📘 কুরআন বোঝার পথ ও পাথেয় > 📄 অনুসরণ করা ছাড়া সুফল লাভ করা যায়না

📄 অনুসরণ করা ছাড়া সুফল লাভ করা যায়না


কিন্তু, যে কোনো বাণীর মতোই আল কুরআনের বাণীও বিমূর্ত উপদেশ ও পথ-নির্দেশই বটে। শুধু অনুসরণ, অনুবর্তন এবং বাস্তবায়ন করার মাধ্যমেই আল্লাহর বাণী হয়ে উঠতে পারে মূর্ত এবং মানুষ লাভ করতে পারে তার সুফল ও কার্যকারিতা। আর মূলত মানা ও বাস্তবায়ন করার জন্যেই নাযিল করা হয়েছে আল কুরআন। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

ذلِكَ أَمْرُ اللهِ أَنْزَلَهُ إِلَيْكُمْ وَمَنْ يَتَّقِ اللهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّاتِهِ وَيُعْظِرْ لَهُ أَجْرًاه

অর্থ: এ (কুরআন) হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশ (command), এটি তিনি তোমাদের প্রতি নাযিল করেছেন। অতএব যে-ই আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করাকে ভয় করে চলবে এবং আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় জীবন যাপন করবে, তার অপরাধসমূহ মুছে দেয়া হবে এবং সম্প্রসারিত (enlarge) করা হবে তার জন্যে শুভ পুরস্কার।' (সূরা ৬৫ আত তালাক: আয়াত ৫)

وَهَذَا كِتَبٌ أَنْزَلْنَهُ مُبْرَكَ فَاتَّبِعُوهُ وَاتَّقُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

অর্থ: আর আমাদের অবতীর্ণ এ কিতাব সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। তাই তোমরা এটিকে অনুসরণ করো, মেনে চলো এবং (এতে প্রদত্ত) নির্দেশ অমান্য করাকে ভয় করো। আশা করা যায় এভাবেই তোমরা (আল্লাহর) অনুকম্পা লাভ করতে সক্ষম হবে।' (সূরা ৬ আল আনআম: আয়াত ১৫৫)

وَكَذَلِكَ أَنْزَلْنَهُ حُكْمًا عَرَبِيًّا ، وَلَئِنِ اتَّبَعْتَ أَهْوَاءَهُمْ بَعْدَ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ لَا مَالَكَ مِنْ اللَّهِ مِنْ وَلِي وَلَا وَاق

অর্থ : এভাবেই আমরা এ কুরআনকে আরবি ভাষায় নাযিল করেছি (কর্তৃপক্ষের) চূড়ান্ত রায় হিসেবে। (হে মুহাম্মদ!) আল্লাহর বিধানের জ্ঞান তোমার কাছে পৌঁছে যাবার পরও যদি তুমি তাদের খেয়াল খুশি ও দাবির অনুসরণ করো, তবে তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে না কোনো অভিভাবক পাবে আর না কোনো রক্ষক।' (সূরা ১৩ আর রা'দ : আয়াত ৩৭)

وَلَقَدْ يَসَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرِه

অর্থ: অবশ্যি আমরা এ কুরআন বুঝার জন্যে সহজ করে নাযিল করেছি। অতএব কে আছে এ থেকে উপদেশ গ্রহণ করবে? (সূরা ৫৪ আল কামার: আয়াত ৪০)

وَالَّذِينَ كَفَرُوا فَتَعْسًا لَّهُمْ وَأَضَلَّ أَعْمَالَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ

অর্থ: যারা (আল্লাহর হুকুম) অমান্য করছে তাদের ধ্বংস নিশ্চিত। আর আল্লাহ তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করে দিয়েছেন। এমনটি এজন্যে করেছেন যেহেতু তারা আল্লাহর অবতীর্ণ বিধানকে অনুসরণ করতে অপছন্দ করেছে। ফলে তিনি তাদের সমস্ত আমল ও কার্যক্রম নিষ্ফল বানিয়ে দিয়েছেন।' (সূরা ৪৭ মুহাম্মদ: আয়াত ৮-৯)

إِنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ لِلنَّাসِ بِالْحَقِّ ، فَمَنِ اهْتَدَى فَلِنَفْسِهِ ، وَمَنْ ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا

অর্থ: (হে মুহাম্মদ!) আমরা গোটা মানব সমাজের জন্যে এ মহাসত্য কিতাব (কুরআন) তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি। এখন যে ব্যক্তিই এতে প্রদর্শিত পথের অনুসরণ করবে, তাতে সে নিজেরই কল্যাণ করবে।' (সূরা ৩৯ যুমার: আয়াত ৪১)

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ تَنْزِيلاً ، فَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ وَلَا تُطِعْ مِنْهُمْ آثِمًا أَوْ كَفُورًا .

অর্থ: (হে মুহাম্মদ!) আমরা তোমার প্রতি আল কুরআন নাযিল করেছি অল্প অল্প করে (by stages)। অতএব, তুমি দৃঢ়তার সাথে তোমার প্রভুর নির্দেশ পালনে অটল থাকো। আর তাদের (সমাজের) মধ্যকার কোনো পাপিষ্ঠ কিংবা অবিশ্বাসীর আনুগত্য-অনুসরণ করো না।' (সূরা ৭৬ আদ দাহার: আয়াত ২৩-২৪)

এ আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার হয়ে গেলো, মানুষের স্রষ্টা মহান আল্লাহ আল কুরআন নাযিল করেছেন মানুষের কল্যাণের জন্যে। তিনি কুরআন নাযিল করেছেন মানুষের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি হিসেবে, যাতে করে মানুষ কুরআনের ভিত্তিতে জীবন যাপন করে। যাতে করে মানুষ বাস্তব জীবনে কুরআন মেনে চলা ও অনুসরণ করার মাধ্যমে অর্জন করে দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি ও কল্যাণ। এ আয়াতগুলোর সার কথা হলো:
- কুরআন হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশ (Command)।
- যারা আল্লাহর এই নির্দেশের ভিত্তিতে জীবন যাপন করবে তাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং তাদের দেয়া হবে সম্প্রসারিত পুরস্কার।
- কুরআন মানুষের সৌভাগ্যের চাবিকাঠি যদি মানুষ কুরআন মেনে চলে এবং এর ভিত্তিতে জীবন যাপন করে।
- কুরআন মহাবিশ্বের একমাত্র কর্তৃপক্ষ মহান আল্লাহ প্রদত্ত রায়। কুরআন বাদ দিয়ে মানব রচিত নিয়ম-বিধি অনুসরণ করা মানে আল্লাহর অভিভাবকত্ব থেকে বিমুখ হওয়া।
- কুরআন বুঝা এবং এ থেকে উপদেশ গ্রহণ করা খুবই সহজ।
- আল্লাহর হুকুম অমান্য করা মানে নিজেকে ধ্বংসের গহ্বরে নিক্ষেপ করা।
- কুরআন অমান্যকারীদের সমস্ত কর্মতৎপরতা নিষ্ফল যাবে।
- যে ব্যক্তি কুরআনের অনুসরণ করবে সে নিজেরই কল্যাণ করবে।
- কুরআন ভাগে ভাগে নাযিল করা হয়েছে দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর নির্দেশের উপর অটল থাকার জন্যে।
- কুরআন অমান্যকারী পাপিষ্ঠদের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব অস্বীকার ও অমান্য করতে হবে।

একথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেলো, মানুষ যদি শান্তি, মুক্তি ও কল্যাণ চায়, তবে তাকে অবশ্যই আঁকড়ে ধরতে হবে আল কুরআন। এছাড়া শান্তি মুক্তি ও কল্যাণের বিকল্প কোনো পথ নেই। তাছাড়া যারা আল্লাহর বাণী হিসেবে আল কুরআনের প্রতি ঈমান রাখেন, শুধুমাত্র আল কুরআনের অনুসরণ ও বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত রয়েছে তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তি ও সাফল্যের গ্যারান্টি। অপরদিকে কুরআনের অনুসরণ ও বাস্তবায়নের পথ পরিত্যাগ করাই হলো তাদের ধ্বংস ও অধ:পতনের উন্মুক্ত গহ্বর।

📘 কুরআন বোঝার পথ ও পাথেয় > 📄 মানার কিতাব বুঝার কিতাব আল কুরআন

📄 মানার কিতাব বুঝার কিতাব আল কুরআন


আল্লাহ যখনই কোনো নবীর মাধ্যমে কোনো জাতির কাছে কিতাব নাযিল করেছেন, তা করেছেন অনুসরণ, অনুকরণ করার জন্যে এবং সে কিতাব অনুযায়ী জীবন যাপন করার জন্যে। তিনি এই একই উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ সা.-এর মাধ্যমে মানুষের জন্যে কুরআন নাযিল করেছেন। একথা তিনি কুরআনে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন:

وَهُذَا كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ مُبٰرَكٌ فَاتَّبِعُوْهُ وَاتَّقُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ اَنْ تَقُوْلُوْا إِنَّمَآ اُنْزِلَ الْكِتٰبُ عَلٰى طَآئِفَتَيْنِ مِنْ قَبْلِنَا ص وَإِنْ كُنَّا عَنْ دِرَاسَتِهِمْ لَগٰفِلِيْنَ اَوْ تَقُوْلُوْا لَوْ اَنَّا اُنْজِلَ عَلَيْنَا الْكِتٰبُ لَكُنَّآ اَهْدٰى مِنْهُمْ فَقَدْ جَآءَكُمْ بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَهُدًى وَّرَحْمَةٌ ، فَمَنْ اَظْلَمُ مِمَّنْ كَذَّبَ بِاٰيٰতِ اللّٰهِ وَصَدَفَ عَنْهَا سَنَجْزِى الَّذِيْنَ يَصْدِفُوْنَ عَنْ اٰيٰতِنَا سُوْءَ الْعَذَابِ بِمَا كَانُوْا يَصْدِفُوْنَ

অর্থ: আর আমি এ কিতাব নাযিল করেছি একটি আশীর্বাদপূর্ণ (blessed) কিতাব হিসেবে। কাজেই তোমরা এর অনুসরণ করো এবং (এর নির্দেশ অমান্য করার ক্ষেত্রে) আল্লাহকে ভয় করো। এভাবেই তোমরা লাভ করবে অনুকম্পা (mercy)। (এ কিতাব অবতীর্ণের পর) এখন আর তোমরা একথা বলতে পারবে না যে: কিতাব তো দেয়া হয়েছিল আমাদের পূর্বের দুটি দলকে (ইহুদি ও খ্রিষ্টানদেরকে) এবং তারা তাতে কী পাঠ করতো, তাতো আমরা কিছুই জানিনা।' কিংবা এখন আর তোমরা এ অভিযোগও করতে পারবে না যে: আমাদের প্রতি যদি কিতাব নাযিল হতো, তবে আমরা ওদের চাইতে অধিক সঠিক পথের অনুসারী হতাম।' সুতরাং এখন আর এসব কথা বলার সুযোগ নেই। এখন তো তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এক সুস্পষ্ট প্রমাণ (clear proof), পথনির্দেশ (guidance) এবং অনুকম্পা (mercy) এসেছে। এখন যে ব্যক্তি আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করবে এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার চাইতে বড় ভুল আর কে করবে? যারা আমার আয়াত (কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তাদের এই সত্য বিমুখতার কারণে আমি তাদের নিকৃষ্ট আযাবে (evil torment) নিমজ্জিত করবো।' (সূরা ৬ আল আন'আম : আয়াত ১৫৫-১৫৭)

