📄 উত্তম বিশ্লেষণের ধরন
বিশেষজ্ঞরা নবীশদের মন মগজের পরিমাণ সামনে রেখে সে হিসেবেই বক্তব্য পেশ করেন। বস্তুত যে সব আয়াতে বিভিন্ন মতাবলম্বীর ভেতরে বিতর্কের ব্যাপার রয়েছে, তা বিশ্লেষণের উত্তম পন্থা হল এই, সেই মতগুলো আগে ব্যাখ্যা করা হবে। তারপর তার ওপরে আরোপিত অভিযোগগুলো পুরোপুরি যাচাই করবে। আর যে সব আয়াত বিধি বিধান সংশ্লিষ্ট, সেগুলোর বিশ্লেষণের ধারা হবে এই, বিধি বিধানের যত রূপ হতে পারে, সব উল্লেখ করবে। তার ভেতরে যে সব শর্ত ও বাধা-বন্ধক রয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করবে। দেখবে, সেগুলো থাকা বা না থাকায় কি পরিণাম দেখা দেয়। মূল মাআলার ওপরে আলোকপাত করতে পারে, এভাবে সব বিষয়ই একে একে আলোচনা করবে।
যে সব আয়াত আল্লাহ্ অবদান সম্পর্কিত, সেগুলোর বিশ্লেষণের ধারা হবে এই, সে অবদানগুলোর চিত্র অংকিত করবে, আর তার সব আনুষঙ্গিক দিকগুলো বলে দেবে। যে সব আয়াত ঘটনা বা দুর্ঘটনা সম্পর্কিত, সেগুলোর বিশ্লেষণের ধারা হল এই, এ ধরনের সব ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বলে দেবে। আর তার ভেতরে যত রহস্য ও ইংগিত রয়েছে সব উদ্ঘাটিত করে দেবে।
যে সব আয়াত মৃত্যু আর তার পরবর্তীকালের অবস্থা সম্পর্কিত, তা এভাবে বিশ্লেষণ করবে, যে সব অবস্থা দেখা দেবার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর চিত্র সুস্পষ্ট করে তুলে ধরবে এবং সব অবস্থাগুলোর পুরোপুরি বিশ্লেষণ দান করবে।
এ পর্যন্ত বিশ্লেষণের একটি ধরন সম্পর্কেই বলা হল। এর আরও অনেক ধরন আছে। যেমন, কোন আয়াতের মর্মে জটিলতার জন্যে অসামঞ্জস্য মনে হল সেখানে বিশ্লেষণের ধরন হবে এই, অনুরূপ উদাহরণ তুলে ধরে পাঠকের ধারণার কাছাকাছি করে দেবে। দুটি পরস্পর বিরোধী প্রমাণের জন্যে যদি তার বুঝতে অসুবিধে হয়, তার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দুটি প্রমাণের ভেতরকার বিরোধ মিটিয়ে দেবে। দুটি মর্ম যদি পরস্পর বিরোধী হয়ে দেখা দেয়, কিংবা সাধারণ অর্থের সাথে যদি যুক্তি-জ্ঞানের বিরোধ দেখা দেয়, তখনও এ দুয়ের ভেতরকার বিরোধ দূর করার মত বিশ্লেষণের দরকার। তেমনি দুটো আলাদা ব্যাপার যদি মিলে জগাখিচুড়ি হয়ে দাঁড়ায়, তখন ভুল সৃষ্টির কারণ দূর করে দেবার জন্যে বিশ্লেষণ প্রয়োজন। যদি একই আয়াত ভিন্ন ভিন্ন দুটো বিধানের প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সে দুটো বিধানের ভেতরে সামঞ্জস্য বিধানের প্রয়াস পাবে। কোন কোন স্থানে বিশ্লেষণের ধারা এও হতে পারে, আয়াতে যে সব প্রতিশ্রুতির কথা রয়েছে, তার সত্যতা ও যথার্থতা সুষ্পষ্ট করে তুলে ধরা। বিশ্লেষণের এও একটি ধরন যে, কোন ব্যাপারে রসূলুল্লাহ (সঃ)-এর জীবন থেকে উদাহরণ সংগ্রহ করে ব্যাপারটি সুপ্রমাণিত করে দেবে।
