مَا كُنْتَ تَدْرِي مَالْكِتَبُ وَلَا الأَيْمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَهُ نُورَنَّهْدِي بِهِ مَنْ نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا ط অর্থ: তুমি তো জানতোনা কিতাব কী? ঈমানই বা কী? কিন্তু আমি এ কুরআনকে (তোমার জন্যে) বানিয়ে দিয়েছি একটি আলো, এর দ্বারা আমার দাসদের যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ প্রদর্শন করি। (সূরা ৪২ আশ শূরা: ৫২)
وَمَا كُنْتَ تَتْلُوا مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَبٍ وَلَا تَخُطُّهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لأَرْتَابَ الْمُبْطِلُونَ অর্থ: তুমি তো এর (কুরআন নাযিলর) পূর্বে কোনো কিতাব পাঠ করো নাই এবং কোনো কিতাব লেখোও নাই। তেমনটি হলে হয়তো মিথ্যাবাদীদের সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকতে পারতো। (সূরা ২৯ আনকাবুত: আয়াত ৪৮)
০২. কুরআন অবিকৃত রয়েছে এবং হুবহু বর্তমান রয়েছে।
০৩. সীমা সংখ্যাহীন হাফেযে কুরআন।
০৪. সর্বাধিক পঠিত কিতাব।
০৫. ভবিষ্যৎ বাণী সমূহ সত্য প্রমাণিত।
০৬. বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য সমূহ দিবালোকের মতো সত্য।
০৭. ভাষার অনন্যতা।
০৮. সুষম (balanced) বক্তব্য।
০৯. প্রদত্ত জীবন বিধান চিরসত্য, চির ন্যায়সংগত ও মহা কল্যাণময়।
১০. সংস্কার মুক্ত।
১১. সর্বযুগে অনন্ত জ্ঞানের উৎস।
১২. সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।
১৩. সর্বাধিক গুরুত্বপ্রাপ্ত গ্রন্থ।
১৪. সর্বাধিক প্রিয় গ্রন্থ।
১৫. অপরাজেয় গ্রন্থ। ছিদ্রান্বেষীরা সবাই পরাজিত।
📄 কেন নাযিল হলো আল কুরআন
মহান স্রষ্টা আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর সকল সৃষ্টিকে প্রকৃতিগতভাবেই জীবন পরিক্রমণের পথ নির্দেশ দান করেছেন। তবে কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শুধু মানুষ আর জিন।
মানুষের সুন্দর সফল ও কল্যাণের পথে জীবন যাপনের জন্যে আল্লাহ পাক মানুষের মধ্য থেকেই নবী রসূল নিযুক্ত করেছেন এবং তাঁদের মাধ্যমে মানুষের জন্যে হিদায়াত বা জীবন যাপনের পথ নির্দেশ (Guidance) প্রেরণ করেছেন। এ জন্যে তিনি রসূলদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। তিনি সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি মানব জাতির জন্যে জীবন যাপনের পথ নির্দেশ হিসেবে আল কুরআন নাযিল করেছেন। তিনি কুরআন মজিদেই এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন:
إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَالَمِينَ অর্থ: এটি (এই কুরআন) বিশ্ববাসীর জন্যে একটি স্মারক ও উপদেশ ছাড়া আর কিছুই নয়। (সূরা ১২ ইউসুফ: আয়াত ১০৪)
يأَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جاءَتْكُمْ مَوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ অর্থ: হে মানব সমাজ! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রভুর নিকট থেকে এসেছে একটি কল্যাণময় উপদেশ এবং তোমাদের অন্তরে যা (যে অজ্ঞতা, অন্ধতা, সংশয়, কুটিলতা, দ্বৈততা) আছে তার নিরাময়। (সূরা ১০ ইউনুস: আয়াত ৫৭)
هُذَا بَيَانَ لِلنَّاسِ অর্থ: এটি (এই কুরআন) মানবজাতির জন্যে এক সুস্পষ্ট বিবৃতি (Statement)। (সূরা ৩ আলে ইমরান: আয়াত ১৩৮)
هُدًى لِلنَّاسِ অর্থ: (এই কুরআন) মানবজাতির জন্যে জীবন যাপনের নির্দেশিকা। (সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ১৮৫)
كِتُبُ أَنْزَلْتُهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسِ مِنَ الظُّلُمَتِ إِلَى النُّورِ অর্থ: এই কিতাব আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তুমি মানব সমাজকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে পরিচালিত করতে পারো। (সূরা ১৪ ইবরাহিম: আয়াত ১)
