📘 কুরআন বোঝার পথ ও পাথেয় > 📄 কুরআন সর্বাঙ্গীন ও পূর্ণাঙ্গ মু’জিযা (Perfect Miracle)

📄 কুরআন সর্বাঙ্গীন ও পূর্ণাঙ্গ মু’জিযা (Perfect Miracle)


কুরআন মজিদ সকল দিক থেকে, সর্বাঙ্গীনভাবে এবং সকল বিবেচনায় এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অপ্রতিহত মু'জিযা। এই মু'জিযা শাশ্বত, চিরন্তন ও জীবন্ত। এই মু'জিযা সর্বব্যাপী ও চিরবিস্ময়। আল কুরআনের এই মু'জিযা প্রধানত এর: ১. ভাষাগত, ২. ভাবগত, ৩. গুণগত, ৪. জ্ঞানগত, ৫. বোধগত, ৬. বুদ্ধিগত (যুক্তিগত), ৭. ফলগত, ৮. প্রভাবগত, ৯. প্রত্যয়গত, ১০. সত্যতাগত, ১১. শুদ্ধতাগত, ১২. সুরক্ষাগত।

এই সকল দিক থেকেই কুরআন বিস্ময়কর মু'জিযা। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি কুরআন মজিদে মু'জিযাকে বলা হয়েছে আয়াত। আয়াত-এর আভিধানিক অর্থ চিহ্ন বা নিদর্শন। আল্লাহ তায়ালা নিজেই কুরআন মজিদের একটি নাম নির্ধারণ করেছেন আয়াতুল্লাহ (آيَاتُ ٱللَّٰهِ) অর্থাৎ আল্লাহর নিদর্শন। আবার কুরআনের প্রতিটি বাক্যকেও পৃথক পৃথক ভাবে আয়াত (নিদর্শন) বলা হয়। এর অর্থ সামগ্রিকভাবে গোটা কুরআন এবং পৃথকভাবে এর প্রতিটি বাক্য একেকটি মু'জিযা।

📘 কুরআন বোঝার পথ ও পাথেয় > 📄 আল কুরআনের জীবন্ত ও বিস্ময়কর মু’জিযা সমূহ

📄 আল কুরআনের জীবন্ত ও বিস্ময়কর মু’জিযা সমূহ


০১. অদৃশ্য স্রষ্টার দৃশ্য বাণী: মানুষ তার স্রষ্টাকে দেখেনা, তিনি অদৃশ্য। কিন্তু আমরা তাঁর বাণী পড়ি, দেখি, শুনি, পড়ে আন্দোলিত হই। কুরআন অনুভব ও বিশ্বাসে আমাদেরকে স্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়। আমরা কথা বলি আমাদের প্রিয় প্রভুর সাথে কুরআনের ভাষায়।

০২. কুরআন বার্তা প্রেরণ এবং গ্রহণের বিস্ময় message sending and receiving miracle: আরেক অনন্য মুজিযা হলো, সীমাহীন দূরত্ব থেকে বার্তা প্রেরণ ও গ্রহণ কৌশল। অথচ রসূলের কাছে তখন কোনো যন্ত্র ছিলোনা।

০৩. নিরক্ষর ব্যক্তির হৃদয়ে মহাজ্ঞান ভাণ্ডার: মানুষ বিস্ময়ে কিংকর্তব্য বিমূঢ়। তাই তারা এটার মানবীয় ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করে কবিতা, ম্যাজিক, জ্যোতির্বিদ্যা, জিনে ধরা, পাগলের বার্তা ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে। কিন্তু নিজেদের এসব মন্তব্যের উপর নিজেরাও স্থির থাকতে পারেনা।

০৪. বিস্ময়করভাবে ২৩ বছরের বিচ্ছিন্ন বার্তা সমূহ স্মৃতিতে অবিচ্ছিন্ন ধারণ।

০৫. অফুরন্ত জ্ঞান ভাণ্ডার: কুরআন মজিদ জ্ঞানের এক অফুরন্ত ফল্গুধারা যা কখনো ফুরায় না। এর জ্ঞানভাণ্ডার অতীতের গর্ভে বিলীন হয়না এবং ভবিষ্যতের আগমনে অকেজো হয়না। সূর্যালোকের মতো প্রতিদিনই ঘটে এর জ্ঞানের নবোদয়।