এ আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার হয়ে গেলো যে, কুরআন নাযিল করা হয়েছে অনুসরণ করার জন্যে। স্বয়ং আল্লাহ কুরআনকে অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর অনুসরণ করার জন্যে অবশ্যই কুরআন পড়তে এবং বুঝতে হবে। কিতাব নাযিল না করলে না পড়ার, না বুঝার ও অনুসরণ না করার ক্ষেত্রে যুক্তিসংগত অভিযোগ থাকতে পারতো, কিন্তু এখন আর সে অভিযোগ করার সুযোগ নেই। এখন যে ব্যক্তি কুরআন বুঝার ও অনুসরণ করার চেষ্টা করবে না, সে সব চাইতে বড় যালিম। সে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট শাস্তি ভোগ করবে।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনের মাধ্যমে মানুষকে যে পথ প্রদর্শন করেছেন, তা-ই সত্য সঠিক পথ। এটাই দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি, কল্যাণ ও সাফল্যের পথ। এ জন্যে কুরআন প্রদর্শিত পথ হচ্ছে নূর বা আলো। এ ছাড়া বাকি সব মত ও পথ হচ্ছে অন্ধকার। কারণ বাকি সবই জাহান্নামের পথ। আল্লাহ তায়ালা কুরআন নাযিল করেছেন মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে আনার জন্যে:

الوقف كتُبْ أَنْزَلْتُهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَتِ إِلَى النُّورِ

অর্থ : হে মুহাম্মদ! এটি একটি কিতাব। আমরা এটি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে করে তুমি মানুষকে অন্ধকার রাশি থেকে আলোতে নিয়ে আসো।' (সূরা ১৪ ইবরাহিম : আয়াত ১)

فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ لَا أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

অর্থ: কাজেই যারা তাঁর (রসূলের) প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, সাহায্য-সহযোগিতা করে এবং তার প্রতি যে নূর (আল কুরআন) অবতীর্ণ হয়েছে- তা মেনে চলে, তারাই হবে সফলকাম।' (সূরা ७ আ'রাফ: আয়াত ১৫৭)

هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَى عَبْدِهِ أَيْتَ ، بَيِّنَتٍ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَتِ إِلَى النُّورِ

অর্থ: তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি তাঁর দাসের প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ (কুরআন) নাযিল করেছেন, যাতে করে তিনি তোমাদের বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোতে।' (সূরা ৫৭ আল হাদীদ: আয়াত ৯)

এ আয়াতগুলোতে কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে, তাহলো মানুষকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোতে নিয়ে আসা। যে ব্যক্তি কুরআন বুঝলো না, তার কাছে তো আলো আর অন্ধকার দুটোই সমান। সুতরাং আলো দেখতে হলে কুরআন বুঝতে হবে। কুরআন না বুঝলে আলোতে আসার সুযোগ কোথায়?

কুরআন বলছে, আল্লাহ তায়ালা কুরআন নাযিল করেছেন যেনো মানুষ কুরআনের বক্তব্য বিষয় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে, তা থেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করে:

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ط وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيْهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا

অর্থ: এরা কি এ কুরআনকে চিন্তাভাবনা ও বিচার বিবেচনা (consider) করে দেখে না? এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো রচিত হতো, তবে অবশ্যই তারা এতে বক্তব্যের অসংগতি খুঁজে পেতো।' (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ৮২)

كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ إِلَيْكَ مُبٰرَكٌ لِّيَدَّبَّرُوْٓا اٰيٰتِهٖ وَلِيَتَذَكَّرَ اُولُوا الْاَلْبَابِ

