📄 মু’জিযার উদ্দেশ্য কী?
নবী রসূলগণকে প্রদত্ত আয়াত বা মু'জিযার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো, নবী রসূলগণ যে আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত, সে বিষয়ে অবিশ্বাসীদের আশ্বস্ত করা এবং তারা যেনো ঈমান আনার মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়াতের অনুসারী হয় সে চেষ্টা করা। মূসা আলাইহিস সালাম ফেরাউনকে বলেছিলেন:
قَدْ جَئْتُكَ بِآيَةٍ مِنْ رَبِّكَ ، وَالسَّلِّمُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى
অর্থ: (মূসা এবং হারুণ ফেরাউনকে আরো বলেছিল) আমরা তোমার প্রভুর পক্ষ থেকে আয়াত (মু'জিযা) নিয়ে এসেছি, সুতরাং হিদায়াতের অনুসারীই শান্তি লাভ করবে। (সূরা ২০ তোয়াহা: আয়াত ৪৭)
রসূলগণ অবিশ্বাসীদের দাবির প্রেক্ষিতে আল্লাহর নিকট মু'জিযার প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু মু'জিযা প্রদর্শনের পর তারা ঈমান আনতে অস্বীকার করে এবং মু'জিযাকে ম্যাজিক বলে আখ্যায়িত করে।
রসূলগণ আশা করতেন, হয়তো তাদের দাবি অনুযায়ী মু'জিযা প্রদর্শন করলে তারা ঈমান আনবে, তাই তারা আল্লাহর কাছে মু'জিযার প্রার্থনা করতেন। আল্লাহ তায়ালা নবীগণের সান্ত্বনার জন্যে মু'জিযা প্রদান করতেন, তবে বলে দিতেন:
وَإِن يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لَا يُؤْمِنُوا بِهَا جِ
অর্থ: তারা সব আয়াত (মু'জিযা) দেখলেও তাতে ঈমান আনবেনা। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৪৬)
📄 মু’জিযার প্রকারভেদ
নবী রসূলগণকে প্রদত্ত আয়াত বা মু'জিযা প্রধানত তিন প্রকার। সেগুলো হলো: ১. কোনো অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত করা, ২. গায়েব-এর সংবাদ বলা এবং ৩. আল্লাহর বাণী।
অতীতের রসূলগণকে আল্লাহ পাক অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত করার মু'জিযা বেশি বেশি প্রদান করেন। তিনি মূসা আলাইহিস সালামকে নয়টি সুস্পষ্ট মু'জিযা প্রদান করেন।২ এর মধ্যে ছিলো লাঠির মু'জিযা, বগলে হাত ঢুকিয়ে জ্যোতির্ময় হাত বের করা, রক্ত বর্ষণ, ব্যাঙের উৎপাত ইত্যাদি। সালেহ আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন উটনির মু'জিযা।৩ ঈসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ পাক অলৌকিক ঘটনাবলী সংঘটিত করা এবং গায়েব-এর সংবাদ বলে দেয়ার মু'জিযা প্রদান করেছিলেন। ভূমিষ্ট হবার সাথে সাথে তিনি ইসরায়েলীদের নিকট নিজের নবুয়্যতের ঘোষণা প্রদান করেন।
টিকাঃ
২. সূরা ১৭ ইসরা: আয়াত ১০১; সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৩৩।
৩. সূরা ১১ হুদ: আয়াত ৬৪।
📄 আল কুরআন : মুহাম্মদ রসূলুল্লাহর সা. মু’জিযা
মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ সা.-কে ইন্দ্রীয় মু'জিযার পরিবর্তে জ্ঞানগত মু'জিযা প্রদান করা হয়েছে। তাহলো আল কুরআন। আল কুরআনের মু'জিযা হবার অর্থ- এ কিতাব অক্ষরে অক্ষরে আল্লাহর বাণী। কোনো মানুষের পক্ষে অনুরূপ কোনো গ্রন্থ রচনা করা, এমনকি এটির একটি ছোট অধ্যায়ের (সূরার) মতো কোনো অধ্যায় (সূরা) রচনা করাও একেবারেই অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে কুরআনের মোকাবেলায় মানুষ সম্পূর্ণ অসহায় এবং কুরআনের প্রতিপক্ষ হতে মানুষ সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
বিরুদ্ধবাদীরা মুহাম্মদ সা.-এর নিকট তাঁর নবুয়্যতের পক্ষে মু'জিযা দাবি করতো। রসূল সা. নিজেও ভাবতেন, ওদের দাবি অনুযায়ী কোনো মু'জিযা দেখিয়ে দিলে হয়তো লেঠা চুকে যাবে, তারা আমার নবুয়্যত মেনে নেবে। কিন্তু অতীতে কোনো নবীর বেলায় এমনটি হয়নি। তাদেরকে মু'জিযা দেয়া হয়েছিল, তারা তা জনসমক্ষে প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু তারপরও বিরোধিতাকারীরা ঈমান আনেনি। তাঁর মু'জিযা সমূহের বিষয়ে কুরআন মজিদে বলা হয়েছে:৪
