📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 তা’বীল বা গূঢ় অর্থ

📄 তা’বীল বা গূঢ় অর্থ


তা'বীল সাধারণত মুতাশাবিহ্ আয়াতে করা হয়। তা'বীল অর্থ হচ্ছে, বাক্যের এমন কোন অর্থ বলে দেয়া, যা বাহ্যিক অর্থের বিরোধী। মুতাকাল্লেমীনরা এ ব্যাপারে বেশ বাড়া-বাড়ী সাথে কাজ করেছেন। তাঁরা প্রায় সব মুতাশাবিহ্ আয়াতেরই তা'বীল করার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে আমি তা'বীল পছন্দ করি না। কারণ অধিকাংশ মুতাশাবিহ্ আয়াতের সম্পর্ক স্বয়ং আল্লাহ্ ও তাঁর গুণাবলীর সাথে সংযুক্ত। আল্লাহর সত্তা ও তাঁর গুণাবলীর তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা আমার মত নয়। আমার তো ইমাম মালিক, সাওরী, ইবনুল মুবারাক ও আগেকার সব মনীষীর মতেই মত। তা হচ্ছে এই, মুতাশাবিহ্ আয়াতেরও বাহ্যিক অর্থ অনুসরণ করা এবং তা নিয়ে গবেষণা ও তা'বীলের প্রশ্রয় না নেয়া। কারণ, এ ধরনের আয়াত থেকে উদ্ভুত আহ্কাম নিয়ে ঝগড়া করা, সে ব্যাপারে নিজ মতবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত করে অন্যের মতবাদকে ঘায়েল করা ও কুরআনের সুষ্পষ্ট প্রমাণ পাল্টে দেয়া আমার কাছে বৈধ নয়। বৈধ পন্থা হচ্ছে এই, আয়াত স্পষ্টত যে মর্ম প্রকাশ করে তা মেনে নেয়া এবং সেটাকেই নিজের মতবাদ মনে করা। অপরে কি বলল বা না বলল, তার পরোয়া করা ঠিক নয়।
কি কি কারণে আয়াতে সন্দেহ ও গরমিল দেখা দেয়, তা বলে এসেছি। এখানে প্রতিটি কারণের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
لغة القرآن
যদি অনিশ্চয়তার (তাশাবুহ্) কারণ হয় কোন শব্দ, তা হলে কর্ম পন্থা হবে এই, দেখতে হবে যে, প্রাচীন আরবরা সে শব্দটিকে কোন অর্থে ব্যবহার করত। তার পরে দ্রষ্টব্য হল সাহাবা ও তাবেঈদের ব্যবহার। যে অর্থের ওপরে তাঁরা একমত হয়েছেন, সেটাই গ্রহণ করবে।
نحوا لقرآن
কুরআনে নাহ্ভী (ভাষা ও উচ্চারণ তত্ত্ব) আলোচনার ফলেও কিছুটা জটিলতা দেখা দিয়েছে। কারণ একদল সিবওয়ায় নাহ্ভীর অনুসরণ করে তার প্রতিকূল যা কিছু পেয়েছে, সম্ভব অসম্ভব সব রকমের হেরফেরের আশ্রয় নিয়ে নিজ মত প্রতিষ্ঠা করেছে। আমার মতে এটা অন্যায়। আয়াতের আকার ইংগিতে যা বেশী উপযোগী মনে হয়, সেটাই অনুসরণ প্রয়োজন। তা ফাররা নাহ্ভীর অনুকুল হোক, কিংবা সিবওয়ায়। যেমন:
وَالْمُقِيمِينَ الصَّلوةَ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ
এবং নামায কায়েমকারী ও যাকাত আদায়কারী
এ আয়াত সম্পর্কে হযরত উসমান (রাঃ) বলেন-
سَتُقِيمُها العَرَبُ بِالْسِنَتِها -
আমার মতে, এ বাক্যাংশ ও বাক-রীতি বাহ্যত আরবদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত বাগধারার বিপরীত হলেও মুলত তা নয়। কারণ আরবরাই আরবী ভাষার জন্মদাতা। তাদের মুখ থেকে যাই বের হবে সেটাই দলীল হয়ে দাঁড়ায়। এটা কোন নতুন কথা নয় যে, আরবরা দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তায় ধারাবাহিক রীতি নীতির লংঘন ও করে থাকেন এবং তা কেউ অন্যায় ভাবে না।
কুরআনও প্রাচীন আরবদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে। তাই কোথাও ‘ও’ স্থলে ‘ঈ’ এসে থাকে, কিংবা দ্বিবচনে একবচন বা পুংলিংগে স্ত্রী লিংগে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, আশ্চর্যের কিছু নেই। তাই এটা সর্বসম্মত কথা যে الْمُقِيمِينَ আদতে الْمُقِيمُونَ অর্থেই এসেছে।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 ইলমে মা’আনী ও বয়ান