অর্থ: এটি একটি বই। আমরা এটি তোমার কাছে অবতীর্ণ করেছি। এটি একটি আশীর্বাদ। এই আশীর্বাদ গ্রন্থ আমরা এজন্যে নাযিল করেছি যাতে করে মানুষ এর আয়াতগুলো সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে এবং বুঝ-বিবেকওয়ালা লোকেরা যেনো এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।' (সূরা ৩৮ সোয়াদ: আয়াত ২৯)

اَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْاٰنَ اَمْ عَلٰى قُلُوبٍ اَقْفَالُهَا

অর্থ: তারা কি মনোযোগ সহকারে কুরআন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরগুলোতে তালা লাগানো রয়েছে?' (সূরা ৪৭ মুহাম্মদ: আয়াত ২৪)

এই তিনটি আয়াতেই যারা কুরআন বুঝার চেষ্টা করে না এবং মনোযোগ সহকারে কুরআন নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে না, আল্লাহ তায়ালা তাদের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, কুরআন যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো রচিত হতো, তবে এতে অনেক অসংগতি ও স্ববিরোধী বক্তব্য পাওয়া যেতো, কিন্তু যারা কুরআন বুঝে এবং কুরআন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে, তাদের কাছে একথা পরিষ্কার যে, কুরআনে কোনো অসংগতি নেই, কোনো স্ববিরোধী বক্তব্য নেই। তাই এটি কিছুতেই আল্লাহ ছাড়া আর কারো রচিত হতে পারে না। কেবল আল্লাহর বাণীই এমন সুসামাঞ্জস্যপূর্ণ ও সুবিন্যস্ত (well-ordered) হতে পারে।

যারা কুরআন বুঝে না, তাদের পক্ষে কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে প্রমাণ করার সুযোগ নেই।
- সূরা সোয়াদের আয়াতটিতে বলা হয়েছে, কুরআন নাযিলই করা হয়েছে বুঝার জন্যে, চিন্তাভাবনা করে দেখার জন্যে।
- বলা হয়েছে, বুঝ-বুদ্ধিওয়ালা লোকেরাই কুরআন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
- সূরা মুহাম্মদের আয়াতটিতে বলা হয়েছে, যারা কুরআন থেকে বুঝার চেষ্টা করে না, কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না, তাদের অন্তরে তালা লেগে আছে।

সম্মানিত পাঠকগণের ভেবে দেখার জন্যে বলছি, দেখুন, মানুষ চোখ দিয়ে দেখে, কান দিয়ে শুনে, হাত দিয়ে স্পর্শ করে, মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে; কিন্তু এই অঙ্গগুলো দিয়ে বুঝতেও পারে না, উপলব্ধিও করতে পারে না। মানুষ বুঝে এবং উপলব্ধি করে তার অন্তর ও মন-মস্তিস্ক দিয়ে। যারা তাদের মন-মস্তিস্ক কাজে লাগায় না, তাদের চোখ কী দেখলো তার খবর তারা রাখে না। তাদের কান কী শুনলো সে খবর তারা রাখে না। তাদের শরীরে কিসের স্পর্শ লাগলো, সে বোধ তাদের থাকে না। তাদের মুখ কী পাঠ করলো তাদের মর্মে তা পৌঁছে না। তাই বলা হয়েছে তাদের অন্তরে তালা লেগে আছে। যারা কুরআন বুঝার চেষ্টা করে না, মন-মস্তিস্ক খাটায় না এবং বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগায় না, তাদের সম্পর্কে কুরআন বলে:

وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا الْفَيْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا ، أَوَلَوْ كَانَ آبَاؤُهُمْ لا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَ لا يَهْتَدُونَ وَمَثَلُ الَّذِينَ كَفَرُوا كَمَثَلِ الَّذِي يَنْعِقُ بِمَا لَا يَسْمَعُ إِلَّا دُعَاءً وَ نِدَاءٌ ، صُمَّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لا يَعْقِلُونَ