📄 বিশ্বাস ও আদর্শের ভিত্তিতে কুরআন মানব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে
কুরআন গোটা মানব সমাজকে নিজের দিকে আহ্বান জানায় এবং নিজের উপস্থাপিত মতাদর্শ গ্রহণ করার ও মেনে চলার আহ্বান জানায়:
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا অর্থ : তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহ্র রজ্জুকে (আল কুরআনকে) আঁকড়ে ধরো এবং পৃথক পৃথক ভাগভাগ হয়োনা। (সূরা ৩ আলে ইমরান: আয়াত : ১০৩)
আল্লাহ্র রজ্জু আল কুরআন মানব সমাজের জন্যে এক মহা অনুগ্রহ। এ মহা গ্রন্থকে যারা জেনে নেয় এবং তাতে প্রদত্ত বিশ্বাস ও ব্যবস্থাকে যারা মেনে নেয়, তারা পরস্পরের জানের দুশমন থেকে থাকলেও প্রাণের বন্ধু হয়ে যায়। এ কিতাব মানব সমাজকে একমুখী এবং ঐক্যবদ্ধ করে দেয়। পরস্পরকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রিয়তম ভাই বানিয়ে দেয়:
وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا অর্থ: স্মরণ করো তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা: তোমরা ছিলে পরস্পরের দুশমন। অত:পর তিনি তোমাদের অন্তরগুলোকে প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে দিয়েছেন। ফলে তাঁরই অনুগ্রহে তোমরা হয়ে গেলে পরস্পর ভাই ভাই। (সূরা ৩ আলে ইমরান: আয়াত ১০৩)
ইসলাম মুমিনদেরকে কর্মপন্থা ও কর্মপদ্ধতিগত মতপার্থক্যের স্বাধীনতা দিয়েছে। কুরআন-সুন্নায় যেসব বিষয়ের দিক নির্দেশনা দেয়া হয়নি, সেসব বিষয়ে গবেষণা ইজতিহাদ করে মত প্রতিষ্ঠা করার স্বাধীনতা দিয়েছে; কিন্তু কুরআন-সুন্নায় প্রদত্ত সুস্পষ্ট নির্দেশনাবলী ও নীতিমালার ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করার অধিকার মুমিনদের দেয়নি। এই নীতিতে মুমিনরা ঐক্যবদ্ধ।
📄 কুরআন মানুষকে বিশ্বাসের ভিত্তিতে বিভক্ত করে
পক্ষান্তরে যারা কুরআনের আহবানে সাড়া দেয়না, কুরআন উপস্থাপিত ম্যাসেজকে মেনে নেয়না, তারা কুরআনের পথ থেকে পৃথক হয়ে যায়। তাদের পথ আলাদা আর কুরআন ওয়ালাদের পথ আলাদা। মূলত কুরআন মানব সমাজকে দুইভাগে ভাগ করে দেয়:
১. কুরআন গ্রহণকারী মানবদল।
২. কুরআন বর্জনকারী মানবদল।
এ জন্যেই কুরআনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ও বিশেষণ হলো 'আল ফুরকান'। ফুরকান মানে- (সত্যাসত্যের) বিভক্তকারী, পার্থক্যকারী, (the criterion between right and wrong)। মহান আল্লাহ বলেন :
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَ بَيِّنَتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ অর্থ: রমযান মাস! এ মাসেই নাযিল করা হয়েছে আল কুরআন- যা মানবজাতির জীবন যাপনের পথ নির্দেশ, সঠিক পথ নির্দেশের সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং (সত্যাসত্যের মধ্যে) পার্থক্যকারী ও বিভক্তকারী। (সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ১৮৫)
تَبْرَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَلَمِينَ نَذِيرًا অর্থ: মহা মহীয়ান তিনি, যিনি তাঁর দাসের প্রতি নাযিল করেছেন আল ফুরকান (বিভক্তকারী ও পার্থক্যকারী কিতাব), যাতে সে বিশ্ববাসীর জন্যে সতর্ককারী হয়। (সূরা ২৫ আল ফুরকান: আয়াত ১)
এটাই আল্লাহ্ নিয়ম। তিনি যখনই কোনো রসূল পাঠিয়েছেন, রসূল নিজে এবং তাঁর প্রতি অবতীর্ণ কিতাব ছিলো মানুষকে এক বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধকারী এবং বিশ্বাস অবিশ্বাসের ভিত্তিতে বিভক্তকারী। তাই ঈসা মসীহ আলাইহিস্ সালাম ইসরায়েলীদের বলেছিলেন:
"আমি মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড় করাইতে আসিয়াছি; ছেলেকে পিতার বিরুদ্ধে; মেয়েকে মায়ের বিরুদ্ধে, বউকে শাশুড়ির বিরুদ্ধে দাঁড় করাইতে আসিয়াছি।” (মথি/১০: ৩৫)
সুতরাং কুরআনের ভিত্তিতে মানুষ দুইভাগে বিভক্ত:
১. কুরআনের প্রতি বিশ্বাসী মানব সমাজ এবং
২. কুরআনের প্রতি অবিশ্বাসী মানব সমাজ।