০৬. সত্য অনির্বাণ: একদিকে অবতীর্ণের সূচনা থেকে কুরআনের সত্যতা ছিলো অনাবিল স্বচ্ছ। অপরদিকে মানব জ্ঞানের পরিধি যতোই বাড়ছে, ততোই প্রকাশিত ও বিকশিত হচ্ছে আল কুরআনের বিস্ময় ও সত্যতা।

০৭. সার্বজনীনতা: আল কুরআনের আরেক বিস্ময় হলো এর সার্বজনীনতা। কুরআন বলছে তাকে অবতীর্ণ করা হয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্যে (সূরা ২:১৮৫, ১৪:০১)। বিগত দেড় হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষী বিশ্বের সর্বগোত্র, সর্বজাতি, সর্বধর্ম, সর্বভাষা, সর্ববর্ণ এবং সর্বশ্রেণীর নারী কিংবা নর যে-ই কুরআন শুনেছে, পাঠ করেছে এবং হৃদয়ঙ্গম করেছে, সে-ই কুরআনকে হৃদয় দিয়েছে, এর প্রতি ঈমান এনেছে এবং এটিকে জীবন যাপনের গাইড বুক হিসেবে গ্রহণ করেছে।

০৮. কুরআন কাঁপিয়ে দেয় পাষাণের হৃদয়: আরব কি অনারব, যে-ই মনোযোগ দিয়ে কুরআন পড়ে, বুঝার চেষ্টা করে কুরআনের বক্তব্য, যতোই পাষাণ হৃদয় হোক তার, কুরআন কাঁপিয়ে তোলে তার সত্তাকে। তারপর বিগলিত করে দেয় তার হৃদয় মন। উমর থেকে নিয়ে আহমদ দীদাত এবং হাজারো আধুনিক মানুষ পর্যন্ত ১৪শ বছরের ইতিহাস এর সাক্ষী।

০৯. কুরআন শত্রুকে আপন করে দেয়: আল্লাহর রসূলের যারা ছিলো জানের শত্রু, কুরআন শুনে কিংবা কুরআন পড়ে তারা হয়ে যায় তাঁর প্রাণের বন্ধু। উমর, আমর, আকরামা এবং খালিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ইতিহাস তো আর ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি। আজো অব্যাহত রয়েছে সেই ধারা। থাকবে চিরকাল। এ এক মহাবিশ্বয়।

১০. ভাষাবিশারদ মহা পণ্ডিতরা সব কুপোকাত: যারা ধারণা করেছিল, কিংবা শত্রুতার বশে বা বিদ্বেষ বশে বলেছিল, কুরআন স্রষ্টার বাণী নয়। এগুলো কোনো কবির শিখিয়ে দেয়া বুলি, কিংবা জিনেরা শিখিয়ে দেয়, কিংবা কোনো ভাষাবিশারদ রাতে এসে মুখস্ত করিয়ে দেয়, কিংবা সবই ম্যাজিক, কিংবা অতীতের কাহিনী মাত্র; কুরআন তাদেরকে অনুরূপ একটি কুরআন, কিংবা অন্তত একটি সূরা তৈরি করার চ্যালেঞ্জ প্রদান করে। এ চ্যালেঞ্জের সামনে সবাই জানে আরবি ভাষার রথি মহারথি কবি পণ্ডিতরা সবাই কুপোকাত।

১১. ভাষার মাধুর্য আর সুরের সম্মোহন অবিরাম নিশিদিন।

১২. প্রতিনিয়ত পঠন, পাঠন, লিখন, শিখন, বিশ্বময়। শিশু কিশোর, যুবক বৃদ্ধ, নারী পুরুষ সকলে সব সময়।

১৩. প্রতিনিয়ত হিফয এবং প্রতি যুগে লাখো লাখো হাফেযে কুরআন।

১৪. প্রতিদিন সালাতে পাঠ করে শত কোটি মানুষ।

১৫. দিবসনিশি দরস, তফসির, গবেষণার ধারা চলছে অবিরাম।

১৬. সম্পূর্ণ অবিকৃত: যেমন নাযিল হয়েছে, তেমনই আছে।

১৭. সংস্কার ও সম্পাদনা মুক্ত। এ কাজের কোনো প্রয়োজন পড়েনি, পড়বেওনা।

১৮. কোনো প্রকার বিরোধপূর্ণ বক্তব্য নেই: সবই পরিপূরক।

১৯. সকল তত্ত্ব ও তথ্য সত্য প্রমাণিত: যেমন সব কিছুর জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি (সূরা জারিয়াত: ৪৯) মাতৃগর্ভে সন্তানের ক্রমবিকাশ প্রক্রিয়া (সূরা মু'মিনুন ১২-১৪) এবং আরো অনেক বিষয়।

২০. সকল ভবিষ্যৎ বাণী সত্য প্রমাণিত: যেমন নবীকে মক্কায় ফিরিয়ে নেয়ার ঘোষণা (সূরা কাসাস: ৮৫), মক্কা বিজয় (সূরা আল ফাতহ: ১)।

২১. তাৎপর্য সমূহ উন্মোচিত হয়ে চলেছে: জ্ঞান গবেষণার ক্রমোন্নতি এবং ভবিষ্যতের আগমন ক্রমেই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর ভাবে প্রকাশ করে চলেছে কুরআনের বক্তব্য ও তত্ত্ব সমূহের তাৎপর্য।

২২. স্রষ্টা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেশ: তাঁর এককত্ব, অনন্যতা ও সঠিক মর্যাদা প্রকাশ করা হয়েছে। এ যেনো একেবারে প্রত্যক্ষ জ্ঞান।

২৩. মানব জীবনের সূচনা ও ধারাবাহিকতা এবং সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে চিরন্তন ও অনাবিল গাইড লাইন।

২৪. জগত ও জীবন সম্পর্কে নিখুঁত ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন।

২৫. মানব সৃষ্টির সূচনা এবং মানব জাতির বংশগত ঐক্যের তথ্য প্রকাশ।

কুরআন এক শাশ্বত ও জীবন্ত মু'জিযা

আল কুরআন সর্বজয়ী সাবলীল বচনের অবিরল বন্ধনে, নিরেট সত্যের অবগুণ্ঠন উন্মোচনে, ভাব ব্যঞ্জনার অদম্য সম্মোহনে, অনাবিল সুরের অনুপম আবেশে অনির্বাণ। আল কুরআন শাশ্বত জীবন পদ্ধতির জ্যোতির্ময় প্রকাশে, ভাব অনুভবের অপূর্ব প্রতিফলনে, বক্তব্যের যৌক্তিকতায়, বিবেকের অভ্যর্থনায় প্রশান্তিময়। ভাষা ও বাকরীতির অনন্য উচ্চতায়, ভাব ও বাস্তবতার নিখুঁত বাঁধনে, বিষয়বস্তু ও ভাষণের অটুট সাদৃশ্যে কুরআন এক চিরন্তন বিস্ময়। সত্যের অনাবিল আলোকচ্ছটার অনুপম সম্মোহনে আল কুরআন হৃদয়াবেগ সৃষ্টিতে বহমান নদীর অবিরল ধারা। আল কুরআন আহত হৃদয়ের সান্ত্বনা আর ব্যাহত পথের নির্দেশনা। আল কুরআন সুস্থ বিবেকের প্রশান্তি এবং বক্র মানুষের মর্মজ্বালা।

কুরআনকে ভ্রান্ত বলার এবং ব্যর্থ করার সাধ্য কারো নেই। কুরআনকে নিঃশেষ করার প্রসেস মানুষের আয়ত্তে নেই।

কুরআন সর্বজয়ী সর্বজ্ঞানী সর্বস্রষ্টা মহান আল্লাহর বাণী। কুরআনের বাণী ও ভাষ্য চিরন্তন, চির শাশ্বত ও চিরঞ্জীব। বিশ্ববাসীর কাছে কুরআন এক জীবন্ত মু'জিযা। মানব সমাজের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা শুধুমাত্র আল কুরআনের অনুবর্তন কিংবা প্রত্যাখ্যানের মধ্যেই নিহিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00