অর্থ: আর যখন তাদের বলা হয়: আল্লাহ (কুরআনে) যে বিধান নাযিল করেছেন, তোমরা তা মেনে চলো।' তখন তারা বলে: 'আমাদের বাপ-দাদারা যে পথে চলেছে, আমরা সে পথেই চলবো।' আচ্ছা, তাদের বাপ-দাদারা যদি বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে না থাকে এবং সঠিক পথ লাভ করে না থাকে, তবু কি তারা তাদের অনুসরণ করবে? যারা আল্লাহর নাযিল করা বিধান মুতাবিক চলতে অস্বীকার করে, তাদের উপমা হলো রাখালের পশু। রাখাল তার পশুকে ডাকে, কিন্তু পশু তার ডাকাডাকির শব্দ (আওয়াজ) ছাড়া আর কিছুই শুনে না (বুঝে না)। আসলে এই লোকেরা কালা, বোবা, অন্ধ। তাই তারা কিছুই বুঝতে পারে না।' (সূরা ২ আল বাকারা: আয়াত ১৭০-১৭১)

وَجَعَلْنَا لَهُمْ سَمْعًا وَأَبْصَارًا وَأَفْئِدَةً فَمَا أَغْنَى عَنْهُمْ سَمْعُهُمْ وَلَا أَبْصَارُهُمْ وَلَا أَفْئِدَتُهُمْ مِنْ شَيْءٍ إِذْ كَانُوا يَجْحَدُونَ بِآيَاتِ اللَّهِ .

অর্থ: আমি তাদের কান দিয়েছিলাম, চোখ দিয়েছিলাম, অন্তর দিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহর আয়াতকে অমান্য-অস্বীকার করার কারণে তাদের কান তাদের কোনো উপকার করেনি, তাদের চোখ তাদের কোনো উপকারে আসেনি, আর তাদের অন্তর তাদের কোনো কাজে আসেনি।' (সূরা ৪৬ আল আহকাফ: আয়াত ২৬)

فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِنْ تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ

অর্থ: আসলে তাদের চোখ অন্ধ নয়, বরং অন্ধত্ব চেপে বসেছে তাদের বুকের মধ্যকার অন্তরে।' (সূরা ২২ আল হজ্জ : আয়াত ৪৬)

وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مستوراة وجَعَلْنَا عَلَى قُلُوبِهِمْ أَكِنَّةً أَن يَفْقَهُوهُ وَفِي آذَانِهِمْ وَقْرًا

অর্থ: তুমি যখন কুরআন পড়ো (পেশ করো), তখন আমরা তোমার ও আখিরাতে অবিশ্বাসীদের মাঝখানে একটি পর্দা ঝুলিয়ে দিই এবং তাদের অন্তরের উপর আবরণ ছড়িয়ে দিই যাতে করে তারা তা (কুরআন) না বুঝে, তাছাড়া তাদের কানেও তালা লাগিয়ে দিই।' (সূরা ১৭ বনি ইসরাঈল: আয়াত ৪৫-৪৬)

كَلابَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ

অর্থ: কখনো নয়, বরং আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করার কারণে তাদের অন্তরে মরীচিকা পড়ে গেছে।' (সূরা ৮৩ মুতাফফিকীন: আয়াত ১৪)

এ আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়, যারা কুরআন অস্বীকার করে, তারা তাদের বিরোধিতার কারণে কুরআনকে হৃদয়ংগম করতে পারে না, কুরআনের মর্ম উপলব্ধি করতে পারে না।
- যারা অর্থ না বুঝে কুরআনের শব্দ উচ্চারণ করাকেই যথেষ্ট মনে করে, তাদের উপমা হচ্ছে রাখালের ভেড়া, যারা রাখালের কথার শব্দ শুনে, কিন্তু মর্ম বুঝে না।
- যারা অর্থ ও মর্ম না বুঝে কুরআন পড়ে, তাদের ও কুরআনের মাঝখানে একটা পর্দা ঝুলে আছে। তারা কুরআনের শব্দ শুনে, তবে কুরআনকে দেখে না।

📘 কুরআন বোঝার পথ ও পাথেয় > 📄 আপনার বিবেক কী বলে?