মোট কথা, সাহাবাদের তাফসীরে বিশ্লেষণের অনেক নজীর রযেছে। বস্তুত এ বিষয়টি সব জটিলতার সর্ববিধ কারণ সবিস্তারে না করে যথাযথভাবে বুঝানো সম্ভব নয়। বিশ্লেষণ-সাপেক্ষ সব ব্যাপারগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ দ্বারা সমাধান বের করে দিতে পারলেই এ বিষয়টির পুরোপুরি আলোচনা সফল হতে পারে।
📄 তা’বীল বা গূঢ় অর্থ
তা'বীল সাধারণত মুতাশাবিহ্ আয়াতে করা হয়। তা'বীল অর্থ হচ্ছে, বাক্যের এমন কোন অর্থ বলে দেয়া, যা বাহ্যিক অর্থের বিরোধী। মুতাকাল্লেমীনরা এ ব্যাপারে বেশ বাড়া-বাড়ী সাথে কাজ করেছেন। তাঁরা প্রায় সব মুতাশাবিহ্ আয়াতেরই তা'বীল করার প্রয়াস পেয়েছেন। তবে আমি তা'বীল পছন্দ করি না। কারণ অধিকাংশ মুতাশাবিহ্ আয়াতের সম্পর্ক স্বয়ং আল্লাহ্ ও তাঁর গুণাবলীর সাথে সংযুক্ত। আল্লাহর সত্তা ও তাঁর গুণাবলীর তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা আমার মত নয়। আমার তো ইমাম মালিক, সাওরী, ইবনুল মুবারাক ও আগেকার সব মনীষীর মতেই মত। তা হচ্ছে এই, মুতাশাবিহ্ আয়াতেরও বাহ্যিক অর্থ অনুসরণ করা এবং তা নিয়ে গবেষণা ও তা'বীলের প্রশ্রয় না নেয়া। কারণ, এ ধরনের আয়াত থেকে উদ্ভুত আহ্কাম নিয়ে ঝগড়া করা, সে ব্যাপারে নিজ মতবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত করে অন্যের মতবাদকে ঘায়েল করা ও কুরআনের সুষ্পষ্ট প্রমাণ পাল্টে দেয়া আমার কাছে বৈধ নয়। বৈধ পন্থা হচ্ছে এই, আয়াত স্পষ্টত যে মর্ম প্রকাশ করে তা মেনে নেয়া এবং সেটাকেই নিজের মতবাদ মনে করা। অপরে কি বলল বা না বলল, তার পরোয়া করা ঠিক নয়।
কি কি কারণে আয়াতে সন্দেহ ও গরমিল দেখা দেয়, তা বলে এসেছি। এখানে প্রতিটি কারণের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
لغة القرآن
যদি অনিশ্চয়তার (তাশাবুহ্) কারণ হয় কোন শব্দ, তা হলে কর্ম পন্থা হবে এই, দেখতে হবে যে, প্রাচীন আরবরা সে শব্দটিকে কোন অর্থে ব্যবহার করত। তার পরে দ্রষ্টব্য হল সাহাবা ও তাবেঈদের ব্যবহার। যে অর্থের ওপরে তাঁরা একমত হয়েছেন, সেটাই গ্রহণ করবে।
نحوا لقرآن
কুরআনে নাহ্ভী (ভাষা ও উচ্চারণ তত্ত্ব) আলোচনার ফলেও কিছুটা জটিলতা দেখা দিয়েছে। কারণ একদল সিবওয়ায় নাহ্ভীর অনুসরণ করে তার প্রতিকূল যা কিছু পেয়েছে, সম্ভব অসম্ভব সব রকমের হেরফেরের আশ্রয় নিয়ে নিজ মত প্রতিষ্ঠা করেছে। আমার মতে এটা অন্যায়। আয়াতের আকার ইংগিতে যা বেশী উপযোগী মনে হয়, সেটাই অনুসরণ প্রয়োজন। তা ফাররা নাহ্ভীর অনুকুল হোক, কিংবা সিবওয়ায়। যেমন:
وَالْمُقِيمِينَ الصَّلوةَ وَالْمُؤْتُونَ الزَّكَاةَ
এবং নামায কায়েমকারী ও যাকাত আদায়কারী
এ আয়াত সম্পর্কে হযরত উসমান (রাঃ) বলেন-
سَتُقِيمُها العَرَبُ بِالْسِنَتِها -
আমার মতে, এ বাক্যাংশ ও বাক-রীতি বাহ্যত আরবদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত বাগধারার বিপরীত হলেও মুলত তা নয়। কারণ আরবরাই আরবী ভাষার জন্মদাতা। তাদের মুখ থেকে যাই বের হবে সেটাই দলীল হয়ে দাঁড়ায়। এটা কোন নতুন কথা নয় যে, আরবরা দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তায় ধারাবাহিক রীতি নীতির লংঘন ও করে থাকেন এবং তা কেউ অন্যায় ভাবে না।
কুরআনও প্রাচীন আরবদের ভাষায়ই নাযিল হয়েছে। তাই কোথাও ‘ও’ স্থলে ‘ঈ’ এসে থাকে, কিংবা দ্বিবচনে একবচন বা পুংলিংগে স্ত্রী লিংগে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, আশ্চর্যের কিছু নেই। তাই এটা সর্বসম্মত কথা যে الْمُقِيمِينَ আদতে الْمُقِيمُونَ অর্থেই এসেছে।
📄 ইলমে মা’আনী ও বয়ান
ইলমে মা'আনী ও ইলমে বয়ান (ভাষা ও অলংকার শাস্ত্র) সম্পূর্ণ নতুন ব্যাপার। সাহাবা ও তাবেঈনের পরে তা রূপ লাভ করেছে। তাই কুরআনের বর্ণনা রীতির ব্যাপারে তার বিশেষ গুরুত্ব নেই। সুতরাং আরবরা সাধারণত যা সহজেই বুঝতে পারে, আমরা তা মাথা পেতে নেব এবং সেদিকেই লক্ষ্য রাখব। কিন্তু কপোলকল্পিত শাস্ত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যে রহস্য বিশেষ শাস্ত্রবিশারদ ছাড়া বুঝবে না, তেমনি কিছু কুরআনে আছে বলে আমরা স্বীকার করি না। তাই কুরআনের মর্মোদ্ধারে না সে সবের প্রয়োজন রয়েছে, না নিজকে অহেতুক তাতে জড়ানো উচিত।
📄 সূফীয়দের ইংগিত
তাসাউফপন্থী বা সূফী তাফসীরকারদের সৃষ্ট জটিলতার অবস্থাও তাই। তারা যে সূক্ষ্ম রহস্যের দিকে ইংগিত করেন, সে সব বিদ্যার সাথে তাফসীরের যোগ নেই আদৌ। আসল ব্যাপার এই, কুরআন শোনার সময়ে সূফীদের মনে বিশেস ভাব জেগে ওঠে। কুরআনের বিন্যাস আর সূফীদের চিন্তাধারা ও আধ্যাত্মিকতা এ দুয়ে মিলে তাদের অন্তরে এক বিশেষ অবস্থা সৃষ্টি করে। তা থেকে তারাই শুধু আনন্দ পেতে পারে, অপরের বেলায় তার মূল্য নেই আদৌ। যেমন, কোন খাঁটি প্রেমিক যদি লায়লী মজনুর কাহিনী পড়ে, তখনই নিজ প্রিয়াকে স্মরণ করতে থাকে এবং তাদের দু'জনের ভেতরে যা কিছু ঘটেছে, সে সবের কল্পনায় ডুবে গভীর আনন্দ পায়। তাতে অন্যের কি? তাই সূফীদের রহস্য লীলাও তাফসীর শাস্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়।