اَنِّىْ قَدْ جِئْتُكُمْ بِاٰيَةٍ মِّن রَّبِّكُمْ اَنِّىْ اَخْلُقُ لَكُمْ مِّنَ الطِّيْنِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَانْفُخُ فِيهِ فَيَكُوْنُ طَيْرًا بِاِذْنِ اللّٰهِ، وَاُبْرِئُ الْاَكْمَهَ وَالْاَبْرَصَ وَاُحْيِ الْمَوْتٰى بِاِذْنِ اللّٰهِ وَاُنَبِّئُكُمْ بِمَا تَاْكُلُوْনَ وَمَا تَدَّخِرُوْনَ لَا فِى بُيُوْتِكُمْ،
অর্থ: (ঈসা ইসরায়েলীদের বলেছিল:) আমি তোমাদের প্রভুর নিকট থেকে তোমাদের জন্যে আয়াত (মু'জিযা) নিয়ে এসেছি: আমি কাদামাটি দিয়ে পাখির আকৃতি তৈরি করে তাতে ফুঁ দেবো। ফলে আল্লাহর হুকুমে তা (জীবন্ত) পাখি হয়ে যাবে। আমি জন্মান্ধ এবং কুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করে দেবো এবং মৃতকে জীবিত করবো আল্লাহর হুকুমে। আর তোমরা ঘরে যা খাও এবং যা সঞ্চয় করো সে বিষয়ে তোমাদের খবর দেবো। (সূরা ৩ আলে ইমরান: আয়াত ৪৯)
তাই মুহাম্মদ সা.-কে জানিয়ে দেয়া হলো:
وَإِن يَرَوْا كُلَّ آيَةٍ لَّا يُؤْمِنُوا بِهَا جِ
অর্থ: তারা আমার প্রতিটি আয়াত (মু'জিযা) দেখলেও তাতে ঈমান আনবেনা। (সূরা ৭ আ'রাফ: আয়াত ১৪৬)
আল্লাহর পক্ষ থেকে রসূল সা.-কে জানিয়ে দেয়া হলো এবং পরামর্শ দেয়া হলো:
وَإِذَا لَمْ تَأْتِهِرْ بِآيَةٍ قَالُوا لَوْলَا اجْتَبَيْتَهَا ، قُلْ إِنَّمَا أَتَّبِعُ مَا يُوحَى إِلَى مِن ربِّي جَ هَذَا بَصَائِرُ مِنْ رَّبِّكُمْ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِকَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
অর্থ: তুমি যখন তাদের সামনে কোনো আয়াত (মু'জিযা) পেশ করছোনা, তখন তারা বলে: তুমি নিজের (নবুয়্যত প্রমাণের) জন্যে কোনো আয়াত বেছে নাওনি কেন? তুমি তাদের বলো: আমি তো কেবল অহির অনুসরণ করি, যা আমার প্রভু আমার কাছে পাঠান। এটি তো অন্তর্দৃষ্টির আলো তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে এবং পথনির্দেশ ও অনুকম্পা তাদের জন্যে, যারা মেনে নেয়। (সূরা ৭: ২০৩)
أَوَلَمْ يَكْفِهِمْ أَنَّا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ يُتْلَى عَلَيْهِمْ ، إِنَّ فِي ذَلِكَ لَرَحْمَةً وذِكْرَى لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
অর্থ: তাদের জন্যে কি (মু'জিযা হিসেবে) যথেষ্ট নয় যে, আমি তোমার প্রতি এই কিতাব (কুরআন) নাযিল করেছি, যা তাদের তিলাওয়াত করে শুনানো হয়। এতে অবশ্যি রয়েছে অনুকম্পা এবং উপদেশ তাদের জন্যে, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে। (সূরা ২৯ আনকাবুত : আয়াত ৫১)
টিকাঃ
৪. দ্রষ্টব্য: সূরা ১৯ মরিয়ম: আয়াত ২৯-৩৫।
📄 কুরআন সর্বাঙ্গীন ও পূর্ণাঙ্গ মু’জিযা (Perfect Miracle)
কুরআন মজিদ সকল দিক থেকে, সর্বাঙ্গীনভাবে এবং সকল বিবেচনায় এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অপ্রতিহত মু'জিযা। এই মু'জিযা শাশ্বত, চিরন্তন ও জীবন্ত। এই মু'জিযা সর্বব্যাপী ও চিরবিস্ময়। আল কুরআনের এই মু'জিযা প্রধানত এর: ১. ভাষাগত, ২. ভাবগত, ৩. গুণগত, ৪. জ্ঞানগত, ৫. বোধগত, ৬. বুদ্ধিগত (যুক্তিগত), ৭. ফলগত, ৮. প্রভাবগত, ৯. প্রত্যয়গত, ১০. সত্যতাগত, ১১. শুদ্ধতাগত, ১২. সুরক্ষাগত।
এই সকল দিক থেকেই কুরআন বিস্ময়কর মু'জিযা। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি কুরআন মজিদে মু'জিযাকে বলা হয়েছে আয়াত। আয়াত-এর আভিধানিক অর্থ চিহ্ন বা নিদর্শন। আল্লাহ তায়ালা নিজেই কুরআন মজিদের একটি নাম নির্ধারণ করেছেন আয়াতুল্লাহ (آيَاتُ ٱللَّٰهِ) অর্থাৎ আল্লাহর নিদর্শন। আবার কুরআনের প্রতিটি বাক্যকেও পৃথক পৃথক ভাবে আয়াত (নিদর্শন) বলা হয়। এর অর্থ সামগ্রিকভাবে গোটা কুরআন এবং পৃথকভাবে এর প্রতিটি বাক্য একেকটি মু'জিযা।