📄 আপনার বিবেক কী বলে?


আপনি পুরুষ হোন কিংবা মহিলা, আপনার কাজের জন্যে আপনাকে একান্ত ব্যক্তিগতভাবেই জবাবদিহি করতে হবে আল্লাহর কাছে। তাই আপনাকে আহ্বান জানাচ্ছি, আপনি যে কোনো দৃষ্টিভঙ্গিই পোষণ করুন না কেন, একবার কুরআন পড়ে দেখুন। মুক্ত ও নিরপেক্ষ মনে এ গ্রন্থটিকে অধ্যয়ন করুন। আপনার বিবেক, নিরপেক্ষ মন আর মানবিক যুক্তি যদি এ মহাগ্রন্থকে গ্রহণ করে, তবে আসুন, আপনি এ গ্রন্থকে আঁকড়ে ধরুন। বিবেক ও যুক্তিকে সম্মান দিন।

আপনি তো কতো গ্রন্থ, কতো বই-পুস্তকই পড়েন। সকল বই পত্রের মতো আল কুরআন পড়বার অধিকারও আপনার আছে। আপনি কেন বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত এই মহা গ্রন্থকে উপেক্ষা করছেন? এর ফলে কি আপনি এক বিরাট জিনিস হারাচ্ছেন না? আপনি সব ব্যাপারেই সক্রিয় হতে পারলে কুরআন পাঠের ব্যাপারে কেন সক্রিয় হতে পারবেন না?

তাই আসুন, কুরআন পড়ুন এবং কুরআনের সত্যতা, অকাট্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে বিবেকের কাছে প্রশ্ন করুন। বিবেক যদি এটিকে গ্রহণ করে, তবে আপনার পক্ষে বিবেকের বিরুদ্ধে যাওয়া কি ঠিক হবে?

পৃথিবীতে যতো বই পুস্তক ও গ্রন্থই লেখা হয়, সেটা যেকোনো বিষয়েই লেখা হয়ে থাক না কেন, হোক তা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, হোক সমাজ বিজ্ঞান, হোক আইন-কানুন, কিংবা হোক তা অন্য কোনো বিষয়ের, তা মূলত লেখা হয় অনুসরণ, বাস্তবায়ন ও কার্যকর করার জন্যে। ব্যক্তিগত চিঠি থেকে আরম্ভ করে পত্র-পত্রিকা পর্যন্ত সবকিছু থেকেই মানুষ সংবাদ, তথ্য, তত্ত্ব, উপদেশ, সতর্কতা, কর্মনীতি, কর্মপন্থা ও নির্দেশিকা গ্রহণ করে।

অথচ আল কুরআন হলো মানুষের স্রষ্টা, মালিক ও প্রতিপালক মহান আল্লাহর বাণী। এ বাণীতে তিনি গোটা মানব জাতির জন্যে জীবন যাপনের হিদায়াত বা নির্দেশিকা প্রদান করেছেন। তাই মানুষের উচিত দুনিয়ার যে কোনো বই পুস্তক ও গ্রন্থের চাইতে আল কুরআনকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে, অতীব গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এবং অপরিহার্য বিধান হিসেবে গ্রহণ করে পাঠ করা, শিখা, বুঝা এবং এর মর্ম উপলব্ধি করা। সেই সাথে জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল কুরআনের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা। এ গ্রন্থে প্রদত্ত নির্দেশিকার আলোকে ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ উদ্দেশ্যে সর্বত্র কুরআনের আলো ছড়িয়ে দেয়া। ব্যাপকভাবে কুরআন শিখা, বুঝা এবং শিক্ষাদানের আয়োজন করা আর কুরআন চর্চার আন্দোলন গড়ে তোলা। আপনার বিবেক কি এই অকাট্য যুক্তি অগ্রাহ্য করবে?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00