📄 ইলমে মা’আনী ও বয়ান


ইলমে মা'আনী ও ইলমে বয়ান (ভাষা ও অলংকার শাস্ত্র) সম্পূর্ণ নতুন ব্যাপার। সাহাবা ও তাবেঈনের পরে তা রূপ লাভ করেছে। তাই কুরআনের বর্ণনা রীতির ব্যাপারে তার বিশেষ গুরুত্ব নেই। সুতরাং আরবরা সাধারণত যা সহজেই বুঝতে পারে, আমরা তা মাথা পেতে নেব এবং সেদিকেই লক্ষ্য রাখব। কিন্তু কপোলকল্পিত শাস্ত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যে রহস্য বিশেষ শাস্ত্রবিশারদ ছাড়া বুঝবে না, তেমনি কিছু কুরআনে আছে বলে আমরা স্বীকার করি না। তাই কুরআনের মর্মোদ্ধারে না সে সবের প্রয়োজন রয়েছে, না নিজকে অহেতুক তাতে জড়ানো উচিত।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 সূফীয়দের ইংগিত

📄 সূফীয়দের ইংগিত


তাসাউফপন্থী বা সূফী তাফসীরকারদের সৃষ্ট জটিলতার অবস্থাও তাই। তারা যে সূক্ষ্ম রহস্যের দিকে ইংগিত করেন, সে সব বিদ্যার সাথে তাফসীরের যোগ নেই আদৌ। আসল ব্যাপার এই, কুরআন শোনার সময়ে সূফীদের মনে বিশেস ভাব জেগে ওঠে। কুরআনের বিন্যাস আর সূফীদের চিন্তাধারা ও আধ্যাত্মিকতা এ দুয়ে মিলে তাদের অন্তরে এক বিশেষ অবস্থা সৃষ্টি করে। তা থেকে তারাই শুধু আনন্দ পেতে পারে, অপরের বেলায় তার মূল্য নেই আদৌ। যেমন, কোন খাঁটি প্রেমিক যদি লায়লী মজনুর কাহিনী পড়ে, তখনই নিজ প্রিয়াকে স্মরণ করতে থাকে এবং তাদের দু'জনের ভেতরে যা কিছু ঘটেছে, সে সবের কল্পনায় ডুবে গভীর আনন্দ পায়। তাতে অন্যের কি? তাই সূফীদের রহস্য লীলাও তাফসীর শাস্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়।

📘 কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি 📄 ইলমুল ই’তেবার বা ন্যায় শাস্ত্র

📄 ইলমুল ই’তেবার বা ন্যায় শাস্ত্র


এ আলোচনা প্রসংগে আরও এক জরুরী ব্যাপার মনে রাখা চাই। তা হচ্ছে এই, হযরত (সঃ) ও 'ইলমে ইতেবার' বা ন্যায়শাস্ত্র বৈধ রেখেছেন। তিনি নিজে তা অনুসরণও করেছেন, যেন উম্মতের জন্যে তা সুন্নত ও আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ্ যে জ্ঞান ভান্ডার দান করেছেন, তা বুঝতে ও তার মর্মমূলে পৌছতে যেন একটা রাস্তা মিলে যায়। যেমন:
فاما من اعطى واتقى
যে ব্যক্তি দান করল ও আল্লাহকে ভয় করল। (সূরা লাইল-৫)
এ আয়াতকে তকদীর এর মাসআলায় উদাহরণ আনা হয়। অথচ তার সাধারণ তাৎপর্য হচ্ছে এই, ‘যারা এ ধরনের কাজ করে, তাদের জন্য জান্নাত ও তার নিয়ামত রয়েছে এবং যারা বিপরীত পথে চলে, তাদের জন্যে জাহান্নাম ও তার কষ্ট রয়েছে। কিন্তু ন্যায়শাস্ত্র অনুসারে এ আয়াতের মর্ম এও হতে পারে যে, প্রত্যেককে বিশেষ এক অবস্থার জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। সে চাক বা না চাক, জ্ঞাতসারে কি অজ্ঞাতে সে অবস্থায় থাকবেই。
এভাবেই নীচের আয়াত: وَنَفْسٍ وَّمَاسَوّٰهَا
আল্লাহ্ পাপ ও পূণ্য সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন। (সূরা শামছ-৭)
তবে এটা সত্য যে, পাপ পূণ্যের মূল রূপ ও যে পাপ-পুণ্য মানুষের মৌল সত্তায় প্রাণ সঞ্চারের সময়ে নিহিত থাকে-এ দুয়ে সামঞ্জস্য রয়েছে। তাই ন্যায় শাস্ত্রের ভিত্তিতে এটি তকদীরের মাসআলার আরেকটি দলীল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية